এই পত্রিকার প্রতিবেদনটি আব্রাহাম লিঙ্কনের জন্মস্থান, আমেরিকার জাতীয় ঐতিহাসিক উদ্যান, কেনটাকির হোজেনভাইল ভ্রমণের উপর ভিত্তি করে লেখা। লেখক তাঁর পরিবারের সঙ্গে বাউলিং গ্রিন শহর থেকে হোজেনভাইলে লিঙ্কনের জন্মভিটা পরিদর্শনে যান।

প্রতিবেদনে লিঙ্কনের জন্মস্থান ‘সিংকিং স্প্রিং ফার্ম’-এ অবস্থিত মেমোরিয়াল বিল্ডিং, যেখানে তাঁর জন্মকালীন কাঠের কেবিনটি সংরক্ষিত আছে, তার বর্ণনা রয়েছে। পাশাপাশি, লিঙ্কনের শৈশবের আরেকটি বাসস্থান ‘নোব ক্রিক ফার্ম’ এবং তাঁর স্মৃতি বিজড়িত অন্যান্য স্থল, যেমন লিঙ্কন স্কোয়ার ও লিঙ্কন মিউজিয়ামের উল্লেখ করা হয়েছে।

এতে আব্রাহাম লিঙ্কনের শৈশবের স্মৃতিচারণ এবং ক্রীতদাস প্রথার বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থানের কথাও তুলে ধরা হয়েছে, যা তাঁকে বিশ্বজুড়ে মানবপ্রেমীদের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র করে তুলেছে।

  • সাময়িক প্রসঙ্গ, শিলচর, রবিবার, ২৪শে মার্চ, ২০১৩

সম্পূর্ণ নথিটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন (PDF)

View Extracted Text
এ সপ্তাহের বিশেষ প্রসঙ্গ : আমেরিকার জাতীয় ঐতিহাসিক উদ্যান

আব্রাহাম লিঙ্কনের স্মৃতিধন্য কেনটাকির হোজেনভাইল
-অপরেশ ভৌমিক-

বাউলিং গ্রিন শহরটা আমেরিকার কেনটাকি রাজ্যের দ্বিতীয় বড় শহর। আধুনিক শহরের আনুষাঙ্গিক 
সবকিছু থাকার পাশাপাশি সেখানে রয়েছে আরও দু'টো উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান। একটি হল দেশ 
বিদেশ থেকে আগত ছাত্রদের বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য বিখ্যাত ওয়েস্টার্ন কেনটাকি 
ইউনিভার্সিটি এবং অপরটি হল একসময় পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি এডওয়ার্ড ওয়ারেন বাফেটের 
বার্কশায়ার হেথাওয়ে ইনভেস্টার-এর নিয়ন্ত্রণাধীন ফুইট অফ দি লুমের হেডকোয়ার্টার।

ফ্রুইট অফ দি লুমের হেডকোয়ার্টারেই আমার ছেলে কাজ করত আর সেজন্যই প্রবাসে ওর সঙ্গে 
বসবাস করতে গিয়ে বাউলিং গ্রিন শহবের উইলকিনসন ট্রেসের ফেয়ারওয়েজ অ্যাট হার্টল্যান্ড কমপ্লেক্সের 
একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকতে হয়।

প্রবাসের প্রথম পর্বে বাউলিং গ্রিন শহরের দর্শনীয় যা কিছু আছে তা সপ্তাহান্তে ছুটির দিনে এক এক 
করে দেখা হয়ে যায়। তারপর শুরু হয় শহর থেকে দুবের দর্শনীয় জায়গাগুলোতে যাওয়া। দূরে কোথাও 
যেতে হলে আবহাওয়া এবং যাতায়াতের রাস্তাঘাট প্রভৃতির আগাম তথ্য সংগ্রহ করে নিতে হয়। 
শীত পড়ে গেলে মুক্তাঙ্গনের দর্শনীয় স্থানে যাওয়ার কোনও উপায় নেই। কারণ, ঘরের বাইরে ভীষণ 
ঠাণ্ডা এবং বরফ পড়ে সবকিছু একাকার হয়ে যায়।

শীত তখনও বাউলিং গ্রিন শহরে জাঁকিয়ে আসতে কিছুটা দেরি। ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভাব কিছুটা থাকলেও 
মুক্তাঙ্গনে ঘোরাফেরা করার মত জায়গা রয়েছে। ২৮ নভেম্বর ২০১০ রবিবার দিন দুপুর ১২টার সময়ই 
আমরা ফেয়ারওয়েজ অ্যাট হার্টল্যান্ডের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে পড়ি। আমরা যাব হোজেনভাইল। 
সেখানে রয়েছে আমেরিকার জাতীয় ঐতিহাসিক উদ্যান।  আব্রাহাম লিঙ্কনের জন্মভিটা অর্থাৎ 
আমেরিকার ভাষায় আব্রাহাম লিঙ্কন বার্থপ্লেস ন্যাশনাল হিস্টোরিক্যাল পার্ক।

অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে বাউলিং গ্রিন শহরে ভারতীয় খাবার দোকান তাজ প্যালেসে আমাদের 
দুপুরবেলার আহারপর্ব সেরে নিই। তারপর গাড়িতে চেপে শহর থেকে বেরিয়ে ৬৫ এন ইন্টারস্টেট 
রাস্তা ধবে উত্তরে এগিয়ে চলি কেনটাকি রাজ্যের রাজধানী লুইসফাইলের দিকে। ওয়েবসাইট থেকে 
প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে ৬৫ এন ইন্টারস্টেট ধরে এগিয়ে যেতে যেতে ৮১ এক্সিট দিয়ে ঢুকে পড়তে হবে 
ইউএস ৩১ (ই) রাস্তায়। আর ইউএস ৩১ (ই) রাস্তা দিয়ে সোজা চলতে চলতেই পাওয়া যাবে 
হোজেনভাইলে আব্রাহাম লিঙ্কনের জন্মস্থান, আমেরিকার জাতীয় ঐতিহাসিক উদ্যান।

ইন্টারস্টেট ৬৫ এন রাস্তা ঘরে ঘণ্টাখানেক গাড়ি চালিয়ে যেতেই ৮১ এক্সিট পাওয়া যায়। 
এক্সিট দিয়ে ঢুকে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলে হোজেনভাইলের উদ্দেশ্যে। নির্জন রাস্তা। রাস্তায় গাড়ি 
চলাচলের সংখ্যা খুবই কম। দু'দিকে কেবল ফসলবিহীন বিস্তৃত জমি। কিছুদিন হল ফসল 
কেটে নিয়ে গেছে। এখন ন্যাড়া ধূসর মাঠ। দূরে টিলাভূমিতেও ফসল কেটে নেওয়ার চিহ্ন দৃশ্যমান। 
মাঝে মাঝে পত্রবিহীন বড় বড় শুস্ক গাছের কংকাল মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। 
বড় ফাঁকা রাস্তা দিয়ে মনে হয় কেবল আমাদের গাড়িটাই দ্রুতবেge ছুটছে। অবশ্য আমাদের চলার 
পথে দু'খানা ঘোড়ার গাড়ি অতিক্রম করি। দু'টো ঘোড়ার গাড়িতেই দু'জন করে আরোহী। একজন 
স্ত্রীলোক এবং অন্যজন পুরুষ। চলার পথে ঘোড়ার গাড়িতে ওদেরকে দেখতে। চারি থালো লাগে 
মিস্টদের বেশভূষা এবং ঘোড়ার গাড়িতে বসে চলার নুমনা দেখে মধ্যযুগের ইউরোপীয় লর্ড পবিবারদের 
কথাই মনে পড়ে যায়। নির্জন রাস্তায় আমাদের গাড়ি ওদেরকে পিছনে ফেলে আসার সময় ওরা হাত 
তুলে আমাদের অভিবাদন জানায়। আমরাও চলমান অবস্থায়ই ওদেরকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করি।

৮১ এক্সিট থেকে প্রায় দশমাইল পাড়ি দিয়ে আমাদের কাঙ্খিত আব্রাহাম লিঙ্কনের জন্মস্থানে পৌঁছে যাই। 
সেখানে গাড়ি থেকে নেমেই ইউএস ৩৮ (ই) রাস্তার পাশে ন্যাশনাল হিস্টোরিক্যাল পার্কের প্রধান 
ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে দেখতে পাই অনুবে উঁচু টিলায় রয়েছে সুন্দর মেমোবিয়াল বিল্ডিং এবং 
ফটক থেকে একটু এগিয়ে ডানদিকে রয়েছে ভিসিটর সেন্টার এবং বামদিকে একটু নিচু জায়গায় 
ন্যান্সি লিঙ্কন ইন। তাছাড়া সামান্য দূরে ফটকের বিপরীতে রয়েছে পিকনিক করার জায়গা এবং 
মেমোরিয়েল বিল্ডিং-এর চারদিকে 'উঁচু-নিচু টিলা জমির মধ্য দিয়ে পায়ে হাঁটা পথে পার্ক 
এলাকায় ঘুরে বেড়ানোর ব্যবস্থা।

ন্যাশনাল পার্কের প্রধান ফটকের সামনে সামান্য সময় দাঁড়িয়ে চারদিক অবলোকন করি তারপর 
ফটকের ভিতর দিয়ে ডানদিকে এগিয়ে চলে যাই ভিসিটর সেন্টারে। ভিসিটর সেন্টারে দর্শকদের 
অবগতির জন্য রয়েছে নানা ধরনের পত্রক এবং সেখানেই রয়েছে একটি ছোট প্রেক্ষাগৃহ। ছোট 
প্রেক্ষাগৃহটিতে এক ঘণ্টা পর পর আব্রাহাম লিঙ্কনের জন্মভিটা এবং শৈশবের বাসভূমি নিয়ে নাতিদীর্ঘ
 তথ্যচিত্র দেখানো হয়।

বিভিন্ন রকমের প্রচারপত্র এবং হোক্ষাগৃয়ে প্রানিত তথারিয়ে আব্রাহাম লিঙ্কন সম্বন্ধে সন্নিবিষ্ট তথ্যগুলি 
হল-১৮০৯ ইংবাজির ১২ ফেব্রুয়ারি কেনটাকি বাজ্যের তৎকালীন হাবডিন কাউন্টি এবং এখন যেখানে 
হোজেনমিল রয়েছে তা থেকে এক কিংবা দেড় মাইল দূরে বর্তমান লা-রুই কাউন্টিতেই আব্রাহাম 
লিঙ্কনের জন্ম হয়।

- ১৮০৮-এর ১২ ডিসেম্বর আমেরিকায় পাতাঝড়ার দিনগুলোতে আব্রাহাম লিঙ্কনের পিতা টমাস 
লিঙ্কন কেনটাকি রাজ্যের হোজেনমিলের দক্ষিণে তিনশ একর অসমতল টিলাজমি ক্রয় করেন। 
ওই অসমতল এলাকা স্থানীয়ভাবে সিংকিং স্প্রিং ফার্ম নামে পরিচিত ছিল। সিংকিং স্প্রিং ফার্মের 
একটা টিলাতে এক কোঠা বিশিষ্ট কাঠের তৈরি ছোট ঘরে টমাস লিঙ্কন এবং তাঁর স্ত্রী ন্যান্সি 
লিঙ্কন তাঁদের কন্যা সন্তান সাবাকে নিয়ে বসবাস করতে আরম্ভ করেন। তার ঠিক দু'মাস পরেই 
আমেরিকার ভাবী ষোড়শতম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন ওই ছোট এককোঠা বিশিষ্ট কাঠের ঘরটাতেই 
জন্মগ্রহণ করেন।

আব্রাহাম লিঙ্কনের মৃত্যুর ৪৬ বছর পর ১৯১১-এ সিংকিং স্প্রিং ফার্মের টিলায় অবস্থিত সেই এক। 
কোঠা বিশিষ্ট কাঠের ছোট ঘৰটিকে ভিতরে বেখেই গড়ে তোলা হয় এক মেমোরিয়াল বিল্ডিং বা স্মৃতিসৌধ। 
আমেরিকার তদানীন্তন ২৭তম প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম হাওয়ার্ড টেফট ১৯১১ সালের ৯ নভেম্বর এই 
স্মৃতিসৌধকে জাতির উদ্দেশে উৎসর্গ করেন। বর্তমান আমেরিকায় মেমোরিয়াল বিল্ডিং এবং তার 
চতুপাশ্বস্থ সিংকিং স্প্রিং ফার্মের অঞ্চলটা নিয়েই আব্রাহাম লিঙ্কনের জন্মস্থান, আমেরিকার জাতীয় 
ঐতিহাসিক উদ্যান। আমেরিকায় প্রচলিত তাদের বিশেষ জাতীয় উৎসবের দিন থ্যাঙ্কস গিভিং ডে, 
২৫ ডিসেম্বর এবং ১ জানুয়ারি এই তিন দিন ছাড়া বছরের বাকি দিনগুলোতে এই ন্যাশনাল 
হিস্টোরিক্যাল পার্ক দর্শকদের জন্য খোলা রাখা হয় এবং সেখানে সবসময়ই দর্শকদের সমাগম হয়ে থাকে।

'আব্রাহাম লিঙ্কন বার্থ প্লেস ন্যাশনাল হিস্টোরিক্যাল পার্কের মেমোরিয়াল বিল্ডিং-এর সামান্য দূরত্বে 
উত্তর-পূর্বে ন্যাপি লিঙ্কন ইন নামে যে ঘরটি রয়েছে, সেটা আব্রাহাম লিঙ্কনের মায়ের নামকরণে 
১৯২৮-এ তৈরি হয়। ন্যান্সি লিঙ্কন ইন মূলত আব্রাহাম লিঙ্কনের জন্মস্থান পরিদর্শনে আসা উৎসাহী 
দর্শনার্থীদের থাকা খাওয়ার সুবিধার জন্যই চালু করা হয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেই 
পরিষেবা বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে ন্যান্সি লিঙ্কন ইন শুধুমাত্র স্মারক হিসাবেই ইতিহাসের সাক্ষী স্বরূপ 
দাঁড়িয়ে আছে।

ন্যাশনাল হিস্টেরিক্যাল পার্কের ভিসিটর সেন্টারে প্রাপ্ত পত্রক এবং প্রদর্শিত তথ্যচিত্রে বর্ণিত কাহিনী থেকে 
আব্রাহাম লিঙ্কনের জন্মভিটা, ন্যান্সি লিঙ্কন ইন এবং গোটা সিংকিং স্প্রিং-এর 'তথ্যাদি অবগত 
হওয়ার পর সেখান থেকে বেরিয়ে অগ্রসর হই মেমোরিয়াল বিল্ডিং-এর দিকে।

সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই দিনমণি দিগন্তে ডুব মারবে। জাতীয় 
ঐতিহাসিক উদ্যানের প্রশাসন আর পনেরো মিনিট সময়ের মধ্যেই প্রধান ফটক বন্ধ করে দেবে। আমরা 
তাড়াতাড়ি টিলার উঁচু-নিচু পথ পাড়ি দিয়ে ঢুকে যাই মেমোরিয়াল বিল্ডিং-এব ভিতর।

মেমোরিয়াল বিল্ডিং-এর ভিতর ঢুকে প্রথমেই নজরে পড়ে কাঠের একটি ছোট্ট কুঠুরি। এই এক কোঠা 
বিশিষ্ট কাঠের কুঠুরির ভিতরই জন্ম হয়েছিল আমেরিকার ষোড়শতম প্রেসিডেন্ট  আব্রাহাম লিঙ্কনের। 
কুঠুরিটার সামনেষ দিক দেখার পর বাকি দিকগুলো ঘুরে দেখার জন্য পা বাড়াই আর তখনই দেখতে 
পাই ছোট্ট একটি টেবিল সামনে রেখে চেয়ারে বসে আছেন একজন কর্মী। আমাদের দেখেই কর্মীটি 
মেমোরিয়াল বিল্ডিং-এর দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সময় সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়। আমরা তাড়াতাড়ি 
মেমোরিয়াল বিল্ডিং-এর ভিতর কুঠুরিটার চারদিক ঘুবে দেখি এবং আমার ছেলে এবং বউমা পালা 
করে ঝটপট কয়েকটা ফটো তুলে নেয়।

তারপর মেমোরিয়াল বিল্ডিং-এর ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে সিংকিং স্প্রিং ফার্ম এলাকার পায়ে 
হাঁটা উঁচু-নিচু পথ দিয়ে হেঁটে, প্রধান ফটকের বাইরে এসে ইউএস ৩১ (ই) রাস্তার পাশে রাখা 
আমাদের গাড়িতে গিয়ে উঠি। গাড়ি ইউএস ৩১ (ই) রাস্তা ধরে উত্তরদিকে এগিয়ে চলে। সামান্য 
সময়ের ব্যবধানেই তিন মাইল অতিক্রম করার পর পৌঁছে যাই হোজেনভাইল ডাউন টাউনের লিঙ্কন 
স্কোয়ারে। লিঙ্কন স্কোয়ারে রয়েছে লিঙ্কন মিউজিয়াম এবং মিউজিয়ামের নিকটেই রাস্তার মাঝখানে 
রয়েছে আব্রাহাম লিঙ্কনের একটি ব্রোঞ্জ নির্মিত সুদৃশ্য মূর্তি। আমরা সময়মত পৌঁছতে না পারার 
জন্যই লিঙ্কন মিউজিয়ামে ঢুকে কিছু দেখতে পারিনি। লিঙ্কন স্কোয়ারে রাস্তার মাঝখানে আব্রাহাম 
লিঙ্কনের মূর্তি এবং মিউজিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের প্রাকমূহূর্তে আলো-আঁধারি পরিবেশেই 
দু-তিনটা ফটো তুলে নিই।

ধীরে ধীরে লিঙ্কন স্কোয়ারের পাশে রাখা আমাদের গাড়িতে গিয়ে ওঠি। গাড়ির মুখ ঘুবিয়ে যেদিক 
থেকে এসেছিলাম সে দিকেই বাউলিং গ্রিনের ফেয়ারওয়েজ অ্যাট হার্টল্যান্ডে পরবাসের আস্তানায় ফিরে 
যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিই। গাড়িতে চলতে চলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আব্রাহাম লিঙ্কন 
বর্ণিত তাঁর শৈশবের বাসভূমির চিত্রপট এবং আরও সব কাহিনী।

হোজেনভাইলের লিঙ্কন স্কোয়ার কিংবা সিংকিং স্প্রিং ফার্মে আব্রাহাম লিঙ্কনের জন্মভিটার পাশ দিয়ে
ইউএস ৩১ (ই) রাস্তায় গাড়ি উত্তর-পূর্বে এগিয়ে গেলেই পাওয়া যায় নোষ ক্রিক ফার্ম।

আব্রাহাম লিঙ্কনের জন্মের দু'বছর পর ১৯১১-তে টমাস লিঙ্কন নোব ক্রিক ফার্ম কিনেছিলেন। 
সিংকিং স্প্রিং ফার্মের ছোট বাড়িটা ছেড়ে সপরিবারে চলে যান নোব ক্রিক ফার্মে।

১৮৬০-এর ৪ জুন হোজেনভাইলের নিকটবর্তী শহর এলিজাবেথ টাউনের নাগরিক এবং আব্রাহাম লিঙ্কনের 
শুভানুধ্যায়ী স্যামুয়েল হে ক্রাফট আমেরিকার হবু প্রেসিডেন্টকে তাঁৰ শৈশবের জন্মভিটা ও বাসস্থান 
দেখে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানালে প্রত্যুত্তবে  আব্রাহাম লিঙ্কন তাঁকে একটি চিঠি লিখেন। সেই 
চিঠিতে ছিল  আব্রাহাম লিঙ্কনের শৈশবের স্মৃতিচারণ।

স্মৃতিচারণায় আব্রাহাম লিঙ্কন ব্যক্ত করেন, কী সুন্দর ছিল নোব ক্রিক ফার্মের ভৌগোলিক অবস্থান। 
উঁচু পাহাড়ের গা বেয়ে ঢালু ভূমি নীচে এসে ঠেকেছে গোলাকার হাতলের আকাবে বিস্তৃত গ্রীষ্মের 
স্রোতস্বিনী ছোট নদীর কিনারায়। বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে, বন পাহাড়ে মাঝে মাঝে মাথা উঁচু করে 
দাঁড়িয়ে থাকা ওক মেপলের সারি সারি গাছ। তারই মধ্যে পাহাড় ঘেরা নদী উপত্যকা ঝোপঝাড়ের 
ফাঁকে ফাঁকে ছিল তিন তিনটা উর্বর চাষের জমি। একবার চাষের জমিতে পাশাপাশি সারি বেঁধে শিশু 
আব্রাহাম কুমড়ো বীজ রোপণ করছিলেন এবং তাঁর বোন সারা যপন করছিলেন ভূট্টার বীজ। রাতের 
মুষলধারার বৃষ্টি তাঁদের সব পরিশ্রম পণ্ড করে দেয়। ধারাবৃষ্টি তাঁদের বপন করা বীজগুলোকে 
একাকার করে ভাসিয়ে নিয়ে যায় ফুলেফেঁপে ওঠা খরস্রোতা নোৰ ক্রিক নদীর জলে।

এসব ছাড়া আব্রাহাম লিঙ্কন নোব ক্রিক ফার্ম এলাকায় বসবাসের সময় শৈশবের আরও সব 
অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করেন। তিনি লিখেন, নস ক্রিঞ্চ নদী সংলগ্ন নোব ক্রিক ফার্মের পাশ দিয়ে 
বর্তমানে ইউএস ৩১ (ই) নামের যে রাস্তাটি কেনটাকি রাজ্যের রাজধানী লুইসভাইলের দিক থেকে 
এসে দক্ষিণে টেনেসি বালের ন্যাসভাইলের দিকে এগিয়ে গেছে সেটাই হল পুরাতন কামবারল্যান্ড ট্রেইল। 
ছেলেবেলায় আব্রাহাম লিঙ্কন তাঁদের নোষ ক্লিক ফার্মের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে যেখেছেন পুরাতন 
কালো নিগ্রো ক্রীতদাসদের বেঁধে দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে বিক্রির জন্য নিয়ে যেতে।

পশ্চিম দিগন্তে সূর্য ডুব দেওয়ার সাথে সাথেই আমরা হোজেনতাইল লিঙ্কন স্কোয়ার থেকে রওয়ানা 
দিয়েছিলাম বাউলিং গ্রিনে ফিরতে। গাড়ি চলতে চলতে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। আর অন্ধকার 
ভেদ করেই শর প্রস গ্রাম্য রাস্তা দিয়ে এগোতে এগোতে আব্রাহাম লিঙ্কনের স্মৃতিচারণার ওইসব 
কথাগুলোই মনের মধ্যে তোলপাড় করে। শুধু তাই নয়, এসব ভাবতে ভাবতে চলতি গাড়িতে বসে 
বসেই তাঁর প্রেসিডেন্ট জীবনের শেষ পর্যায়ের কিছু কাহিনীও মনকে আলোড়িত করে।

মার্কিন মুলুকে ক্রীতদাস প্রথা বিলোপ করার প্রশ্নে, গৃহযুদ্ধে বিদীর্ণ আমেরিকার সঙ্কটময় দিনগুলোতে, 
রিপাবলিকান দলেব সভাপতি আব্রাহাম লিঙ্কনের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের সময় তাঁর স্মৃতির পর্দায়। 
-শৈশবের ওইসব ঘটনাবলীর দৃশ্য ভেসে উঠতো। কামবারল্যান্ড ট্রেইল ধরে সাদা চামড়ার লোকেরা 
কালো চামড়ার ক্রীতদাসদের বেঁধে নিয়ে যাওয়ার করুণ দৃশ্য তাঁর মনকে ভীষণ পীড়া দিত। আর 
সেটার উপশম করতে গিয়েই মানবাধিকার সুরক্ষার দিশারী  আব্রাহাম লিঙ্কন নিজের জীবন দিয়ে 
মার্কিন মুলুক থেকে ক্রীতদাস প্রথা হটিয়ে দেন। সে কারণেই সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মতাদর্শের জনগণ 
সহ বিশ্বের সকল মানবপ্রেমীদের নিকট  আব্রাহাম লিঙ্কন শ্রদ্ধার আসনে আসীন।

আজও আব্রাহাম লিঙ্কনের জন্মের দুশ বছর পর দেশ-বিদেশের পর্যটকরা তাঁর জন্মভিটা ও শৈশবের 
বাসভূমি দর্শনের জন্য কেনটাকি রাজ্যের লা-রুই কাউন্টির সিংকিং স্প্রিং এবং নোব ক্রিক ফার্মে 
এসে ভিড় জমায়।