“কন্যা কেশবতী। সুশ্রী। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা। বি, এ পাঠরতা। বয়স ২০ বৎসর। পূর্ব্ববঙ্গীয় ভরদ্বাজ পাত্র চাই। পোঃ বঃ ৭০১।” “সুন্দরী, তন্বী। দৈর্ঘ্য পাঁচ ফুট। গৃহকর্মে সুনিপুণা। আই, এ প্লাকন্ড পাত্রীর জন্য যোগ্য শাণ্ডিল্য পাত্র চাই। উপযুক্ত যৌতুক দেওয়া হবে। পোঃ বঃ ২৭৩০১” – “'আরে বাবাঃ যৌতুক দেওয়া হবে! ডাওরী অ্যাক্টকে অমান্য করে! আইনকে সব দিক দিয়েই ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে তা এদিক দিয়ে হলে ক্ষতি কি? এই দুদিনে দু একটা বছরত দাম্পত্য জীবন মধুরেণ সমাপয়েত হবে। অবশ্য আমাদের ভাগ্যে এসব কুলোবে না। এ লাইনে আমাদের সাড়ি অনেক পিছনে! ফাষ্ট প্রিফারেন্স টুদা ইঞ্জিনীয়ারস। তারপর ডাক্তার, চাটার্ড একাউন্টেন্ট, মিলিটারী অফিসারস আরও কত কি। এসব ভাবতেও যেন কেমন লাগে।” রবিবারের পত্রিকা পড়াটা সুকান্তের একটা বিশেষ নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে বামপন্থী ও দক্ষিণ পন্থী কোন্দলের খবর ওর কাছে সেকেণ্ডারী! প্রাইমারী হচ্ছে কৰ্ম্ম খালির বিজ্ঞাপন। তাই সুকান্তের নিয়মের শুরু হয় কৰ্ম্মখালির বিজ্ঞাপন দেখে। সব কিছু দেখে শেষ পর্যন্ত যখন আর বিশেষ কিছুই থাকে না তখন অজান্তেই সুকান্তের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় ভরদ্বাজ, শাণ্ডিল্য আর সদগোপ পাত্র পাত্রীর বাজারে। পাত্র পাত্রীর চাহিদা ও গুণাগুণের বাহার দেখে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই সুকান্ত খাপছাড়া নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করে পত্রিকা পড়ার সমাপ্তি ঘোষণা করে। বলে “আরে বাবাঃ যৌতুক দেওয়া হবে....। এসব ব্যাপারে ফাষ্ট প্রিফারেন্স টুদা ইঞ্জিনীয়ারস ইত্যাদি ইত্যাদি।" মাঝে মাঝে নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটে। কিন্তু নিগূঢ় ভাবে ভাবলে বলতে হবে সেটাও একটা নিয়ম। যাহোক অবশেষে একদিন সুকান্তর নিয়মেও ব্যতিক্রম ঘটল। রবিবারের পত্রিকা পড়াটা অসমাপ্ত রয়ে গেল। তবে এতদিন মনের আবেগে যা চেয়েছিল তা পেয়েছে। বিলাসপুর স্বর্ণপ্রভা কলেজের পরিচালক সমিতি একজন ইকনমিকসে এম, এ চাইছে। সুকান্ত ভাবল আবেদন করলে নিশ্চয়ই চাকরীটা পেয়ে যাবে। তারপর আরও চিন্তা করল- “জায়গাটা কি রকম? পরিবেশ? যদি একেবারে হয় যদি নিজেকে খাপ খাইয়ে না নিতে পারি? – তা যত গেয়েই হোক বা জঙ্গল হোক আমি যাবই আমাকে একটা কিছু করতে হবে।” আমি যাবই। সুকান্তর শেষ সিদ্ধান্তই ঠিক রইল। কার্যক্ষেত্রে হলও তাই। স্বর্ণপ্রভ। কলেজের পরিচালক সমিতি তার আবেদন পত্র মঞ্জুর করে সাথে নিয়োগ পত্র পাঠিয়ে দিয়েছে। সুকান্ত চলছে। নূতন আশা এবং উৎসাহ নিয়ে। মধ্যে মধ্যে ভয়ও হচ্ছে কি করে প্রথম সামলিয়ে নিবে। সুকান্ত ভাবছে-“আজ কালকার ছেলেগুলি কি আগের চেয়ে বেয়াড়া? আমাদের সময়ও ত ছাত্ররা দুষ্টুমি করত। কিন্তু এখনকার ছাত্ররা যেন দুনিয়ার সাথে তাল রেখে বেয়াড়াপনায় কয়েক ধাপ এগিয়ে গেছে। না না-এসব আমার ভুল ধারণা, নিতান্তই স্বার্থপরতার পরিচয়। আমাদের যা ছিল সবই ভাল, এ ধারণা ঠিক নয়।” টেনে বসে বসে কেবল এসবই ভাবছে। সম্বিৎ ফিরে পেল যখন গাড়ীখানা হুইসেল দিতে দিতে বিলাসপুর ষ্টেশনে প্ল্যাটফর্মে ঢুকে গেল। ট্রেন থেকে নেমে একখানা রিক্সায় চড়ে স্বর্ণপ্রভা কলেজের উদ্দেশে ছুটল যেতে যেতে সুকান্ত তার দৃষ্টি দুদিকে তটুকু যায় নিক্ষিপ্ত করতে লাগল। জায়গাটা মন্দ নয়। প্রগতির হাওয়া যেন জোর বইছে। হোটেল, রেস্তরা, দোকানপাট সব কিছুতেই আধুনিকতার ছোঁয়াচ আছে। সুকান্ত কলেজ প্রান্তে পৌঁছে রিক্সাওয়ালাকে ভাড়া ঢুকিয়ে দিয়ে কলেজের দিকে পা বাড়াল। নানা রকমের ছেলেমেয়ে সুকান্তর পাশ দিয়ে যাওয়া আসা করছে। নানা জনের নানা রকম কথাবার্তার ঢেউ তার কানে বাজতে লাগল। – "নারে আজ আর ১-৪৫ মিঃ ক্লাস করছি না।” – “বুঝেছি 'দিল হিতু হ্যায়’ তে যাচ্ছিস'। তা রেড লাইটকে সাথী করে নিয়ে যাস।” – “হোয়াট রেড লাইট? রেড লাইট কি?” সুকান্ত। মনে মনে বুঝবার চেষ্টা করল। কিন্তু কিছুই বুঝল না। আজকাল টেকনীসীয়ানদের যুগ। কথাবার্তা ও টেকনিক্যাল হচ্ছে। এসব ভাবতে ভাবতে এগিয়ে চলল। কলেজে প্রফেসরস কমনরুমে প্রবেশ করে নিয়োগ পত্র ও পরিচয় পত্র দেখিয়ে সবাইর নিকট পরিচিত হল। বিলাসপুর স্বর্ণপ্রভ। কলেজের কোন হোষ্টেল ছিল না। না ছাত্রদের না প্রফেসরদের। বাইর থেকে যে সব প্রফেসাররা আসে ওরা আলাদা মেস করে থাকে। তাই সুকা তকেও অন্যান্য প্রফেসরদের সাথে মেসে থাকতে হচ্ছে। কলেজ ছুটির পর সুকান্ত অন্যান্য প্রফেসর সমভিব্যাহারে মেসে যেতে লাগল কলেজ থেকে বেরিয়ে সোজা রাস্তা ধরে কিছুদূর এগোল। তারপর বাঁ দিকের গলিটা দিয়ে যাচ্ছে। এগোতে এগোতে সুকান্ত দেখতে পেল একটা দোতালা ঘরে বারিন্দার সামনে সাইন বোর্ড এটে দেওয়া আছে। লিখা "প্রমীলা, বজ্জিত নিবাস”। সুকান্তর কৌতুহল হল! কিন্তু মনে মনে হাসল। প্রমীলা বজ্জিত নিবাসটা ছাড়িয়েই ওদের মেসে উঠল। নির্দ্ধারিত রুমে প্রবেশ করে সুকান্ত বিশ্রামের জন্য সেবারকার মত সবাইকে ইতি জানাল। সেদিনই রাত্রে নৈশভোজনের পর সুকান্তর সমবয়সী এক সহকর্মী এসে সুকান্তর সাথে বেশ আলাপ জমিয়ে দিল। সমবয়সী হলে কি হবে দেখলে কিন্তু মনে হয় বেচারা অকালেই বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। শুরুতেই বেচারা সুকান্তকে বলছে- "আমার পিতৃপ্রদত্ত নাম হচ্ছে প্রদ্যুত চ্যাটার্জী আর ছাত্রদের কাছে পিসেমশাই বলে পরিচিত” – “পিসেমশাই? কেন?” সুকান্ত প্রশ্ন করে। – “তা ওরাই জানে। আমার সাথে ত আলোচনা করে ওরা নাম দেয়নি। অবশ্য সরাসরি কোনদিন পিসেমশাই বলে সম্বোধন করেনি। তবে অগোচরে ছাত্রমহলে বললেও আমাদের কাছে অর্থাৎ প্রফেসরমহলে সেটা ওপেন সিক্রেট।” সুকান্ত এক টু ভ্যাবচ্যাকা হয়ে গেল। মনে মনে কিছু ভাবতে চেষ্টা করল। কিন্তু ভাবার পথে ছেদ দিয়ে প্রদ্যুত আবার বলতে আরম্ভ করল– "আমি পিসেমশাই। এক নম্বর রুমের কালো বৃদ্ধ ভদ্রলোক অর্থাৎ শিবেন্দ্র লাল চক্রবর্তী বাংলার অধ্যাপক হচ্ছেন শিয়াল পণ্ডিত। পাঁচ নম্বর রুমের বিশ্বনাথ বটব্যাল দর্শনের অধ্যাপক তিনি হচ্ছেন ব্রোকেন হার্টেড অর্থাৎ ভগ্ন হৃদয়বান! আর আমাদের শান্তশিষ্ট নিৰ্ম্মল গুহ, মিসেস গুহ বলেই ছাত্রমহলে স্বীকৃতি পেয়েছে। তাদের প্রদত্ত নামগুলির ব্যাকগ্রাউন্ডে কি আছে তা ঠিক করে বুঝতে পারিনি। বিশ্লেষণ করলে হয়তো বা কিছুটা আঁচ করা যেতে পারে। আচ্ছা বলুন দিখিনি মশাই কাহাতক ছাদের এই পরোক্ষ টিটকারি সহ্য করা যায়?” সুকান্ত, তন্ময় হয়ে সব শুনছিল। এখন কি উত্তর দিবে ভেবে পায় না, পুরাপুরি বোকার মত প্রদ্যুতের মুখপানে তাকিয়ে রইল। কোন উত্তর না পেয়ে প্রদ্যুত আবার বলে যেতে আরম্ভ করল,... "আপনি ত এসেছেন মশাই কয়েক দিন পরখ করে দেখুন। আরে মশাই রাস্তা দিয়ে আপনি মাথা উচু করে হাটতে পারবেন না। রাস্তা দিয়ে যখন চলছেন তখন দেখবেন আপনার বিপরীত দিক থেকে ছাত্র কয়টা সিগারেট ফুকতে ফুকতে প্রায় আপনার সামনে এসে গেছে। তখন আপনার মনে ইলেকটিক শকের মত বাজবে সখি আপন মান আপনি রাখ। মান রক্ষার্থে বাধ্য হয়ে তখন ডান বায়ে না চেয়ে অধোবদন করে ফরওয়ার্ড মার্চ করবেন।” প্রত্যুত বলতে বলতে এক রকম পরিশ্রান্ত হয়ে গেছে। একদিনে নূতন সহকর্মীকে আর কত বলা যায়। তাই প্রসঙ্গ শেষ করার নিমিত্তে বলল-“কিছুদিন পরে আপনি নিজেই উপলব্ধি করতে পারবেন। আপনার সাথে অনেকক্ষণ আজে বাজে বকে গেলাম । আচ্ছা যাই।” সুকান্তর তখন ছেড়ে দেমা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। তাই কিছু না বলে নিদ্রাদেবীর আরাধনায় মন নিবিষ্ট করল। আজ সুকান্তকে ক্লাস নিতে হচ্ছে। সকাল থেকেই ভাবছে কি করে নেবে! কেমন করে ক্লাসে যাবে। কি করে ক্লাস কনটোল করবে। কারেন্ট টপিকস নিয়ে আলোচনা করবে না ইকনমিক্স এর প্রাথমিক সম্বন্ধে কিছু বলবে। কিছুই চট করে ভেবে ফেলতে পারল না। অবশেষে ঠিক করল কারেন্ট টপিকস নিয়েই আলোচনা করবে। প্রথমে ১০-৪৫ মিঃ ফাষ্ট ইয়ারের ক্লাস আরম্ভ তারপর ২-২৫ মিঃ থার্ড ইয়ার। ক্লাস আরম্ভ হওয়ার সঙ্কেত পরার সাথে সাথেই সুকান্ত রেজিষ্টারীখানা নিয়ে ফার্স্ট ইয়ার ক্লাসে প্রবেশ করল। আস্তে আস্তে রোল কল করতে লাগল। ছেলেদের উপস্থিতি চিহ্নিত করার ফাঁকে ফাঁকে সুকান্ত ক্লাসটাকে লক্ষ্য করল। পিছনের সারির ছাত্রছাত্রীদের মৃদু গুঞ্জন আর ফিস ফিসানি শুনতে পেল। রোল কল শেষ করার পর সুকান্ত নিজের ব্যক্তিগত পরিচয় দিল। কোন্ ইয়ারে কোন ইউনিভাসি টি থেকে পাশ করেছে। তারপর বর্তমানে সিংহল, জাঞ্জিবার, ব্রহ্মদেশ ও পাকিস্থান থেকে বিপুলভাবে উদ্বাস্তু আগমনের ফলে ভারতে অর্থনৈতিক অবস্থার উপর কিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে সে সম্বন্ধে কিছু বলল। পিরীয়ড শেষের সঙ্কেত পেয়ে আলোচনা অসমাপ্ত রেখেই বেরিয়ে আসল। বেরিয়ে কোলাহলের মধ্যে -সুকান্ত ভাবতে লাগল যে, সে যা বলতে চেয়েছিল তা সব বলা হয়েছে কিনা। সে মনে মনে ভাবল যে. এভাবে না বলে ওভাবে যদি বলত তাহলে বোধ হয় আরও ভাল হত। .. এরকম ভাবতে ভাবতে সুকান্ত প্রফেসারস কমনরুমে এসে একটা চেয়ার দখল করল। চেয়ারে বসেও সুকান্ত ভাবছে। তখন আর একটা নির্দিষ্ট ভাবনা নয়। একটা জিনিষ নিয়ে ভাবনা শুরু হয়। এই ভাবনাটাই শাখা প্রশাখায় বিজ্ঞ হয়ে যায়। অবশেষে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যে, সুকান্ত নিজেই বুঝতে পারে না সে কি নিয়ে ভাবছে। ভাবনার উৎসটা কোথায়। এরকম চিন্তার জাল বুনার ফাঁক দিয়ে সময়টা যেন বড় তাড়াতাড়ি চলে গেল। সুকান্ত ২-১৫ মিঃ থার্ড ইয়ারের রাস নিতে ছুটল। এখন আগের চেয়ে মনের জোর বেশি। ক্লাসটা সুকান্তর কাছে ভাল মনে হল। ছারাই সুকান্তকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রশ্নকরল। সুকান্ত উত্তর দিল। পিরীয়র্ড শেষে সুকান্ত ক্লাস থেকে বেরিয়ে এল। পাশের রুমে থেকে ছাত্রদের ' ডেস্ক চাপরানি আর হৈ হল্লার আওয়াজ ভেসে আসল। ডেস্ক .. এবং টেবিল চাপরানির আওয়াজের মধ্যে সুকান্ত একটা অদ্ভুত প্রাণীর চীৎকার শুনল। "হুক্কা হুয়া হুয়া !" সুকা'ত ঠিক বুঝল না ছাত্ররা কেন এই বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে আনন্দ প্রকাশ করার চেষ্টা করছে। সুকা'ত আরও এগিয়ে গেল। দেখল এক নম্বর রুমের কালো বৃদ্ধ ভদ্রলোক অর্থাৎ শিবেন্দ্র লাল চক্রবর্তী নাকের ডগায় চশমা লাগিয়ে হন হন করে কমনরুমের দিকে চলে যাচ্ছেন। সুকান্ত প্রদ্যুতকে মনে করল। সুকান্ত মনে মনে হাসল। কিন্তু বুঝতে পারল না ছাত্ররা হুক্কা হুয়া করে পণ্ডিত মশাইয়ের যোগ্য শিষ্য হবার চেষ্টা করছে না পণ্ডিত, মশাইকে তাদের উপযুক্ত শিক্ষক হবার জন্য আহ্বান করছে। কলেজ শেষে মেসে ফেরার পথে কলেজের নূতন লব্ধ অভিজ্ঞতা সুকাতর মনে তোলপাড় করল। কখন যে সোজা বড় রাস্তাটি পেরিয়ে এল টেরই পেল না। গলির ভেতর ঢুকে একটু তাড়াতাড়ি হাটতে লাগল। প্রমীলা বজ্জিত নিবাসের বারান্দায় কয়েকটা ছেলে ছোকরা দাঁড়িয়ে আছে। সুকাতকে লক্ষ্য করে নিজেদের মধ্যে যেন কি বলাবলি করল। সুকান্ত তাদের হাবভাব দেখে কিছুটা বুঝতে পারল নিবাসটা ছাড়িয়েই সুকান্ত তার মেসে নিদ্দিষ্ট রুমে প্রবেশ করল। আজ একটু তাড়াতাড়ি প্রদ্যুত এসে গেল। তারপর দুজনে আলাপ আলোচনা আরম্ভ করল। সুকান্ত আজ আর কেবলমাত্র নির্বাক শ্রোতা নহে। মধ্যে মধ্যে সেও বলছে। দুজনের আলাপ যখন বেশ জমে উঠেছে তখন রসভঙ্গ করে একটা মঝাবয়েসী ছোকরা প্রবেশ করল। সুকান্ত জানল ছেলেটা প্রমীলা বজ্জিত নিবাসের একজন। প্রমীলা বজ্জিত নিবাসে যারা বাস করে তারা সবাই চাকুরী করে। বেশীর ভাগই টাইপিষ্ট ও কেরাণী। ছেলেটা প্রাইভেট কোম্পানীর কেরাণী। সুকান্ত বুঝল ছেলেটার সাথে প্রদ্যুতের হৃদ্যতা আছে। হাসির খোরাক পেলেই ছেলেটি একেবারে প্রাণখোলা হাসি হাসে! ছেলেটি প্রথমে মরসুমের ক্রী-াজগত সম্বন্ধে কিছু আলোকপাত করল। এই সূত্র থেকেই আলাপ চলতে চলতে দেশীয় রাজনীতি তথা বিশ্বরাজনীতি ছেড়ে শেষ পর্য'ত প্রত্যুত নিজের প্রফেসর জীবনে লব্ধ অভিজ্ঞ ভার উপর আস্থা করে বর্তমানে তার মত প্রফেসরদের আশা আকাঙ্খা ও ভবিষ্যতের উপর আলোচনার মোড় ঘোরায়। নিজেই বলতে থাকে মান, ইজ্জত, সমাজে প্রতিষ্ঠা কিছুই তাদের নেই। প্রত্যুত বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে যায়। সুকান্ত দেখল ছেলেটি প্রদুতের বাক ভঙ্গিমা দেখে ও কথা শুনে হো হো করে হাসছে। প্রদ্যুত একটু বিকৃত মুখে ছেলেটার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। ছেলেটি হাসি থামিয়ে বলতে আরম্ভ করল- "দেখুন প্রদ্যুতদা যুগটা গণতন্ত্রের। তা আপনারা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নিজের সম্মান রক্ষার্থে আন্দোলন শুরু করুন। বেতন বাড়ানোর জন্য মিছিল করতে পারেন আর সম্মান রক্ষার্থে আন্দোলন করতে পারবেন না? আপনারা সমিতি করুন। "সেইভ প্রফেসরস প্রেষ্টিজ কমিটি।” অর্থাৎ অধ্যাপক সম্মান রক্ষা সমিতি। ব্যাপক- ভাবে সমস্ত দেশে এই আন্দোলন মড়কের মত ছড়িয়ে দিন। দেখবেন কিস্তি মাত হয়ে যাবে। তখন ছেলেরা আর পরোক্ষ ব্যর্থ প্রেমিক অধ্যাপককে ব্রোকেন হার্টেড বলতে পারবে না। আপনাদের রাস্তায় বেরোবার সময় আপনা মান আপনি রাখ ভেবে আর তধোবদন করে কুইক মার্চ করতে হবে না।” এতটুকু বলেই ছেলেটি আবার প্রাণখোলা হাসি হাসতে লাগল সুকান্ত ছেলেটির কথা মন দিয়ে শুনল। 'কিন্তু প্রাণখোলা হাসি হাসেনি। ভাবল ছেলেটি সত্যিই রসিক। মনে মনে ছেলেটিকে তার যুক্তির জন্য তারিফও করল। ছেলেটি ততক্ষণে হাসি থামিয়ে সুকান্তকে নমস্কার করে বলল-"দাদা এ' বাচালকে মাপ করবেন। আমি নিতান্তই বড় বেশি কথা বলি।” এই বলেই ছেলেটি চলে গেল। সুকান্ত এবং প্রত্যুত ও নৈশভোজের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিল। সুকান্ত কলেজে যায় আসে। বেশির ভাগ অবসর সময়ই সুকান্ত প্রহাতের কথা নিয়ে মনে মনে ভাবে। অবশ্য ছেলেটার কথাও মনে পরে ছেলেটার কথা মনে পরলেই সুকাতর মনে খানিক হাসির ঝিলিক ঝরে। আবার ভাবে তার নাম জানি ছাত্ররা কি রেখেছে। তা দিক না বাবা যত খুশী। কৃষ্ণেরত অষ্টোত্তর শত নাম। ছাত্রদের দৌলতে তাদের না হয় দু চারটে নাম হল। এমন সব ভেবে ভেবেই সুকান্তর দিন যায়। অবশেষে কলেজে গ্রীষ্মের বন্ধ এসে গেল। কলেজ বন্ধ ও হলো। সুকান্ত তৈরী হয়েছে বাড়ী ফিরবার জন্য। দিন ঠিক করে বেরিয়ে গেল। প্রমীলা বজ্জিত নিবাসটা ছাড়িয়ে গেল। পিছে তাকিয়ে দোতালার বারান্দাটা দেখল । না,- সুকান্ত ছেলেটিকে দেখতে পেল না। সুকান্ত কয়েক মাস অধ্যাপনা করেও ঠিক করতে পারল না যে সে আবার এখানে আসবে কিনা। যাবার সময় সেই অদ্ভুত ছেলেটিকে দেখবার জন্য সুকান্তর মন ব্যাকুল হল। আবার পিছে তাকিয়ে বারান্দাটা দেখল। না, - ছেলেটি নেই। বোধ হয় কর্মক্ষেত্রে। সুকাত এগোচ্ছে। প্রহাতকে মনে করল। প্রদ্যুতকে ভাবতেই মনের মধ্যে যেন ঢেউ উঠল। ঢেউয়ে ঢেউয়ে আঘাত হচ্ছে। ব্রোকেন হার্টেড, শিয়াল পণ্ডিত সেইভ প্রফেসরস প্রেস্টিজ কমিটি সব কথাগুলি যেন ঢেউয়ে পরে ঘুরপাক খাচ্ছে। সুকাত এগিয়ে চলছে। ষ্টেশন থেকে গাড়ী ছাড়বার পূর্ব্ব মুহূর্ত পর্যন্ত সুকান্ত ভাবছে, হয়ত বা বাড়ী গিয়ে তাকে আবার রোজ রবিবারের পত্রিকাতে কর্মখালির বিজ্ঞাপন দেখে যখন কিছুই পাবে না যেন অজান্তেই তার দৃষ্টি গিয়ে থামবে- কন্যা কেশবতী...........।" সচিত্র ভারত, ২৫ শে জুলাই ১৯৬৪ ইং