এইরে! কামজারীর সাইরেণটা বেজে গেল। ভুইঞাভাঙার ঘিঞ্জি বস্তীট। ক্ষণিকের মধ্যে চঞ্চল হয়ে উঠল। শান্ত পরিবেশটা নিমেষের মধ্যে চাঙ্গা হয়ে উঠল। ঝগডু, মংলা, সুমিতা প্রভৃতিরা সবাই এক এক করে দল বেঁধে ‘লম্বরে’ যেতে লাগল। সিত্যি নিত্যিই এরকমটা হয়ে থাকে। এ সবগুলোই যেন একরকম তালে তালে চলে। সুষমাও তালে তাল মিলিয়ে নিত্যি নিত্যি কামজারীর সাইরেণ শুনে ঝুড়ি নিয়ে ঝগডু মংলাদের সাথে ‘লম্বরে’ চলে যেত। কিন্তু তালে তালে চলতে চলতে হঠাৎ তার বেলায় বেতাল হয়ে গেল। কোম্পানির নতুন কানুনে সুষমা ছাটাই হয়ে গেল। অবশ্যি এ বেতাল ভাবটা ওর কাছে সামান্য ক’দিনই ছিল। তারপর আবার ও নিজের মধ্যে একটা তাল এনেছে। এখন সাইরেণে কামজারীর নির্দেশ পেয়ে ভুইঞাডাঙ্গার ঝগড়ু, মংলা বা সুমিতাদের মত লম্বরে যায় না। সাইরেণ বাজার অনেক আগেই তাল রেখে সুষমা শহরের দিকে রওয়ানা হয়। কিন্তু আজকে সুষমা তাল রেখে কামজারীর ‘সাইরেণ বাজার আগে রওয়ানা হতে পারেনি। -চল চল, তাড়াতাড়ি চল। আজ জবর দেরী হয়ে গেল। সুষমা তাঁর আট বছরের মেয়ে গুলিয়াকে হাত ধরে প্রায় টানতে টানতেই ভূইঞাডাঙ্গার ঘিঞ্জি বস্তী থেকে বের হয়ে বাগানের বড় রাস্তা ধরে চলল। গুলিয়া ওর কোমর থেকে খসে পড়ে যাওয়া ছেড়া পেন্টটা এক হাতে উপরে টানতে টানতে এবং অন্য হাতে মায়ের হাত ধরে এগিয়ে চলল। কিছুদূর যেতেই সে দেখল নাচঘরের পাশে বড় কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচে বসে বিলটু ঘুটুয়ারা প্রায় নাঙ্গা হয়ে বসে পাথরকুচি নিয়ে খেলছে। ওরা খুসী মনে খেলছে দেখে গুলিয়ার মনটা কেমন হয়ে গেল। সে মনে মনে ভাবল দূর ছাই, মা রোজ রোজ কেবল শহরে যায়। বিলটু ঘুটুয়াদের মায়েরা কামজারীতে যায় আর ওরা কি সুন্দর বসে বসে কেবল খেলা করে। মা শহরে না গেলে আমিও ওদের মত খেলতে পারতাম। এসব ভাবতে ভাবতে সে হঠাৎ তার মাকে বলল, হে মা, বিলটু ঘুটুয়াদের মায়ের মত তুই কামজারীতে কাহে নাই যাস? কেবল রোজ রোজ শহরলে যাছিস্।

আরে বাস মেয়ের কাণ্ড দেখ। বলে কিনা বিলটু ঘুটুয়াদের মায়ের মত কামজারীতে কাহে নাই যাস্। কথাগুলো সুষমাকে অপ্রস্তুত করে দিল। ওর মরমে বিধল। কিন্তু গুলিয়াকে ত আর কিছু বলা যায় না। তবু সে গুলিয়ার দিকে মমতা জড়ানো চোখে চেয়ে বলল- আমি বিলটু ঘুটুয়াদের মায়ের মত না। আমি ছাটাই। ছাটাইদের কামজারীতে কাম নাই থাকে।

সুষমার কথা শুনে গুলিয়া খুব ভাল করে ওর দিকে চাইল। সে যেতে যেতে সুষমার হাত, পা, মুখ সব খুটে খুটে দেখল। কিন্তু না কোথাও কিছু বেমানান নেই। বিলটু ঘুটুয়াদের মায়ের থেকে ওর মায়ের মুখের আদল অনেক সুন্দর। হাত পা নিখুঁত। কোথাও ছেটে দেয়নি। তবে কেন ও ছাটাই হবে? কেন কামজারীতে কাম নাই পাবে? তাহলে কি মা ঝুট বাভ বলছে? দূর ছাই কিছুই বুঝা যায় না। এগুলো ভাবতে ভাবতে গুলিয়া পেন্টটাকে এক হাতে ধরে অন্য হাতে মায়ের হাত মিলিয়ে বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে চলে। সুষমা আর গুলিয়া চলতে চলতে বড় মোহনায় এসে পৌঁছল। ভুইঞাডাঙ্গার ঘিঞ্জি বস্তী, নাচঘর, মির্দাপট্টিকে অনেকদূর পিছনে ফেলে এসে বড়মোহনা। মাঝের বিলের চাঘর পার হয়ে চারাবাড়ীর ফাঁক দিয়ে সরু রাস্তা ধরে অনেকদূর এগিয়ে এসে বড়মোহনা। ধলাতলের নেনু মিঞা মহাজনের দোকানটা পার হয়ে অনেকদূর খালি মাঠ, তারপর বড়মোহনা। বড়মোহনা কি আর শুধু শুধু। আসলেই বড়মোহনা। ভুইঞাডাঙ্গা, মাঝের বিল আর ধলাতলের মোহনা তিন দিক থেকে তিন রাস্তা এসে মিলছে। এ ছাড়াও আছে আরেকটি, সেটি হচ্ছে আরও বড়। বড়মোহনার বড় রাস্তা। বড় রাস্তা ধরেই শহরে যেতে হয়। বড়মোহনার বড় রাস্তাটা যেখান থেকে শুরু হয়েছে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে বড় বড় গাছ। শিরিষ গাছ। গাছগুলোর পাশ দিয়েই লংলীছড়া। ছড়া দিয়ে ঝির ঝির করে সারা বছর জল বয়ে যায়। ফটিক জল। কিন্তু সব সময় নয়। ফটিক জল কেবল বর্ষা ছাড়া। ধলাতলের দিক থেকে এসে ক্রমে ক্রমে লংলীছড়া বড়মোহনার পাশ দিয়ে ভুইঞাডাঙ্গার সাত- নালায় মিশেছে। বড়মোহনার শান্ত পরিবেশে লংলীছড়ার ঝির ঝির আওয়াজই ব্যতিক্রম। সূর্য-উঠার সাথে সাথেই মাঝের বিলের চালাঘর থেকে বেরিয়ে এসে দলে দলে মরদ রেন্ডি বড়মোহনায় জড়ো হয়। জড়ো হয় ধলাতল থেকে এসে। ভুইঞাডাঙ্গা থেকে সুষমাও আসে। বড়মোহনায় এসে জড়ো হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই শহরের দিকে পাড়ি। দু’জন তিনজন বা মধ্যে মধ্যে চারজন করে লাইন বেঁধে পা ফেলে এগিয়ে চলে। মনে হয় যেন একটা মিছিল রওয়ানা হয়েছে। না- ইনকিলাব জিন্দাবাদের মিছিল নয়। আমাদের দাবী মানতে হবে আওয়াজ তুলে মিছিল নয়। আবার শোক মিছিলও নয়। লম্বরে কামজারীতে কাজ না পেয়ে ভুখা পেট ভরতে শহরে গিয়ে কাজ জোগাড় করার মিছিল। ইয়েণ্ডির মুহুরীবাবুর রাস্তায়, পিচ ঢালাইয়ের কাজ। গিমুন কোম্পানীর পুলের পাথর ভাঙ্গার কাজ। আসাই মিঞা ঠিকাদারের রাস্তাবাঁধার কাজ। এই কাজ জোগাড় করার যে মিছিল হয় সেটাতে আওয়াজ উঠেনা সুনিয়ন - জিন্দাবাদ। আওয়াজ উঠে না কোম্পানীকা কুত্তা জীওনলাল মুর্দাবাদ। তবে অনেকে যেতে যেতে বলে শালা ইয়েণ্ডির মুহুরী বাবুটা খাটাশ। কেহ কেহ বলে ঠিকাদার আসাই মিঞাটা জবর পিচাশ। গিমুন কোম্পানীর বাবুগুলো কেবল রেন্ডিদেরকে বেছে বেছে কাজ দেয়। আবার কেহ কেহ বলে ঠিকাদার আসাই মিঞা মাই বাপ। ইয়েণ্ডির মুহুরীবাবু মাই বাপ। গিমুন কোম্পানী মাই বাপ। এমনি ভাবে আলাপ আলোচনা এবং নানা রঙ্গের রঙ্গরস করে ধলাতল, মাঝেরবিল এবং ভুইঞাডাঙ্গার ছাটাই মরদ রেন্ডিরা বড়মোহনা থেকে মিছিল করে শহরের দিকে এগিয়ে চলে।

কিন্তু আজকে সুষমা বড়মোহনায় পৌঁছে দেখল কেউ নেই। ধলাতল, মাঝেরবিলের কোন ছাটাই শ্রমিক নেই। শান্ত পরিবেশে বড়মোহনার বিরাট শিরিষ গাছগুলোর উপর দিয়ে হাওয়া বইয়ে যাচ্ছে। ঝির ঝির শব্দে লংলীছড়ার জল গড়িয়ে যাচ্ছে। সুষমা ভাবল বড় শিরিষ গাছটার নীচে দাঁড়িয়ে একটু অপেক্ষা করা যাক। ওদেরও আসতে দেরী হতে পারে। সুষমা দাঁড়িয়ে আছে দেখে গুলিয়া মায়ের হাত থেকে ওকে ছাড়িয়ে নিলো। হাওয়ায় শিরিষ ফুলের গুড়ি গুড়ি পাপড়িগুলোকে পালতোলা নৌকার মত ভাসিয়ে নিচ্ছে। গুলিয়া সেগুলো দেখে পিছন পিছন ছুটলো। ফড়িং ধরার কৌশলে হাওয়ায় ভাসিয়ে নেওয়া গুড়ি গুড়ি পাপড়িগুলোকে ধরছে। এক এক করে ধরে আপনমনে পাপড়িগুলোকে এক জায়গায় জমায়েত করছে।

সুষমা শিরিষ গাছের নিচে দাঁড়িয়ে অধৈর্য হয়ে পড়ছে। সে কেবল ধলাতল আর মাঝের বিলের রাস্তার দিকে অধীর আগ্রহে চাইছে। না-কোথাও কাউকে দেখা যাচ্ছে না। – হেই মা, ওরা কেউ নাই আাসছে গো। ওরা সব চলে গেলো নাকি? এই চলে যাওয়ার প্রশ্নটাই ওর মনকে কাঁপিয়ে তুলল। সে ভয় পেয়ে গেলো। সে কিছুক্ষণের জন্ম বিমূঢ় হয়ে গেল। তারপর আস্তে আস্তে নিজেকে সামলে নিয়ে ঠিক করল অপেক্ষা করে লাভ নেই। ওরা নিশ্চয়ই চলে গেছে। যত জলদি পারা যায় শহরের দিকে রওয়ানা দিতে হবে। এ ভেবেই সুষমা গুলিয়াকে ফড়িং ধরার কৌশলে গুড়ি গুড়ি সুন্দর পাপড়ি ধরা থেকে বিরত করে হাত ধরে টেনে পা বাড়াল এবং বলল, - চল, জলদি জলদি পা ফেলে শহরলে যেতে হবেক।

গুলিয়া তার সাধের সুন্দর গুড়ি গুড়ি শিরিষফুলের জমানো পাপড়িগুলো আর সাথে করে আনতে পারল না। সুষমার হাতে হাত ধরে সুষমার সাথে পাল্লা দিতে সে প্রায় দৌড়ে হাটছে। অন্যান্যদিন সুষমা মাঝেরবিল, ধলাতলের মরদ রেন্ডিদের সাথে গল্প গুজব করতে করতে শহরের দিকে এগিয়ে চলত। কথার ফাঁক দিয়ে কখন যে রাস্তাটা শেষ হয়ে আসত টেরই পেত না। কিন্তু আজ যেন সুষমা কেবল হেটেই চলছে। কেবল হাটছেই আর হাটছে। আর মনের মধ্যে তোলপাড় হচ্ছে, কি জানি আজ কাজ পাওয়া যাবে কি না। সে ভাবছে ইয়েণ্ডির মুহুরীবাবুর কাজ পাওয়া যাবে কি না। ভাবছে আর গুলিয়াকে এক হাতে টেনে এগিয়ে চলছে। সুষমা শহরে পৌঁছে কাউকে পেল না। মাঝেরবিলের কাউকে পেল না এবং ধলাতলেরও কাউকে পেল না। ঠিকাদার আসাই মিঞা বা ইয়েণ্ডির মুহুরীবাবু কোথায় কাজ করাচ্ছে সে খবরও জানতে পারল না। তবুও সে তার নিজের জানামত জায়গা গুলোতে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। কিন্তু না- কোথাও সে কাউকে পেল না। আশা নিয়ে হন্যে হয়ে কেবল ঘুরছে। কোথাও কোন কাজের সন্ধান পেল না। অবশেষে নিরাশ হয়েই সুষমা শহরের বড় রাস্তা ধরে এগিয়ে চলল। গুলিয়াও মায়ের হাত ধরে ছুটছে। শহরের নানা রঙের মানুষ দোকান পাট এবং যানবাহন দেখে ওর খুব ভাল লাগছে। রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছে আর কেবল দেখছে। কিন্তু মুশকিলে ফেলেছে ওর পেস্টটা। একটু পরে পরেই খসে যায়। বাঁ হাতে পেন্টটা আটকে রেখে ডান হাতে মায়ের হাত ধরে এগুচ্ছে আর নানান কিছু দেখছে। ও দেখছে আওয়াজ দিয়ে মটর গাড়ী চলছে। ও দেখছে আর মনে মনে খুব মজা লুটছে। এমনিভাবে যেতে যেতে হঠাৎ আওয়াজ দিয়ে আটো রিক্সাকে যেতে দেখে ও ফর্তি আর ধরে রাখতে পারল না। সে অ’নন্দে উৎফুল্ল হয়ে ওর মাকে বলল, হেই মা দেখ দেখ কেমন একটা খুপড়ী গাড়ী ইঁদুরের মত মাটির সাথে মিশে যাইছে গো।

সুষমা রাস্তা ধরে চলতে চলতে আসন্ন ও বেলার কথা চিন্তা করছে। পেটে ক্ষিধের জ্বালা কি ভাবে তাড়িয়ে তাড়িয়ে ক্রিয়া করে সেট। ও মরমে মরমে জানে। সে জানে ক্ষিধের তাড়নায় গুলিয়া ওকে কি ভাবে. জ্বালাতন করে। কাজেই কাজ না পেয়ে রাস্তা ধরে যেতে যেতে সুষমা কেবল ভাবছে গুলিয়া যখন খাবার বায়না ধরবে তখন সে কি করবে। ওর নিজের ক্ষিধে কি ভাবে নিবারণ করবে। এসব ভাবনাই সুষমার মাথার মধ্যে কিল বিল করছে। সে রাস্তার লোকজনদের ভালভাবে খেয়ালই করতে পারছে না। দুপাশে মনোহারী নানান বাহারের দোকানগুলো ওর নজরে পড়ছে না। পি পি, ভ্য। ভ্যাঁ আওয়াজ ওর মনে কোন নাড়া দিতে পারছে না। আসন্ন ওবেলার কথা ভাবছে। মাটির সাথে ইদুরের মত মিলে চলা গুলিয়ার খুপড়ী গাড়ী দেখা ওর কাছে এখন আনন্দের বস্তু নয়। তবু গুলিয়া ওকে হেই মা দেখ দেখ বলছে বলেই ও পাশ ফিরে চাইল। কিন্তু সে গুলিয়ার আনন্দের অংশীদার হতে পারল না। সে গুলিয়ার দিকে চেয়ে বলল, তুই জবর দিকদার করিস। এ বলেই সুষমা ওর হাতে জোরে টান দিয়ে চলার গতি বাড়াল। গুলিয়াও মাকে আর কিছু না বলে চলতে লাগল। ও মনে মনে বলল, কি জানি বাবা কি দিদার করলাম,। কিন্তু চলার গতি বাড়ালেও গুলিয়া নিজেকে রাস্তার যানবাহন আর মনোহারী দোকানের বাহার দেখা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারেনি। সে মনোহারী দোকানের বাহার দেখছে। দোকানের চকমকি জিনিস। লাল নীল সবুজ হরেক রকম জিনিস। ও দেখছে আর মজা লুটছে। ও দেখছে আর মনে মনে ভাবছে। অ্যামা কত মজার মজার জিনিস! আরে আরে, জুতার দোকানে কাঁচের খুপড়ীতে একটা মেম সাহেব দাঁড়িয়ে আছে। জীওনলাল ম্যানেজার সাহেবের মেমসাহেবটার মত। এটা আসলি না নকলি মেমসাহেবরে বাবা! দূর, মা কেবল বড় বড় পা ফেলে হাটছে। ও আসলি না নকলি মেমসাহেবটা দেখতে নাই পারল। এমনি ভাবে গুলিয়া দেখছে আর ভাবছে। সে ভাবছে আর মায়ের সাথে সাথে পা ফেলছে।

সুষমাও হাটছে আর ভাবছে। কিন্তু কি করবে সে ঠিক করতে পারছে না। হাটতে হাটতে যেন সমস্ত শরীরে ক্লান্তি এসে জড়ো হচ্ছে। আর যেন সমান তালে পা ফেলে এগুতে পারছে না। সে চৌমাথার মোড়ে একটি দোকানের পাশে গিয়ে দাঁড়াল এবং ভাবল এখানে একটু বিশ্রাম নিলে মন্দ হয় না। সুষমা গুলিয়ার হাতটা ছেড়ে দিয়ে বসে কাপড়ের গিট থেকে খৈনী বের করে হাতে মলতে লাগল। গুলিয়া মায়ের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে এদিক সেদিক দেখতে লাগল। সে পিছন ফিরে দেখল একটা দোকানে চেয়ার টেবিল জুড়ে অনেক- গুলো লোক বসে আছে। ওরা নানান খাবার খাচ্ছে। দোকান ঘরের একদিকে কাঁচের আলমারিতে ভতি মিঠাই। কালো সাদা গোল গোল মিঠাই। সাদা হলুদ চেপ্টা মিঠাই। ছোট ছোট মিঠাই। বড় বড় মিঠাই। কেবল মিঠাই আর মিঠাই। একটি ছোব্বা আলমারী থেকে সাদা থালাভতি অনেকগুলো মিঠাই চেয়ারেবসা বাবুর সামনে টেবিলে দিল। বাবুটা মিঠাই- গুলো সামনে পেয়ে খাচ্ছে। গুলিয়া চুপি চুপি দূর থেকে চুরি করে দেখছে। আলমারী ভর্তিত মিঠাই দেখে ওর খাবার লোভ হচ্ছিল না। কিন্তু বাবুটা মিঠাই খাচ্ছে দেখে ওর লোভ হল। সে কেবল বাবুটার মিষ্টি খাওয়া চুরি করে দেখছে। এই রে! বাবুটা এদিকে চাইছে। আমাকে দেখে ফেলল নাকি? বাবুদের ভীষণ রাগ" এই বাবুটাকে আমাদের ইউনিয়ন বাবুটার মতই লাগছে। উহাদের ভীষণ রাগ। ওদের গাড়ীর সামনে গেলেই ধমক দেয়। গেল বছর ভুইঞাডাঙ্গার নাচঘরের সামনে ইউনিয়ন বাবুদের গাড়ীটা রেখেছিল। গাড়ীর পাশে দাঁড়ালে নিজের ছবি দেখা যায়। নিজের ইয়া লম্বা মুখ, ইয়া লম্বা শরীর গাড়ীর মধ্যে দেখা যায়। দল বেঁধে দাঁড়িয়ে গাড়ীর গায়ে ছবি দেখার সময় ইউনিয়ন বাবুরা জোরে ধমক দিয়ে দূর করে দিয়েছিল। ইউনিয়ন বাবুদের ভীষণ রাগরে বাবা। কি জানি এই মিঠাই খাওয়া বাবুটা আমাকে দেখে ফেলল না কি? এসব ভেবে ভেবে গুলিয়া বাবুর মিঠাই খাওয়া থেকে নিজের চোখ সরিয়ে আনে। কিন্তু না-সে চোখকে ঠিক মত আটকে রাখতে পারছে না। বাবুর মিঠাই খাওয়াটা চুরি করে দেখার জন্য আকুলি বিকুলি করছে। সে আবার আড়চোখে চুরি করে দেখে। তারপর সে তার মায়ের কাছে এসে বলে- হেই মা, হামকে চারগো পয়সা দেতো। আমি মিঠাই লিয়ে খাবো।

সুষমাও খাওয়ার কথাই চিন্তা করছিল। তবে মিঠাই খাওয়ার কথা নয়। কাজ না পাওয়ায় ওবেলা যে না খেয়ে থাকতে হবে সে কথা। কাজ না পাওয়া মানে না খেয়ে থাকা। সুষমার সেই কাজ না পাওয়ার পর থেকেই মনটা তেতে আছে। এখানে বসে বসে খৈনী খাওয়ার অবসরে ওর মনের মধ্যে জ্বালা এবং ক্রোধ পাক দিয়ে চিড় বিড় করছিল। এমন সময় গুলিয়ার মিঠাই খাওয়ার আবদার ওর কাটা ঘায়ে নুন ছিটিয়ে দিল। সে প্রথমে কি বলবে কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি। সে তাড়াতাড়ি উঠে পিছন ফিরে মিঠাইর দোকানটা দেখল। দোকানটাই হচ্ছে কাল। এ দোকানের সামনে বসাটাই ঠিক হয়নি। সুষমা ভাবল এখানে আর দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক নয়। গুলিয়ার হাত ধরে সে বলল চল এখান থেকে। চার পয়সার মিঠাই দোকানী দিবেক নাই। ওদিকে বাজারলে গিয়ে কুছ কিনে খাবে। একথা বলেই সুষমা গুলিয়ার হাত ধরে টেনে পা বাড়াল। গুলিয়া সুষমাকে আর কিছুই বলতে পারল না। মিঠাইর দোকানটা পেরিয়ে যাবার সময়ও আবার বাবু সাহেবের মিঠাই খাওয়াটা চুরি করে দেখল। কিছুদূর গিয়ে বাজারের মোড়ে ছোট একটা পান বিড়ির দোকানের সামনে সুষমা দাঁড়াল। এখান থেকে কয়েক পয়সার ভুজিয়া কিনে গুলিয়াকে দেবে। গুলিয়া কোমরের পেন্টটা কোন রকমে সামলিয়ে ওর জামার কুচ মেলে ধরল। দোকানীর দেওয়া ভুজিয়ার ছোট মোড়কটা জামার কুচের মধ্যেই পুরে দিল। তারপর একটু একটু করে খেতে লাগল। গুলিয়া খেতে খেতে দেখল পাশেই বড় একটা দালান ঘরে চৌকির উপর বসে একটি লোক কানে মুখে যন্ত্র লাগিয়ে কথা বলছে। ও বলছে আর জোরে জোরে হাসছে। হাসার সাথে সাথে লোকটার ঢোলের মত পেটটা দুলছে। ও হাসছে আর পেটটা দুলছে। হাসছে আর কানে মুখে যন্ত্র লাগিয়ে কথা বলছে। এ ভারি মজা। গুলিয়া শুনছে লোকটা কেবল বলছে, আরে প্যারেজী মিরচা কা দাম বাড় গিয়া? কিতনা বাড় গিয়া? আট আনা বাড় গিয়া? হিহিহিহি আরে আট আনা বাড় গিয়া? …হিহি হিহি…। হিহি করে হাসার সাথে সাথে লোকটার ঢোলের মত বিরাট পেটটা দুলছে। গুলিয়া ভাবল, লোকটা যদি কানে মুখে যন্ত্র লাগিয়ে আরো বেশী কথা বলে হি হি করে হাসে তাহলে ওর পেটটাও বেশী করে দুলবে। দেখতে খুব মজা হবে।

গুলিয়া একটু একটু ভুজিয়া মুখে পুড়ে দিয়ে কুট কুট করে খাচ্ছে। সে খেতে খেতে লোকটাকে দেখছে আর মনে মনে ভাবছে। এমনি সময় একটি মাল বোঝাই লরি বড় দালানটার পাশে এসে দাঁড়াল। লরিটার গর্ গর্ … বিকট শব্দ গুলিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। সে তার কুট কুট করে ভুজিয়া খাওয়া বন্ধ করে লরিটার দিকে তাকাল। এক পা এক পা করে লরিটার কাছে গেল। বড় বড় বস্তা দিয়ে লরিটা একদম বোঝাই। গুলিয়া ভালভাবে লক্ষ্য করল। সে একবার একবার করে দু’বার লরিটা ঘুরে ঘুরে দেখল। নিবিষ্ট চিত্তে দু’চোখ ভরে দেখল। চোখ দিয়ে দেখার সাথে সাথে সে যেন নাক দিয়ে কিছু শুকে নিল। তারপর যতই দেখছে ততই ওর মনে ক্রিয়া করছে। দেখার সাথে সাথে ওর চোখ মুখের ভাব পরিবর্তিত হয়ে আসছে। অনেক সযত্নে জামার কুচে যে হাতে মুঠ করে ভুজিয়া, আটকে’ রেখেছিল সেটা আস্তে আস্তে অজান্তেই ছুটে আসে। জামার কুচ থেকে ভুজিয়ার অবশিষ্টাংশ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। সেটাকে উপেক্ষা করে দৌড়ে এসে মায়ের কোমরে ধরে ক্রমাগত আঘাত করতে থাকে এবং রাগে, দুঃখে জোরে চেচিয়ে বলতে থাকে,- হেই মা তুই রোজ রোজ ঝুট- বাত বলিস। তুই রুটি নাই বানাস্, বলিস আটা নাইকে। লেকিন ইতনা আটা কাহালে আইল। তুই রোজ রোজ কেবল ঝুট বাত বলিস্। তুই রুটি নাই বানাস আর বলিস্ আটা নাইকে। লেকিন ইতনা আটা কাহালে আইল। বল, তুই বল মা ইতনা আটা, কাহালে আইল।

প্রত্যয়, অক্টোবর, ১৯৮০ ইং