সকালবেলা ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার পরই কমলেশের মনে পড়ল আজ পনেরোই আগষ্ট। ভেন্টিলেটারের ফাঁক দিয়ে ভোরের সূর্য ওর বিছানায় এসে পড়েছে। হঠাৎ বেশী আলোর ঝাপটা, চোখে সহ্য হয় না। এই আলোর ঝাপটাতেই সকাল বেলার আরামের ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। মাথায় একরাশ বিরক্তি নিয়ে পাশ ফিরল। টুটুন এখনো শুয়ে আছে। ওর গায়ে রোদ পড়েনি। ছুই ছুই করছে। জয়া অনেক আগেই বিছানা ছেড়ে চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে লেগে পড়েছে। কাপ প্লেটের টুং টাং আওয়াজ ভেসে আসছে।

কমলেশ নিজের শরীরটা বিছানা থেকে উঠিয়ে টুটুনকে টেনে খাটের ডান দিকে সরিয়ে দেয় । রোদের আঁচ ওর গায়ে লাগবে না। টুটুনকে সরিয়ে দিয়েই আবার খাটের মাথায় বালিশ চেপে হেলান দিয়ে পড়ে থাকে। চা না খেলে ঘুম ঘুম ভাবটা শরীরে লেগে থাকে। কমলেশ জোরে জয়াকে ডেকে বলে,- তাড়াতাড়ি চা নিয়ে এসো। জয়া চা নিয়ে আসছিল। কমলেশের জোরে বলাটা ওর ভালো লাগেনি। জয়ার মনে হল কমলেশ অনর্থক ওকে ধমকিয়ে বলছে। সে চায়ের কাপটা টি টেবিলে রেখে যেতে যেতে বলল,-সাত সকালে কেমন চেঁচামেচি শুরু করেছে দেখ? আমি যেন হাত পা গুটিয়ে বসে আছি।

-ছি, গুটিয়ে থাকবে কেন? তুমি সটান স্বর্গ টেনে আনছ। কমলেশের কথাগুলো জয়াকে পিছন থেকে চুম্বকের মত টেনে ধরে। সে দাঁড়িয়ে শাড়ির আঁচলে মুখ মুছে নেয়। বেশ কিছুটা ঠেস দিয়ে বলে, আমি স্বর্গ টেনে আনার কে? স্বর্গকে টেনে আনার মত পুরুষ তো তুমিই বটে। কমলেশের মনে হলো জয়ার কথার মধ্যে একটা প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত রয়েছে। সে যে অনেক সময় সাংসারিক চাহিদা মেটাতে অক্ষম হয়ে পড়ে। সেটাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। দ্রুত ওর চেহারা পরিবর্তন হতে থাকে। মুখের আদলে মন মরা ভাবটা ফুটে ওঠে। জয়া কমলেশের উদ্দেশ্যে কথা গুলো ছুড়ে দিয়ে বাঁকা চোখে ওকে লক্ষ্য করছিল। কিন্তু এভাবে যে প্রতিক্রিয়া করবে সেটা ভাবেনি। ওর কথায় কমলেশ আহত হউক সেটা চায়না। সে অনুতপ্ত হল। ব্যাপারটা সহজ করার জন্যই জয়া এগিয়ে এসে চায়ের কাপটা হাতে ভুলে নেয়। ঠোটে চাপা হাসি ফুটিয়ে বলে, এই নাও ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।

কমলেশ চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে চুমুক দেয়। জয়া রান্নাঘরে চলে যায়। দুতিন চুমুকেই শেষ হয়ে যায়। চায়ের কাপটা রাখতে গিয়েই টেবিলের কোনে কেলেণ্ডারের উপর নজর পড়ে। সময়ের খাতায় আরেকটা দিন জমা হয়ে যায় কমলেশ টেবিল কেলেণ্ডারটা টেনে নিয়ে তারিখ এবং বারটা ঠিক করে দেয়। সেটার ডে, ফিফটিনথ আগষ্ট নাইনটিন এইটি ওয়ান। ১৯৪৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত অনেকটা বছর চলে গেল। কিন্তু এই চৌত্রিশ বছরের ব্যবধানে কমলেশের স্বাভাবিক কোন বৈচিত্র এসেছে বলে চট করে কিছু মনে আসে না। পেছনের অধিকাংশ দিনের ঘটনাগুলো যেন মহাশূন্যে এক গহীন অন্ধকারে মিলিয়ে গেছে। তবুও বিশেষ কোন ঘটনা থাকে যেগুলোকে চাপা দিয়ে রাখতে গেলেও অনেক সময় সব কিছু চেপে বের হয়ে আসে।

কমলেশ টেবিল কেলেণ্ডারটা ঠিক করে আবার বিছানায় শুয়ে পড়ে। ছোট বেলার কিছু কিছু ঘটনা আজও ওর মনের কোন থেকে সময় সময় উকি মারে। কমলেশের মনে পড়ে স্বাধীনতার প্রথম স্বাদ হিসাবে জীবনের শৈশবে ও যা পেয়েছিল সেটা হচ্ছে বাষ্পচালিত ইঞ্জিনের গাড়িতে চড়ে যাওয়ার পরম আনন্দ। গ্রামের বাড়ি থেকে দু মাইল পথ বাবার সাথে সাথে হাত ধরে পাড়ি দিয়ে ইষ্টিশনে এসে রেলগাড়িতে চেপেছিল। বাবা সমরেশ চৌধুরী গম্ভীর মানুষ, বেশী কথা বলতেন না। কমলেশ কৌতুহল নিভৃত করতে না পেরে বলেছিল, - বাবা আমরা কোথায় যাব? কমলেশের মুখের দিকে সোজাসোজি কিছুক্ষণ তাকিয়ে বাবা বলেছিলেন,-শিলচর তোর সেজকাকুর ওখানে যাব। রেলগাড়ীতে, চড়ে যাওয়ার আনন্দ সামলাতে না পারলেও বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার একটা দুঃখ কমলেশের মনে মাঝে মাঝে খুঁচা দিচ্ছিল। বিকাল বেলা মনু কনাদের সাথে বাড়ির উঠানে দক্ষিণ কোণে পেয়ারা গাছের ডালে দোলনা চড়তে পারবে না ভাবতেই মনটা কেমন ভারী হয়ে গিয়েছিল। সেটা যেন অদৃশ্য হাতে ওকে পিছন থেকে টানছিল। কমলেশ আস্তে আস্তে বাবাকে জিজ্ঞেস করে,

  • বাবা, আমরা শিলচর ক’দিন থাকব?

-জানি না। ব্যবস্থা করতে পারলে সেখানেই থাকবে। দেশ স্বাধীন হয়েছে, আমরা আর এখানে থাকব না।

কথাগুলো বলেই কমলেশের বাবা গাড়ীর জানালা দিয়ে চোখের দৃষ্টিটা দূরের আকাশে নিবদ্ধ করে আরো গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল। কমলেশ সাহস করে আর কিছুই জিজ্ঞেস করতে পারেনি। দেশ স্বাধীন হলেই বুঝি আর দেশের বাড়িতে থাকা যায় না এ রকম একটা অলীক ধারণা ওর মনে তখন দানা বেঁধে ওঠে। স্বাধীনতা জিনিষটা বস্তুত কি সে সম্পর্কে তার কোন ধারণাই জন্মায়নি। সে তার বাবার পাশে জবুতবু হয়ে গাড়ীতে বসে থাকে। হঠাৎ গাড়ীটা সামান্য ধাক্কা দেয়। কমলেশ একটুর জন্য পরে গিয়েছিল। সে তার বাবার শরীর ধরে আবার ঠিক হয়ে বসে। তারপর ঝিক্ ঝিক্ থ্যাক্ থ্যাক্ আওয়াজ দিয়ে প্রথমে আস্তে আস্তে এবং পরে জোরে ছুটছিল। চলন্ত গাড়ীতে বসে কমলেশের মনে হচ্ছিল পৃথিবীর যাবতীয় গাছ-পালা, রাস্তাঘাট গাড়িটাকে এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে সাই সাই করে পালিয়ে যাচ্ছে। দিগন্তব্যাপী আকাশটা ভেঙ্গে জলস্রোতের মত উল্টোদিকে ছুটে চলছে। বালক কমলেশ জানালার দুপাশ দিয়ে থেমে থেমে দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীর এই পট পরিবর্তন অবাক বিস্ময়ে দেখছিল। সেদিনই বিকালবেলা ওরা শিলচরে এসে পৌঁছেছিল।

গাড়ি থেকে নেমে ইষ্টিশনের বাইরে এসে রিক্সা ভাড়া করে নেয়। ওর বাবা দুহাত দিয়ে শূণ্যে ওকে তুলে রিক্সায় বসিয়ে উনিও ওর পাশে বসে। রিক্সাওয়ালা রিক্সাটা কিছুদূর হাতে টেনে নেওয়ার পর সীটে ওঠে। এ জিনিষটিও কমলেশ এর আগে কোন দিন দেখেনি। এত সুন্দর তিন চাকার হালকা গাড়ীটা কালো পাকা রাস্তা ধরে ছুটে চলে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ইণ্ডিয়া ক্লাবের ঘরটাকে বাঁ দিকে রেখে অন্নপূর্ণা ঘাটের দিকে এগিয়ে যায়। ঝক্ ঝক্ সুন্দর বাড়িগুলোর সামনে গোলমোহর গাছের মাথায় থোকা থোকা আগুনের ফুলকির মত লাল ফুল ছড়িয়ে রয়েছে। কমলেশের রিক্সা গাড়ি সেগুলো পিছনে ফেলে এগিয়ে যায়। তারপর ঘোড়দৌড়ের মাঠটা পার হয়ে কিছুদূর গিয়ে বাঁদিকে মোড় ঘুরেই একটানে চলে যায় একটা পুরানো কাঠের দোতালা-বাড়ির সামনে। রিক্সা থেকে নেমে পয়সা চুকে দিয়ে কমলেশের হাত টেনে ওর বাবা বাড়ীটার দিকে এগিয়ে যায়। দরজায় ঠোকা দিতেই সেজকাকু দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন?

সেজকাকু বাবাকে দেখে নির্বাক কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকেন। তারপর কিছু না বলেই বাবাকে জড়িয়ে কাঁদতে থাকেন। বাবার চোখ দিয়েও জল গড়িয়ে পড়ে। সেদিনই কমলেশ বাবাকে প্রথম কাঁদতে দেখেছিল। সে কান্না কেবল কান্নার বিনিময় না পেছনে অন্য কোন গভীর বেদনা ছিল সেটা কমলেশ বুঝতে পারেনি। পরে শুনেছিল প্রথমে অনুশীলন সমিতি এবং পরে রেফারেন্ডামের সময় খুব সক্রিয় ছিলেন বলে সেজকাকু ধরে নিয়েছিল বাবাকে জীবিত অবস্থায় আর কোন দিনই দেখতে পাবে না। কমলেশ বাবার হাত ধরে এই যে বাড়িতে ঢুকেছিল, সেখান থেকেই ওর জীবনের হাটি হাটি পা পা শুরু হয়। সেজকাকু সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে ওকে ভর্তি করে দেয়। ছোট্ট কমলেশ একা একা সদরঘাটের পাশ দিয়ে স্কুলে যেত।

সদরঘাট থেকে দু পা এগিয়ে কাছারীর মাঠটা পার হলেই মন্দির নয় অথচ সে রকম ছাচেরই একটা অদ্ভুত আকাশছোয়া বাড়ি ওর নজর কেড়ে নিত। প্রথম প্রথম কমলেশ ওটা দেখে ভয় পেত। ওর মনে হত সাহেবদের গির্জা এই বৃহৎ বন্ধ ঘরটাতে পৃথিবীর যাবতীয় ভয়ের অলৌকিক শক্তি ওৎপেতে রয়েছে। একা একা যাওয়ার সময় সুযোগ পেলেই ওর পিছু ধাওয়া করবে। সে দুরু দুরু বুকে পা ফেলে রাস্তাটা পার হয়ে যেত। এই ভয়ের ভাবটাও অবশ্য খোলা বাতাসে কপূর বিলীন হয়ে যাওয়ার মতই ধীরে ধীরে কমলেশের মন থেকে চলে যায়। কিন্তু ঐ স্কুলে যে ওর জন্য আরেকটা অস্বস্তিকর জ্বালাতন অপেক্ষা করছিল সেট। সে জানত না। পড়াশুনা সে ভালোই করত। কিন্তু পিরিয়ড শেষে মাষ্টার মশাই ক্লাশ হেড়ে চলে গেলে ধেড়ে ছাত্রগুলো ওকে মাথায় চাটি মেরে বলত, হেই রিফুজী।

কমলেশ অহেতুক এই অসঙ্গত আচরণের অন্তর্নিহিত সম্যক কারণ খুঁজে পেত না। মনে হতো বিশেষ কোন আকৃতিগত শারীরিক দুর্বলতা কিংবা বাপ মায়ের ঐতিহ্যকে কটাক্ষ করে কোন অশ্লীল ইঙ্গিত হয়ত এই শব্দটা বহন করে। তাই সে কোন দিন বাড়ীতে সেজকাকু কিংবা বাবাকে এ নিয়ে কিছু বলেনি। অবশেষে এটাও কমলেশ কাটিয়ে ওঠে। কমলেশ ধাপে ধাপে উচ্চ বিদ্যালয়ের শেষ সীমানা পার হয়েছে। এরই মধ্যে ঐ স্কুল ঘরের পিছনে পাথর ভেদ করে গজিয়ে উঠা পুরোনো ছাতিম গাছগুলোকে ভরা বর্ষার বরাকের করাল স্রোতে কেমন এক এক করে লোক চক্ষুর অন্তরালে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। শীতের শীর্ণকায় বরাকের দুপারে বিস্তৃত শান বাধানো জমকালো কঠিন শিলাস্তুপ ও আর এখন নজরে পড়ে না।

সদরঘাটের ওপারে রংপুর যেতে ইঞ্জিন চালিত জোড়া নৌকা নদীর বুক চিরে গর্গর আওয়াজ তুলে না। একফালি বাঁকানো চাঁদের উল্টো আকৃতি নিয়ে বরাক ব্রীজ দুপারকে জুড়ে দিয়েছে। হাকিম সাহেবের আদালতের সামনে সাহেবদের গির্জাটার পাশে অনেক ঘর বাড়ি উঠেছে। এক নজরে সেটাকে আর আকাশছোয়া মনে হয় না। অনেক পরিবর্তন হয়েছে।

কমলেশেরও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। কমলেশ কলেজ ও ইউনিভার্সিটির পড়াশুনা শেষ করে অনেক বছর হলো কলেজে পড়াচ্ছে। প্রথম স্বাধীনতা দিবসের পর বাবার হাত ধরে সেজকাকুর যে বাড়িটাতে এসেছিল এখন সে নিজেই এ বাড়ির গৃহকর্তা। সেজকাকু যে কোঠাতে থাকতেন সে এখন সেটাকে শোবার ঘর করেছে। এ ঘরে শুয়ে শুয়েই চাকুরীর প্রথম দিন থেকে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় নানা রঙীন কল্পনার জাল বুনেছে। জীবনের নির্দ্ধারিত সময়সীমা ক্রমে ক্রমে কমে আসার সাথে সাথে ওর কল্পনাও ফিকে হয়ে যায়।

এখন কমলেশ সংসার করে। সে কলেজের সাদামাটা অধ্যাপক। যান্ত্রিক ভাবে কলেজে যাওয়া এবং বাজার করার কাজে স্বাভাবিক নিয়মে ওকে আচ্ছন্ন করে রাখে। বছর দু’এক আগে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সুপারিশ অনুসারে কমলেশের বেতনের হার পরিবর্তন হওয়ায় এবং বকেয়া টাকা পাওয়ার পর ওর কাজে স্বাভাবিকতায় যেন কিছুটা হেদ পড়ে। চলার গতিতে যেন কিছুটা সজীবতা এনে দেয়। কমলেশ মনে মনে ভেবেছিল -”যাক বাবা এতদিনে সোসাইটিতে অধ্যাপকদের সম্মানজনক অবস্থানের ইতিবাচক দিকটা সূচিত হল। ডাক্তার ইঞ্জীনীয়ার এবং অনেক আমলাদের চাইতে জাতির মেরুদণ্ড অধ্যাপকদের বেতনের হার বেশী।” এটা ভেবে কমলেশ আনন্দই পায়। শুধু তাই নয়, টাকাটা হাতে আসার আগেই কি কি করবে সেটা নিয়ে মনে মনে অনেক জল্পনা কল্পনা করে। এবার সে ঠিক ঠিকই জয়াকে সারপ্রাইজ দেবে। জয়া যে কোন ডিমাণ্ডই করুক না কেন সেটা ফাষ্ট প্রেফারেন্স পাবে। তাই কমলেশ এক সাথে অনেক টাকা পাচ্ছে জেনে জয়া যখন ফ্রিজ কেনার কথা বলছিল সে আপত্তি করেনি। কমলেশ হেসে হেসেই জবাব দিয়েছিল -হ্যাঁ টাকাটা ড্র করেই একটা ফ্রিজ কিনে নেব। তাহলে তোমার খুব সুবিধা হবে।

কিছুদিনের মধ্যেই কমলেশ টাকা ড্র করেছিল। পত্র পত্রিকায় বিভিন্ন কোম্পানীর তৈরী ফ্রিজের বিজ্ঞাপন ও সে খুটে খুটে দেখছিল। কিন্তু হঠাৎ একটা অস্বস্তিকর বাড়তি সমস্যা মাথা চাড়া দিয়ে ভীষণভাবে ওকে পীড়া দিতে থাকে। সেজকাকু প্রথম জীবনে বাড়ির সাথে যে সার্ভিস লেট্রিন তৈরী করেছিল সেটা জীর্ণদশায় পৌঁছেছে। পর পর কয়েকদিন মিউনিসিপ্যালিটির নাগা দায়িত্ব পালন না করায় প্রাত কালীন নিত্যকর্মের টিনটা ভর্তি হয়ে উপচে পড়ে। সেটা থেকে নির্গত দুর্গন্ধ সারা বাড়ির আনাচে কানাচে ছড়িয়ে বেড়ায়। এ উপদ্রবটা যে আগে ছিলনা তা নয়। কমলেশ টাকাটা পাওয়ার পর যেন সেটা আরো বেশি তীব্র হয়। নাকের ডগায় সব সময়ই লেগে থাকে।

সার্ভিস লেট্রিনের উৎপাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য সাত পাঁচ না ভেবে কমলেশ সেনিটারি পায়খানার পরিকল্পনা করে। এই পরিকল্পনাই বিনি সুতোয় ওকে হাত বেঁধে টেনে নিয়ে যায়। ইট, রড, সিমেন্ট সংগ্রহ করতে গিয়ে যে সব নূতন দিকের সন্ধান পায় সে গুলো ওকে অবাক করে দেয়। কমলেশ অনেক কিছু জানে এবং সে নিজেকে বুদ্ধিমান ভাবত। কিন্তু জীবনের প্রথম নির্মাণ কাজ সেনিটারি লেট্রিনে হাত দিয়ে ওকে যে ভাবে হয়রান হতে হয়েছে সেটা ভাবতে গিয়ে নিজেই নিজেকে বলে, “আমি শালা একটা ফার্স্ট ক্লাস ইডিওট।” যথেষ্ট হয়রান এবং লাঞ্ছনা ভোগ করলেও টাকার অঙ্কটা কিন্তু কম লাগেনি।

সেনিটারিটা শেষ হওয়ার সাথে সাথে কমলেশের মনে হয় বাথরুমটির কাজ সেরে নিলে একেবারে ঝামেলা চুকে যাবে। বাথরুম শেষ করার পর বড়ঘরের পুরানো খুটি পাল্টানো, নীচের তিনফুট দেওয়াল, চালের ঝাঝড়া ফুটো টিন বদলে নূতন টিন এবং ভাঙ্গা দরজা জানালা পাল্টানো প্রভৃতি একে একে সেরে কমলেশ যখন দেখল টাকার পরিমাণ দ্রুত নেমে চার অঙ্কের ক্ষুদ্রতম সংখ্যায় এসে দাঁড়াচ্ছে তখন সে সত্যি সত্যিই বেওকুফ হয়ে যায়। কমলেশ ভেবেছিল এক রকম হলো অন্যরকম। জয়ার ইচ্ছামত ও কিছু হলো না। ওর জন্য কমলেশের কষ্টই হয়। মনে মনে ভাবে, “বেচারী জয়া! ওর কত স্বপ্ন ছিল। রিটায়ার্ড বুড়ো বাপ হন্যে হয়ে বর খুঁজেছে। আট ঘাট বেঁধে মনের মত জামাইকে ধরতে যাবে আর ঠিক তখনই দুধেল হবু শ্বশুররা ফস করে ওকে বোকা বানিয়ে পছন্দের বরকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। এমনি ভাবে বুড়ো ল্যাং খেতে খেতে সবশেষে সমরেশ চৌধুরীর পুত্র অধ্যাপক শ্রীমান কমলেশ চৌধুরীর কাঁধে আদরের মেয়ে জয়াকে চাপিয়ে দিয়ে হাফ ছেড়ে বেঁচেছে। শ্রীমতি জয়ারাণীর স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। সে ২৫০ গ্রাম মাছের ঝোল দিয়ে তিনবেলা চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। টুটুনকে যত্ন করে খাওয়ায়। বস্তুত এখন বিশেষ কোন সম্বোধনে ওকে ভূষিত করলে কীচেন কুইন্‌হ বলতে হবে।”

জয়ার কথা ভাবতে ভাবতে সে নিজের প্রসঙ্গে আসে। কিছু দিন সে বেশ ফুর্তিতেই ছিল। এখন সব ফুর্তি মিলে গিয়ে চুপসে যাচ্ছে। - যক্ষা রোগীকে ইন্জেক্সন দিয়ে এবং ওষুধ খাইয়ে যে ভাবে সাময়িক ফুলিয়ে দেওয়া হয় বেতনের হার বৃদ্ধি এবং বকেয়া কিছু টাকা দিয়ে ক্ষয়রোগাক্রান্ত জাতির মেরুদণ্ডকে সাময়িক ফুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। টাকা ফুরুৎ হয়ে যাওয়ায় এখন আবার চামসিটে ভাবটা চাড়া দিয়ে উঠছে। কমলেশ নিজে নিজেই ভাবে।

আজকাল কলেজ থেকে ফিরে এসে নিজের খাটে একা একা শুয়ে কিংবা বাল্যের অনেক মধুর স্মৃতি জড়ানো সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের নির্জন রাস্তাটা দিয়ে বাজার থেকে একা একা ফেরার সময় বমলেশ ভাবে ওর চাওয়া এবং পাওয়ার মধ্যে সব সময়ই একটা বিরাট ব্যবধান থেকে যাবে। দুটো মিলে এক হবে না। এটার কারণ খুঁজতে গিয়ে অনেক সময় ওর মাথায় জটিল জট পেকে যায়। সে হিসাব মিলাতে পারে না কেমন করে ওর চেয়ে কম বেতন পেয়েও অনেকে দিব্যি বুক ফুলিয়ে বাজার থেকে রোজ রোজ তিরিশ চল্লিশ টাকা কেজি ধরে মাছ কিনে নেয়। বউকে নিয়ে ট্যাক্সি হেকে বেড়ায়। বছরে দু তিনবার শিলং দার্জিলিং ঘুরে আসে। আরো কত কি! সব কিছুই যেন ওদের হাতের মুঠোয়। এসব ভাবতে গিয়ে কমলেশের মনে হয়, সরকার নামক একটা বস্তু যার আকার কিংবা আকৃতি হাত দিয়ে চিহ্নিত করা যায় না অথচ যার অস্তিত্ব না থাকলে যে কোন ভৌগলিক সীমানার মানব সমাজের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না সেই সরকারই হচ্ছে নষ্টের মূল।

জনপ্রতিনিধি দ্বারা জনস্বার্থে চালিত সরকার দীর্ঘদিন ধরে একটা বিশেষ অলিখিত পরিমণ্ডল সৃষ্টি করেছে। আজকে সেটার ব্যাপকতা আরো বাড়ছে। শত সহস্র কাণ্ড এবং শাখা প্রশাখায় ছড়িয়ে আছে। সেটার প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই অলিখিত বিশেষ পরিমণ্ডলের ব্যাপ্তি আনুপাতিক হারে বিদ্যামান। কমলেশ অসুস্থ ছেলেকে মেডিকেল কলেজে চিকিৎসার জন্য নিয়ে দেখেছে সেখানে জনস্বার্থে নিয়োজিত সরকারী ডাক্তররা আইন মোতাবেক কাজ করার বাহনা দেখাচ্ছে। আবার একই সাথে নিজেরা অলিখিত পরিমণ্ডল সৃষ্টি করে। ঢালাও টাকা কামিয়ে ফুলে ফেপে উঠেছে। কমলেশ সাপ্লাই অফিসে দেখেছে সেখানের বড়বাবুরা পারমিট ইসু করতে কি সুন্দর আইনমাফিক সবকিছু ঠিক রেখেছে এবং পাশে পাশেই একটা অলিখিত পরিমণ্ডল সৃষ্টি করে আখের গুচিয়ে নিচ্ছে। কমলেশ দেখেছে পি ডব্লিউ, ডি, ইরিগেশন, পাবলিক হেলথ প্রভৃতি বিভাগে নিয়োজিত কর্মকর্তরা খাতা পত্র খুব কীন রেখে জনস্বার্থে উন্নয়নমূলক কাজের জন্য বরাদ্দ অর্থ ধান্দাবাজ ঠিকাদারদের যোগ সাজসে একটা অলিখিত পরিমণ্ডল সৃষ্টি করে তছরূপ করছে। ইন্কাম ট্যাক্স সেলস ট্যাক্স, প্রভৃতি সব বিভাগেই অফিসারদের সাথে ব্যবসায়ীদের অলিখিত বিশেষ পরিমণ্ডলের মধুচক্র রয়েছে।

কমলেশ খুঁটে খুঁটে দেখেছে এই মধুচক্রে যারা সামিল হয়েছে তাদের প্রায় সবাই ওর চেনাজানা মানুষ। মেডিকেল কলেজের বড় ডাক্তার ওর মেসোর খুড়তুতো ভাই। সাপ্লাইর ইন্সপেক্টর ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র অমিতের বাবা। পি ডব্লিউ, ডির এক্সিকিউটিভ ইঞ্জীনীয়ার ওর সহকর্মীর ভায়রা ভাই। প্রত্যেকবিভাগেরই কেহ না কেহ কোন না কোন ভাবে ওর পরিচিত। পৃথক পৃথক ভাবে ওদের প্রত্যেকেরই সাথে কমলেশের ব্যবহার অমায়িক। এমনিতে ওরা ভদ্র, শিক্ষিত সমাজের মানুষ। ওরা সবাই সরকারী তকমা এটে জনস্বার্থের অছিলায় যে অলিখিত পরিমণ্ডল সৃষ্টি করে কালোটাকার আন্ডার কারেন্ট অব্যাহত গতিতে বইয়ে দিচ্ছে সেখানে কমলেশের বেতনের হার বাড়লেও কিছু হবে না। জীবন ধারণের নুন্যতম চাহিদা মেটাতে কেবল টাকার অঙ্কটাই বাড়বে। চাওয়া এবং পাওয়ার প্রভেদটা আরো ব্যাপক ভাবে বৃদ্ধি পাবে। আজকাল বেশ কিছুদিন হলো ওর মনে হচ্ছে সে যেন একই বৃত্তের মধ্যে আবর্তিত হচ্ছে। ঘরে বাইরে একই জিনিষের বৈচিত্রহীন পুনরাবৃত্তি করে যাচ্ছে। কলেজে যেদিন বেশি ক্লাস থাকে ওর মেজাজ বিগড়ে যায়। সে মনে মনে বলে, “একটা ভলো অভিনেতাকে দিয়ে পড়ানোর বিষয়টা টেপ করে ছাত্রদের শুনিয়ে দিলেই ওরা বেশি লাভবান হবে। একই বিষয় নিয়ে বার বার ওদের সামনে প্যাক প্যাক করতে হত না ।” এসব ভাবতে ভাবতে কমলেশের আর ভাল্লাগে না। ভালো না লাগার একটা অদৃশ্য ব্যামো কুরে কুরে ওর সব ভালো বৃত্তিগুলোকে নিস্তেজ করে দিচ্ছে।

কমলেশ ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে ওঠে। হাত মুখ ধুয়ে শার্ট পেন্ট লাগিয়ে নেয়। জয়া সকালের খাবার রেখে গেছে। কমলেশ তাড়াতাড়ি রুটি চা খেয়ে নেয়। আলমারির ভিতর থেকে একটা বই বের করে পাতা উল্টায়। বাজার খরচের জন্য আলাদা করে রাখার শেষ কুড়ি টাকার নোটটি সেখান থেকে বের করে বুক পকেটে নোটটা ঢুকিয়েই বাজারের থলিটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। ইস্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা রাস্তা দিয়ে দল বেঁধে যাচ্ছে। ওরা দিদিমণিদের সাথে মিছিল করে স্বাধীনতা দিবসের কুচ কাওয়াজ দেখতে প্যারেড গ্রাউন্ডে যাবে। পাশের বাড়িগুলো থেকে রেডিওর আওয়াজ ভেসে আসছে। দিল্লী থেকে দেশনেত্রীর রাষ্ট্রভাষায় প্রদত্ত ভাষণের টুকরো টুকরো শব্দ কমলেশ শুনতে পাচ্ছে। এখানেও স্থানীয় দেশনেতা পতাকা উত্তোলনের পর ভাষণ দেবে।

কমলেশ এসব ভাবতে ভাবতে পুরানো জাহাজ গোদামের সামনে দিয়ে বরাক পারের রাস্তা ধরে এগিয়ে চলছে। খাদ্য নিগমের অফিসটা পার হয়ে বরাক ব্রীজটার নিচে আসতেই সে চমকে উঠল। হঠাৎ ভট ভট বিকট শব্দ করে একটা মোটর সাইকেল ব্রীজের উপর দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে ছটে চলছে। নিমেষেই সেটা চোখের আড়ালে চলে যায়। ওর মনে হ’ল দেশনেতা, মেসোর খুড়তুতো ভাই, অমিতের বাবা সহকর্মীর ভায়রা ভাই, প্রভৃতি সবাই মিলে বিরাটাকার মাকড়সার জালের মত শত সহস্র বন্ধনে আবদ্ধ থেকে জনস্বার্থের সেবায় আকার বিহীন সরকার নামক যে বস্তুটিকে টিকিয়ে রেখেছে সেটিও মানুষের সুখ সম্পদ নিয়ে প্রগতির নামে প্রচণ্ড গতিতে উর্দ্ধমুখী হয়ে ছুটছে। সেটা নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। উপরেই উঠছে। কমলেশ অনেক আগেই সেটা থেকে ছিটছে মাটিতে পড়ে গেছে। সে একা নয়। ওর মাটির চারপাশে হাজারো হাজারো সাধারণ মানুষ লাখো লাখো শ্রমজীবি মানুষ যারপর নাই ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত ছুটাছুটি করছে।

সমকাল, অক্টোবর’ ৮১ ইং