অতুল তার কালি গাইটাকে মাঠে চরতে দিয়ে সাধুটিলার প্রকাণ্ড তেতুলগাছটার নীচে ডাংগুটি খেলছে। এক দুই তিন করে ঠুকে ঠুকে জোরে ডাং দিয়ে গুটিটাকে অনেক দূর পাঠিয়ে দিচ্ছে। ওর মারের বাহনা দেখে রামের তাক লেগে যায়। রাম গুটিতে জোরে মারতে গিয়ে কেবল হাওয়ায় ডাংটা ঘুরায়। সে অতুলের সাথে পাল্লা দিতে না পেরে ঝগড়া বাঁধাবার ফিকির করছে। অতুল গুটিটাকে আরেকবার ডাং দিয়ে মেরে অনেকদূর পাঠিয়ে দিল। সে মাথা নিচু করে মাটিতে ডাং ঘুরিয়ে এক্কা দুক্কা গুনে গুনে আসছে। রাম এটা কিছুতেই সইতে পারছে না। সে দূর থেকেই দাঁড়িয়ে চীৎকার করে বলল - আমি তোর সাথে নাই খেলব। তুই গিন্তিতে কান্টুসবাজি করছিস।

অতুল রামের কথা শুনে গিন্তি বন্ধ করে দেয়। মিথ্যা অভিযোগে ওর খেলার বাহাদুরী মাটি করে দিচ্ছে। নিমেষে ওর আনন্দের মুখখানা চুপসে যায়। সে পিট টান করে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিবাদের জোয়ার ওর শিরা উপশিরায় টই টুম্বুর। সে জোরে ধমক দিয়ে বলে - হেই, আমি কোথায় কান্টুসবাজি করলাম। খেলাতে না পারলে তুই এমনি করে রোজ রোজ ঝগড়া বাঁধাস।

এভাবেই খেলা থেকে অতুল এবং রামের বাকযুদ্ধ শুরু হয় এবং তারপর মল্লযুদ্ধ। একবার অতুল রামকে নীচে ফেলে চেচিয়ে বলে - ‘বল ঝুট বাত বলবি কি নাই’। আবার রাম অতুলকে নীচে ফেলে চেচিয়ে বলে, ‘বল কান্টুসবাজি করবি কি নাই।’ এমনিভাবে পর্যায়ক্রমে ওরা চালিয়ে যেতে থাকে যতক্ষণ না পর্যন্ত ভীষণভাবে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ে। তারপর কিছুটা বিরতি দিয়ে আবার যৌথ চুক্তিতে নূতন উদ্যমে নেমে যায়। কোন কোন দিন অতুল বলে চল চল, রংঘরের পাশে চাম গাছটায় গিয়ে হরিয়াল মারি। ওর প্রস্তাব শুনেই রাম প্রস্তুত হয়ে যায়। গুলতি নিয়ে সাথে সাথেই দুজন রংঘরের দিকে ছুট দেয়। আবার কোন কোন দিন রাম বলে - চল, বাবুটিলার আমলকি চুরি করিগে। সাথে সাথেই দুজন ছুট দেয়। তড়বড় করে গাছ বেয়ে মগডালে চরে বসে। অতুল ডালের আড়ালে নিজের শরীরটাকে লুকিয়ে চুপি চুপি আমলকি পারে। রাম গাছের নীচে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য রাখে বাবুর বাড়ির কেহ আসছে কি না।

আজকেও হয়তবা রাম এবং অতুলের মল্লযুদ্ধ আরম্ভ হয়ে যেত’। ওদের যখন বাকযুদ্ধ শুরু হয়েছে ঠিক তখনই ইয়েণ্ডির মেঠো পথ ধরে একটা জীপ গাড়ি গর্গর গর্গর …. করে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। সেটার দিকে নজর পড়তেই রাম বলল - হেই দেখ, একটা ভোটের গাড়ি তরবরিয়ে যাইছে। চল চল, কাগজ দিবে – ভোটের কাগজ। একথা বলেই সোজা দৌড় দেয়।

অতুল দেখল জীপ গাড়িটা ধুলো উড়িয়ে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। রাম সেটার নাগাল পেতে রাস্তা ছেড়ে কোণাকোণি জমিনের মধ্য দিয়ে ছুটছে। সে আর নিজেকে সামলে রাখতে পারেনি। সে শক্ত হাতে ধরে ডাং ঘুরিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে ছুট দিল। সে দৌড়ে যেতে যেতে চীৎকার দিয়ে বলছে, – হেই ভোটের গাড়ি, কাগজ দে। হামদেরকে কাগজ দে নইলে ভোট পাবি নাই।

জীপ গাড়িটা অসমান রাস্তায় লক্কর জক্কর করে হেলতে দুলতে এগুচ্ছে এবং অতুল রামকে পিছনে ফেলে গাড়িটার সমান তালে পিছন পিছন ছুটছে। ভোটের কাগজের নেশা ওর মাথায় চেপেছে। দৌড়ে যেতে যেতে মোটেই টের পায়নি কখন রংঘর গুটি বাড়ি, মুলিধার এবং বৈঠাখাল পার হয়ে এসেছে। হঠাৎ ভোস, ভোস, আওয়াজ দিয়ে পিছন দিকে ধুয়া ছাড়তে ছাড়তে গাড়িটা দাড়িয়ে যায়। কালো কুয়াশার মত একরাশ ধুয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে অতুলকে ঘিরে ধরে। তেলের পোড়া গন্ধ ওর নাকে মুখে ঝাপট। দেয়। সেও থমকে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ পরে ধুয়া মিলে গেলে সে বুঝতে পারে অনেকদূর পাড়ি দিয়ে মালিবস্তীর চৌমাথায় এসে পৌঁছেছে।

গাড়িটা থামার পর অতুল লক্ষ্য করল কোট প্যান্ট লাগানো দুজন বাবু গাড়ি থেকে নামল। ওদের হাতে ভোটের কোন কাগজ নেই। ওরা হেটে হেটে সুধন্য দাসের মুদি দোকানটার দিকে এগিয়ে যায়। অতুল মনে মনে খুব কষ্ট পেল। সে পিছন ফিরে দেখল রামও ততক্ষণে ওর পাশে এসে গেছে। রামকে লক্ষ্য করে মুখ বিকৃত করে সে বলল – ধ্যাত, ওরা ভোটের কাগজ দিবেক নাই। বাবুগুলা দুস্রা কোন মতলবে আসছে ।

সুধন্য দাস খরিদ্দারের অভাবে দোকানের বাকী হিসাবের খাতাটা উল্টে পাল্টে দেখছিল। গাড়ি থেকে বাবুরা নেমে ওর দোকানের দিকে এগিয়ে আসছে দেখে ভয় পেল। কি জানি বাবা সাপ্লাইয়ের কোন বড় সাহেব আসছে কি না। গেলো মাসে রেশনের রেজিষ্টারখানা ইন্সপেক্টরকে দেখিয়ে আনানোর সময় একশ টাকা দিয়েছে। বৈঠকখানাতে আরাম কেদারায় বসে ইন্সপেক্টর বাবু ওর দেওয়া খামের ভিতর টাকাগুলো আড়চোখে একবার দেখে নিয়েছিল। রেজিষ্টারটা টেবিলের উপর সুধন্য যেমন ভাবে রেখেছিল তেমনিই ছিল। আসার সময় সেটা তুলে নেয় এবং তখন ইন্সপেক্টর বাবু সুধন্যকে বলে – তোমার নামে কিন্তু লোকাল কমপ্লেইন আছে। লোকেরা ঠিকমত জিনিস পাচ্ছে না। সুধন্য এতদিনে বাবুদের কোন কথার মানে কি অনেকটা বুঝে নিয়েছে। ও বুঝতে পারল ইন্সপেক্টর বাবু আগামীতে খামের ভিতরের টাকার অঙ্কটা আরো বাড়াতে চাইছে। সে সামনাসামনি কিছুই বলল না। রেজিষ্টারখানা বগলদাবা করে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে মনে মনে বলল – শালা শুয়োরের বাচ্ছা। আমি দানসত্র খুলেছি? তোমাকে টাকা, ষ্টেটফেডে টাকা, কুলি মজুরের খরচ দিয়ে ন্যায্য দামে রেশন দেব? আমার বাবা স্বর্গে যেতে হাওয়ায় লটকে রয়েছে যে ওকে উদ্ধার করতে নিজের গিট ঢিলা করব? এসব মনে মনে বলে মেজাজটা খারাপ করে শহর থেকে ফিরছিল।

এখন বাবুগুলো দোকানের দিকে এগোচ্ছে দেখে ও ভাবল এটা নিশ্চয়ই ইন্সপেক্টর বাবুর কারসাজি। কলসী ফেটে জল মাটিতে ছড়িয়ে পড়ার মত আতঙ্কের বীজ ওর সারা মনে অঙ্কুরিত হচ্ছে। সে ভয়ে ভয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এলো। সে বাবুদের লক্ষ্য করে দুহাত তুলে নমস্কার করে বলল – আসুন স্যার আপনাদের পায়ের ধুলো পাওয়া আমাদের সৌভাগ্য।

এ ধরণের বিনয়ী আপ্যায়ন ওদের ভালই লাগল। সোস্যাল ওয়েলফেয়ারের প্রজেক্ট অফিসার মিঃ চক্রবর্তী নিজের মধ্যে কিছুটা পোষাকী গাম্ভীর্য টেনে নিয়ে বলল – তুমি শঙ্কু পঞ্চায়েতকে চিন? – আজ্ঞে হ্যাঁ, পঞ্চায়েতকে চিনব না কেন? একথা বলেই সুধন্য তার দোকানের ডানদিকে জামতলীর রাস্তাটা দেখিয়ে বলল – এইদিকে সামান্য এগিয়ে ২০৭ নম্বর নয়ণতারা প্রাইমারী স্কুলের পাশেই এদের পঞ্চায়েত অফিস। সেখানেই ও থাকে।

শঙ্কু পঞ্চায়েতের আস্তানা জেনে নিয়ে মিঃ চক্রবর্তী সাথের ভদ্রলোক আই আর ডি পির বাবু মিঃ রায়চৌধুরীকে বললেন – তাহলে চলুন মিঃ রায়চৌধুরী আমরা সেদিকেই যাই।

সুধন্য মনে মনে যা ভেবেছিল সে রকম কিছুই নয়। অমূলক আশঙ্কার বেড়াজাল কুরে কুরে যে ভাবে মনটাতে চিড় ধরিয়ে দিয়েছিল সেটা মুহুর্তে’ই উবে যায়। ঝরঝরে আনন্দের জোয়ার ওর মনের মধ্যে বইতে থাকে। সে ঘাড় কাত করে মিহি গলায় বলে – আমার এখানে একটু বসে যান স্যার। – না না, এখন নয়। পরে দেখা যাবে। এবলেই মিঃ চক্রবর্তী ও মিঃ রায়চৌধুরী পা বাড়ায়।

ধনেকালি ব্লকের অন্তর্ভুক্ত সবগুলো গ্রামেই নূতন কর্মসূচীর বাস্তব রূপদান হবে। গ্রামের সার্বিক উন্নয়ণের প্রকল্পগুলো বাস্তবে প্রয়োগ করার দায়িত্ব নিয়ে এসেছেন আই আর ডিপির বাবু মিঃ রায়চৌধুরী – এসেছেন সোস্যাল ওয়েল ফেয়ারের প্রজেক্ট অফিসার মিঃ চক্রবর্তী’। ধনেকালি ব্লকের জামতলীতেই শুভ সূচনা হবে।

১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই ধীরে ধীরে জামতলীর হারিন শানুক, দ্বারিক রিকিয়াসন, নবীন সাওতাল ও সুমিত্রা তাঁতিরা দূরে জঙ্গলে যায় লাকড়ি কাটতে। ওরা সেগুলো মাথায় বয়ে মিছিল করে শহরে যায় বিক্রি করতে। ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার পরই বলাই দাস, কামেন্দ্র দাস রিফুজী হয়ে জামতলীতে এসেছে। উচু টিলা গুলো ক্রমশঃ নীচু হয়ে যেখানে বিলের পাশে মিশেছে সেখানেই ঘর বেঁধেছে। ওরা মাছ ধরে, বুরোক্ষেত করে। ব্রিটিশ সাহেবদের আমলে অবশ্য এরকমটা ছিল না। সন্ধ্যা মিলিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই জামতলী টি এষ্টেটের যন্ত্রদানবটা সচল হয়ে উঠত। ধক্ ধক্ আওয়াজ সারাটা এলাকা কাঁপিয়ে দিত। চা ঘর থেকে ভেসে আসা সবুজ চায়ের মাতাল করা গন্ধ নবীন সাঁওতালের বাবা ঝগড়ু সর্দারকে মহুয়ার নেশার মতই আমেজ ধরিয়ে দিত। বাঁধন না মানা ক্ষিপ্ত ঘোড়ার মত ছুটে যেত ঢিল্লা লেইনে। সেখানে টুসু গানের তালে তালে বেজে উঠত মাদল। রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে মাদলের মিষ্টি আওয়াজ টিলা থেকে টিলায় প্রতিধ্বনিত হয়ে দূরে মিলিয়ে যেত।

সাহেবরা চলে যাওয়ার পর প্রথম চা ঘর বন্ধ হয়ে যায়। শিরিষ গাছের নিবিড় ছায়ায় সমান করে ছাটা চা বাগানের ঘন সবুজ গালিচা ধীরে ধীরে যৌবনের ভরা সম্ভার হারিয়ে ফেলে। সজীব প্রাণের স্পন্দন ধুকতে সময়ের স্রোতে বিলীন হতে থাকে। এখন টিলাগুলো নদের নিমাইর ন্যাড়া মাথার মত পালিশ হয়ে যে যার জায়গায় স্থানুবৎ লেপটে আছে।

গ্রামীণ উন্নয়ণের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ণের জন্য জামতলীই এখন আদর্শ গ্রাম ।

মিঃ রায়চৌধুরী এবং মিঃ চক্রবর্তী বাগানের পুরনো ট্রলি লাইনের পাশ দিয়ে পায়ে হাটা রাস্তায় এগিয়ে চলছে। অতুল এবং রাম এত সময় খুটে খুটে বাবুদের জীপগাড়িটা দুচোখ ভরে দেখছিল। বাবুরা জামতলীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেখে ওরাও ওদের পিছু পিছু হাটতে থাকে। সামান্য কিছুটা এগিয়েই ট্রলি লাইনটা ডানদিকে বেঁকে টিলার মধ্য দিয়ে ঢুকে গেছে। টিলাটা পার হয়েই সমতল জায়গা – সেখানেই ২০৭ নম্বর নয়ণতারা প্রাইমারী স্কুল আর পঞ্চায়েত অফিস ।

শঙ্কু পঞ্চায়েত আগে থেকেই লোক জমায়েতের চেষ্টা করেছে। কিন্তু অনেকেই এর কথায় আজকাল আর তেমন উৎসাহবোধ করে না। তবে তার ছত্রছায়ায় সবসময়ই থেকে যারা এটা সেটা তলানি পেয়ে থাকে তাদের মধ্যেই কয়েকজন এসে জমায়েত হয়েছে। আগামীতে কিছু পাবে ভেবে মনে মনে রঙীন আশার জাল বুনছে । আজকের রোজের ধান্দা বাদ দিয়ে অধীর আগ্রহে পঞ্চায়েত অফিসের সামনে অপেক্ষা করছে।

মিঃ রায়চৌধুরী ও মিঃ চক্রবর্তী কে দেখতে পেয়েই শঙ্কু পঞ্চায়েত এগিয়ে এল। ওকে ঘিরে যে দশ বারোজন লোক ছিল ওরাও নিজেদের মধ্যে গুটমাইর বন্ধ করে কৌতূহল নয়ণে বাবুদের আগমন লক্ষ্য করছে। শঙ্কু এগিয়ে এসে বলল – স্যার, আমরা সেই সকাল থেকে আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছি।

– আমরাও সময় মতই রওয়ানা দিয়েছি। রাস্তার জন্যই দেরী হয়ে গেল। গাড়ীর ঝাকুনিতে নাড়ি ভুড়ি একাকার হয়ে যাওয়ার পালা। বাড়িতে গিয়ে বিছানায় না পরলেই হয়। মিঃ রায়চৌধুরী শঙ্কুর কথার রেশ টেনে বলল।

শঙ্কু হাসতে হাসতে বলে – এখন তবুও ভাল স্যার। বর্ষায় এদিকে গাড়ি নিয়ে আসার কথা ভাবাই যায় না। মিঃ চক্রবর্তী ভেবেছিল ওরা আসছে শুনে স্থানীয় লোকের জমায়েতটা ভালোই হবে। পঞ্চায়েত অফিসের সামনে সামান্য কজনকে দেখে ও বুঝতে পারেনি জমায়েত আরো হবে কিনা। সে মুখ ফিরিয়ে শঙ্কুর দিকে তাকিয়ে বলল

– আরো লোক আসবে কি?

– অনেকে অপেক্ষা করে চলে গেছে। মিটিং আরম্ভ হলে আরো কিছু আসবে স্যার। মিঃ চক্রবর্তীর কথা শুনে শঙ্ক পঞ্চায়েত বলল।

– তাহলে আর দেরী করে লাভ নেই। মিঃ চক্রবর্তী একথা বলেই মিঃ রায়চৌধুরীর দিকে মুখ ফিরিয়ে বলেন – কি বলেন মিঃ রায়চৌধুরী?

– হ্যা, আরম্ভ করে দিন। মিঃ রায়চৌধুরীও সম্মতি দেন। শঙ্কু পঞ্চায়েত এবং আরো দুজন মিলে পঞ্চায়েত অফিসের ভাঙ্গা টেবিলটা এবং দুটো চেয়ার অফিস ঘরের বাইরে যেখানটায় ওরা জমায়েত হয়েছিল সেখানে ধরাধরি করে আনে। মিঃ রায়চৌধুরী এবং মিঃ চক্রবর্তী সেখানে গিয়ে বসেন। শঙ্কু পঞ্চায়েত তাদের পাশেই সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে থাকে। লোক গুলো সব হা করে ওদেরকে দেখছে। অতুল এবং রামও লোকগুলোর পাশে ভিড়ে যায়। রাস্তা দিয়ে তখনও মেয়ে ছেলেরা মাথায় লাকড়ি নিয়ে শহরের দিকে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে দু একজন মাছের ভাড় নিয়ে প্রায় দৌড়ে যাচ্ছে। যেতে যেতে সবাই পঞ্চায়েত অফিসের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে।

সোস্যাল ওয়েলফেয়ারের প্রজেক্ট অফিসার মিঃ চক্রবর্তী প্রথম উঠেন। গায়ের সহজ সরল মানুষগুলোকে সহজ সরল ভাষায় সব কিছু বুঝিয়ে বলতে হবে। শিক্ষার অভাব আজও গ্রাম্য জীবনকে মধ্যযুগীয় কুসংস্কার ও সঙ্কীর্ণতার গণ্ডীতে আবদ্ধ করে রেখেছে। শিক্ষার আলোক বর্তিকা যথার্থভাবে দরিদ্র ভূমিহীন জনসাধারণের নিকট পৌঁছে দিতে হবে। নিরক্ষরতা দূর করতে হবে। এসব কথগুলোই মিঃ চক্রবর্ত্তী গ্রামের লোকদের নিকট বলবে বলে মনে মনে আউড়ে ছিল। কিন্তু এখন বলতে গিয়ে ঠিকমত সংযোজন করতে পারেনি।

সে বলল – আমরা এ গ্রামে বয়স্ক লোকদের পড়াশুনা শেখাবার ব্যবস্থা করে দেব। এখানে বুড়াদের জন্য ইস্কুল বানানো হবে। সবাই নিজ নিজ নাম ঠিকানা লিখতে পারে, পড়তে পারে সেটার ব্যবস্থা করে দেয়া হবে। ইস্কুল এবং পড়াশুনার কথা শুনলে অতুলের ভালো লাগে না। গেল বছর ঝড়ে ওদের ইস্কুলটা ভেঙ্গে গিয়ে ভালোই হয়েছে। এখন আর ওকে ইস্কুলে যেতে হয় না। মাঝে মাঝে শহর থেকে পিয়ারী মাষ্টার এসে বাবুটিলার বড় ঘরের বারান্দায় ইস্কুল বসায়। চার পাঁচজন ইস্কুলে যায়। দুপুর বেলায় জোর গলায় চীৎকার দিয়ে নামতা পড়ার আওয়াজ সাধুটিলার আশ পাশ দিয়ে ভেসে যায়। এ সব ভেবে অতুল আবার বাবুটার দিকে চাইল। বাবুটার পিছন দিকে ২০৭ নম্বর নয়ণতারা প্রাইমারী স্কুলটা এখন ভালভাবে ওর নজরে পড়ছে। এটাও বোধহয় এবারই ঝড়ের একদমকা হাওয়ায় পড়ে যাবে। তখন সারা এলাকায় বাচ্চাদের ইস্কুল মাটিতে শুয়ে থাকবে। এখন বুড়াদের ইস্কুল বানালে ভালো হবে। বুড়াদের কথা আসতেই ওর সামনে রামের বাবার চেহারাটা ভেসে উঠে। ওর মাথায় কুবুদ্ধি খোঁচাখুঁচি করতে থাকে। সে রামকে বলে – হেই শোন, তোর বাবা যখন ইস্কুলে পড়া নাই পারবে তখন মাষ্টার মশাই তোর বাপকে এমনি করে কান মলে দিবেক। একথা বলেই সে রামের কান দুটো জোরে মলে দেয়।

রাম এটার জন্য প্রস্তুত ছিল না। অতুল ওর কান দুটো বেশ জোরেই মলে দিয়েছে। ও দুঃখ পেয়েছে। সে রেগে ফেটে পড়ল। রাগ সামলাতে না পেরে সে চেচিয়ে বলল – দূর শালা, আমার বাপের কান নাই মলবেক। তোর মাকে বারান্দায় হাটু ভেঙ্গে বসিয়ে রাখবেক।

অতুল রামের কথার জের টেনে চালিয়ে যেত। কিন্তু সে দেখল দূর থেকে শঙ্কু পঞ্চায়েত ওদেরকে লক্ষ্য করছে। ওর সাথে চোখাচোখি হতেই শঙ্কু পঞ্চায়েত চোখ বড় করে মুখ বিকৃত করল। অতুল দেখতে পেয়ে মাথা নিচু করে নেয়। সে রামকে ফিস ফিস করে বলে – দেখ, পঞ্চায়েতটা কেমন খটমটায়ে তাকাচ্ছে। ও হামদেরকে গিলে ফেলবে নাকি রে বাবা।

রাম সাথে সাথেই পঞ্চায়েতের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে নিয়ে ব্যাপারটা বুঝে নিল। সে আর কিছু না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। ততক্ষণে মিঃ চক্রবর্তী যা বলার বলে ফেলেছে। চক্রবর্তীর পর মিঃ রায়চৌধুরীর পালা। মিঃ রায়চৌধুরী চেয়ার ছেড়ে উঠে একবার চারদিক ভালো করে চেয়ে নিল। তারপর সে গলাটা ঝেড়ে নিয়ে বলতে লাগল – গ্রামের সাধারণ মানুষের উন্নতি না হলে দেশের সার্বিক উন্নতি সম্ভবপর নয়। গ্রামের গরীব জনসাধারণকে আর্থিক দিক দিয়ে সাবলম্বী করে দেওয়ার জন্য আমরা অনেকগুলো প্রকল্প হাতে নিয়েছি। চাষাবাদের জন্য বীজ, সার ও জলসেচের ব্যবস্থা করা হবে। উন্নত প্রথায় হাঁস মুরগী পালনের জন্য গরীব জনসাধারণকে যথার্থ সাহায্য দেওয়া হবে। দেশের ব্যাপক জনসাধারণ অপুষ্টিতে ভুগছে। উন্নত প্রথায় গো পালনের ব্যবস্থা করা হবে। যে সব গরু ২০ থেকে ২৫ লিটার করে দুধ দেয় সে সব গরু আনব। পুষ্টির অভাব দূর করতে আমরা বান বইয়ে দেব। বস্তুতপক্ষে গ্রামীণ পর্যায়ে একটা বিপ্লব সংগঠিত করব

– শ্বেত বিপ্লব। আমাদের প্রকল্প বাস্তবায়িত করে গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করব। রাম ও অতুল পাশাপাশিই চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল। বাবুটার কথাগুলো রাম শুনে অতুলকে বলল – হেই, বাবুটা ভোটের বাতই বলছেরে।

– দূর, ভোটের বাত নাই। ওটা ভোটের মতই দুস্রা কোন মতলব করছে। একথা বলেই অতুল রামকে হাত ধরে টেনে বলল – চল চল, আমরা চলে যাই। এ কীর্তনে হামরা লুট নাই পাব।

রাম অতুলের কথা শুনে আর কোন দ্বিধা করেনি। সে পা বাড়ায়। ওরা দুজনে সমানে হেটে চলছে। জামতলী পার হয়ে মালিবস্তীর চৌমাথায় এসেছে। বাবুদের গাড়িটা সেই একই জায়গায় আছে। অতুল হাটছে আর মনে মনে ভাবছে, গরুগুলি কেমন জানিরে বাবা – বিশ পঁচিশ লিটার করে দুধ দেয়? এর কালি গাই কোনদিন আধসেরের বেশী দুধ দেয়নি। জন্মের পর থেকেই সে দেখে আসছে কালি গাই যখন দুধ দেয় তখন দুধের ব্যাপারী রমেশ গোয়ালা রোজ রোজ সকাল বেলা কলসী নিয়ে নিজ হাতে দুধ দুইয়ে নেয়। সেই কবে যে রমেশ গোয়ালা ওর বাবাকে কুড়ি টাকা আগাম দিয়েছিল সেটার জোরে এখনও কালি গাইর দুধের বাঁট ওর দখলে। অতুল রোজ রোজ গরুটাকে মাঠে চরায় সন্ধ্যায় ঘরে এনে বাঁধে সে কোনদিন কালিগাইর দুধ খায়নি। ভোর বেলা রমেশ গোয়ালা কালি গাইর দুধের বাঁট টেনে আধসের দুধ না পেলে অতুলকে ধমকায়। অতুল ভয়ে জড় সড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। রমেশ গোয়ালা মাই বাপ। কালি গাইর দুধের বিনিময়ে সে রাত্রে ২৫০ গ্রাম চাউল দেয়। কোনদিন চাউল না দিলে ওরা উপোস থাকে।

বাবুটার কথার জের টেনেই অতুলের মনে এসব কথার বেড়াজাল ঘুর পাক খাচ্ছে। সে মনে মনে ভাবল, ঈস্ কালি গাইটা যদি বিশ লিটার করে দুধ দিত তাহলে সারা বছর ভর পেট ভাত খাওয়া যেত। এসব ভেবে ভেবে সে আনমনা হয়ে হাটতে থাকে আর তখনই রাস্তায় একটা উচু পাথরে হোচট খেয়ে পড়ে যায়। ওর হাতের ডাংগুটি ছিটকে পড়ে। ডান পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের নখটা উল্টে যায়। হাটু দুটোও ছড়ে গিয়ে রক্ত পড়ে। রাম তাড়াতাড়ি ওকে ধরে। সে অতুলকে টেনে তুলতে তুলতে বলে – হেই তোর পায়ের বুড়ো আঙ্গুলটা ভড়কে গেলরে।

অতুল রামের কথার কোন জবাব দিল না। সে উঠে ডাংগুটি দুটো কুড়িয়ে নিল এবং রামের দিকে তাকিয়ে রেগে বলল – দূর শালা, বাবু গিলান কেবল মিঠা মিঠা বাত করে পেট ভরায়।

সমকাল, মার্চ ১৯৮১ ইং।