দরজার কড়ানাড়া শুনে ধড়মড়িয়ে বিছানা থেকে উঠে পড়লাম। দরজাটা তাড়াতাড়ি খুলব বলে এগিয়ে যেতে ঘরের আবছা অন্ধকারে চৌকির পায়া উচু করে রাখার জন্য ইটের কোথায় একটা হোচট খেলাম। মনটা সাথে সাথেই একদম বিগড়ে গেল। কিছুটা সামলে নিয়ে দরজা খুলে দেখি উঠমুখো লাম্বস সনাতনদা দাঁড়িয়ে আছে। ও আমাকে দেখেই চীংকার দিয়ে বলতে লাগল,- তোরা আর কোনদিন মানুষ হবি? সকাল আটটা সাড়ে আটটা বেজে গেলো অথচ ঘুম থেকে উঠার কোন পাত্তা নেই। আমার গলা ফাটানি চেচামেচিতে পাড়ার লোক উকিঝুকি মারছে কিন্তু তোমার আর ঘুম ভাঙছে না।
পায়ে হোচট লেগে এমনিতেই মুখটা কিছু বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। তারপর সনাতনদার এধরনের শাসানিতে আরো বিকৃত হয়ে গেলো। আমি বিকৃত মুখ নিয়েই বললাম, অ তুমি এসেছ। ভিতরে এসে বস। সনাতনদা ঘরের ভিতরে ঢুকে মশারীটা ঠেলে চৌকিতে বসল। আমি খাটানো মশারীর দড়িগুলো এক এক করে খুলে পুটলা বেঁধে চৌকির এক কোনায় ঠেলে দিলাম। তারপর আস্তে আস্তে ওর পাশে গিয়ে বসে জিজ্ঞেস করলাম - কি ব্যাপার, তুমি যে আজ সকাল সকাল এসে ডাকাডাকি আরম্ভ করেছ?
– “একটা টুইশানি কর।” – “ছাত্র পড়াব?” – “হ্যাঁ, পার্টি ভালো আছে।”
– “পার্টি ভালো আছে মানে কি? ঠিক ঠিক করে বলো ছাত্রের গার্জেন কে, ছাত্র কি পড়ে এবং কোথায় গিয়ে পড়াতে হবে ইত্যাদি।”
আমার এধরনের প্রশ্ন শুনে সনাতনদার মুখে হাসি ফুটে উঠেছে। ও বুঝে নিয়েছে আমি হয়তবা ওর প্রস্তাবে রাজি হয়ে যাবো! ও দাঁত বের করে হাসতে হাসতে আমার পিঠে চাপড় দিয়ে বলল- আরে সব ভালো বলেই ত তোর কাছে এসেছি। ছাত্র দার্জিলিং কনভেন্টে পড়ে। একদম বাচ্চা ছেলে। শীতের ছুটিতে বাড়ী এসেছে। ছেলেটির বাবা খুব ভালো মানুষ। ভদ্রলোক খুব ঠেকায় পড়ে আমাকে ধরেছে। তাই আমি তোর কাছে ছুটে এসেছি। পয়সা কড়ির জন্য একদম ঘাবড়াসনে।
এতসব বলার পরও আমার প্রশ্ন থেকে যায়। আমি বললাম, — “তুমি যে সব বলছ তা’ত বুঝলাম। কিন্তু ছাত্রকে পড়াব কোথায়? ছাত্রের বাবার নাম কি?”
– “আরে, ভদ্রলোক হাসপাতালের কোয়ার্টারে থাকেন। সেখানে গিয়ে পড়াবি। ভদ্রলোক একজন বিশিষ্ট স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ। ডাঃ মতি বৈদ্য। মেডিকেল কলেজের গাইনোকোলজির হেড অফ দি ডিপার্টমেন্ট। “
– “গাইনোকোলজির হেড অফ দি ডিপার্টমেন্ট?” আমি প্রায় চমকে প্রশ্ন করি। – “হ্যাঁ, ভদ্রলোক গাইনির হেড।”, সে ঝটাপট প্রত্যুত্তরে বলল।
আমি বেশ কিছুক্ষণ উঠমুখো লাম্বুস, সনাতনদার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। তারপর বললাম – “আচ্ছা সনাতনদা, তোমার বয়েস ত প্রায় পয়তাল্লিশ হতে চলছে; বিয়ে থা করোনি। তুমি কি করে এই গাইনির খপ্পরে পড়লে? ও বুঝেছি আসলে তুমি তোমার বিবাহিত বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে বাড়তি বাহবা কুড়িয়ে নিতে ডাঃ মতি বৈদ্যকে তেল মারার ফির্কির খুঁজছ, তাই না?”
আমার কথা শুনে সনাতনদা চটে গেল। সে প্রায় উত্তেজিত হয়ে আমাকে বলল, তুই সব ব্যাপারেই ফাজলামি করিস্। এটা বাড়াবাড়ি। তারপর কিছুটা সামলে নিয়ে সে ধীরে ধীরে বলল, ভদ্রলোকের সাথে বিজুর শ্বশুর মশায় আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন। ক্যাজুয়্যালী আলাপ করতে করতে ওর প্রাইভেট টিউটরের প্রোব্লেম আমাকে বলে। তখনই সাথে সাথে তোর কথা আমার মনে পড়ে যায়। সেটার জের টেনেই এখন এসে তোকে বলেছি।
– “আহা তুমি পট করে চটে যাচ্ছ। আমি রস করে দুটো কথা বলছি আর তুমি সেটাকে সীরিয়াসলী নিয়ে যাচ্ছ। তুমি রাগ করো না তুমি যখন বলছ তাহলে আমি টিউশনি করবো। আমি গাইনির হেডের ছেলেকে পড়াব। “
আমার কথা শুনে সনাতনদা হাসল। সে চৌকি থেকে উঠে বেরিয়ে যেতে প্রস্তুত হতে হতে বলল, “তাহলে আমি ভদ্রলোককে বলে সবকিছু ফাইনাল করে নেবো।”
– “ঠিক আছে তুমি ফাইনাল করে নিও।”, আমি সাথে সাথে বলি।
সনাতনদা আমার ইতিবাচক সম্মতি পেয়ে খুশীর মেজাজ নিয়ে দরজা ঠেলে ঘরের বাইরে গেল। আমিও ওর পিছন পিছন গেলাম তারপর বললাম – “সনাতন দা সকালবেলা এসেছো এক কাপ চা খেয়ে গেলে হতো না? “
সনাতনদা না না বলেই গেট পার হয়ে হন্ হন্ করে রাস্তা ধরে হেঁটে চলল। ও চলে যাওয়ার পর আমি মনে মনে ভাবলাম, “আমার শালা এখন একটা সাপ্লাই অফিসের কোন বড়কর্তার ছেলের প্রাইভেট টুইশনির দরকার। বাজারে বেবীফুডের যা হাহাকার। আমার কোন কাজের বেলায়ই সময়েরটা সময়ে হয়নি। যখন যা দরকার তা হয় না। আমার কপালটাই হল বেকামা। ঈস্, দু’বছর আগে এ টুইশানিটা পেলে কি সুন্দর গাইনির হেড ডাঃ মতি বৈদাকে দিয়ে আমার বৌয়ের প্রাক্ প্রসব সব ঝামেলা ভালভাবে ঝালিয়ে নিতে পারতাম!”
সনাতনদা আমাকে সঙ্গে নিয়েই ব্যাপারটা ফাইনাল করার জন্য ডাঃ মতি বৈদ্যর বাড়ীতে নিয়ে গেলেন। ডাঃ সাহেব ড্রইং রুমে বসেছিলেন। গাইনির হেড শুনে ভদ্রলোককে চোখাচোখি না দেখে যে রকম বয়সের হবে বলে মনে মনে ভেবে নিয়েছিলাম আসলে সেটার সাথে মিলেনি। ডাক্তার মানুষ বলেই বোধহয় এ রকমটা সম্ভব হয়েছে। বারান্দা থেকে হাত ধরেই আমাকে প্রায় টানতে টানতে নিয়ে সনাতনদা ভদ্রলোকের ঘরে ঢুকে গেলেন। আমাকে চেয়ারে বসতে ইঙ্গিত করে সনাতনদা বললেন – “এই যে ডাঃ বৈদ্য আপনার মাষ্টারকে ধরে নিয়ে এসেছি।” ইত্যবসরে আমি ডাক্তার সাহেবের মুখোমুখি বসলাম। ডাক্তার সাহেব আমার দিকে চেয়ে বললেন – “খুব বাঁচালেন মশাই। আমি ছেলেটিকে নিয়ে খুব ভাবনায় পড়ে গেছলাম।” তৎক্ষণাৎ কি উত্তর দেবো সেটা ভেবে পাইনি। আমার ঠোটে যেন কে আচ্ছা করে স্বচ্ছ টিক্সো এটে দিয়েছে। কোন কথাই বেরোয়নি। আমি একবার সনাতনদার দিকে চাইলাম এবং তারপর আবার গাইনির হেডের দিকে চাইলাম। মনে মনে ভাবলাম দুনিয়ায় কত লোকের যে কতরকম ভাবনা আছে।
আমার মুখদিযে কোন কথা বেরুচ্ছে না দেখে ডাক্তার সাহেব একটু সহজ হয়ে বসলেন, তারপর তিনি ভঙ্গী করে বললেন, – “ছেলেটির বয়স খুবই কম। ছুটিতে এসে মা বাপের কাছে মাস দুয়েক থাকছে। তাই স্বাভাবিক কারণেই পড়াশুনার ব্যাপারে মনটা একটু বেশী উড়ো উড়ো থাকবে। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে ব্র্যাকফাষ্ট করতে করতে ওর সাড়ে আটটা নটা বেজে যায়। সে দিক থেকে আমি চিন্তা করে দেখেছি সন্ধ্যার পরটাতে আসলে ভাল। রোজ রোজ এসে ছেলেটির পাশে বই নিয়ে নাড়া চাড়া আর কি।”
ডাক্তার সাহেবের কথা শুনার ফাঁকে ফাঁকে ওর টেবিলে ছড়ানো বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানীর ছোট ছোট শিশি. টেবলেট, ক্যাপসুল এবং দেওয়ালে টাঙানো ক্যালেণ্ডার খুটিয়ে খুটিয়ে আড়চোখে দেখছিলাম। “রোজ রোজ এসে ছেলেটির পাশে বই নিয়ে নাড়া চাড়া আর কি!” কথাগুলো শুনে আমার পিলে প্রায় চমকে উঠে আর কি! এমনিতেই পড়াতে গিয়ে কোলকাতার ভাষায় শব্দ উচ্চারণ করতে ঠোট জিহ্বা নানা কায়দায় ভাজ করতে হবে। দম ধরে ধরে কথা বলতে হবে। তারপর আবার রোজ রোজ? বলি, লোকটার আক্কেল বলতে কোন জিনিস নেই নাকি? রোজ রোজ বাড়ীতে গিয়ে পড়ানোর ব্যাপারটা সেই কোন যুগেই শেষ হয়ে গেছে। আজকাল কোন ভদ্রলোক তার ছেলেকে বাড়ীতে পড়ানোর জন্য মাষ্টারকে এধরনের আবদার করেন না। ড্রইং রুমে না বসে বাইরে অন্য কোথাও হলে আমি ওকে চার কথা শুনিয়ে দিতাম। ঘটনাটার সাথে আমার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ এবং সনাতনদার মধ্যস্থতা থাকায় বলিষ্ঠ প্রতিবাদ স্বরগ্রামে পৌঁছতে পারেনি।
আমি মিন মিনিয়ে সনাতনদাকে লক্ষ্য করে বললাম – “সনাতনদা আমি রোজ রোজ এসে পড়াতে পারবো না। বড়জোর সপ্তায় চারদিন আসতে পারি।” কথাগুলো বলার সময় আমার ঠোটে হাসির একটু ছোট্ট ঝিলিক মেরে নিলাম। হাসিটুকু মোটেই আন্তরিক নয়। মনে হচ্ছিল আমি যেন তড়িঘড়ি করে কারো কাছ থেকে পোষাকী হাসি ধার করে এনে ক্ষনিকের জন্য ঠোটে সেটে দিয়েছি।
আমার কথা শুনে সনাতনদা কি বলবে ভেবে পেল না। সে চুপ করে রইলো ও কিছু বলছে না দেখে ডাক্তার সাহেব কিছুক্ষণ পর নীরবতা ভঙ্গ করে বলল, “ঠিক আছে আপনার যেমনটি সুবিধা তেমনটিই দেখবেন। আমি বলছিলাম রোজ আসবেন - তা আপনার সুবিধা অসুবিধাটাও দেখতে হবে, কি বলেন?” সনাতনদা অনেকক্ষণ ধরে কোন কথা বলেনি। ডাক্তার সাহেবের কথাটা শেষ হতে না হতেই সে বলল, – “তাত ঠিকই।” তারপর আমার দিকে ফিরে বলল, – “ঠিক আছে, সপ্তাহে চার দিন পড়াস্। তবে ওকে পড়ার চাপ দিয়ে যাস যেন বাড়ীতে বসে ও একা একা পড়ে।” আমি সম্মতি সূচক ঘাড় নাড়াই। ঠিক সে সময়ই মিসেস্ মতি বৈদ্যের আমার হবু ছাত্রকে নিয়ে প্রবেশ। ভদ্রমহিলা বোধ হয় পাশের কোঠাতেই ছিলেন এবং আমাদের কথা-বার্তাও শুনেছেন। ছেলেটি দেখতে স্মার্ট। এমনিতে বড়ঘরের আদুরে হেদেল কুত, কুত কমবয়েসী ছেলেদের দেখলে আমার বদমেজাজ চিড়বিড়িয়ে উঠে। মনে হয় নির্জন জায়গায় নিয়ে আচ্ছা করে পাছায় কেবল চিমটি কাটি। অবশ্য কোনদিন কাটতে পারিনি। ডাক্তার সাহেবের ছেলেটি হেদেল কুতকুত্ নয়। বেশ সপ্রতিভ। ওকে দেখে আমার ভালোই লাগল।
মিসেস বৈদ্য আরাম কেদারায় বসতে বসতে বললেন – “ছাত্র কিন্তু ভীষণ দুষ্টু । পড়াশুনায় কেবল ফাঁকি দেয়। ওকে টেক্ট ফুলি টেকল করতে হবে। “ সামলাও ঠেলা! এখন আবার টেক্ট ফুলি টেক্ল করার বক্তৃতা না ঝাড়লেই হয়। মনে মনে ভাবি এবং মনের কোন বিকৃত ভাব প্রকাশ না করেই হেসে হেসে বলি “ছোট বেলায় দুষ্টুমি না করে বুড়ো হয়ে দুষ্টুমি করবে নাকি?” তারপরই খুব সতর্ক হয়ে ছেলেটিকে মিষ্টি করে জিজ্ঞেস করি – “কি নাম তোমার ?”
– “শৈবাল বৈদ্য। “ – “বাঃ কি সুন্দর তোমার নাম। তা তোমার স্কুলের নাম কি?” – “সেন্ট এডমাণ্ডস, দার্জিলিং। “ – “তুমি কিসে পড়?” – “ক্লাস ফাইভে পড়ি।”
ছেলেটি খুব চটপট আমার প্রশ্নের উত্তর দেয়। ওর কথা শুনে আমার ভারি ভালো লাগে । শুধু আমার নয় সনাতনদারও ভালো লাগে। সাধারণতঃ ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা উঠমুখো লাম্বুস, সনাতনদাকে দেখে দূর থেকেই সরে যায়। সনাতনদাও ছোট ছোট শিশুদেরকে আদর করে কাছে টানেন না। কিন্তু সে শৈবালকে কাছে টেনে নিল এবং আমাকে দেখিয়ে বলল, – “উনি তোমাকে বাড়ীতে পড়াবেন। দেখবে ও কি সুন্দর গল্প বলতে পারে। ইচ্ছা করলে ও তোমাকে অনেক খেলাও শিখিয়ে দিতে পারে। তুমি উনার কাছে খুব মন দিয়ে পড়াশুনা করবে, কেমন?” সনাতনদার কথা শুনে ছেলেটি ঘাড় কাত করে।
আমাদের আলাপ আলোচনার ফাঁক দিয়ে অনেক সময় চলে গেলো। আমি মনে মনে ভাবছি এখন কেটে পড়লেই ভালো। আমি সনাতনদাকে ইঙ্গিত করলাম। সনাতনদারও খুব তাড়া। ওকে হয়ত বা আবার অন্য কোন সমাজ সেবায় অন্য ধান্দায় বেরুতে হবে। আমার ইঙ্গিত পেয়েই সে উঠে পড়লো। সে ডাক্তার সাহেবকে বলল – “আচ্ছা ডাক্তারবাবু, এবার আসি। সবকিছুই মোটামোটি ঠিক হয়ে গেলো। ও এসে কাল থেকে পড়াবে।” ডাক্তারবাবু হাসতে হাসতে বললেন, “ঠিক আছে, ঠিক আছে। “ তারপর আমি আর সনাতনদা মিঃ এবং মিসেস বৈদ্যকে নমস্কার জানিয়ে ড্রয়িং রুম থেকে বেরিয়ে পড়ি।
সন্ধ্যাটা মিলিয়ে আসার সাথে সাথে যখন রাস্তার দুধারের দোকান-পাট গুলোর আলোর ঝলমলানি খেলতে শরু করে তখনই আমি বাড়ী থেকে পা বাড়াই। বাড়ীর গলিটা পার হয়ে পাঁচ ছ’মিনিট বড় রাস্তা হাঁটলেই হাসপাতালের পাশে ডাঃ মতি বৈদ্যর বাড়ী। কয়েকবছর আগে জায়গাটা বেশ নির্জনই ছিল। রাত্রিরবেলা হাসপাতালের কাচের দরজা ভেদ করে বিজলী বাতির আলোগুলি কয়েক-গজ দূরে এসেই মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতো। দূর থেকে নির্জন পরিবেশে স্তিমিত ওয়ার্ডগুলো এক রহস্যময় রূপ নিয়ে জরাজীর্ণ রোগগ্রস্থ ব্যক্তিদেরকে আকড়ে রাখত। মাঝে মাঝে পুরাতন ঝাকড়া তেতুল গাছগুলো থেকে থেমে থেমে পেঁচা অলুক্ষণে ডাক ডেকে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিত। হাসপাতালের উল্টোদিকে কালুমিস্ত্রি, জগাই মুচি ও বীরু পালেদের বহু পুরানো ভাঙ্গা ডেরাগুলোতে সন্ধ্যার অন্ধকারে কেরোসিন বাতির টিম টিম আলো কিছুক্ষণ জ্বলেই ধুতে ধুকতে নিভে যেত। এখন অবশ্য আর তেমনটি নেই। জগাই মুচি, কালু মিস্ত্রি ও বীরু পালেরা কোথায় কোন অজানা জায়গায় চলে গেছে জাঁনা যায়নি। ভাঙ্গা ডেরাগুলো ভেঙ্গে দিয়ে সেরাওগী, বিহানী এবং শেঠেরা এসে জাঁকিয়ে বসেছে। এখন সন্ধ্যার পরই কেবল আলোর ঝলমলানি ওরা বিভিন্ন কলকব্জা এবং পাইপের এন্তার কারবার করছে। অফিসের বড় বাবুদের সাথে ওদের ভীষণ খাতির। আমি বড় রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে বিহানী এবং শেঠেদের দোকানটা পার হয়ে ঠিক সেরাওগীর দোকানের উল্টোদিকের গলিটা দিয়ে ঢুকে যাই।
গলিটার মুখ থেকে মাত্র কয়েক গজ হেঁটেই ডাঃ মতি বৈদ্যর বাড়িটা। জনা কয়েক ভদ্দরলোক গলিটাতেই পায়চারি করছেন। ওদেরকে দেখলেই মনে হয় খুব উঁচুদরের লোক হবেন। সরকারী বাধাধরা মাইনে ছাড়াও ওদের পকেটে মোটা অঙ্কের টাকা গচ্ছিত হবার যাদু আছে। আমি তাদের পাশ কাটিয়ে বাড়ীতে ঢুকে যাই। বাড়িতে ঢুকে বারান্দায় পা দিয়েই আমি আঁতকে উঠি। এ এক অবাক কাণ্ড মাইরী ! জীবনে এরকম অপূর্ব সমাবেশ আমি আর কোন দিন দেখিনি। রাস্তার পাশে কেরোসিন সাগ্রহের জন্য টিন বোতলের আধ ফার্লং লম্বা লাইন দেখেছি। ষ্টেট ফেডের দু কেজি করে চাউল কেনার জন্য শীর্ণকায় মলিন উশৃঙ্খল জনতার ঠেলাঠেলি দেখেছি রেলওয়ে টিকেট কেনার লাইন দেখেছি। কিন্তু পোয়াতি বউদের এরূপ অপূর্ব সমাবেশ আমি আর কখনো দেখিনি। ডাঃ মতি বৈদ্যর বারান্দায় পোয়াতি মেয়েরা পেট উচিয়ে সারি সারি বসে রয়েছে। প্রথম কি করব ভেবে পাই নি। তারপর সামলে নিয়ে একবার চোখ বুলিয়ে নেই। বেশীর ভাগই হাড়গিলে ডিকভিগে পেট সর্বস্ব। দু একটা অবশ্য ব্যতিক্রম। ওরা বোধ হয় পোয়াতি না হওয়ার জ্বালাতেই এসে জুটেছে। তাদের মধ্যেই বারান্দার কোনার বেঞ্চে দশাসই পোয়াতি বউয়ের পাশে একজন ভদ্রলোকও জবুঙবু হয়ে বসে রয়েছেন। বোধহয় ভদ্রমহিলার স্বামীই হবেন। বেচারার কাচুমাচু মুখ দেখে মনে হচ্ছে বউয়ের সব যন্ত্রণা ওকে পেয়ে বসেছে। এ এক অপরূপ দৃশ্য। বন্যেরা বনে সুন্দর পোয়াতিরা মতি বৈদ্যর বারান্দায়। আমি বেশীক্ষণ থাকতে পারলাম না। ওদের সবারই সন্দিগ্ধ দৃষ্টি আমাকে উত্যক্ত করে তুলেছে। আমি সোজা ঘরে ঢুকে যাই। একবার মনে হল চীৎকার দিয়ে ওদেরকে বলে যাই আমার আসার সাথে পোয়াতি বউয়ের আসন্ন যন্ত্রণার কোন যোগাযোগ নেই। আমি এখন সোজা চলে যাবো দোতালায় ডাঃ মতি বৈদ্যর ঠিক মাথার উপরে। কিন্তু আমাকে কিছু না বলেই দোতালায় পা বাড়াতে হল।
শৈবাল আমার জন্য উন্মুখ হয়ে বসে রয়েছে। আমাকে দেখেই সে সাদর অভ্যর্থনা জানায়। আমি ওর টেবিলের সামনের চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসে পড়ি। শৈবালের টেবিলে অঙ্ক, বিজ্ঞান এবং ইংরেজীর বই রয়েছে। আমি সহজভাবেই অঙ্ক বই খানা টেনে প্রথম দিকের কয়েকটা অঙ্ক ওকে কষতে দেই। সে খাতা পেন্সিল নিয়ে ঝটাপট খালি রাস্তায় মোটরগাড়ির স্পীডের মত এক এক করে অঙ্কগুলো কষে ফেলছে। আমি দেখে খুব খুশী হয়ে ওকে বলি, – “বাঃ অঙ্কে দেখছি তোমার চমৎকার হাত। কি সুন্দর এক এক করে কষে ফেলছো।” সে আমার কথা শুনে ফিক করে হেসে দিল এবং তৎক্ষণাৎ তার উপরের মাড়ির সামনের একটা কালো দাঁত আমার নজর টেনে নিল। আমি অবাক হয়ে ওকে জিজ্ঞেস করি – “আরে শৈবাল, তোমার সামনের দাঁতটা এত কালো কেন?” আমার প্রশ্ন শুনে সে একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল। তারপর সে বলল, “দাঁতটা কালো হয়ে যাওয়ায় আমার কোন দোষ নেই। মা যখন প্রেগন্যান্ট ছিল তখন বাবা কি সব টেবলেট খেতে দিয়েছিলেন তাই এরকম হয়েছে।”
সামলাও ঠেলা। এ দেখছি কলির অভিমন্যু। আমি প্রশ্নের উত্তর শুনে এ প্রসঙ্গে আর এগোইনি। আমি বলি, – “তুমি বাকী অঙ্কগুলো কষে নাও।” শৈবাল আবার অঙ্কে মনোনিবেশ করে। আমি গুম মেরে বসে থাকি। কিছুক্ষণ পরই সে আমাকে বলল, – “জানো আংকুল, আমি খুব নার্ভাস হয়ে গেছলাম।” হঠাৎ এ ধরণের কথা শুনে আমি চমকে উঠি। আমি সাথে সাথে জিজ্ঞেস করি, “কেন?” সে বলল, “বাবা যখন আমাকে মাষ্টার মশাইর কথা বলেছিল তখন ভেবেছি কি জানি বাবা কোথাকার কোন বুড়ো ময়লা পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে পান চিবোতে চিবোতে আমার সামনে বসে থাকবে আর শুধু শুধু ধমকাবে। “
– “আমিও ধমকাতে পারি “ – “আপনি পারবেনই না। আপনি খুব ভালো।”
“এইরে! পুচকে বাচ্চাটা আমাকে গ্যাস দিচ্ছে নাকি?” মনে মনে ভাবি। গ্যাস দিলেও এমতাবস্থায় আমি ওকে রূঢ় কিছু বলতে পারছি না। আমি সহজ হয়ে ওকে বলি, – “দেখবে তুমি পড়াশুনা না করলে কি রকম ধমক দেই এবং কান মলি।” ও আমার কথা শুনে একটু মুচকি হাসি হেসে আবার অঙ্ক কষতে শুরু করে দিল। আমি একবার ওর দিকে চাইছি আবার দোতালার জানালা দিয়ে বাইরের রাস্তা দেখছি। রাস্তা দিয়ে যানবাহন এবং লোক চলাচল করছে। সেরাওগীদের দোকানটা পুরোপুরি দেখা যাচ্ছে। সেরাওগীরা কি সুন্দর চটপট কারবারের লাইনটা নিজেদের ইচ্ছেমত সহজ ও সরল করে নেয়। অফিসের বড় বড় বাবু, এস. ডি. ও., এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনীয়াররা ইনিয়ে বিনিয়ে সারা বছর এটা সেটার নানান অর্ডার কায়দা করে ওদের হাতে তুলে দেন। আমার চিন্তা সেরাওগীদেরকে নিয়েই এগিয়ে চলে। হঠাৎ আবার শৈবালের আচমকা প্রশ্নে সেটার যোগসূত্র ছিন্ন হয়ে যায়। শৈবাল তার কলম খাতা সামনে রেখে প্রশ্ন করে – “Uncle, may I ask you questions?” – “Yes“ – “What is your name?” – “Brindaban Das.” – “What is your father’s name?” – “Kashinath Das.” – “Do you play?” – “No” – “Do you go to the cinema?” – “I go occasionally.” এত সব প্রশ্নোত্তরের পর সে একটু থেমে যায়। তারপর সে আবার আমাকে বলে, – “আচ্ছা আংকুল, বলতো আমার প্রথম প্রশ্নটি কি ছিল?” আমি কিছুক্ষণ মনে মনে ভেবে নেই। তারপর বললাম, “তোমার প্রথম প্রশ্ন ছিল – What is your name?” আমার উত্তর শুনে শৈবাল আনন্দে আত্মহারা হয়ে প্রায় লাফিয়ে উঠল। সে জোরে জোরে বলতে আরম্ভ করেছে, “আংকুল ফেইল করেছো, ফেইল করেছো! তুমি মেমোরি টেষ্টে ফেইল করেছো!” আমি প্রথমে বেশ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাই।
সে হাসতে হাসতে বলে – “আমার প্রথম প্রশ্ন ছিল — May I ask you questions? ”
আমি ধরা পড়ে বেওকুফ হয়ে যাই। সেটাকে সামাল দেবার জন্য সশব্দে হো হো করে হাসতে আরম্ভ করি। হাসির সাথে সাথে আমার শরীরের ঝাকুনিতে চেয়ার টেবিল দুই কেপে উঠে। হঠাৎ আমার খেয়াল চাপে যে ডাঃ মতি বৈদ্য আমার নিচে শহরের বিত্তবান লোকের পোয়াতি বউদের এক এক করে অন্ধকার ঘরে নিয়ে পেট টিপেটিপে পরীক্ষা করে দেখছে ওদের ঐতিহ্য মণ্ডিত বংশধারা বজায় রাখতে আগামীতে যারা আসছে, তারা সবল সতেজ ভাবে ঠিক ঠিক আসতে পারবে কি না। ডাঃ মতি বৈদ্য দেখছে সব ঠিক ঠিক আছে কি না। সে দেখছে আর ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছে। ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছে আর টাকাগুলো দেখে নিয়ে ড্রয়ারে ভরছে। আর আমি শালা সিভিক সেন্স, হারিয়ে তার মাথার উপর বসে নুইস্যান্স করেছি- ছিঃ। এসব ভেবেই চুপ হয়ে যাই এবং গম্ভীর হয়ে শৈবালকে পড়াতে মনোনিবেশ করলাম।
প্রায় ঘণ্টা দেড়েক শৈবালের পাশে বসে থেকে ওর পড়াশুনার তদারকি করি। তারপর আগামী দিনের পড়া সমজে দিয়ে আমি দোতালা থেকে আস্তে আস্তে নেমে পড়ি। তখনও ডাঃ মতি বৈদ্য পোয়াতিদেরকে নিয়ে ব্যস্ত। অবশ্য বারান্দার পোয়াতি মেলা প্রায় ফাঁকা হয়ে আসছে। ধীরে ধীরে বারান্দা পার হয়ে গলি থেকে বড় রাস্তায় চলে আসি। চলমান জনসমুদ্রে গা ভাসিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি ভাবি, সনাতন দেশের এ এক আজব সনাতনী মহিমা। ডাঃ মতি বৈদ্যর বারান্দায় পোয়াতিরা আগাম লাইন দিলে হাসপাতালে ঠিক সময়ে মতি বৈদ্যর হাতের কোমল স্পর্শে’ ওদের মুসকিল আসান হয়। এমনিতে আগাম পরিচিতি বিহীন সাধারণ পোয়াতি বউদের হাসপাতালে ভীড় দেখলে মতি বৈদ্যর মাথা বিগড়ে যায়। আমি শালা তিন পয়সার মাষ্টার! ক্লাসে একটি ছেলে দুটোর বেশী তিনটি প্রশ্ন করলে বাঘের বাচ্চার মত ঘোৎ করে ধমক দিয়ে ঠাণ্ডা করে দেই। অথচ ছাত্রের বাড়ীতে’ গিয়ে পড়ানোর সময় ও হাজার ন্যাকামো করলেও মিষ্টি করে কথা বলি। সনাতন দেশের এ আরেক আজব সনাতনী মহিমা আর কি!
-সমকাল, সেপ্টেম্বর, ১৯৭৯ ইং