-আপনি একা একা যেতে পারবেন? -হ্যাঁ নিশ্চয়ই যেতে পারব। মুনীণ গগৈ তাঁর ঘর থেকে বেরিয়ে কিছুদূর অবধি আমার সাথে এল। তারপর আমাকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, – এই যে দেখছেন এলাকাটা, এটার নামই রূপাহি গ্রাম। বড় রাস্তা ধরে কিছুদূর এগিয়ে দক্ষিণ পশ্চিম দিকে বাঁক নিয়ে প্রায় তিন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। তারপর কতগুলো বড় অর্জুন গাছ দেখতে পাবেন এবং সেগুলোর সামান্য আগে বা দিক দিয়ে একটা খাল বয়ে চলেছে। খালের উপর নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোটা পার হয়েই চারদিকে বাঁশঝাড় দিয়ে ঘেরা একটা শণের ছাউনির বাড়ি দেখবেন। সে বাড়িটাই রমিজ শেখের বাড়ি।

আমি এলাকাটাতে নূতন এসেছি। শহরের স্থানীয় বাবুদের সাথে মোটামোটি আলাপ চালাতে পারলেও অনেক শব্দ অজানা রয়ে গেছে। গ্রামের কৃষক জনসাধারণের সাথে অনর্গল তাদের ভাষায় কথা বলতে পারব কিনা একটা সন্দেহ মনের মধ্যে কিছুক্ষণ থেকেই নাড়া দিচ্ছে। অবশ্য এটাও ভেবে নিয়েছি যে এ অবস্থাটা খুব তাড়াতাড়িই কাটিয়ে উঠব। গতরাত্রে মুনীণ গগৈর বাড়িতে আসার পর থেকেই আমি খুব সতর্ক হয়ে ওদের কথাবার্তার ধরণ লক্ষ্য করে আসছি। মুনীণ গগৈর নিকট থেকে বিদায় নিয়ে আমি হাটতে থাকি। রোদ পূব দিকে উঁকি দিয়েছে। শরতের শিশির সিক্ত ঘাসের ডগায় রোদের মিষ্টি কিরণ পড়ে চিক্ চিক্ করছে। রূপাহি গ্রামটা পেরিয়ে আদিগন্ত কেবল সবুজ ধানের ক্ষেত। ঘন নিবিড় শ্যামলিমায় আচ্ছাদিত দূর প্রান্তর। হাটুর উপর অবধি ছ’ইঞ্চি পরিমান শরীরের অংশ মলিন কাপড়ে ঢেকে শক্ত পিটানো দেহগুলো নিয়ে লোকজন কাজে বেরিয়ে পড়েছে। ওরা আমার দিকে তাকাচ্ছে, জানিনা আমার চলাফেরায় কোন অস্বাভাবিক আচরণ আছে কি না। আমি মনে মনে ভাবি, প্রশ্ন করলে সঠিক ভাবেই উত্তর দিয়ে ওদের সন্তুষ্ট করতে পারব। সেদিন গৌহাটিতে স্মরনীয়ায় ভবেশ শর্মার বাড়ীতে চা খেতে খেতে আলাপ আলোচনার সময় ভবেশ তারিফ করে বলেছিল – কমরেড, আপনি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ভাষাটা শিখে নিয়েছেন। এটা খুব ভালো।

নীলাচল পাহাড়ের শীর্ষদেশ থেকে গৌহাটি মহানগরের নৈসর্গিক দৃশ্যাবলী, ডিসপুরে জনতা ভবনের সামনে ফড়ে দালালদের ভিড়, বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর ছাত্রছাত্রীদের উজ্জ্বল কোলাহল, পানবাজার ফেন্সীবাজার প্রভৃতি রাজপথ দিয়ে চলমান জনতার মুখ এবং দু’পাশে নানা রংয়ের ঝলমলানি বাহার দেখে আমি এটা কল্পনা ও করতে পারিনি যে ব্রহ্মপুত্র সেতু পাড়ি দিয়ে মহানগরের অপর প্রান্তে কয়েক মাইলের ভিতরই এমন একটা গ্রাম পেয়ে যাবো। এ সব ভেবে ভেবেই এগিয়ে চলছি। একটি মাঝারি বয়সের চাষীভাই আমার পিছন দিক থেকে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে মহিষকে তাড়া করে সশব্দে তেড়ে আসছে। আমি কিছুটা ভয় পেয়ে যাই। তাড়াতাড়ি রাস্তার কিনারায় সেধিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। ওরা পার হয়ে গেলেই আবার হাটতে থাকি। মহিষটাকে তাড়িয়ে নিয়ে দেখে আমার নেনুমিয়ার কথা মনে পড়ে যায়। নেনু মিয়া তার গাধধা মহিষটাকে বাগে অনতে হুররর হুররর শব্দ করেই শক্ত পাজন দিয়ে সপাং সপাং করে আঘাত করত। নেনু মিয়ার কথা ভাবার সাথে সাথে নরেন গড়ুই, রজনী দাসের চেহারাটা ও আমার মনে ভেসে উঠছে। রাতের অন্ধকারে বীজ- তলায় উবু হয়ে নরেন গড়ুই এক মুঠ দুমুঠ তিনমুঠ করে বরে চারা গাছ দুহাত বোঝাই করে নিত। তারপর শিরদাড়া সটান করে হঠাৎ শরীরটা বাকিয়ে মাটি জড়ানো চারা গাছের গোছার দিকটা দিয়ে হাটুতে আঘাত করত আর তখনই ছেরাত্ ছেরাত্ শব্দ রাতের অন্ধকারে চলমান গ্রাম্য লোককে সচকিত করে বুঝিয়ে দিত পাশে কেহবা বীজতলা থেকে চারা গাছ তুলছে। রজনী দাস সেই ভোরের অন্ধকার থেকে রোদ তেতে উঠা অবধি তার শক্ত হাল নিয়ে কাদামাটিতে হাল ঠেলত। বলদগুলোর হাল টানার সাথে সঙ্গতি রেখে রজনী তার পাগুলো কাদামাটি থেকে টেনে টেনে তুলে নিত। মনে হত তার চওড়া বুকই যেন পাগুলোকে কাদা থেকে টেনে বের করে আনছে।

মহিষটির পেছনে তেড়ে আসা চাষা ভাইটিকে কেন্দ্র করেই পর্যায়ক্রমে আমার মমে ভেসে উঠে বরাকপারের নেনু মিয়া, তরাইর নরেন গড়ুই আর রাতাবাড়ির রজনী দাস। কৃষক মুক্তি আন্দোলনের যে উদ্যম আমাকে দিনের পর দিন অদৃশ্য বন্ধনে আবদ্ধ করে ঠেলে ঠেলে এখান থেকে সেখানে নিয়ে চলছে এবং তারই ফলশ্রুতিতে আমার অবচেতন মনে ভাজে ভাজে যে ধারনা পুঞ্জীভূত হয়েছে সেটা চাউর দিয়ে বলছে রূপাহি গ্রামের চাষাভাই, নেনু মিয়া, নরেন গড়ুই এবং রজনীদাস সবাই এক - সবাই অভিন্ন। ক্ষণিকের জন্য আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল ওরা সবাই বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে বজ্রমুঠি আকাশে উত্তোলন করে এক দুর্ভেদ্য পিরামিড রচনা করছে। ওরা সশব্দে যৌথ কণ্ঠে আওয়াজ দিচ্ছে- ‘আমাদের কোন সীমারেখা নেই। আমরা সবাই এক আমরা অভিন্ন। এই প্রতিক্রিয়া প্রকৃতই সাময়িক ভাবে বেশ কিছুক্ষণের জন্য পারিপার্শ্বিক অবস্থান থেকে আমাকে ছিন্ন করে দেয়। আমি সঠিক ভাবে খেয়াল করতে পারিনি কতটুকু জায়গা পাড়ি দিয়েছি। হঠাৎ ঘুঘু পাখীর একটানা কুর, কুর, কুর……. কুর কুর আওয়াজ শুনে যখন সামনের দিকে তাকাই তখন দেখি বেশ বড় বড় কয়েকটা অর্জুন গাছ বাবড়িওয়ালা বিরাট দৈত্যের মত ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। প্রকাণ্ড গাছের বিস্তৃত ডালপালা গুলো নিশ্চিদ্র ছায়াঘন শীতল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। গাছ গুলোর, নিচে স্যাতে স্যাতে মেটোপথ ধরে কিছুদূর এগিয়ে বা দিকে খালের উপর বাঁশের সাঁকো। আমি সে দিকেই পা বাড়াই। নড় বড়ে বাঁশের সাঁকোটা পার হয়ে একটু এগোতেই বাঁশঝাড় দিয়ে ঘেরা বাড়ি দেখা যাচ্ছে। বাঁশ ঝাড়ের ফাঁক দিয়ে শণের ছাউনির ছোট ঘরখানা ও আমার নজরে পড়ছে। তৎক্ষণাৎ আমার মন স্পষ্ট করে বলছে এটাই রমিজ শেখের বাড়ি।

রমিজ শেখ দাওয়ায় বসে তামাক টানছিল। আমাকে দেখেই সে উঠে পড়ল। নাকে মুখে এক্রাশ ধুয়া ছাড়তে ছাড়তে দাওয়া থেকে নেমে এসে আমাকে বলল- আমি সেই সকাল থেকে বসে বসে আপনার জন্য অপেক্ষা করছি।

– আমি যে আপনার এখানে আসছি খবরটা তাহলে আগেই এসে পৌঁছেছে।

– হ্যাঁ, গেল পরশুদিন ট্যাঙ্গার বাজারে আমাকে মুনীণ গগৈ খবরটা দিয়েছে।

বেশ কিছুদূর একটানা হেটে এসেছি। এখন বসতে পারলে খানিকটা আরাম পাওয়া যাবে। এভেবেই আমি দাওয়ায় উঠে পড়ি। রমিজ শেখ তামাকের একটা পিড়ি টেনে নিয়ে বসে কল্কিটা আমায় হাত বাড়িয়ে এগিয়ে দেয়। অনেকদিন হল তামাক বিড়ি খাইনি। সর্দি কাশিতে জোর করেছে। বিড়ি তামাক খেলেই সেটা তেতে উঠে। রাতে ঘুমোতে কষ্ট হয়। তবুও হাটার ক্লান্তি এসে শরীরটাকে ঘিরে ধরায় তামাক টেনে চাঙ্গা হওয়ার লোভটা সামলে নিতে পারিনি। আমি দুই হাতে মাজখানে কল্কিটা রেখে ওস্তাদ নেশাখোরের মত দম নিতে থাকি।

রমিজ শেখও দাওয়ায় এসে আমার মুখোমুখি বসে। সে আমার তামাক সেবন ভালভাবে নিরীক্ষণ করছে। মুখ থেকে কল্কিটা সরিয়ে নিতেই সে আমাকে বলল কি কমরেড চারদিকের খবরা খবর কি? রমিজ শেখ আমাকে এখন এপ্রশ্ন না করলে ও আমি এ প্রসঙ্গেই আসতাম। কখন কি ভাবে শুরু করব আমাকে মনে মনে আউড়ে নিতে হত। কিন্তু এখন আর আমাকে সেটা করতে হচ্ছে না। কল্কিটা রমিজ শেখের হাতে দিয়ে একটু সহজ হয়ে সরাসরি বলি- জানো কমরেড আজ দুতিন দিন হলো পরমাদের গায়ে আগুন লাগিয়ে কয়েকটা বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে।

-কারা ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে? রমিজ শেখ আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করে! -ওরা দলবদ্ধ ভাবে এসেছিল। ব্যক্তি বিশেষে চিহ্নিত করা যায়নি।
মুনীণ গগৈ বলেছে, ঘটনার কদিন আগ থেকেই গিরিধারী ফুকন আর বারীন চৌধুরীরা গায়ে গায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমনিতে গিরিধারী ফুকন পৌষের প্রথম দিকে একবারই গায়ে আসত। গেল বছর দাদন ঠিকমত উঠেনি বলে সবাইকে খুব শাসিয়ে গেছে। এবার এরই মধ্যে দুতিন বার এসেছে। হঠাৎ যেন লোকটা কি রকম হয়ে গেছে। গায়ের লোকদের দুঃখে ওর দুচোখ টিকড়ে জল বেরিয়ে আসছে। সবাইর নিকট ফিস্ ফিস্ করে বলছে, দেখতে পাচ্ছিস্ না পরমা, রমিজ শেখরা কি রকম শিকড় গেড়ে ফেলেছে। ওদের জন্যইত তোরা সবকিছু হারাতে বসেছিস। এটার কোন হিললে না করতে পারলে তোদের কোন মুক্তি নেই। এসব কথাই বার বার গিরিধারী ফুকন সবাইকে বলছে। তারপর যাবার সময় আবার কানে কানে বলে, তোদের এবার কিন্তু দাদন দিতে হবে না।

রমিজ শেখ মুখ থেকে কল্কিটা সরিয়ে মাটিতে রেখে দেয়। সে আমার কথা শুনে গম্ভীর হয়ে যায়। তার বসানো গাল এবং শক্ত চোয়াল নিয়ে কালো মুখটা আরো কালো হয়ে যায়। চোখের গর্তটা বড় দেখায়। গর্তের মধ্য দিয়েই আরো গভীরে যেন তার চোখ চলে যাচ্ছে। তারপর হঠাৎ সচল হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, জানো কমরেড, তোমার কথা আমাকে - অনেক দূর নিয়ে যাচ্ছে। আনেক দূর। মেঘনার পারে ছোট গ্রাম। ছোট গ্রামে বাঁশঝাড় দিয়ে ঘেরা ছোট বাড়ি। ঘরটা এঘরের মতই শণের ছাউনি দেওয়া। ফি বছর প্রচণ্ড ঝড় তুফানে ঘরটাকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে যেত। ঘরের পূব দিকেই বিশাল বিস্তৃত ধান ক্ষেত। ঝড়তুফানে, আকাল, বন্যা প্রভৃতির সাথে মরীয়া হয়ে লড়াই করে ফসল ফলিয়েছি। ফসল কাটার পর মাড়াইর সময় ঠিক ঠিক প্রতি বছর ইরফান আলী এসে হাজির হত। মটকার কুর্তা আর মাথায় ফেজটুপি দেখেই দূর থেকে বুঝা যেত ইরফান আলী আসছে। ওর বিরাট দেহট। নিয়ে যখন পাশে দাঁড়াত তখন সব শক্তিই নিমেষে বরফের মত শীতল কঠিন হয়ে জমে যেত। মেহেন্দি লাগানো দাড়ি এবং বড় বড় লাল চোখ নিয়ে ওর প্রশস্ত মুখটার দিকে চাইতে ভয় হত। মাড়াইর পর ইরফান আলীর ধান ভাগ করে দিয়ে কানাই, যামিনী, লতিফ আমরা সবাই কিছুটা উচ্ছিষ্ট পেয়ে নির্বাক দাঁড়িয়ে অজানা ভবিষ্যতের ভাবনায় ফ্যাল ফ্যাল করে দূর আকাশের দিকে। তাকিয়ে থাকতাম।

এই ইরফান আলীই একবার গায়ে এসে ভীষণ ভাবে ঘুরাঘুরি করে। ইদ্রিস মিয়া কালুশেখ ওর সাথে সাথে ছায়ার মত লেপটে থাকে। গায়ের জোয়ান লোক গুলোকে জড় করে শলাপরামর্শ করে। রাতারাতি ইরফান আলী আপনজন হয়ে যায়। রাতের অন্ধকারে সভা করে। সভায় সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে - তরা কছেন, দেশটা যদি আমরার লাইগ্যা আইয়া থাকে ত কাফেরের পুলাডিন অখন ও ক্ষেত বাড়ির দখল লইয়া আছে কেরে? প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়েই তার বড় বড় চোখ দুটো চারিদিকে ঘুরিয়ে নেয়। তারপর কেহ সাড়া শব্দ করছে না দেখে সেই আবার বলে,- খোদাতালার ইচ্ছায় হেরার ক্ষেত বাড়িডি তরার অইব। হেরা যদি এমনে না ছাইড়া যায় ত মেঘনাডা লাল কইরা দে। ‘হেরার ক্ষেত বাড়িডি তরার অইব’ কথাটা শুনেই মনটা চন মন করে উঠে। পূবের গ্রামে কি সুন্দর ধানের ক্ষেত যেন সোনার থালা। আঃ কত জমিন কত ধান! পিছনের সারিতে বসে আবছা আবছা ইরফান আলীর মুখটা দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল, আল্লা তার দূতকে পাঠিয়েছেন। আমাদের মুশকিল আসান হবে। ইরফান আলী ঠিক ঠিকই মুক্তিদাতা।

দু’ দিন পর প্রতিদিনের মতই বিকেলের শেষে মেঘনার পশ্চিম পারে টুপ করে লাল সূর্যটা ডুবে গেল। মহিয রঙা জমাকালো অন্ধকার দৌড়ে এসে সারাটা এলাকা ঘিরে ধরছে। ইদ্রিস মিয়া, কালু শেখ আরো শয়ে শয়ে জোয়ান ছেলে নিঃশব্দে চলেছে পুবের গ্রামে। সেখান থেকে শঙ্খ ঘন্টার আওয়াজ ভেসে আসে মেঘনার কল্লোল ভেদ করে সে আওয়াজ তরঙ্গায়িত হয়ে ক্রমে দূর থেকে দূর ভেসে যায়। হঠাং আল্লাহো আকবর চীৎকারে সবকিছু বেসামাল করে দেয়। ইদ্রিস ও কালুশেখরা যামিনীদের গাঁয়ে ঢুকে ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। শিশু, বৃদ্ধ ও রমনীদের আর্ত কান্না মেঘনার দুকুলে থেমে থেমে আছড়ে পড়ে। আগুনের লেলিহান শিখা লক লক করে আকাশের দিকে হাত বাড়ায়। এমনি ভাবে দু তিন দিন পৈশাচিক উন্মত্ততা চলে। কানাই যামিনীদের গায়ে যারা বেঁচেছিল, ভিটে মাটি ছেড়ে পালিয়ে যায়।

পূবের গ্রামটা ফাঁকা হয়ে যাওয়ার পর কিছুদিন মনে মনে অনেক অঙ্ক কষি। শীতের রাতে দেহটাকে কুকড়ে ছেড়া কাথাটায় মুড়ি দিয়ে ভাবি সামনের শীতে বাবুদের মত গরম লেপের নীচে ঘুমাবো। পূবের গ্রামের ফাকা জমির দখলদারিতে আমিও শরিক হব। কেবল ইদ্রিস মিয়া কালুশেখ বাগড়া না দিলেই হয়। এসব ভেবে ভেবে শরীর মন আনন্দে আনচান করে উঠত। কিন্তু এ আনন্দটা বেশি দিন টিকেনি। আল্লারদূত ইরফান আলীর দখল দারিতেই সব চলে যায়। ইরফান আলী আরো সুন্দর ফেজ টুপী মাথায় পড়ে। ও দাড়িতে কেরল মেহেন্দীই দেয় না। চলার সথে সাথে ওর দাড়ি থেকে আতরের গন্ধ বেরিয়ে মম করে। আমরা ধীরে ধীরে নিঃস্ব হতে থাকি। কানাই যামিনীরা চলে যাওয়ায় আরো দুর্বল হয়ে পড়ি। স্বজন হারানো ব্যথা থেকে থেকে বুক থেকে গুমরে উঠে। অবশেষে একদিন সহায় সম্বলহীন হয়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেই।

এসব বলেই রমিজ শেখ একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে। কল্কিটা মাটি থেকে টেনে নিয়ে ঠিক ঠাক করে দম নেয়। কিন্তু না, ধুয়া বেরোয়নি। সে কল্কিটা আবার মাটিতে রেখে দেয় । তারপর সহজ হয়ে বলে, কমরেড, গিরিধারী ফুকনের মুখে আমি ইরফান আলীর মুখের আদলটাই দেখতে পাচ্ছি। ওরা ভীষণ শট। নিজেদের স্বার্থ বজায় রাখতে সব সময়ই মাথায় চক্রান্তের জাল বুনতে থাকে। রমিজ শেখের কথা শুনে আমি বলি, ঠিক তাই।

দাওয়ায় বসে বসে আলাপ আলোচনার ফাঁক দিয়ে সময়টা বড় তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল। রৌদ্র মাঝ আকাশে চরে বসেছে। সূর্য ডুবার সাথে সাথেই মুনীণ গগৈ তার বাড়ি থেকে এখানে আসতে রওয়ানা দেবে। এখানে এসে সে যখন পৌঁছবে তখন সারাটা অঞ্চলই অন্ধকারে ছেয়ে ফেলবে। কাল ভোর হওয়ার আগেই মুনীর্ণ গগৈ রমিজ শেখ এবং আমাকে রওয়ানা দিতে হবে। আমরা যাঁবো মিনিদের ওখানে অনেক দূর। গিরিধারী যে জাল বুনছে সেটা ছিড়ে দিতে হবে। এসব মনে মনে ভেবে আমি দাওয়া থেকে উঠে পড়ি। হঠাৎ বেহিসেবির মত আমার ঠোঁটের ফোকর ফোকর দিয়ে বেরিয়ে আসে- গিরিধারীর কোমর ভেঙ্গে দেবো। আমি রমিজ শেখ এবং মুনীণ গগৈ আছি। রমিজ শেখ আমার কথা শুনে ফেলে। সেও বলে -হ্যাঁ, শালার কোমর ভেঙ্গে দেবো। । আমি আপনি এবং মুনীল গগৈ আছি। আমি রমিজ শেষের দিকে ফিরে তাকাই, তাঁরপর দুজনে হাসতে হাসতে এক সাথে বলি…হ্যাঁ, কোমরটা ঠিক ঠিক ভেঙ্গে দেবো। আমি, আপনি এবং মুনীর্ণ গগৈ আছি।

মিনিরা সেই কবে দেড়শ বছর আগে এসেছে। মিনিরা কাতারে কাতারে ধনীরাম দাদার পিছনে ছুটে এসেছে। উপত্যকার সমতল অঞ্চল যেখানে পাহাড়ের পাদদেশে সীমানা চিহ্নিত করেছে, সেখানে ম্যাকলোর্ড, এণ্ডারসন প্রভৃতি সাদা চামড়ার সাহেবদের পাতানো চা বাগানে নিপুন হাতে দুটি পাতা একটি কুড়ি তুলে আসছে। ম্যাকলোড এন্ডারসনদের অনেকই অবশ্য চলে গেছে। ওদের জায়গায় এখন ভাতিণ্ডা আগারওয়ালা। কিন্তু মিনিরা প্রায় মিনিই রয়ে গেল। চামেলী মেম সাহেবত লাখো মিনিদের একজন।

রাতের অন্ধকারে রমিজ শেখের বাড়িতে বাঁশের মাচানে শুয়ে শুয়ে এসব ভাবনাই আমার মাথায় জট পাকাচ্ছে। কিছুতেই ঘুম আসছে না। আমার পাশে মুনীণ গগৈ নাক ডেকে ঘুমুচ্ছে। ও হয়তবা সারাদিন পরিশ্রম করে এসেছে। দুপুর বেলা আমার মতো বিশ্রাম করতে পারেনি। তবু ও ওর ঘুম দেখে আমার ঈর্ষা হল। আমি জোর করেই ভাবলেশহীন ভাবে পড়ে থাকি। কখন ঘুম এসে আমাকে ও কাবু করে ফেলে বলতে পারিনি।

ভোরবেলা রমিজ শেখের চালাঘর থেকে মুরগী গুলো ভীষণ ভাবে চিৎকার করতে থাকে। ওদের চিৎকারে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। ভোরের আলো তখন ও ঘরে ঢুকেনি। আমি উঠে পড়ি। রমিজ শেখ আমার আগেই উঠেছে। আমি উঠার পর মুনীণ গগৈকে ধাক্কা দিয়ে জাগাবার চেষ্টা করি। সে প্রথমে হকচকিয়ে যায়। তারপর নিজেকে সামলে শরীরটাকে আড়মোড়। দিয়ে মাচান ছেড়ে উঠে পড়ে!

তড়িঘড়ি করেই রমিজ শেখের বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ি। রাস্তাঘাট ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে না। প্রথমে রমিজ শেখ তারপর আমি এবং আমার পিছন পিছন মুনীণ গগৈ । এমনি ভাবে গায়ের সরুপথ ধরে হেটে চলছি। ধীরে ধীরে সরুপথ পার হয়ে বড় রাস্তায় উঠি। ভোরের আলো ফুটে উঠছে। নীল আকাশ । চারিদিকে এক মোহময় নীরবতা বিস্তার করছে। হঠাৎ নিস্তদ্ধতা ভঙ্গ করে এক ঝাক পাখী কিচির মিচির করে অমোদের প্রায় মাথার উপর দিয়ে উড়ে যেতে লাগল। পাখীগুলো আমাদের সামনের দিকেই উড়ে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে ওগুলো কালো বিন্দুতে পরিণত হয়ে দিগন্তের ওপারে বিলীন হয়ে গেল।

আমরা হেটে চলছি। হাটার সাথে সাথে কেবল মিনিদের কথাই মনে ভাসছে। চা বাগান অন্য পরিবেশ। সেখানে মিনি, ঘুটুরা বিলটু এবং মংলাদের অন্য জীবন। তলবের প্রথম দিন রাতেই চোলাই মদ খেয়ে মংলাদের বস্তীতে বেজায় হাল্লা করে। মনের সুখে টুসু গায়। আমি এসব ভাবছি আর হাটছি। হাটা এবং ভাবনার মধ্য দিয়ে একটা ছন্দের অবতারনা হয়। হাটার তালে তালে ছন্দ মিলিয়ে আমার মনে প্রতিধ্বনিত হয় সর্দার বলে কাম কাম; বাবু বলে ধরি আন আর সাহেব বলে লিব পিঠের চাম। আমার মনে মনে গুন গুনায় – চল মিনি আসাম যাবো, দেশে- বড় দুখরে। কিন্তু না, শেষ পর্যন্ত এগুলো আমার মনে খটকা লাগিয়ে দেয়। ছন্দ পতন হয়। ভাবনা থেকে নিজেকে ছিটকে নিয়ে আওয়াজ দিয়ে বলি - কমরেড আমরা মিনিদেরকে আগের পুরানো গান গাইতে দেবো না। চল মিনি আসাম যাবো, দেশে বড় দুখরে বললে মনে হয় আমরা মিনিদেরকে নিয়ে সেই দেড়শ দুশ বছর আগের অবস্থাতেই ঘুরপাক খাচ্ছি। আমার কথাশুনে রমিজ শেখ বলল- জানো কমরেড, গান আমার খুব ভালো লাগে। মেঘনার বুকে মাঝি মল্লার নৌকা দেখলেই আপনা আপনি দরাজ গলায় বেরিয়ে আসত - কোন বা দেশে যাও মাঝি মেঘনার উজান বাইয়া ভাইজানরে কইও নাইওর নিত আইয়া। – এখন অবশ্যি আর সে রকম আসে না। তবুও মাঝে মধ্যে ফসলের সম্ভাবনাময় উজ্জ্বল ফলনের আশাটা যখন মনে ঝিলিক মারে তখন আনমনা হয়ে লাঙ্গল ঠেলতে বেরিয়ে আসে, - তুমি গেলে কি আসিবে মোর মাহুত বন্ধুরে।

বাঃ কি চমৎকার! রমিজ শেখ পরিবেশের সাথে একাত্ম হয়ে সংস্কৃতির বিকাশ কি ভাবে ঘটাচ্ছে সে নিজেও টের পাচ্ছে না। আমি একথা মনে মনে ভেবে কিছু বলতে যাবো ঠিক তখনই মুনীণ গগৈ তার মুখ খুলল। সে বলল,-জানো কমরেড গেলো রাত্রে আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি। স্বপ্নের কথা বলতেই রমিজ শেখ উৎসুক হয়ে ওকে বলল, মজার স্বপ্ন আমার খুব ভালো লাগে। বল, তুমি কি দেখেছ। আমরা ও শুনে’ শুনে মজা পাব।

মুনীণ গগৈ কিছুটা গম্ভীর ‘হয়ে গেল। তারপর সে বলল, - না, তেমন মজার কিছু নয়। ‘গেলো রাত্তিরে আমি “আই অহম” কে দেখেছি। “আই অহম” আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। মুখখানা বড় করুণ। সারা মুখে বিষাদের ছায়া ফুটে উঠেছে। “আই অহম” আমাকে বলল, - মুনীণ, গিরিধারীরা আগুন লাগাচ্ছে। এ আগুনে সব ছারখার হয়ে যাব। তারপর আমাকে বলল,-তোরা পারিস্ না ওদেরকে সায়েস্তা করতে? আমি অধীর আগ্রহে “আই অহম” এর কথা শুনছি আর ঠিক তখনই তুমি আমাকে ধাক্কা দিলে। আমি হকচকিয়ে উঠে পড়ি।

মুনীণ গগৈর কথা শুনতে শুনতে আমিও ভাব রাজ্যে চলে যাই। আই অহমে’র দগদগে ক্ষতবিক্ষত রূপটা জ্বালা ধরিয়ে দেয়। স্বগতোক্তির মতই আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে ‘আই অহম’ তুমি সুন্দর হবে- আমরা পারব। রমিজ শেখ আমার পাশাপাশিই হাটছে। সে বলল হ্যাঁ কম- রেড, আমরা পারব। আমি, আপনি এবং মুনীণ গগৈ আছি। সাথে সাথে মুনীণ গগৈ বলল, - হ্যাঁ হ্যাঁ আমরা পারব কমরেড। আমি, আপনি এবং রমিজ শেখ আছি! তারপর আমি, রমিজ শেখ এবং মুনীণ গগৈ তিনজন পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জোর দিয়ে এক সাথে বলি- হ্যাঁ হ্যাঁ পারব, আমরা আছি।

একথা বলেই জোর কদমে পা ফেলি। ততক্ষণে সূর্য পূব আকাশে উকি দিয়েছে। তার সোনালী আভা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

সমকাল, অক্টোবর ‘৮৫ ইং