এন্টারিকটিকা কিংবা ট্রপিক অফ কেনসারের পার্শ্ববর্তী যে কোন অঞ্চলের অধিবাসীই হোক না কেন সে মৃত্যুর মুখোমুখি হলে মরীয়া হয়ে বাঁচার চেষ্টা করবেই করবে। সেটা প্রতিরোধ করেই হোক কিংবা পালিয়েই হোক। তীক্ষ্ণ বল্লম কিংবা চকচকে ধারালো তলোয়ার নিয়ে যদি একটি লোক পাশবিক উন্মত্ততায় আমার উপর ঝাপিয়ে পড়ে ঠিক সেই মূহুর্তে আমি নিশ্চয়ই পৃথিবী অন্যকোন জায়গায় নির্মমভাবে নিহতদের জন্যে দুঃখ প্রকাশে উদ্বেল হয়ে পড়ব না। এমতাবস্থায় বোধ হয় কেউই শোকে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ন্যুব্জ হয় না। অবশ্যি যারা নিরাপদ দূরত্বে অক্ষত থাকে, আঘাত হুমড়ি খেয়ে যাদের ঝাপটে ধরেনি তারাই ভাববার অবকাশ পায়। শোক দুঃখ সারা বুক জুড়ে আসন পেতে বসে। নির্মম হত্যাকাণ্ডে যারা ধরাধাম থেকে চলে যায় তাদের জন্যে মর্মবেদনায় হৃদপিণ্ড চেপে ধরে।
অন্যের দুঃখে মানুষকে বিচলিত হয়ে পড়তে দেখলেই কমল এরকম ভাবে। কদিন হল সে বদলী হয়ে এখানে এসেছে। এখানে আসার পর থেকেই উষ্ণ কোলাহল পূর্ণ বাজারের মুখে দাঁড়িয়ে প্রায় রোজই বিকেলের অবসর সময়টা কাটিয়ে নেয়। বাজারের বড় রাস্তার উল্টোদিকে পাঁচতালার বিরাট অতিকায় মিল সবগুলো মেশিন সচল করে লকর জকর আওয়াজ দিয়ে শিল্প এলাকার নৈক্য কুলীন আচরণ জাহির করে। এই মিলের দেওয়ালেই নানা রকম পোষ্টার লেপটে রয়েছে। একটি পোষ্টারের লিখন কমলের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। অনেকদিন আগেই বোধহয় সেটে দেওয়া হয়েছিল। রোদ বৃষ্টিতে জৌলুস নষ্ট হয়ে গেছে, লেখাগুলো অস্পষ্ট। তবুও “নেলির গণহত্যা” “বর্বর” প্রভৃতি লেখাগুলো বিশেষ মনোনিবেশে বুঝা যায়। কমল সেগুলো পড়ে মনে মনে বলল, - মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের শোকবার্তা এখানকার মানুষের হৃদয়কেও ব্যাকুল করেছে। ওরা মর্ম বেদনায় পীড়িত হয়েছে। অথচ আমি শালা নেলি, গহপুর, শিলপাথারের শিহরণ জাগানো নির্মম পৈশাচিক হত্যালীলায় যারা শিকার হলো তাদের জন্যে দুঃখ করার একটু ও ফুরসং পেলাম না। কমল ঠিকঠিকই দুঃখ কিংবা শোক প্রকাশ করতে পারেনি। সে সময়টা এমন নয় যে সে সঠিক ভাবে মৃত্যুর মুখোমুখি ছিল। আবার সে যে খুব নিরাপদ দূরত্বে ছিল তাও নয়। আসু এবং গণসংগ্রাম পরিষদ পরিচালিত বিদেশী বিতাড়ণ আন্দোলনের ম্যারাথন কর্মসূচী বাস্তবায়িত করতে যারা সচেষ্ট তাদের দ্বারাই কমল পরিবৃত ছিল।
আসু গণসংগ্রাম পরিষদের যে কোন ডাকে সাড়া দিতে ওকে তৈরী থাকতে হত। সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠে কি করবে কি না করবে সেটা কমল ভাবতে যাচ্ছে আর ঠিক তখনই কন্টাকটর খগেন বরুয়ার ছোট ভাই নগেন কয়েকটা ছেলেকে নিয়ে জোট বেঁধে ওর কোয়ার্টারে হাজির। বাইরের কোঠায় কমলকে বসা অবস্থায় দেখে এক গাল হেসে বলে, কমলদা, বৌদিকে আজ রান্না করতে বারণ করবেন। মোকালমোয়াতে পুলিশের গুলিতে নিহত শহীদ তরুণ ডেকার শ্রাদ্ধ হবে। নবীন বরদলৈ রোডের পাশে পার্কে সব ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঘরের সবাইকে নিয়ে আপনি যাবেন। -হ্যাঁ, যাবো। একটা কচি তাজা প্রাণ বুকের রক্ত ঢেলে নিজেকে নিঃশেষ করে দিল দেশের জন্যে। তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে যাবো না? নিশ্চয়ই যাবো। কমল গম্ভীর এবং আবেগ প্রবণ হয়ে প্রত্যুত্তরে নগেনকে বলে। কমলের কথা শুনে নগেন দলবল সহ চলে যায়।
পার্কের মধ্যে সামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। বিপুল সমারোহে যাগ যজ্ঞাদি অনুষ্ঠান হয়েছে। চারদিক থেকে আশে পাশের অলিগলি ভেঙ্গে আবাল বৃদ্ধ বণিতা পার্কে এসে উপচে পড়ছে। সবাই শহীদ তরুণ ডেকার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে। কমল বৌ ছেলেকে নিয়ে যোগ দেয়। সে সামিয়ানার পাশে নিমিত শহীদ বেদীতে স্তূপীকৃত পুষ্পমালার সামনে খালিপায়ে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধাবনত মস্তকে এক গুচ্ছ ফুল ছুড়ে দেয়। কমল যে জনতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয় বা সে যে জনতারই সামিল সেটা বুঝাবার জন্যেই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিল। কিন্তু শহীদ বেদীতে ফুল ছুড়ে দেওয়ার সময় ঠিক ঠিকই শ্রদ্ধায় মস্তক অবনত হয়ে পড়ে। সে শহীদ বেদীর পাশ থেকে ফিরে আসার সময় মনে মনে বলে – শহীদ তরুণ ডেকা তুমি সব ভালোমানুষেরই শ্রদ্ধা কেড়ে নেবে। তোমার মন অসৎ ভেকধারী দেশপ্রেমিক কিংবা কপট রাজনীতিবিদদের মত পাপাচারে ক্লিষ্ট নয়, আই অহমের প্রতি নিখাদ ভালোবাসার প্রেরণাই ছিল প্রধান। শহীদ তরুণ ডেকার প্রতি শ্রদ্ধার্থ নিবেদন ছাড়া কমল আরো অনেক শহীদ স্মৃতি তর্পন করেছে।
অন্যান্য মেয়েছেলেদের সাথে দলবদ্ধভাবে কমল বৌকে অফিসে পিকেটিং করতে পাঠিয়েছে। কমলের বৌ আঁচল দিয়ে শক্ত করে কোমর বেঁধে বজ্রমুঠি আকাশে তুলে শ্লোগান দিয়েছে। আন্দোলন তহবিলে যখন তখন অর্থদান করেছে তাছাড়া জনতা কারফু, লাগাতার বন্ধ এবং কর্মবিরতিতেও অংশ গ্রহণ ছিল বাধ্যতামূলক। প্রথম প্রথম এগুলো খুব একটা খারাপ লাগেনি। কিন্তু শেষদিকে ব্যাপারটা গোলমেলে ঠেকে। অফিস কামাইয়ের জন্যে সরকার যখন পে-কাট করে দেয় তখন সামাল দিতে কমলের প্রায় লালসূতো বেরিয়ে আসছিল। বেতনের দিন ক্যাশ কাউন্টারে বেতন দেয়া হচ্ছিল। সহকর্মী বিমল শইকিয়া বেতন নিচ্ছিল। পাশে কমল ও দাঁড়িয়ে। পে কাট হওয়ায় সবাইর এবার বেতনের অঙ্কটা কম। বিমল শইকিয়া টাকাটা নিয়ে হাত পালটে দু’তিনবার গুনে নেয়। তারপর সে কাউন্টারের পাশেই দাঁড়িয়ে জোরে জোরে বলে,- এভাবে পে কাট হলে চলবে কি করে? অফিস কামাই করে এখন কোমরে গামছা বেঁধে হাওয়া খাবো নাকি? এ আন্দোলনের কোন মানে হয়? বিমল শইকিয়ার কথায় যেন যাদুকরের চমক আছে। নিমেষে প্রত্যেকের একজোড়া করে চোখের দৃষ্টি ওর মুখে কেন্দ্রীভূত হয়। ক্যাশিয়ার ক্যাশ কাউন্টারে টাকা গুনা বন্ধ করে দেয়। সারা ঘর ব্যাপী হঠাৎ এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে আসে।
কর্মচারী পরিষদের শাখা সম্পাদক অতুল ভরালী ঘরের কোনে বসে অন্যদের সাথে আলাপ করছিল। সে ধীরে ধীরে উঠে আসে। বিমল শইকিয়ার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে ‘স্বেচ্ছাসেবীরা দেশের জন্যে বুকের রক্ত উজাড় করে দিচ্ছে। ক্লাস ওয়ান বাঘা অফিসার সুরেন কলিতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদগ্ধ পণ্ডিত পাণ্ডবেশ্বর নেওগ এবং ডাক্তার গিরীণ চৌধুরী প্রভৃতি লোকের বিপন্ন জাতির প্রশ্নে সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ছে। গরমেন্টের নাকের ডগায় দুহাতে যুগল বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ উচিয়ে ধরে আইনের নিকুচি করছে। চাকুরী চলে যায় চলে যাক। এমতাবস্থায় আমাদের পে কাট এমন কিই বা ক্ষতি! দেশ কিংবা জাতির জন্যে এটা কোন ক্ষতিই নয়।’ প্রায় বক্তৃতার ঢং এ কথাগুলো শেষ করে অতুল ভরালী পরিতৃপ্তির হাসি হাসে। ওর বক্তব্যে ঘরের আবহাওয়া হালকা হয়ে আসে। পে-কাটের জন্যে বিমল শইকিয়ার মত কমলেরও প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। কিন্তু অতুল ভরালীর ভাষণ শুনার পর সে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেনি। অব্যক্ত চাপা ক্ষোভ মনের গভীরে পাক দিয়ে থেকে থেকে অস্বস্তিকর ঢেকুর তুলছিল। আন্দোলনকারীদের মনে মনে খারাপ পেলেও আচার আচরণে প্রকাশ করত না। ভেতরে চিন চিন ব্যথায় আচ্ছন্ন হয়ে ও বাইরে আনন্দ প্রকাশের বিশেষ অভিনয় ক্ষমতা সে বাঁচার তাগিদে ধীরে ধীরে আয়ত্ব করে নিয়েছিল। কিন্তু এতসব করেও ঝামেলার শেষ নেই।
নির্বাচন আসন্ন। সাংবিধানিক সংকট দূর করতে নির্বাচন করতে হবে। লোহিত, বুড়িদিহং, সুবন সিরি এবং পাগলাদিয়ার উত্তাল তরঙ্গ মালার করাল গ্রাস থেকে দু’কুল বাঁচাতে নির্বাচন করতেই হবে। আর এই নির্বাচনই জমাট সর্বনাশা আবহাওয়ার বাঁধ ভেঙ্গে দেয়। লণ্ডভণ্ডের মাতাল নৃত্য শুরু হয়ে যায়। কাজিরাঙ্গায় দাঁতল গণ্ডারগুলো যেন ভীষণ ভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। সি আর পি, মিলিটারীর বুটের আওয়াজ দ্রুত শ্মশানের স্তব্ধতা চারদিকে ছড়িয়ে দেয়। আসু গণসংগ্রাম পরিষদের নির্বাচন বয়কট ঘোষণার মোকাবিলায় সরকার কঠোর এবং নির্মম।
কমল ভেবে পায় না কি করবে। বেতারে ঘন ঘন আসাম নির্বাচন সম্পর্কে খবরাখবর প্রচার করছে। সে রেডিওর নবটা ঘুরিয়ে দেয়। রেডিও চালু করতেই ভেসে আসে, ‘…… নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে সরকার নিরাপত্তার ব্যবস্থা সুদৃঢ় করেছে। নির্বাচনে কর্মরত যে কোন গেজেটেড অফিসারের দুর্ঘটনা জনিত মৃত্যতে এক লক্ষ টাকা ক্ষতি পূরণ দেওয়া হবে……..’। কমল রেডিও বন্ধ করে দেয়। রেডিওর প্রচার যত বেশি শুনে ততই সে ভয়ে কুকড়ে যায়। নিজেকে শামুকের মত গুটিয়ে নেয়। সে মনে মনে বলে, ‘না, আসু গণসংগ্রাম পরিষদ যে গণ্ডী এঁকে দিয়েছে সেটা কিছুতেই ভেদ করা যাবে না। গণ্ডীর বাইরে এক পা বাড়ালেই রাক্ষুসে রাবণ এসে ঘাপটি মেরে ধরবে।’ কমল ঘরে বসে একা একা এসব ভাবছে আর ঠিক তখনই কলিং বেল বেজে ওঠে। সে দরজার সামনে এগিয়ে যায়। পর্দা সরিয়ে স্বচ্ছ কাঁচের দরজা দিয়ে দেখে নেয় কে এসেছে। কলিং বেল টিপে খগেন বরুয়া বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল। খগেন বরুয়াকে দেখে কমল আস্বস্ত হয়। ডিভিশনাল একাউন্টেন্ট পদে উন্নীত হয়ে এখানে আসার পর থেকেই কনট্রাকটার খগেন বরুয়াকে দেখে আসছে। অল্পদিনের মধ্যেই কাজ কর্মের সুবাদে ওর সাথে মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। একই গাঁজার কল্কেতে মিলেমিশে সুখটান দিয়েছে। ভিতরে আসতে কমল দরজা খুলে দেয়। খগেন বরুয়া ঘরে ঢুকে চেয়ার টেনে বসে। সে মনে প্রাণে আন্দোলনপন্থী। আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে কমলকে বলে, আসু গণসংগ্রাম পরিষদ এবারের ইলেকশন এলোমেলো করে দিচ্ছে। এ সুযোগে অনেকেই লুটেপুটে নিবে। তা আপনি ইলেকশন ডিউটিতে কোথায় যাচ্ছেন?
– আমরা ইলেকশান ডিউটি দেবো না।
– দেবেন না কেন? ইলেকশানে ঢালাও খরচ হচ্ছে। যে ইলেকশান ডিউটি দেবে তাকেই পুরো এক মাসের বেতন একষ্টা দেবে।
– যত খুশী খরচ করুক বা যারা দিচ্ছে দিক। আমরা ডিউটি দেবো না। এ ব্যাপারে আমাদের কর্মচারী পরিষদ ঠিকই করেছে। তুমি যখন জোর করে ইলেকশান চাপাচ্ছ সেটার দায় দায়িত্ব তোমার। দিল্লী থেকে আনকোরা আই এ এস নিয়ে এসে করাও বা বিহারীদের দিয়েই করাও আমরা সেটাতে নেই। আমরা ডিউটি একসেপ্ট করবো না, আর ভোেট দেওয়ার ত প্রশ্নই ওঠে না।
কমলের কথা শুনে খগেন বরুয়া খুশী হয়। কিন্তু সে উচ্ছসিত হয়ে সেটা প্রকাশ করেনি। চাপা হাসিতে ওর তামাটে ফুলা মুখটা আর ফুলে ওঠে। চোখ দুটো ছোট হয়ে পিট পিট করে। মুখে চাপা হাসি রেখেই সে বলে - ইলেকশান ডিউটি একসেপ্ট না করার মধ্যে ও বিরাট ঝুকি রয়েছে। নিশুতি রাতে মিলিটারী বাড়িতে এসে বলবে ডিউটি একসেপ্ট করো নতুবা সোজা লাল ঘরে চলো। তখন কি করবেন? -সে যখন আসবে তখন দেখা যাবে। কমল হালকা ভাবে উত্তর দেয়। আইন অমান্য করায় যে কোন মূহুর্তে মিলিটারী সি আর পি বাড়ি ঘেরাও দিয়ে এরেষ্ট করে নিয়ে যেতে পারে। লোকমুখের এ রকম ফিসফিস কথা বাতাস বয়ে বেড়ায়। ইতিমধ্যেই অনেকে নানা ফন্দি ফিকির করে অফিস কোয়ার্টার ছেড়ে গাঁয়ের বাড়িতে গা ঢাকা দিয়েছে। খগেন বরুয়া ও দু’তিন দিনের মধ্যে চলে যাবে। যাবার আগে সে কমলকে একটু ঝালিয়ে নেয়।
নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিনটি এগিয়ে আসার সাথে সাথে বাতাস ভারী হয়ে আসছিল। দেহ মন সতেজ করা নির্মল বাতাস ক্রমশ কঠিন পাথরের মত শক্ত হয়ে বুক চেপে ধরে। কমলের আশে পাশে কোয়ার্টারের দরজা জানালা বন্ধ। পাঁচশ গজ ব্যাসার্দ্ধের মধ্যে সব প্রতিবেশীই ঘরছাড়া। কেবল কমল ঘরবন্দী। এক অদ্ভুত নির্জনতায় সারাটা অঞ্চল খা খা করে। সন্ধ্যা মিলিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে নৈঃশব্দ আঁধার ঘিরে ফেলে। কেবল ভয় আর ভয়। খাটের উপর বৌ ছেলে নিয়ে জটলা বেঁধে বসে কমল ভাবে মাঝ সমুদ্রে ওদের জাহাজ ডুবে গেছে। অন্যান্য যাত্রীদের কোন পাত্তা নেই। সীমাহীন দৃষ্টিতে অথৈ জল। কুল পারাপারের জন্য ভব সাগরে যার পর নাই মরীয়া হয়ে সাতাঁর কাটছে। এভাবে একপক্ষকাল ব্যাপী সাঁতার কাটার পর ঝড়ের শেষে একদিন ভোরের সূর্যালোকে বেরিয়ে এসে মুক্ত বাতাস বুক ভরে টেনে নেয়। কমল বিগত কয়েক দশকে এরকম ঘটনার আরো মুখোমুখি হয়েছে। ফি বছর বর্ষায় বানপাণিতে দুকুল ভাসিয়ে নেওয়া কিংবা কালবৈশাখীর তাণ্ডব নৃত্যে গাছপালা সমূলে উৎপাটিত করে দেওয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতই ব্যাপারটা এক দশক পর পর ব্রহ্মপুত্রের বুক চিরে বেরিয়ে আসে।
ষাটের দশকের শুরুতে কমল খোদামকুলাই উচ্চ ইংরাজী বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা পরই কটন কলেজে ভর্তি হয়। কলেজ পাশের ছাত্রাবাসে প্রথম কদিন নিঃসঙ্গই ছিল। পরে অবিশ্য বন্ধু জুটে যায়। কলেজের পাঠ এবং শহর জীবনের নূতন নূতন অভিজ্ঞতা ওর মনে আনন্দের জোয়ার বইয়ে দেয়। ছুটির শেষে সহপাঠি বীরেন মোহন্ত, সুদীপ গোঁহাই, সুরেন দত্ত এবং আরো অনেকে জোট বেঁধে চলে যেত এদিক সেদিক। বিকেলের পড়ন্ত রোদে কাচারী ঘাটে বসে ওরা কতদিন সুদূর বিস্তৃত ব্রহ্মপুত্রের উজ্জ্বল শুভ্র ফেশিল জলরাশির খেলা দেখেছে ঠিক নেই। রূপোলী চিক চিক ঢেউয়ের সাথে সাথে ওদের মন ও নেচে উঠত। জীবনের এই সন্ধিক্ষণে সবকিছুই মুক্ত, বন্ধনহীন। ওরা উন্মুক্ত আকাশের নীচে পাশাপাশি বসে সুন্দর ভবিষ্যতের রঙীন আশার জাল বুনে যেত। এভাবে আন্তরিকতার বন্ধন যখন সবেমাত্র দৃঢ় হতে থাকে ঠিক তখনই বঙালখেদা আন্দোলনের টটুকিটাকি বিক্ষিপ্ত ঘটনার খবর নিজেদের মধ্যে কানাগুসায়’ অন্তর গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। মুক্ত এবং স্বাধীন চলাফেরায় ছেদ পড়ে। গুমোট হাওয়া দ্রুত ঘণীভূত হয়ে নিরাপত্তার অভাব জানান দিয়ে যায়।
গুরুেশ্বরে পুলিশের গুলিতে ছাত্র নিহত হওয়ার পর অবস্থা বেসামাল হয়ে পড়ে। বীভৎস পৈশাবিক উন্মাদনা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সত্যি সত্যিই কমলের অস্তিত্ব বিপন্ন। সে উদভ্রান্ত, দিশেহারা। চুপি চুপি হষ্টেল থেকে পালিয়ে যেতে সুদীপ গোঁহাই ওকে সাহায্য করে। কমল রাতের অন্ধকারে গৌহাটি, প্লাটফর্মে দাঁড়ানো গাড়িতে চেপে বসে। তারপর অনেক কথা। ঝড়ে বিধ্বস্ত ঘরগুলো মেরামত করা হয়। ঘরহারা লোকগুলো আবার মাথা গুজার ঠাই করে নেয়। শিকড় নাড়িয়ে দেওয়া দুমড়ানো গাছগুলো ভাঙ্গা কাণ্ডেই শাখা প্রশাখা মেলে। কমলের এক বছর নষ্ট হলেও লেগে পড়ে স্নাতকের ছাড়পত্র নিয়ে শেষ অবধি একটা সরকারী চাকুরী জুড়িয়ে নেয়। ধীরে ধীরে অজানা সন্দেহ, অহেতুক ভয় এবং মানসিক বিদ্বেষ মনের গভীরে থিতিয়ে যায়। কিন্তু সত্তরের দশকে আবার হাওয়া গরম হয়। বিশ্ব বিদ্যালয়ের ভাষার মাধ্যম নিয়ে রেষারেষি বিদ্বেষ, খুনোখুনির খবর ছড়িয়ে পড়ে। কমল অবশ্য তখন এসব চাক্ষুষ দেখেনি। সে বিপন্ন বোধ করেনি। তবে হ্যাঁ, খামের ছোট্ট চিঠির কয়েকটা লাইন ওকে মুষড়ে দিয়েছিল। ছোট ভাই খোদামকুলাই থেকে লিখেছিল,-দাদা তোর কথামত সব ঠিক ঠাক করে এগ্রিকালচার কলেজে ভর্তি হতে জোড়হাট গিয়েছিলাম। কলেজে যাওয়ার পথে কিছু ছেলেরা ইচ্ছাকৃত ভাবে ঝামেলা বাঁধায়। আমি ভর্তি হতে পারিনি। তোর মত আমার ও একটা বছর নষ্ট হল। কমল চিঠিটা পড়ে দুঃখে একা একা নিজের ভাগ্যকেই দোষারূপ করছিল। কমল ছোটবেলা থেকে দেখে আসছে ওদের বাড়িতে একটা কদম গাছ লকলকিয়ে বেড়ে উঠেছিল। সেটা বড় হওয়ার পর সহজভাবে মাথা উচু করে দাঁড়াতে পারেনি। প্রতি বছর ঝড়ের ঝাপটা ওটা নেড়া করে দিয়ে যেত, সে ঝড় যে দিক থেকেই আসে না কেন। কমলের মনে হয় ওর অবস্থা নেড়া কদম গাছটার মতই।
সাতচল্লিশের গণভোটে সুরমাভ্যালীর সুশোভন গুপ্তের পৈতৃক বাড়িটা অন্যদেশে চলে যায়। নিজস্ব কোন হাত পা না থাকায় বাড়িটা একই জায়গায় থেকে যায়। বাধ্য হয়ে সুশোভন গুপ্ত পরিজন নিয়ে ব্রহ্মপুত্র ভ্যালীর নিজদেশে সরে আসে। কমল বাবার হাত ধরে আসে। এরপর থেকেই খোদামকুলাই চা বাগানের বাড়িটাই ওদের বাড়ি। শৈশবে খোদামকুলাইর আকাশ বাতাস কমলের পৃথিবী। খোদামকুলাইর উত্তরে আকাশের নীচে দিগন্তে মিশে গেছে গভীর কালো পাহাড়। দক্ষিণ পূর্ব আর পশ্চিমে ছড়িয়ে আছে শিরিষের ছায়া সিক্ত চা গাছের সবুজ গালিচা। ঋতু বদলের সাথে পালা করে খোদামকুলাইর গায়ে মনোহর রূপের ছোয়া লেগে যায়। খোদাককুলাইর নৈসর্গিক পরিমণ্ডল কমলের নিকট স্বর্গের চেয়ে ও প্রিয়। যেখানেই থাকুক খোদামকুলাইর নাম শুনা মাত্র নষ্টালজিয়া মাথায় ছাড়া দিয়ে ওকে আষ্টে পৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলে। কিন্তু বার বার আন্দোলনের ঢেউ আঘাত করে ওকে দূরে সরিয়ে দেয়। বিগত তিন দশকে বঙ্গালখেদা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষার মাধ্যম কিংবা বিদেশী বিতাড়ণ আন্দোলন যে দৃষ্টিকোণ থেকেই পরিচালিত হোক সেটার আঘাত কমলকে বিপর্যস্ত করছে। কমলের মনে হয় সে বাড়ির কদম গাছটার মতই দাঁড়িয়ে আছে। বার বার ঝড় ঝাপটা আঘাত করে দুমড়ে মুচড়ে মাথা নেড়া করে দিচ্ছে। শুধু টিকে থাকার জন্যে মরীয়া হয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে। ওর পা দুটো খোদামকুলাইর মাটির গভীরে শিকড় গাড়তে আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
আমাদের সমকাল ৬ষ্ঠ বর্ষ ২য়- ৩য় সংখ্যা