এই প্রতিবেদনটি একনাথ রানাডের জীবন ও তাঁর কাজকে কেন্দ্র করে লেখা, যিনি স্বামী বিবেকানন্দের একজন যোগ্য ভাবশিষ্য হিসেবে পরিচিত। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রচারক থেকে শুরু করে বিবেকানন্দ শিলা স্মারক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং অবশেষে বিবেকানন্দ কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তাঁর দীর্ঘ কর্মময় জীবনের বিভিন্ন দিক এখানে তুলে ধরা হয়েছে।

লেখক একনাথ রানাডের জন্ম, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘে তাঁর যোগদান এবং গান্ধী-হত্যার পর সংঘের উপর নিষেধাজ্ঞা জারির মতো সংকটময় মুহূর্তে তাঁর ভূমিকার বর্ণনা দিয়েছেন। প্রতিবেদনে কন্যাকুমারীর বিবেকানন্দ শিলা স্মারক নির্মাণে তাঁর অসামান্য অবদানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাধা অতিক্রম করে সফল হয়েছিলেন।

সবশেষে, বিবেকানন্দ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কীভাবে তিনি স্বামীজির সেবা ও ত্যাগের আদর্শকে বাস্তব রূপ দিয়েছেন, তার একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এই লেখাটি একনাথ রানাডের সাংগঠনিক দক্ষতা এবং দেশমাতৃকার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগের এক প্রামাণ্য দলিল।

সাময়িক প্রসঙ্গ, শিলচর, ২৬শে ডিসেম্বর ২০১৪

সম্পূর্ণ নথিটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন (PDF)

View Extracted Text
একনাথ রানাডে : স্বামীজির এক যোগ্য ভাবশিষ্য
।। অপরেশ ভৌমিক।।


রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের অখিল ভারতীয় কার্যকর্তা, বিবেকানন্দ শিলা স্মারক সমিতির সাংগঠনিক 
সম্পাদক এবং বিবেকানন্দ কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা একনাথ রানাডের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন 
প্রান্তে নানাবিধ অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছে।

গত ৯ নভেম্বর দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে আয়োজিত একনায় রানাডের জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন অনুষ্ঠানে 
মুখ্য অতিথি ছিলেন তাঁরই অনুগামী এক সময়ের সংঘ প্রচারক, যিনি বর্তমানে ভাবতের প্রধানমন্ত্রী 
নরেন্দ্র মোদি। মুখ্য অতিথির ভাষণে নরেন্দ্র মোদি একনাথ রানাডের বিশেষ গুণাবলি উল্লেখ করে 
তাঁর প্রতি যে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন, তা সংবাদমাধ্যমে দেশবাসীর উদ্দেশে প্রচারিত হয়েছে।

মহারাষ্ট্রের অমরাবতী জেলার টিমতলায় ১৯১৪ সালের ১৯ নভেম্বর একনাথ রানাডের জন্ম হয়। 
তদানীন্তন ব্রিটিশ শাসনাধীন বিদর্ভ রেলওয়ের কর্মী রামকৃষ্ণ রাও বিনায়ক রানাডের অষ্টম সন্তান 
একনাথ রানাডে। ছোটবেলা সাত বছর বয়স থেকেই অগ্রজ বাবুব রাও-র সঙ্গে নাগপুরে বসবাস করতেন।

১৯২৫ সালের বিজয়া দশমীর দিন দেশপ্রেমিক ডাঃ কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার সমভাবাপন্ন কিছু 
ব্যক্তিকে নিয়ে তাঁর নিজস্ব বাসভবনেই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রতিষ্ঠা করেন। এর এক বছর পর 
অর্থাৎ ১৯২৬ সাল থেকেই ১২ বছরের বালক একনাথ রানাডে নাগপুরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের 
দৈনিক শাখাতে যাতায়াত শুরু করেন। সংঘ কাজের মধ্য দিয়ে কিশোর একনাথ রানাডের দেশমাতৃকার 
সেবা করার প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পায় এবং নাগপুর মহালস্থিত নিই ইংলিশ মডেল স্কুল থেকে 
১৯৩৬ সালে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা উত্তীর্ণের পর সংঘের প্রচারক হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। 
কিন্তু ডাঃ হেভগেওয়ার তাঁকে স্নাতক অবধি পড়াশুনো চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

হেডগেওয়ারের মতানুসারেই একনাথ রানাডে নাগপুর হিসলপ কলেজে ভর্তি হন। কলেজের পড়াশুনো 
এবং সংঘের দৈনন্দিন শাখা ও কার্যক্রমে নিয়মিত যোগদান যুগপৎ চালিয়ে যান। দর্শনশাস্ত্রে অনার্স 
নিয়ে বিএ পাস করার পর বাড়ি ছেতে সর্বক্ষণের সংঘ প্রচারক হন।

প্রথম প্রচার হিসেবে মহাকোশল প্রান্তের কার্যভার গ্রহণ করেন। সংঘের নিবিষে মধ্য ভাবতের জব্বলপুর, 
ইন্দোর, উজ্জয়িনী, হোসাঙ্গবাদ, ছত্তিশগড় প্রভৃতি অঞ্চল মহাকোশল প্রান্তের অধীন ছিল। তখনকার 
দিনে এসব এলাকায় ব্রিটিশ সরকার 'গুণ্ডা আইন' প্রচলন করেছিল। যে সব ব্রিটিশবিরোধী 
স্বদেশপ্রেমী 'যুবক পড়াশুনো কিংবা কেনও চাকরিতে নিযুক্ত থাকত না, তাদের এই আইনের বলে 
গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠিয়ে দিত। নিজের সুরক্ষার জন্য একনাংজি সাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন 
পড়ার জন্য ভর্তি হন। আইন কলেজে ভর্তি হলেও সংঘের কাজে ব্যস্ত থাকায় কলেজে নিয়মিত উপস্থিত 
থেকে ক্লাস করতে পারেননি তবে মেধার দৌলতে পরীক্ষার আগে কিছুদিন পড়াশুনো করে এলএলবি 
ফাইনাল পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ কখনও চায়নি ভারত বিভাজিত হয়ে স্বাধীনতা লাভ করুক। অখণ্ড ভাবত 
গঠনের লক্ষ্যে সংঘ তার স্বকীয়তা বজায় রেখে সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। 
সংঘের এই ভাবনা কংগ্রেস এবং আরও অনেক রাজনৈতিক দলেরই পছন্দ নয়। তাই ১৯৪৭ সালের 
১৫ আগস্ট স্বাধীন ভাবতের শাসনভার গ্রহণ করাব কিছুদিন পরই সংঘবিরোধী রাজনৈতিক নেতাবা 
স্বয়ংসেবক সংঘের কার্যকলাপকে বেআইনি ঘোষণা করার জন্য সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন।

১৯৪৮ -র ৩০ জানুয়ারি মহাত্মা গান্ধী আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর 
সংঘবিরোধীরা প্রচার চালায়, গান্ধীহত্যায় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ জড়িত। তখন স্বয়ংসেবকদের উপর 
আসে নানা নির্যাতন। কিছু কিছু ক্ষিপ্ত জনতা স্বয়ংসেবকদের আক্রমণ কবে। সংঘ কার্যালয় ভাঙচুর করে। 
সবকার সংঘের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। সব সংঘচালক মাধব সদাশিব রাও গোলওয়ালকবকে 
গ্রেফতার করে জেলবন্দি বাখা হয়। সংঘের সেই সঙ্কটময় দিনগুলোতে প্রচারক একনাথ বানাডে খুবই 
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অসীম সাহস এবং বুদ্ধিবলে সংঘের নেতৃত্ব দেন। সংঘের উপর 
নিষেধাজ্ঞা জারির বিরুদ্ধে সংঘকর্মীদের সত্যাগ্রহ আবস্ত হয়। সংঘকর্মীরা সত্যাগ্রহে যোগদান করে 
দলে দলে গ্রেফতার বরণ করেন। সমগ্র দেশে আশি হাজারের অধিক স্বয়ংসেবক গ্রেফতার বরণ করেন। 
১৯৪৮ সালের ৯ ডিসেম্বর সত্যাগ্রহ আবস্ত হয়ে ১৯৪৯ সালের ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত চলতে থাকে। 
গোপনে ঘুরে ঘুরে এই সত্যাগ্রহে নেতৃত্ব প্রদানকারী পুরোধা ব্যক্তি ছিলেন একনাথ বানাডে।

সত্যাগ্রহ বন্ধ করা এবং বাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের উপর সরকারের নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে 
তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের সঙ্গে বারকয়েক একনাথ বানাডের সাক্ষাৎ এবং 
কথাবার্তা হয়। প্রথমে একনাথ বানাডের সঙ্গে মন্ত্রীর ব্যবহার কড় হলেও পরবর্তীতে বানাডের কর্মপদ্ধতি 
ও কথাবার্তায় সর্দর্শর বল্লভভাই প্যাটেল সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং একসময় বলেন, 
'লোকে আমাকে লৌহমানব বলে আর আমি কিন্তু একনাথ রানাডের মধ্যে ইস্পাত মানবকে দেখতে পাই।'

সে যা হোক, গান্ধীহত্যায় কোনওভাবেই বাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের জড়িত থাকার প্রমাণ না পেয়ে 
সরকার সর সংঘচালক মাধব রাও সদাশিব ব'ও গোলওয়ালকব ও অন্যান্য জেলবন্দি সংঘকর্মীকে 
মুক্তি দেহ এবং ১৯৪৯ সালের ১২ জুলাই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের উপর জাবি করা নিষেধাজ্ঞা 
প্রত্যাহার করে নেয়।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর সংঘ আবার নিজস্ব শক্তিতে পূর্ণ উনমে কাজ শুরু করে। তখন 
একনাথ রানাডে পূর্বাঞ্চলের প্রচারক হয়ে কলকাতায় চলে যান। সে-সময় দেশ বিভাজনের ফলে 
পূর্ববঙ্গ থেকে কাতারে কাতারে লোক কলকাতায় উদ্বাস্তু হয়ে আসেন। উদ্বাস্তু হয়ে আসা দুর্গতদের 
সাহায্যের উদ্দেশ্যে একনাথজির প্রচেষ্টায় 'বাস্তহারা সহায়তা সমিতি' গঠন করা হয়। সমিতি 
উদ্বাস্তুদের কেবল শিবিবে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা কবেই নিজের কাজ সীমাবদ্ধ রাখেনি। শিবিরে 
আশ্রিতদের অনেকেরই ভবিষ্যৎ জীবনে নতুন জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ব্যাপারেও সহায়তা করে।

বিবেকানন্দের আদর্শই ছিল তাঁর সব কাজের প্রেরণার উৎস। অবেকানবকানন্দের আদর্শে নতুন 
প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করে দেশকে বৈভবশা রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনে গিয়ে তাতন্ত্র করে স্বামী বিবেকানন্দ 
রচনাসামগ্রী পাঠ করেন। সে-সব রচনাবলি থেকে স্বামী বিবেকানন্দের বাণী চয়ন করে ইংরেজিতে 
একটি সংকলন (Swami Vivekananda's Rousing call to Hindu Nation) তৈরি করেন। 
স্বামী বিবেকানন্দের জন্মশতবর্ষে সেই সংকলনটি প্রকাশ করেন।

পূর্বাঞ্চলে সংঘের দায়িত্ব নির্বাহের পাশাপাশি এটা ছিল স্বামীজির প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন। 
স্বামী বিবেকানন্দের জন্মশতবর্ষে কন্যাকুমারীর পার্শ্বস্থ সমুদ্রে যে, শিলাখণ্ডে স্বামী বিবেকানন্দ ধ্যান করেছিলেন, 
সেখানে তাঁর মূর্তি স্থাপনের জন্য তামিলনাড়ু প্রান্তের সংঘ প্রচারক দত্তজি দিদলকর উদ্যোগ নেন এতে 
সেখানকার হিন্দু জনগণ উৎসাহিত হয়ে একটি কমিটিও গঠন করেন। কিন্তু কন্যাকুমারীর খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী 
লোকেরা শিলাখণ্ডটিকে সেন্ট জেভিয়াবের শিলা উল্লেখ করে স্বামী বিবেকানন্দের মূর্তি স্থাপনের বিরোধিতা 
করেন। একদিন রাতের অন্ধকারে শিলাখণ্ডে পৌঁছে সেখানে ক্রস চিহ্ন দিয়ে আসে। স্থানীয় প্রশাসন 
শিলাখণ্ডের উপর ক্রস চিহ্ন অপসারণ কিংবা তাদের বিরুদ্ধে কোনও আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়নি। 
ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই বিবেকানন্দ অনুবাগীরা ক্ষুব্ধ হন। বিবেকানন্দ শিলা স্মারক সমিতির স্থানীয় 
কর্মীদের সহায়তায় কিছু সাহসী স্বয়ংসেবক শিলাখণ্ডে পৌঁছে ক্রস চিহ্ন নিশ্চিহ্ন করে রাতারাতি স্মাবত 
বেটি তৈরি করেন। সেই দিনটি ছিল ১৭ জানুয়ারি, ১৯৬৩। ঘটনাক্রমে ওই দিনটিতেই কন্যাকুমারী 
থেকে বহুদূরে অবস্থিত কলকাতায় একনাথ রানাডে সংকলিত Rousing call to Hindu Nation 
বইটি প্রকাশিত হয়।

বিবেকানন্দ শিলা স্মারক সমিতির স্থানীয় কর্মকর্তাদের সহায়তায় সংঘকর্মীরা ১৭ জানুয়ারি ১৯৬৩ তে 
শিলাখণ্ডে যে বেদিটি স্থাপন করেছিলেন সেটা কিছু দুষ্কৃতকর্থী ১৬ মে ১৯৬৩ সালে ভেঙে 
সাগরে ফেলে দেয়। এ ঘটনায় কন্যাকুমারীর সামগ্রিক অবস্থার অবনতি ঘটে। আমজনতার বিক্ষোভের 
ফলে প্রশাসন শিলাখণ্ডটিকে বিবেকানন্দ শিলা বলে স্বীকৃতি দিলেও সেখানে বিবেকানন্দের মূর্তি স্থাপনের 
অনুমতি প্রদানে অসম্মতি প্রকাশ কবে। এ অবস্থায় বিবেকানন্দ শিলা স্মারক সমিতির কিছু নেতৃস্থানীয় 
ব্যক্তি নাগপুরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সর-সংঘচালক মাধব সদাশিব রাও গোলওয়ালকরের সঙ্গে 
সাক্ষাৎ করেন এবং শিলাখণ্ডে বিবেকানন্দের মূর্তি স্থাপনের জন্য ওই সমিতিকে সঠিকভাবে পরিচালনা 
করে এগিয়ে নিতে সংঘের একজন দক্ষ কর্মকর্তাকে নিয়োগের জন্য আর্জি পেশ করেন।

ঘটনাচক্রে কলকাতায় সংঘ সঙ্গে একনাথ রানাডের আলাপ হয়। দায়িত্ব নিয়ে সমিতিতে যোগদানের প্রশ্নে 
আলাপ-আলোচনার পর রানাডে সোজা কলকাতায় গিয়ে কেড়ে সোজা মিশনের অধ্যক্ষ মাধবানন্দ 
মহাবাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বিবেকানন্দ শিলা স্মারক সমিতির দায়িত্বভার গ্রহণ করে জন্মশতবর্ষ 
উপলক্ষে শিলাখণ্ডে বিবেকানন্দের মূর্তি স্থাপনের কথা মহারাজজিকে বলেন। সবকিছু শুনে অধ্যক্ষ 
মহাবাজ বলেন, 'এ কাজে শ্রীরামকৃষ্ণ তোমাকে আশীর্বাদ করবেন, স্বামী বিবেকানন্দ তোমাকে আশীর্বাদ 
করবেন এবং তোমার উপর আমারও আশীর্বাদ রইল।'

বামকৃষ্ণ মিশন ও মঠের অধ্যক্ষ মাধবানন্দ মহারাজের আশীর্বাদ নিয়ে রানাডে চেন্নাই চলে যান। 
সেখানে সারা ভারত বিবেকানন্দের শিলা সমিতিতে নতুনভাবে সাংগঠনিক পদ সৃষ্টি করা হয়। 
১১ আগস্ট ১৯৬৩ সালে একনাথ রানাডে সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। 
দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমেই তিনি শিলাখণ্ডে বিবেকানন্দের মূর্তি স্থাপনের বিষয় নিয়ে 
মুখ্যমন্ত্রী ভক্তবৎসলমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। মুখ্যমন্ত্রী শিলাখণ্ডে মূর্তি স্থাপনে অসম্মতি প্রকাশ করেন 
এবং বলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হুমায়ুন কবীরের অভিমত যে, শিলাখণ্ডে কোনও মূর্তি স্থাপন করলে 
সেখানকার নৈসর্গিক সৌন্দর্য ক্ষুণ্ণ হবে। রান'ডে তখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হুমায়ুন কবীবের সঙ্গে সাক্ষাতের 
আবেদন করেন কিন্তু তা ফলপ্রসূ হয়নি। মন্ত্রী কবীরের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ না পেয়ে তিনি 
অন্য পথ ধবে অগ্রসর হন।

হুমায়ুন কবীব কলকাতা লোকসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত সাংসদ। একনাথ বানাডে কলকাতায় চলে যান। 
সেখানে বামকৃষ্ণ মিশনের সহায়তায় একে একে কলকাতায় প্রভাবশালী বিদ্বজ্জন, দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক 
এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে দেখা করেন। অবশেষে সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করেন। সাংবাদিক সম্মেলনে 
বিবেকানন্দ শিলাখণ্ডে মূর্তি স্থাপনের প্রশ্নে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হুমায়ুন কবীরের মন্তব্য তুলে ধরেন। পরদিন 
কলকাতার পত্রপত্রিকায় এ খবর ব্যাপকহাবে প্রকাশিত হয়।

স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম শতবার্ষিকীতে তাঁব স্মৃতিরক্ষার কাজে কলকাতার সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী 
হুমায়ুন কবীবের ভূমিকা পত্রিকায় পাঠ করে কলকাতাবাসী ক্ষুব্ধ হন। এ খবর জানতে পেরে 
হুমায়ুন কবীর শীঘ্রই তাঁর সঙ্গে একনাথ রানাডের সাক্ষাতের ব্যবস্থা কবেন এবং আলাপ আলোচনান্তে 
হুমায়ুন কবীর বলেন, তিনি কখনওই স্বামী বিবেকানন্দ শিলাখণ্ডে স্বামীজির মূর্তি স্থাপনের বিবোধী নন। 
তিনি রানাডেকে অনুরোধ করে বলেন, একথা যেন সব সাংবাদিকের কাছে প্রচারের জন্য পৌঁছে দেন। 
বিবেকানন্দ শিলা স্মারক সমিতির কন্যাকুমারীর বিবেকানন্দ শিলাখণ্ডে মূর্তি স্থাপনের জন্য মূলত রাজ্য 
সরকারের অনুমতিই প্রধান। তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী প্রধান ংল তামিলনার মুথায়ী বিষয়ক মন্ত্রীর মন্তব্যকে 
সামনে এনে অনুমতি প্রদানে বিরত থাকার বিষয়টিকে সর্বভারতীয় পর্যায়ে নিয়ে কেন্দ্র সরকারকে চাপ 
সৃষ্টির জন্য রানাডে মনোনিবেশ করেন।

তিনি দিল্লি গিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করেন। লালবাহাদুর রানাডের 
বক্তব্য শুনে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং শিলাখণ্ডে যথাসময়ে স্বামী বিবেকানন্দের মূর্তি স্থাপন হবেই বলে 
রানাডেকে ধৈর্য সহকাবে ধীরে ধীবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। রানাডে শাস্ত্রীজিব মত নিয়েই 
স্মারকলিপি তৈরি করে মোট ৩২৩ জন সাংসদের স্বাক্ষর গ্রহণ করে সবচেয়ে বরিষ্ঠ সাংসদ এমএস 
অ্যানিকে দিয়ে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর হাতে সঁপে দেন। তখন সংসদ অধিবেশনে মোট ৩২৩ জন 
সাংসদই দিল্লিতে উপস্থিত ছিলেন।

বিবেকানন্দ শিলাখণ্ডে স্বামী বিবেকানন্দের মূর্তি স্থাপনের দাবিতে দলমত নির্বিশেষে ৩২৩ জন সাংসদের 
স্বাক্ষরিত স্মারকলিপি পাওয়ার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর মন্তব্য ছিল- 
'অতি শীঘ্রই মুখ্যমন্ত্রী ভক্তবৎসলমের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হবে, আমি আলাপ করব, কারণ এ 
ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাজ্য সরকাবের উপরই বর্তায়।'

বিবেকানন্দ শিলা স্মারক সমিতির আহ্বানে দেশের সব প্রদেশের সাংসদের সমর্থন এবং সাংবাদিকদের 
প্রশ্নে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর মন্তব্য প্রকাশিত হওযার পর ভক্তবৎসলম সাংবাদিকদের বলেন, 
জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে বিবেকানন্দ শিলাখণ্ডে বিবেকানন্দের মূর্তি স্থাপনে রাজ্য সরকার সম্মত এবং 
১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৪ সালে মুখ্যমন্ত্রী ভক্তবৎসলম একনাথ রানাডেকে ডেকে মণ্ডপ সহ বিবেকানন্দের 
মূর্তি স্থাপনের অনুমতি প্রদান করেন।

প্রথমে কন্যাকুমারীর স্থানীয় খ্রিস্টানদের বিরোধিতা, তারপর সরকার থেকে অনুমতিপ্রাপ্তির প্রতিবন্ধকতা 
দূর করার পর একনাথ বানাডে ভাবতের সব প্রান্তের জনগণকে বিবেকানন্দ শিলা স্মারক তৈরির কাজে 
জড়িত করার লক্ষ্যে কার্যসূচি প্রণয়ন করেন। তিনি প্রতিটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে 
বিবেকানন্দ শিলায় স্মারক তৈরির জন্য অর্থ আদায় করতে সমর্থ হন। প্রত্যেক রাজ্যের স্কুল-কলেজের 
ছাত্রছাত্রী, সরকাবি কর্মচারী এবং জনতার কাছে কূপন বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহের ব্যবৃস্থা করেন। 
এসব সম্ভব হয়েছিল তাঁর অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতার জন্যই। অবশ্য বিবেকানন্দ শিলাব, 
স্মারক তৈরিতে সে-সময় তিনি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের কর্মী ও জাতীয়তাবাদী স্বদেশপ্রেমীদের 
সহায়তা লাভ করেছিলেন। টানা সাত বছর একনাগাড়ে একনিষ্ঠভাবে কাজ পরিচালনা করে অনুপম 
বিবেকানন্দ শিলা স্মারক তৈরি করেন, যা নাকি ভারতীয় জনজীবনের এক মহাসঙ্গম।

১৯৭০ সালের ২ ডিসেম্বর বিবেকানন্দ শিলা স্মারকের উদ্বোধন হয়। সেদিনটি ছিল ভারতীয় ক্যালেন্ডার 
অনুসারে ভাদ্রপদ শুক্লা দ্বিতীয়। ১৮৯৩ সালের ভাদ্রপদ শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতেই স্বামী বিবেকানন্দ 
শিকাগো ধর্ম মহাসম্মেলনে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। বিবেকানন্দ শিলা স্মারকের উদ্বোধনী শুরু হয়ে 
দু'মাসব্যাপী চলে। আর দু'মাস সময়সীমায় পর্যায়ক্রমে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অধ্যক্ষ 
স্বামী বীরেশ্বরানন্দ, ভারতের রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি, তামিলনাড়ু মুখ্যমন্ত্রী করুণানিধি, ভারতের প্রধানমন্ত্রী 
ইন্দিরা গান্ধী, সংঘের গুরুজি এবং দেশ-বিদেশের আরও অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি যোগদান করেছিলেন।

বিবেকানন্দ শিলা স্মারক তৈরির পর রাষ্ট্রীয় স্বংয়সেবক সংঘের কিছু কবিতায় কর্তা চাইছিলেন 
একলাখ বানাডে আগের দায়িত্ব নিয়ে আবার স্বয়ংসেবক সংঘের কাজে যোগদান করুন। কিন্তু একনাথজি 
পুরনো দায়িত্ব নিয়ে সংঘের কাজে যোগদান করেননি। বিবেকানন্দ শিলা স্মারককে ভিত্তি করেই 
দেশমাতৃকার সেবাকাজ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে কন্যাকুমারীতেই থেকে যান।

১৯৭২ সালের ৭ জানুয়ারি স্বামী বিবেকানন্দের ১০৮তম জন্মতিথিতে বিবেকানন্দ কেন্দ্র আনুষ্ঠানিকভাবে 
স্থাপন করেন। তাঁর জীবদ্দশায় দশ বছর সময় অর্থাৎ ১২ আগস্ট ১৯৮২ সালে তাঁর দেহান্তের আগে 
পর্যন্ত বিবেকানন্দ কেন্দ্রকে কেন্দ্র করেই আঞ্চলিক প্রয়োজনানুসাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সেবা প্রকল্প 
চালু করেন। তাঁর মৃত্যুর পরই তাঁরই ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ বিবেকানন্দ কেন্দ্রেব কাজে নিয়োজিত উত্তরসূরিরা 
প্রত্যন্ত গ্রাম ও বনাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা, অচিরাচরিত শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ সহ আরও নানা সেবা 
প্রকল্পের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। স্বামী বিবেকানন্দের সার্ধশত জন্মবর্ষে 'বিজয় হি বিজয়' কার্যসূচির 
মাধ্যমে যুবসম্প্রদায় তথা ভাবতের আপামর জনসাধারণকে স্বামীজির আদর্শে উদ্বুক করার নিরলস 
প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। বর্তমানে উত্তর-পূর্ব ভারতের সীমান্ত প্রদেশ অকণাচলের জনজাতিদের মধ্যে 
শিক্ষা প্রসারের জন্য ত্রিশটি বিবেকানন্দ কেন্দ্র বিদ্যালয় চালু রেখে রেখেছেন এবং অসমে রয়েছে ষোলটি।

পরিশেষে এখানে উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, স্বামী বিবেকানন্দ অনুগ রাষ্ট্র-কমি একনাথ রানাডে 
আমাদের প্রান্তিক শহর শিলচরে এসেছিলেন। ষাটের দশকের শুরুতে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের কর্মকর্তা 
হিসেবে সংঘের কাজ পরিদর্শনে এসেছেন।

পরবর্তীতে বিবেকানন্দ শিলা স্মারক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে থাকাকালীন এসেছিলেন। 
বিবেকানন্দ শিলায় স্মারক তৈবিব ব্যাপারে বামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের মহারাজ স্বামী বীরেশ্ববানন্দের সঙ্গে 
একনাথজির সাক্ষাতের বিশেষ প্রয়োজন হয়।' বীরেশ্বরানন্দজি তখন মিশনের কাজে শিলচব ছিলেন। 
তাই একনাথজিও শিলচরে এসেছিলেন তাঁর পরামর্শ নেওয়ার জন্য।

অখিল ভাবতীয় কর্মকর্তা হিসেবে সংঘের কাজ পরিদর্শনে শিলচরে এসে সে-সময়ের যে-সব স্থানীয় 
স্বয়ংসেবকের সঙ্গে সম্পর্ক হয়েছিল তাদের অনেকেই আজ আর নেই। যে দু'-চারজন আছেন তারাও 
জীবনের শেষ প্রান্তে উপনীত। কৈশোরে একনাথজির সাহচর্যের স্মৃতি আজও ওদের বিশেষ প্রেবণা দেয়।

(তথ্যসূত্র একনাথজি-নিবেদিতা রঘুনাথ ভিদে বিবেকানন্দ কেন্দ্র প্রকাশন)