এই প্রতিবেদনটি “বিশ্বমঙ্গল গো-গ্রাম যাত্রা” নিয়ে, যা গোরক্ষা এবং গ্রামোন্নয়নের জন্য একটি দেশব্যাপী আন্দোলন। ২৮ সেপ্টেম্বর কুরুক্ষেত্র থেকে এই যাত্রা শুরু হয়ে ১৭ জানুয়ারি নাগপুরে শেষ হওয়ার কথা। এর একটি অংশ হিসেবে বরাক উপত্যকায় ১৫ ডিসেম্বর থেকে একটি উপযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে ভারতীয় সংস্কৃতিতে গরুর গুরুত্ব এবং বর্তমান সময়ে কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজের সংকট তুলে ধরা হয়েছে। ঋষি অরবিন্দ, মদনমোহন মালব্য, ডঃ রাজেন্দ্রপ্রসাদ এবং মহাত্মা গান্ধীর মতো ব্যক্তিত্বদের উদ্ধৃতি দিয়ে গোরক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
এই যাত্রার প্রধান উদ্যোক্তা কর্ণাটকের শ্রীরামচন্দ্রপুর মঠের স্বামী রাঘবেশ্বর ভারতী। যাত্রার লক্ষ্য হল গোরক্ষা, গ্রামোন্নয়ন, এবং পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি করা। এই যাত্রার মাধ্যমে গোরক্ষার জন্য একটি পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের দাবিও জানানো হয়েছে।
- অপরেশ ভৌমিক
- সাময়িক প্রসঙ্গ, শিলচর, ১২ ই ডিসেম্বর ২০০৯
সম্পূর্ণ নথিটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন (PDF)
View Extracted Text
গো-রক্ষায় বিশ্বমঙ্গল গো-গ্রাম যাত্রা
চলতি বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে মহাসমারোহে সূচনা হয়েছে বিশ্বমঙ্গল গো-গ্রাম যাত্রা। কুরুক্ষেত্র থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা দেশের বিভিন্ন রাজ্যের পথ-পরিক্রমা করছে। আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি নাগপুরে হবে যাত্রার সমাপ্তি। বরাক উপত্যকায় এরই পথ ধরে ১৫ ডিসেম্বর শিলকুড়ি বরমবাবার মন্দির থেকে সূচনা হয়েছে গো-গ্রাম উপযাত্রার, যা বরাকের বিভিন্ন গ্রাম পরিক্রমার মধ্য দিয়ে ১০ জানুয়ারি শিলচরের ভুবনেশ্বর সাধঠাকুর আশ্রমে এসে সমাপ্ত হবে। এই বিশ্বমঙ্গল গো-গ্রাম যাত্রার আয়োজন কেন? কোন লক্ষ্যপথে হাঁটছে এই যাত্রা, জানতেই আজকের আলোকপাত। লিখছেন অপরেশ ভৌমিক।
অতি প্রাচীনকাল থেকেই ভারতের মানুষ গরুর প্রতি শ্রদ্ধালীল। ঋকবেদে গরুকে মাতা বলে সম্বোধন করা হয়েছে। আমাদের ধর্মগ্রন্থে জয়, বিবাহ, মৃত্যু সম্পর্কিত সকল সামাজিক অনুষ্ঠানেই গো-দানকে সব থেকে উঁচু স্থান দেওয়া হয়েছে। আবার অথর্ববেদে উল্লেখ রয়েছে যে, ‘তেজো রাষ্ট্রসা নিহস্তি ন ধীরো জায়তেবৃষা’। অর্থাৎ গরুর প্রতি অত্যাচার হলে সেই রাষ্ট্রের তেজ দ্রুতগতিতে লুপ্ত হয়ে যায়, সেখানে বীর জন্মগ্রহণ করে না। তাই সুপ্রাচীনকাল থেকেই সমাজজীবনে ভারতবর্ষে গো-রক্ষা ও গো-সেবাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আমাদের পুরনো ইতিহাসের পাতায় দৃষ্টি নিবন্ধ করলে দেখতে পাই বীরযোদ্ধা ও সুনিপুণ প্রশাসক মহারাজা রঘু, শ্রীকৃষ্ণ, ছত্রপতি শিবাজি, বিজয়নগরের রাজাগণ এবং বীর শিখযোদ্ধা গুরু গোবিন্দ সিং প্রভৃতির শাসনকালে গো-রক্ষায় ওদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
ব্রিটিশ শাসনাধীন পরাধীন ভারতে, দেশকে শৃঙ্খলমুক্ত করার আন্দোলনে জড়িত ভারতের বিভিন্ন মনীষী ও রাজনীতিবিদরাও স্বাধীনোত্তরপর্বে কৃষিভিত্তিক সুন্দর সমাজ গঠনের উদ্দেশ্যে গো রক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে তাদের সুচিন্তিত মত ব্যক্ত করেছেন। ঋষি অরবিন্দ বলেছেন, ‘গরু অর্থ, কাম, ধর্ম ও মোক্ষ প্রদানকারী, তাই তাকে কামধেনু বলা হয়। এর অনিষ্ট চিন্তাও পরাজয়ের কারণ হয়।’
পণ্ডিত মদনমোহন মালব্য বলেছেন, ‘গো-জাতিকে রক্ষা করলে আমরাও সুরক্ষিত থাকব। গ্রামের প্রতি পরিবারের এবং প্রত্যেক পাড়ায় গো-শালা থাকা উচিত। এর সঙ্গে থাকা দরকার বিস্তৃত গোচারণ ভূমি।’ ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ডাঃ রাজেন্দ্রপ্রসাদ বলেছেন, ‘যন্ত্রের দ্বারা (ট্রাক্টর ইত্যাদি) আমরা কৃষিতে কিছুটা অগ্রসর হতে পারি, কিন্তু কৃষিতে ষাঁড় বলদের প্রয়োজন চিরদিন থাকবে। গাই বলদের সাহায্য ছাড়া আমাদের চলবে না।’
ভূদান যজ্ঞ আন্দোলনের পথিকৃৎ আচার্য বিনোবাভাবে বলেছেন, ‘হিন্দুস্থান কৃষকের দেশ। হিন্দুস্থানের কদিকাজ ষাঁড়-বলদের উপরই নির্ভরশীল। গো সেবা হিন্দুস্থানি সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।’
লোকনায়ক জয়প্রকাশ নারায়ণ বলেছেন, ‘আমাদের কৃষি ব্যবস্থা পশুশ্রম নির্ভরশীল। তথাকথিত যান্ত্রিক এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে কৃষি ভিত্তিক গ্রামসমাজ উন্নয়নের স্বপ্ন দেখা অবাস্তব। আমাদের জন্য গো হত্যা বন্ধ করা অনিবার্য।’
জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী গ্রাম স্বরাজের যে রূপরেখা তৈরি করেছিলেন তাতেও গ্রামীণ অর্থনৈতিক বুনিয়াদ সশস্ত্রকরণ তথা সুস্থ ও সবল জীবন ধারণের চাহিদা পূরণে গো বংশের অপরিহার্য অবদানের কথা উল্লেখ করে ভারতীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী গো-পালন ও গো রক্ষার জন্য দেশবাসীর নিকট আবেদন রেখেছিলেন।
কিন্তু এতদসত্ত্বেও আজ আমরা স্বাধীনতার ৬২ বছর পর কি দেখতে পাচ্ছি? সুদূর অতীতকাল থেকে গো ধন এবং কৃষিভিত্তিক গ্রাম ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থায় মুখ্য স্থান অধিকার করে আসলেও বর্তমানে গো ধন তথা কৃষিভিত্তিক গ্রাম সমাজের অবস্থা উন্নতির বিপরীতে দিনে দিনে ক্রম অবনতির সর্বনাশা রূপ পরিগ্রহণ করছে। গো ধন দ্রুত বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। কৃষকেরা নিরুপায় হয়ে আত্মহত্যা করছে। কাতারে কাতারে গ্রাম ছেড়ে শহরে ছুটছে।
২০০৩-০৪ সালের একটি রিপোর্ট অনুসারে গ্রামের কৃষক পরিবারের গড়ে মাসিক আয় ২১১৫ টাকা যা নাকি ২০০৯ সালে বেড়ে ২৫০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। অথচ শহরে কোনও বাড়িতে ৩-৪ ঘণ্টা কাজ করে একজন মহিলা প্রতিমাসে ৩০০০ টাকা রোজগার করতে পারে। একটি কৃষক সৈনিক ৭-৮ ঘণ্টা পরিশ্রম করার পরও তার মাসিক আয় হয় ২৫০০ টাকা। এজন্যই আজ বাধ্য হয়ে গ্রামের কৃষক গ্রাম খালি করে শহরের দিকে ছুটছে। শহরে নোংরা বস্তির মধ্যে বসবাস করে দিন মজুরি করছে, ঠেলা রিক্সা চালাচ্ছে। দেশের অন্নদাতা কৃষক এক মুঠো অন্নের জন্য হন্যে হয়ে শহরে ছুটছে।
১৯৯৬ সালে বিশ্বব্যাঙ্কের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১৫ সাল পর্যন্ত ভারতে গ্রাম ছেড়ে শহরে যত লোক ছুটে আসবে, সেই সংখ্যাটা ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানির মিলিত জনসংখ্যার দ্বিগুণের বেশি হবে। এই তিনটি দেশের মিলিত জনসংখ্যা প্রায় কুড়ি কোটি। অর্থাৎ ২০১৫ সালে ভারতের ৪০ কোটি লোক গ্রাম ছেড়ে খাদ্যের খোঁজে শহরে আশ্রয় নিবে। আমেরিকার মোট জনসংখ্যা ৩২ কোটি এবং ইউরোপের দেশগুলোর মিলিত জনসংখ্যা ৪০ কোটির কিছু বেশি। তা হলে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকার মোট জনসংখ্যার চেয়ে বেশি এবং ইউরোপের দেশগুলোর মিলিত জনসংখ্যার সমান সংখ্যক লোক ভারতের গ্রাম ছেড়ে শহরের দিকে ছুটবে। কি সাংঘাতিক ব্যাপার। অথচ সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে। সরকারের গ্রামোন্নয়নে বরাদ্ধকৃত অর্থে গ্রামের কোনও উন্নতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও তাদের দোসরেরাই গ্রামের আমজনতার অবস্থা ক্রম অবনতির দিকে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, পাশ্চাত্যের তথাকথিত বিজ্ঞান ভিত্তিক দর্শন ও জীবনযাত্রার প্রভাব আমাদের সমাজকে প্রলোভিত করছে। গ্রামের সাধারণ মানুষ শহরাভিমুখী হচ্ছে। কৃষিকাজে ব্যাপকহারে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারে জমির উর্বরা শক্তি হারিয়ে ফেলছে এবং উৎপাদিত শস্যের খাদ্যগুণ নষ্ট হচ্ছে। দেখা দিচ্ছে ভূপৃষ্ঠে জলাভাব, ভূগর্ভের জলে দূষণ। বাড়ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং পরিবর্তিত হচ্ছে ঋতুর সময়সীমা। সবকিছুতে ভেসে আসছে ভবিষ্যত সমাজের এক সর্বনাশা সঙ্কেত। পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর ভয়াবহতা সম্পর্কে সারা বিশ্বের মানুষের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন, ‘জল বাঁচাও, জঙ্গল বাঁচাও, প্রকৃতির কাছে ফিরে যাও।’
এই রকম পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের দেশের সাধু-সন্ত-স্বভ্যদ্বারা এবং অনেক ধর্মীয়-সামাজিক সংগঠন নিশ্চুপ বসে থাকেননি।
কর্ণাটকের শ্রীরামচন্দ্রপুর মঠের স্বামীজি রাঘবেশ্বর ভারতী একজন সুপরিচিত সন্ন্যাসী। তিনি সন্ন্যাস জীবনযাপন করার মধ্য দিয়েই দীর্ঘদিনব্যাপী ভারতীয় গো-বংশের ৩০টি প্রজাতি সংরক্ষণ ও প্রতিপালন করে আসছেন।
গ্রাম রক্ষা তথা গ্রামের বিকাশ হলেই সমগ্র দেশের বিকাশ এই ভাবনা তার চিন্তায় দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্ব পেয়ে আসছে। আমাদের কৃষিভিত্তিক গ্রামকে রক্ষা করতে হলে গো-রক্ষা অপরিহার্য তার এই ভাবনা দেশবাসীর নিকট গ্রহণযোগ্য করে তুলতে তিনি অনেকদিন থেকেই সচেষ্ট।
ভারতীর এই ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য ভারতের আরও অনেক আধ্যাত্মিক মহাপুরুষ সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, পড়া প্রণব পাড়ো, যোগগুরু রামদেব, আর্ট অব লিভিং এর প্রাণপুরুষ রবিশঙ্কর, মাতা অমৃতানন্দময়ী (আত্মা), ন্যামর সরস্বতী, শ্রীমুরারিবাপু মহারাজ, সদগুরু জগজিৎ সিং মহারাজ, শামডেঙ্গ বিনপোচেজি এবং আরও অনেকে।
স্বামীজি রাঘবেশ্বর ভারতীর সঙ্কল্পপূরণে গঠন করা হয় বিশ্বমঙ্গল গো গ্রাম যাত্রার কেন্দ্রীয় সমিতি। কেন্দ্রীয় সমিতি যে কার্যসূচি গ্রহণ করে তা হল, বিশ্বমঙ্গল গো গ্রাম যাত্রার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ২৮ সেপ্টেম্বর ২০০৯ সালের বিজয়া দশমীর দিন কুরুক্ষেত্রে অনুষ্ঠিত হয়। তারপর সেখান থেকে যাত্রা আরম্ভ করে ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যে বিশ হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে নাগপুরে পৌঁছে ১৭ জানুয়ারি ২০১০ সালের মকর-সংক্রান্তির দিন যাত্রার সমাপ্তি উৎসব হবে। এই যাত্রা ১০৮ দিনব্যাপী চলার পথে দেশের বিভিন্ন রাজ্যের ৪০০ টি স্থানে সভা অনুষ্ঠিত হবে। তাছাড়া প্রত্যেক রাজ্যের জেলা, মহকুমা এবং প্রখণ্ড থেকে সব মিলিয়ে আরও হাজারের অধিক উপযাত্রা বের করে সারা ভারতবর্ষের পাঁচ লক্ষেরও অধিক গ্রাম পরিক্রমণ করছে।
এই গো-গ্রাম যাত্রার মাধ্যমে ভারতের সন্ন্যাসী ও সন্ত সমাজ দেশবাসীর নিকট বার্তা নিয়ে যাচ্ছেন গ্রামের উন্নতি, দেশের উন্নতি। গ্রামের বিকাশ, দেশের বিকাশ। আর এই দেশের বিকাশ সাধনে সন্ত সমাজ দেশবাসীকে নিয়ে গো-রক্ষা, গ্রাম রক্ষার সঙ্কল্প গ্রহণ করবে। সাধু সন্তদের নেতৃত্বে ন্যূনতম ৫০ কোটি ভারতবাসী এই যাত্রায় সামিল হয়ে গ্রাম, গো-মাতা এবং প্রকৃতি মাতাকে রক্ষা করার শপথ নেবে। গো-রক্ষা, গ্রাম রক্ষা এবং প্রকৃতি রক্ষার জন্য কোটি কোটি মানুষের হস্তাক্ষর সংগ্রহ করবে।
বিশ্বমঙ্গল গো-গ্রাম যাত্রার কেন্দ্রীয় সমিতির কার্যসূচি অনুসারেই বিজয়া দশমীর দিন কুরুক্ষেত্রের থিম পার্কে গায়েত্রী এবং কামধেনু যজ্ঞানুষ্ঠান করে গোকর্ণ পীঠাধীশ্বর শ্রী রাঘবেশ্বর ভারতী স্বামীজি এবং বিখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেতা সুরেশ ওবেরয় বিশ্বমঙ্গল মাত্রার শুভ উদ্বোধন করেন। ৩০ সেপ্টেম্বর থিম পার্কেই অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বমঙ্গল গো গ্রাম যাত্রার বিশেষ প্রথম বিশাল জনসভা। অনুপম শঙ্খনাদের মধ্য দিয়েই জনসভার শুভারম্ভ সূচিত হয়।
জনসভা। বিশ্ববিখ্যাত শঙ্খবাদক শাবন্তের ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধু সন্তরা এসে এই উদ্বোধনী সভায় যোগদান করেন। যোগদান করেন বৈজ্ঞানিক, পরিবেশবিদ, কৃষি বিশেষজ্ঞ সহ ৫০ বর্গের মানুষ।
বিশাল জনসভায় শঙ্করাচার্য বাঘবেশ্বর ভারতী গো-পূজন করেন এবং গো-সম্পর্কে তাৎপর্যপূর্ণ শ্রুতিমধুর সঙ্গীত পরিবেশন করেন ওস্তাদ সঈন উদ্দিন নাগার। তারপর এক এক করে বিশ্ব মঙ্গল গো গ্রাম যাত্রার প্রাসঙ্গিক বক্তব্য রাখেন স্বামীজী রাঘবেশ্বর ভারতী, পীজাবর স্বামী বিশেষতীর্থ, শঙ্করাচার্য বাসুদেবানন্দ সরস্বতী, দিদিমা সাধনী খেতস্করা, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের অশোক সিংগেল, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের সর কার্যবাহী ভাইয়াজী যোশি, সিবিআইর প্রাক্তন ডিরেক্টর যোগীন্দর সিং এবং ছোটে মিঞা মঈন উদ্দিন সাবরি প্রভৃতিরা।
৩০ সেপ্টেম্বর কুরুক্ষেত্রের বিশাল জনসভার পরই শুরু হয় গো-গ্রাম যাত্রা। কুরুক্ষেত্র থেকে যাত্রা শুরু করে হরিয়ানা, পাঞ্জাব, হিমাচলপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, বাংলা, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্ণাটক, গোয়া প্রভৃতি রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল পরিভ্রমণ এবং স্থানে স্থানে বিশাল জনসভা করে ১২ ডিসেম্বর মুম্বাই পৌঁছে। ১৪ ডিসেম্বর নাসিক থেকে যাত্রা শুরু করে ঔরঙ্গাবাদ, সুরাট, ভাদোদরা, যোধপুর, বিকানীর হয়ে ২৬ ডিসেম্বর দিল্লি পৌঁছবে এবং ২৮ ডিসেম্বর আলওয়ার থেকে যাত্রা করে জয়পুর, ইন্দোর হয়ে ৫ জানুয়ারি ভূপাল পৌঁছবে। ৭ জানুয়ারি সাগর থেকে যাত্রা করে জবালপুর, রায়পুর এবং যবতমল হয়েয় ১৬ জানুয়ারি নাগপুর পৌঁছবে। তারপর ১৭ জানুয়ারি মকর সংক্রান্তির নিন বিশ্বমঙ্গল গো-গ্রাম যাত্রার সমাপন উৎসব নাগপুর অনুষ্ঠিত হবে।
ভারতব্যাপী বিশ্বমঙ্গল গো গ্রাম যাত্রার অঙ্গ হিসাবে আমাদের দক্ষিণ প্রান্তের করিমগঞ্জ জেলার বিভিন্ন স্থানেও বেশ কিছুদিন ধরে গো-সম্পদের সংরক্ষণের জন্য স্বাক্ষর অভিযান চলছে সঙ্গে সঙ্গে গো-ধন কীভাবে আমাদের কৃষিভিত্তিক গ্রাম তথা সমগ্র দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সমৃদ্ধ হতে পারে তার তথ্য প্রাঞ্জল ভাষায় জনসাধারণের নিকট ব্যক্ত করা হচ্ছে।
তাছাড়া গ্রামীণ অর্থব্যবস্থা এবং কৃষিকাজের পূর্ণ বিকাশের জন্য জনচেতনা জাগরিত করার এক লক্ষ্যে বিশ্বমঙ্গল গো গ্রামের এক উপযাত্রা শিলকুড়ি বরহম বাবার মন্দির থেকে ১৫ ডিসেম্বর ২০০৯ থেকে শুরু হয়েছে যা নাকি বরাক উপত্যকার বিভিন্ন গ্রামের মধ্য দিয়ে পরিভ্রমণ করে আগামী ১০ জানুয়ারি শিলচর ভূবনেশ্বর সাধু ঠাকুর আশ্রমে এসে উপযাত্রার সমাপন হবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সাধু-সন্তদের অগ্রণী ভূমিকায় এই বিশ্বমঙ্গল গো-গ্রাম যাত্রা স্থানে স্থানে জনসমাবেশ সংগঠিত করে গো-পূজন, গো-রক্ষার সঙ্কল্প কিংবা ব্যাপক জনসাধারণের স্বাক্ষর গ্রহণ করে রাষ্ট্রপতি সমীপে দাবি সনদ পেশ করার মাধ্যমেই কি গো রক্ষা এবং গ্রামোন্নয়নের সফল বাস্তবায়ন হবে? এ ব্যাপারে বিশ্বমঙ্গল গো-গ্রাম যাত্রার পুরোধা স্বামীজী রাগবেশ্বর ভারতী সাংবাদিক সম্মেলনে যে বিশদ বক্তব্য রেখেছেন, তার সারসংক্ষেপ হল ‘এ তো সবে শুরু। অদূর ভবিষ্যতে আমাদের অনেক গঠনমূলক কাজ করতে হবে যদিও গরু নিঃসন্দেহে এক ঐশ্বরিক প্রাণী তবুও এ যুগে আর্থিক লাভালাভের গুরুত্ব বৈষয়িক পৃথিবীতে অস্বীকার করা যায় না। বিদেশের বিজ্ঞানীরা গো রক্ষার প্রয়োজনীয়তা আমাদের থেকে বেশি অনুভব করেন। তারা গো-মূত্র, গো দুগ্ধ এবং পঞ্চগব্য নিয়ে দারুণ সব পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন। আমাদের গো-ভিত্তিক শিল্প পরিকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। প্রমাণ করতে হবে গো পালন অর্থকরী। এ বিষয়ে সাধারণ মানুষকে বুঝিয়ে বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। সামাজিক ন্যায়ের সঙ্গে সঙ্গে ধনী দরিদ্রের ব্যবধান কমাতে হবে। গরুর প্রতিপালন প্রাথমিকভাবে কৃষকের ঘর থেকে শুরু হবে। সেজন্য তাদেরকে গো-কেন্দ্রিক জীবনযাত্রা এবং কৃষি বিষয়ে সচেতন করে তুলতে হবে। তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হল, গো-পালনকে লাভজনক প্রতিপন্ন করা। সেজন্যই গো-কেন্দ্রিক শিল্পকে গুরুত্ব দিতে হবে। এ শিল্পকে লাভজনক করে তুলতে হবে। গো-ভক্ত শিল্পপতিদের এগিয়ে আসতে হবে। গরুকে ভিত্তি করে গবেষণার মাধ্যমে গো-কেন্দ্রিক উৎপাদনের বিভিন্ন নতুন দিক বের করে আনতে হবে। জেলায় জেলায়। গ্রামে গ্রামে।"
(তথ্যসূত্র - পাথেয়কন অর্গানাইজার)