সুশীতল মজুর সর্দার বীরওয়াকে নিয়ে ওর এলাকায় ঘুরে ঘুরে কাজ দেখছে। বীরওয়ার ওয়ার্ডে কেবল মেয়ে মজুর। সমান তালে দুটি পাতা ও একটি কুড়ি গাছ থেকে তুলে পিঠের ঝুড়িতে ফেলছে। চায়ের গাছ থেকে পাতা সংগ্রহ ও ঝুড়িতে রাখা এই দুইয়ে একটা ‘ছন্দ আছে। সুশীতলের সহজ মন সায় দিচ্ছে না এই অদ্ভুত ছন্দের পতন ঘটাতে। কিন্তু বাহাদুরীর জন্য মধ্যে মধ্যে পতন ঘটাতে হয়। তদারকী না করলে আবার কিসের তদারক! বাবু যদি কেবলমাত্র চুপ করে দেখেই চলেন তাহলে কেমন হবে। বকা বকি করতে হয়, ধমক দিতে হয়। না হলে বাবুর বাবুত্ব নষ্ট হয়ে যায়। মজুররা ভয়ে সন্ত্রস্থ থাকে না। তাই সুশীতল নিজেকে আচ্ছা বাবু বলে জাহির করতে একবার রূপমতিয়ার কাছে যায় আবার রুছলির কাছে আসছে। শুধু শুধুই কাজে খুঁত ধরবার চেষ্টা করে। কিন্তু পারছে না।

এখন সুশীতল মুংলীর কাছে গিয়ে দাঁড়াল। মুংলী সুশীতলকে তার কর্তব্যের গণ্ডী থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আসল। কারণ মুংলীর দর্শন পাওয়া মাত্রই সুশীতল ভুলে গেছে যে, সে তদারক করতে এসেছে। সে কেবল মুংলীকে ভাবছে। মুংলী সেদিন রাত্রে বীরওয়ার বাড়ীতে টুসু গান গেয়েছিল। বীরওয়ার বাড়ীতে মজুররা জমায়েত হয়েছিল। বাবু হয়ে মজুরদের বাড়ীতে চলাফেরা করা, বাগান সমাজ অভিধানের বহির্ভূত। সুশীতল মাঝ মাঝে নিয়মের ব্যতিক্রম করে। সে বীরওয়ার বাড়ীতে টুসু গান শুনতে গিয়েছিল। মুংলী খুব ভালো গেয়েছিল। মুংলীর টুসু গানের আওয়াজ এখন সুশীতলের মনে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সুশীতল শুনতে পাচ্ছে -

“হলুদ বনের টুসু তুমি হলুদ কেন মাখ না? শাশুড়ী ননদের ঘরে হলুদ মাখা সাজে না।”

সেদিন রাত্রে গান শুনে ঘোর তমিস্রা ভেদ করে নিজ কোয়ার্টারে যেতে যেতে সুশীতল ভাবছিল, - সত্যিই সব সমাজে শাশুড়ী ননদরা নরপরিণীতদের পীড়াদায়ক ছিল? একথা সুশীতল ভেবে ভেবে খুব মজা পেয়েছিল। ননদিনী কালসাপিনী একথা ও সুশীতলের মনে এসেছিল আর ওর বেদম হাসি পেয়েছিল। শেষ পর্যন্ত মুংলীর গান গাওয়ার ভঙ্গিমা এবং মিষ্টি আওয়াজ সুশীতলের মনের অতলে তলিয়ে গিয়েছিল। সে কেবল নিজের সামনে পুরা কালের শাশুড়ী ননদদের হাতে নিগৃহীত আহাম্মক নবপরিণীতা দেখছিল। সাইরেন বেজেছে। কাজ শেষ হওয়ার সঙ্কেত। মেয়ে মজুররা সবাই পিঠে ঝুড়ি ঝুলিয়ে চলে যাচ্ছে। মুংলীও চলে যাচ্ছে। সুশীতল বুঝতে পারল ও তদারকী করতে এসেছিল কিন্তু পুরাপুরি করেনি। সুশীতল চলে যাচ্ছে, নিজ আস্তানায়। সে শিরীষ গাছের নিচ দিয়ে এগিয়ে চলল। শিরীষ গাছগুলি আসলে চা গাছের প্রাণ। সেগুলিইত ছায়া দেয়, পাতা পচিয়ে সার দেয়। সুশীতল চলছে আর বাগানের শান্ত নীরব অবস্থানটাকে পুরাপুরি উপলব্ধি করছে। সে এগিয়ে চলছে। দূরে টিলা গড়িয়ে ছড়া দিয়ে ঝির ঝির করে জল পড়ছে। গেল শীতে এই ছড়ার কাছেই লিগুন সাহেব এক গুলি দিয়ে একটা বাঘ মেরেছিল। এখানেই রূপমতিয়া কানহাইয়ার পাশে বসে ফষ্টি নষ্টি করছিল। বীরওয়ার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সেখানে পড়েছিল। বীরওয়া তখনই কানহাইয়াকে চাবুক দিয়ে প্রহার করতে গিয়েছিল। রুপমতিয়ার আকুল কান্না বাগানের নীরবতা ভেদ করে দূর পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। ওর কান্না বীরওয়ার হাত থেকে চাবুক নামিয়ে দিয়েছিল।

ছড়াটা ছাড়িয়ে বাঁ দিকে বনসাথী টিলা হয়ে সুশীতল চলছে। মনুয়ার বাড়ীর সামনে এসে গেল। মনুয়ার বাড়ীটা এখন ঝিমিয়ে আছে। মনুয়ার বৌ সুন্দরা আজ ক’দিন হল বাড়ীতে নেই। গুঠুরা মনুয়ার বৌকে নিয়ে পালিয়ে গেছে। মনুয়া পঞ্চায়েতের কাছে বিচার দিয়েছে! পঞ্চায়েত বীরওয়া সেটার বিচার করবে। মনুয়া যখন মজুর সর্দার ছিল তখন সুন্দরা ওর বাড়ীতে গিয়ে ওকে টুসু গান শুনিয়ে দিত। কাজের মাঝে অবসর খুঁজে মহুয়া গাছের নিচে বসত। তখন মনুয়া ভাবতেও পারেনি কোন দিন সুন্দরা ওকে ছেড়ে চলে যাবে। সুশীতলের ভয় হচ্ছে হয়তবা কোনদিন মুংলীও বীরওয়াকে ছেড়ে চলে যাবে। বীরওয়া তখন অন্য কোন মজুর সর্দারের কাছে বিচার প্রার্থী হবে। এটা কি এই সমাজের ধর্ম? চিরাচরিত নিয়ম? হ্যাঁ। আবহমান কাল ধরেই নাকি এই প্রথা এখানে চলে আসছে। এই সমাজ কি সব সমাজের প্রতিবিম্ব না না সেটা কখনও সম্ভব- পর নয়। মজুররা হল অশিক্ষিত। শিক্ষার আলোক ওদেরকে স্পর্ণ করেনি। তাই ওরা ভালবাসাকে মর্যাদা দিতে পারে না। যারা স্কুল কলেজে পড়েছে- বর্তমান শিক্ষা যাদের মজ্জাগত হয়েছে তারা কোনদিন ভালোবাসার অমর্যাদা করতে পারে না। এসব ভাবতে ভাবতে সুশীতল এগিয়ে চলছে। সে ভাবছে শহরে কোথাও চাকুরী হলে চলে যাবে। এই সামাজিক আবর্তে থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে না।

সুশীতল নিজ কোয়ার্টারে এসেছে। চাকর চা পানের সাথে একখানা চিঠি এনে দিল। সুশীতল তাড়াতাড়ি চিঠিটা পড়ছে। কিন্তু, গড়ার সাথে সাথে ক্রমশ আনন্দ ও উৎসাহ যুগপৎ-বিষাদে পরিণত হচ্ছে। ওর চেতনশীল দেহ অবশ হয়ে মৃন্ময় মূর্তিতে রূপান্তরিত হতে চলছে। কারণ উর্মিলা লিখেছে ও গতমাসে ই এ সি শুভাশীষ গুপ্তের পানি গ্রহণ করেছে। সুশীতল স্থানুবৎ দাড়িয়ে আছে। সে দেখছে স্রোতম্বিনী নদীর মধ্যে ওর ডিঙ্গি ডুবে যাচ্ছে। ও জলের গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে। উর্মিলা ওকে বিদ্রূপ করছে। ওকে তুলতে এগিয়ে আসছে না। সুশীতল চিঠির মধ্যেই উর্মিলাকে দেখতে পাচ্ছে। উমি’লা ব্যঙ্গ করে বলছে— সুশীতল, তুমি কলেজ ছাত্র মজলিশের সম্পাদক পদপ্রার্থী হও। তুমি নির্বাচিত হবে। আমি সাহায্য করব। - তোমার মত ও আমার মত এক। তুমি এগিয়ে যাও। আমি তোমাক মদত দেব। সুশীতল, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি প্রতিরোধের জন্য ছাত্র আন্দোলন জোর- দার কর। তোমার পাশে থেকে আমি তোমাকে হেল্প করব। তোমার পাশে আমি সারাজীবন থাকব। তোমার আমার ভালো- বাসা অকৃত্রিম। শুশীতল, তুমি সরকারী চাকুরী নাই বা পেলে তাতে ক্ষতি কি! আমিও ত তোমাকে মাসে মাসে…..।"

শুশীতল টের পাচ্ছে ও জলে নিমগ্ন হয়ে যাচ্ছে। হাবু ডুবু খাচ্ছে। ও আর ঢেউয়ের কলতানে উর্মিলার কথা শুনতে-পাচ্ছে না। শুশীতল আবছা আবছা উর্মিলাকে চোখের সামনে দেখছে। উর্মিলা বদলে গেছে। মুংলী বদলে যাচ্ছে। সব সুন্দরা। শুশীতল এই নিঃসহায় অবস্থায় চিৎকার দিয়ে বলতে চেষ্টা করছে, - “মনুয়া আমি তোদের। মনুয়া ..”

সচিত্র ভারত, নভেম্বর ১৯৬৫ ইং