প্রাক্কন্ধন
তিন মাস হলো আমরা পরবাসী। আমেরিকার মিশিগান স্টেটে এসেছি। ছেলে ডেইমলার অ্যান্ড ক্রাইসলার কোম্পানীর সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার। একসময়ে বিশ্বের এক নম্বর অটোমোবাইল সিটি ডেট্রয়েটের পাশে আববার্ণ হিলসের এডামস্ ক্রীকে ওর বাসস্থান। আমরা সেখানেই উঠি।
ডেট্রয়েটে শীতের প্রকোপ খুব বেশি। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে এখানে আসার পর মার্চ মাস অবধি অধিকাংশ দিনই বরফ পড়েছে এবং তাপাঙ্ক -৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে -৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস ওঠানামা করেছে। দীর্ঘদিন আকাশে সূর্য দেখার সুযোগ হয়নি। কেবল আহার সামগ্রী কিনতে বাইরে যেতে হয়েছে। বিশেষ শীতবস্ত্র গায়ে জড়িয়ে এয়ার কন্ডিশনড ঘর থেকে বেরিয়ে এয়ার কন্ডিশনড গাড়ি চেপে শপিং মলে বাজার করেই ঝটাপট আস্তানায় ফিরে আসা। বাস্, এ পর্যন্তই আমাদের বাইরে বেরোনোর ব্যাপার। বস্তুত সে সময় ঘরবন্দীই ছিলাম।
এপ্রিলের শুরু থেকে আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটতে থাকে। ঠান্ডা কমে আসে। বরফ দ্রুত হারিয়ে যায়। জলাশয়ে বরফের আস্তরণ গলে জল হতে থাকে। আশপাশের ছোট ছোট জলাশয়গুলোতে রাজহাঁসদের জলখেলি হয়। তাছাড়া তিন চার মাস শুধুমাত্র ডালপালা নিয়ে পত্রবিহীন রুক্ষ বিশাল বিশাল গাছগুলোর নূতন পাতা গজিয়ে উঠে। চারদিক সবুজে সবুজ হতে থাকে। বাসগৃহ সংলগ্ন বাগান মৌসুমী ফুলের বাহারে রাঙিয়ে উঠে। ডাউন টাউনের মোড়ে মোড়ে চোখ ধাঁধানো ফুলের টব বসিয়ে প্রশাসন বসন্তের আগমনীকে স্বাগত জানায়। সবকিছু দেখে মনে হয় কোন এক ঐন্দ্রজালিক শক্তি তাঁর যাদুমন্ত্রে দ্রুত এই সকল পরিবর্তন এনে দেয়। তখন ভাবাই যায় না কিছুদিন আগের শীতের প্রকোপ, জমাট বাঁধা বরফের লীলাখেলা সহ সেসময়কার প্রাকৃতিক অবস্থান।
এই পরিবর্তনের সাথে সাথেই সেখানকার লোকজন বেরোতে থাকে ঘরের বাইরে। উইক এন্ডে আউটিং এর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। সৌখীন নাগরিক নিজস্ব লরিতে স্পীড বোট বয়ে নিয়ে চলে ধারেকাছের জলাশয়ে। দিনভর জলে স্পীডবোট চালিয়ে আবার ফিরে আসে ঘরে। মেয়ে পুরুষ দলে দলে ছুটে চলে বালুতটে রৌদ্রস্নানে।
দীর্ঘদিন শীতের দাপটে ঘরবন্দী থাকার পর আমাদেরও নূতন আবহাওয়ায় বাইরে যেতে ইচ্ছা হয়। সপ্তাহান্তে ছেলের অফিস বন্ধের দিন ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি আববার্ন হিলসের পার্শ্ববর্তী এলাকায়। দেখে আসি ট্রয় সিটির ভারতীয় টেম্পল, পোন্টিয়াকের পরাশক্তি মন্দির, পেনসেলভিনিয়ার শহর পিটসবার্গ এবং সেখানকার হিন্দুদের তৈরী বালাজী মন্দির। তবে বিখ্যাত কোন জায়গায় তখনও যাওয়া হয়নি।
মে মাসের শেষ সপ্তাহের সোমবার সারা আমেরিকাতেই জাতীয় জীবনে স্মরণ দিবস। দেশপ্রেমিক বীর যোদ্ধাদের স্মরণ করতে দিনটা প্রতিপালিত হয়। দেশের স্বার্থে যাদের জীবন বলিদান হয়েছে, তাঁদের স্মৃতিস্তম্ভের সামনে জড়ো হয়ে দেশবাসী শ্রদ্ধা জানায়। প্রিয়জনেরা যুদ্ধে স্বজন হারানোদের স্মৃতি ফলকে আলো জ্বালায়, পুষ্পার্ঘ নিবেদন করে। দেশের আনাচে কানাচে বিশেষ বিশেষ স্মরণ সমাবেশ হয়। আরো কত কি!
এ বছর ২৮ তারিখই হচ্ছে মে মাসের শেষ সোমবার। মার্কিন দেশের রীতি অনুসারে সেদিনটিই হচ্ছে মেমোরিয়াল ডে। ২৭ তারিখ রোববার এবং ২৬ তারিখ শনিবার। সপ্তাহান্তের (Weekend) শনি রবি দু’দিন এবং ২৮শে মে মেমোরিয়াল ডে নিয়ে মোট তিনদিন এক নাগাড়ে অফিস ছুটি। সিদ্ধান্ত নেই এই তিন দিন ছেলের অফিস ছুটির অবসরেই আমরা যাবো শিকাগো দর্শনে।
যাত্রাপথ
২৬শে মে শনিবার স্থানীয় সময় সকাল দশ ঘটিকায় আমরা আববার্ণ হিলসের এপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে পড়ি। ক্রাইসলার কোম্পানির কালো মজবুত জীপ গাড়িতে চেপে পাঁচজন রওয়ানা দেই শিকাগোর উদ্দেশে। ছেলে অশোকতরু নিজেই গাড়ি চালায়। জীপগাড়িটার স্টিয়ারিং বাঁদিকে। তাই আমাকে সারথী অশোকের ডান পাশের সিটে বসতে হয়। পিছনের দুটো সিটে বসেছে আমার স্ত্রী এবং পুত্রবধূ সোনা আর ওদের মাঝখানে কারসিট ফিট করে বেল্ট বেঁধে বসিয়ে রাখা হয়েছে দুমাস দশদিনের শ্রীমান অরুণীমবাবুকে। অরুণীমবাবু পরবর্তী প্রজন্মের প্রথম পুরুষ। জন্মসূত্রে আমেরিকার নাগরিক। অরুণীমবাবু এই ধরাধামে আসছেন জেনেই আমরা এই সুদূরে আসতে বাধ্য হয়েছি।
শহর শিকাগো ইলিনয়ীস ষ্টেটের উত্তর পূর্বপ্রান্তে মিশিগান লেইকের পশ্চিম তীরে অবস্থিত। ডেট্রয়েটের আববার্ন হিলস হলো মিশিগান স্টেটের দক্ষিণ পূর্বের শেষ সীমানায়। পূর্বপ্রান্ত থেকে মিশিগান স্টেটের পশ্চিমের শেষ সীমানায় পৌঁছে ইন্ডিয়ানা ষ্টেটের সামান্য অঞ্চল ছুঁয়ে ইন্টারষ্টেট হাইওয়ে ধরে কিছুটা এগিয়ে গেলেই বৃহৎ মিশিগান লেইকের পশ্চিমে ইলিনয়ীস ষ্টেটের পৃথিবী বিখ্যাত শহর শিকাগো।
শিকাগো আর আববার্ন হিলসের মধ্যে দূরত্ব পাঁচশ কিলোমিটারেরও বেশি। মিশিগান, ইন্ডিয়ানা এবং ইলিনয়ীস এই তিন রাজ্যের হাইওয়েগুলোর উপর দিয়ে ১১০ থেকে ১২০ কিলোমিটার গতিতে ক্রাইসলার জীপ গাড়ি চলতে চলতে সন্ধ্যা ৭ ঘটিকায় শিকাগো ডাউন টাউনের উত্তরে রোসমন্ট এলাকার ওয়েস্ট হিগিন্স রোডে হোলিডে ইন হোটেল প্রাঙ্গণে পৌঁছায়। তিন চার দিন আগেই অন লাইনে এই হোটেলে এসে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আববার্ন হিলস থেকে সকাল দশ ঘটিকায় বেরিয়ে সন্ধ্যা ৭ ঘটিকার সময় রোসমন্টের ওয়েস্ট হিগিন্স রোডে পৌঁছতে ন ঘন্টা সময়ের ব্যবধান হলেও ওই পুরো সময়টাতে জীপ গাড়ি লাগাতার চলতে থাকেনি। চলার পথে ৪৫ মিঃ থেকে ১ ঘন্টা করে তিন চারবার থেমে থেমে যেতে হয়েছে।
আমেরিকার ইন্টারষ্টেট হাইওয়ে গুলোর ৩০/৪০ কিঃমিঃ অন্তর অন্তর দূরপাল্লার যাত্রীদের সুবিধার জন্য রেষ্ট হাউস, ফুড হাউস, গ্যাস স্টেশন (Fuel filling station) প্রভৃতির ব্যবস্থা রয়েছে। এক নাগাড়ে বেশিক্ষণ গাড়ি চড়ার ক্লান্তি, সময়মত ক্ষুধা নিবৃত্তি এবং প্রকৃতির ডাকের মোকাবিলার জন্য এ রকম সুব্যবস্থা রয়েছে। রেস্ট হাউসগুলো ভারী সুন্দর এবং পরিচ্ছন্ন। আমাদের বড় বড় শহরে বিমানযাত্রীদের জন্য এয়ারপোর্ট লাউঞ্জে যে রকম পরিষেবার ব্যবস্থা রয়েছে তার চেয়েও বেশি সুযোগ সুবিধা রয়েছে রেস্ট হাউসগুলোতে।
চলতি পথে রেষ্ট হাউসে আমাদেরকে সাধারণ যাত্রীদের তুলনায় কিছু বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। কারণ, আমাদের বিশেষ সহযাত্রী অরুণীমবাবুকে কারসিট থেকে নামিয়ে হাগিস বদলানো, মায়ের কোলে বসিয়ে খাওয়ানো এবং কিছুটা স্বাভাবিক অবস্থায় রাখার পর আবার কারসিট ফিট করে আষ্টেপৃষ্ঠে বেল্ট বেঁধে রওয়ানা হতে হয়েছে। সে জন্যই নির্ধারিত সময়ের বেশ কিছু পরেই আমরা রোসমন্টের হোলিডে ইন হোটেলে পৌঁছাই।
রোসমন্টে রাতের আকাশে বিমান ও ভূতলে যান চলাচলের বিরল দৃশ্য
রোসমন্টের বহুতল বিশাল হোলিডে ইন হোটেলের সামনে বিস্তর এলাকা নিয়ে পাকা করা মসৃণ উন্মুক্ত পার্কিং জোন। গাড়ির পাশে গাড়ি, কেবল গাড়ি। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িগুলোই জানান দেয় হোলিডে ইন হোটেলে কত লোক চেক ইন করেছে।
পার্কিং জোনেই আমাদের জীপ গাড়িটা দাঁড় করিয়ে অরুণীমবাবুকে কারসিট সহ নামিয়ে ট্রলিতে বসানো হয়। লটবহর যা ছিল তা হাতে হাতে নিয়ে অরুণীমবাবুর ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে চলে যাই রিসেপশন কাউন্টারে। অন লাইনে বুকিং করার প্রিন্টআউট দেখানোর সাথে সাথেই আমাদের চেক ইন পর্ব চুকে যায়। হোটেলের সহায়ক আমাদেরকে এলিভেটরের সাহায্যে বারোতলার নির্দিষ্ট কক্ষে পৌঁছার ব্যবস্থা করে চাবি সমজে দিয়ে চলে যায়।
রুমের দরজা খুলে প্রথম নজরেই মন আনন্দে ভরে উঠে। রুমটি খুব সুন্দর। আধুনিক স্বাচ্ছন্দ্যের সব ব্যবস্থাই রয়েছে। আরাম আয়াসের সোফা, বিছানা, আসবাবপত্র, রান্না করার গ্যাস স্টোভ, মাইক্রওয়েব ওভেন এবং ল্যাপটপে ইন্টারনেট যোগাযোগের ব্যবস্থাও রয়েছে।
রুমে ঢুকে পূর্বদিকের জানালা খুলে দেই। জানালা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই একটা চলমান বিকট শব্দ কানে এসে বাজে। ভীষণ ভয় পেয়ে যাই। বাইরে ভালভাবে চেয়ে দেখি একটা উড়ান সশব্দে ক্ষিপ্র গতিতে উর্ধ্বাকাশে ছুটছে।
রোসমন্ট এলাকায় হোলিডে ইন হোটেলের অনতিদূরে বলতে গেলে প্রায় লাগোয়াই শিকাগোর বিখ্যাত বিমান বন্দর ও’ হেয়ার ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। এটা বিশ্বের বৃহত্তম এবং ব্যস্ততম আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরগুলোর অন্যতম। এই এয়ারপোর্টের রানওয়ে থেকে উড়ান আকাশে উঠার সময় বিকট শব্দ হোটেল হোলিডে ইনের বাসিন্দাদের সন্নিকটস্থ এয়ারপোর্টের অবস্থান সম্পর্কে জানান দিয়ে যায়। আমি নবাগত অনভিজ্ঞ হোটেলের বাসিন্দা তাই আচমকা উড়ানের বিকট শব্দে ভয় পেয়ে যাই। তবে উড়ান দেখে এবং সেটা দৃশ্যান্তরে চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনের ভয় দূরীভূত হয়। কিন্তু চোখের দৃষ্টি তখনও জানালার বাইরে দূরাকাশে নিবদ্ধ থাকে।
একটু পরেই দেখা যায় দিগন্তের শেষ সীমানা থেকে দুটো আলোর বিন্দু আকাশপথে ধীরে ধীরে হোলিডে ইন হোটেলের দিকে এগিয়ে আসছে। অতি অল্প সময়ের ব্যবধানেই বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে, আসলে দূর থেকে আকাশ পথে ধেয়ে আসছে অত্যাধুনিক বায়ুযান এবং নিমেষেই হোলিডে ইনের পাশে এসে ডুব মেরে অন্তর্হিত হয়ে যায়। অর্থাৎ ও’ হেয়ার ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে অবতরণ করে। একটা অদৃশ্য হতে না হতেই আরেকটার আগমন। রাতের আকাশে একের পর এক জোড়া আলোকরশ্মি বিশেষ ছন্দে দূর থেকে এগিয়ে আসতে থাকে। এক ঝলকে মনে হয় আকাশের নক্ষত্রপুঞ্জ নিচতলায় আরেক ধাপে জোড়ায় জোড়ায় সারিবদ্ধ নক্ষত্রের মেলা বসিয়েছে।
ও’ হেয়ার ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে বিভিন্ন জায়গা থেকে শনিবারে অধিক সংখ্যক যাত্রীবাহী বিমান আসে। এক মিনিট ব্যবধানের চেয়েও কম সময়ে একটি করে বিমান অবতরণপূর্বে রোসমন্টের রাতের আকাশে উড়ানের অবস্থান এবং সেটা থেকে ঝিকিমিকি আলোর বিচ্ছুরণ দর্শকের দৃষ্টি কেড়ে নেয়।
আকাশ পথে বায়ুযানের এই দৃষ্টিকাড়া লীলা দেখতে দেখতে কিছুক্ষণ পর নিচের দিকেও তাকাই। সেখানেও নজরে পড়ে চোধ ধাঁধানো আলোর মালা। ভূতলে জন এফ কেনেডি এক্সপ্রেস হাইওয়ের উপর দিয়ে অগুণতি মোটর গাড়ির যাতায়াত। প্রত্যেকটি চলতি গাড়ির হেড লাইট ঠিকরে বেরিয়ে আসছে জোড়ায় জোড়ায় গোলাকৃতি আলোক রশ্মি। আর সেগুলোর সম্মিলিত প্রকাশই দূর থেকে মনে হয় এক চলমান গ্রন্থিবদ্ধ আলোক রশ্মি মালা। অনেকক্ষণ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আমি এ দৃশ্য দেখতেই থাকি।
আগামীকাল স্বামী বিবেকানন্দের স্মৃতি বিজড়িত শিকাগোর জায়গাগুলো দেখতে অতি প্রত্যুষেই আমাদের হোটেল থেকে রওয়ানা হওয়ার কথা। রাতের আহার পর্ব তাড়াতাড়ি চুকিয়ে শুয়ে পড়তে হবে। সে তাগিদেই ছেলে আমাকে ডাক দেয়। ডাক শুনে আমি জানালার বাইরে থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আনি।
শিকাগো দর্শনের প্রথম রাত্রিতে রোসমন্ট এলাকার আকাশ থেকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উড়ান অবতরণ এবং নিচে এক্সপ্রেস হাইওয়ে দিয়ে মোটরযান চলাচলের দুর্লভ দৃশ্যাবলীর অনন্য রূপ মনের স্মৃতি কোঠায় জমা রেখে আগামীকাল সকাল সকাল হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়ার প্রস্তুতির জন্য সচল হই।
সাউথ হাইড পার্ক বুলিবার্ডে বিবেকানন্দ মন্দির
সাতাশে মে, রবিবার প্রতে্যুষে হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত থাকলেও সেটা সম্ভব হয়নি। সকাল সকাল প্রত্যেকের স্নান, প্রাতঃরাশ, অরুণীমের সারাদিনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, অকুস্থলে পৌঁছার রোড ম্যাপ এবং বিবেকানন্দ বেদান্ত, সোসাইটির ওয়েব সাইট খুলে প্রয়োজনীয় তথ্যের প্রিন্ট আউট নিয়ে বেরুতে বেরুতে সকাল ন’টা বেজে যায়।
রোসমন্টের হোলিডে ইন থেকে বেরিয়ে শিকাগো ডাউন টাউনে পৌঁছোতে প্রায় পয়তাল্লিশ মিনিট সময় নেয়। ইন্টারস্টেট হাইওয়ে ধরে শহরের দিকে এগিয়ে আসার সময় চলতি পথে দূর থেকে ডাউন-টাউনে অত্যাধুনিক বিভিন্ন ডিজাইনে তৈরি উদ্ধাকাশে উচিয়ে থাকা সারিবদ্ধ অট্টালিকাগুলো ভারী সুন্দর দেখায়। সে এক মনোরম দৃশ্যপট। তবে ডাউন-টাউনের ভিতর ঢুকে গেলে অট্টালিকার গগনচুম্বী টাওয়ারগুলো দৃষ্টির অগোচরে চলে যায়। তখন অন্য সৌন্দর্যের হাতছানি। প্রশস্ত মসৃণ রাস্তায় চলতে থাকে নানা রঙ বেরঙের গাড়ি। গাড়ির পেছনে গাড়ি।
গাড়িগুলো দ্রুতবেগে চললেও চলতে থাকে এক সুশৃঙ্খল ছন্দে। পাশে সারি সারি সুরম্য অট্টালিকার নজরকড়া কারুকার্য। এদিক সেদিক সবকিছু ছিমছাম এবং মনোমুগ্ধকর।
আমাদের গাড়ি ডাউন-টাউনে ঢুকে উত্তর পূর্ব দিকে এগিয়েই মিশিগান লেইকের কিনারা ঘেঁষে লেইক শোর ড্রাইভ (Lake shore drive) ধরে সোজা দক্ষিণ দিকে এগিয়ে চলে। বিশ পঁচিশ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যায় শিকাগো শহরের মিউজিয়াম অফ আর্টস অ্যান্ড সাইন্স বিল্ডিং-এর সামনে। মিউজিয়াম অফ আর্টস অ্যান্ড সাইন্স বিল্ডিং ১৮৯৩ সালেই ওয়ার্ল্ড কলোম্বিয়ান এক্সপোজিশনের সময় তৈরি হয়েছিল। বিশ্বধর্ম মহাসম্মেলনের সময় স্বামী বিবেকানন্দ কয়েকবার এই বিল্ডিং-এর পাশ দিয়ে যাতায়াত করেছেন। আর সেটার আড়াই ব্লক উত্তরেই হলো ৫৪২৩ সাউথ হাইড পার্ক বুলিবার্ড, বিবেকানন্দ মন্দির। শিকাগোর বর্তমান বিবেকানন্দ বেদান্ত সোসাইটির কেন্দ্র, রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের একটি শাখা।
আমাদের গাড়ি এই বিবেকানন্দ বেদান্ত সোসাইটির সামনেই গিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু সেখানে গাড়ি পার্ক করে রাখার কোনও ব্যবস্থা নেই। প্রত্যেকটি বাড়ির সামনেই নো-পার্কিং জোনের সাইনবোর্ড রয়েছে। অগত্যা প্রায় দু’ফার্লং জায়গা উত্তরে এগিয়ে একটা ফাঁকা জায়গা পাওয়া যায়। সেখানেই গাড়ি পার্ক করা হয়।
অরুণীমকে কারসিট সহ গাড়ি থেকে নামিয়ে ট্রলিতে বসানো হয়। তারপর ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে পায়ে হাঁটা পথ ধরে আবার ৫৪২৩ নম্বর বাড়িটির সামনে পৌঁছাই। ভেজানো দরজা দেখে ভেতরে ঢুকতে পারবো কি না সন্দেহ হয়। না, বাইরে থেকে ঠেলা দিতেই দরজা খুলে যায়।
ঘরের ভিতর প্রথমেই বারান্দার মত সামান্য জায়গা রয়েছে। সেখানে জুতো খুলে ভেতরের রুমে ঢুকি। ছোট্ট রুমটাতেই কুর্শির মত তৈরি একটা বিশেষ জায়গায় রয়েছে শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের বিগ্রহ, প্রদীপ, ধূপদানী এবং পূজার অন্যান্য সামগ্রী। রুমের বাঁ দিকে দোতালায় উঠার সিঁড়ি এবং বিগ্রহের সামনে একটু এগিয়ে ডানদিকে অন্য কোঠায় প্রবেশের আরেকটি দরজা। সিঁড়িটার পাশেই দেওয়াল ঘেঁষে রয়েছে কাঠের তৈরি সুন্দর র্যাক। র্যাকগুলিতে থাকে থাকে বিবেকানন্দ বেদান্ত সোসাইটির বিজ্ঞপ্তি, পত্রিকা এবং বই ইত্যাদি। রুমে প্রবেশ করে এসব দেখার পর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের বিগ্রহের সামনে যাই আর তখনই বুঝতে পারি পাশের কোঠাতে লোকজনের উপস্থিতি রয়েছে এবং সে দিকেই এগিয়ে যাই।
কোঠাটি মূলতঃ একটি ছোট্ট হলঘর। হলঘরে বিশ পঁচিশটি চেয়ার রয়েছে। সেখানে উপবিষ্ট সাত আটজন শ্রোতা এবং সামনে এক সন্ন্যাসী বক্তৃতা দিচ্ছেন। বক্তা এবং শ্রোতাদের কোন ব্যাঘাত সৃষ্টি না করে আমি অতি সন্তর্পণে একটি চেয়ারে বসে পড়ি। মিনিট পাঁচেক সন্ন্যাসী প্রদত্ত ভাষণে মনোনিবেশ করি। কিন্তু আমেরিকান উচ্চারণে ইংরেজি ভাষণের বিষয়বস্ত আমি পাঁচ শতাংশও ভালোভাবে বুঝে উঠতে পারিনি। তাছাড়া এখানে এসে আমাদের যা কিছু দেখার তাড়াতাড়ি দেখে অন্যত্র চলে যাওয়ার পূর্ব সিদ্ধান্ত ছিল। তাই অধিক সন্তর্পণে নিশ্চুপ হলঘরটি থেকে বেরিয়ে আসি।
আমার সাথীরা অরুণীমকে নিয়ে প্রথম রুমটিতেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেওয়ালের র্যাকে বিবেকানন্দ বেদান্ত সোসাইটির বইপত্র দেখছিল। কারণ অরুণীমের ট্রলি ঠেলে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে নিয়ে যাওয়ার অসুবিধা ছিল। ইতিমধ্যে রুমে আরেকজন ষাটোর্ধ বয়সের অবাঙ্গালী হিন্দু এসেছেন। উনি শিকাগোতেই স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। বিবেকানন্দ বেদান্ত সোসাইটির সাথে যুক্ত গৃহীকর্মী। ভদ্রলোক র্যাক থেকে কিছু বিজ্ঞপ্তি এবং চটি বই হাতে তুলে নিয়ে আমাকে দেন। পরে মনে হয়েছে এই বিজ্ঞপ্তি এবং চটি বইগুলোই আমার কাছে বিবেকানন্দ বেদান্ত সোসাইটির বিবেকানন্দ মন্দির থেকে প্রাপ্ত মহাপ্রসাদ।
বিজ্ঞপ্তিতে রয়েছে শিকাগো বেদান্ত সোসাইটির কার্যক্রমের খতিয়ান। স্বামী বিবেকানন্দের গুরুভ্রাতা স্বামী ব্রহ্মানন্দের মন্ত্রশিষ্য স্বামী জ্ঞানেশ্বরানন্দ কর্তৃক ১৯৩০ সালে শিকাগো শহরে যে বেদান্ত সোসাইটির সূচনা হয়েছিল আজ তা শক্ত ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আছে। শিকাগোর বিবেকানন্দ বেদান্ত সোসাইটি আজ সেখানকার প্রবুদ্ধ জনগণের নিকট সমাদৃত। ভারতীয় আধ্যাত্মিকতায় আকৃষ্টদের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রস্থল।
শিকাগোর বর্তমান সাউথ হাইড পার্ক বুলিবার্ডের বিবেকানন্দ বেদান্ত সোসাইটির সাথে যুক্ত রয়েছে মিশিগান স্টেটের গ্যাঞ্জেস শহরের বিবেকানন্দ মোনেস্টারি অ্যান্ড রিট্রিট। (Vivekananda Monestery & Retreat) বেদান্ত সোসাইটির ঐ কেন্দ্রটি মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে বেশ বড় এলাকা নিয়েই তৈরি। সেখানে ভক্তদের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। ভক্তেরা সময় নিয়ে নীরবে নিভৃতে জপধ্যান করতে পারে। গ্রীষ্মে ৭-১৫ বৎসর বয়স পর্যন্ত ছেলেমেয়েদের শিবির অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে রয়েছে শিকাগো শহরে হেইলদের বাড়িতে থাকাকালীন স্বামীজির ব্যবহৃত জিনিসপত্রের প্রদর্শনী।
মে মাস থেকে নভেম্বর মাস অবধি ৫৪২৩ সাউথ হাইড পার্ক বুলিবার্ড এবং গ্যাঞ্জেসে প্রতি রবিবার রামকৃষ্ণ ভাবাদর্শ, উপনিষদের কথা এবং বেদান্ত দর্শনের কোন না কোন বিষয়ের উপর ভাষণ হয় এবং ভাষণ দেন সোসাইটির প্রধান স্বামী চিদানন্দ, সহযোগী স্বামী বরদানন্দ এবং স্বামী ব্রহ্মপুরানন্দ।
বিজ্ঞপ্তি পড়ে বুঝতে পারি পাশের যে হলঘরটি থেকে আমি সন্তর্পণে বেরিয়ে এসেছি, সেখানে স্বামী বরদানন্দ স্পিরিচুয়েলাইজিং এভরিডে লাইফ (Spiritualizing every day life) এর উপর বক্তৃতা দিচ্ছেন এবং এটাও বুঝতে পারি যে একই সময়ে মিশিগানের গ্যাঞ্জেস শহরের বিবেকানন্দ মনেস্টারি এবং রিট্রিটে স্বামী চিদানন্দ ফোর পিলারস অফ স্পিরিচুয়াল লাইফ (Four pillars of Spiritual life) এর উপর ভাষণ দিচ্ছেন।
উপরোক্ত বিষয়গুলো জানার পর বিজ্ঞপ্তির আরও অন্য সব বিষয়বস্তু পাঠে ইতি টানি। কারণ আমাদেরকে অতি শীঘ্রই বেরিয়ে যেতে হবে। তাড়াতাড়ি বেদান্ত সোসাইটির কাগজপত্র ব্যাগের ভিতর ঢুকিয়ে সোসাইটির গৃহীকর্মীকে বিদায় সম্ভাষণ জানাই এবং ঘরের বাইরে চলে আসি।
বাইরে এসে রাস্তায় পা দিতেই এক অশীতিপর আমেরিকান বৃদ্ধার মুখোমুখি হই। বৃদ্ধা আমাদেরকে দেখে পাশে এসে হাঁটা বন্ধ করে দেন এবং সন্ন্যাসীর প্রবচন না শুনে এ সময়ে আমরা চলে যাচ্ছি দেখে ভদ্রমহিলা অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করেন - উইল ইউ নট লিসেন ডিসকোর্স?
আমরা না থেমে চলতে চলতেই প্রত্যুত্তরে বলি - নো। আমাদের কথা বলা এবং চলার ভঙ্গি দেখে একটু হেসে আবার বললেন - ও ইউ আর ইন হারি, ওকে, ওকে। তারপর পায়ের হাই হিল জুতোয় খট্ খট্ আওয়াজ তুলে বেদান্ত সোসাইটির ঘরে ঢুকে যান।
আমরা দু’ফার্লং পায়ে হাঁটা পথ পাড়ি দিয়ে গাড়িতে উঠি। এখন দুপুরের আহারের ব্যবস্থা করতে না পারলে সারাদিন উপোস থাকতে হবে।
ওয়েস্ট ডিভোন এভিনিউ - মিনি ইন্ডিয়া
শিকাগো শহর এবং তৎপার্শ্ববর্তী এলাকার অধিকাংশ প্রবাসী ভারতীয়দের ওয়েস্ট ডিভোন এভিনিউতে মাসে তিন চারবার আসা খুবই জরুরি। সেখানকার প্রবাসী ভারতীয়রা - যারা নিজেদেরকে পাশ্চাত্য খাওয়া দাওয়ায় পুরোপুরি রপ্ত করতে পারেনি, তাদেরকে অবশ্যই দৈনন্দিন আহার এবং নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্য ক্রয়ের জন্য আসতে হয়। এই ওয়েস্ট ডিভোেন এভিনিউকে প্রবাসী ভারতীয়রা মিনি ইন্ডিয়া বলে থাকে। আমরা আমাদের দুপুরের আহারের জন্য এই মিনি ইন্ডিয়াতেই চলে আসি।
এমনিতেই ওয়েস্ট ডিভোেন এভিনিউতে সবসময় ভিড় লেগে থাকে। ছুটির দিনে উপচে পড়া ভিড়ের জন্য নিকটবর্তী জায়গায় গাড়ি পার্ক করার সমস্যা হয়। আমরা ওয়েস্ট ডিভোন এভিনিউতে পৌঁছে খোঁজে খোঁজে একটা পার্কিং স্লট পেয়ে তাড়াতাড়ি গাড়িটা সেখানে দাঁড় করিয়ে নেমে পড়ি। অরুণীমকে কারসিট সহ নামিয়ে ট্রলিতে চাপাই এবং পায়ে হাঁটা পথ দিয়ে চলতে থাকি।
রাস্তার দু’পাশে সারি সারি দোকান। দু’দিকের দোকানপাট এবং মানুষের যাতায়াত দেখে প্রবাসী ভারতীয়দের মত এলাকাটাকে শুধু মিনি ইন্ডিয়া বলেই মনে হয়নি। আবাল্য শিলচর শহরে বর্দ্ধিত হয়ে জানিগঞ্জের যে রূপ দেখে আসছি, আমার কাছে ওয়েস্ট ডিভোন এভিনিউ জানিগঞ্জেরই একটা বৃহৎ সংস্করণ বলে মনে হয়। ব্যতিক্রম কেবল জানিগঞ্জে পাগড়ী মাথায় শিখদের দোকান নেই।
যেতে যেতে দেখছি দু পাশে রয়েছে ফল-সজির দোকান, ভারতীয় শাড়ি এবং অন্যান্য কাপড়ের দোকান। রয়েছে চাউল, ডাল, তেল, নুন, মশলাপাতি প্রভৃতি নিত্য প্রয়োজনীয় ভারতীয়দের আহার দ্রব্য। তবে রাস্তার দু’পাশে বিভিন্ন প্রকার হোটেল ও রেস্তোরার অবস্থানই বেশি নজর কাড়ে। বেশিরভাগ ভারতীয় দোকানগুলির মালিক গুজরাটি এবং পাঞ্জাবী। অন্যান্য ভাষাভাষী এশিয়ানদের দোকানও রয়েছে, তাদেরকে চটজলদি পাঞ্জাবী এবং গুজরাটিদের মত চিহ্নিত করা যায় না।
রাস্তা দিয়ে মিনিট পনেরো চলতে চলতে একটা প্রশস্ত হোটেল নজরে পড়ে। সাইনবোর্ডে লিখা রয়েছে হোটেল ভাইসরয় অফ ইন্ডিয়া। আমরা হোটেল ভাইসরয় অফ ইন্ডিয়াতেই ঢুকে পড়ি। ঘরের বাইরে সাধারণত আমাদের নিরামিষ আহারই পছন্দ। হোটেল ভাইসরয় অফ ইন্ডিয়াতে নানা ধরনের আমিষ এবং অন্যান্য মিষ্ট দ্রব্য থাকা সত্বেও আমরা নিরামিষ আহারই গ্রহণ করি। আহার শেষে হেঁটে হেঁটে পার্কিং স্লটে গিয়ে আমাদের গাড়িতে উঠি। গাড়ি যাবে মিশিগান এভিনিউর আর্ট ইনস্টিটিউটে। আর্ট ইনস্টিটিউট আমাদের শিকাগো ভ্রমণের অন্যতম প্রধান আকর্ষণস্থল।
আর্ট ইনস্টিটিউট অব শিকাগো
ওয়েস্ট ডিভোন এভিনিউ থেকে গাড়ি চলে যায় মিশিগান এভিনিউতে। মিশিগান এভিনিউর প্রশস্ত দীর্ঘ সোজা রাস্তার উত্তর থেকে দক্ষিণে কিছুদূর এগিয়ে গিয়েই হলো আর্ট ইনস্টিটিউট অব শিকাগো। সেটার পাশে গিয়েই আমাদের গাড়ির গতিবেগ কমিয়ে দেওয়া হয়।
আমেরিকার প্রায় সব শহরের ডাউন টাউন এলাকায় গাড়ি থেকে নেমেই চট করে নির্ধারিত জায়গায় চলে যাওয়া যায় না। আগে নিজেদের গাড়িটাকে সঠিক জায়গায় রাখার ব্যবস্থা করতে হয়। গাড়ি সঠিক জায়গায় রাখার পর পায়ে হেঁটে সেখানে যেতে হবে।
আর্ট ইনস্টিটিউটের নিকটেই কিছুদূর এগিয়ে মিশিগান এভিনিউর পাশেই রয়েছে একটি মোটেল। আমাদের গাড়িটা ধীরে ধীরে সেখানেই নিয়ে যাওয়া হয়। মোটেলের তিনতলায় একটা স্লটে গাড়ি রেখে আবার হেঁটে হেঁটে চলে আসি আর্ট ইনস্টিটিউটের সামনে।
আর্ট ইনস্টিটিউটের সামনে একটা অনাকাঙ্খিত ব্যাপার আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বাঁ-দিকের গেট থেকে সামান্য দূরত্ব বজায় রেখে ছ’সাত জনের একটি দল জটলা বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েকজনের হাতে প্লেকার্ড এবং বাকীদের সামনে রয়েছে সিন্থেসাইজার এবং ড্রামসেট। হঠাৎ সমবেত বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ শুনে আমরা আকর্ষিত হই এবং ওদেরকে দেখতে পাই।
প্লে-কার্ডের একটিতে রয়েছে পূর্ণাঙ্গ গাধার ছবি যার মুখটা হলো অবিকল প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের মত। আর বাকীগুলোতে রয়েছে ইরাকে নিহত আমেরিকান সৈন্যের খতিয়ান এবং বুশের ইরাক নীতির সমালোচনা। তবে গাধার শরীরে বুশের মুখটাই সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়।
আগামীকাল ২৮শে মে আমেরিকার (Memorial Day) জাতীয় স্মরণ দিবস। আমেরিকার দেশপ্রেমিক বীর সৈনিক যারা কোরিয়া, ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান এবং ইরাক প্রভৃতি দেশে বিভিন্ন সময়ে আত্মাহুতি দিয়েছেন তাঁদেরকে দেশবাসী স্মরণ করবে এবং শ্রদ্ধা জানাবে। সেদিন কেবল স্মরণ মনন এবং শ্রদ্ধা নিবেদনের পালা। তাই স্মরণদিবসের প্রাক্কালে বুশ বিরোধীরা তাঁদের বিক্ষোভ প্রদর্শনের অঙ্গ হিসাবে এ ধরনের কার্যসূচি পালন করছে।
বুশমুখী গাধার প্লে-কার্ড যদিও বেশি নজর কাড়ে, আমি সেটা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে জটলাধারী লোকগুলোর মুখ ভালোভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি। সাধারণ বেশভূষায় লোকগুলোর মুখের ভাবভঙ্গী আমাদের শিলচর শহরের পরিচিত পোড়খাওয়া রাজনৈতিক কর্মী যারা সময়ে সময়ে রাস্তার মোড়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বিক্ষোভ প্রদর্শন করে তাদের সাথে অনেকটা মিল খুঁজে পাই। আর তখনই আমাদের গণতান্ত্রিক লেখক সংস্থার এক সময়ের সহকর্মী প্রয়াত প্রমথ চৌধুরী রচিত গানের কলি- ‘শোষিত মানুষের সীমারেখা নেই, নেই কোন সীমান্ত চিহ্ন’ আমার মনে পড়ে। বিক্ষোভকারীদের আন্দোলিত প্লে-কার্ড এবং কানসার্টের যুগলবন্দি আমাকে প্রেরণা দেয় প্রমথ চৌধুরীর গানের কলিকে ওদের সাথে ছন্দোবদ্ধ করতে। মনে মনে আমি তাই করতে চেষ্টা করি। তারপর কিছুটা উদ্দীপিত হয়েই সঙ্গে নিয়ে চলা ছোট ভিডিও ক্যামেরা দিয়ে ওদের ফটো তুলতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু পরমুহূর্তেই ইচ্ছাটা আবার দমে যায়- ভয় হয়। বিদেশ বিভুঁইয়ে, বুশের দেশেই দাঁড়িয়ে বুশমুখী গাধার ছবি তুলে আবার না কোন বিপদ টেনে আনি। থাক বাবা, ভিডিও ক্যামেরার ছবি তোলার দরকার নেই। মনের পর্দাতেই এ ছবি বাঁধানো থাক। এসব ভেবেই তাড়াতাড়ি সিংহদ্বার দিয়ে আর্ট ইনস্টিটিউটে ঢুকে পড়ি।
আর্ট ইনস্টিটিউটের রিসেপশন কাউন্টারে মহিলা কর্মীদের নিকট থেকে টিকিট কিনে আর্ট গ্যালারির প্রদর্শনী দেখতে এগিয়ে চলি। কাউন্টার থেকে দু’ পা এগিয়ে পশ্চিম দিকে ঘুরতেই নজরে পড়ে (Fullerton Hall) ফুলেরটন হল। ফুলেরটন হলের দরজা ভেজানো। হলটা পার হয়ে একের পর এক কোঠায় যেতে থাকি। তারপর সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় যাই। সেখানেও কোঠার পর কোঠা। সব কোঠাতেই রয়েছে নানা ধরনের শিল্প কার্য ও পুরাতত্ত্বের বস্তু সামগ্রী। পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেরই পুরাকাল থেকে আরম্ভ করে আধুনিক শিল্প ও কারুকার্যের নিদর্শন রয়েছে। বিদেশি দর্শণার্থীদের মধ্যে অনেকেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আগ্রহের সহিত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সেগুলো দেখছে। আবার কেউ কেউ ডাইরিতেও সেগুলোর নোট নিয়ে নিচ্ছে।
আমার কিন্তু গ্যালারির চিত্রশিল্প এবং ভাস্কর্যের রকমারি বস্তুসম্ভার ঘুরে ঘুরে দেখতে মন মোটেই সায় দেয়নি। মনে ভীষণ উচাটন হয়। আমি শিকাগোর আর্ট ইনস্টিটিউটে বিশ্বের নানা চিত্রশিল্প এবং ভাস্কর্যের রস আস্বাদন করতে আসিনি। আমি ভারতীয় এবং মধ্যবিত্ত বাঙালি। কৈশোর থেকে আজ অবধি স্বামী বিবেকানন্দই ভারতমায়ের শ্রেষ্ঠ সন্তানরূপে আমার হৃদয়জুড়ে শ্রদ্ধার আসনে বিরাজ করছে। পরাধীন ভারতের এই হিন্দু সন্ন্যাসী মাত্র ৩০ বছরের যুবক স্বামী বিবেকানন্দ আধুনিক বিজ্ঞান ও ধনবলে উন্নত পাশ্চাত্যের শিকাগো শহরে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ধর্ম মহাসম্মেলনে ভারতের ধর্ম ও আধ্যাত্মবাদের কথা বিশ্ববাসীকে শুনিয়ে ভারতকে জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসনে আসীন করার সোপান তৈরি করে গিয়েছিলেন। আমি স্বামী বিবেকানন্দের স্মৃতি বিজড়িত সেই শিকাগো দেখে নিজেকে ধন্য করতে এসেছি। তাই বাকী আরও যেসব কোঠায় প্রদর্শনী রয়েছে সেগুলো দেখতে যাইনি। অরুণীমের ট্রলি ঠেলে ঠেলে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আবার ফুলেরটন হলের সামনে চলে আসি।
আর্ট ইনস্টিটিউটের ফুলেরটন হলটা বর্তমানে যে জায়গায় রয়েছে সেখানেই কিছু জায়গা জুড়ে ছিল হল অফ কলোম্বাস। চার হাজার শ্রোতার আসন বিশিষ্ট অস্থায়ী হল অফ কলোম্বাসের বক্তৃতা মঞ্চে দাঁড়িয়েই স্বামী বিবেকানন্দ আমেরিকান বোন ও ভাইদেরকে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন সন্ন্যাসী সমাজ, সকল ধর্মের জননী এবং নানা শ্রেণি ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত লক্ষ লক্ষ হিন্দু নরনারীর পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছিলেন। এই ধর্ম মহাসম্মেলনেই তেজস্বী এবং সুদর্শন যুবক প্রতিনিধির সে সময়কার সকল বক্তব্য শুনে তৎকালীন নিউইয়র্ক হেরল্ড পত্রিকা উল্লেখ করেছিল হিন্দু সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দই ছিলেন নিঃসন্দেহে সেই বিশ্ব ধর্ম মহাসম্মেনলনের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব।
বিশ্ব ধর্ম মহাসম্মেলনের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব স্বামী বিবেকানন্দ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করেছিলেন আজ সে জায়গা দেখার সুযোগ পেয়েছি ভেবে নিজেকে ধন্য মনে করি এবং রোমাঞ্চিত হই। মনে মনে ভাবি, বিশ্ব ধর্ম মহাসম্মেলনের হল অফ কলোম্বাস বিলুপ্ত হয়ে ফুলেরটন হলের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। সময়ের প্রবাহে কলোম্বাসের চতুর্থ শতাব্দী জয়ন্তীর অনেক কিছুই বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছে। কিন্তু সে সময়ের বিশ্ব ধর্ম মহাসম্মেলনের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব স্বামী বিবেকানন্দ আজও স্মরণীয় এবং তাঁর ভাবাদর্শের বিস্তৃতির পরিধি ক্রমবর্ধমান।
হ্যাঁ, সত্যিই তাই। এখানে স্বামীজির আদর্শের বিস্তৃতির পরিধি ক্রমবর্ধমান। বিবেকানন্দ বেদান্ত সোসাইটির উদ্যোগে ১১ই সেপ্টেম্বর ১৯৯৩ ইংরাজীতে স্বামী বিবেকানন্দের শিকাগো বিশ্ব ধর্ম মহা সম্মেলনের ভাষণের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে আর্ট ইনস্টিটিউটের ফুলেরটন হলে অনুষ্ঠান হয়। ১৯৯৫ ইংরাজীর ১১ই সেপ্টেম্বর ফুলেরটন হলের দক্ষিণ দিকের দেওয়ালের বাইরে (যে জায়গায় বিশ্ব ধর্ম মহাসম্মেলনে হল অফ কলোম্বাসের অস্থায়ী মঞ্চ ছিল) স্মৃতিফলক উন্মোচন করা হয়। সেই ফলকে ইংরাজীতে লিখা রয়েছে - On this site between September 11 & 27, 1893 Swami Vivekananda (1863-1902), the first Hindu monk from India to teach Vedanta in America, addressed the world’s Parliament of Religions, held in conjunction with the world’s Colombian Exposition. His un-precedented success opened the way for the dialogue between Eastern & Western religions.
১৯৯৫ সালেই ১১ নভেম্বর তারিখে শিকাগো বেদান্ত সোসাইটি, ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়, আর্ট ইনস্টিটিউট অব শিকাগোর কর্তৃপক্ষ এবং অবশ্যই শিকাগো প্রশাসনের সহমতে আর্ট ইনস্টিটিউটের সামনে দক্ষিণের এডামস স্ট্রীট থেকে উত্তরের মনরো (Monroe Street) স্ট্রিট পর্যন্ত বিস্তৃত মিশিগান এভিনিউর অংশটুকু কেবলমাত্র স্বামী বিবেকানন্দের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য ‘স্বামী বিবেকানন্দ ওয়ে’ নাম রেখেছে।
আমরা ফুলেরটন হলের পাশ থেকে বেরিয়ে, দক্ষিণে বাইরে বিবেকানন্দ স্মৃতি ফলকের পাশ দিয়ে চলে যাই স্বামী বিবেকানন্দ ওয়েতে। অর্থাৎ আর্ট ইনস্টিটিউট অব শিকাগোর সামনে প্রশস্ত মিশিগান এভিনিউতে। সেখান থেকে সামান্য উত্তরেই হলো আর্ট ইনস্টিটিউটের গেট। গেটের পাশে জটলাবাঁধা বুশ বিরোধী বিক্ষোভকারীরা তখন আর নেই। সরকারি হস্তক্ষেপে ওদের সেখান থেকে চলে যাওয়ার কোনও লক্ষণ টের পাইনি। হয়তবা অন্য কোনও জায়গায় ওদের বিশেষ কার্যসূচি রয়েছে, তাই চলে গেছে। গেটের সামনে লোকজন কম। বলতে গেলে প্রায় ফাঁকাই। আমরা অরুণীমের ট্রলি ঠেলে ঠেলে স্বামী বিবেকানন্দ ওয়ের উত্তরদিকে এগোতে থাকি।
মিলেনিয়াম পার্ক
ইস্ট মনরো স্ট্রীট (E Monroe St.) যেখানটায় এসে মিশিগান এভিনিউতে মিশেছে সেখানেই স্বামী বিবেকানন্দ ওয়ের উত্তর সীমানা। আমরা বিবেকানন্দ ওয়ের উত্তর সীমানা পার হয়ে ঢুকে যাই (Millenium Park) মিলেনিয়াম পার্কে।
মিলেনিয়াম পার্ক শিকাগো শহরের নতুন সংযোজন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আগত ভ্রমণার্থীদের নিকট উইন্ডি সিটি শিকাগোর এই মিলেনিয়াম পার্ক বর্তমানে বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। মিলেনিয়াম পার্কে উল্লেখযোগ্য বস্তুগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্রাউন ফাউনটেইন, (Crown fountain) ক্লাউড গেট, (Cloud gate) জে প্রিটজকার প্যাভেলিয়ান (Pritzkar Pavellion) এবং লুরি গার্ডেন (Lurie Garden) সহ আরও অনেক কিছু।
ক্রাউন ফাউনটেইন হলো ওয়াটার পুলের উপর খাড়া ৫০ ফুট উঁচু বিশেষ ধরনের গ্লাস ব্রিকের (Glass Brick) জোড়া টাওয়ার। টাওয়ারের বর্হিভাগের মসৃণ আবরণের মাঝখানে নোজল (nozzle) রয়েছে যা দিয়ে ছিটিয়ে জল বেরোয়। তাছাড়া উপরিভাগ থেকে ক্রমান্বয়ে টাওয়ারের গা ভেসে জল পড়তে থাকে। গরমের দিনে কচি কাঁচারা উদোম গায়ে টাওয়ারের পাদদেশে নোজল থেকে ছিটিয়ে এবং টাওয়ার বেয়ে পড়া জল দিয়ে মহানন্দে জলখেলি করে। আমরা সেই ক্রাউন টাওয়ারের পাশে গিয়ে দেখি সাদা চামড়া এবং কালো চামড়ার ছোট ছোট বাচ্চারা নির্বিরোধে অফুরন্ত আনন্দ উল্লাসে সেই জল নিয়ে খেলা করছে। তাদের জলখেলি দেখে আমরাও কিছু আনন্দ সংগ্রহ করে চলে যাই ক্লাউড গেটের দিকে।
ক্লাউড গেট হচ্ছে বিশাল গোলাকৃতি গ্লোবের মত বস্তু, বিশেষভাবে দণ্ডায়মান। সেটার উপরিভাগ গ্লোবের মত হলেও নিজের দিকটা কনকেইভ আকৃতিতে রয়েছে। পুরোটা চকচকে স্টেইনলেস স্টীলের তৈরি। ক্লাউড গেটের উপরিভাগে গোলাকৃতি জায়গায় আশপাশের গগনচুম্বী অট্টালিকাগুলোর ছবি সুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়। সামনে দাঁড়িয়ে সারিবদ্ধ গগনচুম্বী অট্টালিকাগুলোর প্রতিচ্ছবি দেখতে খুবই সুন্দর। আর নিচের অংশে দেখা যায় সামনে দণ্ডায়মান দর্শনার্থীদের অদ্ভুত প্রতিচ্ছবি। নিজের প্রতিফলিত বিকৃত ছবিগুলো দেখলেই হাসি পায়। মনে হয় দুনিয়ার যে কোন নৈকষ্য গুমড়োমুখো ব্যক্তিও ওটার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ছবি দেখলে না হেসে পারবো না। বেশ কিছুক্ষণ ক্লাউড গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা হাসি এবং পরে হাসতে হাসতেই জে প্রিটজকার প্যাভিলিয়নের দিকে পা বাড়াই।
সুন্দর কারুকার্যের অনুপম প্রকাশ এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বিস্তর প্রয়োেগ রয়েছে জে প্রিটজকার প্যাভেলিয়নে। একদিকে আবৃত বৃহৎ রঙ্গমঞ্চ এবং সামনে উন্মুক্ত বিস্তৃত জায়গা জুড়ে দর্শকাসন। আমরা প্যাভেলিয়নে প্রবেশ না করে বাইরে দাঁড়িয়েই দেখি। রঙ্গমঞ্চে রয়েছে কয়েকজন কনসার্টের কুশীলব। ওদের কনসার্টের শ্রুতিমধুর আওয়াজ ভেসে আসছে। খুব সম্ভব স্মরণ দিবসের কোনও অনুষ্ঠানের মহড়া দিচ্ছে। চারদিকের সুদৃশ্য গগনচুম্বী অট্টালিকা, সামান্যদূরে দৃশ্যমান লুরি গার্ডেন, স্থানে স্থানে নানা রঙ বেরঙের পোশাক পরিচ্ছদে জটলা বাঁধা উচ্ছল নরনারী এবং এরইমধ্যে ভেসে আসা সুমধুর কনসার্টের আওয়াজ সমগ্র পরিবেশে এক বিশেষ মাত্রা জুড়ে দেয়।
অনেকক্ষণ যাবত হাঁটাহাঁটি এবং দাঁড়িয়ে সব দেখতে দেখতে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়ি। জে প্রিটজকার প্যাভেলিয়নটার সামান্য দূরেই দর্শনার্থীদের বসে বিশ্রাম করার জন্য রাখা সুন্দর আরামদায়ক বেঞ্চে বসে পড়ি। কনসার্টের আওয়াজ তখনও ভেসে আসে।
পার্কের বেঞ্চিতে বসে মনে মনে ভাবি আগামীকাল আমেরিকার দেশবাসী বিভিন্ন যুদ্ধে নিহত তাঁদের দেশের বীরসেনানীদের স্মরণ করবে। নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁদেরকে শ্রদ্ধা নিবেদন করবে। অথচ কি আশ্চর্য! আমেরিকার স্মরণযোগ্য বীরসেনানীদের অনেকেই কিন্তু ভিয়েতনামের মতো আরও মুক্তিকামী দেশের হাজারো দেশপ্রেমিক বিপ্লবীদেরকে নিঃশেষ করতে গিয়েই নিহত হয়েছেন। তাহলে? এসব ভাবনা মনে ভেসে উঠে। তবুও সুন্দর পরিবেশে, বিশ্রাম করার অবকাশে সুমধুর কনসার্টের আওয়াজ শুনে, আমেরিকানদের জাতীয় স্মরণ উপলক্ষে ওদের কার্যসূচির কথা ভেবে ভালো লাগে। কিন্তু ওদেশের বীর সেনানীদের আত্মবলিদানের জন্য শ্রদ্ধা নিবেদনের কোনও অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার তাগিদ অনুভব করি না। জাতীয় জীবনের মহাপুরুষ স্বামী বিবেকানন্দের স্মৃতি বিজড়িত শিকাগোর প্রসঙ্গই মনে টানে। কনসার্টের সুরেলা আওয়াজে আবিষ্ট মনকে ঝটকা দেই, টেনে আনি শিকাগোর স্বামী বিবেকানন্দ প্রসঙ্গে।
মিলেনিয়াম পার্কের বেঞ্চিতে বসেই সাউথ হাইড পার্ক বুলিবার্ডের বিবেকানন্দ মন্দিরে গৃহীভক্তের দেয়া বেদান্ত সোসাইটির প্রাচরপত্রে মনোনিবেশ করি। তাতে উল্লেখ রয়েছে শিকাগোর বর্তমান প্রবাসী ভারতীয় হিন্দুদের স্বামী বিবেকানন্দের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের নিদর্শন।
বর্তমান বৃহত্তর শিকাগোর দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত লেমন্ট (Lemont) নামক জায়গায় ভারতীয়দের প্রচেষ্টায় তৈরি হয়েছে হিন্দু টেম্পল। এই হিন্দু টেম্পল সংলগ্ন উঁচু স্থানের নাম রাখা হয়েছে ‘বিবেকানন্দ হিল’। আর এই বিবেকানন্দ হিলেই স্বামী বিবেকানন্দের ১০ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতা বিশিষ্ট একটি ব্রোঞ্জের মূর্তি স্থাপন করা হয়। মূর্তিটি নির্মাণ করেন কলকাতার জি পাল অ্যান্ড সন্স। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অন্যতম সহ-সভাপতি স্বামী আত্মস্থানানন্দ ১২ই জুলাই ১৯৯৮ ইংরেজিতে লেমন্টে হিন্দু টেম্পল সংলগ্ন বিবেকানন্দ হিলে সেটা নিবেদন করেন।
তাছাড়া রয়েছে বিবেকানন্দ বেদান্ত সোসাইটি কর্তৃক “শ্রী রামকৃষ্ণ ইউনির্ভাসেল টেম্পল” নির্মাণের প্রকল্প। বৃহত্তর শিকাগোর লেমন্ট অঞ্চলের আরও চার মাইল দক্ষিণে হোমের প্লেন (Homer Glen) নামক স্থানে ১৫ একর বিস্তৃত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এলাকায় নির্মিত হচ্ছে দুই কিস্তিতে পূর্ণাঙ্গ শ্রী রামকৃষ্ণ ইউনিভার্সেল টেম্পল। বিগত ২০০৫ ইংরেজির অক্টোবর মাসে ভূমি পূজনের পর দ্রুতলয়ে এই মন্দিরের কাজ এগিয়ে চলছে। ১লা জুলাই ২০০৭ ইংরেজিতে পূজার্চ্চনা, মন্ত্রপাঠ এবং যজ্ঞানুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রথম পর্বে সমাপ্ত মন্দিরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। ব্যাপারটা কতই না আনন্দের! শিকাগো শহরে স্বামী বিবেকানন্দের স্মৃতি বিজড়িত স্থানগুলো যথাযোগ্য মর্যাদায় স্মরণীয় করে রাখার পরও নতুনভাবে বৃহত্তর শিকাগো শহরেই গড়ে উঠেছে বিশ্বকে আপন করে নেওয়ার সর্বধর্ম সমন্বয়ের আদর্শে শ্রী রামকৃষ্ণ ইউনিভার্সেল টেম্পল।
পার্কের বেঞ্চিতে বসে থাকা অবস্থায় মনের মধ্যে লেমন্টের বিবেকানন্দ হিল, হোমের প্লেনে শ্রী রামকৃষ্ণ ইউনিভার্সেল টেম্পল প্রভৃতির ভাবনার আলোড়নই চলতে থাকে। ইতিমধ্যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা ধেয়ে আসে। উইন্ডি সিটির আকাশ থেকে দিনমণির কিরণ বিলীন হতে থাকে। বিজলী বাতির ঝলমলানির প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। আমরাও গা ঝাড়া দিয়ে উঠি পড়ি।
মিলেনিয়াম পার্ক থেকে বেরিয়ে ধীরে ধীরে চলে যাই মোটেলে। সেখানে গিয়ে গাড়িতে উঠি। তারপর মোটেল থেকে গাড়ি রাস্তায় বের করে দূরন্ত গতিতে চলতে থাকি শিকাগো শহরে আমাদের দুদিনের আস্তানা রোসমন্টের হোলিডে ইন হোটেলের দিকে।
গগনচুম্বী সিয়ার্স টাওয়ারের স্কাইডেক
২৮শে মে অতি প্রত্যুষেই রোসমন্টের হোলিডে ইন হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়ি। ঐ দিনই আমাদের শিকাগো ভ্রমণের অন্তিম দিন। রোসমন্ট থেকে সোজা চলে যাই ২৩৩ সাউথ ওয়েকার ড্রাইভে। সেখানেই দণ্ডায়মান রয়েছে সিয়ার্স টাওয়ার। বিগত ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর তারিখে ওসামা বিন লাদেন গোষ্ঠীর জঙ্গি হামলায় ১৭২৭ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার গুড়িয়ে যাওয়ায় বর্তমানে ১৪৫০.৫৮ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট সিয়ার্স টাওয়ারই আমেরিকার সবচেয়ে বেশি উঁচু গগনচুম্বী অট্টালিকা।
সকাল ৯ ঘটিকার মধ্যেই এস ওয়েকার ড্রাইভে পৌঁছাই। ধারে কাছে গাড়ি পার্ক করার নির্দিষ্ট জায়গা আগে থেকে জানা না থাকায় এদিক-সেদিক ঘুরাঘুরি করে কিছুটা সময় দিতে হয়। অবশেষে সিয়ার্স টাওয়ারের অনতিদূরেই একটা জায়গা পাওয়া যায়। সেখানে গাড়ি পার্কিং করে সিয়ার্স টাওয়ারের উদ্দেশ্যে পায়ে হেঁটে রওয়ানা দেই। ইতিমধ্যেই দর্শনার্থীরা সিয়ার্স টাওয়ারের পাদদেশে এসে ভিড় জমিয়েছে। সিয়ার্স টাওয়ারে প্রবেশ এবং স্কাইডেকে (Sky deck) উঠার জন্য টিকিট কাটতে হয়। তবে সহজেই টিকিট সংগ্রহ করার সুযোগ নেই। দর্শনার্থীদের নির্দিষ্ট পথ ধরে এগিয়ে এবং ভিডিও ক্যামেরার মুখোমুখি হয়ে সিকিউরিটি চেকিং এর আধুনিকতম বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করতে হয়। তারপরই টিকিট সংগ্রহ এবং সিয়ার্স টাওয়ারের ভেতরে প্রবেশ।
সিয়ার্স টাওয়ারের স্কাইডেকে উঠার জন্য বড় এলিভেটর রয়েছে। এলিভেটর দিয়েই পর্যায়ক্রমে দর্শণার্থীদের উঠানামা করানো হয়। যে এলিভেটরটি আমাদেরকে নিয়ে স্কাইডেকে উঠে, সেটাতে ন্যূনতম পঁচিশজনের মত ছিলাম। ১০৮ তালার গগনচুম্বী অট্টালিকাটির ভূমি থেকে ১৩৫৩ ফুট উঁচুতে ১০৩ তালায় রয়েছে স্কাইডেক। মিনিট খানেক সময়ব্যাপী সচল এলিভেটর আমাদেরকে নিচ থেকে ঠেলে ১০৩ তালায় তুলে দেয়। বদ্ধ এলিভেটর থেকে বেরিয়ে দেখি আলোময় খোলামেলা পরিচ্ছন্ন স্কাইডেক। দর্শনার্থীরা বেশ আরাম আয়াসেই স্কাইডেকের চতুর্দিকে চলাচল করতে পারে। চারদিকে রয়েছে স্বচ্ছ মজবুত ফাইবার গ্লাসের আবরণ। এপ্রিল মে মাসের পরিষ্কার আবহাওয়ায় এই স্কাইডেকের ভিতর থেকেই স্বচ্ছ ফাইবার গ্লাসের মধ্য দিয়ে ইলিনয়ীস, ইন্ডিয়ানা, মিশিগান ও উইস-কিনসন প্রভৃতি চারটি রাজ্যের দূরান্তের মনোরম দৃশ্যাবলী দেখা যায়। দেখা যায় শিকাগো শহরের সারিবদ্ধ আকাশচুম্বী সুরম্য অট্টালিকা এবং পূবদিকে দিগন্ত বিস্তৃত লেইক মিশিগানের আকাশ রঙের নিস্তরঙ্গ জলরাশি।
আমরা আমেরিকার সবচেয়ে উঁচু অট্টালিকার স্কাইডেকের চতুর্দিকে ঘুরাফেরা করি। বাইরের মনোরম দৃশ্যাবলী দেখি এবং স্কাইডেকের অভ্যন্তরেই মাঝে মাঝে ফটো তুলি। প্রায় ঘন্টা খানেক সময় কাটিয়ে আবার এলিভেটর চড়ে নিচে নেমে আসি। সিয়ার্স টাওয়ার থেকে নেমে কিছুটা হেঁটে পার্কিং জোনে গিয়ে গাড়িতে চাপতে হবে। সিয়ার্স টাওয়ারের বহির্পথ দিয়ে বাইরে রাস্তায় বেরিয়েই নজরে পরে নদী। সিয়ার্স টাওয়ারের লাগোয়া, প্রায় পাদদেশ দিয়েই উত্তর দক্ষিণ বরাবর বয়ে চলছে ক্ষীণাঙ্গী শিকাগো নদী। নদীটা উত্তরে কিছুটা এগিয়ে দ্বিধা-বিভক্ত হয়ে যায়। একটা পূবদিকে বাঁক নিয়ে কিছু দূর এগিয়ে মিলে যায় লেইক মিশিগানে। অন্যটা আরও ক্ষীণ অবস্থায় মধ্য শিকাগো শহরের উত্তর সীমানায় বিস্তৃত। সিয়ার্স টাওয়ারের পাশ দিয়ে শিকাগো নদী বয়ে যাত্রীবাহী ছোট ছোট সুসজ্জিত লঞ্চ চলছে। আমোদপ্রিয় দর্শনার্থীরা জলপথে শিকাগো শহরের সৌন্দর্য উপভোগ করছে। আমরা শিকাগো নদীর জলপথের যাত্রীদের দেখতে দেখতেই পার্কিং জোনে পৌঁছে যাই।
পার্কিং জোনে গিয়ে গাড়িতে উঠেই তাড়াতাড়ি চলে যাই ওয়েস্ট ডিভোন এভিনিউতে। সারাদিন নিশ্চিন্তে চলাফেরার জন্য দ্বিপ্রাহরিক আহার পর্বটা ঝটপট ওয়েস্ট ডিভোন এভিনিউতে চুকে নিতে হয়। কিন্তু মেমোরিয়েল ডে উপলক্ষে ছুটির দিন হওয়ায় ওয়েস্ট ডিভোন এভিনিউতে সেদিন ভ্রমণার্থীদের সংখ্যা অধিক এবং হোটেল রেস্টুরেন্টে খুব ভিড়। আমরা লাইনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে খাবার আসন গ্রহণ করি। ভ্রমণসূচীতে দুপুর বেলায় আহারের জন্য যতটুকু সময় ধার্য করা হয়েছিল তার দ্বিগুণ সময়ই অতিবাহিত হয়। তাড়াতাড়ি আহার শেষ করেই আমরা রওয়ানা দেই ৬০০ই গ্র্যান্ড এভিনিউর উদ্দেশ্যে।
বিনোদন কেন্দ্র নেভি পাইয়ার
শিকাগো শহরের ৬০০ই গ্র্যান্ড এভিনিউতে লেইক শোর ড্রাইভ সংলগ্ন লেইক মিশিগানের উপর অবস্থিত বিখ্যাত (Navy Pier) নেভি পাইয়ার। চিত্ত এবং অবসর বিনোদনের নানাবিধ ব্যবস্থা রয়েছে এই নেভি পাইয়ারে। ছুটির দিনে উপচে পড়ে নানা বর্গ ও বর্ণের ভ্রমণার্থীরা। নেভি পাইয়ারে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য রয়েছে বিখ্যাত শিকাগো থিয়েটার, আইম্যাক্স থিয়েটার। আরও রকমারি অনুষ্ঠানের জন্য আছে ফেমিলি পেভেলিয়ন স্টেজ, ডক স্ট্রীট স্টেজ এবং পেপসি স্কাই লাইন স্টেজ প্রভৃতি। তাছাড়া রয়েছে শিকাগো চিলড্রেন্স মিউজিয়াম, বীয়ার গার্ডেন, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দেশীয় আহারের রেস্তোরা এবং আরও কত কি।
আমরা নেভি পাইয়ারে ঢুকেই ধীরে ধীরে হেঁটে পশ্চিম থেকে পূবে এগিয়ে চলি। অধিক সংখ্যক লোক সমাগমে নেভি পাইয়ার ভারাক্রান্ত। নজরে পড়ে অগুনতি মানুষ রেস্তোরায় বসে গল্পগুজব করে তাড়িয়ে তাড়িয়ে খাবার খাচ্ছে। কিছুদূরে উন্মুক্ত মঞ্চে নারীপুরুষ একযোগে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে নাচ গান করছে। কিছু দর্শক দাঁড়িয়ে সেটা উপভোগ করছে। আবার অনেকেই চলার পথে থেমে থেমে মনপসন্দ দৃশ্যাবলী ক্যামেরাবন্দী করে নিচ্ছে। আমরা পশ্চিমে শিকাগো শহরের সুরম্য অট্টালিকার দৃশ্যাবলী পিছনে রেখে পূবের সীমাহীন দুরত্বে দিগন্তে মিলিয়ে যাওয়া মিশিগান লেইকের জলরাশি দেখতে দেখতে কিছুদুর এগিয়ে নেভি পাইয়ারের দ্বিতল ডেকে অবস্থিত পাইয়ার পার্কে উঠি।
পাইয়ার পার্কে রয়েছে খুব সুন্দরভাবে তৈরি পথ, ঘোড়া প্রভৃতির উপর বসে যন্ত্রসঙ্গীতের তালে তালে চক্রাকারে ছুটে চলে আনন্দ উপভোগ করার উপকরণ মিউজিক্যাল কেরুসেল। রয়েছে ১৫০ ফুট উঁচু অতিকায় হুইলের ২৪০টি আসনে আরোহী বসিয়ে সাত মিনিট সময়ব্যাপী চক্রাকারে উপর নীচ উঠানামা করার বিখ্যাত ফেরিস হইল। তাছাড়া রয়েছে পেপসি স্কাই লাইন স্টেজ এবং ক্রিস্টেল গার্ডেন প্রভৃতি।
মিউজিক্যাল কেরুসেল কিংবা ফেরিস হইল কোনটাতেই চড়ে আনন্দ উপভোগ করতে আমাদের সাহস হয়নি। কারণ শিকাগো ভ্রমণে সবকিছুতেই আমাদের সঙ্গী রয়েছে অরুণীম বাবু। শিশু অরুণীমকে সঙ্গে নিয়ে এসব আনন্দের অংশীদার হওয়া অসম্ভব। কাজেই কেবল দেখার আনন্দ উপভোগ করেই ফেরিস হুইল, মিউজিক্যাল কেরুসেলের পাশ দিয়ে হেঁটে চলে যাই ক্রিস্টেল গার্ডেনে।
আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগে ঝকঝকে স্টীলের স্ট্রাকচার এবং স্বচ্ছ কাচের ছাউনির আবেষ্টনীতে সুদর্শন ক্রিষ্টেল গার্ডেন অতি সহজেই দর্শকের মন কেড়ে নেয়। সেখানে রয়েছে পাম গাছ, বিভিন্ন ধরনের ফার্ন, ক্যাকটাস আর রকমারী মরশুমি ফুলের গাছ। আমরা বেশ কিছু সময় ক্রিস্টেল গার্ডেনে হাঁটাহাঁটি করি। তারপর কিছু দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করে দ্বিতল ডেক থেকে নিচে নেমে আসি।
দ্বিতল ডেক থেকে নিচে নেমে এসে নেভি পাইয়ার থেকে আমাদের বেরিয়ে আসার পালা। বাইরে চলে আসার পথে মুক্তাঙ্গনে রয়েছে রেস্তোরা। অনেকক্ষণ হাঁটাহাঁটি এবং ঘুরে দেখার পর ক্লান্তি আসে। চা কিংবা কফি পান করে কিছুটা চাঙ্গা হওয়ার মনবাসনা জাগে। চলতি পথে মুক্তাঙ্গনে রেস্তোরায় খালি আসন পেয়ে বসে পড়ি। তৃষ্ণা নিবারণ এবং অবসাদ দূর করার জন্য এক গ্লাস কফি এবং পটেটো চীপস মুখে পুরে চিবোতে থাকি। কিন্তু কফিতে চুমুক এবং চীপস চিবিয়ে মজা পাওয়ার যে ভাবনা মনে ছিল সেটাতে বিরাট ধাক্কা লাগে। তেতো গরম কফি এবং তেল মশলা লবণবিহীন পটেটো চীপস সারা মুখ বিস্বাদে ভরে দেয়। দ্বিতীয়বার আস্বাদনে আর কিছুতেই মন এগোয় না। মুখের বিস্বাদ মনের বিষাদকে চাঙ্গা করে দেয়। সেটা আরও বেশি চাগাড় দিয়ে উঠে যখন দেখি এক গ্লাস কফি এবং সামান্য চীপসের দাম বাবদ সাত ডলার অর্থাৎ প্রায় সাড়ে তিনশ টাকা পকেট থেকে বেরিয়ে গেছে। নিজ দেশে আমাদের পাড়ার মোড়ে ভইজ্যা কিংবা পবনের দোকানে একমাসব্যাপী চা সহযোগে দুটো করে তেলেভাজা খেলেও এত টাকার বিল হবে না। অথচ শীতের সন্ধ্যায় চায়ের সঙ্গে মুখরোচক তেলে ভাজা কি আনন্দটাই না দেয়। আর এখানে? এক গ্লাস তেতো কফি আর সামান্য বোদা আলুভাজার বিনিময়ে একবারই তিনশ পঞ্চাশ টাকা নিয়ে নিচ্ছে। না, আর কখনই এদেশে থাকাকালীন এভাবে মুক্তাঙ্গনের কোন রেস্তোরায় চা কফি খাওয়ার বাসনাকে আমল দেব না। অগত্যা বিরক্ত মন নিয়েই কফির গ্লাস এবং পটেটো চীপস পাশের ওয়েস্ট ড্রামে ফেলে দেই। তারপর ধীরে ধীরে হেঁটে নেভি পাইয়ার থেকে বেরিয়ে পার্কিং জোনে গিয়ে আমাদের গাড়িতে উঠি।
শিকাগো ভ্রমণে অন্তিম পর্বের সুখানুভূতি
লেইকশোর ড্রাইভ ধরে গাড়ি উত্তরমুখী হয়ে এগোতে থাকে। তখন আমাদের শিকাগো ভ্রমণের অন্তিম পর্ব। এই অন্তিমপর্বে স্বামী বিবেকানন্দ স্মৃতি বিজড়িত কিছু স্থান কেবল চলতি পথে চোখের দেখায় দেখে যাবো। সেগুলো হচ্ছে ১৪১৫ নর্থ ডিয়ারবর্ণ স্ট্রীট, লিঙ্কন পার্কের প্রবেশদ্বার এবং লিঙ্কন পার্কের পাশে লেইক শোর ড্রাইভ সংলগ্ন লেইক মিশিগানের বালুতট।
জায়গাগুলোতে বর্তমানে স্বামী বিবেকানন্দের কোন স্মৃতি চিহ্ন কিংবা ফলক নেই। তবে স্বামী বিবেকানন্দের ধর্ম মহাসম্মেলনে যোগদান এবং তৎপরবর্তী সময়ে পাশ্চাত্য বেদান্ত দর্শন প্রচারের জন্য সেগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম।
১৮৯৩ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর তারিখে স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্বধর্ম মহাসম্মেলনে যোগদানের জন্য শিকাগোতে পৌঁছান। তাঁর কাছে নিজের পরিচয়পত্র সবকিছু থাকা সত্ত্বেও বিশ্ব ধর্ম মহাসম্মেলনের চেয়ারম্যান রেভারেন্ড জন বারুজের সাথে দেখা করতে পারেননি। কারণ তিনি রেভারেন্ড বারুজের ঠিকানা হারিয়ে ফেলেছিলেন।
রেল স্টেশন থেকে বেরিয়ে স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগো শহরের উত্তর পূর্বাঞ্চল এলাকায় চলাফেরা করেন। কিন্তু ভাষার দুর্বোধ্যতার জন্য তিনি ধর্মমহাসম্মেলনের চেয়ারম্যানের ঠিকানা কিংবা নিকটস্থ কোন হোটেলের সন্ধান পাননি। অগত্যা সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসার সাথে সাথেই তিনি স্টেশনে ফিরে যান। সেখানে স্টেশন চত্বরে একটা ফাঁকা বাক্স দেখতে পান এবং সর্বশক্তিমান ঈশ্বরকে স্মরণ করে সেই ফাঁকা বাক্সেই শুয়ে পড়েন।
পরদিন অর্থাৎ ১০ই সেপ্টেম্বর খুব ভোরেই স্বামীজীর ঘুম ভেঙে যায়। তিনি স্টেশন থেকে বেরিয়ে পুব দিকে হাঁটতে থাকেন। মাথায় একমাত্র চিন্তা পার্লামেন্ট অফ রিলিজিয়নের অফিস খুঁজে বের করা। পায়ে হেঁটে চলতে চলতে স্বামী বিবেকানন্দ পরিশ্রান্ত হন। গেলো কাল শিকাগো পৌঁছার পর তিনি কোন খাবারও খেতে পাননি। ক্ষুধার্ত ও পরিশ্রান্ত স্বামী বিবেকানন্দ তাই কিছুটা ক্লান্তি নিরসনে পথের পাশে একটা উনুন ঘেরা পাঁচিলে বসে পড়েন। জায়গাটা ছিল সেন্ট ক্রিসোস্টম চার্চের পাশে এবং তৎকালীন ৫৪১ নং ডিয়ারবর্ন এভিনিউএর বাড়িটার ঠিক উল্টোদিকে।
৫৪১ ডিয়ারবর্ন এভিনিউর বাড়ির গৃহিনী মিসেস এলেন ইসাবেল হেইল সকালবেলা নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে উল্টোদিকে রাস্তার ওপারে উনুন ঘেরা পাঁচিলে বসা থাকা অদ্ভুত পোশাক পরিহিত সৌম্যদর্শন যুবককে দেখতে পান। তিনি উৎসুক হয়ে তাঁর নিকট এগিয়ে যান। বার্তালাপে জানতে পারেন যে সৌম্যদর্শন অদ্ভুত পোশাক পরিহিত লোকটি বিশ্বধর্ম মহাসম্মেলনে যোগদান করতে এসেছেন। মিসেস হেইল তাঁকে সাদরে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান, কিছু খাবার দেন এবং পরে তাঁকে সঙ্গে নিয়ে পার্লামেন্ট অফ রিলিজিয়নের কর্মকর্তাদের নিকট গিয়ে বিশ্বধর্ম মহাসম্মেলনে প্রতিনিধিত্ব করার ব্যাপারে সহয়তা করেন।
বিশ্বধর্ম মহাসম্মেলনের পরেও স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগো শহরে ৫৪১ নং ডিয়ারবর্ন এভিনিউর হেইলদের বাড়িতেই অনেকদিন থেকেছেন। তিনি মিসেস এলেন ইসাবেল হেইলকে মাতৃসম দেখতেন এবং তাঁর স্বামী জর্জ ওয়াশিংটন হেইলকে ফাদার পোপ বলে ডাকতেন। বস্তুত হেইলদের বাড়িতে স্বামী বিবেকানন্দ নিজের বাড়ির মতই থাকতেন। সেই বাড়িটা ১৯৬০ ইংরেজীতে ভেঙে নতুন করে আবাসিক গগনচুম্বী অট্টালিকা গড়ে তোলা হয়। আর বর্তমানে সেটার ঠিকানাই হল ১৪৫১ নর্থ ডিয়ারবর্ন স্ট্রীট।
১৪৫১ নর্থ ডিয়ারবর্ন স্ট্রীটের দুটো ব্লক উত্তরেই অনতিদূরে রয়েছে লিঙ্কন পার্কের প্রবেশদ্বার। হেইলদের বাড়ি থেকে স্বামী বিবেকানন্দ প্রায়ই লিঙ্কন পার্কে গিয়ে বসতেন। সে সময় এক আমেরিকান ভদ্রমহিলা বেশ ক’দিন তার শিশু কন্যাকে স্বামী বিবেকানন্দের জিম্মায় রেখে বাজার হাট করেন। এগনীস এউইংগ নামক এই শিশু কন্যাটি পরবর্তীতে বিবাহোত্তর জীবনে ফিলাডেলফিয়ায় স্বামী অখিলানন্দের ছাত্রী হয়ে আধ্যাত্মিক জীবনে আকৃষ্ট হন।
লিঙ্কন পার্কের পুবদিকে লেইকশোর ড্রাইভ সংলগ্ন মিশিগান লেইকের বালুতটে বসে স্বামী বিবেকানন্দ কোন এক পূর্ণিমার রাতে ধ্যানস্থ হয়ে ব্রহ্মে লীন হতে যাচ্ছিলেন। তখন হঠাৎ তিনি রামকৃষ্ণকে দেখতে পান এবং মনে পড়ে কেন তিনি এই ধরাধামে এসেছেন। তারপরই তাঁর মন ফিরে আসে উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে।
আমি ভারতীয় বাঙ্গালী। জাতীয় মহাপুরুষ স্বামী বিবেকানন্দ আমার হৃদয়াকাশে শ্রদ্ধার আসনে বিরাজমান। ছাত্রাবস্থাতেই পাশ্চাত্যে স্বামী বিবেকানন্দ প্রসঙ্গে পড়তে গিয়ে শিকাগোর ডিয়ারবর্ন এভিনিউতে হেইলদের বাড়ি, লিঙ্কন পার্কে স্বামীজির অবস্থান এবং লেইক মিশিগানের বালুতটে স্বামীজির ধ্যান সম্পর্কিত বিষয়গুলো পাঠ করে কিছু কিছু জেনেছি। তখন সেসব নিয়ে মনে মনে কত না কল্পনার জাল বিস্তৃত হতো।
আজ শিকাগো ভ্রমণের অন্তিম পর্বে সেইসব কল্পনার জায়গাগুলোকে বাস্তবে দেখার সুযোগ পেয়েছি। আমাদের গাড়ি ধীরে ধীরে লেইক শোর ড্রাইভ ধরে এগিয়ে চলে। পার হয়ে আসি লেইক মিশিগানের বালুতট।
মিশিগান লেইকের বালুতটে অসংখ্যা নরনারী প্রায় নগ্ন হয়েই রৌদ্রস্নান করছে। অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন ভঙ্গীতে দৌড়ঝাঁপ খেলাধূলা করছে। অনেকেই স্পীডবোট নিয়ে লেইক মিশিগানের জলে সর্পিল গতিতে ছুটাছুটি করছে। সেসব দৃশ্য পিছনে ফেলে আমাদের গাড়ি নর্থ এভিনিউ ধরে পৌঁছে যায় ১৪১৫ নর্থ ডিয়ারবর্ন স্ট্রীট এবং লিঙ্কন পার্কের প্রবেশদ্বারে।
এলাকাজুড়ে চাকচিক্য, জাঁকজমক এবং ভোগবাদী পাশ্চাত্যের সবরকম উপকরণ থাকা সত্ত্বেও আমার মনে হয় আমি এক পবিত্র জায়গার সংস্পর্শে পূণ্য অর্জন করছি। স্বামী বিবেকানন্দের কোন স্মৃতিচিহ্ন নেই, নেই কোন ফলক। তবুও কেন এ জায়গায় এসে এই আনন্দদায়ক রোমাঞ্চ?
শতাব্দীকালেরও অধিক সময় পর স্বামী বিবেকানন্দ স্মৃতি বিজড়িত জায়গা দেখতে এসে আমাদের গাড়ি এই এলাকায় ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে। আমার মনে হয় এই এলাকার আলো হাওয়া রৌদ্রে স্বামী বিবেকানন্দের অদৃশ্য সত্ত্বা বহমান এবং আমরা সেই আলো হাওয়া রোদ্রেই অবগাহন করছি। আমাদের গাড়ি জায়গাটা অতিক্রম করার সময় এক অদ্ভুত সুখানুভূতি মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে।
আর সুখের অনুভব নিয়েই আমাদের শিকাগো ভ্রমণের পালা চুকিয়ে ধীরে ধীরে নর্থ এভিনিউ অতিক্রম করে চলে যাই ইন্টারস্টেট হাইওয়েতে। তারপর শিকাগো শহরকে পিছনে ফেলে দূরন্ত গতিতে গাড়ি ছুটতে থাকে আমাদের পরবাসের আস্তানা আববার্ন হিলসের এডামস্ ক্রীক এপার্টমেন্টের উদ্দেশ্যে।
শ্রীরামকৃষ্ণ ইউনিভার্সেল টেম্পল দর্শনের ইচ্ছাপূরণ
স্বামী বিবেকানন্দের স্মৃতি বিজড়িত শিকাগো শহরের স্থানগুলো পরিদর্শনের পর সুখের অনুভব নিয়েই সেখান থেকে ফিরেছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে মাঝে মাঝে একটা অতৃপ্তির বেদনাবোধ মনকে পীড়া দিত। কারণ, শিকাগো বিবেকানন্দ বেদান্ত সোসাইটির নূতন প্রকল্প অর্থাৎ বৃহত্তর শিকাগোর লেমন্ট এলাকার চারমাইল দক্ষিণে হোমের প্লেনে প্রথম পর্বে নির্মিত শ্রী রামকৃষ্ণ ইউনিভার্সেল টেম্পলটি দেখে আসতে পারেনি। অবিশ্যি সেই বেদনা বোধের পীড়া আমাকে বেশি দিন বহন করতে হয়নি।
আমেরিকায় ছেলের কর্মস্থলে বসবাস করতে গিয়ে আমাকে আরো দুবার শিকাগো শহরে যেতে হয়। আর সে সুযোগেই হোমের গ্লেনে শ্রী রামকৃষ্ণ ইউনিভার্সেল টেম্পল দর্শনের ইচ্ছা পূরণ হয়।
শীতের সময় আমেরিকার উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে ঠাণ্ডার প্রকোপ খুব বেশি। স্বভাবতই সে সময়ে সেখানকার লোকজনেরা পর্যটন কিংবা ভ্রমণের কথা চিন্তা করে না। দৈনন্দিন জীবন যাপনের প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যেখানে না গেলে না হয় সেখানেই বেরোয়। শীতের পর থেকে গ্রীষ্মের সময়সীমাতে সেখানকার সবকিছুতেই সঞ্জীবনী শক্তির বিকাশ ঘটতে থাকে। ঠাণ্ডা চলে যায়, আকাশে রোদ ওঠে। লেইক গুলোতে নিস্তরঙ্গ বরফের শক্ত আস্তরণ গলে জল হয়ে তরঙ্গের সৃষ্টি করে। দ্রুত পাতা গজিয়ে রুক্ষ, শুষ্ক গাছপালার কংকালগুলো সজীব হয়ে ওঠে। ঘরের বাইরে লোকজনের চলাচল লক্ষ্যণীয় ভাবে বেড়ে যায়। যে কোন শহরে ডাউন টাউনের গগনচুম্বী ও চাকচিক্য পূর্ণ সারিবদ্ধ অট্টালিকা গুলোর অনিন্দ্য সুন্দর রূপ দর্শকের মনে আনন্দের জোয়ার বইয়ে দেয়।
আমার প্রথমবার শিকাগো ভ্রমণের সময়, স্বামী বিবেকানন্দ স্মৃতি বিজড়িত স্থানগুলোর দর্শন গ্রীষ্মকালের সুন্দর মনোরম আবহাওয়ায় মে মাসের শেষের দিনগুলোতেই হয়েছিল। কিন্তু শেষবারে হোমের প্লেনে শ্রীরামকৃষ্ণ ইউনিভার্সেল টেম্পলটি দর্শন করতে হয় শীতের মরসুমে, প্রতিকূল অবস্থার মোকাবিলা করে এক দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার দিনে। শেষবার যখন শিকাগো শহরে যাই, সেটা হলো ১০ জানুয়ারী ২০১১ ইংরাজি। আমেরিকায় প্রায় ছমাস বসবাস করার পর স্বদেশে ফিরার পথে।
স্বদেশ থেকে বিদেশে পাড়ি এবং বিদেশ থেকে দেশে ফেরার টিকিট, দিনক্ষণ ঠিক করে একসাতে করে নিলেই ভালো। পরিকল্পনা মাফিক প্রবাসে দিন কাটানো এবং আর্থিক লাভ দুটোই হয়। কিন্তু আমার বেলায় সেবার স্বদেশে ফিরার টিকিট একসাথে করায় লাভজনক হয়নি, বিড়ম্বনাই হয়েছে বেশি।
বিদেশে যাওয়ার সময় আমেরিকায় ছেলের আবাসস্থল ছিল কেনটাকি রাজ্যের বাউলিং গ্রীন শহরে এবং কর্মস্থল ছিল বাউলিং গ্রীন শহরেই অবস্থিত ফ্রুইট অফ দি লুম কোম্পানীর হেডকোয়ার্টারে। সেজন্যই আমাদের বিমানের টিকিট কাটা হয় ছত্রপতি শিবাজী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে প্যারিস চার্জ দ্য গল এয়ারপোর্ট হয়ে শিকাগো ওহেয়ার ইন্টারনেশনাল এয়ারপোর্ট অবধি এবং ফেরার পথে ওহেয়ার ইন্টারনেশনাল এয়ারপোর্ট থেকে প্যারিস চার্জ দ্য গল এয়ারপোর্ট হয়ে ছত্রপতি শিবাজী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর পর্যন্ত।
আমেরিকায় পৌঁছে প্রথম চারমাস কেনটাকি রাজ্যের বাউলিং গ্রীন শহরে বসবাস করার পর আমাদেরকে চলে যেতে হয় আরকানসাস রাজ্যের বেনটনভাইল শহরে। কারণ, ছেলে অশোকতরু ফ্রুইট অফ দি লুম কোম্পানির প্রজেক্টের কাজ শেষ করে ওয়াল মার্টের একটা নূতন প্রজেক্টে যোগ দেয়।
বেনটনভাইল শহর হলো আমেরিকায় নিত্য ব্যবহার্য্য দ্রব্য সামগ্রীর খুচরো বিক্রয় কেন্দ্র ওয়ালমার্টের হেড কোয়ার্টার। বর্তমানে ওয়ালমার্টের কর্ণধার জিম ওয়ালটন, বিশ্বের ৪র্থতম ধনী ব্যক্তি বেনটনভাইলে বসবাস করেন। তবে ওয়াল মার্টের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন স্যাম ওয়ালটন। ওর জন্মস্থান হলো আমেরিকার ওকলাহামা রাজ্যের কিংফিসার শহরে। বিশ্বব্যাপী বিপণন সামগ্রীর খুচরো ব্যবসায়ে পারদর্শিতার জন্য ১৯৯২ সালে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি এইচ ডব্লিউ বুশ তাঁকে পুরস্কৃত করেন। স্যাম ওয়ালটন এইচ ডব্লিউ বুশের হাত থেকে প্রেসিডেনসিয়াল মেডেল অফ ফ্রিডম গ্রহণ করেন। শুধু তাই নয়, আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার এই ধনাঢ্য ব্যক্তি স্যাম ওয়ালটন বিশ্বের নিপীড়িত জনগণের দিশারী পিপুলস রিপাবলিক অফ চায়নাও পুরস্কৃত করেছে। চীনের নানজিং প্রদেশের সুযাউ শহরের পাশে, জনগণের মালিকানাধীন ফ্যাক্টরির উন্নয়নকল্পে স্যাম ওয়ালটনের নিরলস সহায়তার জন্য তাঁকে “গোল্ডেন ষ্টার অফ ফরেনীয়ার্স এওয়ার্ড” প্রদান করা হয়। এই পুরস্কার লাভের কিছুদিন পরই স্যাম ওয়ালটন ৫ এপ্রিল ১৯৯২ ইংরাজি আরকানসাস ষ্টেটের রাজধানী শহর লিটলরকে দেহত্যাগ করেন।
সে যাহোক, ওয়ালমার্ট হেড কোয়ার্টারস্থিত শহর বেনটনভাইলে কিছুদিন বসবাস করার পরই, ভিসায় অনুমোদিত আমার সেদেশে থাকার সময়সীমা শেষ হওয়ার এলার্ম বাজতে থাকে। তড়িঘড়ি করেই সুদূর আরকানসাস ষ্টেটের বেন্টনভাইল শহর থেকে শিকাগো ওহেয়ার ইন্টারনেশনাল এয়ারপোর্টে ১০ জানুয়ারী ২০১১ ইংরাজি পৌঁছার ব্যবস্থা করতে হয়। কিন্তু বেনটনভাইল শহর সংলগ্ন এয়ারপোর্ট থেকে ডোমেস্টিক ফ্লাইটে ওহেয়ার বিমান বন্দরে সরাসরি যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। তাছাড়া নিজস্ব গাড়ি ড্রাইভ করে আরকানসাস ষ্টেটের বেনটনভাইল শহর থেকে ইলীনয়ীস ষ্টেটের শিকাগো শহরে অল্প সময়ের ব্যবধানে পাড়ি দেওয়া দুঃসাহসেরই নামান্তর। বাধ্য হয়েই পার্শ্ববর্তী ওকলাহামা ষ্টেটের তুল্সা এয়ার পোর্ট থেকে বিমানে চড়ে শিকাগো ওহেয়ার ইন্টারনেশনাল এয়ারপোর্টে যাওয়ার টিকিট কাটতে হয়।
বেনটনভাইল শহরের এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি বিমানে চেপে ওহেয়ার বিমান বন্দরে না যেতে পারার ঝঞ্জাট মোকাবিলা করার বিকল্প ব্যবস্থা হলেও বাড়তি আরেক সমস্যা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। সমস্যাটা হলো প্রতিকূল আবহাওয়ার জন্য বাইরে চলাচলে বিঘ্ন।
জানুয়ারী মাসের শুরু থেকেই দিনের তাপমান -৩০ ডিগ্রী সেলসিয়াস থেকে-১০ ডিগ্রী সেলসিয়াসে ওঠানামা করতে থাকে। এরই মধ্যে দুতিন দিন ওহেয়ার এয়ারপোর্ট এবং তার আশপাশে বরফ জমে একাকার হয়ে যায়। স্থানে স্থানে বরফ জমাট বাঁধার জন্য অনেক উড়ান বাতিল হয়ে যায়। এমতাবস্থায় মনজুড়ে দুশ্চিন্তা ও সংশয়ের দানা বেঁধে ওঠে। ভাবনা হয় - প্রতিকূল অবস্থার মোকাবিলা করে সময়মত শিকাগোতে পৌঁছানো সম্ভব হবে কি? সংশয় আর দুশ্চিন্তার ঘেরাটোপে আবর্তিত হয়েই ১০ জানুয়ারী ২০১১ ইংরাজি বিকেল তিন ঘটিকায় ছেলের গাড়িতে চেপে বেনটনভাইল থেকে তুল্সা এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই।
দিনভর আকাশ মেঘলা। একবারের জন্যও মাথার উপর সূর্যকে দেখা যায়নি। ক্ষেপে ক্ষেপে আকাশ ভেঙ্গে বরফের কুঁচি পড়তে থাকে। চারদিকে মেঘবর্ণ আস্তরণের মধ্য দিয়েই ইন্টারস্টেটের রাস্তা ধরে গাড়ি চলতে থাকে। তিনঘন্টা সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর পৌঁছে যাই তুল্সা এয়ারপোর্টে।
তুলসা এয়ারপোর্টে পৌঁছেও মনের সংশয় ও দুশ্চিন্তা নিবৃত্ত হয়নি। কারণ, তখনও আবহাওয়া গোলমেলে। তবে যাত্রীদের অবগতির জন্যে বিমান কর্তৃপক্ষের ঘোষণা অনুসারে কিছু সময় পর জানতে পারি শিকাগোগামী বিমান রাত আট ঘটিকাতেই ছাড়ছে। খবরটা জানতে পেরে কিছুটা স্বস্তি বোধ করি। ধীরে ধীরে বাক্স প্যাটরা স্ক্যানিং, বোর্ডিং পাস সংগ্রহ এবং সিকিউরিটি চেকিং পর্ব শেষ করে বিমানে ওঠার অপেক্ষাগারে গিয়ে বসি। কিছুক্ষণ বসার পর, যাত্রীদের সুবিধার্থে সামনেই টাঙানো সূচনা জ্ঞাপক পর্দায় বিমান ছাড়ার ঘোষণা নজরে পড়তেই একের পর এক এগিয়ে চলা যাত্রীদের অনুসরণ করে বিমানে ওঠে নির্দিষ্ট আসন গ্রহণ করি। নির্দ্ধারিত সময়েই বিমান উড়ে এবং প্রায় এক ঘন্টা আকাশে উড়ার পর শিকাগো এয়ারপোর্টে অবতরণ করে।
শিকাগোর মাটিতে বিমান অবতরণের সাথে সাথেই মনের সংশয় ও দুশ্চিন্তার অবসান ঘটে। ধীরে ধীরে মনের মধ্যে আনন্দের এক চোরাস্রোত বইতে থাকে। কারণ, প্রতিকুল আবহাওয়ায় সময়মত শিকাগো পৌঁছতে না পেরে, স্বদেশে ফিরতে প্যারিস চার্জ দ্যা – গল বিমানবন্দরগামী এয়ার ফ্রান্সের ফ্লাইট মিস করার দুর্ভাবনা থেকে মুক্ত হই। দুশ্চিন্তা এবং সংশয়মুক্ত মন নিয়ে বিমান থেকে বেরিয়ে এসে লাউঞ্জের পাশে ঘূর্ণায়মান এক্সেলেটার থেকে নিজেদের বাক্স প্যাটরা সংগ্রহ করি। তারপর সেগুলোকে ট্রলিতে চেপে ঠেলতে ঠেলতে খুশীমনে এয়ারপোর্টের বহির্পথ দিয়ে বেরিয়ে আসি।
এয়ার পোর্ট থেকে বেরিয়ে রাস্তার পাশেই খোলা আকাশের নিচে দাঁড়াই। উইন্ডি সিটি শিকাগোর রাতের শৈত্যপ্রবাহ এসে ঝাপটা মারে। অন্য সময় হলে হয়তবা হাড়কাপানো এই শীতের প্রকোপে বেসামাল হয়ে পড়তাম। কিন্তু শিকাগো পৌঁছে যাওয়ার আনন্দে মনটা ভরপুর থাকায় খোলা আকাশের নিচে শীতের কনকনে ঝাপটা সহ্য করতে অসুবিধা হয়নি। এমতাবস্থায় অল্পক্ষণের মধ্যেই একটা ছোট্ট ভ্যানগাড়ি এসে আমাদের সামনে দাঁড়ায়।
বেনটনভাইল শহর থেকে রওয়ানা দেওয়ার দুতিন দিন পূর্বেই, শিকাগো পৌঁছে রাতে হোটেলে থাকার ব্যবস্থা এবং এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলে যাওয়া ও পরের দিন চলাচলের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা অনলাইনে ঠিক করা হয়েছিল। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়েই মোবাইল ফোনে গাড়ি ভাড়া দেওয়ার কোম্পানীকে যোগাযোগ করতেই এই ছোট্ট ভ্যান গাড়িটা আমাদেরকে নিয়ে যেতে আসে। ভ্যানটি আমাদেরকে তুলে নিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে দেয় এয়ারপোর্ট সংলগ্ন তাদের অফিসে। সেখানে কোম্পানীর কনট্রাক্ট ডিড এ সই করার পর গ্যারেজ থেকে একটি ট্যাক্সি বের করে দেয়। আমরা ঐ ট্যাক্সিতেই ওঠে বসি। তারপর অশোকতরু ড্রাইভ করে নিয়ে যায় রোসমন্ট এলাকার ওয়েষ্ট হিগিন্স রোডেরই একটা হোটেলে।
হোটেলটিতে রাত কাটিয়ে পরদিন সকাল ৯ ঘটিকায় চেক আউট করতে হবে, আর শিকাগো ওহেয়ার আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে আমাদের প্যারিস চার্জ দ্যা গল বিমান বন্দরে যাওয়ার এয়ার ফ্রান্সের AF 667 নম্বর ফ্লাইটটি ছাড়বে সন্ধ্যা পাঁচটা কুড়ি মিনিটে। অতএব পরদিন সকাল থেকে বিকাল অবধি, বলতে গেলে প্রায় সারাদিন আমাদের আর অন্য কোন কাজ নেই। এই অবসরেই পূর্ব পরিকল্পনা মতে শিকাগো ভ্রমণের শেষ ইচ্ছা পূরণ অর্থাৎ শিকাগোর বিবেকানন্দ বেদান্ত সোসাইটির নবতম প্রয়াস, প্রথমপর্বে নির্মিত হোমের প্লেনে শ্রীরামকৃষ্ণ ইউনিভার্সেল টেম্পলটি দেখে যাবো। তাই রাত বেশি না করে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়াই ভালো। রাতের আহারের জন্য হোটেলের লাগোয়া রেষ্টুরেন্ট থেকে মোবাইল ফোনে কনট্যাক্ট করে একটা পিঁজা আনানো হয়। চট জলদি ভাগ করে পিঁজাটা শেষ করে বিছানায় ঢুকে শুয়ে পড়ি।
শেষরাতে হঠাৎ রেলগাড়ি চলাচলের আওয়াজে ঘুম ভাঙ্গে। ঘুম ভাঙ্গার পর বিছানায় বসে বসেই জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের দিকে তাকাই। আবচা আলো আঁধারে দেখা যায়, হোটেলের পাশ দিয়ে সামান্য দূরেই রেল চলাচলের ট্র্যাক রয়েছে। ঐ ট্র্যাক দিয়ে রেলগাড়ি চলে যাওয়ার শব্দেই ঘুম ভাঙ্গে। তখন আর কিছু করার নেই, বিছানায় বসে বসেই জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকি। এলাকা জুড়ে গুড়ি গুড়ি বরফের আস্তরণ সারিবদ্ধ নিয়ন বাতিগুলোকে ঘোলাটে করে রেখেছে। বুঝা ভার ভোরের আলো কখন ফুটে ওঠবে। এরই মধ্যে ফাঁকে ফাঁকে শিকাগো রেল পরিষেবার আরো কয়েকটা রেলগাড়ি আওয়াজ দিতে দিতে ঐ ট্র্যাক দিয়ে যাতায়াত করেছে।
সময় এগিয়ে চলছে। ঘরের ভিতর এবং বাইরের অবস্থান দেখে সঠিক সময় আন্দাজ করা মুশকিল। পাশ থেকে মোবাইলটা হাতে নিয়ে নজর দিতে দেখি সকাল সাতটা বেজে গেছে। আমাদেরকে সকাল ৯ ঘটিকাতেই চেক আউট করতে হবে। তাই আর গড়িমসি না করে বিছানা ছেড়ে দেই। স্নানটান সেরে, জিনিসপত্র গোছগাছ করে সারাদিনের প্রস্তুতি নিয়ে বের হতে হবে।
স্নান ও জিনিসপত্র গোছগাছ করে চলে যাই পাশের রেষ্টুরেন্টে, সকালের খাবার খেতে। হোটেল থেকে বেরিয়ে রেষ্টুরেন্টে যাওয়ার পথেই দিনের বেগতিক ভাব আরো বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়। সূর্য আকাশের কোথায় অবস্থান করছে বুঝা মুশকিল। হালকা গুড়ি গুড়ি বরফ হাওয়ায় ভাসছে। আলো, আঁধার আর গুড়ি গুড়ি বরফের সংমিশ্রণে এলাকা জুড়ে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। রেষ্টুরেন্টে খাবার খেতে খেতে ভাবি, কি করে এই অবস্থার মোকাবিলা করে লেমন্টে হোমের মেনে শ্রীরামকৃষ্ণ ইউনিভার্সেল টেম্পল দেখতে যাই। অথচ মনের বাসনা, স্বদেশে ফেরার পথে শিকাগো শহরে একদিনের অবস্থানের সময় অবশ্যই শিকাগো বিবেকানন্দ বেদান্ত সোসাইটির শ্রীরামকৃষ্ণ ইউনিভার্সেল টেম্পলটি দেখে যাবো।
এসব ভাবতে ভাবতে খাওয়া শেষ করে বাইরে নজর দেই। তখন যেন মনে হলো আবহাওয়ার কিছুটা পরিবর্তন হতে চলছে। গুড়ি গুড়ি বরফপুঞ্জ হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে দ্রুত দূরে চলে যাচ্ছে। আকাশটা ধীরে ধীরে অন্ধকারের খোলস ছেড়ে ফর্সা হচ্ছে। আবহাওয়ার সামান্য পরিবর্তন লক্ষ্য করে মনের জোড় বেড়ে যায়। আমি ছেলেকে উদ্দেশ করে বলি - আবহাওয়া যেন ভালোর দিকেই এগুচ্ছে। চল, এবার বেরিয়ে পরা যাক।
বেনটনভাইল থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হওয়ার আগেই বিবেকানন্দ বেদান্ত সোসাইটির ওয়েভ সাইট খুলে শ্রীরামকৃষ্ণ ইউনিভার্সেল টেম্পলটির ভৌগলিক অবস্থান এবং কোন কোন পথ দিয়ে কত সময়ে পৌঁছানো যায় তা জেনে নেওয়া হয়েছিল। রোসমন্টের ওয়েষ্ট হিগিন্স রোডস্থিত হোটেল থেকে যাত্রা শুরু করে শ্রীরামকৃষ্ণ ইউনিভার্সেল টেম্পলে পৌঁছানো এবং সেখান থেকে ওহেয়ার এয়ারপোর্টে যেতে মোট দুঘন্টা সময় লাগবে। আর রামকৃষ্ণ ইউনিভার্সেল টেম্পলটির সবকিছু দেখার জন্য এক ঘন্টা ব্যয় করলে মোট তিন ঘন্টা সময়ের মধ্যেই ইচ্ছাপূরণ হয়ে যায়। সারাদিন আমাদের হাতে যে সময় থাকছে তা থেকে তিন ঘন্টা সময়ের সদ্ব্যবহার করে হোমের প্লেনে শ্রী রামকৃষ্ণ ইউনিভার্সেল টেম্পলটি দর্শন করে যাওয়া অবশ্যই যুক্তিযুক্ত। এরকম মনের প্রস্তুতি নিয়েই আসা হয়েছিল। কিন্তু আবহাওয়া যে এরকম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে সেটাতো আগাম জানা যায়নি।
সে যাহোক, আবহাওয়ার সামান্য পরিবর্তন লক্ষ্য করে লেমন্টের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করতেই অশোকতরু ওঠে পড়ে। সে পার্কিং স্লট থেকে গাড়িটা রেষ্টুরেন্টের সামনে নিয়ে আসে। আমরা ধীরে ধীরে এগিয়ে গাড়িতে ওঠে বসি এবং সীট বেল্ট বেঁধে নেই। গাড়ি স্টার্ট নিয়ে দক্ষিণ মুখো এগুতে থাকে। তখন বেলা প্রায় দশটা।
গাড়ি সামান্য কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পরই মনে হলো, আবহাওয়া পরিবর্তনের যে ইঙ্গিত লক্ষ্য করেছিলাম তা ঠিক নয়। যেন চারদিক থেকে কুয়াশা ধেয়ে আসছে। সামনের দিকে চলাচলের রাস্তার কয়েকমিটার অবধি জায়গা ঝাপসা ঝাপসা দৃষ্টিগোচর হয়। রাস্তার দুপাশে বরফের স্তর জমে রয়েছে। দূরে ঘন কুয়াশার অস্বচ্ছ আবরণ, সঠিক বুঝা যায় না কি আছে কি নেই। স্বভাবতই গাড়ির গতিবেগ অনেকটা কমিয়ে ধীরে ধীরে এগুতে হয়।
এমতাবস্থায় মনে ভীষণ ভয় চাড়া দিয়ে ওঠে। সন্দেহ জাগে এ দুর্যোগে আমরা কি পারবো সঠিক ভাবে পৌঁছতে? না ভুল পথে অন্য কোথাও চলে যাবো? তাছাড়া সেখানে পৌঁছেও কি আবার সঠিক সময়ের মধ্যে বিমান বন্দরে ফিরতে পারবো?
এসব ভাবনা মনকে ভীষণ দুর্বল করে দেয়। গাড়িতে তিনজন বসে যাচ্ছি। কেউ কারো সাথে কোন আলাপ নেই, সবাই চুপচাপ। অশোকতরু শক্ত হাতে ষ্টিয়ারিং ধরে, সঠিক পথে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মধ্যে নিজের মোবাইল টিপে সময় ও রাস্তার গতিপথের দিক নির্দেশিকা দেখে নিচ্ছে।
আজ ১১ জানুয়ারী ২০১১ ইংরাজী। পাশ্চাত্যের ঐতিহ্যশালী দেশগুলোর অন্যতম শিকাগো শহরের উপর গেলো রাত থেকে বরফ পড়ছে। তাপমান অবশ্যই শূণ্য ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে। আমরা এই শহরেরই ডাউন টাউনের পাশ দিয়ে দক্ষিণে এগিয়ে চলছি। এখানেই একদা বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু গগনচুম্বী অট্টালিকা সিয়ার্স টাওয়ার অবস্থিত। তাছাড়া রয়েছে জন হেন কক সহ আরো অনেক চাকচিক্যপূর্ণ মনোমুগ্ধকর সারিবদ্ধ গগনচুম্বী অট্টালিকার সমাহার। স্বাভাবিকভাবেই রাস্তা দিয়ে চলমান যাত্রীদের নজর কাড়তে ওদের জুড়ি নেই। কিন্তু আজ সেগুলোকে পাশ কেটে বৃহত্তর শিকাগোর দক্ষিণ দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় কিছুই নজরে পড়ছে না। আকাশ থেকে গুড়ি গুড়ি বরফ ঝরে সবকিছু একাকার করে দিয়েছে।
গাড়ি এগিয়ে চলছে, সময়ও এগিয়ে চলছে। তবে গাড়ির গতি শ্লথ আর সময় যেন চলছে ক্ষিপ্র গতিতে। প্রায় বারোটা বাজতে চলল। পূর্বে সংগৃহীত তথ্যানুসারে এই সময়ের মধ্যে হোমের প্লেনে ১৪৭ তম স্ট্রীট ও লেমন্ট রোডের সংযোগ স্থলে পৌঁছে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাইরের ভৌগলিক অবস্থান দেখে বুঝা মুশকিল এখনও কতদূর যেতে হবে। তবে মোবাইলে গতিপথ নির্দেশিকা দেখে অশোকতরু বুঝে নিয়েছে আমরা শ্রীরামকৃষ্ণ ইউনিভার্সেল টেম্পলের ধারে কাছে এসে গেছি।
রোসমন্টের ওয়েষ্ট হিগিন্স রোড থেকে যাত্রা শুরু করে, প্রায় দুঘন্টা সময় অতিবাহিত করে লেমন্ট এলাকায় এসে গেছি। গ্রীষ্মের স্বাভাবিক দিনে বড় রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলাচলের সময়, গাড়ির পিছনে গাড়ি কিংবা গাড়ির পাশে গাড়ি একের পর এক বিরামহীন বিপুল সংখ্যায় চলতে থাকে, তখন গাড়িগুলোর ভেতরের লোকজনদেরকে দেখা যায়। কিন্তু আজ একটি লোককেও দেখা যায়নি, সম্পূর্ণ জনমানবহীন। শুধু তাই নয়, বাইরে পশু পক্ষী বা কোন ধরনের জীবজন্তুও দেখা যায়নি। রাস্তার দুপাশে কিছুটা দূরের বাড়িগুলোর ছাদ বরফে ঢেকে রেখেছে। রাস্তার ডাইনে বায়ে সামান্য দূরে দেখা যায় অসমতল উঁচু টিলা। টিলাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বরফে আচ্ছাদিত পত্র বিহীন ডাল পালা বিশিষ্ট বিশাল গাছ। পাতা ঝড়া দিনগুলোর পর, শীতের শুরুতেই ওক, মেপল প্রভৃতি গাছ গুলোর পাতা ঝরে রুক্ষ-শুষ্ক ডালপালা নিয়ে গাছের কঙ্কালসেজে ঠায় আকাশের দিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। সেই বিশাল বিশাল ওক, মেপল গাছগুলোর কঙ্কাল বরফে লেপটে রয়েছে।
চারদিকে বরফে আচ্ছাদিত অঞ্চলের মাঝখান দিয়ে সরু কালো পিচঢালা রাস্তা ধরে আমাদের গাড়ি ধীরে এগিয়ে চলছে। অশোকতরু খুব তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে গাড়ি চালাচ্ছে। কারণ, তার মোবাইলের গতিপথ নির্দেশিকা অনুসারে অতি সন্নিকটেই বিরাজ করছে ১৪৭ তম স্ট্রীট এবং লেমন্ট রোডের কর্নার। আমিও উৎকণ্ঠা নিয়ে আবছা আলো অন্ধকারে গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে দেখছি। এগিয়ে সামনে যেতে যেতে হঠাৎ নজরে পড়ে রাস্তার বাঁ পাশে দুটো সরু আর, সি,সি পোষ্টে একটা বোর্ড টাঙানো রয়েছে এবং তাতে ইংরাজিতে কিছু লিখা আছে। আরো কিছুটা এগিয়ে যেতেই বড় হরফে শ্রীরামকৃষ্ণ ইউনিভার্সেল লেখাটি দেখতে পাই। লেখাটা নজরে পড়ামাত্রেই আমি অশোকতরুকে গাড়ি থামাতে বলি। আমার কথা শুনেই সে একটু এগিয়ে রাস্তার বাঁ পাশে গাড়ি থামায়। তারপর গাড়ি থেকে নেমে বাঁ দিকে মুখ ঘুরিয়েই দেখতে পাই প্রায় একশ মিটার দূরে বরফের চাদর মুড়ি দিয়ে একটা সাদা মাটা লম্বাটে অট্টালিকা দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর সেটাই হলো শিকাগো বিবেকানন্দ বেদান্ত সোসাইটির প্রথমপর্বে নির্মিত শ্রীরামকৃষ্ণ ইউনিভার্সেল টেম্পল।
গাড়ির পাশে যে জায়গায় নেমেছি, গাড়ি চলাচলের পিচঢালা রাস্তাটার সামান্য রেখ ছাড়া বাকী সমস্ত ভূপৃষ্ঠের উপর প্রায় তিন চার ইঞ্চি পুরু বরফের আস্তরণ পড়েছে। যেদিকে দৃষ্টি যায় কেবল বরফ আর বরফ।
আমার সাথে সাথে অশোকতরুও গাড়ি থেকে নামে। আমাদের দুজনেরই পায়ে লম্বা মোজা এবং হাইহীলের জুতো রয়েছে। তাই বরফের আস্তরণের উপর দাঁড়ানো যায়। কিন্তু আমার স্ত্রী রুবির পায়ে হাই হীল জুতো নেই। বরফের আস্তরণের উপর দিয়ে ও চলতে পারবে না। তাই সে গাড়িতেই ঠায় বসে থাকে।
কিছুক্ষণ খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে চারিদিক ভালোভাবে নিরীক্ষণ করি। না, -আমরা ছাড়া এই এলাকায় অন্য কোন মানুষ কিংবা প্রাণীর অস্তিত্ব আছে বলে মনে হয় না। চারিদিকে ভূপৃষ্ঠে বরফের আস্তরণ, দূরের উঁচু টিলায় বরফে লেপটে থাকা গাছপালা এবং সামনে একশ মিটার দূরত্বের মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে দরজা বন্ধ করা লম্বাটে অট্টালিকা। এমতাবস্থায় কি করি ভাবছি। তখনই অশোকতরু আমাকে বলে, - চলো বাবা, মন্দিরের সামনে গিয়ে দেখি কি আছে। রুবিকে একা গাড়ির ভেতর রেখেই অশোকতরুর কথামাতো ধীরে ধীরে হেটে বরফের আস্তরণ অতিক্রম করে মন্দিরের দোরগড়ায় পৌঁছি। সেখানে দরজার সামনে গিয়ে ডোরবেলে চাপ দেই। অল্প সময়ের ব্যবধানেই ভেতর থেকে দরজা খুলে যায়। দেখতে পাই গেরুয়া বসন পরিহিত এক সৌম্যদর্শন মহারাজ সামনে দাঁড়িয়ে আমাদেরকে ভেতরে প্রবেশ করার ইঙ্গিত করছেন।
বাইরে গাড়িতে রুবি একা বসে আছে। ওকে সেখানে রেখে কি করে আমরা মন্দিরের ভেতরে যাই? মহারাজকে উদ্দেশ্য করে বলি, স্যার, আমাদের আরেকজন সহযাত্রী বাইরে গাড়িতে বসে আছেন। উনাকে নিয়ে এসে আমরা মন্দিরে প্রবেশ করব। মহারাজ সম্মতি প্রদান করে দোতালায় তার নির্দিষ্ট কক্ষে চলে যান।
মন্দিরের খোলা দরজার সামনে দাঁড়িয়েই আমি পায়ের জুতা খুলে নেই। জুতা জোড়া অশোকতরু হাতে বয়ে নিয়ে সোজা চলে যায় রাস্তার পাশে গাড়ির সামনে। সেখানে গাড়িতে বসিয়েই ওর মাকে হাইহীল জুতা পরিয়ে দেয়। তারপর দুজন ধীরে ধীরে একসাথে বরফের উপর দিয়ে হেটে মন্দিরের দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। সবাই মিলে তখন মন্দিরে প্রবেশ করি। প্রথমেই আমাদের জুতোগুলো স্যু-রেক’এ রেখে নিচতলায় মন্দিরের অবস্থান ঘুরে ঘুরে দেখি। তারপর দোতালায় ওঠে যাই।
দোতালায় চলতে চলতে সবকিছু দেখে ঢুকে যাই একটা প্রকোষ্ঠে। প্রকোষ্ঠটি হলো বিবেকানন্দ বেদান্ত সোসাইটির কার্যালয় এবং সেখানেই রয়েছেন শ্রীরামকৃষ্ণ ইউনিভার্সেল টেম্পলের ম্যানেজার স্বামী বরদানন্দ। তিনি ভারতীয় নন। ফর্সা, ছিপছিপে সুঠাম দেহের অধিকারী পাশ্চাত্য দেশীয় সন্ন্যাসী। তিনিই ডোরবেলের আওয়াজ শুনে নিচে গিয়ে আমাদেরকে মন্দিরে প্রবেশ করার দরজা খুলে দিয়েছিলেন।
আমরা উনার ঘরে ঢুকে প্রথমেই এক এক করে সবাই প্রণাম করি। প্রণাম পর্বের শেষে, আমিই স্বামিজীকে ইংরেজীতে বলি, - আমরা ভারতীয় বাঙ্গালী, আমেরিকায় ছেলের সাথে ছ’মাস বসবাস করে আজই সন্ধ্যায় স্বদেশে ফিরার বিমানে উঠবো। ২০০৭ সালে আরেকবার শিকাগো এসে বিবেকানন্দ স্মৃতি বিজড়িত জায়গাগুলো দেখে গেছি। কিন্তু সময়াভাবে ২০০৭ সালের ১লা জুলাই এই মন্দিরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখে যেতে পারিনি। আজকে এখানে এসে মন্দির দর্শন এবং আপনাকে প্রণাম করে নিজেদেরকে ধন্য মনে করছি।
প্রথমবার ২০০৭ সালে মে মাসের শেষের কদিন শিকাগোতে ছিলাম। তখন সাউথ হাইড পার্ক বুলিবার্ডের বিবেকানন্দ মন্দিরে আপনাকে দেখেছি। সেবার ২৭শে মে রোববার সকাল ১১-৩০ ঘটিকায় আপনি জনৈক শ্রোতাদের সামনে স্পিরিচুয়েলাইজিং এব্রিডে লাইফ সম্বন্ধে বলছিলেন। আমরাও সেদিন কিছু সময়ের জন্য সেখানে ছিলাম। আজ এই মন্দিরে পূজা-অর্চনার স্থান, ধ্যানের জায়গা, ধর্মালোচনার গৃহ, লাইব্রেরী কার্যালয়, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও সারদামায়ের মূর্তি এবং স্বামী বিবেকানন্দের বিভিন্ন ভঙ্গিমার ফটো ও তৎসহ বাণীগুলো দেখে অপার আনন্দে মনটা আমার ভরে গেছে। এসব বলতে বলতে আমি স্বামিজীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। মনে হলো, আমার কথাগুলো স্বামিজী মন দিয়ে শুনেছেন এবং কথা শেষ হওয়ার পর তিনি স্মিত হাস্যে পাশেই রাখা বাক্স থেকে এক মুঠো চকলেট নিয়ে আমাদেরকে মন্দিরের প্রসাদ স্বরূপ দিলেন। তারপর তিনি বললেন, — আগামীকাল ১২ই জানুয়ারী স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম দিবস। এই দিনটি আন্তর্জাতিক যুব দিবস হিসাবে বিভিন্ন দেশে পালিত হবে, রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনে তিথি হিসাবেই জন্মদিবসে পূজার্চনা করা হয়ে থাকে তবুও আগামীকাল এই শ্রীরামকৃষ্ণ ইউনিভার্সেল টেম্পলে স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠান হবে। আগামীকালের অনুষ্ঠান উপলক্ষে এই মন্দিরে কিছু ভক্তের সমাগম হবে। আজ এখানে তিনি একাই রয়েছেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ ইউনিভার্সেল টেম্পলের নিচতলা ও উপর তলার সবকিছু দেখা এবং স্বামী বরদানন্দ মহারাজের সাথে আলোচনায় প্রায় এক ঘন্টা সময় অতিবাহিত হয়। বেলা প্রায় একটা বাজতে কয়েকমিনিট বাকি। দিনের আবহাওয়া এবং ওহেয়ার বিমান বন্দরে সঠিক সময়ে পৌঁছানোর ব্যাপার চিন্তা করেই স্বামিজীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মন্দিরের বাইরে চলে আসি। বাইরে বারান্দায় এসে অশোকতরু তার মাকে আমার জুতাজোড়া পরিয়ে দেয়। তারপর ওর মাকে সঙ্গে নিয়ে ধীরে ধীরে বরফের আস্তরণ অতিক্রম করে গাড়ির পাশে চলে যায়। রুবি গাড়ির ভিতর বসে জুতাজোড়া খুলে অশোকতরুকে দেয়। অশোকতরু আবার সেগুলো বয়ে ফিরে আসে মন্দিরের বারান্দায়। আমি চটজলদি সেই জুতা জোড়া পায়ে দিয়ে পা বাড়াই গাড়িতে ওঠার জন্য।
বারান্দা থেকে সামান্য কিছুদূর এগিয়ে যেতেই অশোকতরু আমাকে হঠাৎ বলে, - বাবা তুমি দাঁড়াও, তোমার একটা ফটো তুলে নেই। ওর কথা শুনে আমি হাটা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকি। সে তাড়াতাড়ি বেশ কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে মন্দিরকে আমার পেছনে রেখে একই পজিশনে হাতের মোবাইল ফোনের ক্যামেড়ায় পর পর দুবার ক্লিক করে। এই মোবাইল ফোনের ক্যামেড়ায় বন্দী ফটোই হলো দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় হোমের গ্লেনে আমাদের শ্রীরামকৃষ্ণ ইউনিভার্সেল মন্দির দর্শনের সাক্ষ্য বহনকারী একমাত্র নিদর্শন।
ক্যামেড়ার ক্লিক করার পর ফটো সেভ করেই অশোকতরু মুখ ঘুরিয়ে রাস্তার পাশে গাড়ির দিকে এগুতে থাকে। আমিও ধীরে ধীরে বরফের উপর দিয়ে ওর পিছনে হাটতে হাটতে গাড়ির সামনে গিয়ে পৌঁছি।
আবহাওয়ার তখনও কোন ব্যতিক্রমী পরিবর্তন হয়নি। বরফের ছোট ছোট কুচি আকাশে হাওয়ায় ভাসছে পশু পক্ষী বিহীন জনশূন্য এলাকায়। শীতের ঝাপটা থেকে বাঁচতে তাড়াতাড়ি গাড়িতে ওঠে বসি। অশোকতরু ষ্টিয়ারিং ধরে গাড়ি স্টার্ট দেয়। তারপর গাড়িকে উত্তরমুখী করে রওয়ানা দেয় ওহেয়ার বিমান বন্দরে যাওয়ার পথ ধরে। রাস্তার দুপাশের ঘরবাড়ি, গাছপালা প্রভৃতির অবস্থান আগের মতই রয়েছে – সবকিছুতেই বরফের প্রলেপ, রাস্তা দিয়ে কেবল আমাদের গাড়িটাই চলছে মনে হয়। তবে চলার পথে আগের মত সংশয় আর দুশ্চিন্তার যাতনা নেই। হোমের প্লেনে শ্রীরামকৃষ্ণ ইউনিভার্সেল টেম্পল দর্শনের আনন্দ মনকে সবল এবং সতেজ করে দিয়েছে। কুয়াশা ঘেরা আবছা আলো আঁধারে রাস্তায় গাড়ি যেন সাবলীল গতিতেই এগিয়ে চলছে। শিকাগো শহরের দক্ষিণের লেমন্ট এলাকাকে পিছনে ফেলে গাড়ি এগুচ্ছে।
সময় প্রায় দুটো বাজতে চলছে। আমাদের স্বদেশে ফেরার এয়ার ফ্রান্সের বিমানটি ওহেয়ার ইন্টারন্যাশনেল এয়ার পোর্ট থেকে টেক অফ করার সময় এগিয়ে আসছে। আর মিনিট ত্রিশেক পর থেকেই যাত্রীদের চেকিং পর্ব শুরু হয়ে যাবে। আমরা এয়ারপোর্টের কাছাকাছিই চলে এসেছি। মনে মনে ভাবছি, বিশাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কোন টারমিনালে রয়েছে এয়ার ফ্রান্সের কাউন্টার? এয়ার ফ্রান্সের কাউন্টারে পৌঁছতে গিয়ে কি সঠিক টারমিনালেই ঢুকতে পারবো? এসব ভাবতে ভাবতে যখন মনে সংশয়ের দানা বাঁধতে থাকে তখন হঠাৎ দেখি আমাদের গাড়িটা এয়ারপোর্টের ফিদ্ধ টারমিনালের গেইট দিয়ে ঢুকছে।
ফিদ্ধ টারমিনালের গেটের ভিতর ঢুকে কিছুটা সামনে এগিয়ে যেতেই নজরে পড়ে নিওন বাতির আলোয় ঝলমল করছে এয়ার ফ্রান্স কাউন্টারের হোর্ডিং। আমাদের গাড়িটা সেখানেই থামানো হয়।
কি আশ্চর্য! বিশাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে, এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি না করে, কি ভাবে একেবারেই এত সহজে সঠিক টারমিনালে পৌঁছলাম? আনন্দে মনটা ভরে যায়। আমাদের শেষবারের শিকাগো ভ্রমণে, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় হোমের প্লেনে শ্রীরামকৃষ্ণ ইউনিভার্সেল টেম্পল দর্শনের শেষ পর্বের সমাপ্তি ভ্রমণ সুখকর হওয়ার পিছনে নিশ্চয়ই রয়েছে গুরুদেবের অশেষ কৃপা এবং স্বামী বরদানন্দের আশীর্ব্বাদ।