আমেরিকার আরকানসাস ষ্টেটের রোজার্স নামক ছোট্ট শহরের পাইনেকল্ হিলস্ এলাকার একটা কনডেমোনিয়ামে কিছুদিনের জন্য আমাদের বসবাস ছিল। আমাদের ঐ বাসগৃহ থেকে অনতিদূরেই ছিল একটা ওয়ালমার্ট আর সেটাই নাকি ওয়ালমার্টের প্রতিষ্ঠাতা স্যাম ওয়ালটনের প্রথম দোকান। আমরা ঠিক করেছিলাম রবিবার বন্ধের দিন সকালবেলা রোজার্সের ঐ ঐতিহাসিক ওয়ালমার্টে যাবো। কিন্তু শনিবার মাঝরাত থেকে বরফ পড়তে শুরু করে এবং এলাকার রাস্তাঘাটে বরফ প্রায় তিন ইঞ্চি উচু হয়ে জমাট বেঁধে থাকে। অগত্যা রবিবার সকালবেলা প্রতিকুল আবহাওয়ায় ঘর থেকে বের না হয়ে কম্পিউটারের সামনে বসে মাউস নিয়ে নাড়াচাড়া করি। গুগুলস্-এ চাঁদ প্রসঙ্গে কিছু দেখতে গিয়ে কম্পিউটারের পর্দায় ভেসে আসে ‘ফক্স টিভি এন্ড দি এপেলো মুন হোয়াক্স’। সেটাতে মনোনিবেশ করতেই মনে এক বিরাট ধাক্কা লাগে। হায় হায়, এটা যদি সত্যি হয় তাহলে কি সর্বনাশের কথা! এত বড় মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে আমেরিকা পৃথিবীর মানুষকে বোকা বানিয়েছিলো?

কম্পিউটারের পর্দায় যা ভেসে উঠে তাহলো, ১৫ই ফেব্রুয়ারী ২০০১ ইংরেজি বৃহস্পতিবার ফক্স টিভি নেটওয়ার্কের একটি কার্যক্রম বিশ্ববাসীর অবগতির জন্য খোদ আমেরিকার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হয়। সেটাতে উল্লেখ করা হয়েছে এপেলো চন্দ্রাভিযানে চন্দ্রপৃষ্ঠে নভোচরদের অবতরণের ঘটনা মিথ্যা। ১৯৬৯ সালে চন্দ্রপৃষ্ঠে মানুষ অবতরণের প্রযুক্তিগত কৌশল ও যন্ত্রপাতি নাসার ছিল না। সোভিয়েত রাশিয়ার সাথে শীতল যুদ্ধে জড়িত আমেরিকা বিশ্ববাসীর নিকট নিজেদের প্রভাব জাহির করার জন্য নাসাকে দিয়ে চন্দ্রপৃষ্ঠে মনুষ্য অবতরণের নাটক করে। সমস্ত ঘটনাটাই সাজানো এবং নাভাদা মরুভূমিতে সেই নাটক অভিনীত হয়।

এতটুকু পড়েই চোখ আর এগুতে চায় না। মনে তোলপাড় হয়। ধেয়ে আসে পুরনো স্মৃতি। আমাদের বাঁধন না মানার দিনগুলোতে, নীল আর্মস্ট্রং এবং এডুইন এলড্রিনের চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণের কাহিনি বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। তখন নিজেদের জ্ঞান-গম্যি বিচার না করেই বিজ্ঞানের ওই অভূতপূর্ব সাফল্যের কাহিনি গায়ে গঞ্জে, শ্রমিক মহল্লায় মেহনতি মানুষের নিকট কত না জোর দিয়ে প্রচার করা হয়েছে। স্মৃতি-পটে ভেসে আসে সে সব অতীতের ঘটনা। বরথল চা বাগানে লেবার লাইনের পাশ দিয়ে আমি আর সুজন পায়ে হেঁটে চলছি। সমীরদার বাড়িতে এই ফাড়ি পথটাই আমাদের সুবিধাজনক। রাস্তায় বিভিন্ন শ্রেণির লোকজনের সঙ্গে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নেই এবং হাঁটার দূরত্বটাও কম।

সন্ধ্যায় আঁধার ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই ডেরা থেকে বেরিয়ে পড়ি। চারদিক অন্ধকার হয়ে আসে। শ্রমিক বস্তীর ঝুপড়িতে কেরোসিন বাতির টিম টিম আবছা আলো নিশানা করে হাঁটতে থাকি। ইতিমধ্যে সন্ধ্যারাতেই মেঘহীন নির্মল আকাশে ধীরে ধীরে ঝিকিমিকি নক্ষত্রের মেলা বসে যায়। লেবার লাইনের লাগোয়া কোন এক শিউলি গাছ থেকে মৃদুল বাতাস সুবাস বয়ে আনে। আঃ কি সুন্দর শিউলি ফুলের গন্ধ! সুজন বুক ভরা দম টেনে নিতে নিতে বলে। সুজনের কথা শুনার সাথে সাথে আমিও টের পাই শিউলি ফুলের সুগন্ধ। দিনের বেলায় বরথল চা বাগানের লড়াকু শ্রমিক বীরুয়া তাঁতি ও তাঁর অনুগামীদের সাথে গোপন বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটা হয়নি। এমনিতেই বসে বসে সারাটা দিন কাটে। আর এই নিষ্ফলা দিনের শেষে নিরানন্দ মন নিয়েই আমি আর সুজন পাশাপাশি লেবার লাইনে পায়ে হাঁটা পথ ধরে বরথল থেকে থাইলুর দিকে এগিয়ে চলি। চলতি পথে বাতাসে বয়ে আনা শিউলি ফুলের সুগন্ধ সুজন এবং আমার নিরানন্দ মনে অযাচিতভাবেই আচমকা আমোদের ছোঁয়া দেয়। এ সময় আলো, হাওয়া, রোদ এবং আকাশ সবকিছুতেই আগমনীর বার্তা। কদিন পরেই শারদীয়া দুর্গাপূজা। চা বাগানে বোনাস নিয়েই কুলি কামিনদের অধিক গুঞ্জন। বোনাসের দাবিতে শ্রমিকপক্ষ এবং মালিক পক্ষের দড়ি টানাটানি তুঙ্গে।

বরাকপারের সব বাগানগুলোতেই আই এন টি ইউ সি-র শ্রমিক সংগঠনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি।

বস্তুত কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন কাছাড় চা শ্রমিক ইউনিয়ন ছাড়া অন্য কোনও রাজনৈতিক দলের সংগঠন প্রায় নেই বললেই চলে। তবে বিরুদ্ধ রাজনৈতিক দলের সংগঠন না থাকলেও কাছাড় চা শ্রমিক ইউনিয়নের মধ্যেই প্রায় সব বাগানগুলোতে কমবেশি বিক্ষুদ্ধ শ্রমিক রয়েছে। আর বিক্ষুব্ধ শ্রমিক বীরুয়া তাঁতিদের সঙ্গে গোপন বৈঠকের জন্যই আমাদের বরথলে আসা। কিন্তু বোনাস নিয়ে ইউনিয়নবাবু এবং মালিক পক্ষের দৌঁড়ঝাপে বীরুয়া তাঁতি এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে এ সময় ওকে নিয়ে গোপনে বৈঠক করার ফুরসৎ নেই। অগত্যা আমাদেরকে বরথলের পাততাড়ি গুটিয়ে থাইলুর উদ্দেশ্যেই রওয়ানা দিতে হয়।

থাইলুতে গিয়েও আমাদের কাজের কাজ কিছু হবে কিনা বুঝতে পারিনি। শুনেছি বাগান পঞ্চায়েত বিনু কালিন্দীও বোনাস জ্বরে আক্রান্ত। তবে ওকে নিয়ে গোপন বৈঠক করতে না পারলেও আমাদের দুতিন বেলা খাওয়া দাওয়া এবং রাত কাটানোর কোনও অসুবিধা হবে না। সমীরদার বাড়িতে আমরা নিরাপদেই থাকতে পারব। পড়াশোনা বাদ দিয়ে শ্রমিক মহল্লায় আমাদের লুকোচুরি মাসীমা পছন্দ না করলেও উনার বাড়িতে থাকা খাওয়ার ব্যাপারে কোনও ত্রুটি করবেন না। এরকম ভেবেই আমাদের বরথল থেকে থাইলুর উদ্দেশে যাত্রা শুরু।

হাঁটতে হাঁটতে লেবার লাইন পার হয়ে বাগানের চারা বাড়ির মধ্য দিয়ে চলি। যেতে যেতে সুজন বলে - সমীরদা আমাদের সঙ্গে না আসায় ভালোই হয়েছে। সুজনের কথা আমার কানে এসে বাজতেই আগুপিছু না ভেবে আমি বলি – কেনরে? সমীরদা এলে কী অসুবিধা হতো?

-সমীরদা আমাদেরকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে দেখলেই মাসীমা খচে যেতো। ওকে আড়ালে আবডালে নিয়ে শাসিয়ে বলতো কেন ও আমাদের ঘরছাড়া করে কেবল শ্রমিক মহল্লায় ঘোরাঘুরি করছে। আমার প্রশ্নের উত্তরে সুজন এসব বলে।

– ধুর, সমীরদা আমাদের মাথা নষ্ট করবে কিরে? আমারইতো ওর স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে দিয়েছি। এতদিনতো সংশোধনবাদীদের ঘেরাটোপে আবদ্ধ থেকে কেবল মানতে হবে, দিতে হবের অনুনয় বিনয়ের ইউনিয়নবাজী করে আসছিল। ওকে আমাদের আড্ডায় নিয়ে আসছিলাম। ভদুদার রাজনৈতিক বিশ্লেষণে ওর মাথা সাফ হয়ে গেছে। ওর সকল ভাবনায় এখন থটস্ অফ মাও ক্রিয়া করে। রেড বুক ওর নিত্য সঙ্গী।

আমি সুজনের কথাশুনে সমীরদা সম্পর্কে একনাগাড়ে এতসব বলি। আমার কথা শুনে সুজন আবার বলে, - সমীরদার অবস্থানটা আমরা জানি। বাইরের কেউতো সব জানতে পারবে না। সমীরদা আমাদের চেয়ে বয়সে অনেক বড়। ও শহরের একটা কলেজে অধ্যাপনা করে। আমরা এখনও পড়াশোনায় কলেজের খাতায় লিস্টিবদ্ধ এবং বাউন্ডুলের মতই চলাফেরা করি। কাজেই সমীরদার সঙ্গে আমাদের মাখামাখি দেখে বাইরের লোক স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিতে পারে আমরা সমীরদার কথাতেই চলছি। তাছাড়া সমীরদার বাড়িতে আমরা যে ভাবে আসা যাওয়া করছি তাতে মাসীমা ভাবতেই পারেন আমরা ওর নেওটা হয়ে গেছি।

– তা অবশ্য ঠিক। সুজনের বিশদ বক্তব্য শুনে আমি সায় দেই।

বরথল থেকে থাইলু যাওয়ার পাড়ি পথের সিংহভাগই ঝোপঝাড় এবং জঙ্গলে ঘেরা। এ রাস্তায় চলাচলে পথচারীদের প্রায়ই হিংস্র জন্তু দর্শনের জনশ্রুতি রয়েছে। দিনের বেলাতেই এ পথ ধরে একা পাড়ি দিতে অনেকে সাহস করে না। একযোগে কয়েকজন দলবেঁধে চলে।

সুজন কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের পড়ুয়া ছাত্র। প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনেক ছাত্র বিপ্লবী রাজনীতিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। দেশের যা অবস্থা তাতে শাসকগোষ্ঠী পুরোনো কায়দায় আর জনগণকে শোষণ করতে পারছে না। জনগণও পুরোনো কায়দায় শোষিত হয়ে থাকতে চাইছে না। দেশে বৈপ্লবিক পরিস্থিতি বিদ্যমান। নকশালবাড়ির স্ফুলিঙ্গ সারা দেশে দাবানল সৃষ্টি করতে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় ক্যারিয়ারের জন্য বুর্জোয়া শিক্ষা ব্যবস্থায় নিজেকে আবদ্ধ রাখা দেশদ্রোহিতারই নামান্তর। ‘বুর্জোয়া শিক্ষা ব্যবস্থায় যে যত পড়াশোনা করে সে তত মুর্খ হয়।’ আরও অনেক ছাত্রদের সঙ্গে সঙ্গে বুর্জোয়া শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙ্গে ফেলার আওয়াজ তুলে সুজন প্রেসিডেন্সি কলেজের পাঠপর্বে ইস্তফা দিয়ে মাস দেড়েক হলো এখানে এসেছে। সত্তরের দশককে মুক্তির দশকে পরিণত করার উদগ্র বাসনা নিয়ে বৈপ্লবিক কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। বিপ্লবের কাজে ওর ডরভয় নেই। মৃত্যুভয় তুচ্ছ করেই বেপরোয়া তাঁর গতিবিধি। সুজনের সঙ্গে চলতে চলতে আমার মনও দিনে দিনে ভয়শূন্য হয়। রাতের অন্ধকারে, নির্জন শ্বাপদসঙ্কুল পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একবারও ঝোপঝাড় থেকে ভেসে আসা কোনও শব্দ আমার মনকে ভীত করেনি, শরীরের লোম খাড়া করে দেয়নি। অতি সহজেই এবং তাড়াতাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে আমরা থাইলু পৌঁছে যাই।

সমীরদার বাড়ি পৌঁছতে আরও সামান্য পথ এগিয়ে যেতে হবে। রাতটা খুব সম্ভব কৃষ্ণপক্ষের মাঝামাঝি। ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদ একটু আগে পূবাকাশে উঁকি দিয়েছে। দূর থেকে গাছগাছালিতে ঘেরা সমীরদার বাড়িটা আবছা আবছা দেখা যায়। বড় রাস্তা থেকে বাঁদিকে আলপথ ধরে সামান্য এগিয়েই বাড়ির সীমানায় পৌঁছে যাই। ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদের মেটমেটে আলোয় উঠোনের পশ্চিম ভিটেয় ঘরটার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। সুজন আমাকে পিছনে রেখে দরজার সামনে গিয়ে কড়া নাড়ায়। সামান্য সময়ের ব্যবধানেই ভেতর থেকে দরজা খুলে যায়। লণ্ঠনটা বাঁ হাতে উঁচিয়ে মাসীমা আমাদেরকে দেখে অবাক হয়ে বলেন,- আরে এই রাত্তিরে তোরা কোত্থেকে এসেছিস?

আমাদের মুখ দিয়ে কোনও রা কাড়ে না। মাসীমা একটু সরে গিয়ে আদূরে গলায় বলে, - আয়, ভেতরে আয়।

সুজন ঘরে পা ফেলে। আমিও সুজনের পিছু পিছু হেঁটে সোজা সমীরদার জন্য বাড়িতে বরাদ্দ কোঠার দিকে এগোই। যেতে যেতে মমতা জড়ানো মাসীমার আদুরে গলার আওয়াজ

  • ‘আয়, ভেতরে আয়’ কথাগুলো কানে বাজতে থাকে আর মনে হয় আমাদের গায়েগঞ্জে কত না গোর্কির মায়ের মত মা মাসীরা রয়েছেন।

ঘন্টাখানেকের মধ্যেই মাসীমা খাবার তৈরি করে আমাদেরকে ডাক দেন। পথে হাঁটার ক্লান্তি এবং ক্ষুধার তাড়নায় আমরা বেশ কাবু। মাসীমার ডাক শুনেই ঝটপট রান্নাঘরে এসে পাতানো পিঁড়িতে বসে পড়ি। থালাভর্তি ভাত, ডাল আর আলুভাজা মাসীমা আমাদেরকে এগিয়ে দেন। আমি আর সুজন পাশাপাশি বসে পরমতৃপ্তিতে খেতে থাকি। মাসীমা সামনে বসে আমাদের খাওয়া দেখেন। সামান্য কিছুক্ষণ পর আমাদের বলেন, -হ্যাঁরে, তোদের সাথে এবার সমীর এল না কেন? মাসীমার প্রশ্ন শুনে আমি আর সুজন দুজনই দুজনের দিকে চাওয়া চাওয়ি করি। তারপর অবশ্য সুজনই বলে - সমীরদার কলেজ তো তিন চারদিন পরই পূজার বন্ধ হয়ে যাবে, সেজন্যই এখন সে আসেনি। আমাদের একটা জরুরি কাজ আছে বলেই তাড়াহুড়ো করে এসেছি।

আমাদের যে কী জরুরি কাজ সেটা মাসীমা পুরোপুরি না জানলেও কিছুটা এত দিনে আঁচ করে নিয়েছেন। তিনি জানেন আমাদেরকে এখানে আসলেই শ্রমিক পঞ্চায়েত বিনু কালিন্দী এবং এর সাকরেদদের নিয়ে রাতে লেবার লাইনে গোপনে শলা পরামর্শ করতে হয়। তিনি ধরে নিয়েছেন এবারও নিশ্চয় বিনু কালিন্দীদের ব্যাপারেই এসেছি।

গেলো তলব বাজারে বিনু কালিন্দীর সাথে মুরগী ব্যাপারী ফইজুল মিঞার মারপিট হয়েছে। মদ খেয়ে বিনু কালিন্দী হল্লা করতে করতে বাজারে আসে। সে মুরগী ব্যাপারী ফইজুল মিঞাকে ওর মুরগীর ঝাপি থেকে একটা বড় মুরগী বের করে দিতে বলে। মদ্যপ বিনু কালিন্দীকে মুরগী বের করে দিলে পরে দরদাম নিয়ে ঝামেলা হবে ভেবে ফইজুল ওকে পাত্তা দেয়নি।

ফইজুল পাত্তা দিচ্ছে না দেখে বিনু কালিন্দী ক্ষেপে যায়। সে হেলে দুলে আগবেড়ে ফইজুলকে ধাক্কা দিয়ে বলে, - হেই বেটা বাঙালোর পুয়া, তর মুরগী ইটা খাইতাম। বাইর কর, কত দাম লাগে তর?

বিনু কালিন্দীর ধাক্কা ফইজুলকে নাড়াতে পারেনি। ফইজুল ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। সে একটু পিছনে সরে বেসামাল বিনু কালিন্দীকে তাচ্ছিল্যভাবে বলে,

  • ওই, আরও কিছু পানি খাইয়া আয়। তর মুরগী খাওয়া লাগত না। একেবারে যাইবেগী হউ চান্দো।

এরকম বলে ফইজুল বিনু কালিন্দীকে আঙুল উঁচিয়ে পূবদিকে সন্ধ্যাকাশে উঠা বড় পূর্ণিমার চাঁদ দেখায়। মুরগী ব্যাপারী ফইজুল মিঞা সে মুহূর্তে আঙুল উচিয়ে বিনু কালিন্দীকে ‘একেবারে যাইবেগী হউ চান্দো’ বলার কারণ চাঁদ তখন সারা বিশ্বের আনাচে কানাচে সর্বজনীন আলোচ্য বিষয়। এপেলো-১১ মহাকাশযানে ১৯৬৯ ইংরেজির ১৬ই জুলাই ভূপৃষ্ঠ থেকে উৎক্ষেপিত হয়ে প্রদক্ষিণরত মূলযান চড়ে ২১শে জুলাই নীল আর্মস্ট্রং এবং এডুইন এলড্রিন চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণ করে। সেখানে আমেরিকার পতাকা ও বিজয় ফলক স্থাপন, পদচারণা এবং নানা পরীক্ষা নিরীক্ষার পর মূলযান চড়ে পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন করে। ২৪ শে জুলাই তারিখে প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব নির্দিষ্ট অঞ্চলে অবতরণ করে। এ ঘটনা নিয়ে সারা পৃথিবী জুড়ে হুলুস্থুল। গায়েগঞ্জে, হাটে বাজারে, ঘরের কোণে কোণে প্রচার হয় এমন দিন আর দূরে নয় যখন মানুষ চাঁদে যাতায়াত করবে এবং সেখানে বসতিও স্থাপন হবে।

ফইজুল ঝাপি থেকে মুরগী বের না করে, চাঁদে মানুষ অবতরণের সর্বজন আলোচ্য বিষয় নিয়ে বিনু কালিন্দীকে বিদ্রূপাত্মক কথা বলায় সে ভীষণ ক্ষেপে যায়। মরীয়া হয়ে ফইজুলকে ঝাপটে ধরে এবং আওয়াজ দিয়ে বলে, হালা বাঙালোর পুয়া, মুরগী কিনতাম তো আমারে চান্দো যাইবার কথা বলবি কেনে? ফইজুল মদের নেশায় ভারসাম্যহীন বিনু কালিন্দীর হাত থেকে ছাড়া পেতে একটা ঝটকা মারে আর তাতেই বিনু কালিন্দী ছিটকে মাটিতে পড়ে যায়।

বিনু কালিন্দী মাটিতে পড়ে গেছে দেখে আশেপাশের বাগান মজুররা দৌড়ে আসে। বাগান পঞ্চায়েতের গায়ে হাত তুলেছে অভিযোগে ফইজুলকে সবাই মিলে মারতে যায়। অবশেষে ইউনিয়নবাবু ভোলা সিংয়ের হস্তক্ষেপে হইহল্লা থামে। ফইজুলকে জলের দামে বাকীতে বিনু কালিন্দীর পছন্দের মুরগী ঝাপি থেকে বের করে দিতে হয়। ঘটনার শেষ সেখানেই নয়। পরবর্তীতে শুনা যায় ফইজুল তার দল ভারী করে বদলা নেওয়ার ধান্দায় আছে।

সমীরদাকে বাদ দিয়ে আমরা দুজন একটা জরুরি কাজে এসেছি শুনে মাসীমার ধারণা তলব বাজারে বিনু কালিন্দী এবং ফইজুলের সংঘর্ষই আমাদেরকে এ সময়ে এখানে আসতে বাধ্য করেছে। বিনু কালিন্দী এবং ফইজুল দুজনই আমাদের কাছের মানুষ। আমরা তো চাই না শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে বিভাজন হোক। এতে প্রতিক্রিয়াশীলদের হাত শক্ত হয়। সংগ্রামী ঐক্যে ফাটল ধরিয়ে দেয়। তাই মাসীমা নিজ ধারণা থেকেই বিনু কালিন্দী এবং ফইজুল পর্বের প্রসঙ্গ টেনে আমাদেরকে শেষে বলেন - দেখ বাবা, ওদের দরবারে তোরা বেশি জড়িয়ে পড়িস না। আমরা কিন্তু বিনু কালিন্দী ও ফইজুলের এ কাহিনী সম্বন্ধে কিছুই জানতাম না। বরথল লেবার লাইনে থাকার সময় যদি এখবর আমাদের নিকট পৌঁছত তাহলে আর থাইলুর দিকে পা বাড়াতাম না। আমাদের লক্ষ্য চা বাগানে মাও সে তুঙের চিন্তাধারায় লড়াকু শ্রমিকের গোপন সেল গঠন করা। বিনু কালিন্দী ও তার সহযোগীদের নিয়ে নিরালায় বৈঠক করে গোপন সেল গঠন করার প্রক্রিয়া শুরু করার সুযোগ না পাওয়া যায় তাহলে আমাদের এখানে থেকে কোনও লাভ নেই। এমনিতেই এখন মালিকপক্ষের সাথে বোনাসের ব্যাপারে দড়ি টানাটানি চলছে। এমতাবস্থায় ফইজুলের সাথে সংঘর্ষ বাঁধিয়ে আরও বাড়তি যে সমস্যা খাড়া করেছে তাতে বিনু কালিন্দীকে নিয়ে এবার আর কোনও গোপন বৈঠক করা সম্ভব হবে না। বরথলের মত এখান থেকেও কাজের কাজ কিছু না করে আমাদেরকে ফিরতে হবে।

এসব ভেবেই আমি মাসীমাকে বলি – না মাসীমা, আমরা ওদের দরবারে নাক গলাতে যাবো না।

একথা বলে থেমে যাই। আমি আর কিছু বলছি না দেখে সুজন মুখ খুলে। সে বলে, – হ্যাঁ মাসীমা, আমরা ওদের ওসব ব্যাপারে নেই। জরুরি কাজে বরথলেই এসেছিলাম। ভাবলাম এতদূর যখন এসেছি, আর একটু এগিয়ে মাসীমাকে দেখে যাই। দু’বেলা মাসীমার হাতে রান্না করা ভালোমন্দ খেতে পাবো আর আমাদেরও একটু বিশ্রাম হয়ে যাবে।

সুজন এবং আমার কথাশুনে মাসীমা খুশি হন। খুশি খুশি ভাব নিয়েই হাড়ি থেকে থালায় আরও কিছু ভাত নিয়ে আমাদের পাতে ঠেলে দেন। আমরাও পরম তৃপ্তিতেই ভাত সাবাড় করতে থাকি।

তারপর মাসীমা বিনু কালিন্দী আর ফইজুলের ব্যাপার বাদ দিয়ে কেবল চাঁদের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, – আমার কিন্তু বাবা তোদের ওই চাঁদে মানুষ নামার ব্যাপার নিয়ে খুব সন্দেহ হয়। কিছুতেই বুঝতে পারি না কীভাবে ওই গোল চাঁদের মধ্যে মানুষ গিয়ে দাঁড়াবে। সেদিন সন্ধ্যারাতে উঠোনে দাঁড়িয়ে আকাশে উজ্জ্বল চাঁদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে অনেকক্ষণ দেখলাম। এরোপ্লেন কিংবা ওই জাতীয় কোন কিছু যদি চাঁদে পৌঁছায়ও মানুষকে সেখানে দাঁড় করিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ওরা তো চাঁদ থেকে খসে পড়ে যাবে।

মাসীমার কথাশুনে আমার খাওয়ার গতি কমে আসে। আমি সুজনের দিকে তাকাই। সুজনও খাওয়া বাদ দিয়ে একবার আমার দিকে আরেকবার মাসীমার দিকে তাকায়। আমেরিকার নভোচর নীল আর্মস্ট্রং এবং এডুইন এলড্রিনের চাঁদে অবতরণ করার ঘটনা বিশ্বস্বীকৃত। কিন্তু তাদের চাঁদে অবতরণের প্রশ্নে অতি সহজ এবং সাবলীল ব্যাখ্যায় কীভাবে মাসীমার সন্দেহ নিরসন করতে পারি তা ভেবে পাই না।

তখন অবশ্য কয়েক মিনিটের নীরবতা ভঙ্গ করে সুজনই বলে, - মাসীমা, চাঁদে মানুষ নেমেছে ঠিকই। আমরা পৃথিবী থেকে আকাশে চাঁদকে যত ছোট দেখছি আসলে সেটাতো তা নয়। মহাশূন্যে অনেক দূর থেকে আমাদের পৃথিবীটাকেও চাঁদের মত গোলাকৃতি দেখায়। অথচ পৃথিবীপৃষ্ঠে পাহাড় পর্বত, নদী-সমুদ্র, সমতল ভূমি প্রভৃতি নিয়ে কত বিস্তর পরিসর রয়েছে। মানুষজন, জন্তু-জানোয়ার কোন কিছুইতো পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে ছিটকে পড়ে যাচ্ছে না। চাঁদেও বিস্তর পরিসর রয়েছে। আর চন্দ্রপৃষ্ঠের বিস্তর পরিসরেই কোন এক জায়গায় নভোচররা অবতরণ করেছে।

সুজনের ব্যাখ্যা শুনে মাসীমা বলেন, - কি জানি বাবা, তোদের সব কথাবার্তা আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারি না।

আমি মাসীমার মুখের দিকে ভালোভাবে তাকাই। মনে হলো, প্রসঙ্গের ইতি টানতে গিয়েই মাসীমা বলেছেন কি জানি বাবা, তোদের সব কথাবার্তা আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। বস্তুত, চাঁদে নীল আর্মস্ট্রং এবং এডুইন এলড্রিনের অবতরণের প্রশ্নে উনার মনে সন্দেহের প্রশ্ন রয়েই গেছে।

ফক্স টিভি এন্ড দি এপেলো মুন হোয়াক্সের বিষয়কে কেন্দ্র করেই এতসব ঘটনা এবং মাসীমার সেই সন্দেহ প্রবণ অতীতের মুখখানা চারদশক পর আমার মানস পর্দায় উজ্জ্বল হয়ে উঠে।

অতীত দিনের এত সব ঘটনা একের পর এক স্মৃতিতে ভেসে আসায় মন আমার এক অদ্ভুত অনুভূতিতে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে। সামনে কম্পিউটারের উন্মুক্ত পর্দা। কীবোর্ড এবং মাউস প্রভৃতি যেমন ছিল তেমনই পড়ে থাকে। আমিও নিশ্চুপ বসে থাকি। হঠাৎ কম্পিউটার বিদ্যুৎ সংযোগহীন হওয়ার সংকেতে সম্বিৎ ফিরে পাই। কী বোর্ডের পাশে অচল মাউসটাকে ধীরে ধীরে হাতের তলায় কব্জা করে কম্পিউটার শাট ডাউন করার প্রক্রিয়া শুরু করি।

কম্পিউটার শাট ডাউন করার পর নির্জন প্রকোষ্ঠে আরও কিছু সময় বসে থাকি। একাকী মনে আবার ভাবনা এসে জড়ো হয়। সুদীর্ঘ চল্লিশ বছরে দেশ ও দিনকালের কত পরিবর্তন হয়েছে! এশিয়ার মুক্তিসূর্য ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রবল উত্থান যুব ছাত্র ও মেহনতি জনতার বিপ্লবী কর্মকাণ্ড ভোতা করে দেয়। ভারতে কৃষকের গণমুক্তি ফৌজ গঠন করে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। বীরুয়া তাঁতি আর বিনু কালিন্দীদেরকে নিয়ে গোপনে বিপ্লবের অগ্রগামী বাহিনী গঠন করা সম্ভব হয়নি। সুজন কলকাতায় ফিরে যায়। সমীরদা বিয়ে থা করে ঘর সংসারী হন শুধু তাই নয়, সমীরদার ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে। ছেলে স্লোভাকিয়ায় কৃষিবিজ্ঞানের কোন এক বিষয় নিয়ে রিসার্চ করছে। মেয়েটিও জার্মানির এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। ছেলেমেয়ে দুটোই ভারত সরকারের বৃত্তি পেয়ে বিদেশ গিয়েছে। মাসীমা অবশ্য নাতি-নাতনীর এ খবর জেনে যেতে পারেনি। বছর পাঁচেক হলো উনি দেহরক্ষা করেছেন।

বিশ্ব রাজনীতিতেও কত না পট পরিবর্তন! সর্বহারার একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রথম দিশারী সোভিয়েত রাশিয়া ভেঙ্গে খান খান। সাচ্চা কম্যুনিস্ট চীন সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকায় সমাদৃত। চীনের তৈরি দৈনন্দিন জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় সব জিনিসই আমেরিকার শপিং মলে ক্রেতাদের চাহিদা মেটাচ্ছে।

আমেরিকার প্রশাসন এখন মানুষকে আর চাঁদে পাঠানোর জন্য তড়িঘড়ি করছে না। ওদেশের হাজারে হাজারে লোক আর্থিক মন্দায় সবকিছু হারিয়ে ফাঁকা আকাশতলে সাগরতটে দিন গুজরান করছে।

এসব ভাবনাই নির্জন প্রকোষ্ঠে বসে থাকা একাকী মনে উথাল পাথাল হয়। ফক্স টিভি নেটওয়ার্কে সম্প্রচারিত বক্তব্য ঠিক না বেঠিক ভাবতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলি। থাইলুর মাসীমার মতই তখন মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে কি জানি বাবা, সব কিছু বুঝে উঠতে পারি না।