কোচিন শহরের ভাইটিলা এলাকায় এল, এম, পাইলি লেনের বাড়িটাতে আমাদের বসবাসের বেশ কিছুদিন হয়ে গেলো। বাড়ির মালিক কেরলের স্থায়ী বাসিন্দা, মালয়ালম ভাষাভাষী এবং সম্ভ্রান্ত হিন্দু। সম্প্রতি একটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। ভদ্রলোক এবং উনার গিন্নি বাড়িতে থাকেন। ভাড়াটিয়ার প্রতি ওদের ব্যবহার অমায়িক।
নূতন জায়গায় গিয়ে বসবাস করতে দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় খুটিনাটি অনেক জিনিসের খোঁজ খবর নিতে ওদের সাহায্য অপরিহার্য। কিন্তু আমাদের নিজস্ব ভাষায় সেই প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোর নাম ওদেরকে বলে বুঝানো যায় না। আর জিনিস পত্রের সঠিক স্থানীয় নাম জানা না থাকলে দোকানে গিয়ে কিছুই কেনা কাটা করা যায় না। রান্নার উপকরণ যথা কালীজিরা, গুলমরিচ, আদা এবং মাছ কুটার বটিদা, নারকেল কুড়ানি প্রভৃতির স্থানীয় নাম জানতে গিয়ে গলদগম হতে হয়েছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তবে বাড়িতে ঠাকুরের নিত্য পূজা করার জন্য ঠাকুর রামকৃষ্ণ, মা সারদা এবং গুরুদেব স্বামী গহনানন্দজীর ফটো কোথায় পাওয়া যাবে জিজ্ঞেস করে অতি সহজেই তাদের কাছ থেকে জানতে পারি যে, আমাদের এল,এম, পাইলি লেন থেকে পাথর ছোড়া দূরত্বেই রয়েছে ভাইটিলা রামকৃষ্ণ মঠ এবং সেখানে গেলেই ওগুলো পাওয়া যাবে। এল,এম, পাইলি লেন থেকে বেরিয়ে ভাইটিলা চৌমাথায় যাওয়ার রাস্তায় পা ফেললেই সামনে রয়েছে ৪৭নং জাতীয় সড়ক। উত্তরে তামিলনাড়ুর শেষ প্রান্ত থেকে দক্ষিণে ভারত মহাসাগরের পার অবধি আরব সাগরের উপকূল ঘেঁষে চলে গেছে চার লাইনের ৪৭নং জাতীয় সড়ক এবং তার দু’ধারের কিছু ফাঁকা জায়গা নিয়ে চওড়া হবে প্রায় একশ মিটারের কাছাকাছি। সকাল থেকে সন্ধ্যা এবং সন্ধ্যা থেকে সকাল অবধি সবসময়ই বিশাল বিশাল ষোল চাকার মালবাহী ট্রাক এবং নানা ধরণের যানবাহন এই মহাসড়ক দিয়ে যাতায়াত করে।
আমাদের গৃহস্বামীর নিকট থেকে ভাইটিলার রামকৃষ্ণ মঠের খবর জানার পর আমি একা একাই একদিন সকালবেলা ঠাকুরের ফটো সংগ্রহের জন্য মঠের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। বাড়ি থেকে বেরিয়ে ভাইটিলার চৌমাথায় পৌঁছে ত্রিপূর্ণাত্তোরার রাস্তা ধরে পায়ে হেটে এগোতে থাকি। রাস্তায় যানবাহনের চলাচল এবং লোকজনের ভিড় সামলে অতি সন্তর্পনেই ফুটপাতের কিনার দিয়ে ধীর গতিতে হাটতে হাটতে প্রায় ৩০/ ৩৫ মিনিট পর রামকৃষ্ণ মঠে পৌছে যাই।
ভাইটিলার চৌমাথা থেকে ত্রিপূর্ণাত্তোরা যাওয়ার রাস্তায় ৩/৪ ফার্লং দূরত্বেই ডানপাশে গাছপালা পরিবেষ্টিত শান্ত পরিবেশে রামকৃষ্ণ মঠ অবস্থিত। মঠ চত্বরে ঢুকেই ডানদিকে রয়েছে মঠ পরিচালিত রোেগ আরোগ্যের হোমিও প্যাথিক সেবা প্রতিষ্ঠান ও লাইব্রেরী। সামনে মাঝারি আকারের আসাম টাইপ ঘরের দোতালায় ঠাকুর শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণের মূর্তি। সেখানেই ঠাকুরের পূজার্চনা হয়। মূর্তির সামনে ভক্তদের বসে জপধ্যান করার প্রশস্ত জায়গা। দোতালার নিচে লাগোয়া অন্য ঘরে মঠের সন্ন্যাসীরা থাকেন।
আমি ধীরে ধীরে সিড়ি বেয়ে দোতালায় উঠে ঠাকুরকে প্রণাম করি। সেখানে অন্য কেউ নেই। চারদিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখি। মঠের এক পাশে জাতীয় সড়ক এবং অন্য পাশে রাজ্য সড়ক দিয়ে, যানবাহন ও লোক চলাচল করলেও গাছপালায় পরিবেষ্টিত রামকৃষ্ণ মঠ চত্বরের পরিবেশ খুবই নিরিবিলি ও শান্ত। ঠাকুরকে প্রণাম করে সিড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসি। পাশে সন্ন্যাসীদের ঘরের সামনে গিয়ে দেখি একজন মহারাজ চেয়ারে বসে আছেন। কোন কাথাবার্তা না বলেই সোজা ঘরে ঢুকে মহারাজকে প্রণাম করি। মহারাজ আমাকে কিছু বলার আগেই আমি ইংরেজিতে বলি – মহারাজ, আমি সুদূর আসাম থেকে এসেছি। এখানে পাশেই এল, এম, পাইলি লেনে ভাড়া বাড়িতে থাকি। আমি মিশনের দীক্ষিত। বাড়িতে ঠাকুরের আসন বসানোর ইচ্ছা। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ, সারদামা, স্বামী গহনানন্দের ফটো চাই, এখানে পাওয়া যাবে কি?
আমার ইংরাজিতে কথা বলার ধরণ এবং চলাচলন দেখে বোধহয় তিনি বুঝতে পেরেছিলেন আমি বাঙ্গালী। তাই তিনি আমাকে বসার ইঙ্গিত করে বাংলাতেই বললেন,
– না, আমাদের এখানেতো ফটো বিক্রি করার কোন ব্যবস্থা নেই, আপনি কালাডিতে পাবেন।
আমি কালাডি নামটি জীবনে এই প্রথম শুনি। তাই কালাডি কি, কোথায় এবং কিভাবে কালাডি থেকে ফটো সংগ্রহ করতে পারবো প্রভৃতি বিষয় মহারাজের নিকট থেকে জেনে নিতে ইচ্ছা হয় এবং তা মহারাজের নিকট ব্যক্ত করি। আমি নবাগত, মালয়ালম ভাষা জানিনা, রাস্তাঘাট অপরিচিত এবং কালাডি সম্পর্কে আমার কোন ধারণাই নাই, তাই আমার পক্ষে কালাডিতে ফটো সংগ্রহ করা সম্ভব হবে না ভেবেই মহারাজ এ ব্যাপারে আমাকে কিছু বলতে উৎসাহ দেখাননি। আমিও নিরুৎসাহ হয়ে মহারাজের সামনে থেকে চলি আসি এবং মঠের এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি করি। কিছুক্ষণ পর মঠ থেকে বেরিয়ে আসার সময় মঠের আরো দু’জন আবাসিকের সাথে দেখা হয়। ওদের একজন গৈরিক বসনধারী বৃদ্ধ সন্ন্যাসী। অন্যজন সাদা কাপড় পরিধানকারী যুবক ব্রহ্মচারী। যুবকটি মূলত দাক্ষিণাত্যের অধিবাসী হলেও বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারেন। বিগত কিছুদিন আগে বেলুড় মঠ থেকে ভাইটিলা মঠে এসেছেন। এই দুজনের কাছেও ঠাকুরের ফটো কোথায় পাব জিজ্ঞেস করে কোন সদুত্তর না পেয়ে আমি হতাশ হয়েই মঠ থেকে বেরিয়ে আসি। মহারাজের নিকট থেকে শুনা কালাডি নামটি আমার মনের অতলে থিতু হয়ে যায়। কালাডি সম্পর্কে কিছু জানার আগ্রহ হয়নি কিংবা সেখানে যাওয়ার কোন তাগিদ অনুভব করিনি।
বেশকিছুদিন পর ৮মে ২০০৫ ইংরেজি রবিবার বিকাল বেলা মুন্নার থেকে ফেরার পথে ৪৯নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে পশ্চিম দিকে এগিয়ে কুট্টামঙ্গলমে এসে পৌঁছাই। সেখান থেকে সোজা পথে এর্নাকুলামের দিকে না গিয়ে আমাদের গাড়ির চালক সার্জু ডানদিকে পেরাম্বাডুর যাওয়ার রাস্তা ধরে এগিয়ে চলে। পেরাম্বাডুর পৌঁছে সেখান থেকে আধ ঘণ্টা সময় রাস্তা পাড়ি দিয়ে পেরিয়ার নদীর উপর শ্রীশঙ্করাচার্য সেতুতে পৌঁছাই ‘আর শঙ্করাচার্য সেতুটির ওপারেই রয়েছে জনবহুল চৌরাস্তার মোড়। ট্যাক্সির ভিতর থেকে চৌমাথার ব্যস্ততম এলাকায় রাস্তার পাশে দোকানপাটে টাঙানো সাইনবোর্ডে ইংরেজিতে হঠাৎ কালাডি নামটি দেখে সচকিত হই।
‘আরে, এটাইতো কালাডি শহর।
এই কালাডিতেই কি ঠাকুর রামকৃষ্ণ, সারদা মা এবং গুরুদেবের ফটো পাওয়া যাবে বলে ভাইটিলা রামকৃষ্ণ মঠের মহারাজ বলেছিলেন?
আমি চালক সার্জকে গাড়ি থামাতে বলি। গাড়ি থেকে নেমে খবর নিয়ে জানতে পারি একটু এগিয়ে ডানপাশ দিয়ে যে রাস্তাটি গেছে সে পথ ধরে একটু এগোলেই পাওয়া যাবে শ্রী রামকৃষ্ণ অদ্বৈত আশ্রম।
ইউরেকা। ইউরেকা। কিছুদিন পূর্বে যা পাওয়ার আকাঙ্খা ছিল তার সন্ধান পেয়ে গেছি। গাড়িতে উঠে সাজুকে নির্দেশ দেই শ্রীরামকৃষ্ণ অদ্বৈত আশ্রমের দিকে চলতে। সামান্য কিছুদূর এগিয়ে গাড়ি যেখানে থামল সেখানে গাড়ি থেকে নেমে আশ্চর্য হয়ে যাই।
একটি বিশাল তোরণ। তোরণটিতে স্থানীয় মালয়ালম ভাষায় হিজি বিজি অনেককিছু লেখা থাকলেও এক জায়গায় ইংরেজিতে বড় হরফে লেখা রয়েছে (1217th Shri Shankara Jayanthi Mahotsavam 2005) ১২১৭ তম শ্রীশঙ্কর জয়ন্তী মহোৎসবম ২০০৫ ইংরেজি।
মুন্নার থেকে কোচিন ভাইটিলার বাড়িতে ফেরার পথে হঠাৎ অভাবনীয় ভাবে কালাডির সন্ধান পেয়ে যুগপৎ আনন্দিত ও যতটুকু আশ্চর্য হই তার চেয়ে আরো আশ্চর্যের বিষয় হলো সেখানে পৌঁছেই জানতে পারি বৈদিক ভারত আত্মার মহাপুরুষ শঙ্করাচার্যের জন্মস্থান এই কালাডিতেই ৯ মে থেকে ১৬মে ২০০৫ ইংরেজি পর্যন্ত ১২১৭ তম শ্রী শঙ্কর জয়ন্তী মহোৎসব পালনের প্রস্তুতি চলছে।
এলাকার চারদিকে উৎসবের বাতাবরণ। তোরণ এবং মন্দিরের আনাচে কানাচে মহোৎসব উৎযাপন সমিতির উদ্যোগে সবকিছু সাজানো হচ্ছে। এসব দেখে তোরণের সামনে খোলা উদ্যানে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত ভাবাবেগে নিজেকে হারিয়ে ফেলি। কেরল রাজ্যে এর্নাকুলাম জেলার আলুবা তালুকে পশ্চিমঘাট পাহাড়ের অনতিদূরে অবস্থিত সবুজ বদ্ধিষ্ণু গ্রাম কালাডি। গ্রামটিকে ডানপাশে রেখে পূব থেকে পশ্চিমে বয়ে চলেছে ভারতের পশ্চিম উপকূলের সবচেয়ে প্রাণবন্ত নদী পেরিয়ার। সারা বছরই স্বচ্ছ সলিল ধারায় পরিপূর্ণ। স্মরণাতীত সময় থেকে বয়ে আসা এই পুণ্য নদীকেই ভিত্তি করে কালপ্রবাহে আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রকৌশল প্রয়োগে তৈরি হয়েছে পুল্লিভাসাল, পেরিয়ার ভ্যালী ইরিগেশন প্রজেক্ট। বলতে গেলে সারা কেরলেই আলো আর শক্তি যোগানের উৎস এই পেরিয়ার নদী।
আজ থেকে দেড় সহস্রাধিক বছরের চেয়ে ও অধিক প্রাচীন সময়ে দাক্ষিণাত্যের কেরল প্রদেশে পেরিয়ার নদীর পার্শ্ববর্তী কালাডি গ্রামে নাম্বুধি ব্রাহ্মণদের বসবাস ছিল। সেই নাম্বুদ্রি ব্রাহ্মণ পরিবারেরই শিবগুরু এবং আর্যস্তা নামে এত দম্পতির বিবাহিত জীবনের প্রথম দিকে কোন সন্তানাদি ছিল না। কথিত আছে কালাডি গ্রামের অনতিদূরে পেরিয়ার নদীর তীরেই বৃষাদ্রির মন্দিরে শিবের নিকট তিন বৎসর কাল অবধি আরাধনার ফলে সেই দম্পতি এক পুত্র সন্তান লাভ করেন। পুত্র সন্তানটির জন্মের পরই পিতা শিবগুরু পরলোক গমন করেন। মাতা আর্যম্ভার উপরই শিশুটির লালন পালনের দায়ভার বর্তায়। পাঁচ বৎসর বয়সে তার উপনয়ন হওয়ার পরই গুরুকুলে শিক্ষারম্ভ হয়। দশ বছর বয়সেই চুর্তবেদ এবং ষড়শাস্ত্র পাঠ সমাপন করে। যে বয়সে সাধারণ বালকেরা গুরুকুলে শিক্ষা আরম্ভ করতে যায় সেই বয়সেই সে পাঠ সমাপনান্তে বিষয়ের উপর নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করতে সমর্থ হয়। তার যুক্তি তর্কের মোকাবিলা এবং আন পিপাসা মিটাতে গুরুদের অক্ষমতা প্রকাশ পায়।
বালক বয়স থেকেই সৃষ্টি তত্ত্বের অনন্ত জিজ্ঞাসা শঙ্করকে ব্যাকুল করে। বেদ বেদান্ত ও নানা ধর্ম শাস্ত্র পাঠ সমাপনান্তে জানার অসীম আগ্রহ তাঁকে স্বাভাবিক জীবন যাপনের পথ থেকে সরিয়ে আনে। সে সন্ন্যাস গ্রহণ করে সাংসারিক জীবনের গণ্ডী থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। কিন্তু পুত্র স্নেহে অধিক কাতর মা আর্যম্ভা সেটা চান না। তিনি কিছুতেই ছেলেকে নিজের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে রাজী নন।
কালপ্রবাহে শ্রুতিতে চলে আসছে একদিন বালক শঙ্কর তাঁদের বাড়ির পাশেই বয়ে চলা পেরিয়ার নদীতে মায়ের সঙ্গে স্নান করতে যান। সেখানে নদীর জলে নামার পর সাতার কাটতে কাটতে হঠাৎ শঙ্কর ভয়ার্তকণ্ঠে মাকে বলে - মা, আমাকে কুম্ভীরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তুমি যদি আমাকে সন্ন্যাস গ্রহণ করতে অনুমতি না দেও তাহলে ও আমাকে মেরে ফেলবে। পাশেই নদীর ঘাটে মা আর্যন্তা শঙ্করের আর্ত চিৎকার শুনে ব্যাকুল হন। কুম্ভীরের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে তৎক্ষণাৎ শঙ্করকে সন্ন্যাস গ্রহণ করার অনুমতি প্রদান করেন। এ ভাবেই নাকি অনুমতি প্রাপ্তির পর শঙ্কর মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। অবশ্যি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রাক্কালে মাকে আশ্বস্ত করে বলেন যে, সে যেখানেই থাকুক না কেন মায়ের মৃত্যুর পূর্বে এসে মায়ের পাশে থাকবেন।
শঙ্কর ঘর ছেড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রব্রজন করেন এবং গুরু সান্নিধ্য লাভ করে অনন্যমনে তপশ্চরণ ও যোগাভ্যাসে প্রবৃত্ত হন। সে সময়ই শঙ্কর বুঝতে পারেন তাঁর মায়ের মৃত্যুর দিন ঘনিয়ে আসছে। তাই তিনি ঘর ছেড়ে সন্ন্যাসী হওয়ার পূর্বে মাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য দেশের বাড়িতে মায়ের কাছে ফিরে আসেন। অসুস্থ ও বৃদ্ধা মা আর্যন্তা নিজের ছেলেকে ফিরে পেয়ে খুবই আনন্দিত হন। শঙ্কর মায়ের যথাযথো সেবা শুশ্রুষা করেন কিন্তু তিনি আর বেশিদিন বাঁচেননি। অচিরেই দেহ রক্ষা করেন।
আর্যম্ভার মৃত্যুর পর কালাডির অন্যান্য নাম্বুদ্রী ব্রাহ্মণেরা শঙ্করকে তাঁর মায়ের অন্তোষ্টি ক্রিয়া সম্পাদন করতে বাঁধা দেন। কারণ নাম্বুদ্রী ব্রাহ্মণদের অনুশাসনে সন্ন্যাসী হয়ে যাওয়া ব্যক্তির এ ধরণের অন্তোষ্টি ক্রিয়া সম্পাদন করার কোন অধিকার নেই। শঙ্কর গ্রামের ঐ সকল ব্রাহ্মণদের মত উপেক্ষা করেই নিজ বাড়ির পিছনে তাঁর মায়ের অন্তোষ্টি ক্রিয়া সম্পাদন করেন। মায়ের অন্তোষ্টি ক্রিয়া সমাপনের পর শঙ্কর গ্রাম ছেড়ে চলে যান। তিনি আর জীবদ্দশায় কোন দিন গ্রামে ফিরে আসনে নি।
অতঃপর তিনি ধর্ম প্রচারে দেশে দেশে ভ্রমণ করেন। তাঁর ধর্মমত বেদান্তের উপর স্থাপিত। কিন্তু সাধারণের জন্য তিনি শৈব ধর্মের প্রতিষ্ঠা করেন। ভারতের চার প্রান্তে তিনি চারটি মঠ নির্মাণ করে যান। সেগুলো হলো দ্বারকার সারদা মঠ, পুরীতে গোবর্দ্ধন মঠ, কর্ণাটকে শৃঙ্গেরী মঠ ও বদরিকাশ্রমে যোশী মঠ।
শঙ্করের আভির্ভাবের পূর্ব থেকে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব সারা ভারতকে ছাপিয়ে বহির্ভারতে বিস্তার লাভ করে। শঙ্কর ভারতের বিভিন্ন স্থানে এবং তিব্বতে গিয়ে বৌদ্ধ মতের খণ্ডন করেন। বৌদ্ধদিগকে বিচারে পরাস্ত করে বৈদিক ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিজয় পতাকা পুনরুজ্জীন করেন। শঙ্কর ভারতে হিন্দু ধর্মের সঙ্কট জনক অবস্থায় স্থানে স্থানে শিব মন্দির ও মঠ স্থাপন করে হিন্দু ধর্ম ও শাস্ত্রালোচনার সুবিধা করে দেন। তাঁর রচিত উপনিষদ ভাষ্য, বেদান্ত ভাষ্য, গীতা ভাষ্য প্রভৃতি গ্রন্থ অতি প্রসিদ্ধ। আজও সে সব গ্রন্থ বিদ্ধত সমাজে অমূল্য সম্পদ হিসাবেই সমাদৃত। ইহ জগতে মাত্র ৩২ বছর জীবনকালের মধ্যেই শঙ্কর এতসব কাজ করে গেছেন।
অল্প বয়সে দেহরক্ষা করলেও শঙ্করের প্রদর্শিত ধর্মমত স্তব্ধ হয়ে যায়নি কিংবা তাঁর কীর্তি বিলুপ্ত হয়নি। তাঁর প্রতিষ্ঠিত মঠগুলো আজ অবধি শিষ্যদের প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে। শিষ্যগণ শঙ্করকে শিবের অবতার বলেই মান্যতা দিয়ে আসছে।
যে শঙ্করাচার্য নাম্বুদ্রি ব্রাহ্মণদের মতামত উপেক্ষা করে মায়ের অন্তোষ্টি ক্রিয়া সম্পন্ন করে কালাডি ত্যাগ করে চলে গিয়েছিলেন, শঙ্করাচার্য্যের কীর্তির জন্যই আজ সেই কালাডি “আদি শঙ্কর জন্মভূমি ক্ষেত্রম” হিসাবে বিশ্বের ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের নিকট এক বিশিষ্ট তীর্থভূমি হিসাবে স্বীকৃত।
শঙ্করের দেহরক্ষার সহাস্রাধিক বছর পর তাঁর জন্মস্থান অর্থাৎ কালাডিতে গড়ে উঠে আরেক শৃঙ্গেরী মঠ। কর্ণাটকের তুঙ্গাভদ্রা নদীতীরে আদি শঙ্করাচার্য নিজে যে শৃঙ্গেরী মঠ তৈরি করেছিলেন কালাডির শৃঙ্গেরী মঠ সে মঠেরই শাখা। আদি শৃঙ্গেরী মঠের ৩৩তম আচার্য শ্রী সচ্চিদানন্দ শিব অভিনব নরসিংহ ভারতী স্বামীঙ্গলের বিশেষ প্রচেষ্টায় ১৯১০ ইংরেজির প্রথমভাগে শঙ্করের জন্মস্থানে এই মঠ স্থাপিত হয়।
কালাডির শৃঙ্গেরী মঠরে পাশেই বর্তমানে রয়েছে আর্যম্ভার সমাধি স্তম্ভ এবং সেটা তৈরি হয়েছে সে জায়গাতেই যেখানে শঙ্কর তাঁর মা আর্যম্ভার মৃতদেহ দাহ করেছিলেন। শৃঙ্গেরী মঠ এবং আর্যন্তার সমাধি স্তম্ভের মাত্র কয়েক মিটার দূরত্বে বয়ে চলেছে পেরিয়ার নদী। শৃঙ্গেরী মঠ ও সমাধি স্তম্ভের সরাসরি উত্তরে বয়ে যাওয়া নদীতেই একটি স্নানের ঘাটকে চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে- সেটাই হলো (Crocodile ghat) কুম্ভীর ঘাট। বালক শঙ্কর সন্ন্যাস গ্রহণে মায়ের অনুমতি প্রাপ্তির জন্য এই স্নানের ঘাটেই জলে নেমে সাতার কাটতে কাটতে মাকে ভয়ার্তকণ্ঠে বলেছিলো ওকে কুম্ভীরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
কালাডিতে শৃঙ্গেরী মঠ, আর্যম্ভার সমাধি স্থল এবং কুম্ভীর ঘাট ইত্যাদি ছাড়াও সেখানে কাঞ্চি কামকোটি পীঠের তত্ত্বাবধানে তৈরি হয়েছে শ্রী আদি শঙ্কর কীর্তি স্তম্ভ মণ্ডপ। স্তম্ভ মণ্ডপটির উচ্চতা ১৫২ ফুট এবং ব্যাসার্দ্ধ ৬০ ফুট। আধুনিক স্থাপত্য শৈলীতে ভরপুর নয়তালা বিশিষ্ট স্মৃতি সৌর্ধের নিচ থেকে আটতালা পর্যন্ত রয়েছে বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি, শঙ্করের কীর্তি কাহিনী, গীতোপদেশ এবং সবচেয়ে উঁচু তালায় রয়েছে চার শিষ্যদের নিয়ে শঙ্করের দশ ফুট উচু মূর্তি। কীর্তি স্তম্ভ মণ্ডপের শীর্ষ তালায় উঠে কালাডির চারদিকে তাকালে গ্রামের সবুজ বনানী, দূরে নীল পাহাড়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্য এবং স্বচ্ছ সলিল ধারায় প্রবাহমান পেরিয়ার নদীর দৃশ্যপট দর্শকদের প্রভূত আনন্দ দেয়।
উপরে উল্লেখিত শঙ্কর সম্পর্কিত বিষয়গুলি ছাড়াও কালাডিতে রয়েছে সংস্কৃত পাঠ ও চর্চার কেন্দ্র শ্রী শঙ্করাচার্য সংস্কৃত বিশ্ব বিদ্যালয়। (Sri Shankara Charya University of Sanskrit) এবং শ্রীরামকৃষ্ণ অদ্বৈত আশ্রম। অদ্বৈত আশ্রমে রয়েছে বেলুড় মঠের আদলে তৈরি শ্রীরামকৃষ্ণ ইউনিভার্সেল টেম্পল। শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রম ও শ্রীরামকৃষ্ণ ইউনিভার্সেল টেম্পল শঙ্করের জন্মভূমি কালাডিতে স্থাপিত হলেও সেটা আসলে বেলুড়ের রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের শাখা।
৮ মে ২০০৫ ইংরাজি রবিবার বিকাল বেলা মুন্নার থেকে কোচিন ভাইটিলা এল এম পাইলি লেনের বাড়িতে ফেরার পথে আচমকা কালাডির সন্ধান পেয়ে যাই। দিনটি ছিল শ্রী আদি শঙ্কর জন্মভূমি ক্ষেত্র, কালাডিতে ১২১৭ তম শ্রী শঙ্কর জন্মজয়ন্তী মহোৎসবের অধিবাস। ৯মে থেকে ১৩ মে পর্যন্ত পাঁচ দিবস ব্যাপী ঠাসা কর্মসূচীতে পালিত হবে মহোৎসব। তাই ৮মে শেষ বেলায় শঙ্কর জন্মভূমি ক্ষেত্রে চলছে সাজ সাজরব। আমরা ঘন্টা ব্যাপী সময় নিয়ে ঘুরে ঘুরে মহোৎসবের সাজ সজ্জা, শৃঙ্গেরী শঙ্কর মঠের বাহির ভিতর, আর্যম্ভার সমাধি স্তম্ভ এবং পেরিয়ার নদীর পাশে কুম্ভীর ঘাট প্রভৃতি পরিদর্শন করি। তারপর চলে যাই শ্রীরামকৃষ্ণ অদ্বৈত আশ্রমে।
শ্রীরামকৃষ্ণ অদ্বৈত আশ্রম এবং তৎসংলগ্ন শ্রীরামকৃষ্ণ ইউনিভার্সেল টেম্পল যদিও শ্রী শঙ্করের জন্মভূমি কালাডিতেই অবস্থিত সেটা আসলে হচ্ছে শ্রী রামকৃষ্ণ মঠও মিশনের শাখা। শ্রীরামকৃষ্ণ ইউনিভার্সেল টেম্পলটি বেলুড় মঠের আদলেই তৈরি।
শ্রীরামকৃষ্ণ অদ্বৈত আশ্রমে প্রবেশ করেই মন্দিরের বাইরে সাক্ষাৎ হয়ে যায় আশ্রমের অধ্যক্ষ স্বামী অমলেশানন্দজীর সাথে। স্বামীজীকে প্রণাম করার পর আলাপ আলোচনান্তে উনি জেনে নেন আমরা প্রবাসী বাঙ্গালী। স্বামীজী নিজেও বাঙ্গালী এবং দীর্ঘদিন ধরেই এই আশ্রমে আছেন। উনার সাথে বাংলায় কথাবার্তা বলতে পারায় খুব সুবিধা হয়। স্বামীজী সাদরেই আমাদেরকে সঙ্গে নিয়ে আশ্রমের বিশেষ স্থানগুলো দেখান এবং পরিশেষে নিয়ে যান আশ্রমের বিপণন কেন্দ্রে। সেখানে রয়েছে দেবদেবীও মিশনের পূর্ববর্তী অধ্যক্ষদের বিভিন্ন রকমের ফটো, ক্যাসেট, উপহার সামগ্রী এবং নানাবিধ মূল্যবান গ্রন্থ।
বেশ কিছুদিন পূর্বে ভাইটিলা রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন থেকে শ্রীরামকৃষ্ণ, সারদামা এবং গুরুদেবের ফটো সংগ্রহ করতে গিয়ে সেখানকার মহারাজের নিকট থেকে কালাডি নামটি শুনলেও কালাডি সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানতে না পেরে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম। আজ অপরিকল্পিত এবং অভাবনীয় ভাবে কালাডিতে এসে অনেক কিছু দেখে এবং জানতে পেরে খুবই আনন্দিত হই। শ্রী রামকৃষ্ণ অদ্বৈত আশ্রমের বিপণন কেন্দ্র থেকে পছন্দ মত ঠাকুর ও গুরুদেবের ফটো এবং কিছু পুস্তক খরিদ করে আশ্রমের বিপণন কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসি। ততক্ষণে দিনমণি পশ্চিম দিগন্তে ডুব মেরেছে। সন্ধ্যায় আশ্রমের বাতিগুলি জ্বলে উঠলেও কিছু কিছু জায়গায় আবছা অন্ধকার বিদ্ধমান। অদ্বৈত আশ্রমের আলো আঁধারি এলাকা পার হয়ে শৃঙ্গেরী মঠের কিনারায় পৌঁছতেই আবার আলোর ঝিলিমিলি নজরে পড়ে। শ্রী শঙ্করের ১২১৭ তম জন্ম জয়ন্তী মহোৎসব উদযাপন সমিতির কর্মকর্তাদের ব্যস্ততায় সমগ্র আশ্রমের পরিবেশ জমজমাট। আশ্রমের প্রবেশ দ্বারে শ্রী শঙ্কর জন্মজয়ন্তী মহোৎসব সমিতি নির্মিত বিশাল তোরণের সামান্য দূরেই রাস্তার পাশে আমাদের সারথী সাজু গাড়িতে বসে অপেক্ষা করছিল। আমরা ধীরে ধীরে আলোকোজ্জ্বল তোরণ অতিক্রম করে গাড়িতে গিয়ে বসি।
সাজু গাড়ি ষ্টার্ট দেয়। আনন্দে ভরপুর মন নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে এগিয়ে চলি। ভাবি সত্যিই আমার উপর ঠাকুরের আশীর্বাদ রয়েছে নইলে কী করে আজকের এই বিশেষ দিনে নবম শতাব্দীর ভারতে বৈদিক সনাতন হিন্দু ধর্মের পুনরুত্থানকারী মহাপুরুষ শঙ্করাচার্যের জন্মভূমিতে উপস্থিত থেকে এতসব দেখা ও জানার সৌভাগ্য হলো।