ম্যাকনামারা নামটা মনের কোন গহীন অতলে যে চাপা পড়েছিল জানি না, সেটা হয়ত বা চিরদিনের মতই চাপা পড়ে থাকত যদি না আমেরিকার মিশিগান স্টেটের ডিটিডব্লু ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে আসতাম।
কিছুদিন আগেও আরেকবার এই এয়ারপোর্টে এসেছি। তবে তখন ছিল ডমেস্টিক ফ্লাইট, ডেট্রোয়েট থেকে নিউইয়র্ক। সেসময় অবশ্য এই ম্যাকনামারা টারমিনালে আসতে হয়নি। আমাকে স্মিথ টারমিনালে যেতে হয়েছিল। আমেরিকান এয়ারলাইন্সের আমেরিকান ঈগল নামক ছোট জেট বিমানে চেপে ডেট্রয়েট থেকে নিউইয়র্ক লা-গার্ডিয়া এয়ারপোর্টে অবতরণ করেছিলাম। আমেরিকার স্মিথ নামে কোন্ বরেণ্য ব্যক্তির স্মৃতিতে স্মিথ টার্মিনাল রাখা হয়েছে তা জানি না। সেটা অনুসন্ধানের জন্য মন তেমন কোনও পীড়াপীড়িও করেনি। কিন্তু ম্যাকনামারা টার্মিনাল নাম শুনেই মনে হয়েছে সেটা নিশ্চয়ই সেই ম্যাকনামারা যে নাকি বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে বিশ্বব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান ছিলেন। আমেরিকার কৃতি পুরুষদের অন্যতম ম্যাকনামারার স্মৃতি রক্ষার্থেই সম্ভবত ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের এই টার্মিনালের নাম রাখা হয়েছে ম্যাকনামারা টার্মিনাল।
আমার দেশে ফেরার পালা। ডেট্রয়েটের পাশে আববার্ন হিলস সিটির এডামফ্রিক-এ ছেলের এপার্টমেন্টে দীর্ঘদিন থাকার পর বিদায়বেলায় সেখান থেকে যে গাড়ি চড়ে এয়ারপোর্ট এসেছি সেটা টার্মিনালের পার্কিং স্লটে এসেই থেমে যায়। গাড়ি থেকে নেমে যাত্রীদের জান্য রাখা সারিবদ্ধ ট্রলি থেকে একটা টেনে নিয়ে বাক্স প্যাঁটরা চাপিয়ে সামনের এলিভেটর চড়ে চলে যাই টার্মিনালের উপরতলায়। ম্যাকনামারা টার্মিনালটা ভারী সুন্দর। বিশাল বহুতল ইমারত। সবকিছুতেই আধুনিক প্রযুক্তির অনন্য প্রকাশ। প্রতিটি তালাতেই বিস্তৃত খোলামেলা পরিসর। চারদিকে চোখ-ধাঁধানো আলোর রোশনাই। উপরতলায় কিছুদূর সমতল জায়গা পাড়ি দিয়ে আবার এক এস্কেলেটর। একটু এগিয়ে এস্কেলেটরে দাঁড়াতেই সেটা সোজা সিঁড়ি ভেঙ্গে চলে যায় নিচতলায়। সেখানে রয়েছে একের পর এক পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিমান পরিষেবার কাউন্টার। আমার ছিল ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ওলার্ল্ড ট্রাভেলার টিকিট। তাই ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের কাউন্টারে গিয়েই চেক ইন করতে হবে। সারি সারি বিভিন্ন এয়ারওয়েজ কাউন্টারগুলোর মধ্যে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ কাউন্টার খুঁজে পেতে কোনও অসুবিধাই হয়নি। বাক্স প্যাঁটরার ট্রলিটা ঠেলে ঠেলে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ কাউন্টারে চেক ইন করার জন্য কিউ দিয়ে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি।
ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের শ্বেতাঙ্গী কর্মী বিমান যাত্রীদের টিকিটে চোখ বুলিয়ে ঝটপট কম্প্যুটার দাবাচ্ছে এবং সাথে সাথেই আরেক কৃষ্ণাঙ্গী সহায়িকা বাক্সপ্যাঁটরা যুগপৎ স্ক্যানিং ও ওজন পরিমাপ করে লেবেল সেঁটে চলমান বেল্টে চাপিয়ে দিচ্ছে। বাক্সপ্যাঁটরা যথাসময়ে চলে যাবে যাত্রীদের নির্দিষ্ট বিমানে। বোর্ডিং পাস এবং লাগেজ লেবেলের কাউন্টারফয়েল সহ টিকিট যাত্রীর হাতে সমঝে দিয়ে হাসিমুখে শ্বেতাঙ্গী কর্মী বলে যাচ্ছে - উইশ্ ইউ এ হ্যাপি জার্নি।
অতি অল্প সময়ের মধ্যেই আমার সামনের যাত্রীরা এক এক করে বোর্ডিং পাস নিয়ে চলে যায়। লাইনের পেছনে থাকতেই এটাচি থেকে টিকিট এবং পাসপোর্ট বের করে ডান হাতে রাখি এবং বাঁ-হাতে লাগেজ সমতে ট্রলিটা ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে চলি। শ্বেতাঙ্গী কর্মীটির সামনা-সামনি হতেই টিকিট এবং পাসপোের্ট ওকে এগিয়ে দিই। কৃষ্ণাঙ্গী সহায়িকা ট্রলি থেকে লাগেজ নিয়ে স্ক্যানিং এবং ওজন পরিমাপ করে লেবেল সেঁটে চলমান বেল্টে চাপিয়ে দেয়। নিমিষেই পাসপোর্ট, বোর্ডিংপাশ এবং লাগেজের কাউন্টারফয়েল সহ টিকিট পেয়ে যাই। সবকিছু সহজভাবে হলেও মনের মধ্যে একটা উৎকণ্ঠার যাতনা ছিল। চেহারায় সেটা প্রকাশ পাচ্ছিল কিনা জানি না। সে যাহোক, চেক ইনের শেষপর্বে বিমান পরিষেবা কর্মীর শুভেচ্ছা বার্তার বিনিময়ে নিঃশব্দে মুখে হাসির ভাব ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করে সিকিউরিটি চেকিং-এর জন্য এগিয়ে যাই।
এখন এগিয়ে চলতে অনেকটা সহজ এবং ভারমুক্ত। বাক্সপ্যাঁটরা সমেত ট্রলি ঠেলে এগোতে হচ্ছে না। সাথে কেবলমাত্র একটা ছোট্ট এটাচি। নিজেকে খুবই হাল্কা মনে হচ্ছে। আমার স্ত্রী রুবি এতক্ষণের নির্বাক ছায়াসঙ্গী সহজভাবে আমার পাশে পাশে চলছে। আমরা সামান্য একটু হেঁটেই চলে আসি সিকিউরিটি চেকিং-এর প্রবেশদ্বারে। দেশ থেকে এখানে আসার পর বারকয়েক উড়োজাহাজ যাতাযাতের ফলে সিকিউরিটি চেকিং-এর ব্যাপারে এখন আর কোনও উৎকণ্ঠা হয় না। প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢুকে চেকিং পর্ব চুকিয়ে স্বাভাবিকভাবেই বহির্পথ দিয়ে বেরিয়ে মুখোমুখি হই আরেক এস্কেলেটারের সামনে।
পা বাড়িয়ে এস্কেলেটারে দাঁড়াতেই সেটা নিয়ে চলে গ্রাউন্ড ফ্লোরে। সেখানে নামতেই যা দৃষ্টিগোচর হয় তা ম্যাকনামারা টার্মিনালের বহুতল ইমারতের যে সৌন্দর্য এতসময় উপভোগ করে এসেছি সেটাকে চটজলদি ম্লান করে দেয়। আমার চোখে-এ আরেক বিরাট বিস্ময়। বিশাল চত্বরে ছড়িয়ে আছে রোমাঞ্চকর আলো-আঁধারি রেস্তোরাঁ। সুবেশ উচ্ছল নারী-পুরুষের মেলবন্ধন। রেস্তোরাঁয় খদ্দেররা গিজগিজ করছে। পাশাপাশি দু’ধারে ছড়িয়ে আছে অনুপম মনোহারি বিপণি। বিপণনের পাশ দিয়েই এগিয়ে চলছি পায়ে হেঁটে। সামান্য কিছু দূর এগিয়ে দেখি ওভারহেড ট্র্যাক দিয়ে স্বয়ংক্রিয় এয়ারট্রেন দ্রুত বেগে চলছে, কয়েক বর্গ কিলোমিটার জায়গা নিয়ে ছড়িয়ে আছে এয়ারফিল্ড। সেখানে অপেক্ষারত বিভিন্ন বিমান পরিষেবার বিমানে গিয়ে ওঠার জন্য যাত্রীদের নিজস্ব বোর্ডিং পাসে উল্লিখিত নির্দিষ্ট গেটে গিয়ে অপেক্ষা করতে হয়। দূর দূর এলাকায় অবস্থিত গেটে যাত্রীদেরকে সহজে পৌঁছে দেওয়ার জন্যই স্বয়ংক্রিয় এয়ারট্রেনের ব্যবস্থা। চক্রাকারে ওভারহেড ট্র্যাক দিয়ে স্বয়ংক্রিয় এয়ারট্রেন চলছে এবং বিভিন্ন এয়ারওয়েজের নির্দিষ্ট গেটগুলোর সামনে থামছে। যাত্রীরা প্রয়োজনে ওঠানামা করছে। ভাগ্যিস, আমাদের ছিল গেট নম্বর ফিফ্টি সিক্স-এ। পায়ে হেঁটে সামান্য এগিয়েই সেটা পেয়ে যাই। নতুবা এয়ারট্রেনে ওঠা-নামার হ্যাপা সামলাতে কত না রকমারি কাণ্ডের মোকাবিলা করতে হত।
অল্প হেঁটেই গেট নং ফিফ্টি সিক্সএ-তে পৌঁছে খুবই স্বস্তি বোধ করি। পাশেই যাত্রীদের জন্য আরামদায়ক সোফা এবং উল্টোদিকে উঁচুতে কম্প্যুটারের বিশাল পর্দা। সেটাতে ক্রমাগত উড়ানের সময়সূচি দেখানো হচ্ছে। আমাদের উড়ানের নম্বর হচ্ছে বিএ শূণ্য দুই শূণ্য দুই। ডেট্রয়েট থেকে স্থানীয় সময় ১৫ আগষ্ট রাত ১০টা ২৫ মিনিটে উড়ান ছাড়বে এবং ১৬ই আগস্ট স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় হিথ্রো বিমানবন্দরে পৌঁছবে। কিন্তু এখন স্থানীয় সময় হচ্ছে ১৫ই আগস্ট রাত আটটা। আরও প্রায় আড়াই ঘন্টা পর গেট খুলে আমাদেরকে বিমানে উঠতে দেবে। এ সময়টুকু এখানেই কাটাতে হবে। অগত্যা আমি এবং আমার স্ত্রী পাশাপাশি দুটো সোফাতে বসে পড়ি। আশপাশের যাত্রীদের দিকে তাকাই। মেম-সাহেবের তুলনায় প্রাচ্য দেশিয়রাই বেশি। সহজ নজরে ভারতীয় বাঙালি বলে এদের মধ্যে কাউকেই চিহ্নিত করতে পারিনি। অপরিচিত যাত্রীদের সাথে মনের ভাব অন্য ভাষায় তর্জমা করে যেচে বলার কোন ইচ্ছাই জাগেনি। সোফাতে গা এলিয়ে বসে থাকি। কিন্তু মুখ বন্ধ করে নিশ্চুপ বসে থাকলেও এই বিশেষ পরিবেশে চোখ আর কানকে কিছুতেই নিষ্ক্রিয় করা যাচ্ছে না। সামান্য সময়ের বিরতি দিয়ে ওভারহেড ট্র্যাকে স্বয়ংক্রিয় এয়ারট্রেন চলছে। চলার ঝম্ সুললিত আওয়াজ কানে বাজে। চারিদিকে চিত্তহারী আলোর ঝলমল চোখ টানে। ম্যাকনামারা টার্মিনালের বিলাসবহুল আধুনিক প্রযুক্তির বিস্ময় এবং মোহময় সৌন্দর্যের হাতছানি কিছুতেই উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। যতটুকু দেখছি তাতে মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ছি। এক মোহনীয় আবেশে আমি ধীরে ধীরে ডুবে যাই। মনে কেবল ম্যাকনামারা ম্যাকনামারা আলোড়িত হচ্ছে। আর ম্যাকনামারা নামটাই আমাকে চার দশক পেছনে টেনে নেয়। চলে যাই বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষপ্রান্তে। তখন বিশ্বব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান ম্যাকনামারার বিরুদ্ধে কী ঘৃণাটাই না প্রকাশ করেছি। সেটা করেছি আমাদের শহর শিলচরে - যে শহরের আলো-বাতাসে শৈশব থেকে বেড়ে উঠেছি।
অধিক বাঙালি অধ্যুষিত প্রান্তিক শহর শিলচর। দেশ বিভাজনে ছিন্নমূল বাস্তহারার দল কাতারে কাতারে ওপার থেকে এসেছে এবং বাঁচার তাগিদে এখানে শিকড় গেড়েছে। এই শহরের সিভিল হাসপাতালের উল্টোদিকে মেনরোডের পাশে টুনু দেবের চায়ের স্টল। সন্ধ্যার পর কলেজ পড়ুয়া ছেলেরা এসে আড্ডা দেয়। বেশিরভাগই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। ওরা বামপন্থী দলের ছত্রছায়ায় ছাত্র আন্দোলনে সামিল হর। এ আড্ডায় দীর্ঘদিন জেল-খাটা এক কম্যুনিস্ট এবং দু’তিনজন কলেজ শিক্ষকও আসেন। ওরা দেশিয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির চর্চা করেন। দেশে তখন রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পালা। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে ভাঙন এবং কম্যুনিস্ট দলের মধ্যেও ভাঙন।
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অজয় মুখার্জি কিছু সংখ্যক অনুগামী নিয়ে দলছুট হয়ে পশ্চিমবঙ্গে বাংলা কংগ্রেস গঠন করেন। সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেসকে কুপোকাত করে বামপন্ধীদের সাথে মিলে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করে। কিন্তু সুষ্ঠু শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে পারেনি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভেদ এবং কোন্দল বাড়তেই থাকে।
কম্যুনিস্টদের মধ্যেও বিভাজন আসে। একদল বলছে, কেবলমাত্র মন্ত্রীত্ব বদল করেই দেশের মানুষকে সাম্রাজ্যবাদী শোষণ থেকে মুক্ত করা যায় না। ভারতবর্ষ কৃবিপ্রধান দেশ। শতকরা আশিভাগ জনগণের বাস গ্রামাঞ্চলে। কৃষক জনসাধারণের মুক্তিতেই ভারতের ব্যাপক জনগণের মুক্তি আসবে। চিনের মাও-সে-তুঙের চিন্তাধারার কৃষকের সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমেই গণতান্ত্রিক বিপ্লব সমাধা করতে হবে। সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ সোভিয়েত রাশিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণকারী সংশোধনবাদী কম্যুনিস্টদের বেষ্টনী থেকে বিশ্বের নিপীড়িত জনগণের মুক্তির পথ প্রদর্শক চিনের পদাঙ্ক অনুসরণকারী কম্যুনিস্টরা বেরিয়ে আসে। চিনের চেয়ারম্যান মাও-সে-তুঙের চিন্তাধারায় ভারতে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠিত করতে পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়িতে চারু মজুমদার, কানু সান্যাল প্রভৃতিদের নেতৃত্বে কৃষকের সশস্ত্র আন্দোলন শুরু হয়ে যায়।
নকশালবাড়ির সশস্ত্র কৃষক আন্দোলনকে চিন স্বাগত জানায়। নকশালবাড়ির ঘটনা উল্লেখ করে পিকিং রেডিও ঘোষণা করে ওটা ভারতে বসন্তের বজ্র-নির্ঘোষ। (Spring thunder breaks over India) নকশালবাড়ির পথ ধরেই ভারতের জনগণ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে পরাস্ত করে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের ধ্বজা ওড়াবে, সর্বহারার একনায়কত্ব কায়েম করতে। পিকিং রেডিওর প্রচার কলকাতার ছাত্র যুবকদের মধ্যে বিস্তর প্রভাব ফেলে। প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্ররা দলে দলে নকশাল আন্দোলনে যোগ দেয়। দিকে দিকে নকশালপন্থীদের মতাদর্শ ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের শহরেও এর ঢেউ আছড়ে পড়ে। ছাত্র যুবকরা বিশেষ করে আমরা যারা টুনু দেবের চায়ের স্টলে আড্ডা দিতাম, তাদের প্রায় সবাই সেই মতাদর্শে জড়িয়ে পড়ি। সে সময় শরিক কোন্দলে পশ্চিমবঙ্গে যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতন হয়। নানা ডামাডোলে রাষ্ট্রপতির শাসন চালু হয়। কেন্দ্রে তখন প্রভাবশালী মহিলা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। সে সময়টাতেই বিশ্বব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান ম্যাকনামারার ভারত সফরসূচি এবং সেটা খোদ কলকাতাতেই। সমস্যাসঙ্কুল তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে শহর উন্নয়নের জন্য আর্থিক সহায়তার কর্মসূচি রয়েছে বিশ্বব্যাঙ্কের। বিশ্বব্যাঙ্কের কাছে ভারতের প্রত্যাশা অনেক। ম্যাকনামারার সফরসূচির উপরই নির্ভর করছে সে প্রত্যাশার রূপায়ণ। দিল্লির ইচ্ছা বিশ্বব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান ম্যাকনামারা স্বচক্ষে কলকাতা শহরের দুর্দশাপূর্ণ রাস্তাঘাট, নালা-নর্দমা, পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থা এবং বস্তির হাল দেখুন। কিন্তু নকশালপন্থীরা সেটা বাঁকা চোখে দেখছে। উন্নয়নের নামে ওটা তৃতীয় বিশ্বের নিপীড়িত জনগণকে শোষণের প্রক্রিয়া প্রশস্ত করারই আরেক সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত। কাজেই ওরা ম্যাকনামারার সফরসূচিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করার সিদ্ধান্ত নেয়।
দিনক্ষণ সঠিক মনে নেই। সরকারি দস্তাবেজ ঘাঁটলে অবশ্য ওই সফরসূচির সব তথ্যই বেরিয়ে আসবে। কিন্তু বিদেশ বিভুঁইয়ে ম্যাকনামারা টারমিনালের এই ‘ফিফ্টি সিক্স এ’ গেটে বসে তা সম্ভব নয়। স্মৃতি রোমন্থনে যা ভেসে আসছে তাতে মনে হয় সময়টা ছিল ১৯৬৮ সালের নভেম্বর মাস। নির্দিষ্ট দিনে ম্যাকনামারার বিমান দমদম এয়ারপোর্টে অবতরণ করে। কাকভোরেই নকশালপন্থী ছাত্র যুবার দল এয়ারপোর্টের বাইরে এসে জড়ো হয়। কালোপতাকা এবং মার্কিন বিরোধী প্ল্যাকার্ড নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ম্যাকনামারা কিন্তু এসব দেখতে পাননি। তিনি হেলিকপ্টার চড়ে কলকাতার আকাশে উড়ে বেড়ান। সরকারি কর্তাব্যক্তিরা কলকাতার বেহাল অবস্থা সরেজমিনে ম্যাকনামারাকে দেখিয়ে বিশ্বব্যাঙ্কের পর্যাপ্ত সাহায্য আদায়ের জন্য যার-পর-নাই চেষ্টা চালিয়ে যায়।
সেদিন কলকাতা এয়ারপোর্টে বহিপ্রাঙ্গণ ছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় ছাত্র যুবকের দল ম্যাকনামারার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। আমরাও সফরসূচির আগের দিন থেকেই বিক্ষোভ প্রদর্শনের প্রস্তুতি নিই। টুনু দেবের চা স্টলের পাশেই ছিল ভোলা মুচির জুতা সেলাইর পসরা। আর এই ভোলা মুচির উপরই দায়িত্ব বর্তায় ম্যাকনামারা সাহেবের কুশপুতুল তৈরি করার। সাহেবের শার্ট, প্যান্ট, হ্যাট, টাই ওকে দেওয়া হয়েছে কিন্তু খড় বিচালি এবং বাঁশ ওকেই সংগ্রহ করতে হবে। ভোলা সাদরেই এ দায়িত্ব গ্রহণ করে। টুনুদার চা স্টলের আড্ডায় তর্ক-বিতর্ক এবং আলোচনা বারবার শুনে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বের নিপীড়িত জনগণের শত্রু, কথাটা ভোলার প্রায় মুখস্থ হয়ে গেছে। যে সাহেবটার কুশপুতুল তৈরি করবে সে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রতিভূ মেহনতি জনতার শত্রু। ভোলা এ কাজের দায়িত্ব পেয়ে গর্বিত। খুব সুন্দরভাবে খড়-বিচালির উপর টেরিলিনের শার্ট প্যান্ট সেলাই করে সাহেবের কুশপুতুল তৈরি করে। মাথায় হ্যাট, গলায় টাই এবং ওর স্টক থেকে একজোড়া পুরানো জুতো বের করে সাহেবের পায়ে পরিয়ে দেয়।
কলকাতা বিমানবন্দরে যেদিন সকালবেলা ম্যাকনামারা অবতরণ করেন সেদিনই বিকাল বেলায় আমাদের বিক্ষোভ প্রদর্শন ও কুশপুতুল দাহ করার কর্মসূচি। বিকাল ৩ টের পর থেকেই দু’তিন জন করে কলেজপড়ুয়া ছেলেরা টুনুদার চায়ের দোকানে এসে হাজির। জিসি কলেজের মৃন্ময়, অভি, ধীমান, জগা, বাপন ও ঝন্টু এসেছে। এসেছে কাছাড় কলেজের সুকল্যাণ, লতুব, মোজাম্মিল এবং বিল্টু। অল্প সময়ের ব্যবধানেই বিশ-পঁচিশ জনের মত জড়ো হয়েছে। হাতে-লেখা প্ল্যাকার্ড ও কালো পতাকা নিয়ে এসেছে।
মৃন্ময় ভোলা মুচির জুতো সেলাইর সরঞ্জামের পাশেই চিৎপটাং শুইয়ে রাখা কুশপুতুলটা একবার ভাল করে দেখে নেয়। তারপর জগার হেফাজতে থাকা প্ল্যাকার্ডগুলো থেকে বেছে একটা কুশপুতুলটার গলায় বেঁধে দেয়। ওটাতে লেখা রয়েছে ‘মার্কিনি কুত্তা ম্যাকনামারা গো ব্যাক’। ইতিমধ্যে এক এক করে বাকি সবগুলো প্ল্যাকার্ডই জগা অন্যদের হাতে ধরিয়ে দেয়। চটজলদি সবাই দু’জন দু’জন করে সিভিল হাসপাতালের পাশে মেন রোডে লাইন বেঁধে দাঁড়ায়। মৃন্ময় আর জগা কুশপুতুলটা খাড়া করে লাইনের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। আমি অবশ্য লাইনে গিয়ে দাঁড়াইনি। টুনুদার চায়ের দোকানেই আড়াল-করা এক কোণার চেয়ারে বসে সবকিছুর নজর রাখছি। গেল রাত মণিদা আমাকে প্রকাশ্য মিছিলে যোগ দিতে বারণ করে গেছে। সরকারি শিক্ষায়তনে শিক্ষকতার কাজ করি, তাই আমাকে যতদূর সম্ভব গোপনীয়তা বজায় রেখে চলতে হবে। গোপন সংগঠনে এভাবেই অনেককে কাজ করতে হয়। মৃন্ময় জগাকে একাই কুশপুতুলটা বয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। জগা এগিয়ে চলার সাথে সাথে দু’জন দু’জন করে সারিবদ্ধ ছোট্ট লাইনটা মুহূর্তেই সচল হয়। মৃন্ময় আওয়াজ তোলে - নকশালবাড়ি লাল সেলাম। সাথে সাথে সমবেত কণ্ঠ গর্জে উঠে - লাল সেলাম, লাল সেলাম। তারপর আর বিরতি নেই। ক্ষিপ্রগতিতে মিছিলটা শ্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে যায়। ওরা হাসপাতাল রোড, প্রেমতলা এবং শিলংপট্টি ধরে নরসিংটোলা দিঘির পার যাবে। সেখানেই হবে কুশপুতুল দাহ।
টুনুদার চায়ের দোকানের সামনে থেকে মিছিলটা অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার তিন চার মিনিট পরে আমিও বেরিয়ে পড়ি। সুজনের সাইকেল চেপে সোজা প্রেমতলা সেন্ট্রাল রোড হয়ে চলে যাই নরসিংটোলা দীঘির দক্ষিণ-পূব পার। সেখানে রয়েছে বুলু কুণ্ডুর বইয়ের দোকান পুথিভবন। পুথিভবনের পাশেই গাছের তলায় দাঁড়িয়ে থাকি। সামান্য অপেক্ষার পর দেখতে পাই মিছিলটা দীঘির পাশে পৌঁছে গেছে।
দক্ষিণ-পশ্চিম কোণায় পৌঁছেই জড়ো হয়ে জোরে শ্লোগান দিতে থাকে -
-
নকশালবাড়ি লাল সেলাম, লাল সেলাম, লাল সেলাম।
-
ম্যাকনামারা, গো ব্যাক, গো ব্যাক।
-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক, নিপাত যাক নিপাত যাক।
- ম্যাক ম্যাক ম্যাকনামারা, ফিরে যাও ফিরে যাও।
এমনিভাবে মিনিট দশেক ধরে শ্লোগান দেওয়ার পর কুশপুতুলটাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। কুশপুতুলটা জ্বলতে জ্বলতে শেষ পর্যায়ে পৌঁছার আগেই দীঘির জলে ফেলে দেয়। তারপর দলছুট হয়ে যে যেদিকে পারে কেটে পড়ে।
মিনিট কয়েক ধরে কতিপয় ছাত্রের বজ্রমুঠি উচিয়ে জোরালো শ্লোগান এবং কুশপুতুল দাহ যেভাবে পথচারীদের নজর কেড়েছিল এখন তার লেশমাত্র চিহ্নও নেই। সব শুনশান। এই বিক্ষোভ অনুষ্ঠান মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ভিতে কেমন নাড়া দিয়েছিল কিংবা মেহনতি জনগণকে কতটুকু প্রভাবিত করেছিল জানা যায়নি। তবে দূর থেকে নজর রেখে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম দুটো পরিচিত টিকটিকি ঘটনার অনুসরণ করছে এবং এটা নিশ্চিত যে বিক্ষোভ প্রদর্শনকারী লবকুশদের পুঙ্খানুপুঙ্খ আচরণ ওদের ডায়েরিতে নথিভুক্ত হয়ে যথাসময়ে গোয়েন্দা দফতরে পৌঁছে যাবে। টিকটিকি দুটো নরসিংটোলা রাজপথ ধরে পুবদিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। আমি ওদের মুখোমুখি হতে চাইনি। দূর থেকে দেখামাত্রই সাইকেল ঘুরিয়ে সটান দীঘির পূবপার ধরে উত্তর দিকে এগিয়ে কলাবতী সিনেমা হলের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাই। ঘন্টাদুয়েক এদিক সেদিক ঘুরে আড্ডায় ফিরে যাব। টুনু দেবের চায়ের দোকানে রাতের মজলিশ জমবে ভাল। উড়ানে ওঠার অপেক্ষায় জমজমাট ম্যাকনামারা টার্মিনালে বসে থাকতে হয়েছে নির্বাক নিশ্চুপ। আর এ অবস্থাতেই ম্যাকনামারাকে কেন্দ্র করে অতীতের ঘটনাপুঞ্জ মনকুঠুরির কম্প্যাক্ট ডিস্কে সচল হয়। মনের পর্দায় একের পর এক ছবি ভাসতে থাকে। পাশের কেউই টের পায়নি কীভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে এতসব বিগত দিনের ঘটনাবলী।
এসবের মধ্যদিয়েই সময়টা দ্রুত এগিয়ে চলে। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের বিএ, শূন্য দুই শূন্য দুই উড়ান ছাড়ার সময় হয়ে গেছে। স্থানীয় সময় রাত দশটা বেজে গেছে। উড়ানে ওঠার গেট খুলে দিয়েছে। অপেক্ষমাণ যাত্রীদের তৎপরতা শুরু হয়ে গেছে। আমিও গা-ঝাড়া দিয়ে উঠি। রুবিকে সঙ্গে নিয়ে অন্যান্য যাত্রীদের অনুসরণ করে এগিয়ে চলি। গেটের লাগোয়া সামান্য কয়েকমিনিটের দূরে সিঁড়ি জুড়ে উড়ানে ওঠার ব্যবস্থা করে রেখেছে। বেশি হাঁটতে হয়নি দু’তিন মিনিটের ব্যবধানেই উড়ানের নির্দিষ্ট আসনে পৌঁছে যাই।
আসন দখল করে বসার পর আবার ভাবনা। কী আশ্চর্য ব্যতিক্রমী যোগাযোগ! দেশব্রতে উদ্দীপ্ত যে যুবক মুক্তিকামী নিপীড়িত জনগণের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামে নিজেকে সামিল করতে বিশ্বব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান ম্যাকনামারার বিরুদ্ধে স্বদেশে প্রচণ্ড বিদ্বেষ ও ঘৃণায় বিক্ষোভ প্রদর্শন এবং কুশপুতুল দাহে অংশগ্রহণ করেছে, সে-ই চার দশক পর বার্ধক্যের দোরগোড়ায় আজ সেই ম্যাকনামারার দেশে তাঁর স্মৃতিতে নামাঙ্কিত টার্মিনালে এসে আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগে আরাম আয়াসের অনন্য সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ! কোনও ক্ষোভ নেই, নেই ঘৃণার ভাব! শুধু তাই নয়, মনে তৃপ্তি এবং প্রশান্তি নিয়েই সাম্রাজ্যবাদীদের আশ্রয়ে আত্মজকে রেখে দেশে ফিরছে। অদৃশ্য জগত-নিয়ন্তার কাছে মনে মনে প্রার্থনা করছে - আমার ছেলেকে রেখে দাও এদেশে আরও কয়েক বছর। এখানে ওর দৈনন্দিন জীবন যাপনে কোনও উটকো ঝামেলা নেই, নেই অহেতুক উৎপীড়ন। বেশ ভালই আছে। আমি নিজ আসনে বসে এসব ভাবছি আর ইত্যবসরে উড়ান সচল হওয়ার কলতান শুরু করে দেয়। যাত্রীদের কোমরে বেল্ট বাঁধা এবং অন্যান্য সতর্কীকরণের ঘোষণাও শেষ হয়ে গেছে। যান্ত্রিক কলরব দীর্ঘায়িত হওয়ার সাথে সাথে আবার মনে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে - ম্যাক ম্যাক ম্যাকনামারা, ফিরে যাও ফিরে যাও।
উড়ান সশব্দে রানওয়েতে হাঁটতে হাঁটতে দৌড় শুরু করে দেয়। আমি নিজেকে সংযত করে শক্ত হয়ে বসি। মনে প্রতিধ্বনিত শব্দমালায় সামান্য পরিবর্তন করে বলতে থাকি - ম্যাক, ম্যাক ম্যাকনামারা ফিরে যাই, ফিরে যাই। উড়ান দৌড়তে দৌড়তে পা গুটিয়ে আকাশে উঠে। ম্যাকনামারা টার্মিনালের মাটি ছেড়ে অতি ক্ষিপ্রগতিতে ভাসতে থাকে অন্তরীক্ষে।