মুন্নার সম্বন্ধে আমার কিছুই জানা ছিল না। কয়েকমাসের জন্য শিলচরের বাড়ি থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে কোচিনে পাড়ি দেওয়ার প্রাক্কালে পার্থিব বসুর মুখেই আমি মুন্নারের কথা প্রথম শুনি।

পার্থিব হলো আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তব্য বিদ্যার অধ্যাপক। বনগাঁর ছেলে, পড়াশুনা কলকাতায় করেছে এবং পরবর্তীতে বিদেশ বিভুইয়ে সে অনেক ঘুরাঘুরি করেছে। পড়াশুনার বিষয়বস্তু নিয়ে গবেষণার জন্য ওকে কয়েকমাস আফ্রিকার শ্বাপদ সঙ্কুল ও হিংস্র প্রাণী সম্বলিত গভীর জঙ্গলেও দিনাতিপাত করতে হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার জন্য নিযুক্তিপত্র নিয়ে কলকাতা থেকে শিলচরে আসার দুতিন দিন পরই আমার বাড়িতে ও ভাড়াটে হয়ে আসে। প্রথম দর্শণেই আমার বাড়িটা ওর খুব পছন্দ হয়। তাছাড়া ভাড়াটের সুযোগ সুবিধা এবং বিনিময়ে প্রদেয় মাসিক শুল্ক প্রভৃতি সবকিছুই মনোমত হওয়ায় পার্থিব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবাসনে চলে যাওয়ার কোন চেষ্টা করেনি। একই ছাতের নিচে বসবাসে উভয়েরই উভয়ের প্রতি দিনে দিনে টান বাড়ে। তাই আচমকা শিলচরের পাততাড়ি গুটিয়ে কোচিন চলে যাবো বলে আমার অবর্তমানে অধ্যাপক পার্থিব বসুকেই বাড়িটা দেখভাল করার জন্য অনুরোধ করি। পার্থিব খুশী মনেই দেখভালের দায়িত্ব নেয়। ওর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে উঠোন সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার সময়ই পিছু পিছু এগিয়ে এসে ও আমাকে বলে- “দাদা কোচিন থেকে মুন্নার কিন্তু দূর নয়। মুন্নারের হিল রিসোর্টে গিয়ে কয়েকদিন থাকবেন।” কোচিনে এসে বসবাস করার কয়েকমাস হয়ে যায়। শহর এলাকার হাটবাজার, মল এবং কোচিন শহরের পশ্চিমে দৃষ্টির অগোচরে চলে যওয়া দিগন্ত বিস্তৃত সীমাহীন সমুদ্রের মনোমুগ্ধকর জলরাশির উথাল পাথাল বার কয়েক ছুটির দিনে দেখা হয়েছে। তাই কোচিন শহরের নিকটবর্তী দর্শনীয় জায়গায় যাওয়ার চিন্তা ভাবনা শুরু হয়।

কোচিন শহরে ভাইটিলা এল.এম. পাইলি লেনে যার আশ্রয়ে আছি সে হলো কনস্ট্রাকশন কোম্পানীর উচ্চপদের কর্মী আমার ছোট ছেলে শ্রীমান অনির্বাণ। অফিসে ওদের কাজের চাপ খুব বেশি। তাই কোচিন শহরের বাইরে কোথাও যেতে হলে অনেক আগে থেকেই ছুটির ব্যবস্থা করে নিতে হবে। এসব ভেবেই সপ্তাহের প্রথম দিকে ঠিক করে নেয় সামনের শনিবার ৭ মে রাত এর্নাকুলাম নর্থ রেলওয়ে ষ্টেশন থেকে রেলগাড়ি চেপে কন্যাকুমারীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবো এবং রবিবার সকালবেলা সেখানে পৌঁছে সারাদিন কাটিয়ে রাতের গাড়িতে চেপে সোমবার ভোরবেলা কোচিনে ফিরে আসব। কিন্তু রেলের রিজার্ভেশন না পাওয়ায় সে পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। আর তখনই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় পার্থিবের উক্তি অর্থাৎ “দাদা কোচিন থেকে মুন্নার কিন্তু দূর নয়। মুন্নারের হিল রিসোর্টে গিয়ে কয়েকদিন থাকবেন।” কথাগুলো মনে পড়ে। আর সাথে সাথে এটাও তখন মনে হয় পার্থিবের কথামত মুন্নারের হিল রিসোর্টে আমাদের কয়েকদিন থাকা মোটেই সম্ভব নয়। কারণ যে আমাদেরকে মুন্নারে নিয়ে যাবে তাকে যদি মুন্নার হিলরিসোর্টে বিনোদনের জন্য কয়েকদিন সময় দিতে হয় তাহলে যে চাকুরীর সুবাদে ও কোচিনে আছে সেই চাকুরীটার সাথেই তার বিচ্ছেদ ঘটে যাবে। তবে ভোরে ভাইটিলায় ট্যাক্সিতে চেপে রওয়ানা দিয়ে মুন্নার এবং তার পার্শ্বস্থ এলাকা দেখে দিনে দিনে ফিরে আসা যায়। এমনটা ভেবেই চটজলদি নিজেদের মধ্যে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নেই মুন্নারে গিয়ে যতটুকু সম্ভব দেখে দিনে দিনে ফিরে আসব।

তড়িঘড়ি করে ট্যাক্সির ব্যবস্থা হয়। রোববার ৮মে ভোর পাঁচ ঘটিকায় ঘুম থেকে উঠে স্নান টান সেরে আমাদের যাওয়ার প্রস্তুতি চলে। সকাল ৬টা বাজতেই বাড়ির সামনে ট্যাক্সি এসে হাজির। নিজেদের সাজ সজ্জার পর কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস সঙ্গে নিয়ে ৬-৩০ মিনিটের মধ্যেই ঘর থেকে বের হয়ে গাড়িতে গিয়ে বসি। এল.এম. পাইলি লেনের সরু রাস্তায় ধীরে ধীরে এগিয়ে ভাইটিলার চৌমাথায় পৌঁছেই ত্রিপূর্ণাত্তোরার রাস্তা ধরে গাড়ি মুন্নারের উদ্দেশ্যে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলে।

গাড়িতে আমরা পাঁচজন রয়েছি। পিছনের সীটে অনির্বাণ, বৃন্দা এবং রুবি। সামনে চালক সার্জুর বাঁ পাশে রয়েছি আমি। কিছুদূর যেতেই সমতল রাস্তা পার হয়ে পাহাড়ি আঁকা বাঁকা রাস্তা। ক্রমশঃ উঁচু থেকে উঁচু হয়ে এগুচ্ছে। ধীরে ধীরে দূরের পাহাড়টা যেন আমাদের চলার পথেই এগিয়ে আসছে। কিছুদূর এগিয়ে যেতেই আকাশ ভেঙ্গে বিশাল জলরাশি আছড়ে পড়ার শব্দে সচকিত হই। ট্যাক্সির জানালা দিয়ে মাথা বাইরে বের করে দেখি বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে পাহাড় গড়িয়ে জলের ধারা নিচে নেমে আসছে।

এরাভিকুলাম জাতীয় উদ্যানে আনামুডি পাহাড়ে আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করি

– আরে এটা আবার কি? কেরলের স্থায়ী বাসিন্দা আমাদের সারথী সাজু ভাঙ্গা হিন্দিতে বলে

– এটা হলো বলেরো জলপ্রপাত। এই জলপ্রপাত দেখার জন্য প্রত্যেকদিনই এখানে লোক জমায়েত হয়।

একথা বলেই সাজু গাড়ির গতিবেগ কমিয়ে জিরোতে নিয়ে এসে রাস্তার পাশে দাঁড় করায়। আমি গাড়ি থেকে নেমে যাই। সাথে সাথে পেছন থেকে অনির্বাণ বৃন্দা এবং রুবি ও গাড়ি থেকে নামে। রাস্তার কিনারা ঘেঁষে পায়ে হেটে কিছুদূর এগোতেই পাহাড় বেয়ে জলের ধারা গড়িয়ে পড়ার দৃশ্য ভালোভাবেই নজরে আসে।

আমরা বলেরার পাশে পৌঁছার আগেই সেখানে অনেক লোক জড়ো হয়েছে। ওরা এলাকার আনন্দবর্দ্ধক নান্দনিক পরিবেশ এবং জলপ্রপাতের লীলাখেলা উপভোগ করছে। কিছু কিছু কিশোরেরা খালি গায়ে পাহাড় গড়িয়ে নেমে আসা জলধারায় জলখেলি করছে।

অনির্বাণের ডিজিটাল ক্যামেরাটা ওর কাঁধেই ঝুলানো ছিল। জলক্রীড়ায় মত্ত উদ্দাম কিশোরদের কয়েকটা দৃশ্যপট ক্যামেরাবন্দী করে নেয়। সাথে সাথে আমারও ইচ্ছা হয় জায়গাটাতে আমাদের উপস্থিতির একটা স্মৃতি ধরে রাখতে। আমি স্বগতোক্তি করি,

  • এই পরিবেশে আমাদের একটা ফটো নিয়ে নিলে কি ভালো হয় না?

কথাটা মুখ থেকে বেরনোর সাথে সাথেই অনির্বাণ আমাদেরকে ওর দিকে মুখ করে পাহাড়টাকে পিছনে রেখে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেয়। ওর নির্দেশমতেই আমি, রুবি এবং বৃন্দা রাস্তার পাশে স্থানীয় ভাষায় লেখা একটা হোর্ডিং এর সামনে গিয়ে জলপ্রপাতের দৃশ্যাবলীকে পিছনে রেখে দাঁড়াই। অনির্বাণ ওর ক্যামেরা দিয়ে আমাদের ফটো তুলে নেয়। তারপর বলেরা জলপ্রপাতের পাশ থেকে হেটে হেটে অনতিদূরে একটা রেস্তোরায় গিয়ে ঢুকে পড়ি। ছিমছাম রেস্তোরা, রুচি সম্মত বেতের সোফাসেটে বসার ব্যবস্থা। আমাদের কাছাড় জেলার কিছু কিছু ব্যবসায়ী বেতের সুন্দর সোফা সেট ও আসবাব পত্র তৈরি করে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ ও বর্হিভারতে চালান দেয়। রেস্তরার সোফায় গা এলিয়ে বসতে বসতে মনে হলো এগুলো কি আমাদের অঞ্চল থেকেই আমদানী করা নাকি! সে যাহোক, যাত্রাপর্বের প্রথম চা-পর্ব রেস্তরার এই সোফা সেটে বসেই সম্পন্ন হয়। চা পর্ব শেষ হওয়ার মিনিট দশেক পর রেস্তোরা থেকে বের হয়ে ট্যাক্সিতে চাপি। ট্যাক্সি ষ্টার্ট দেয়।

কিছুদুর যাওয়ার পর আলামডি (Alamadi) পার হয়ে আঁকা বাঁকা ৪৯ নং জাতীয় সড়ক ধরে পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি দ্রুত চলতে থাকে। রাস্তার পাশে তখন পরিদৃষ্ট হয় নানা ধরণের ছোট বড় মনোরম রিসোর্ট। প্রকৃতির লীলা খেলায় ভরপুর পাহাড়ের কোলে আধুনিক সুযোগ সুবিধা সহ নির্জন বাসের আবাস। রাস্তার পাশে বহুদূর বিস্তৃত পাহাড়ের গায়ে গায়ে গড়ে ওঠা রিসোর্ট গুলোর অন্তবর্তী স্থানে নির্জন সুরম্য প্রাকৃতিক পরিবেশ বিরাজ করছে।

পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সেসব স্থানে বোর্ডে বড় বড় হরফে ইংরেজিতে View point লিখে স্থায়ী লোহার খুটিতে টাঙিয়ে রেখেছে। রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী পর্যটকরা সেসব বোর্ডের লিখা দেখে গাড়ি থামিয়ে সেখানে নেমে দৃষ্টির গোচরিভূত বিস্তীর্ণ এলাকার মনোমুগ্ধকর নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করে। কোন কোন জায়গায় রাস্তার বাঁপাশে পাহাড়ের শৃঙ্গ উঁচু থেকে উঁচুতে উঠে আকাশ ছোয়ার চেষ্টা করছে আর ডানপাশে পাহাড় নিজস্ব গাছপালা সবকিছু নিয়ে ক্রমশঃ নিচের দিকে দিগন্তের শেষপ্রান্তে, নেমে যাচ্ছে। সে এক অপূর্ব নয়নাভিরাম দৃশ্য। চলার পথে আমরা কয়েকবারই কয়েকটা View point এ দাঁড়িয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশের মনকাড়া সৌন্দর্য উপভোগ করি এবং ফটো ক্যামেরাবন্দি করি।

তারপর ক্রমশঃ উঁচুতে উঠা পাহাড়ের রাস্তা ধরে আমাদের ট্যাক্সি এগিয়ে চলে। ডানপাশে ক্রমশঃ নিচু হয়ে যাওয়া বিস্তীর্ণ ঢালু পাহাড় এবং বাম পাশে আকাশ চুম্বী চূড়া। ট্যাক্সিতে বসে যতদুর দৃষ্টি যায় পাহাড়ের গা লেপটে কেবল চা গাছ আর চা গাছ। মনে হয় কোন এক অসাধারণ শিল্পী তাঁর নিপুণ হাতে পাহাড়ের গা লেপটে থাক থাক সবুজ চা-পাতার গালিচা বিছিয়ে রেখেছে। কোথাও কোন বেমানান নেই।

আসাম কিংবা ডুয়ার্সের চা বাগানে মাইলের পর মাইল সমতল অঞ্চল জুড়ে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে টিলা জমিতে দেখা যায় সবুজ চা গাছের গালিচা। মাঝে মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে মে ফ্লাওয়ার কিংবা শিরিষ গাছ। দলে দলে কুলি কামিনরা সবুজ চা গাছের গালিচা থেকে দুটি পাতা একটি কুঁড়ি ভেঙ্গে ঝুলানো ঝুড়িতে রাখে। কিন্তু এখানে এ সময়টায় আসাম ডুয়ার্সের মিনিদের মত কাউকেই নজরে পড়ে না।

উন পঞ্চাশ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে পাহাড় বেয়ে আরো কিছুদূর এগিয়ে যেতেই দেখা যায় পুল্লিভাসাল টি এস্টেট (Pullivasal Tea Esatate) এর সাইনবোর্ড। পরিচ্ছন্ন অমলিন সড়কের পাশে উঁচু পাহাড়ের গায়ে আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি ছিমছাম ইমারত এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বাহার প্রভৃতি সবকিছু নিয়ে পুল্লিভাসাল তার আভিজাত্য জাহির করছে। পুল্লিভাসাল চা বাগানের মাঝ দিয়ে কিছুদূর এগিয়ে গিয়েই সামনে রাস্তার ডানদিকে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা বিরাট হোর্ডিং। তাতে লেখা রয়েছে Kanan Devan Hills Plantation Company Pvt. Ltd. আরো কিছুদূর এগিয়ে চা গাছের মাঝে মাঝে দেখা যায় আকারে ছোট আরো কিছু হোর্ডিং সে গুলোতে ইংরাজিতে লেখা রয়েছে TATA. এসব দেখে স্বাভাবিক ভাবে এটাই মনে হয় যে, এই পশ্চিমঘাট পাহাড়ের ব্যাপক অঞ্চল জুড়ে চায়ের যে সকল বাগান বিরাজ করছে তার একচ্ছত্র অধিপতি টাটা।

ক্যানন ডিভাইন হিলস প্ল্যানটেশন কোম্পানীর হোর্ডিংটা যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে সেটার কিছুদুর এগিয়েই পাহাড় ঘেরা সমতল জায়গা। সেখানে রয়েছে সরকারী প্রশাসনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, কেনাকাটার রকমারি দোকান, আহার ও থাকার নানারকম রেস্তোরা এবং লজ। যোগাযোগের জন্য রয়েছে রাজ্য পরিবহনের বাসস্ট্যান্ড এবং অন্যান্য যানবাহন। এটাই হলো মুন্নার শহরের কেন্দ্রবিন্দু।

মুন্নার সামুদ্রিক স্তর থেকে পাঁচ হাজার চারশ কুড়ি (৫৪২০ ফুট) ফুট উঁচুতে পশ্চিমঘাটের আনাইমালাই পাহাড়ের পাদদেশ ও মুখিবাপুজা, নাল্লাথানি এবং কুন্দলা নামক তিনটি পাহাড়ি নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত। তামিল ভাষায় মন্নো শব্দের অর্থ হচ্ছে তিন এবং আর শব্দের অর্থ হচ্ছে নদী। তিনটি পাহাড়ি নদীর সঙ্গমস্থলে গড়ে উঠার জন্যই শহরটির নাম মুন্নার। উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ সময় অবধি মুন্নার ছিল অনতিক্রম্য ঘন জঙ্গল অধ্যুষিত পাহাড়ি জায়গা। সেখানে ছিল মাধবন নামক পার্বত্য উপজাতিদের বাস। ওরা কুশলী শিকারী এবং জুম চাষের উপরই নির্ভরশীল। এখনও ঐ অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে ওদের প্রাচীন প্রচলিত নিয়মনীতি মেনে চলার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। তবে সময় এগিয়ে চলার সাথে সাথে আধুনিকতার ছোয়ায় ওদের প্রাচীন রীতিনীতি প্রায়বিলুপ্তির পথে।

১৭৯০ খৃষ্টাব্দে ব্রিটিশরা তাদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য মহীশূরের শাসক টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা করেন। টিপু সুলতানের পরাজয়ের পরই ব্রিটিশরা দাক্ষিণাত্যে আধিপত্য লাভ করে এবং ত্রিবাঙ্কুর ও কোচিনের রাজা ওদের অধীনস্থ হয়।

দাক্ষিনাত্যের এই অঞ্চলটি বৃটিশের অধীনে চলে যাওয়ার পর সেখানে ব্যাপকহারে শুরু হয় চায়ের আবাদ এবং মুন্নার শহরটিকে গড়ে তুলে ওদের গ্রীষ্মকালীন আবাসস্থলে। শহরটির চারপাশের নজরকাড়া চা বাগান এবং দৃষ্টির সীমারেখা ছাড়িয়ে দিগন্তের শেষ সীমানা পর্যন্ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলায় ভরপুর এলাকাটি কালপ্রবাহে বর্তমানে পর্যটকদের এক আকর্ষণীয় রিসোের্ট হিসাবে সমাদৃত।

পাহাড়ের বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে রয়েছে নীলকুরুঞ্জি নামক এক বিশেষ ধরণের (flora) চারাগাছ। বারো বৎসর অন্তর অন্তর নীলকুরুঞ্জি চারা গাছে নীল রংয়ের ফুল ফুটে পাহাড়ের বিস্তৃত অঞ্চলকে এক অপূর্ব দৃষ্টিনন্দন নীলাভ আস্তরণে ঢেকে রাখে।

মুন্নার থেকে মাত্র বিশ কিলোমিটার দূরেই অবস্থিত দাক্ষিণাত্যের সবচেয়ে উঁচু গিরিশৃঙ্খ আনামুডি। আনাইমালাই পাহাড়, কারডামাম পাহাড় এবং পালানি পাহাড়ের সংযোগস্থলে সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৮৮৪২ ফুট উঁচুতে মাথা খাড়া রেখে দাঁড়িয়ে আছে আনামুডি। বিশেষ আকর্ষণীয় উঁচু গিরিশৃঙ্খ এই আনামুডি ব্যতীত রয়েছে একশ বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে এরাভিকুলাম জাতীয় (Eravikulam National Park) উদ্যান। এই উদ্যানে এখনো পাওয়া যায় ক্রমশঃ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার বিশেষ প্রজাতির পশু পক্ষী এবং প্রজাপতি। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পশু হলো ‘নীলগিরি টার’। পশ্চিমঘাট পর্বতের দক্ষিণাঞ্চলে এবং নীলগিরি পাহাড়ই হলো ওদের মূল বাসস্থান। নীলগিরিটার (Nilgiri Tabr) হচ্ছে গাঢ় লোমে আচ্ছাদিত স্বল্প কেশরযুক্ত শক্তিশালী ছাগল। স্ত্রী এবং পুরুষ উভয়েরই ৩০ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার অবধি লম্বা বাঁকানো শিং রয়েছে। পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ নীলগিরি টারের ওজন হবে ৮০ থেকে ১০০ কেজি এবং উচ্চতায় ১ মিটার। আর পূর্ণ বয়স্ক স্ত্রী নীলগিরি টারের ওজন ৫০ কেজি এবং উচ্চতায় ৮০ সেন্টিমিটার।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আনামুডি পাহাড়ের ১২০০ মিঃ থেকে ২৬০০ মিটার উচ্চতায় ক্ষেপে ক্ষেপে চতুর্দিকে জঙ্গলে ঘেরা সবুজ ঘাসের আচ্ছাদন রয়েছে। খাড়া পাহাড়ে নিম্নভাগের জঙ্গলঘেরা সবুজ গাছে আচ্ছাদিত অঞ্চলেই নীলগিরি টারের বসবাস।

উনবিংশ শতাব্দীতে চোরা পশু শিকারীদের ক্রমাগত বেপরোয়া আক্রমণে নীলগিরি টারের সংখ্যা কমতে কমতে প্রায় একশর কাছাকাছি নেমে এসেছিল। তবে পরবর্তীতে নীলগিরি গেইমস এসোসিয়েশন ও হাই রেঞ্জ গেইমস এসোশিয়েশন প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের প্রচেষ্টা এবং বিরল প্রজাতির পশু পক্ষী সংরক্ষণের জন্য ১৯৭২ ইংরাজিতে সরকার কর্তৃক গৃহীত ইন্ডিয়ান ওয়াইল্ড লাইফ প্রোটেকশন এক্ট প্রভৃতি কার্যকর হওয়ায় নাটকীয় ভাবে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া নীলগিরি টারকে সুরক্ষা দিয়েছে। বর্তমানে এরাভিকুলাম ন্যাশনাল পার্কেই অধিক সংখ্যক নীলগিরি টারের বাসস্থান। বিগত পরিসংখ্যান অনুসারে ওদের বর্তমান সংখ্যা এক হাজার আট শত থেকে দু হাজারের মত হবে।

মুন্নার শহরের চারপাশেই উঁচু পাহাড়ে ছড়িয়ে রয়েছে চোকানন্দ, কানাই মালাই, রাজমালাই সহ আরো অন্যান্য চা বাগান। আমরা মুন্নার শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে রাজামালাই চা বাগানের পাশ দিয়ে ক্রমশঃ পাহাড়ের উঁচু রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যাই। যেতে যেতে খাড়া পাহাড়ের বৃহৎ শিলাখণ্ডের উপর জোড়ায় জোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা নীলগিরি টারদের দেখতে পাই। দূর থেকে পাহাড়ের শিলাখণ্ডে ওদেরকে দাঁড়ানো দেখে প্রথমে অবাক হয়ে যাই। মনে হচ্ছিল কি সুন্দর শিংযুক্ত বামন হরিণগুলো খাড়া পাহাড়ের শিলাখন্ডে নির্ভয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আনামুডি গিরিশৃঙ্খের পেট কেটে তৈরি করা মসৃণ পীচের রাস্তা দিয়ে এরাভিকুলাম জাতীয় উদ্যানে এগিয়ে যেতে যেতে নীলগিরি টারদেরকে দেখে আমি প্রথমে বিশেষ ধরণের ছোট ছোট হরিণ বলেই ভেবেছিলাম। পরবর্তীতে এরাভিকুলাম জাতীয় উদ্যান এবং আনামুডি গিরিশৃঙ্খ প্রভৃতি সম্বন্ধে জানতে গিয়েই আমার ভুল ধারণা শুধরে যায়। নীলগিরি টারের আসল পরিচয় জানতে পারি।

একদিকে খাড়া উঁচু গিরিশৃঙ্খ অন্যদিকে ঢালু হয়ে যাওয়া পাহাড়ের খাদ এবং তারই মাঝখান দিয়ে পাহাড় ঘেঁষে মসৃণ পীচ রাস্তা ক্রমাগত উপরের দিকে উঠছে। কিছুদুর ধীর গতিতে আমাদের গাড়ি উঁচু পাহাড়ি রাস্তায় চলার পর সারথী সাজুকে গাড়ি থামাতে বলি। সার্জ পাহাড়ের গা ঘেঁষে গাড়ি দাঁড় করায়। আমরা অর্থাৎ আমি, অনির্বাণ, রুবি এবং বৃন্দা সবাই গাড়ি থেকে নেমে পাহাড়ের গা ঘেঁষে রাস্তায় দাঁড়াই।

সামান্য দূরে আরো একটু এগিয়ে আরো উঁচু জায়গায় রাস্তাটা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে তেমাথা রয়েছে। উঁচুতে তেমাথায় গিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে পাহাড়ের দিকে এগুতে সাহস হয়নি। সার্জ একাই গাড়ি নিয়ে এগিয়ে চলে।

আমরা উঁচু রাস্তা ধরে না এগিয়ে বিপরীত দিকে ধীরে ধীরে পায়ে হেঁটে চলি। তখন আমাদের বাঁদিকে মাথার উপর পাহাডের শিখর দাক্ষিণাত্যের সবচেয়ে উঁচু গিরিশৃঙ্খ আনামুডিকে ধবল মেঘপুঞ্জ আচ্ছাদিত করে রেখেছে। আর ডান পার্শ্ব ক্রমশঃ ঢালু হয়ে অনেকদূর চলে গেছে। আর তার মধ্যেই অবস্থিত চা বাগানগুলোর পাশ দিয়ে সর্পিল পীচ রাস্তা ক্রমশঃ ছোট হয়ে দৃষ্টির অগোচরে চলে যায়। দূর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে এনে রাস্তার কিনারায় খাদে তাকালেই ভয় হয়। পা পিছলে কিংবা হোচট খেয়ে পড়লে আর রক্ষা নেই। ভয়ে ভয়ে খাড়া পাহাড়ের গা ঘেঁষে চলে যাওয়া রাস্তায় পদচারণা করি। মিনিট পনেরো পরেই শ্রীমান সাজু গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে আমাদের সামনে এসে হাজির হয়। আমরা এক এক করে গাড়িতে উঠে বসি।

আনামুডিস্থিত এরাভিকুলাম ন্যাশনাল পার্ক থেকে আমাদের গাড়ি মুন্নার শহরের কেন্দ্রস্থলে যাওয়ার পথে অগ্রসর হয়। মুন্নার থেকে এরাভিকুলাম জাতীয় উদ্যানে যাওয়ার সময় চড়াই উৎরিয়ে উপরে উঠতে যত সময় লেগেছিল তারচেয়ে অনেক কম সময়েই উৎড়াই পাড়ি দিয়ে মুন্নারে চলে আসি। তখন সময় দুপুর দুটো। দিনের মুখ্য আহার পর্ব সমাধা করার এটাই প্রকৃষ্ঠ সময়। এখন সেটা করে নিতে না পারলে পথে অন্য কোন জায়গায় আর সুব্যবস্থা নেই। তাই তাড়াতাড়ি একটা ভোজনালয় খুঁজে বের করে। দ্বিপ্রাহরিক আহার সেরে নিতে ঢুকে পড়ি।

মুন্নারে আহার পর্ব শেষ হতে প্রায় আড়াইটা বেজে যায়। সাজুকে পৃথকভাবে টাকা দেওয়া হয়েছিল সে নিজের পছন্দ মত লাঞ্চ সেরে নিতে। লাঞ্চ সেরে সার্জ আসার পর আমরা আবার গাড়িতে ওঠে বসি। এখন মুন্নার থেকে ফিরে আসার পালা।

মুন্নারের পাশেই পুল্লিভাসাল চা বাগান অবস্থিত। পুল্লি ভাসাল চা বাগানের বিপরীতে রয়েছে গভীর খাদ। আবার সেই খাদের পরেই রয়েছে পাহাড়। সেই পাহাড়েও রয়েছে কিছু ঘন সবুজ চায়ের বাগান। আর চা বাগান পার হয়ে আরো দূরে ছড়িয়ে আছে বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে এলাচিগাছের ঝোপ ঝাড় (cardamon plantation) এবং মাঝে মাঝে সুন্দর সুন্দর হিল রিসোর্টস।

পুল্লিভাসাল চা বাগান এবং মুন্নারের মাঝে যে জায়গায় কেনন ডিভোন হিলস্ প্ল্যানটেশন কোম্পানী প্রাইভেট লিমিটেডের সাইনবোর্ড মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, তার পাশ দিয়েই আরেকটা পথ রয়েছে। সে পথ ধরেই যাওয়া যায় এলাচি চাষযোগ্য অঞ্চল কারডামোম পাহাড়ে। মুন্নার থেকে ফেরার পথে সাজু আমাদেরকে সে পথেই অনেক দূর নিয়ে চলে।

প্রায় এক ঘন্টা সময় এভাবে চলতে চলতে পথ যখন ক্রমশঃ দুর্গম হয়ে আসে তখন মনের ভীতি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে উপেক্ষা করে। গাড়ি চড়ে আর এগিয়ে যেতে মন চায় না। সার্জুকে গাড়ির গতিপথ ঘুরিয়ে নিতে বলি। কিছুদুর এগিয়ে একটা রিসোর্টের সামনে সামান্য প্রশস্ত জায়গা পেয়ে সাজু গাড়ি ঘুরিয়ে নেয়। প্রথমে স্বাভাবিক গতিতেই গাড়ি চলে। তারপর অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা মুন্নার এবং তৎ সংলগ্ন এলাকাকে পিছনে ফেলে উত্তর পূর্ব এশিয়ার আঁকা বাঁকা এবং চড়াই উৎড়াইয়ের একমাত্র ব্যতিক্রমী রাস্তার কিছু অংশ পাড়ি দিয়ে উনপঞ্চাশ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে দ্রুত গতিতে কোচিন ফেরার পথে এগিয়ে চলি।