ইউনাইটেড স্টেটস্ অফ আমেরিকার রাজ্যগুলির মধ্যে কেনটাকি অন্যতম। কেনটাকি রাজ্যের রাজধানী হলো লুইসভাইল এবং লুইসভাইলের পরই দ্বিতীয় বড় শহর হলো বাউলীং গ্রীন। বাউলিং গ্রীন শহরে রয়েছে বিখ্যাত ওয়েস্টার্ণ কেনটাকি ইউনিভার্সিটি। এই ইউনিভার্সিটিতে দেশ বিদেশের ছাত্ররা এসে উচ্চ শিক্ষা লাভ করেন।

এছাড়া এ শহরে আরো একটি বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেটা হলো (Fruit of the Loom) ফ্রুইট অফ দি লুমসের হেডকোয়ার্টার। ফ্রুইট অফ দি লুমস হলো গেঞ্জি, আণ্ডারওয়ার, মোজা ইত্যাদি সহ নানা ধরণের অন্তর্বাস তৈরির বিখ্যাত কোম্পানী যার উৎপাদন কেন্দ্র পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় আছে এবং উৎপাদিত দ্রব্য বিশ্বের বাজারে বিক্রি হয়।

বাউলীং গ্রীনে ফুইট অফ দি লুমস্ কোম্পানীর হেডকোয়ার্টারের অধিকাংশ কর্মীই মধ্য ও পূর্ব এশিয়া থেকে আগত অনাবাসী। আবার সফট ওয়ার ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কর্মরত ব্যক্তিদের মধ্যে ভারতীয়দের সংখ্যাই বেশি।

বাউলিং গ্রীন শহরের মাঝামাঝি অঞ্চলেই রয়েছে উইলকিনসন ট্রেইস নামক বড় রাস্তা। বড় রাস্তার পাশে রয়েছে মেরিয়ট, হায়াত, হোলিডে ইন প্রভৃতি বড় বড় হোটেল। হোটেল গুলোর সামান্য দূরেই শান্ত নিরিবিলি পরিবেশে রয়েছে ফেয়ারওয়েজ এট হার্টল্যাণ্ড নামক (Housing complex) আবাসন কেন্দ্র। এই আবাসন কেন্দ্রের শতাধিক এপার্টমেন্টে নাহলেও এক তৃতীয়াংশ অধিবাসী ভারতীয় যারা এ শহরের বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে কাজ করে।

ফেয়ার ওয়েজ এট হার্টল্যাণ্ড আবাসনের যেপাশ দিয়ে চলে গেছে উইলকিনসন ট্রেস নামক রাস্তা তার বিপরীতে অন্য পাশে রয়েছে গলফ খেলার মাঠ এবং সেই মাঠ সংলগ্ন এলাকায় রয়েছে ছোট ছোট এয়ারক্রাফট উঠা নামার এক বেসরকারী এয়ার ফিল্ড। এয়ার ক্র্যাফ্ট খুব সম্ভবত ব্যক্তিগত মালিকানাধীন কোম্পানীর নিজস্ব কাজেই ব্যবহৃত হয়, সাধারণ যাত্রীদের উড়ে যাওয়া আসার কোন ব্যবস্থা নেই।

আমার ছেলে শ্রীমান অশোকতরু জাপানের ফুজিৎসু কোম্পানীর প্রতিনিধি হয়ে ফ্রুইট অফ দি লুমস্এর হেড কোয়ার্টারে সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কাজ করার নিযুক্তি পত্র পায়। বৎসরাধিক কাল অবধি ফেয়ার ওয়েজ এট হার্টল্যাণ্ড আবাসনের একটি এপার্টমেন্টে বসবাস করে ওকে কর্মস্থলে যাতায়াত করতে হয়েছে। সে সময়ে আমি এবং আমার স্ত্রী ছেলের আবদারে প্রবাসী হয়ে বাউলীং গ্রীনে ওদের কাছে গিয়ে বসবাস করি।

আমেরিকায় দৈনন্দিন জীবন যাপনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সেখানকার ওয়াল মার্ট, মল বা বিভিন্ন নামের বিপণন কেন্দ্রগুলো থেকে সংগ্রহ করা যায়। তবে ভারতীয়দের আহার সামগ্রীর চাহিদা পূরণের জন্য সেখানকার মল কিংবা অন্যান্য আধুনিক বিপণন কেন্দ্র গুলো যথেষ্ট নয়। আমেরিকায় প্রবাসী ভারতীয় এবং পূর্ব এশিয়ার চীন, ভিয়েতনাম, কোরিয়া এবং মায়াম্মার প্রভৃতি অঞ্চলের লোক যারা কর্মসূত্রে আমেরিকায় বসবাস করে তাদের প্রয়োজন মেটাতে প্রায় প্রতিটি শহরেই গুজরাটের প্যাটেল, বাংলাদেশের মুসলমান কিংবা পূর্ব এশিয়ার লোকদের মালিকানাধীন বিপণন কেন্দ্র রয়েছে। ওগুলোতে সব্জি, মাছ, মশলাপাতি এবং নিজ নিজ দেশের রকমারি খাদ্য দ্রব্য পাওয়া যায়। তবে সবগুলোতে সবসময় চাহিদার জিনিস পাওয়া যায় না। এক্ষেত্রে বড় শহরের প্যাটেলদের দোকানগুলো খুব নির্ভরশীল। সেখানে সাধারণত প্রবাসী ভারতীয়দের প্রয়োজনীয় জিনিস না পাওয়ার ঘটনা বিরল।

বাউলীং গ্রীনের ফেয়ার ওয়েজ এট হার্টল্যাণ্ড আবাসন কেন্দ্রে ভারতীয় বাসিন্দাদের নিজস্ব খাবারের উপকরণ খরিদ করার নিকটবর্তী যে বিপণন কেন্দ্র আছে সেটার নাম এসিয়ান মার্ট এবং মালিক হচ্ছে আলী নামে পরিচিত এক বাঙ্গালী মুসলমান। সে আমেরিকার নাগরিকত্ব লাভ করেছে। ফ্লোরিডাতে নানা ধরণের ফলপশারি এবং সব্জি ক্ষেত সহ তার নিজস্ব বাড়ি আছে। তবে ব্যবসার খাতিরে ফ্লোরিডার সেই বাড়ি ছেড়ে তাকে কেনটাকিতে এসে ‘এশিয়ান মার্ট’ নামক দোকান খুলতে হয়েছে। বাউলীং গ্রীনের ভারতীয় বাঙ্গালীরা আলীর এশিয়ান মার্ট থেকেই মুড়ি, কাঁচামরিচ, সুটকি, বরফ দেওয়া প্যাকেটে বাংলা দেশের ইলিশ, পাবদা, ট্যাংড়া, সরপুটি প্রভৃতি মাছ খরিদ করতে যায়। তবে সবসময় চাহিদার সবকিছু পাওয়া যায় না। তাই চাহিদামত সবকিছু পাওয়ার জন্য নিকটবর্তী বড় শহরের প্যাটেলদের দোকানে যেতে হয়।

বাউলীং গ্রীনের নিকটবর্তী বড় শহর হলো টেনেসি রাজ্যের রাজধানী ন্যাসভাইল। ইন্টারস্টেট রাস্তা ধরে বাউলীং গ্রীন থেকে ন্যাসভাইল গাড়ি ড্রাইভ করে যেতে এক ঘন্টার চেয়েও কিছু বেশি সময় লাগে আর ন্যাসভাইলে রয়েছে প্যাটেলদের দোকান, যেখানে ভারতীয়দের দৈনন্দিন আহারের প্রয়োজনীয় সবজিনিস পাওয়া যায়। তাই আমরা মাসে একবার কিংবা দুবার সপ্তাহান্তে ছুটির দিনে ন্যাসডাইলে যেতাম। তবে দেশীয় আহারের উপকরণ সংগ্রহ ছাড়াও ন্যাসভাইলে যাওয়ার অন্য আকর্ষণ ছিল।

ন্যাসভাইলে প্রচুর ভারতীয়দের বসবাস, এর মধ্যে বাঙ্গালীদের সংখ্যা কম নয়। তবে গুজরাটীদের সংখ্যা অধিক। কেবলমাত্র ন্যাসভাইল টেলিফোন ডাইরেক্টরিতে শতাধিক প্যাটেল উপাধিকারী ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়। সেখানে ভারতীয় ধর্ম ও সংস্কৃতির ধারক বাহকের কেন্দ্ররূপে বেশ শক্ত ভিত নিয়েই আত্মপ্রকাশ করে আছে দি গনেশ টেম্পল, ন্যাসভাইল, টেনেসি।

ন্যাসভাইল শহরের মধ্যিখানেই এক বড় পরিসরের উঁচু টিলায় সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশে বিরাজ করছে সুরম্য গণেশ মন্দির। বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর প্রবাসী ভারতীয়দের প্রচেষ্টাতেই এই গণেশ মন্দির তৈরি হয়েছে। মন্দিরের সামনেই সমবেত ভক্ত ও দর্শক মণ্ডলীর গাড়ি রাখার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা জুড়ে পার্কিং জোন। বিশাল একতালা অট্টালিকার ছাদের নিচে আলাদা আলাদা প্রকোষ্ঠে রয়েছে কারুকার্যময় ও সালঙ্কারা হিন্দু দেবদেবীর নানা মূর্তি। মন্দিরের ভিতরেই আছে প্রসাদ বিতরণের কেন্দ্র, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ধর্মালোচনার জন্য বিশেষ অডিটোরিয়াম।

গণেশ মন্দিরে নিয়মিত ভক্ত সমাগম এবং পূজার্চনা ছাড়াও বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর ভারতীয়রা বন্ধের দিনে তাদের বারো মাসের তেরো পার্বন পালন করে থাকে। বাৎসরিক শারদীয় দুর্গাপূজা, সরস্বতী পূজা, নবরাত্রি, দেওয়ালী এমনকি রথযাত্রা গণেশ মন্দিরে বেশ ভালোভাবেই পালিত হয়। ন্যাসভাইলের গণেশ মন্দিরে রথযাত্রা পালনের জন্য সেখানকার জগন্নাথ সোসাইটি অফ দি আমেরিকা নামক সংগঠন বেশ ঘটা করেই রথযাত্রা উপলক্ষে নানা কর্মসূচী সহ রথটানার আয়োজন করে থাকেন।

সময়ে সময়ে ন্যাসভাইলে আমাদের ছুটে যাওয়ার আরো এক বিশেষ আকর্ষণ ছিল - সেটা হলো “বেঙ্গলী এসোসিয়েশন অফ গ্রেটার ন্যাসভাইল” এর নানাবিধ কর্মসূচী। ন্যাসভাইল শহর ও তার চতুপার্শ্বস্থ অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রবাসী বাঙ্গালীদের নিয়েই এই স্বতন্ত্র সংগঠন। এই সংগঠনের উদ্যোগেই চলে ন্যাসভাইলে বঙ্গ-সংস্কৃতি, শিল্প ও সাহিত্যের বর্ণময় অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান পর্বে যোগ দিতে সমাগম হয় বৃহত্তর ন্যাসভাইলের বাঙ্গালীদের।

কোন কোন বছর অনুষ্ঠানের গৌরববৃদ্ধি ও দর্শক মণ্ডলীর মনোরঞ্জনে বিশেষ মাত্রা জুড়ে দিতে বহুদূর থেকে সাগর পাড়ি দিয়ে ছুটে আসেন সাহিত্য ও সঙ্গীত জগতের দিকপালরা।

২০১০ ইংরাজির জুলাই মাসে বেঙ্গলী এসোসিয়েশন অফ গ্রেটার ন্যাসভাইল কর্তৃক আয়োজিত আঞ্চলিক বঙ্গ সম্মেলন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বাংলা থেকে এক গোষ্ঠী শিল্পী যোগ দিয়েছিলেন। জুলাই মাসের ১৬,১৭ এবং ১৮ তারিখ অর্থাৎ শুক্র, শনি ও রবি এই তিনদিন ব্যাপী ঠাসা কর্মসূচী নিয়ে চলে আঞ্চলিক বঙ্গ সম্মেলনের অনুষ্ঠান। প্রথমদিন সন্ধ্যা ৬ ঘটিকা থেকে মধ্যরাত্রি পর্যন্ত ছিল ভারতীয় সংস্কৃতি ও শিল্পের সমারোহে অনুষ্ঠান ‘ইন্ডিয়া নাইট’। দ্বিতীয় দিন সকাল ১০টা থেকে মধ্য রাত্রি পর্যন্ত ‘দুই বাংলার মিলন’ এবং তৃতীয় দিনে সকাল ৯টা থেকে বিকাল সাড়ে চার ঘটিকা পর্যন্ত ছিল আমেরিকার প্রতি সম্মান ও শুভেচ্ছার প্রতীক ‘ট্রিবিউট টু আমেরিকা’ নামক অনুষ্ঠান।

সেই আঞ্চলিক বঙ্গ সম্মেলনে বাংলাদেশের এক গোষ্ঠী শিল্পীদের মধ্যে বাংলা সাহিত্য জগতের দিকপাল স্বনামধন্য সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী শ্রীমতি লোপামুদ্রা মিত্র ও রেজওয়ানা বন্যা চৌধুরী প্রভৃতিরা যোগ দিয়েছিলেন। আমরা কেনটাকি রাজ্যের বাউলিং গ্রীন শহরে বসবাস করলেও প্রবাসী বাঙ্গালী হওয়ার সুবাদে স্বজনের টানে ছুটে যেতাম টেনেসি রাজ্যের ন্যাসভাইল শহরে বেঙ্গলী এসোসিয়েশনের অনুষ্ঠান উপভোগ করতে। কারণবশতঃ কোন অনুষ্ঠানে উপস্থিত না থাকতে পারলে আনন্দ হারানোর ব্যথায় মনটা বিশেষ ভারাক্রান্ত হয়ে উঠতো। ন্যাসভাইলের গণেশ মন্দিরে ধর্মীয় কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগদান করতে হলে সেই অনুষ্ঠানের সময়সূচী দেখেই বাউলিং গ্রীন শহর থেকে রওয়ানা দিয়ে অনুষ্ঠানের শেষে আবার নিজেদের আস্তানা ফেয়ার ওয়েজ এট হার্ট ল্যান্ডের আবাসনে ফিরে আসা হোত। কিন্তু সাপ্তাহান্তে ছুটির দিনে আহার সামগ্রী ক্রয় করার জন্য ন্যাসভাইলে প্যাটেলদের দোকানে যেতে হলে সারাদিনের জন্যই যেতে হোেত। সকাল দশ ঘটিকার মধ্যে স্নান টান সেরে ব্রেক ফাস্ট পর্ব চুকিয়ে নিজেদের গাড়িতে বসে দেও ছুট ন্যাসভাইলের উদ্দেশে। ৬৫নং সাউথ ইন্টারস্টেট রাস্তা ধরে গাড়ি চালিয়ে এক ঘন্টার চেয়ে সামান্য বেশি সময়েই পৌঁছানো যায় ভিন রাজ্য টেনেসির রাজধানী ন্যাসভাইল শহরের ডাউন টাউনে। তারপর ঘন্টা দেড়েক এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি করে চলে যেতাম রেস্তোরায় দ্বিপ্রাহরিক আহারের জন্য। বন্ধের দিনে অর্থাৎ শনি রবিবারে অধিকাংশ রেস্টুরেন্ট গুলোতে দুপুর ১২ ঘটিকা থেকে বিকাল ৩ ঘটিকা পর্যন্ত বুফে ব্যবস্থা চালু থাকে। ন্যাসভাইল শহরের এভিনিউ নর্থের সিতার, ডেমনক্রন স্ট্রীটের টেমারিন্ড এবং ওয়েস্ট এন্ড এভিনিউর বোম্বে প্যালেস ও ওডল্যান্ড নামক বিখ্যাত ভারতীয় খাবারের রেস্তোরা গুলো ছাড়া আরো নানা রকম রেস্তোরা ন্যাসভাইলে রয়েছে। সাধারণতঃ সাপ্তাহান্তে কিংবা বিশেষ কোন সরকারি ছুটির দিনে রেস্তোরাগুলিতে ভিড় থাকে। প্রথমেই রিসেপশন কাউন্টারে গিয়ে চাহিদা অনুযায়ী বুফে প্লেট বুকিং করে ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করতে হয়। সুসজ্জিত ডাইনিং টেবিলে বসার ব্যবস্থা করে ওয়েটার এসে গ্রাহককে সময়মত নিয়ে যায়। ডাইনিং টেবিলের পাশেই অদূরে সারি সারি পাত্রে সাজিয়ে রাখা হয় গরম গরম রকমারি আমিষ নিরামিষ আহার সামগ্রী এবং মিষ্টি জাতীয় দ্রব্য। সেখান থেকে নিজ নিজ ডিসে পছন্দ মত খাবার তুলে নিয়ে ডাইনিং টেবিলে রেখে বসে বসে আরাম আয়েসে যত ইচ্ছা খেতে থাকো।

প্যাটেল ব্রাদার্সের গ্রোসারী দোকান থেকে জিনিস ক্রয় করার জন্য আমাদের যাওয়ার পথেই সুবিধাজনক অবস্থানে পাওয়া যেত বহুতল বিশিষ্ট হোটেল কন্টিনেন্টাল এবং হোটেল কন্টিনেন্টালের নিচতলায় রয়েছে ভারতীয় খাবারের রেস্তোরা। বেশির ভাগ দিনেই আমরা ন্যাসভাইলের এই হোটেল কন্টিনেন্টালের নিচতলায় ভারতীয় খাবারের রেস্তোরাতেই দ্বিপ্রাহরিক ভোজন পর্ব শেষ করে নিতাম।

কেন্টাকি রাজ্যের বাউলিং গ্রীন শহরে আমাদের ছমাস সময় সীমার প্রবাসকালে প্রতিমাসে তিন চার দিন সীমান্তবর্তী দক্ষিণের টেনেসি রাজ্যের রাজধানী ন্যাসভাইল শহরে যাওয়া হয়েছে। কোন দিন পূজা পার্বন উপলক্ষে গণেশ মন্দিরে আবার কোনদিন বেঙ্গলী এসোসিয়েশনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু বেশিরভাগ দিনই ন্যাসভাইল শহরে আমাদের যাওয়ার কারণ ছিল প্যাটেল ব্রাদার্সের দোকান থেকে আহারের জন্য বাসমতি চাউল, আটা, মশলাপাতি এবং শাক সব্জি খরিদ করার জন্য।

প্যাটেল ব্রাদার্সে সওদা শেষ করেই চলে যেতাম পাশ্ববর্তী মূলতঃ পূর্ব এশিয়ার লোকের মালিকানাধীন মাছের দোকানে। সেখানে বিভিন্ন ধরনের মাছ পাওয়া যেত। তবে সেই দোকানে জলাধারে রাখা জ্যান্ত পাঁচশ গ্রাম ওজনের বড় তেলাপিয়া মাছই ছিল আমাদের পছন্দের।

প্যাটেলের দোকান থেকে জিনিসপত্র এবং মাছের দোকান থেকে মাছ খরিদ করার পরই আমাদের বাউলিং গ্রীনের বাড়িতে ফেরার পালা। ন্যাসভাইলের প্যাটেলদের গ্রোসারী দোকান এবং তৎপার্শ্ববর্তী পূর্ব এসিয়ানদের মাছের দোকান থেকে বাউলিং গ্রীনের বাড়িতে গাড়ি ড্রাইভ করে ফিরে আসতে ঘন্টা সোয়া ঘন্টা সময় বেরিয়ে যেত। সাধারণতঃ বিকালের পড়ন্ত বেলাতেই বাউলীং গ্রীনের উদ্দেশ্যে আমরা ন্যাসভাইল থেকে রওয়ানা দিতাম। কোন কোন দিন বাজার শেষে হাতে সময় থাকলে আমরা ন্যাসভাইলের এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি করতাম। চলে যেতাম কাম্বারল্যান্ড নদীর তীরে।

ন্যাসভাইল শহরটি ডেভিডসন কাউন্টিতে কাম্বারল্যান্ড নদীর তীরেই অবস্থিত। কাম্বারল্যান্ড নদীটিকে পাশে রেখে ইন্টারস্টেট ৬৫ রাস্তা ধরে যেতেই নজরে পড়ে ন্যাসভাইল ডাউনটাউনের গগনচুম্বী অট্টালিকাগুলো। এক সারিতে আকাশের দিকে মুখ উচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অট্টালিকা গুলোই হলো ন্যাসভাইল ডাউনটাউনের স্কাইলাইন। বাউলিং গ্রীন থেকে ন্যাসভাইল আসার সময় আমাদেরকে আসতে হতো ইন্টারস্টেট 65S রাস্তা ধরে এবং ন্যাসভাইল থেকে বাউলিং গ্রীনে ফিরে যেতে হতো ইন্টারস্টেট 65N রাস্তা ধরে। স্বাভাবিক ভাবেই ইন্টারস্টেট সাউথ এবং নর্থ রাস্তা দিয়ে যাতায়াতে ন্যাসভাইল এবং বাউলিং গ্রীনের মধ্যবর্তী জায়গাগুলোই আমাদের বেশি পরিচিত হয়ে যায়। কিন্তু ন্যাসভাইল থেকে আরো দক্ষিণে যাওয়ার প্রয়োজন হয়নি বলেই দক্ষিণের জায়গা গুলো দেখা হয়নি। তবে আমাদের বাউলিং গ্রীনে প্রবাসের দিনগুলি শেষ হওয়ার সামান্য কিছুদিন পূর্বেই ন্যাসভাইল যখন শেষবারের মত যাই তখনি ন্যাসভাইল থেকে আরো দক্ষিণে ইন্টারস্টেট রাস্তা ধরে এগিয়ে যেতে ইচ্ছা হয়।

সে রাস্তায় এগিয়ে যেতেই জানতে পারি ন্যাসভাইলের দক্ষিণে পরবর্তী যে বড় শহরটি রয়েছে তার নাম নক্সভাইল। আর নক্সভাইল যাওয়ার আগেই বাঁদিকে ১৬২ ইস্ট স্টেট রোডে বাঁক নিয়ে সামান্য দূরত্ব পাড়ি দিলেই পৌঁছানো যায় ওকরীজ শহরে। ওকরীজ, ওকরীজ, ওকরীজ নামটা বার বার মনে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। কারণ, ন্যাসভাইল থেকে নক্সভাইল পৌঁছানোর পূর্বেই বাঁদিকে ইস্ট ১৬২ রাস্তা ধরে সামান্য দূরত্বেই যে ওকরীজ শহর রয়েছে সে খবর জানার অনেক আগে আমেরিকায় প্রবাস জীবন শুরুর প্রথমদিকেই ওকরীজ নামটি বিভিন্ন স্থানে দেখেছি। প্রথমে মিশিগান রাজ্যের আববার্ণ হিলস্ এর এডামস্ ক্রীক নামক আবাসন কেন্দ্রের বাসিন্দা থাকাকালীন আমাদের এপার্টমেন্টের পার্শ্ববর্তী আরেকটি আবাসন কেন্দ্রের প্রবেশ দ্বারেই ওকরীজ নামধারী বিরাট হোর্ডিং নজরে পড়েছে। তবে ঐসব ওকরীজ নামের জায়গাগুলো থেকে বর্তমানের নক্সভাইলের নিকটবর্তী ওকরীজ শহর স্বতন্ত্র। এই ওকরীজ শহরের ইতিহাস এবং গুরুত্ব অসাধারণ।

বিশ্বজুড়ে রনদামামায় উথাল পাথালের দিনগুলোতেই আমেরিকার দক্ষিণের রাজ্য টেনেসির পূর্বপ্রান্তে এন্ডারসন ও রৌনে কাউন্টির ভূখণ্ডে অবস্থিত ওকরীজ শহরকে নূতনভাবে গড়ে তোলা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কানাডা ও ব্রিটেনের সহযোগে আমেরিকা কর্তৃক গৃহীত “ম্যান হাটান প্রজেক্ট” এর বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এই শহরের পত্তন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করার উদ্দেশ্যেই আমেরিকা কর্তৃক গৃহীত সমরাস্ত্র আনবিক বোমা তৈরির প্রকল্পই হলো “ম্যানহাটান প্রজেক্ট”। এই প্রকল্পের বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা প্রধান ব্যক্তি ছিলেন ইউএস কর্পস অফ ইঞ্জিনিয়ার্সের জেনারেল লেসলি গ্রোভস্। লেসলি গ্রোভস্ এর নেতৃত্বেই ১৯৪২ সালের অক্টোবর মাসে টেনেসি রাজ্যের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত এন্ডারসন ও রৌনে কাউন্টির ভূখণ্ডই “ম্যানহাটন প্রজেক্ট” এর সিংহভাগ কাজ চালিয়ে যাওয়ার উপযুক্ত প্রধান জায়গা হিসাবে চিহ্নিত হয়। তড়িঘড়ি করেই এলাকাটি আমেরিকার সামরিক বাহিনীর অধীনে নিয়ে আসা হয়। দীর্ঘকাল ধরে বসবাসকারী স্থানীয় বাসিন্দাদের ছ’সপ্তাহের মধ্যেই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য করে। কেহ কেহ ছ’সপ্তাহেরও সুযোগ পায়নি। বাড়ি ঘর ছেড়ে যাওয়ার নোটিশ পাওয়ার দুসপ্তাহের মধ্যেই ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আগেই বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছে।

১৯৪২ ইংরেজির অক্টোবর মাস থেকে ১৯৪৩ ইংরেজির মার্চ মাসের মধ্যেই নির্দ্ধারিত ভূখণ্ডের পরিসীমায় প্রাচীর গড়ে উঠে এবং গুরুত্বপূর্ণ চেকপোস্ট তৈরি হয়। সড়কপথে ও বিমানে যোগাযোগ রক্ষার সুবিধাজনক পরিকাঠামো নির্মাণ করে জায়গাটিকে পার্শ্ববর্তী অসামরিক জনবহুল অঞ্চল থেকে পৃথক করে রাখা হয়।

সামরিক কর্তৃপক্ষ যেভাবে স্থায়ী বাসিন্দাদের উৎখাত করে লোকচক্ষুর অন্তরালে ম্যানহাটন প্রজেক্টের বাস্তব রূপ দিতে সবরকম পরিকাঠামো তৈরি করে ওকরীজ শহরকে গড়ে তুলে, তাতে চতুপার্শ্বস্থ এলাকার সকল জনসাধারণ সন্দেহ ও অজান ভয়ের আবর্তেই দিন অতিবাহিত করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হ্যারী, এস, ট্রুম্যানের নির্দেশে ১৯৪৫ ইংরাজির ৬ ও ৯ ই আগষ্টে যথাক্রমে জাপানের হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে আনবিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটানোর পরই এ খবর প্রকাশ্যে আসে যে “ম্যান হাটান প্রজেক্ট” এর কার্যসূচী অনুসারেই ‘লিটলবয়’ এবং ‘ফ্যাটম্যান’ সাঙ্কেতিক নামের আনবিক বোমা তৈরির আতুড় ঘর ছিল শহর ওকরীজ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার দুবছর পর আমেরিকার এটমিক এনার্জি কমিশনের হাতে ওকরীজ শহরকে হস্তান্তরিত করা হয়। এখানো এই শহরে এটমিক এনার্জি সংক্রান্ত গবেষণা মূলক কাজের ব্যবস্থা রয়েছে।

ওকরীজ শহরের পাশে পৌঁছেও কিন্তু শহরের ভিতরে প্রবেশ করতে না পেরে আমাদেরকে ফিরতে হয়। কারণ, ওকরীজ শহর প্রাচীন ঐতিহ্য নিয়ে বর্তমানে যে স্থিতিতে আছে তাতে আমাদের মত প্রবাসীদের পক্ষে আচমকা শহরের ভিতরে প্রবেশ করে ইচ্ছামত পরিদর্শন করার সুযোগ নেই। সে যাহোক, ওকরীজ শহরের ভিতরে গিয়ে পরিদর্শন করতে না পারার জন্য মনে কোন ক্ষোভ হয়নি। তবে বিশ্বের অনন্য সাধারণ ঘটনা বিজড়িত এই ওকরীজ শহরকে স্বচক্ষে দূর থেকে দেখে মনে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ন্যাসভাইল থেকে ফেয়ারওয়েজ এট হার্টল্যান্ডের বাড়িতে ফিরে স্বাভাবিক রুটিন মাফিক নিজেকে যেভাবে নিয়োজিত রাখতাম তার ব্যতিক্রম ঘটে। মনে কেবল ওকরীজ কেন্দ্রিক চিন্তাই জট বাঁধতে থাকে আর ওকরীজ শহরের ইতিবৃত্তই উন্মোচন করে দেয় মনের স্মৃতি কোঠায় থিতিয়ে থাকা অতীতের বিপর্যয় সস্কুল দিনের করুণ কাহিনি। এপার্টমেন্টে নিজের নিদ্ধারিত কক্ষে একাকী বসে বসে কেবল ভাবি। আশ্চর্য, জীবন সায়াহ্নে পৌঁছে একি সাংঘাতিক যোগাযোগ। ১৯৪২ খৃষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে ইউনাইটেড স্টেটস আর্মি কর্পস অফ ইঞ্জিনিয়ার্স আমেরিকার টেনেসি রাজ্যের ওকরীজ শহরকে অধিগ্রহণ করে সেখানেই আনবিক বোমা তৈরির কাজ করে যাচ্ছিল। আমার তখন জন্মই হয়নি। ১৯৪২ ইংরাজির আরো দুবছর পর পরাধীন ভারতে পূর্ব বাংলার এক প্রান্তিক পল্লী গ্রামে আমি ভূমিষ্ঠ হই। জন্মের পর দুনিয়ার সকল স্বাভাবিক শিশুদের মতই তখন মায়ের কোলই ছিল আমার ভুবন। দুনিয়ায় কি হচ্ছে না হচ্ছে সেসব কিছুইতো বুঝতাম না। দিনে দিনে বড় হওয়ার পরই মায়ের কাছ থেকে অনেক জেনেছি। অরপর, বয়স বাড়ার সাথে সাথে সমাজ দেশ, কাল, পাত্র ইত্যাদির জ্ঞান ধীরে ধীরে উপলব্ধ হয়েছে। মায়ের মুখেই শুনেছি আমার জন্মের শুরুতেই বাংলার ছিল দুর্ভিক্ষের করালগ্রাস।

১৯৪৩ ইংরাজিতে বাংলার এই দুর্ভিক্ষ পঞ্চাশের মন্বন্তর বলেও খ্যাত। কাতারে কাতারে নিরন্ন বুভুক্ষের দল ঘরবাড়ি ছেড়ে খাবারের সন্ধানে ফেনবাও ফেনদাও বলে আর্তনাদ করে পথে প্রাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সে সময় জাপান বার্মা আক্রমণ করে এবং বার্মা জাপানের কজায় চলে যায়। ফলস্বরূপ বার্মা থেকে বৃটিশ ভারতে চাউল যোগানের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। বাংলায় দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ। খাদ্যাভাবে বাংলার লক্ষ লক্ষ লোক অনাহারে অর্থাহারে প্রাণ হারায়। অথচ কি আশ্চর্য, দুর্ভিক্ষের ঐকরাল গ্রাস আমাকে হাপিস করতে পারেনি।

লক্ষ লক্ষ লোক খাবর না পেয়ে অসময়েই ধরাধাম থেকে চলে গেলেও আমি কিন্তু মায়ের কোলেই ধীরে ধীরে বড় হয়েছি। তখন সারা বাংলা জুড়ে শুধু দুর্ভিক্ষই নয়, সারা ভারত জুড়ে চলছিল ইংরাজ ভারত ছাড়ো আন্দোলনের (Quit India Movement) জোয়ার। ইংরাজ ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন তথ্য আগষ্ট বিপ্লবে যোগদানকারী বিপ্লবী যুবাদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য বাংলার ঘরে ঘরে চলছিল ব্রিটিশ সরকারের নির্মম অত্যাচার। সে সময়ই আবার নিরীহ গ্রামবাসীদেরকে আতঙ্কিত করে বিশ্বযুদ্ধে নিয়োজিত বাকে বাকে ছোট্ট বোমারু বিমান মাথার উপর দিয়ে আকাশের এক প্রান্ত থেকে ধেয়ে এসে নিমেষে দিগন্তে বিলীন হয়ে যেত।

বাংলার দুর্ভিক্ষ, ভারতজুড়ে ‘ইংরাজ ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের জোয়ার আর বিশ্বব্যাপী বিশ্বযুদ্ধের দামামা প্রভৃতি মিলে যে সঙ্কটময় পরিস্থিতি বিরাজ করছিল সে সময়ই আবার নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোেস আজাদ হিন্দ ফৌজ বাহিনী তৈরি করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে ভারত থেকে উৎখাত করার জন্য দিল্লী চলো অভিযানে ভারতের পূর্বপ্রান্তের মৈরাং পর্যন্ত এসে পৌঁছেছিল। আজাদ হিন্দ বাহিনী নেতাজী সুভাষ বোসের নেতৃত্বে শক্তিশালী ব্রিটিশ সরকারের সৈনিকদের পরাস্ত করে ১৯৪৪ ইংরাজির ১৪ই এপ্রিল মৈরাং-এ নিজেদের বিজয় পতাকা উত্তোলন করেন। কিন্তু না, শেষ পর্যন্ত আজান হিন্দ ফৌজের বিজয় রথ ব্রিটিশ বাহিনীকে মোকাবিলা করে আর এগুতে পারেনি। আজাদ হিন্দ ফৌজের দিল্লী চলো অভিযান সফল না হওয়ার পিছনে নানা কারণ থাকলেও প্রধান কারণ ছিল আমেরিকা কর্তৃক জাপানের হিরোসিমা ও নাগাসাকি শহরে যথাক্রমে ‘লিটল বয়’ ও ‘ফ্যাট ম্যান’ সাঙ্কেতিক নামে আনবিক বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা। এই আনবিক বোমা বিস্ফোরণের ফলেই জাপান বিধ্বস্ত হয় এবং পরবর্তীতে ১৫ আগষ্ট ১৯৪৫ ইংরাজি তারিখে বিশ্বযুদ্ধে নিজেদের আত্ম সমর্পণের কথা ঘোষণা করে। নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস জাপান থেকেই দেশ প্রেমিক ভারতীয় বীর সেনানীদের নিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করে দিল্লী চলো, চলো দিল্লী অভিযান এগিয়ে চলছিল।

এ ব্যাপারে জাপানের সহায়তা ছিল। কিন্তু আমেরিকার আনবিক বোমার আঘাতে বিধ্বস্ত জাপানের আত্মসমর্পণ এবং ব্রিটিশ ও মিত্র শক্তির জয়ের ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্তিম পর্বে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয় তাতে দিল্লী দখলের অভিযান অধরা রেখেই ব্রিটিশের হাতে যুদ্ধাপরাধী হিসাবে নিজেকে বন্দী হতে না দেওয়ার উদ্দেশ্যেই নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোসের অন্তর্ধান।

বার্ধক্যের প্রবাসজীবনে আমেরিকার টেনেসি রাজ্যের ওকরীজ শহরের ইতিবৃত্তকে কেন্দ্র করেই মনে পড়ে উল্লেখিত ঘটনাবলী। মনের পর্দায় ভেসে ওঠে আমাদের ছেলেবেলায় দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের উথাল পাথাল ঘটনাগুলোর চিত্রপট।

চল্লিশের দশকের প্রথমার্ধে ওকরীজে মারণাস্ত্র তৈরি হওয়ার সময়ে আমাদের দেশের তৎকালীন রাজনৈতিক ঘটনাবলীর যোগসূত্র রয়েছে বলেই এরকমটা হয়। আনবিক মারণাস্ত্র তৈরি হলো আমেরিকার ওকরীজে, সেটার বিস্ফোরণ ঘটানো হলো এশিয়ার হিরোসিমা নাগাসাকিতে আর ভারত মাতাকে শৃঙ্খলমুক্ত করতে অফুরন্ত উদ্যম নিয়ে আমাদের আজাদ হিন্দ ফৌজের দিল্লী দখলের অভিযান ভারতের মণিপুর রাজ্যে মৈরাং-এ এসেই স্তব্ধ হয়ে যায়। এসব কাহিনী মনে তোলপাড় করে। মনে হয় ওকরীজে তৈরি আনবিক বোমা যদি জাপানকে বিধ্বস্ত না করতো তাহলে ব্রিটিশ এতটা অপ্রতিরোধ্য হতো না। আজাদ হিন্দ ফৌজ বাহিনীর বিজয় রথ এগিয়েই চলত এবং সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশকে ভারত থেকে ঝোটিয়ে বিদায় করত। ব্রিটিশ সরকার দেশকে বিভাজন করে তাদের সৃষ্ট লম্পট ও ভেকধারী দেশনেতার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে পারতো না। আমাদেরকেও হয়তবা নিজ জন্মভূমি থেকে উৎখাত হয়ে জীবনের ঘাটে ঘাটে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার বিড়ম্বনা এবং দুর্ভোগ সইতে হতো না।