কৃপাংশু চৌধুরী আমার চাকুরী জীবনের প্রথম পর্বে স্বল্প সময়ের সহকর্মী। সে আসাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংএ ডিগ্রি লাভ করার পরই লেকচারার পদের নিযুক্তি পেয়ে শিলচর পলিটেকনিকে যোগ দেয়। প্রায় ছ ফুট লম্বা, সুশ্রী ও সুঠাম দেহের অধিকারী কৃপাংশুর ছাত্র পড়ানোর বিশেষ দক্ষতা এবং সহকর্মীদের সাথে বন্ধুত্বের বন্ধন গড়ে তুলার বিশেষ গুণ ছিল। তাছাড়া ছাত্রদের খেলাধূলা এবং সাংস্কৃতিক মান উন্নয়নেও তাঁর অগ্রণী ভূমিকা ছিল।
আমিও চাকুরী জীবনের পূর্বে ছাত্রাবস্থায় শিলচর জেলা ক্রীড়া সংস্থা আয়োজিত এ ডিভিশনের লীগ এবং নক আউট প্রতিযোগীতায় ফুটবল এবং ক্রিকেট দু ধরণের খেলাই খেলেছি। ফুটবল খেলেছি শিলচর স্পোটিং ক্লাবের হয়ে এবং ক্রিকেট খেলেছি শিলচর টাউন ক্লাবের হয়ে। পরবর্তীতে চাকুরী জীবনে শিক্ষক হয়েও ছাত্রদেরকে নিয়ে ফুটবল এবং ক্রিকেট টিম গঠন করে খেলাধূলায় অংশগ্রহণ এবং পরিচালনায় যুক্ত থেকেছি। এসুবাদেই কৃপাংশুর সঙ্গে আমার ভাব বিনিময় এবং সম্প্রীতি গড়ে ওঠে।
চাকুরী জীবনের দৈনন্দিন কর্তব্য এবং সহকর্মীদের সাথে স্বাভাবিক চলাফেরা করার সঙ্গে সঙ্গে তখন নকশালপন্থী রাজনৈতিক দলের সাথেও আমার গোপনে নিবিড় সম্পর্ক ছিল। তাই গোপন রাজনৈতিক দলের হয়ে রাষ্ট্র বিরোধী কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগে আসাম সরকার আমাকে গ্রেপ্তার করে এবং বিচারাধীন বন্দী হিসাবে চার মাস জেল হাজতে রাখে। আর সে সময়ই কৃপাংশু জব ভাউচার সংগ্রহ করে শিলচর পলিটেকনিকের চাকুরীতে ইস্তফা দিয়ে সুদূর আমেরিকায় চলে যায়। এরকম পরিস্থিতিতে ওর সাথে সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও পরবর্তীতে বিদেশ থেকে কৃপাংশু আমার খোঁজ খবর নিত এবং কয়েক বছর পর পর দিন কয়েকের জন্য দেশে ফিরে এলে অবশ্যই সে তার প্রথম চাকুরী জীবনের বন্ধুদেরকে শিলচরে এসে দেখে যেতো।
তখন সামান্য সময়ের জন্য হলেও কৃপাংশুর সাথে কথাবার্তা এবং ভাব বিনিময় হতো।
আমার আরেক বাল্যবন্ধু এবং সহপাঠী সুজিত। সেও ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে, ষাটের দশকের শেষে জব ভাউচার সংগ্রহ করে আমেরিকায় পাড়ি দেয়। সে বর্তমানে আমেরিকার স্থায়ী বাসিন্দা এবং স্ত্রী কন্যা সহ নিউজার্সিতে নিজস্ব বাড়িতেই থাকে। আমি আমেরিকার মিসিগান ষ্টেটের একটি শহরতলীতে ছেলের সাথে বসবাস করছি সে জানে। তখন কৃপাংশুর সাথে আমার যোগাযোগ হয়নি। সুজিতকে একদিন ফোনে বলেছিলাম সে যেন কৃপাংশুর ফোন নম্বরটা সংগ্রহ করে আমাকে জানায়। কিন্তু সাথে সাথে এ ব্যাপারে সুজিতের কোন সাড়া পাইনি। পিটস্বার্গ থেকে ভ্রমণ করে আসার পরদিন সকালবেলা নিজেদের এপার্টমেন্টের ল্যান্ডলাইনে একটি ফোন আসে। আমার ছেলের বৌ সোনা ফোন রিসিভ করে আমাকে বলে, - বাবা দেখ তোমার ফোন এসেছে। আমি চটজলদি উঠে গিয়ে ফোনের রিসিভারটা ওর হাত থেকে নিয়ে কানে লাগাই। হ্যালো বলতেই অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসা শব্দমালা কানে বাজে। শুনতে পাই-কি তারে বা, কবে এইদেশে আইলায়। কথাগুলো যে কৃপাংশুর মুখনিঃসৃত সেটা বুঝতে আমার একটুও অসুবিধা হয়নি। মনটা আনন্দে ভরে উঠে। আমি সাথে সাথে বলি, - কৃপাংশু আমি বেশ কিছুদিন ধরে তোমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি।
-
হ্যা, সুজিত আমাকে তাই বলল। আচ্ছা বলো কেমন আছো।
-
ভালোই আছি, আমরা পিটস্বার্গ গিয়েছিলাম। গত রাত্রে ফিরে এসেছি।
-আরে, তাহলেতো আমাদের কাছেই এসে গিয়েছিলে। আর ঘন্টা চারেক ড্রাইভ করলে আমাদের বাড়ির দোরগড়ায় এসে পৌঁছে যেতে। আচ্ছা বলো আর সব খবর বার্তা।
-এইতো তিনমাস হলো এখানে এসেছি। আর তিন মাস পর নাতিটা পাঁচ ছ মাসের হলেই দেশে ফিরে যাবো। ভিসার মেয়াদ ও তখন শেষ হয়ে আসবে।
-হ্যাঁ, প্রবাসী ভারতীয় ছেলে মেয়েদের নূতন প্রজন্মের নূতন মুখ দেখার সময়টাতেই দেশ থেকে তাদের মা বাবারা এখানে আসেন। আচ্ছা যাক, তোমাদের দেশে ফিরে যাওয়ার আরও যখন তিন মাস সময় রয়েছে, তাহলে আমাদেরকে একবার দেখে যেয়ো।
প্রত্যুত্তরে কি বলব আমি ভেবে পাই না। কারণ মিসিগান ষ্টেটে আমার বসবাসের জায়গা থেকে ওর বাড়ির দূরত্ব হাজার মাইলেরও বেশি হবে। আমার পক্ষে এত দূরত্ব পাড়ি দিয়ে ওদেরকে দেখতে যাওয়া সহজ নয়। তাই বলি,
-তোমাদেরকে দেখতে তো খুবই ইচ্ছা হয় তবে সেটাকি সম্ভব হবে?
-আরে, ইচ্ছা থাকলেই হবে। কবে আসছ এখনই ঠিক করে ইমেইল কিংবা ম্যাসেজ পাঠিয়ে দিও।
-এখন থেকেতো তোমার সাথে প্রায়ই ফোনে কথা হবে। দেখা যাক কি হয়।
কৃপাংশু বলে - ও কে, বাই।
কৃপাংশুর ওখানে যাওয়ার এই আমন্ত্রণ পাওয়ার পূর্বে বাবলুর নিকট থেকেও ওদের বাড়িতে যাওয়ার আমন্ত্রণ ছিল। বাবলু হলো আমার স্ত্রী রুবির জেঠতুতো ভাই। বয়সে ছ সাত বছরের ছোট। প্রায় দু দশক পূর্বে বাংলাদেশের হবিগঞ্জ শহর থেকে ও নিউইয়র্কে চলে আসে। বর্তমানে নিউইয়র্কের নাগরিক এবং স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মী।
বাবলুর আমন্ত্রণে আমার স্ত্রী নষ্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়। ছোটবেলার দেশ বাড়ির স্মৃতি এবং বাবলুর বালক বয়সের চাঁদমুখ তার চোখের পর্দায় বার বার ভেসে উঠে। ওকে স্বচক্ষে দেখতে তার খুব ইচ্ছা হয়। আমি তখন ওকে পাত্তা দেইনি। কিন্তু কৃপাংশুর আমন্ত্রণ পেয়ে আমিও যেন কেমন হয়ে যাই। মনে মনে ভাবি নিউইয়র্কে ওদের ওখানে যেতে পারলে তো ভালোই হয়।
কৃপাংশুর সাথে ফোনে বার্তালাপের বিষয়বস্তু আমার ছেলের বৌ সোনা কিছুটা আঁচ করতে পেরেছে। কৃপাংশুর সাথে বার্তালাপের পর ফোনটা রেখে আমি সোফায় গা এলিয়ে বসি। ছেলের বৌ সোনা আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। সে বলে- বাবা, এখান থেকে ডেট্রয়টে গিয়ে আপনাদেরকে প্লেইনে উঠিয়ে দিলে নিউইয়র্কের এয়ারপোর্টে বাবলু মামা রিসিভ করবেন। তারপর বাবলু মামাইতো আপনাদেরকে গাইড করে নিয়ে যাবে। ফিরার পথেও বাবলু মামা এয়ারপোর্টে আপনাদেরকে পৌঁছে দেবে। তারপর ডেট্রয়েট থেকে আমরা গিয়ে নিয়ে আসবো। কোন অসুবিধা হবে না। আপনারা নিউইয়র্ক গিয়ে বাবলু মামা এবং আপনার বন্ধুদেরকে দেখে আসুন।
সোনার প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে আমি হ্যাঁ কিংবা না কিছুই বলিনি। আরেকদিন বাবলু যখন তার বড়দির সাথে ফোনে বার্তালাপ করে তখন আমার ছেলে অশোকতরু তার মায়ের হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে মামাকে বলে, মামা, আমি মা এবং বাবাকে এয়ারের টিকিট কেটে তোমাদের ওখানে পাঠাচ্ছি। বাবাতো এখানকার চলাফেরাতে এখনও ভালো ভাবে রপ্ত হয়নি, তুমি নিজেই এয়ারপোর্টে এসে ওদেরকে নিয়ে যেয়ো। তারপর মামা ভাগ্নে আরো কিছু সময় নিজেদের মধ্যে আলাপ করে। তখন ওদের মধ্যে কি কথাবার্তা চলে তা বুঝতে পারিনি, কেবল দেখেই যাই। তবে মনে মনে ভাবি, অনেকদিন না দেখা আপনজনদের সঙ্গ পাওয়া এবং নিউইয়র্ক ও নিউজার্সির মত ঐতিহ্যশালী নগর গুলোর যৎসামান্য কিছু দর্শন করার সুযোগ পাওয়া গেলে সেটা উপেক্ষা করা মোটেই সমীচীন হবে না। ওরা যেভাবে বলছে সেরকম সবকিছু হলে আমি এবং আমার স্ত্রী দুজন নিউইয়র্ক গিয়ে তিন চারদিন থেকে স্বজনদের দেখে ফিরে আসতে পারব। আমি আমার ছেলের বৌ এবং ছেলের প্রস্তাব মতো নিউইয়র্ক ঘুরে আসতে সম্মতি প্রদান করি।
দুতিন দিনের মধ্যেই ডেট্রয়েট থেকে নিউইয়র্ক যাওয়া আসার এয়ার টিকিট কাটা হয়। শুক্রবার সকালবেলা ৯ ঘটিকায় আববার্ণ হিলসের বাড়ি থেকে অশোকতরু তার নিজের গাড়ি ড্রাইভ করে আমাদেরকে ডিটি ডব্লিউ এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেবে এবং সেখান থেকে ছোট্ট আমেরিকান জেট বিমানে চেপে নিউইয়র্কে লা গার্ডিয়া এয়ারপোর্টে অবতরণের পর দুপুর বেলা এয়ারপোর্টের এক্সিট এর মুখেই বাবলু আমাদেরকে রিসিভ করবে। তারপর নিউইয়র্কে তিনদিন ঘুরাঘুরির পর সোমবার সকালবেলা লা-গার্ডিয়া এয়ারপোর্ট থেকে বিমানে চেপে ডেট্রয়েটে ফিরে আসব। তখন অশোকতরু আমাদেরকে ডেট্রয়েট এয়ারপোর্টে রিসিভ করে বাড়িতে নিয়ে আসবে।
‘শুক্রবার দিন সকাল ৯ ঘটিকাতেই শ্রীমান অশোকতরু আমাদেরকে নিয়ে গাড়ি ড্রাইভ করে রওয়ানা দেয় ডেট্রয়েট ডিটি ডব্লিউ ইন্টারন্যাশনেল এয়ারপোর্টে। ডমেস্টিক ফ্লাইটের জন্য আমাদেরকে এয়ারপোর্টের স্মিথ টারমিনালে যেতে হয়। সেখানে লাউঞ্জের প্রবেশ পথেই অশোকতরুর সাথে আমাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। অন্যান্য যাত্রীদেরকে অনুসরণ করে চলে যাই চেক ইন কাউন্টারে। সেখান থেকে বোর্ডিং পাশ সংগ্রহ করার পরই সিকিউরিটি চেকিং এর পালা। যাত্রীদের পিছু পিছু আমার স্ত্রী এবং আমি ধীরে ধীরে এগোই। সিকিউরিটি চেকিং এর প্রবেশ পথে পরিষেবা কর্মী একজন কালো রমনী আমার স্ত্রীকে আটকে দেয়। আটকানোর কারণ কি আমার স্ত্রী এবং আমি দুজনেই বুঝে উঠতে পারি না। আমরা ইংরেজিতে কিছু বললে ওরা প্রত্যুত্তরে কি বলছে ঠিক বোধগম্য হয়না। মহাফাপড়ে পড়ে যাই। আগেও লক্ষ্য করেছি, স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কোন কিছু আলাপ আলোচনার সময় ওরা যে ভঙ্গিমায় ইংরেজি শব্দমালা ব্যবহার করে তা আমি মোটেই অনুধাবন করতে পারি না। এজন্যেই ওদের সাথে বার্তালাপে সমর্থ সঙ্গী ছাড়া বাইরে বেরুতে আমার অনীহা। যাহোক, বেশ কিছুক্ষণ পর আরও সব সহযাত্রীদের ঈশারায় বুঝতে পারি চেকিং কাউন্টারের অভ্যন্তরে প্রবেশ পূর্বে আমার স্ত্রীর হাতের চুড়ি এবং শাখা খুলে নিতে হবে। লাইন থেকে বের হয়ে হাতের চুড়িগুলো চট জলদি খুলতে পারলেও অনেক টানা টানি করে শাখা হাত থেকে বের করে আনা সম্ভব হয়নি। অগত্যা উদ্ভূত সমস্যা নিরসনে আরেকজন ঊর্ধ্বতন পরিষেবা কর্মীকে ডাকা হয় এবং পরিশেষে তার অনুসন্ধান এবং পরীক্ষা নিরীক্ষার পর হাত থেকে শাখা বের না করেই আমাদেরকে বিমানে উঠার জন্য এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পূর্বে সিকিউরিটি চেকিংএ বিমান পরিষেবা কর্মীদের ভূমিকা কিছু সময়ের জন্য মনে যে ভীতি ও আশঙ্কার সঞ্চার হয়ে বিবশের পর্যায়ে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিল সেটা স্তব্ধ হয়ে যায়। সহযাত্রীদের অনুগামী হয়ে বিমানের নির্দ্ধারিত আসনে বসে স্বস্তি বোধ করি। পরিষেবা কর্মী কালো দশাসই রমনী কর্তৃক আমার স্ত্রীর হাত থেকে শাখা খুলে নেওয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টার দৃশ্যপট মনের পর্দায় ভেসে ওঠে। তবে এখন এ দৃশ্যপট মনে আশঙ্কা ও ভীতি সঞ্চারের পরিবর্তে মুখমণ্ডলে হাসির আভাই ফুটে উঠে। নিউইয়র্ক যাত্রার প্রথম পর্বের এই ঘটনা মনের স্মৃতি কোঠায় ভবিষ্যতের জন্য আনন্দের খোরাক হয়েই সঞ্চিত থাকে।
ডেট্রয়েট এয়ার পোর্ট থেকে বিমান সকাল সাড়ে এগারোটার সময়ই টেইক অফ করে। আকাশে প্রায় সোয়া ঘন্টা বিহারের পর লা গার্ডিয়া বিমান বন্দরে অবতরণ করে। বিমান থেকে বের হয়ে এবারও আমরা অন্যান্য সহযাত্রীদের অনুসরণ করে বর্হিপথের দিকে এগোতে থাকি। যেতে যেতে পকেট থেকে মোবাইল বের করে বাবলুকে ফোন করি। বাবলু কল রিসিভ করে সাথে সাথেই বলে,- ভানুদা, আমি এক্সিট গেইটের সামনেই তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছি। সোজা চলে এসো। আমি ঠিক আছে বলেই মোবাইলটা পকেটে রেখে মনের আনন্দে পা ফেলি। মিনিট পাঁচ সাতেক হাটার পর বর্হিপথ দিয়ে বেরিয়ে দেখি সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে বাবলু আমাদেরকে দেখে হাত নাড়াচ্ছে।
আমরা হাটার গতিবেগ বৃদ্ধি করে অল্প সময়ের মধ্যেই ওর নিকটে পৌঁছে যাই। ওকে পেয়ে মনের সাহস এবং শরীরের শক্তি অনেক বেড়ে যায়। মনে হয় অথৈ জলে যেন ঠাই পেয়ে গেলাম। পৃথিবীর অনন্য শক্তিধর ও ধনী দেশ আমেরিকার প্রধান শহর নিউইয়র্কের অন্যতম এয়ারপোর্ট লা গার্ডিয়ার বহির্পথে স্বজনকে পেয়ে সকল দুশ্চিন্তা এবং আশঙ্কা দূরীভূত হয়। এখন এখানে চলতে ফিরতে আর অসুবিধা হবে না। বাবলু আমার ও তার দিদির হাত থেকে ছোট দুটো ব্যাগ নিয়ে হাটা শুরু করে এবং আমাদেরকে ওর সাথে এগিয়ে যেতে বলে। আমরা ওকে অনুসরণ করে হাটতে থাকি।
মিনিট পনেরোর মত সময় হাটতে হাটতে এয়ারপোের্ট এলাকার সীমানা পার হয়ে প্রশস্ত শান বাঁধানো রাস্তার পাশে একটা জায়গাতে দাঁড়াই। দু তিন মিনিট পর ঐ জায়গাতেই একটি সুরম্য বড় বাস এসে দাঁড়ায়। বাবলুর পিছু পিছু এগিয়ে আমরা বাসটাতে উঠে পড়ি। আকারে বাসটি বেশ বড় হলেও যাত্রী সংখ্যা খুবই কম। আমাদের তিনজনকে নিয়ে সাকুল্যে আটজন। বাসে ওঠে বসার সাথে সাথেই গাড়ি স্টার্ট দেয়। গাড়ি এয়ারপোর্ট এলাকা ছেড়ে বড় রাস্তায় এসে মিলে যায়। গাড়ি গতিবেগ বাড়িয়ে চলতে থাকে। চলন্ত বাস থেকে দ্রুত দৃষ্টির অগোচরে চলে যাওয়া সুন্দর সুন্দর ঘরবাড়িগুলো দেখতে বেশ ভালোই লাগে। বেশ কিছু সময় চলার পর রাস্তার দিকে মুখ করে একটা অট্টালিকার দিকে তাকাতেই দেখি ইংরাজিতে লেখা রয়েছে রোজভেল্ট এভিনিউ। অর্থাৎ লা গার্ডিয়া এয়ারপোের্ট থেকে বেরিয়ে এখন যে রাস্তা ধরে এগিয়ে চলছি সেটার নামই হলো রোজভেল্ট এভিনিউ। রোজভেল্ট এভিনিউ দিয়ে এগিয়ে যে জায়গাতে বাস থামার পর বাবলু আমাদেরকে নেমে যেতে ইঙ্গিত করে সে এলাকাটার নাম হলো জ্যাকসন হাইট।
বাস থেকে নেমে বাবলু হাটতে থাকে। আমরাও ওর পাশাপাশি চলছি। চলার পথে আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি বড় বড় সুদৃশ্য আকাশ চুম্বী অট্টালিকা নজরে পড়ছে না। আমেরিকান মেম সাহেবদেরও চলাফেরা নেই। দৃশ্যমান সবকিছুতেই যেন আমাদের স্বদেশী গন্ধের আভাস পাই। বাংলাদেশীদের রেস্তরা এবং ভারতীয়দের রকমারি জিনিসের দোকান ঘিরে ক্রেতা বিক্রেতাদের সমাহারে মনে হয় যেন আমাদের দেশেরই কোন এক জায়গায় এসেছি।
বাবলু আমাদেরকে নিয়ে একটা রেস্তরায় ঢুকে। সকালবেলা বাড়ি থেকে খাওয়া দাওয়া করে বেরিয়েছিলাম। এখন বাজে প্রায় তিনটা। স্বাভাবিক কারণেই ক্ষুধা নিবৃত্তির ব্যবস্থা করতে হয়। আমাদের সহমতেই বাবলু পরটা ঘুগনী ও চায়ের অর্ডার দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি ছিপছিপে শ্যামলা কিশোরী ট্রেতে সাজিয়ে খাবার এনে আমাদের সামনে টেবিলের উপর রাখে। আমেরিকার খোদ নিউইয়র্ক শহরেই একটি জনবহুল বসতিতে রেস্তরায় এধরণের কর্মী প্রথমে দেখে আমার বেমানান ঠেকে। আমি মেয়েটির দিকে ভালো করে তাকাই। ওর বেশ ভূষা এবং চালচলনে মনে হলো ও নিশ্চয়ই পূব বাংলার কোন এক গায়ের কিশোরী সম্প্রতি এদেশে এসেছে। এখনো এখানকার আলো হাওয়া রোদে নিজেকে পুরোপুরি রপ্ত করে নিতে পারেনি। ওর সাথে আলাপ করার লোভ আমি সামলাতে পারিনি। কিছুক্ষণ অপলক ওরদিকে তাকিয়ে থাকার পর আমি বলি, - কি রে মা, তুমি এখানে কদিন ধরে কাজ করছো। মেয়েটি আমার মুখে পূর্ব বঙ্গীয় কণ্ঠস্বর শুনে বেশ আনন্দই পায়। সেও হাসিমুখে তার দেশীয় কণ্ঠস্বরে বলে, - এক বছরের ও বেশি হইব আমি এখানে কাজ করছি। তারপর আমি আবার জিজ্ঞেস করি, - তা তোমার বাড়ি কোথায় ছিল?
এ প্রশ্নের উত্তর সে আগের মত সহাস্যে চটজলদি দেয়নি। আমি আকার ইঙ্গিতে পূর্ব প্রশ্নের উত্তর জানতে চাওয়ায় সে আমাদের সামনে থেকে যেতে যেতে বলে - দাউদপুরে।
কথা বলার কণ্ঠস্বর এবং চলে যাওয়ার ভঙ্গিমা দেখে ওর সম্পর্কে আরো কিছু জানার কৌতুহল দমে যায়, অবশ্যি এধরণের প্রশ্ন স্থান বিশেষে নানা রকম ব্যক্তির নানা রকম প্রতিক্রিয়া হওয়াই স্বাভাবিক। বিদেশ বিভুইয়ে বসবাস, কোন ক্যাটাগরির ভিসায় এদেশে এসেছে তার ম্যায়াদ কতদিন আছে কিংবা সে এখানে আইন মোতাবেক আদৌ কোন কাজ করার অধিকারী কি না ইত্যাদি নানা বিষয়ে নানা হ্যাপা আছে। কাজেই এ ধরণের প্রশ্ন একজন স্বাভাবিক ভাবেই এড়িয়ে যেতে পারে এবং কেবলমাত্র নিজের কৌতুহল নিবারণের নিমিত্তে কেহই এরকম প্রশ্ন অপরিচিত ব্যক্তিকে করা ঠিক নয় ভেবে নিজেই লজ্জা পাই। সে যাই হোক ঘুগনী পরটা এবং চায়ের মাধ্যমে আমাদের দ্বি প্রাহরিক আহার পর্ব নিউইয়র্ক শহরের জ্যাকসন হাইটে পূর্ব বাংলার বাঙ্গালী মুসলমান পরিচালিত রেস্তরায় বসে বসে সমাধা হয়। আহার পর্ব চুকে যাওয়ার পর রেস্তরা থেকে বের হয়ে সামান্য পথ হেটেই চলে যাই অনতিদূরে অবস্থিত জ্যাকসন হাইট সাবওয়ে ষ্টেশনে। সাবওয়ে হলো ভূপৃষ্ঠের নিচে সুড়ঙ্গ পথে নিউইয়র্ক শহরে যাত্রী চলাচলের রেল পরিষেবা।
সাবওয়ে ষ্টেশনের ভিতর প্রবেশ করে অবাক হয়ে যাই। এত সময় জ্যাকসন হাইটের রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি এবং লোকজন যেমনটি দেখেছি তার সাথে সাবওয়ে ষ্টেশনের অভ্যন্তরের কোন কিছুতেই বিন্দুমাত্র মিল নেই। সাবওয়ে স্টেশনের ভিতর সব কিছুতেই আধুনিক প্রযুক্তির বিস্ময়কর বহিঃপ্রকাশ। আলোকোজ্জ্বল বিস্তৃত এলাকাজুড়ে রেল যাতায়াতের ট্র্যাক, বড় প্ল্যাটফর্ম, প্ল্যাটফর্মের পাশেই রকমারি বিপণন কেন্দ্র। দেখতে খুবই সুন্দর এবং মনোমুগ্ধকর। ট্রেইন আসছে, থামছে এবং চলে যাচ্ছে। লোকজনের ভিড় রয়েছে তবে ঠেলাধাক্কা কিংবা অসংলগ্ন কোন কিছু নজরে পড়েনি। আমেরিকান মেম সাহেবের উপস্থিতিও লক্ষ্যণীয়।
মিনিট দশেক পর আমাদের প্ল্যাটফর্মের সামনে রেল ট্র্যাকে একটি গাড়ি এসে থামে। থামার সঙ্গে সঙ্গেই কিছু যাত্রী গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। বাবলু আমাদেরকে এই গাড়িতে ওঠার নির্দেশ দেয়। সে নিজেও খুব সতর্কতার সহিত আমাদেরকে নজরে রেখে পিছু পিছু আসে। আমরা অনায়াসেই গাড়িতে ওঠি। গাড়ির কামড়া বেশ বড়। তবে কামড়া ভর্তি লোকজন নেই। সামনেই খালি আসন পেয়ে বসে পড়ি। আমাদের বিপরীতে গাড়ির আসনে কয়েকজন মেম সাহেব রয়েছেন। বেশ কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে কামড়ার এক কোনে পাঁচটা কালো কিশোর চুপচাপ বসে রয়েছে। সামান্য সময় অতিবাহিত হওয়ার পর গাড়ি চলতে শুরু করে।
চলন্ত গাড়িতে বসে বসে আমরা কেবল গাড়ির ভিতরের লোকজনদেরকেই দেখতে পাই। কারণ গাড়ি চলে মাটির নিচে সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে। বাইরের প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী দেখার কোন উপায় নেই। তাই আমরা নিজেদের মধ্যেই নিজেদের ভাষায় আলাপ করে যাই। বাবলু তার দিদিকে বলে- বড়দি আমরা আর পয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যেই বাড়িতে পৌঁছে যাবো। মাঝপথে সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে ভূপৃষ্ঠে ওঠে গাড়ি কিছু সময় চলবে। আবার সুড়ঙ্গে ডুব দিবে। তারপর আবার সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে চলতে চলতে ভূপৃষ্ঠে উঠে আসবে এবং আমাদের গন্তব্যস্থল ফার রক এওয়ে নামক জায়গায় যাবো।
সময় এগিয়ে চলার সাথে সাথে আমাদের গাড়ি ও এগিয়ে চলে। এক ষ্টেশন থেকে অন্য ষ্টেশনে যাওয়ার পর কামড়ার মেম সাহেবরাও এক এক করে সব নেমে পড়ে। গাড়িতে কেবল আমরা তিনজন এবং বাকী পাঁচজন কালো কিশোর। জ্যাকসন হাইটের সাবওয়ে ষ্টেশনে গাড়িতে ওঠেই কামড়ার এক কোনে নিগ্রো কিশোরগুলোকে নিশ্চুপ বসে থাকতে দেখেছিলাম। ওদেরকে এভাবে বসে থাকতে দেখে ভালো লাগেনি। মনে হচ্ছিল ওদের যেন সাদা চামড়ার যাত্রীদের মত সাবওয়ের রেলে যাতায়াত করার সামাজিক অধিকার নেই। তাই ওরা মেমসাহেব থেকে দূরত্ব বজায় রেখে নিজেদের গন্তব্যস্থলে যাওয়ার জন্য কামড়ার এককোণে একত্রে চুপচাপ বসে রয়েছে। কিন্তু এখন ওরা আর চুপচাপ নেই। নিজেদের ভাষায় কথা বলছে। কি বলছে সেটা বোধগম্য না হলেও ওদের গলার আওয়াজ এবং প্রকাশ ভঙ্গি মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। গাড়ি যতই গন্তব্যস্থলের দিকে এগোচ্ছে ওদের গলার আওয়াজ বাড়ছে এবং মাঝে মাঝে ওরা নিজেদের মধ্যে ঠেলাধাক্কা করছে। ওদের এরকম আচরণ দেখে আমি অস্বস্তি বোধ করি। বাবলুকে নিচু স্বরে আমার মনোভাব ব্যক্ত করি। বাবলু দীর্ঘদিন ধরে ফার রক এওয়ের বাসিন্দা। ওর বাসগৃহের চার পাশেই কালো আদমীদের বসবাস। ওদের আচার ব্যবহার সম্বন্ধে বাবলু ওয়াকিবহাল। সে আমাকে বলে, - ওরা এরকমই, বাড়ি ফেরার পথে নিজেদের মধ্যে আনন্দ ভাগ বাটোয়ারা করে নিচ্ছে। আমাদের ভয় পাওয়ার কিছু নাই। বাবলুর কথা শুনে আশ্বস্ত হই। গাড়ি চলতে থাকে। কামড়ার সহযাত্রী পাঁচটি কিশোরের আচরণকে কেন্দ্র করে কালো আদমীদের প্রসঙ্গ মন জুড়ে বসে। গেলো কিছুদিন পূর্বে আববার্ণ হিলসের এডামস্ ক্রীক এপার্টমেন্টেই জন হাওয়ার্ড গ্রিফিনের “ব্ল্যাক লাইক মি” বইটি পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। জন হাওয়ার্ড গ্রিফিন ছিলেন অনেক গুণ সম্পন্ন এবং কালো মানুষের অধিকার রক্ষার প্রবক্তা এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব। তিনি ফ্রান্স প্রতিরোধ যুদ্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণ উপকূল ভাগে সেনা এবং বিমান বাহিনীতে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী জীবনে বিশিষ্ট উপন্যাসিক ও প্রবন্ধকার হিসাবে তার খ্যাতি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। আমেরিকার বর্ণ বিদ্বেষী সাদা চামড়ার মেম সাহেব কর্তৃক কালো নিগ্রোদের প্রতি নির্মম আচরণের স্বরূপ উপলব্ধির জন্য তিনি তাঁর নিজের শরীরকে কালোতে রূপান্তরিত করেন এবং স্ত্রী কন্যা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মতামতকে উপেক্ষা করে ১৯৫৯ ইংরাজির ২৮ অক্টোবর রাত্রিতে নিজের পরিচয় গোপন রেখে একজন নিগ্রো হিসাবে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন। তিনি প্রথমেই দক্ষিণের ওরলীনস্ শহরে যান। তারপর টেক্সাসের মিসিসিপি এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চলে ঘুরাঘুরি করেন। অবশেষে ১৫ ডিসেম্বর তারিখে তার পৈত্রিক বাড়ি টেক্সাসের মানস্কিল্ড শহরে ফিরে এসে সাদা চামড়ার জন হাওয়ার্ড গ্রিফিন হিসাবেই জীবনের বাকী দিনগুলো অতিবাহিত করেন। আমেরিকার দক্ষিণ প্রান্তে বর্ণচোরা হয়ে অর্থাৎ কালো আদমী সেজে চলাফেরার সময় নানা দুর্ভোগ ও নিগ্রহের কাহিনী ডাইরীতে নোট করে রাখেন এবং সেই লিপিবদ্ধ কাহিনীকে ভিত্তি করেই তাঁর “ব্ল্যাক লাইক মি” বইটি প্রকাশিত হয়। বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর স্বজাতীয় কট্টর বর্ণ বিদ্বেষীরা জন হাওয়ার্ড গ্রিফিনের বিরুদ্ধে নানা রকম বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন এবং শারীরিক ভাবেও তাঁকে নির্যাতন করেন।
আমেরিকায় ক্রীতদাস হয়ে আসা কালো মানুষের বংশধরদের জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন এবং বর্ণ বৈষম্যে নিগৃহীত না হওয়ার জন্য আব্রাহام লিঙ্কন থেকে মার্টিন কিংলুথার, জন হাওয়ার্ড গ্রিফিন এবং আরো সব নানা সজ্জন ব্যক্তিরা নিজেদের জীবন দিয়ে সংগ্রাম করেছেন। তাঁদের সংগ্রামের ফলশ্রুতিতে কালপ্রবাহে নিগ্রো বাংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের সরকারী উচ্চপদে দায়িত্ব নির্বাহ, রাষ্ট্র পরিচালনায় নীতি নির্ধারণ এবং সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালনের নজির পাওয়া যায়। তবে অধিকাংশ কালো মানুষের বংশোদ্ভুতদের অবস্থার আশানুরূপ পরিবর্তন হয়নি। আমাদের কামড়ার সহযাত্রী পাঁচটি কালো কিশোর অবশ্যই শোষাক্ত কালো মানুষের অনুন্নত উত্তর পুরুষ। তাঁদের আচার আচরণে তাই মনে হয়।
চলন্ত গাড়িতে পাশের আসনে বসা বাবলু এবং তার বড়দির উপস্থিতিকে প্রায় উপেক্ষা করেই কামড়ার সহযাত্রী কালো কিশোরগুলোর আচরণ রক্ষ্য করে আমি কালো মানুষের ভাবনায় নিমগ্ন ছিলাম। ভাবনার জাল বিস্তৃত হয়েই উপরোক্ত বিবৃত কাহিনিগুলো মনে আসে। হয়তবা ভাবনার জড় আরো ছড়িয়ে পড়তো যদি না গাড়ি গন্তব্যস্থলের স্টপেজে এসে থমকে যেতো। গাড়ি থামতেই ভাবনার সূত্র ছিন্ন করে আশে পাশে তাকাই। কালো কিশোরগুলো হুড়মুড়িয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। বাবলু এবং তার বড়দি ও আসন ছেড়ে উঠে। বাবলু আমাকে গাড়ি থেকে নামার ইঙ্গিত দেয়। আমি গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ি। বাবলুকে অনুসরণ করেই গাড়ি থেকে নেমে ষ্টেশনের বাইরে চলে আসি।
খোলা আকাশের নিচে নির্জন বিস্তর মুক্ত এলাকা। সামনে দৃষ্টির গোচরে মানুষ জন নেই। গাড়ি চলাচল নেই। কালো কিশোরগুলো গাড়ি থেকে নেমে কোথায় যে নিমেষে হারিয়ে গেলো বুঝতে পারিনি। পিছনে ফার রক এওয়ের স্টপেজে গাড়ি ঠায় গাঁড়িয়ে আছে। ওটাকে পিছনে ফেলে আমরা দূর যাংলার কোন এক প্রত্যন্ত ষ্টেশনে নেমে পল্লীগায়ের মেঠোপথ ধরে হেটে যাওয়ার মতই নিউইয়র্ক শহরের ফার রক এওয়ের শেষ সাবওয়ে স্টেশন থেকে নেমে শানবাঁধানো রাস্তা দিয়ে কেবলমাত্র তিনজন হাটি হাটি পা পা করে এগোচ্ছি। মিনিট পনেরোর মত সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর আমরা একটা বিশাল বহুতল বিশিষ্ট ইমারতের সামনে এসে দাঁড়াই। সেটা হলো ফার রক এওয়ের চল্লিশতম বীচ স্ট্রীটের চারশো ছাপ্পান্ন নম্বর বাড়ি আর এ বাড়িরই 8BF চিহ্নিত ফ্ল্যাটই হলো বাবলুদের আস্তানা।
বহুতল অট্টালিকাটির বেসমেন্টে সাড়ি বেঁধে পর পর কয়েকটা এলিভেটর রয়েছে। বাবলু তারমধ্যে একটা এলিভেটরের ভিতর আমাদেরকে নিয়ে প্রবেশ করে নয় নম্বর বাটনে চাপ দেয়। এলিভেটর আমাদেরকে নিয়ে নবম তালায় উঠে থমকে দাঁড়ায়। সেখানে দরজা খুলে যাওয়ার পর ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে করিডর দিয়ে সামান্য এগিয়ে গিয়েই আরেকটি দরজার সামনে এসে বাবলু ডোের বেলে চাপ দেয়। অল্প সময়ের ব্যবধানেই দরজা খুলে যায় এবং ঘরের ভিতর থেকে বাবলুর স্ত্রী মনি ও শিশু কন্যা বুসি বাইরে এসে আমাদেরকে সাদরে ঘরের ভিতর নিয়ে যায়। তারপর আমাদের জন্য নির্দ্ধারিত কক্ষে গিয়ে কাপড় পালটে হাত মুখ ধুই এবং শারীরিক ক্লান্তি নিরসনে সোফায় গা এলিয়ে বিশ্রাম করি।
রাতে ডিনারের পর বাবলুর সাথে অনেক কথাবার্তা হয়। সব আলাপই ওর ব্যক্তিগত ও দেশ বাড়ির প্রসঙ্গে। বাংলাদেশে মুক্তি যোদ্ধের কথা, পাক সেনাবাহিনী কর্তৃক নিরীহ গ্রামবাসীদের হত্যা এবং মেয়েদেরকে পাশবিক অত্যাচার করার কাহিনী, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু মুজিব হত্যা এবং তারপর নূতন শাসক গোষ্ঠীর স্থানীয় ক্যাডারদের শ্যোণ দৃষ্টিতে পড়ে হবিগঞ্জ শহরে প্রতিষ্ঠিত নিজের ছাপাখানার মায়া ত্যাগ করে এক বিশেষ সুযোগে আমেরিকায় চলে আসা ইত্যাদি। বাবলুর কথা শুনতে শুনতে অনেক রাত হয়ে যায় এবং আলাপের শেষ পর্বে আমাদের তিন দিনের সফর সুচীর ও একটা ছক ঠিক করা হয়। প্রথম দু’দিন বাবলুর সঙ্গে থেকেই যা কিছু ঘুরাঘুরি করবো। তৃতীয় দিন কৃপাংশুর সঙ্গে কাটিয়ে পরদিন সকাল বেলা ডেট্রয়েটে ফিরে যাবো। এসব কথাবার্তার পরই বিছানায় চলে যাই।
ভোরে অজানা পাখির কাকলি শুনে ঘুম ভেঙ্গে বিছানা ছেড়ে পাশের জানালা খুলে বাইরের দিকে তাকাই। পূব দিগন্তে তখন রক্তিম আভা ছড়িয়ে আছে। আমাদের আধাসনের সরাসরি সামান্য দূরে একটি জলাশয় অট্টালিকার বিপরীতে চলাফেরার রাস্তার প্রায় কিনারায় এসে মিশেছে। আর রাস্তার উপরই বড় কবুতরের মত পাখিরা এসে জটলা বেঁধে কলরব করছে। অনেকটা এই আকৃতির পাখিই আমি দেশে ত্রিবেনী সঙ্গমে যমুনা নদীর জলে ভাসতে দেখেছি। তবে এই পাখিগুলো ওদেরই সমগোত্রীয় কিনা বুঝতে পারিনি।
কিছুক্ষণ পরই সূর্য উঁকি দেয়। রোেদ ওঠার সাথে সাথেই পুবাকাশের রক্তিম আভা বিলীন হয়ে যায়। পাখিগুলোও আকাশে উড়ে দৃষ্টির অগোচরে চলে যায়। হঠাৎ একটা শব্দ পেয়ে উত্তর পুবদিকে তাকিয়ে দেখি অনতিদূরে বিমানের ওঠানামা। সেখানেই রয়েছে নিউইয়র্ক শহরের জন ফিটজারেল্ড কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর। একটা বিমান দূর থেকে এসে ধীরে ধীরে গুত্তা মেরে এয়ার ফিল্ডে অবতরণ করছে। আবার সামান্য সময়ের ব্যবধানেই আরেকটি বিমান বিকট শব্দ করে আকাশের বুক চিড়ে নিমেষে হারিয়ে যাচ্ছে। বিমানের ওঠানামার দৃশ্য থেকে চোখ সরিয়ে এনে ডানে দক্ষিণ-পুব দিকে তাকাতেই দেখি দূরে বিস্তর এলাকাজুড়ে রয়েছে অথৈ জলরাশি। আটলান্টিক মহাসাগরের ব্যাক ওয়াটারে সূর্যালোক পড়ে জলের উপরিভাগ চিক চিক করছে। আমি একা একাই জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরের এসব দৃশ্যাবলী মনের পর্দায় ডাউন লোড করে নিচ্ছিলাম। এমতাবস্থাতেই কিছুক্ষণ পর বাবলুর ছোট কন্যা বুসি এসে আমাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় পাশের কোঠায় সকালের চা পানের জন্যে।
সকালবেলা চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে দৈনিক খবরের কাগজে চোখ বুলানো আমার দীর্ঘ দিনের অভ্যাস। পৃথিবীর সকল ভাষাভাষী আমাদের মত লোকদের এ অভ্যাসটা কমবেশি আছে বলে আমার ধারণা। আর এ অভ্যাসের বশেই আমি চায়ের পেয়ালা হাতে নিয়ে টেবিলের অপর প্রান্তে বসা বাবলুকে বলি- তোমার এখানে দৈনিক খবরের কাগজ আছে কি?
বাবলু আমার এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতে গিয়ে ইতস্ততঃ করে। সে কিছু না বলে পাশের ঘর থেকে দুটো বাংলা সাপ্তাহিক সংবাদপত্র এনে আমার সামনে টেবিলের উপর রাখে। সাপ্তাহিক সংবাদপত্র দুটোর বহিরাবরণ দেখে আমি অবাক হই। পত্রিকা দুটোর আকৃতি আমাদের দেশে প্রকাশিত দৈনিক সংবাদ পত্র গুলোর আকৃতির অর্ধেক হবে। কিন্তু পৃষ্ঠা সংখ্যা দুটোরই শতাধিক। ‘ঠিকানা’ এবং ‘বাংলা পত্রিকা’ নামক দুটো সাপ্তাহিক সংবাদ পত্র খোদ নিউইয়র্ক শহর থেকেই বিগত দু দশকেরও অধিক সময় ধরে প্রকাশিত হয়ে আসছে। ‘ঠিকানা’ পত্রিকাটির প্রকাশক হলো প্রমিথিউস ইন্টার ন্যাশনাল ইনক্ এবং ‘বাংলা পত্রিকা’র প্রকাশক হলো বাংলা পত্রিকা ইনক্। ওগুলোতে বাংলাদেশের পটভূমি নিয়ে রাজনৈতিক প্রবন্ধ, বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতি ও বাংলাদেশের এবং আমেরিকার বাংলাদেশী প্রবাসীদের খবর বার্তা প্রকাশিত হয়ে থাকে। তবে দুটো পত্রিকাই ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের গোষ্ঠী দ্বারাই বোধ হয় পরিচালিত হয়ে থাকে।
আমেরিকাতে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত এ ধরণের সংবাদপত্র দেখে বেশ গর্বই অনুভব করি। তবে এটাও মনে হয় যে, বঙ্কিমচন্দ্র, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রভৃতি মহাপুরুষদের দেশের উত্তরসুরী হয়েও পশ্চিমবঙ্গ এবং ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের বাঙ্গালীরা ভারত থেকে পৃথক হয়ে যাওয়া বাংলাদেশীদের মতো বহির্বিশ্বে বাংলা ভাষার প্রচার প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারছে না।
সে যাই হোক ‘ঠিকানা’ এবং ‘বাংলা পত্রিকা’ নামক সাপ্তাহিক সংবাদ পত্র দুটো সময় কাটানোর খোরাক হয়ে যায়। মনে মনে ভাবি, আজ সারাদিন বাবলুর বাড়িতেই থাকবো। বাইরে যাওয়ার কোন পরিকল্পনা নেই। তাই গল্পগুজব, খাওয়া দাওয়া ছাড়া বাকী সময় পত্রিকা দুটোকে সম্বল করে কাটাতে হবে। তবে প্রাথমিক ভাবে পত্রিকার পাতাগুলো ওলটাতে গিয়ে যে সব নজরে পড়ে তাতে আগ্রহ বেড়ে যায়। পত্রিকার পাতা ওলটিয়ে একের পর এক দেখি নিউইয়র্ক শহরের এস্টেরিয়ায় পি এস ১১২ স্কুল অডিটরিয়ামে হবিগঞ্জ জেলা কল্যাণ সমিতির ঈদ পুনর্মিলনী সভা, ২১০ স্ট্রীট এভিনিউ ম্যানহাটানে ছাতক সমিতির ঈদ পুনর্মিলনী ও বনভোজন অনুষ্ঠান, এস্টেরিয়ার ৩১ এভিনিউস্থ আই এস দশ স্কুলের অডিটোরিয়মে মৌলভী বাজার ডিস্ট্রিক্ট এসোসিয়েশনের ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান এবং নবীগঞ্জ মানব কল্যাণ সমিতির এস্টোরিয়ার ২৪ স্ট্রীট অধিবাসীদের উদ্যোগে ২০০জন প্রবাসীর ওয়েসচেষ্টার কাউন্টির জর্জ আইল্যান্ডে বনভোজন ও মিলনমেলা প্রভৃতির খবর। পাতা ওলটাতে ওলটাতে আরো দেখতে পাই ওজন পার্কে জ্যামে মসজিদে কুলাউড়া সোসাইটির শোক ও দোয়া মহফিল, জ্যাকসন হাইটের একটি রেষ্টুরেন্টে ঢাকা জেলা এসোসিয়েশনের আত্মপ্রকাশ, ৭৩ স্ট্রীট জ্যাকসন হাইটে জালালাবাদ এসোসিয়েশনের সাহিত্য সভা, কুমিল্লা সোসাইটি অব নর্থ আমেরিকা ইন্ক এর সভা এবং নিউইয়র্ক বাংলাদেশ পূজা সমিতির ২১তম শারদীয়া দুর্গোৎসব পালনের খবর। খবরগুলো পাঠ করে আনন্দিত হই আবার দুঃখও পাই।
আনন্দিত হই এই কারণে যে কুলাউড়া, হবিগঞ্জ, মৌলভী বাজার, ছাতক, নবীগঞ্জ এবং জালালাবাদ প্রভৃতি নামের জায়গাগুলোর সাথে আমার এবং আমার পূর্বজদের নাড়ীর সম্পর্ক রয়েছে। এ সব জায়গাগুলিতেই আমাদের নিজের বাড়ি, মামার বাড়ি, পিসীর বাড়ি এবং মাসীদের বাড়ি ছিল আর সেগুলোর নাম শুনলেই মনে এক বিশেষ আনন্দের স্পন্দন হয়। আর দুঃখ পাই এই ভেবে যে, কংগ্রেস ও মুসলীমলীগের নেতৃস্থানীয়দের নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা এবং অদূরদর্শিতায় ধর্মভিত্তিক দেশ বিভাজনের ফলে সে সব জায়গা থেকে আমাদের বাস্তহারা হতে হলো। বর্তমানে সেসব জায়গা ভৌগলিক ভাবে আমাদের বাসস্থানের অতি নিকটে থাকা সত্বেও বাস্তবে মনের দিক থেকে দুরের অনতিক্রম্য বিদেশ বলেই বিবেচ্য হয়ে থাকে।
আনন্দ ও দুঃখ নিয়ে মনে ভাবনার জড় হয়তোবা আরো বিস্তৃত হতো, কিন্তু হঠাৎ বাবলুর আবির্ভাবে সেটা থিতু হয়ে যায়। বাবলু আমার সামনে এসে বলে,-চল ভানুদা, তোমাকে আমার বাগান দেখাবো। ওর কথাশুনে আমি ভাবি, বিশাল এলাকাজুড়ে অট্টালিকাগুলোতে না হলেও শতাধিক পরিবারের আবাস। এখানে আশেপাশে কোথায় সেই জমিন যেখানে ওর বাগান রয়েছে। তাই আমি ওকে জিজ্ঞেস করি, - কোথায় তোমার বাগান?
সে আমার হাত ধরে টেনে বলে, চলো না আমার সঙ্গে, দেখবে এসো। ওর সাথে ঘরের বাইরে করিডর দিয়ে কিছু এগিয়ে এলিভেটরের সাহায্যে নিচে নেমে যাই। সেখান থেকে প্রায় পঞ্চাশ মিটার দূরত্ব পায়ে হেটে গিয়ে দেখি বেশ কিছুটা জায়গা তারের বেড়া দিয়ে ঘেরা এবং তাতে একটা গেইট আছে। বাবলু গেইটটা খুলে আমাকে নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। সেখানে কয়েকটা টমেটোর চাড়া, বেগুন চাড়া, কাঁচা মরিচের গাছ এবং নালিতা পাতার গাছ রয়েছে। বাবলু নালিতা গাছ থেকে পাতা সহ গুটি কয়েক ডগা ভেঙ্গে নেয় এবং বলে, - আজ তোমাকে নাইল্যা পাতার বড়া খাওয়াবো।
তারের বেড়া দেওয়া একখণ্ড সবুজ জমিনের ভেতর আমি আর বাবলু। আমি ওর বাগান নিরীক্ষণ করার পর চারদিকে চোখ বুলিয়ে নেই। পাশে কয়েকটা বহুতল ফ্ল্যাট বাড়ি, মাথার উপর নীল আকাশ আর সামান্য দূরে উত্তর পূব কোণায় জে, এফ, কে আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে উড়ো জাহাজ একের পর এক উঠা নামা করছে। কিন্তু কোথাও কোন মানুষ জন নজরে পড়ে না। যানবাহনের ও চলাচল নেই। নিউইয়র্ক শহরের ফার রক এওয়ের চল্লিশতম বীচ রোডে বহুতল আবাসনের পাশে একখণ্ড সবুজ জমিনের উপর দাঁড়িয়ে আছে কেবল পূব বাংলার বংশজ ষাটোর্দ্ধ দুই বাঙ্গাল। একজনের হাতে এক গুচ্ছ নালিতা পাতা, অন্যজন তার দিকে তাকিয়ে এবং দুজনই নির্বাক।
দেশ থেকে আমেরিকায় পাড়ি দেওয়ার প্রস্তুতিপর্বে ঠাট্টা তামাশার সম্পর্ক যুক্ত দুয়েকজন বন্ধুর বিশেষ পরামর্শ ছিলো বিদেশের সাহেবী খানাপিনার রস আস্বাদন এবং লাসভেগাসের মত শহরগুলোর নিশুতি রাতের ক্যাসিনোতে সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফেরা। বন্ধুদের পরামর্শ মত অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফেরা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না তখনই ব্যক্ত করেছিলাম। তবে খানাপিনার ব্যাপারে ম্যাকডোনাল্ডের বার্গার, চিকেন নাগেট এবং কেনটাকি ফ্রাইড চিকেন (KFC) প্রভৃতি বারকয়েক খেয়েছি। কিন্তু নিউইয়র্ক শহরে শ্যালকের বাড়িতে দ্বি প্রাহরিক আহারে প্রধান আইটেম নাইল্যা পাতার বড়ার খবরটা বন্ধুরা জানতে পারলে সহজভাবে নিবে না। খবরটাকে ভিত্তি করে ওদের টিটকারি আমাকে নানাভাবে নাজেহাল করবে। তবে আমি নিজে কিন্তু নাইল্যা পাতার বড়া দিয়ে তৃপ্তিতেই উদরপূর্তি করি এবং আমেরিকার খাসতালুক নিউইয়র্ক শহরে এবং বিশেষ করে জন ফিটজারেল্ড কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সন্নিকটে একটি বাসগৃহে বসে দুপুরের অতিথি ভোজনে গ্রাম বাংলার বিশেষ সময়ের বিশেষ রকমের খাবার নাইল্যা পাতার বড়া খেয়ে খুশী হই এবং গর্ব অনুভব করি।
আমার খুশী হওয়া এবং গর্ব অনুভবের কারণ হলো, বাবলুর বাড়ি ফার রক এওয়েতে এসেই বুঝতে পারি, আমাদের বাপ ঠাকুর্দার দেশবাড়ির বশংবদদের অনেক উত্তরসুরীরাই, যে কোন কারণেই হোক স্বদেশ ছেড়ে এখন নিউইয়র্কের এস্টেরিয়া, জ্যাকসন হাইট এবং আরো সব নানা স্থানে বেশ ভালোভাবেই গ্রাম বাংলার স্বকীয় ধারা বহন করে দিনাতিপাত করছে।
গেলো রাত কৃপাংশুর সাথে ফোনে আলাপ হয়েছে। আমাদের নিউইয়র্কে থাকার সময় খুবই কম। ওর সঙ্গে মাত্র একদিনই কাটানো সম্ভব হবে। তাই ঠিক হয়, আগামীকাল ২২ জুলাই সকালবেলা ও নিজের গাড়ি ড্রাইভ করে এসে আমাদেরকে ফার রক এওয়ে থেকে ওর নিউজার্সির বাড়িতে নিয়ে যাবে। সারাদিন গল্পগুজব করে কাটিয়ে সন্ধ্যায় ডিনার শেষে আবার ও নিজে ড্রাইভ করে ফার রক এওয়েতে বাবলুর বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে যাবে।
আজ ২১ জুলাই ২০০৭ ইংরেজি, সারাদিনের জন্য বাড়ির বাইরে থাকবো। বাবলুর পরিবার সহ আমরা সবাই ষ্ট্যাচু অব লিবার্টি দেখতে যাবো। নিউইয়র্কে এসে স্ট্যাচু অব লিবার্টি দর্শন করা সাধারণ ভ্রমণকারীদের ক্ষেত্রে সব সময় সম্ভব হয়ে উঠে না। বিশেষ করে শীতকালে প্রাকৃতিক কারণে ম্যানহাটানের ব্যাটারী পার্ক কিংবা নিউজার্সির লিবার্টি স্টেট পার্ক থেকে লিবার্টি আইল্যাণ্ডে যাওয়া আসার ফেরী বন্ধ থাকে। তবে জুলাই মাসে ম্যানহাটান থেকে লিবার্টি আইল্যাণ্ডে যাতায়াতের জন্য ফেরীপথ স্বাভাবিক এবং লিবার্টি আইল্যাণ্ডের আবহাওয়া ও মনোরম থাকে।
সকাল ন’ঘটিকার সাথে সাথেই ফার রক এওয়ের আবাসন থেকে বের হয়ে যাই। বাবলুর পরিবারের তিনজন এবং আমরা দুজন মিলে মোট পাঁচজন ৪০তম বীচ রোডে নির্জন রাস্তা ধরে পায়ে হেটে চলে যাই সাবওয়ে ষ্টেশনে। গাড়িতে উঠে আসন গ্রহণের কিছুক্ষণ পরই গাড়ি ছেড়ে দেয়। প্রায় পঁচিশ মিনিট চলার পর একটি বড় ষ্টেশনে এসে থামে। বাবলুর নেতৃত্বে গাড়ি থেকে নেমে এই ষ্টেশনেরই অন্য প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকটি গাড়িতে গিয়ে উঠি। সাবওয়ে ষ্টেশনটিতে কয়েকটি ট্র্যাক রয়েছে। যাত্রীর ভিড় ও বেশি। নানান ধরণের দোকান পাট ও আরাম আয়েসে বসে অবসর বিনোদনের ব্যবস্থা আছে। সবকিছুই আলোকোজ্জ্বল এবং মনোমুগ্ধকর। সাধারণ ভাবে মনে হয় খোলা আকাশের নিচেই মুক্ত আলো হাওয়া রৌদ্রে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগে এক উন্নত মানের রেলওয়ে ষ্টেশনের কোন এক গাড়িতে বসে আছি। কিন্তু যখনই ভাবি যে, ষ্টেশনটাতো ভূপৃষ্ঠের নিচেই রয়েছে এবং গাড়িটা সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে চলে তখন মনে ভয় হয়।
সে যাইহোক, অল্পক্ষণ পরেই আমাদের গাড়ি ছুটে চলে। মিনিট পনেরো সময় অতিক্রান্তের পর গাড়ি এসে থেমে যায় সাউথ ফেরী সাবওয়ে ষ্টেশনে। তখন গাড়িতে যাত্রী সংখ্যা খুবই কম। আমরা পাঁচ জন কামড়া থেকে বেরিয়ে আসি। বাবলুকে অনুসরণ করে হাটতে হাটতে চলে আসি একটা জায়গায়। সেখান থেকে বেরিয়েই দেখি আমরা ভূপৃষ্ঠের উপরে চলে এসেছি। উপরে খোলা আকাশ। সামনে প্রশস্ত রাস্তা। সামান্য দূরে গগনচুম্বী সারি সারি অট্টালিকার সমাবেশ। সামান্য কিছুটা পথ হেটে এগিয়ে এসে দেখি একটা খালি জায়গা এবং তার মাঝখানে পোড়ামাটি এবং কালো জঞ্জাল ভেদ করে ধূয়া বেরিয়ে আসছে। এ জায়গাতেই দাঁড়িয়েছিলো ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ার। ২০০১ ইংরাজির ১১ সেপ্টেম্বর ওসামা বিন লাদেনের অনুগামীদের বিমান আক্রমণে ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছিল। আমরা ধ্বংসপ্রাপ্ত টুইন টাওয়ারের খালি জায়গায় পোড়া মাটি এবং জঞ্জাল থেকে বেরিয়ে আসা ধুয়া রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে দেখি। তখন আরো সব অন্যান্য টুরিষ্টরাও পার্শ্ববর্তী দক্ষিণের ফুলটন স্ট্রীট দিয়ে টুরিষ্ট বাসে এসে ওখানে দাঁড়িয়ে জায়গাটি দর্শন করে। সামান্য দূর থেকে ওদেরকে দেখে মনে হলো, ওরা যেন চুপচাপ দাঁড়িয়ে কোন এক ঐশী শক্তির নিকট মনে মনে কিছু ব্যক্ত করছে। তারপর আবার সবাই মিলে বাসে উঠে চলে যায়। এ দৃশ্য দেখে আমরাও ভারাক্রান্ত মনে ম্যানহাটানের দক্ষিণ শেষ প্রান্তে অবস্থিত ব্যাটারী পার্কের উদ্দেশ্যে পা বাড়াই।
ব্যাটারী পার্ক থেকে লঞ্চে চড়ে হাডসন নদীর জলভেঙ্গে লিবার্টি আইল্যান্ডে যাওয়ার ব্যবস্থা। আর লিবার্টি আইল্যান্ডেই রয়েছে ষ্ট্যাচু অফ লিবার্টি ন্যাশনাল মনুমেন্ট। এপার থেকে ওপারে লঞ্চে যেতে হলে আগাম টিকিট কাটতে হয়। বাবলু আমাদের টিকিট কেটে নেয়। আরো সব দর্শনার্থীরা অনেক আগে থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে লঞ্চে উঠার জন্য অপেক্ষা করছে। তাই আমাদেরকে বেশ লম্বা লাইনের পেছনেই দাঁড়াতে হয়। তবে কয়েকটা লঞ্চ পারাপারের জন্য নিযুক্ত থাকায় অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা লঞ্চে উঠার সুযোগ পেয়ে যাই।
নির্দ্দিষ্ট সংখ্যক যাত্রী উঠার সাথেই সাথেই লঞ্চ ষ্টার্ট দিয়ে জলপথে যাত্রা শুরু করে। লঞ্চের চারিদিক খোলা। মাথার উপরে সরাসরি কিছু দেখা না গেলেও চারিদিকের দৃশ্যপট নজরে পড়ে। হাডসন নদীর নীল জলরাশি ভেদ করে আমাদের লঞ্চ দ্রুত এগিয়ে চলে। ক্রমে ক্রমে দূর থেকে দূরে সরে যায় পিছনে ফেলে আসা ম্যানহাটানোর গিজ গিজ সারিবদ্ধ গগনচুম্বী অট্টালিকার চিত্রপট। সামনে দেখা যায় নীল আকাশের নিচে লিবার্টি আই ল্যান্ডের উপর একটি দণ্ডায়মান বিশাল নারী মূর্তি। মূর্তিটির ডান হাতে রয়েছে আকাশের দিকে উঁচু করে রাখা এক আলোকবর্তিকা, কোমরের পাশে বাঁ হাতে রয়েছে একটি আয়তকার মসৃণ ধাতুখণ্ডের উপর খোদাই করা আমেরিকার স্বাধীনতা দিবসের ঘোষণা এবং পায়ের পাশে একটি ভগ্ন শৃঙ্খল। মূর্তিটি আমেরিকার স্বাধীনতার প্রতীক এবং আটলান্টিক মহাসাগর দিয়ে বিদেশীদের নিউইয়র্ক বন্দরে পৌঁছার দিক নির্দেশক।
সময় এগিয়ে চলার সাথে সাথে আমাদের লঞ্চ লিবার্টি আটল্যাণ্ডের নিকটবর্তী হতে থাকে। বাবলুর সাথে ডিজিটাল ক্যামেরা ছিল। নদী পারাপারের অবসরে বিভিন্ন দিক থেকে কয়েকটি ছবি পর পর তুলে নেয়। ইত্য বসরে আমাদের লঞ্চ লিবার্টি আইল্যাণ্ডে ফেরীঘাটের জেটিতে গিয়ে থেমে যায়। যাত্রীরা সব একএক করে জেটি থেকে লিবার্টি আইল্যাণ্ডের ভূমিতে পা রাখে। আমরা ওদেরকে অনুসরণ করি। জেটির দুপাশেই আইল্যাণ্ডের স্থলভাগ ঘিরে শক্ত কংক্রিটের দেওয়াল রয়েছে। তারপরই সবুজ ঘাসে আচ্ছাদিত বিস্তর ভূমি। আইল্যাণ্ডের প্রায় মাঝখানেই অবস্থিত ষ্ট্যাচু অব লিবার্টি। আমরা যতই হেটে ষ্ট্যাচুর দিকে অগ্রসর হই ততই মূর্তিটিকে বড় থেকে বড় হতে দেখা যায়। তারপর যেতে যেতে বেদীর পাশে পৌঁছানোর পর মাথা উঁচু করে তাকালে বেদীর উপরিভাগে দণ্ডায়মান মূর্তিটির পাদদেশ পর্যন্তই দৃষ্টির গোচরে আসে। লিবার্টি আইল্যান্ডের জমিনের উপর একটি বিশাল বেদী তৈরি করে তার উপর মূর্তিটি স্থাপন করা হয়। ভূমি থেকে বেদীটির উপরিভাগের উচ্চতা ১৫৪ ফুট এবং বেদীর উপরিভাগ থেকে মূর্তিটির হাতে খাড়া করে রাখা আলোকবর্তিকার শীর্ষ পর্যন্ত উচ্চতা হলো ১৫১ ফুট। ফ্রান্সের বিশিষ্ট ভাস্কর ফ্রেডরিখ অগাষ্ট বার্থলডির পরিকল্পনা মত রোমান দেবী লিবারটাস এর আদলে তৈরি এই বিশাল মূর্তিটি ফ্রান্সের জনগণ আমেরিকা যুক্তরাজ্যকে উপটৌকন দেয়। ১৮৮৬ সালের ২৮ অক্টোবর লিবার্টি আইল্যান্ডে মূর্তিটি স্থাপন করা হয় এবং তখন থেকেই ওটা আমেরিকা যুক্ত রাজ্যের ন্যাশনেল মনুমেন্ট হিসাবে স্বীকৃত এবং বিশ্ববাসীর নিকট একটি বিশেষ আকষর্ণীয় দ্রষ্টব্য স্থল হিসাবে বিবেচিত। শতাব্দী কালেরও বেশি সময় ধরে বিদেশ থেকে আগত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, বিশেষ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন লোক এবং পর্যটকরা বিভিন্ন সময়ে ষ্ট্যাচু অফ লিবার্টির পাদদেশে দাঁড়িয়ে ওটাকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং বিশ্ব ভ্রাতৃত্ববোধের সম্মিলিত প্রতীক বলে তাঁদের মতামত ব্যক্ত করেছেন।
স্ট্যাচু অফ লিবার্টির বেদীর পাশে পায়ে চলাচলের পথ ধরে এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি করি। সকাল থেকে সময় এগিয়ে চলার সাথে সাথে ষ্ট্যাচুর পাদদেশে লোকের ভিড় ক্রমাগত বাড়তে থাকে। তবে এখন দুপুর বেলায় জেটিতে তেমন ভিড় নেই। আজকের দিনের দর্শনার্থীদের প্রায় সবাই এসে ষ্ট্যাচুর পাদদেশের পার্শ্ববর্তী রেস্তরার কাছে জমায়েত হয়েছে। আমরাও দুপুরের আহার সেড়ে নেওয়ার তাগিদ অনুভব করি। কিন্তু রেস্তরার ভিড় ঠেলে সেটা তাড়াতাড়ি সম্ভব নয়।
খোলা আকাশের নিচে গাছ তলায় টেবিল চেয়ার রয়েছে। লাইনে দাঁড়িয়ে রেস্তরা থেকে খাবার খরিদ করে ওখানে এসেই বসে খাওয়ার ব্যবস্থা। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর আমরা একটা টেবিল দখল করে পাশের চেয়াগুলোতে বসে পড়ি। বাবলু লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার খরিদ করতে যায়।
আমাদের টেবিলের পাশাপাশি টেবিল চেয়ারে আরো সব লোকজনের ভিড় রয়েছে। অধিকাংশদের চেহারা দেখে ভারতীয় বলেই মনে হয়। অনেকে খাবার খাচ্ছে আবার কেহ কেহ আমাদের মত টেবিল চেয়ার দখল করে খাবারের অপেক্ষায় রয়েছে। মিনিট পনেরো পর বাবলু খাবার নিয়ে আসে। ভারতীয় খাবার পাওয়া যায়নি। ডিস ভর্তি বার্গার, পটেটো ফিংগারস, চিকেন নাগেট, স্যালাড আর ছোট ছোট প্যাকেটের মধ্যে রয়েছে সস্। আমার ভারতীয় খাবারই পছন্দ কিন্তু পাওয়া না গেলে আর কি করা যায়। তৃপ্তির অভাব থাকলেও ক্ষুধা নিবৃত্তিতো করতে হবে। সবাই টেবিলের চারপাশে বসে ধীরে ধীরে খেতে থাকি। সাধারণের চেয়ে বেশি সময় নিয়েই আহার পর্ব শেষ হয়।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল। সূর্য পশ্চিম দিগন্তে ঢলে পড়ছে। এখন লিবার্টি আইল্যাণ্ড থেকে দর্শনার্থীদের প্রত্যাবর্তনের পালা। জেটিতে সমাগম বেশি। লঞ্চগুলো এক এক করে প্রথমে এলিস আইল্যাণ্ড, তারপর সেখান থেকে আবার কোনটা চলে যাচ্ছে জার্সি সিটি লিবার্টি ষ্টেট পার্কে আবার কোনটা যাচ্ছে ম্যানহাটানের ব্যাটারী পার্কে। আমরা জেটির দিকে না গিয়ে লিবার্টি আইল্যান্ডের বিস্তর ভূমিতে পদচারণা করি। একবার লোয়ার ম্যানহাটানের দিকে মুখ করে হাটি তো আবার নিউ জার্সির লিবার্টি ষ্টেট পার্কের দিকে এগিয়ে হাডসন নদী ও দূরের নৈশর্গিক দৃশ্যাবলী উপভোগ করি এভাবে বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর আমরা জেটির দিকে পা বাড়াই। ততক্ষণে জেটির পাশে লোকজনের ভিড় অনেক কমে গেছে। পশ্চিম দিগন্তে সূর্য ডুব দেওয়ার আর বেশি সময় নেই। আমরা তাড়াতাড়ি পা ফেলে লঞ্চে গিয়ে উঠি। অল্পক্ষণ পরেই লঞ্চ ওপারে ম্যান হাটানের দিকে এগোতে থাকে। লঞ্চে বসে থাকা অবস্থায় ক্রমাগত দূর থেকে দূরে সরতে সরতে পিছনে ফিরে রোমানদের পূজ্য দেবী লিবারটাসের আদলে তৈরি বিশ্ব বিখ্যাত আমেরিকার ষ্ট্যাচু অফ লিবার্টিকে শেষ বারের মত দেখে মনের পর্দায় বেঁধে রাখতে যারপর নাই চেষ্টা করি।
আজ ২২ জুলাই ২০০৭ ইংরেজি। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই স্নানটান করে প্রাতঃরাশের পর ৪০তম বীচ ষ্ট্রীট ফার রক এওয়ের 8BF নম্বর আবাসনে বসে অপেক্ষা করছি। পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কৃপাংশু এসে আমাদেরকে নিউজার্সিতে ওর বাড়িতে নিয়ে যাবে। সারাদিন ওর সাথেই কাটাতে হবে। এসব বসে ভাবছি আর ঠিক তখনই আমার মোবাইলটা বাজতে থাকে। কল রিসিভ করে ওটাকে কানে লাগিয়ে হ্যালো বলতেই শুনতে পাই- অপরেশ, আমি তোমার এপার্টমেন্টের কাছে এসে গেছি। - ঠিক আছে, তুমি অপেক্ষা কর আমি আসছি। একথা বলেই আমি বাবলুর স্মরাণাপন্ন হই। বাবলু আমার সঙ্গে যাওয়ার জন্য দরজাখুলে করিডরে পা বাড়ায়। আমি ওর সাথে যেতে থাকি। কয়েক পা ফেলতেই দেখি অপর দিকে কৃপাংশু আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। দূর থেকে দেখে ওকে চিনতে অসুবিধা হয়নি যদিও প্রায় কুড়ি বছর পর সশরীরে দেখছি। আমি আর বাবলু দ্রুত এগিয়ে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াই। বাবলুকে কৃপাংশুর সাথে পরিচয় করিয়ে তিনজন ঘরে এসে বসি।
রুবিও বের হওয়ার সবরকম প্রস্তুতি নিয়েই কৃপাংশুর আগমনের অপেক্ষায় ছিল। কাজেই ও আসার সাথে সাথেই বেরিয়ে পড়ার উদ্যোগ নেই। তখন বাবলুর স্ত্রী কৃপাংশুকে চা পানের জন্য অনুরোধ করে। কিন্তু কৃপাংশু তার স্ত্রী শিবানীকে একা নিচে রাস্তায় গাড়িতে রেখে এসেছে। গাড়িটা রাস্তার পাশে বেশি সময় পার্ক করে রাখা ঠিক নয় ভেবে সে চা পানের পরিবর্তে এক গ্লাস জলপান করেই গৃহকর্ত্রীর আতিথেয়তার মর্যাদা দেয়। তারপর আমরা বেরিয়ে পড়ি। কৃপাংশুর বিয়ে কলকাতাতেই হয়েছে। ওর বিয়েতে উপস্থিত থাকার নিমন্ত্রণ পত্র এবং পরবর্তীতে তাঁর ছেলে অঙ্কুরের অন্নপ্রাশনে যোগদানের নিমন্ত্রণ পত্র যথাসময়েই আমি পেয়েছি। কিন্তু সেসব অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই আগে শিবানীকে আমি চাক্ষুষ দেখিনি। এই প্রথম বন্ধু পত্নীর মুখোমুখি হই। সহাস্যে দুজনেই নমস্কার বিনিময় করি।
শিবানী গাড়ির পিছনের সিটে বসা। সিথিতে সিঁদুরের টান, ষোল আনা বাঙ্গালী ঢঙে শাড়ি পরিহিতা শ্যামলা শিবানীর মুখখানা দেখতে ভারী মিষ্টি। সে দরজা খুলে সাদর অভ্যর্থনায় আমার স্ত্রী রুবিকে ওর পাশে নিয়ে বসায়। আমি সামনে কৃপাংশুর ডানদিকে গিয়ে বসি।
চল্লিশতম বীচ স্ট্রীটের রাস্তা ধরে এগিয়ে ফাররক এওয়ের সাবওয়ে ষ্টেশনের পাশে গিয়েই বিপরীত দিকে চলে যাওয়া বড় রাস্তা ধরে আমাদের গাড়ি ছুটে চলে। অল্পক্ষণের মধ্যেই আমরা জন ফিট জারেল্ড কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নিকট পৌছে যাই। বিমান বন্দরের পাশ দিয়ে বড় রাস্তা ধরে আমাদের গাড়ি চলে। কিছুক্ষণ পর শহরের রাস্তা থেকে মোড় নিয়ে গাড়ি ইন্টারষ্টেট হাইওয়ে ধরে গতিবেগ বাড়িয়ে চলতে থাকে।
দিনের আলোয় রাস্তার দুধারের কারুকার্যময় অট্টালিকা কিংবা অন্যান্য দৃশ্যাবলী আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারছে না। রাতের অন্ধকারে বিদ্যুতের মহিমার নিকট কিংবা দূরের দৃশ্যপট যতই আকর্ষণীয় ও মোহময় হয়ে দর্শকের নজর কারুক না কেন দিনের সূর্যালোকে সেটাকে অনেক নিষ্প্রভই মনে হয়। তাই চলতি গাড়িতে বসে দ্রুত অপসৃয়মান বাইরের দৃশ্যাবলী উপেক্ষা করে আমরা গাড়ির ভেতরই নিজেদের দৃষ্টি আবদ্ধ রাখি। কৃপাংশু গানের ক্যাসেট চালু করে। সুললিত কণ্ঠের মিষ্টি মধুর রবীন্দ্র সঙ্গীত গাড়ির ভিতর এক ভিন্ন মাত্রার পরিবেশ সৃষ্টি করে। বিশেষ ভাবাবেগে আবিষ্ট হই। বিশ্বের অন্যতম সেরা শহর নিউইয়র্কের ব্যস্ততম এলাকার মধ্য দিয়ে গাড়ি চললেও আমাদের মন তখন চলে যায় পুরানো সেইদিনের কথাতে।
কৃপাংশু ষ্টীয়ারিং ধরে একই গতিতে গাড়ি চালিয়ে যেতে যেতে আমাকে বলে, - জানো অপরেশ, জীবনের চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় আমার আমেরিকাতে কাটলেও প্রথম চাকুরী স্থল শিলচর পলিটেকনিকের পুরানো স্মৃতি কিন্তু আজও আমাকে আনন্দ দেয়। আমি প্রত্যুত্তরে বলি, আর এজন্যেইতো মহাজনদের মন্তব্য রয়েছে স্মৃতি সততই সুখের।
আমার কথা শুনে কৃপাংশু বলে- না, স্মৃতি সততই সুখের হতে পারে কিন্তু জীবনের অনেক কিছুই স্মৃতিতে থাকে না। আমার আমেরিকায় কালযাপনের অনেক ঘটনাই মনের স্মৃতি কোঠায় জমা নেই। কিন্তু কথাপ্রসঙ্গে যেকোন সময়ে শিলচর পলিটেকনিকের নাম শুনলেই আমার মনের স্মৃতি কোঠার দরজা খুলে যায়। আর সে সময়ের ঘটনাগুলো এক এক করে চোখের সামনে ভেসে উঠে। মনে হয় জীবনদীপ নিভে যাওয়ার আগ পর্যন্তও সেগুলো সজীব থাকবে।
কৃপাংশুর বক্তব্য শুনে আমার মনে হয় ও ঠিকই বলছে। চাকুরী থেকে অবসর নেওয়ার এক যুগ কবেই পার হয়ে গেছে। জীবন নদীর শেষ সীমানায় এসে তরী ভিড়ে গেছে। এখন যেন বেশি করেই যখন তখন প্রথম জীবনের ঘটনাগুলো মনে এসে ভিড় জমায়। কিন্তু এরকমটা হলেও আমিতো আর সেই পুরানো দিনগুলোকে এখন বাস্তবে ফিরিয়ে আনতে পারছি না। এসব ভাবতে ভাবতে আমি কৃপাংশুর দিকে ভালো করে তাকাই। তার যৌবনের ভারচুয়াল প্রতিছবি আমার সামনে কিছুটা ভাসলেও বাস্তবে দেখতে পাচ্ছি ওর শক্ত সুঠাম দেহে এখন অনেক মেদ জমেছে, মাথার সামনের দিকে চুল পড়ে কপালটা প্রশস্ত হয়েছে। প্রৌঢ় ভারিক্কী আদলের কৃপাংশু সহজ সাবলীল ভাবেই ষ্টীয়ারিং ধরে হাইওয়ের মধ্য দিয়ে গাড়ি দুর্বার গতিতে চালিয়ে যাচ্ছে।
গাড়ি চলার সাথে সাথে রবীন্দ্র সঙ্গীতের ক্যাসেটটাও কৃপাংশু অবিরাম চালু রেখেছে। এখন যে গান বাজছে সেটার সুর ও কলি মনকে বিভোর করে। কৃপাংশুর দেহ সৌষ্ঠব নিরীক্ষণ করা থেকে বিরত হয়ে আমি গানেই মনোনিবেশ করি। কিছুক্ষণ পর গান শুনার অবকাশেই পিছনে ফিরে তাকাই। কৃপাংশুর স্ত্রী শিবানী এবং আমার স্ত্রী রুবি দুজনেই পাশাপাশি বসে নিচু স্বরে নিজেদের মধ্যে বার্তালাপ চালিয়ে যাচ্ছে। বাহ্যত মনে হয় অল্প সময়ের এই যাত্রাপথে ওরা পরস্পর ভাব বিনিময়ের মাধ্যমে দুজনই একে অন্যের খুব কাছের মানুষ হয়ে গেছেন।
প্রায় ঘণ্টা দেড়েক সময় চলতে চলতে আমরা নিউইয়র্ক ও নিউজার্সি শহরের বিভাজন কারী হাডসন নদী, দূরের ষ্ট্যাটেন আইল্যান্ড, ভেরাজোনাব্রীজ প্রভৃতিকে দৃষ্টির অগোচরে রেখে গোথ্যাল ব্রীজের সামনে চলে আসি। গোথ্যাল ব্রীজ থেকে নিউ জার্সির এলিজাবেথ সিটির ডাউন টাউন পার হয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যেই চলে যাই বেল্ডার এভিনিউ রোসিলি পার্কে, কৃপাংশুর বাড়ির সামনে।
বেল্ডার এভিনিউতে ঢুকে সামান্য এগিয়েই কৃপাংশুর বাড়িটা। সোজা এবং দীর্ঘ রাস্তার দুপাশে একের পর এক বাড়ি। সব বাড়ির বহিরাবরণ একই ধাঁচের। নবাগতের নিকট প্রথম দর্শনে বাড়িগুলোর মধ্যে কোন ফারাক নজরে পড়ে না। মনে হয় কোন রিয়েল এষ্টেট কোম্পানী একই নক্সায় বাড়িগুলো তৈরি করে বিভিন্ন খরিদ্দারের নিকট বিক্রি করেছে, ঘরগুলোতে রড, কংক্রীট এবং ইট সিমেন্ট প্রভৃতির সংমিশ্রণ প্রায় নেই বললেই চলে। কাঠ, প্লাস এবং সিমেন্ট মিশ্রিত প্লাইউড প্রভৃতি দিয়ে বসবাসের জন্য বিশেষ সুবিধাজনক এবং আরামদায়ক বাড়িগুলো দেখতে ভারি সুন্দর। আকৃতিতে অনেকটা আমাদের আসাম টাইপ ঘরের মত। তবে ঘরের ছাউনীটা টিন দিয়ে নয়, ওয়েদার প্রুফ গাঢ়ো কালো রঙের আয়তকার পলিথিন সীটের মত জিনিস দিয়ে দেওয়া হয়।
কৃপাংশুর বাড়ির সামনেই শিবানী, রুবি এবং আমি গাড়ি থেকে নেমে পড়ি। কৃপাংশু গাড়িতে বসেই গ্যারেজ ঘরের সাটার খুলতে রিমোট টিপে। গরর্ গরর্ শব্দে স্বয়ংক্রিয় সাটার নিচ থেকে উপরে উঠে। গ্যারেজে গাড়ি প্রবেশ করার পথ উন্মুক্ত করেদেয়। কৃপাংশু ধীরে ধীরে গাড়ি চালিয়ে গ্যারেজে রেখে আসে। গ্যারেজের বাম পাশেই বাড়ির প্রধান ফাটক। শিবানীকে অনুসরণ করে এগিয়ে ঘরের ভিতর প্রবেশ করি। প্রথমেই সাজানো সুন্দর ড্রইং রুম এবং ড্রইং রুমের সরাসরি ডাইনিং রুম। ড্রইং রুমের বিশালাকার সোফাসেটের বিপরীতে দেওয়ালের পাশে রয়েছে বড় পর্দার টিবি। আমি আর কৃপাংশু সোফায় বসে পড়ি। শিবানী ড্রইং রুমের পাশে অন্য কোঠায় রুবিকে নিয়ে চলে যায়।
নিউইয়র্কের প্রান্তিক এলাকা ফাররক এওয়ে থেকে শহরের অন্য প্রান্ত পার হয়ে নিউজার্সির রোসিলী পার্কে পৌঁছতে আমাদের প্রায় দুঘন্টা সময় ব্যয় হয়। দুঘন্টা ব্যাপী একটানা গাড়ি চড়ে এসে বেশ ক্লান্তি বোধ করি। কিন্তু কৃপাংশু এবং শিবানীতൊ আমাদের চেয়ে দ্বিগুণ সময় গাড়িতে ছিল। প্রথমে নিউজার্সি থেকে ওদেরকে ফাররক এওয়েতে যেতে হয়েছে এবং সেখান থেকে আমাদেরকে এখানে নিয়ে এসেছে। কিন্তু ওদের মুখাবয়বে ক্লান্তির কোন ছাপ নেই।
কিছুক্ষণ পর শিবানী এসে আমাদেরকে ডাইনিং টেবিলের পাশে যেতে বলে। ইতিমধ্যে কৃপাংশুর ছেলে শ্রীমান অঙ্কুরও এসে হাজির। সে নিউইয়র্কেই একটি কলেজে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। এক বছর পরই ওর ডিগ্রী কোর্স শেষ হবে। আমরা যে ওদের বাড়িতে আসছি সে জানতো। তাই ওর সাথে প্রথম দর্শনের প্রথম সম্ভাষণে বিশেষ কালক্ষেপ হয়নি। আমরা সবাই এক এক করে ডাইনিং টেবিলের পাশে গিয়ে চেয়ার দখল করে বসি।
গৃহকর্ত্রী শিবানী ইতিমধ্যেই মণ্ডা-মিঠাই এবং পিঠা-পায়েসের ডালি সাজিয়ে রেখেছিল। কৃপাংশু ভোজন রসিক এবং আমিও এক সময়ে ওদের নিকট পেটুক বলে খ্যাত ছিলাম। কিন্তু আজকাল চোখের সামনে বিশেষ খাবার দেখে মনে আনন্দ হলেও পেটে ওগুলো সয় না। তবে দীর্ঘদিন পর যৌবনের এক সময়ের নিত্যসঙ্গী এবং বর্তমানে নিউজার্সিবাসী স্বজনের বাড়িতে এসে বাংলার বারো মাসের তেরো পার্বনের বিশেষ খাবার মণ্ডা-মিঠাই ও পিঠা-পায়েস প্রভৃতির সদ ব্যবহারের সুযোেগ উপেক্ষা করা মোটেই সমীচিন নয়। পরে পেটের কি হবে ভাবনাকে আমল না দিয়ে অত্যন্ত আনন্দের সহিত ডিস থেকে খাবার তুলে মুখে দেই। শিবানীর নিজের হাতে পরিপাটি করে তৈরি সুস্বাদু খাবারগুলো খেতে খেতে নিজেদের মধ্যে গল্প গুজব ও চলতে থাকে। তবে গল্পের বিষয়বস্তু সব স্বদেশে থাকাকালীন নিজেদের পুরানো দিনের ঘটনা নিয়ে।
রোসেলি পার্কে কৃপাংশুর বাড়িতে এসে প্রথম পর্বের মিষ্টিমুখ এবং গল্প সল্প করতে করতে প্রায় ঘন্টা দেড়েক সময় অতিবাহিত হয়। দিনের অবস্থান তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল আসন্ন। অন্যদেরকে ডাইনিং রুমে নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনায় রত রেখেই আমি আর কৃপাংশু ঘর থেকে বের হয়ে যাই। বাড়ির চতুঃসীমানা ঘুরে ঘুরে দেখি। বসবাসের এলাকায় বাড়ির চারদিকে ইট সিমেন্ট দিয়ে তৈরি কোন দেওয়াল নজরে পড়ে না। প্রত্যেকের বাড়ি কাঠের পাঠাতন দিয়ে তৈরি দেওয়ালে ঘেরা। সীমানার ভিতর বাড়ির পিছনের দিকে ছোট ছোট মেপলবৃক্ষ। এখন গ্রীষ্ম-বর্ষায় সবুজ পাতার আচ্ছাদিত। শীতের শুরুতে পাতাঝরার দিনগুলোর আগে গাছের সবুজ পাতাগুলি তামাটে হলুদ কিংবা সোনালী রং ধারণ করবে। তখন গাছগুলিকে দেখতে ভারী সুন্দর। কিন্তু তারপই আবার শীতের মরসুমে গাছগুলো পত্র বিহীন হয়ে কংকাল রূপ ধারণ করবে।
বাড়ির সীমানার ভিতর পিছন দিকে দেওয়ালের কিনারায় ছোট্ট মেপল জাতীয় গাছগুলোর পাশ থেকে আমরা চলে আসি বাসগৃহের সন্নিকটে। সেখানে রয়েছে একটি ছোট্ট কিচেন গার্ডেন। কিচেন গার্ডেনে টম্যাটো, বেগুন এবং মরিচের গাছগুলো বেশ সতেজ। ওগুলোর পাশেই রয়েছে আমাদের দেশের কুমড়ো গাছেরমত লতানো গাছ। ওটার স্থানীয় নাম জুকিনি। জুকুনি এবং অন্যসবগুলো গাছেই ফসল ধরেছে। কিছুক্ষণ বাগান নিরীক্ষণের পর কৃপাংশু পাশেই লম্বা নল লাগানো জল সরবরাহের টেপ খুলে দেয়। তারপর সে নলটির অগ্রভাগহাতে নিয়ে বাগানের গাছগুলোতে জলসিঞ্চনকরে।
বাড়ির চারিদিকের সীমানা ও বাগান পরিদর্শন এবং জল সিঞ্চনের পর কৃপাংশু আমাকে বাড়ির বাইরে নিয়ে আসে। সে গ্যারেজ থেকে গাড়িটা বের করে আমাকে বলে - চলো অপরেশ, আমাদের এলাকাটা একটু ঘুরে আসি। ওর কথামতোই আমি গাড়ির ড্রাইভিং সিটের ডানপাশে গিয়ে বসি।
বেন্ডার এভিনিউর সোজা রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলতে থাকে। রাস্তার দুপাশে কেবল বসতবাড়ি। প্রায় মিনিট দশেক চলার পর বাঁক নিয়ে অন্য রাস্তার মুখে প্যাটেলদের দোকানের সামনে গিয়ে কৃপাংশু গাড়ি থামায়। গাড়ি থেকে নেমে প্যাটেলদের দোকানে গিয়ে কিছু সওদা করে। আমিও ওর সাথে সাথে দোকানে যাই এবং একসঙ্গে ফিরে এসে আবার গাড়িতে গিয়ে বসি। গাড়ির বিপরীতের রাস্তাটা দেখিয়ে কৃপাংশু আমাকে বলে - সামনে যে রাস্তাটা দেখছো সেটা দিয়ে দশ মাইল এগুলেই সুজিতের বাড়ি।
সহপাটি এবং বাল্য বন্ধু সুজিতের নিকট আমার নিউজার্সিতে আসার খবর ইমেল করে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু ও বিজনেস ট্রিপে এখন আটলান্টাতে আছে। তাই ওর সাথে দেখা করা সম্ভব নয়। তাই গাড়িতে বসে কৃপাংশুকে বলি – সুজিতের সাথে ফোনে একটু যোগাযোগ করার চেষ্টা করো, নিউজার্সিতে এসে ওর সাথে দেখা না হলেও ফোনে আলাপ করে যাই। কৃপাংশু আমার অনুরোধে মোবাইল টিপে এবং সুজিতকে পেয়ে যায়। আমি বর্তমানে কৃপাংশুর সঙ্গেই আছি খবরটা সুজিতকে দেয় এবং অল্প বার্তালাপের পর সুজিতের সঙ্গে আলাপ করার জন্য ও হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা আমাকে দেয়।
মোবাইলটা কানে লাগিয়ে আমি বলি- হ্যালো সুজিত, তোর খবর কি? প্রত্যুত্তরে আমি শুনতে পাই সুজিত বলছে, আমি এখন তোদের থেকে হাজার মাইল দূরে। বিজনেস ট্রিপে এটলান্টাতে এসেছি।
-এ খবর অবশ্যি কৃপাংশু আমাকে আগেই দিয়েছে। তা আছিস্ কেমন?
-আর বলিস্ না ভাই গেলো রাত থেকে পেট খারাপ। এখনও অবস্থা সুবিধার নয়।
ওর পেট খারাপ শুনে সহানুভূতির বদলে আমার হাসির উদ্রেক হয়। আমি হাসতে হাসতেই ওকে ফোনে বলি তুই যেখানে আছিস সেখানে তোর হার্ট বা প্রেসারের সমস্যা হতে পারে কিংবা অসাবধানতা বশত চলাফেরায় কোন আঘাত পাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু পেট খারাপ হবে কেন? একাধিকবার অলিম্পিক গেইমস অনুষ্ঠিত হওয়া পৃথিবী বিখ্যাত শহর এটলান্টাতে বিজনেস টুরে এসে মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানীর হাই প্রফাইল এক্সিকিউটিভের পেট খারাপ! এটা শুনতেও কেমন লাগে।
আমার কথা বলার পর চটজলদি সুজিতের নিকট থেকে কোন উত্তর পাইনি। মনে মনে ভাবি ওকি আমার কথায় গোসা করল? আর তখনই কানে লাগানো মোবাইলে সুজিতের কথা ভেসে আসে। সে বলে – তুই কি জানিস্ না প্রেমাবতার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মভূমি নবদ্বীপেও প্রেত আছে।
হঠাৎ করে চৈতন্য মহাপ্রভু, নবদ্বীপ, প্রেম প্রভৃতি শব্দ গুলোর সংযোজনে রচিত বাক্যের সঠিক বিন্যাস করতে পারিনি। আমি ভাবছি কি বলব আর তখনই সুজিতের কণ্ঠস্বর কানে বাজে। শুনতে পাই চৈতন্য মহাপ্রভুর দেশে যদি প্রেত থাকে তাহলে এটলান্টাতে পেটের অসুখ হবে না কেন? সুজিতের একথা শুনার পর মগজ খোলসা হয়ে যায়। আমি বুঝতে পারি, হাসিস্থলে ওকে লক্ষ্য করে যে মাটির ঢেলা ছুড়েছি সে পাটকেল ছুড়ে তার বদলা নিচ্ছে। আমি অবশ্য ওর পাটকেলের আঘাতে বেশ মজা পাই।
চলতি গাড়িতে বসেই সুজিতের সাথে আলাপ চালিয়ে যাচ্ছিলাম। আমরা প্যাটেলদের দোকানের সামনা থকে চলতে চলতে কৃপাংশুর বাড়ির সামনে এসে যাই। সন্ধ্যা তখন দ্রুত ঘনিয়ে আসে। চারিদিকের ঘর বাড়ি ও রাস্তার বাতিগুলো জ্বলতে থাকে। আমি সুজিতকে বলি - সুজিত, কিছুক্ষণ পরই আমরা নিউইয়র্ক ফিরে যাচ্ছি। তুই ভালো থাকিস। Wish your bowels to be in order আগামীতে আবার যদি আসি দেখা হবে। প্রত্যুত্তরে সুজিতের কণ্ঠ নিঃসৃত আওয়াজ কানে বাজে। শুনতে পাই OK, wish you all the best, bye সুজিতের সাথে বার্তালাপের পর মোবাইলটা অফ করে ভালোভাবে সামনে নজর দিতেই দেখি কৃপাংশুর বাড়িতে গ্যারেজের মুখে গাড়ি দাঁড়ানো। গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে ও আমাকে নামতে বলে। দুজনেই গাড়ি থেকে নেমে সোজা চলে যাই বাড়ির ড্রইং রুমে।
আগামীকাল সকালবেলা লা-গার্ডিয়া এয়ারপোর্ট থেকে ডেট্রয়েটে যাওয়ার ফ্লাইট আমাদেরকে ধরতে হবে। তাই আজরাতেই রোসিলি পার্ক থেকে ফার রক এওয়েতে ফিরে যাবো। কৃপাংশু ড্রাইভ করে আমাদেরকে ফাররক এওয়েতে পৌঁছে দিয়ে আবার নিউজার্সিতে নিজেদের বাড়িতে ফিরবে। এই হেকটিক ভ্রমণ সূচীর জন্যই আমাদেরকে সন্ধ্যারাতের সামান্য পরেই রোসিলি পার্ক থেকে রওয়ানা দেওয়া উচিত।
আমি আর কৃপাংশু ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকেই শিবানী ডিনারের ব্যবস্থাপনায় নিজেকে ব্যস্ত রাখেন। অতিথি রুবি অবশ্য পাশে ছিল। কিন্তু ডিনার প্রস্তুতির ব্যাপারে তার সহযোগের আন্তরিক আগ্রহকে সুগৃহিণী শিবানী একেবারেই পাত্তা দেয়নি। ওকে পাশে বসিয়ে কাজ করতে করতে তাঁর বিগত তিনদশকের প্রবাস জীবনের চাকুরী, দেশ থেকে মা বাবা এবং অন্যান্য আত্মীয় স্বজনদেরকে এদেশে ভ্রমণের জন্য আনয়ন এবং আরো সব দৈনন্দিন জীবন যাপনের খুটিনাটি কাহিনি আন্তরিকভাবে ব্যক্ত করে রুবিকে যথার্থই আপন করে নেয়।
ড্রইং রুমে বসে ফাররক এওয়েতে ফিরার জন্য সন্ধ্যারাতের কিছু পরেই রোসিলি পার্ক থেকে আমাদের রওয়ানা হওয়া উচিত বলে যখন ভাবি তার অল্পক্ষণ পরেই ডাইনিং রুমে যাওয়ার ডাক পড়ে। কাল বিলম্ব না করে আমরা ডাইনিং রুমে যাই। শিবানী আমিষ নিরামিষের রকমারি খাবার খুব আকর্ষণীয় করে টেবিলের উপর সাজিয়ে রেখেছে।
আমি কৃপাংশু আর অঙ্কুর একদিকে বসি। অন্যদিকে রুবি আর শিবানী। সবাই বুফে পদ্ধতিতে নিজ নিজ সুস্বাদু খাবার নিজের প্লেটে নিয়ে খাই। তবে আমার খাওয়ার মধ্যে একটা তাড়াহুড়া ভাব ছিল। কারণ, আমাদেরকে ফাররক এওয়েতে পৌছিয়ে কৃপাংশুকে তার বাড়িতে ফিরে আসতে রাতের প্রায় শেষ প্রহর হয়ে যাবে। এই ভাবনাটা আমাকে পীড়া দেয় যদিও কৃপাংশু এবং তাঁর স্ত্রী শিবানীর আথিতেয়তার পরাকাষ্ঠায় আমি আমোদিত।
সে যাই হোক, ডিনার পর্ব তাড়াতাড়িই শেষ করে নেই। এখন রোসিলি পার্ক থেকে আমাদের বিদায়ের পালা। ফাররক এওয়েতে আমাদেরকে পৌঁছে দিয়ে আবার ফিরে আসতে কৃপাংশুকে একা ছাড়তে শিবানী নারাজ। তাই শিবানীও সঙ্গী হয়। আমাদেরকে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দিয়ে ওরা দুজনই পাশাপাশি থেকে নিশুতি রাতে নিউইয়র্ক শহরের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাড়িতে ফিরবে।
তাড়াতাড়ি রওয়ানা হবো বলে প্রস্তুতি নিলেও রাত দশটার আগে ঘর থেকে বেরনো সম্ভব হয়নি। গ্যারেজের বাইরেই গাড়ি দাঁড় করানো ছিল। কৃপাংশু ড্রাইভিং সীটে বসার পর আমি তার ডানদিকে গিয়ে বসি। পিছনের সীটে রুবি আর শিবানী পাশাপাশি বসে। শ্রীমান অঙ্কুর ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আমাদেরকে দেখছে। ও একাই এখন বাড়িতে থাকবে। কৃপাংশু গাড়ি স্টার্ট দেয়। গাড়ি থেকে মুখ বের করে অঙ্কুরের দিকে তাকিয়ে আমি হাত নাড়াই।
রোসিলি পার্কের বেন্ডার এভিনিউ দিয়ে গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে। কিছুদূর এগিয়ে মোড় ঘুরে বড় রাস্তায় গিয়েই গাড়ির গতিবেগ বাড়তে থাকে। অল্প সময়ের মধ্যেই এলিজাবেথ শহরের ডাউন টাউন এলাকা পার হয়ে গাড়ি চলে যায় চারলাইনের হাইওয়েতে। তখন গাড়ির পেছনে গাড়ি, গাড়ির ডানে বায়ে গাড়ি, গাড়ি আর গাড়ি, কেবল গাড়ি। চলার পথে সামনে ক্রসিং এসে গেলেই এরকম গাড়ির মহামিছিল নজরে পড়ে। তারপর ক্রসিং এ এসে গাড়ি গুলো ডানে বায়ে এবং সামনের পথ দিয়ে ত্রিধা বিভক্ত হয়ে চলে যাওয়ার পর চলতি রাস্তায় গাড়ির ভিড় কমে যায়। রাস্তায় গাড়ির ভিড় কমে গেলে, চলন্ত গাড়িতে বসে সামনে এবং ডানে বায়ের দৃশ্যগুলো নজরে পরে। রাতে বিজলী বাতির রোশনাইয়ে দূরের উঁচু নিচু জায়গার চলমান দৃশ্যপট অতি রমনীয়। রাতের নিউইয়র্কের রাজপথ দিয়ে দুর্বার গতিতে চলতে চলতে গাড়ির মহামিছিল এবং রমনীয় চলমান দৃশ্যপট পর্যায়ক্রমে অবলোকন করতে থাকি। কৃপাংশু একনিষ্ঠভাবে ষ্টীয়ারিং ধরে দক্ষতার সহিত গাড়ি চালিয়ে আমাদেরকে নিয়ে এগিয়ে চলে অকুস্থলের দিকে। এভাবেই চলতে চলতে একসময় গুগুলের রুট ম্যাপ দেখে গাড়ির গতিবেগ কমিয়ে দেয়। আস্তে আস্তে গাড়ি রাস্তার পাশেই থেমে যায়। কৃপাংশু বলে- অপরেশ, তোমার আবাসনের ঠিক নিচেই আমরা এসে গেছি। কৃপাংশুর একথা শুনে আমি কিছুটা আশ্চর্য হই। মনে মনে ভাবি, এত তাড়াতাড়ি কি করে এসে গেলাম? ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সময় রাত্রি বারোটা বেজে পাঁচ মিনিট। তাহলেতো সময় ঠিকই লেগেছে। আমরা গাড়ি থেকে সবাই নেমে পড়ি। কৃপাংশু আমাকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলে - ঐ দেখো চল্লিশতম বীচ স্ট্রীটের বহুতল অট্টালিকা। এই অট্টালিকার 8B/F নম্বর আবাসনই তোমাদের। হ্যাঁ ঠিকতো, আমরা আমাদের আবাসনের ঠিক নিচেই এসে দাঁড়িয়েছি। নিচ থেকে এলিভেটর চড়ে আমাদের নির্দিষ্ট জায়গায় যেতে কোন অসুবিধা হবে না। কৃপাংশু আর শিবানীকে আবার দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে নিউজার্সির রোসিলি পার্কে ওদের বাড়িতে ফিরতে হবে। তাই আমাদের জন্য অহেতুক দেরী না করে ওদেরকে গাড়িতে ওঠার জন্য অনুরোধ করি। কৃপাংশু ড্রাইভিং সীটে বসে ষ্টীয়ারিং এ হাত দেয়। শিবানীও কৃপাংশুর ডান পাশের সীটে বসে। গাড়ি সচল হওয়ার সাথে সাথে কৃপাংশু এবং শিবানী দুজনই হাত নেড়ে বলে গুডনাইট। সাথে সাথে আমাদের মুখ দিয়েও অনায়াসে উচ্চারিত হয় গুড নাইট।
আমাদেরকে পিছে ফেলে গাড়ি এগিয়ে চলে। ক্রমশই গাড়ির দূরত্ব বাড়তে থাকে। মাঝরাতে বন্ধু ও বন্ধু পত্নীর বিদায় দৃশ্যে মন খুবই বিষণ্ণ হয়। বিষণ্ণচিত্তেই ফার রক এওয়ের নির্জন রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকি যতক্ষণ না গাড়িটা দৃষ্টির অগোচরে চলে যায়।
আমরা যে নিউজার্সি থেকে ফাররক এওয়েতে মাঝরাতে ফিরব খবরটা বাবলুর জানা ছিল। সে ঘুমোতে যায়নি। আমাদের অপেক্ষায় ল্যাপটপ নিয়ে অন্য কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখে। এলিভেটর চড়ে ন’তালাতে ওঠে 8B/F আবাসনের ডোরবেল চাপ দেই। বাবলু এসে দরজা খুলে দেয়। ঘরে প্রবেশ করেই নিজেদের রাত্রি যাপনের নির্দিষ্ট কক্ষে চলে যাই। আগামীকাল ভোরবেলা আমাদেরকে লা-গার্ডিয়া এয়ারপোর্টে যেতে হবে। সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার মত যা কিছু লটবহর তা আগেই গোছগাছ করে রাখা হয়েছিল। তাই যাওয়ার প্রাক্ প্রস্তুতির বিশেষ কিছু নাই। সারাদিনের ঝাটিকা সফরের ক্লান্তি নিরসনে এখন বিছানায় আশ্রয় নেওয়াটাই জরুরী। পরনের কাপড় পালটে হাত পা ধুয়ে বিছানায় সটান হই। সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে মধ্যরাতের পর বিছানায় গেলেও চোখে ঘুম নেই। কৃপাংশু এবং শিবানীর কথা নিয়েই মনে তোলপাড় হয়। স্বাভাবিক ভাবে গাড়ি চলতে থাকলেও দু ঘণ্টার আগে ওরা বাড়িতে পৌঁছতে পারবে না। কিছুক্ষণ পর পরই ঘড়ি দেখি। কিন্তু সময় যেন ধীর লয়ে চলছে। বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করি। মনে মনে ভাবি, আমরা নিজেরা গাড়ি নিয়ে গেলে ওদেরকে এতটা ঝামেলা পোহাতে হতো না। এটা ভাবার পর তৎক্ষণাৎ আবার মনে হয় আমার এরকম ভাবাটা ঠিক নয়। কারণ কৃপাংশুতൊ আর আমার মতো নয়। কৃপাংশু কৃপাংশুই। নিজ স্বার্থ ব্যতিরেকে আমি যে কাজ করতে গিয়ে দুপা পিছিয়ে যাই সে কাজ করতে কৃপাংশু নির্দ্ধিধায় তিন পা এগিয়ে যায়।
নিউজার্সির রোসিলি পার্কের বাড়ি থেকে নিউইয়র্কের ফাররক এওয়েতে এসে পূর্বতন সহকর্মীকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া এবং পরে আবার নিশুতি রাতে পৌঁছে দিয়ে নিজের বাড়িতে ফেরার মত কৃপাংশুর আরো অনেক বিশেষ ঘটনা পূর্বে প্রত্যক্ষ করেছি। তাই আমরা নিজেদের গাড়ি না নেওয়ায় ওদেরকে ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে ভাবনাটা মনে স্থান দিয়ে কৃপাংশুর চারিত্রিক বৈশিষ্টকে খাটো করছি বলেই মনে অপরাধবোধ জাগে। এরকম ভাবতে ভারতে রাত আরো গভীর হয়। ঘড়িতে নজর দিয়ে দেখি দুটো বেজে পাঁচ মিনিট। কৃপাংশুরা এখান থেকে রওয়ানা হওয়ার পর দু ঘণ্টা অতিক্রান্ত হয়েছে। এত সময়ে ওদের বাড়িতে পৌঁছে যাওয়ার কথা। আমি মোবাইল নিয়ে কৃপাংশুকে ফোন করি। ওর মোবাইল বাজতে থাকে। সামান্য পরেই মেয়েলি কণ্ঠের আওয়াজ কানে ভেসে আসে। শুনতে পাই-হ্যালো, মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই বাড়িতে পৌঁছে যাচ্ছি। আপনি চিন্তা করবেন না, এখন ঘুমুন।
পরদিন পূর্বসূচী অনুযায়ীই সকালবেলা লা-গার্ডিয়া এয়ারপোের্ট থেকে উড়ানে ডেট্রয়েট এয়ারপোর্টে অবতরণ করি। অশোকতরু আমাদেরকে ডেট্রয়েট থেকে পরবাসের আস্তানা আববার্ণ হিলসের এডামস্ ক্রীক এপার্টমেন্টে নিয়ে আসে। আমাদের ভিসার ম্যায়াদ আর দু সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। ছেলে, বৌমা এবং নাতিকে বিদেশে রেখে আমাদেরকে দেশে ফিরতে হবে। দেশ ফিরার প্রস্তুতিতে খুব ব্যস্ততার মধ্যেই কেবল নিজেদেরকে নিয়ে দিনগুলো কাটে। দেশে নিজের বাড়িতে ফিরে এসে কৃপাংশুর সাথে যোগাযোগ হয়। ই-মেল করেই খবর বার্তা এবং শুভেচ্ছা বিনিময় হয়। কিছুদিন পর কম্পিউটার সচল করে নিজের ই-মেল এড্রেসে আসা খবরগুলো দেখছি, হঠাৎ একটা জায়গায় নজর পড়ে চোখ স্থির হয়ে যায়। কৃপাংশু আমাকে লিখেছে- “অপরেশ, শিবানী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। আমি জানতাম সে আমার আগে চলে যাবে।” আমি মর্মাহত হই। শিবানী বেঁচে থাকলে ওর সাথে আর কোনদিন সাক্ষাতে আলাপ করার সুযোগ কিংবা ওর কথা নিয়ে বেশি ভাববার অবকাশ আমার হতো কি না জানিনা, তবে তাঁর অকাল প্রয়াণের খবর পাওয়ার পর আরো বেশি করে তাঁর স্বল্পকালের আতিথেয়তার চিত্রপট আমার মানসচক্ষে সময়ে সময়ে ভেসে ওঠে এবং নিউইয়র্কে দিন যাপনের শেষপর্বে নিশুতি রাতে মোবাইলে বয়ে আনা তাঁর মুখ নিঃসৃত মধুর কথাকলি আমার কর্ণকুহরে বাজে। আমি শুনতে পাই-হ্যালো ভৌমিক বাবু, আমরা মিনিট পাচেকের মধ্যেই বাড়িতে পৌঁছে যাচ্ছি। আপনি চিন্তা করবেন না, এখন ঘুমুন। শিবানীর কথা দিনকয়েক লাগাতার আমার মনকে আচ্ছন্ন করে রাখে। কাজের অবসরে নিভৃতে একাকী থাকলেই ওদের সঙ্গে নিউইয়র্ক এবং নিউজার্সিতে দিনভর। সময় কাটানোর ঘটনাবলী মনে উঁকি দেয়। এরকম অবস্থাতেই কয়েকদিন পর রাতে ছেলে শ্রীমান অশোকতরুর ফোন আসে। আমাদের কুশলবার্তা জানার পর সে বলে - বাবা বাবলু মামা গতকাল মারা গেছেন। বাবলু মামার মেয়ে এনির বর রাজদীপ নন্দী আমাকে ফোনে খবরটা দিয়েছে। এখবর পাওয়ার পর বিমর্ষতা আমাকে কাবু করে। আমার প্রবাসের শেষ ভ্রমণে যাদের সহযোগীতায় প্রভূত আনন্দের খোরাক সঞ্চয় হয়েছিল, তাদের দুজনকে পরপর চিরদিনের জন্য হারিয়ে মন ব্যথাতুর হয়। মৃত্যু জীবনের শেষ পরিণতি। কেহরই মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই নেই। স্থিতধী মহাপুরুষেরা অবশ্য কারো মৃত্যুতে বিয়োগ ব্যথায় শোকাহত হন না। নানা জায়গায় পণ্ডিতেরা উল্লেখ করেছেন, শোক সবকিছু নাশ করে এবং শোকের সমান শত্রু নেই। কিন্তু আমরা ছাপোষা মানুষ, স্বজন কিংবা পরিচিত জনদের অকালে চলে যাওয়ার ঘটনায় মর্মাহত না হয়ে পারি না, শোকে আকুল হই। তবে এটাও ঠিক বাবলু ও শিবানীকে নিয়ে জড়িত নিউইয়র্ক ও নিউজার্সির স্বল্পকালীন সফরের ঘটনাবলী সজ্ঞানে জীবদ্দশায় আমার স্মৃতির মণিকোঠায় অমলিনই থাকবে।