আমেরিকায় আমাদের প্রথম প্রবাস ছিল মিশিগান রাজ্যের আববাার্ণ হিলস্ শহরের এডামস্ ক্রীক এপার্টমেন্টে। আববার্ণ হিলস্ শহরেই ছিল ক্রাইসলার কোম্পানীর বড় অফিস। ক্রাইসলার হলো আমেরিকায় মটর তৈরির বিখ্যাত কোম্পানী। এক সময় জার্মানের ডেইমলার কোম্পানীর সাথে যুক্ত হয়ে ক্রাইসলার এণ্ড ডেইমলার নামে ওরা পৃথিবীজুড়ে মটর তৈরির ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিল। আমার ছেলে শ্রীমান অশোকতরু ব্যাঙ্গালোর শহরেই ডেইমলার কোম্পানীর নিযুক্তি পেয়ে প্রথমে জার্মানের স্কুট গার্ট শহরে কিছুদিন কাজ করে পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান রাজ্যের আববার্ণ হিলস্ শহরে বদলি হয়ে যায়। আববার্ণ হিলস্ শহরটি আবার আমেরিকার বিখ্যাত অটোমোবাইল সিটি ডেট্রয়েটের লাগোয়া শহর। ডেট্রয়েট শহরটি এক সময়ে পৃথিবীর সেরা মোটর গাড়ি উৎপাদনের কেন্দ্র ছিল। বর্তমানে অবশ্য ডেট্রয়েট তার পুরাতন ঐতিহ্যের ঠাট রাখতে পারেনি। ফোর্ড, জেনারেল মটরস, চেভ্রলেট প্রভৃতি কোম্পানীর এক সময়ের চাকচিক্যপূর্ণ বৃহৎ বৃহৎ অট্টালিকাগুলো বর্তমানে ভগ্নদশা প্রাপ্ত ও জরাজীর্ণ অবস্থায় বিরাজমান।
সে যাহোক, ডেট্রয়েট শহরের পার্শ্ববর্তী আববার্ণ হিলস্ এর এডামস্ ক্রীক এপার্টমেন্টে আমাদের বসবাসের সুযোগ হয়েছিল ছেলে শ্রীমান অশোকতরুর চাকুরীর সুবাদে। যে সময়টাতে আমরা সেখানে ছিলাম সেটা শীতকাল। মিশিগান রাজ্যের ডেট্রয়েট এবং তার আশে পাশের শহরগুলোতে শীতের প্রকোপ খুব বেশি। স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগো বিশ্বধর্ম সম্মেলনে যোগদানের পর আমেরিকায় থাকাকালীন সময়ে ডেট্রয়েট পরিভ্রমণ করেছিলেন এবং তাঁর লেখনীতে ডেট্রয়েটে অত্যাধিক শীতের প্রকোপ সম্বন্ধে উল্লেখ রয়েছে।
আমরা আববার্ণ হিলসে বসবাসের প্রায় একমাস সময় অবধি দিনের বেলায় আকাশে কোনদিন সূর্যকে দেখতে পাইনি। গাছপালা, বাড়িঘর এবং পায়ে হাটার রাস্তাঘাট বরফে আচ্ছাদিত থাকত। তাপমাত্রা বিয়োেগ চিহ্ন সামনে রেখে তিনডিগ্রী থেকে নয় ডিগ্রী পর্যন্ত উঠানামা করত। সেখানকার শীতের প্রকোপ যে কি রকম সেটা উপলব্ধি করেছি।
শীতের জন্য আমাদের সে সময়ে ঘরের বাইরে গিয়ে ঘুরাঘুরি প্রায় বন্ধ। তবে জীবন ধারণের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির জন্য সপ্তাহান্তে বিভিন্ন শপিং মল কিংবা ওয়ালমার্টে ছেলের সঙ্গী হয়ে যেতে হতো। সে সময়ে মাথা কান ঢেকে গায়ে শীত নিরোধক পোষাক ভালভাবে চাপিয়ে একই ছাতের নিচে এয়ার কন্ডিশন বাসগৃহ সংলগ্ন গ্যারেজে গিয়ে গাড়িতে বসতাম। তারপর ছেলে ড্রাইভিং সীটে বসে রিমোট কন্ট্রোলে গাড়ি ঘরের দরজা উঠিয়ে ড্রাইভ করে নিয়ে চলে যেত নিকটবর্তী শপিং মল কিংবা ওয়ালমার্টে।
প্রত্যেক শপিংমল কিংবা ওয়ালমার্টের সামনে থাকে বিশাল এলাকাজুড়ে উন্মুক্ত শান বাঁধানো পার্কিং জোন। সেখানে গাড়ি পার্ক করে চট জলদি আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত সুরম্য বিশাল মলের ভিতর প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢুকে গেলেই আর কনকনে ঠাণ্ডার কোন ঝাপটা নেই। শপিং মল কিংবা ওয়ালমার্টের ভিতর আলাদা আলাদা এলাকাজুড়ে সারিবদ্ধভাবে সুদৃশ্য রকমারি আলমিড়া এবং র্যাকে সাজানো থাকে আমিষ নিরামিষ ভোজনের আহার সামগ্রী ও ঘরকন্নার আনুষঙ্গিক যাবতীয় জিনিসপত্র। মল, ওয়ালমার্ট বা অন্য যেকোন বিপণন কেন্দ্রই হোক না কেন সেটার প্রবেশদ্বারের পাশেই কিছুটা জায়গাজুড়ে ক্রেতাদের দ্রব্য সামগ্রী বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ট্রলি রাখা হয়। প্রবেশদ্বার দিয়ে বিপণন কেন্দ্রে ঢুকে প্রথমেই ক্রেতাকে সেখান থেকে একটা ট্রলি সংগ্রহ করে ঠেলতে ঠেলতে চলে যেতে হয় বিপণন কেন্দ্রের বিভিন্ন স্থানে থাকে থাকে সাজানো রকমারি দ্রব্যের বিপুল সম্ভার থেকে নিজের চাহিদা মত জিনিস তুলে নিতে। এক এক করে প্রয়োজনমত সকল জিনিস নিজ হাতে সংগ্রহ করে ট্রলিতে ভরে এগুতে হয় বিপণন কেন্দ্রের বহির্পথের দিকে।
বিপণন কেন্দ্রের বহির্পথের সামান্য কিছু আগেই অনেকগুলো সারিবদ্ধ কাউন্টার থাকে। সেখানে বিপণন কেন্দ্রের কর্মীরা স্ক্যানিং মেশিন ও কম্পিউটারের সাহায্যে ট্রলিতে রাখা জিনিসগুলোর তালিকা ও তৎসহ মূল্য নির্দ্ধারণ করে তার প্রিন্ট আউট ক্রেতাদেরকে দেন। ক্রেতারা সাধারণতঃ তাদের ক্রেডিট কার্ড ঘসেই বিনিময় মূল্য চুকে দিয়ে জিনিসপত্র ট্রলিতে রেখেই সেটা আবার ঠেলতে ঠেলতে বাইরে পার্কিং জোনে রাখা নিজ গাড়ির সামনে নিয়ে যায়। বাজার করা দ্রব্য সামগ্রী নিজ গাড়িতে তুলে খালি ট্রলিটি পার্কিং জোনেই নির্দ্ধারিত জায়গায় রেখে যে যার নিজ নিজ গন্তব্যস্থলে রওয়ানা দেয়।
বসবাসের বিস্তৃত এলাকা জুড়ে শীত দুর্দন্ড প্রতাপে তার আধিপত্য বিস্তার করলেও ঘর, গাড়ি কিংবা শপিংমলের ভিতর কখনও হাড়কাপানো শীতের কামড়ে জবুতবু হতে হয় না। শীততাপ নিয়ন্ত্রণের অতি উত্তম ব্যবস্থা বিদ্ধমান থাকায় প্রচণ্ড শীতের মধ্যেও দৈনন্দিন জীবন যাপনে আরাম আয়াসে চলার কোন খামতি নেই।
প্রথম প্রথম নূতন ব্যতিক্রমী আবহাওয়া এবং পরিবেশে চলাফেরা করতে কিছুটা বেমানান লাগলেও কয়েকদিনের মধ্যেই ধাতস্থ হয়ে যাই। সুন্দর সুন্দর বাড়ি ঘর, পরিছন্ন রাস্তাঘাট, আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি বিশাল বিশাল নয়নাভিরাম স্থাপত্য প্রভৃতি দেখে খুবই ভালো লাগে। ধুলাবালি নেই, কাদা নেই, পথেঘাটে আবর্জনার স্তুপ কোথাও নজরে পড়ে না। নেই লোড শেডিং এবং গুমোট অন্ধকার। শপিংমল কিংবা ওয়ালমার্টে আহার সামগ্রী এবং ঘরকন্নার জিনিস খরিদ করতে গিয়ে কোন উটকো ঝামেলা নেই। জিনিসের দাম নিয়ে নেই ক্রেতা বিক্রেতার দর কষাকষি এবং গুণমান নিয়ে নেই বাদানুবাদ। সেখানকার এরকম প্রচলিত অবস্থায় চলাফেরা এবং দিন গুজরান করতে ভালোই লাগে। তবে ছোটবেলা থেকে চুল পাকা বয়স অবধি দীর্ঘদিন যে সব ধ্যান ধারণা মনের মধ্যে বেশ গভীর ভাবেই দখল করে রেখেছিলো, এখানে এসে কোন কোন ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রমী প্রকাশ দেখে খুব আশ্চর্য হয়ে যাই।
ছ’মাস করে তিনবার আমেরিকার বিভিন্ন শহরে প্রবাসের সময় ওয়ালমার্ট, মল মাঈয়ার এবং হাইবী প্রভৃতি বিপণন কেন্দ্রের প্রত্যেকটিতে অনেকবার আসা যাওয়া করেছি। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, নানা রকমের সব্জি প্রভৃতি আহার সামগ্রী এবং ঘর-কন্নার আরো নানা রকম জিনিস মনের আনন্দেই ছেলের সঙ্গী হয়ে কেনাকাটা করেছি। শাক সব্জি, ফলমূল প্রভৃতি আহার দ্রব্য ছাড়া বাকী ঘরকন্নার অন্যান্য প্যাকেটজাত দ্রব্য গুলো কেনার সময় সেগুলোর প্রস্তুতকারকের নামটা জেনে নেওয়ার কৌতূহল হতো। কিন্তু কি আশ্চর্য! কোনদিন এমন একটা জিনিসও আমার নজরে পড়েনি যাতে লিখা আছে মেইড ইন ইউ,এস,এ। বেশির ভাগ জিনিসগুলোতে মেইড ইন চায়না ছাপমারা। সূচ সূতা থেকে আরম্ভ করে কাপ প্লেইট, বাসন পত্র, কাপড় চোপড়, সেলাই মেশিন, ইলেকট্রনিক গ্যাজেট, ওয়াশিং মেশিনের পার্টস এবং আরো সব নিত্য ব্যবহার্য জিনিসগুলোর নিচে দেখা যায় মেইড ইন চায়না ছাপমারা। চীনে উৎপাদিত দ্রব্য সামগ্রী আমেরিকা যুক্ত রাজ্যের বিপণন কেন্দ্র, ওয়ালমার্ট ও মলগুলিতে আমেরিকাবাসী ক্রেতাদের সিংহভাগ চাহিদা পূরণ করে থাকে। এ ব্যাপারটা আমার কাছে খুবই বেমানান ঠেকে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই কম্যুনিষ্ট ভাবধারায় অনুপ্রাণিত তৃতীয় বিশ্বের রাজনৈতিক দলগুলো আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদকে দুনিয়ার নিপীড়িত জনগণের চরম শত্রু বলে চিহ্নিত করে আসছে। আবার ওদের মতে মাও সে তুঙের নেতৃত্বাধীন কম্যুনিষ্ট চীনই হলো বিশ্বের নিপীড়িত জনগণের মুক্তির দিশারী। বিশ্বের মুক্তিকামী সংগ্রামী জনগণ চীনের কম্যুনিষ্ট ভাবধারায় সাম্রাজ্যবাদী দেশ আমেরিকাকে পর্যদুস্ত করে নিজ দেশে কম্যুনিষ্ট শাসন ব্যবস্থা কায়েম হউক সেটাই চায়। কয়েক দশক ধরেই আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদ আর কম্যুনিষ্ট চীনের সম্পর্ক অহিনকুল। কিন্তু কোন জাদুতে নিপীড়িত জনগণের মুক্তির দিশারী কম্যুনিষ্ট চীনের উৎপাদিত দ্রব্য সামগ্রী সাম্রাজ্যবাদের ধ্বজাধারী আমেরিকার খোলা বাজারে বর্তমানে বিপুলভাবে সমাদৃত? এটা ভাবতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলি। শুধু তাই নয়, আরো বেশি আশ্চর্য হই যখন জানতে পারি যে, চীনের পূর্ব উপকুলে অবস্থিত জিয়াংসু প্রদেশে পিপলস রিপাবলিক অফ চায়না ১৯৯২ ইংরাজিতে ওয়ালমার্টের প্রতিষ্ঠাতা তথা প্রাণপুরুষ স্যাম ওয়ালটনকে “গোল্ডেন ষ্টার ফরেনার্স এওয়ার্ড” দিয়ে পুরষ্কৃত করেছে। পুরষ্কৃত করার কারণ, স্যাম ওয়ালটন জিয়াংসু প্রদেশের সুঝাউ শহরে অবস্থিত জনগণের মালিকানাধীন ফ্যাক্টরী গুলো উন্নয়নের জন্য নিরলস প্রচেষ্টা ও সহায়তা করেছেন।
আমেরিকায় আমার তিন দফায় মোট দেড় বছর প্রবাসকালে মিশিগান রাজ্যের আববার্ণ হিলসে ছ মাস, কেনটাকি রাজ্যের বাউলীং গ্রীন শহরে পাঁচ মাস, আরকানসাস রাজ্যের বেনটনভাইলে একমাস এবং নেব্রাস্কার ওমাহা শহরে ছমাস থেকেছি। তাছাড়া ঐসব জায়গায় বসবাসকালীন ছুটির দিনে ভ্রমণচ্ছলে আরো কিছু কিছু জায়গায় গিয়েছি। সেগুলো হলো শিকাগো, নিউইয়র্ক, নিউজার্সি, পিটসবার্গ, ন্যাসভাইল, হোজেনভাইল, মেমফীস, লিটিলরক এবং তুলসা প্রভৃতি। যেখানে থেকেছি কিংবা যেসব জায়গাতে গিয়েছি সেখানে কেবলমাত্র ভারত ও বাংলাদেশের প্রবাসীদের সাথেই যোগাযোগ এবং মেলামেশা হয়েছে। খোদ আমেরিকান মেম সাহেবদের সাথে চলাফেরার কোন সুযোগ হয়নি। নিজ থেকেও মেলামেশার কোন আগ্রহ প্রকাশ করিনি। বাজার হাট করতে গিয়ে মল, ওয়ালমার্ট কিংবা বিভিন্ন জায়গায় চলাচলের সময় দূর থেকেই ওদেরকে দেখেছি। কাজেই স্থানীয় মেম সাহেবদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মতাদর্শ সম্পর্কে ওদের মুখ থেকে শুনা হয়নি। যা কিছু সামান্য আঁচ করা যায় তা টেলিভিশনে দেখে বা পত্র পত্রিকা পাঠ করেই। তবে সমগ্র আমেরিকা যুক্তরাজ্যে সরকার কর্তৃক যে তিনটি দিবস জাতীয় স্তরে পালিত হয় সেটাতে আমেরিকাবাসীর আন্তরিক ও স্বতঃস্ফূর্ত যোগদানে তাদের জাতীয় চরিত্র, নীতিবোধ ও দেশ প্রেমের স্বরূপ প্রকাশিত হয়ে থাকে। জাতীয় স্তরে পালিত তিনটি দিবসের প্রথমটি হলো ৪ জুলাই আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস। দ্বিতীয়টি হলো মেমোরিয়েল ডে। তৃতীয়টি লেবার ডে।
প্রতি বৎসর মে মাসের শেষ সোমবার দিনটি আমেরিকায় জাতীয় ছুটির দিন। সেটাই হলো মেমোরিয়েল ডে। ঐদিনে কোরিয়া, ভিয়েতনাম এবং পৃথিবীর অন্যান্য দেশে আমেরিকার যে সকল সৈনিক নিহত হয়েছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয়। দেশের নানা স্থানে তাদের স্মৃতি সৌধে পুষ্পার্ঘ নিবেদন, স্মরণ মনন এবং গৌরবগাথা নিয়ে আলোচনা হয়। আবার সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সোমবার দিনটা আমেরিকায় জাতীয় স্তরে লেবার ডে হিসাবে পালিত হয়। সেদিন দেশের সম্পদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে শ্রমজীবি মানুষের অবদানের কথা স্মরণ করে তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়।
পঞ্চাশের দশকের প্রথমার্ধ থেকে সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত পূর্ব এশিয়ার কোরিয়া এবং ভিয়েতনামে কম্যুনিষ্টদের অগ্রগতিকে স্তব্ধ করে দিতে আমেরিকার যে ভূমিকা ছিল, সারা বিশ্বের মার্কসবাদে বিশ্বাসীদের বিচারধারায় সেটা ছিল খুবই অন্যায়। কেন আমেরিকা নিজ দেশের সৈন্য সামন্ত নিয়ে দূর দূরান্তে অবস্থিত অনুন্নত দেশে পুতুল সরকার গঠন করে সে দেশের মুক্তিকামী জনগণের সংগ্রামকে গুড়িয়ে দিতে নির্মমভাবে সামরিক অভিযান চালাবে? এ প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই সাধারণ জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয় এবং আমেরিাককে অনুন্নত দেশের জনস্বার্থ বিরোধী সাম্রাজ্যবাদী হিসাবেই চিহ্নিত করে।
এ ধারণার বশবর্তী হয়েই আমাদের মনে হতো রাষ্ট্র পরিচালনায় আমেরিকা ও চীনের ভূমিকা পরস্পর বিরোধী। বিশ্ব রাজনীতিতে এই দুই দেশের অবস্থান বিপরীত মেরুতে। কিন্তু আজ দেখা যায় আমেরিকা যুক্ত রাজ্যের আভ্যন্তরীণ বাজারে চীনে উৎপাদিত দ্রব্য সামগ্রী ছেয়ে ফেলেছে। চীন দেশ থেকে দলে দলে যুবকেরা এসে আমেরিকার কোম্পানীগুলোতে কর্মরত। চীনা অভিবাসীরা আমেরিকায় সাদরে লালিত। তবে আমেরিকায় শুধু যে চীনা অভিবাসীরা লালিত তাই নয়। যে ভিয়েতনামে দীর্ঘ এক দশক সময় ব্যাপী ভিয়েতকং নিধনযজ্ঞে আমেরিকার সৈনিকরা নিয়োজিত ছিল সেই ভিয়েতনামেরই বিপুল সংখ্যক লোক আজ আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছে।
আমেরিকায় আমার প্রবাসকালের শেষ দফায় ছমাস নেব্রাস্কা রাজ্যের ওমাহা শহরে কাটাতে হয়। সে সময় ওমাহা শহরের ডাউন টাউনের অনতিদূরে ডজরোডের পাশে অবস্থিত এশিয়ান মার্ট নামক বিপণন কেন্দ্রে যাওয়া আসার সময় ওমাহাতে বিপুল সংখ্যক ভিয়েতনামীদের বসবাস সম্পর্কে অবগত হই। ওমাহা শহরে বিপুল হারে ভিয়েতনামীরা এসে বসবাস করার খবর জানার সাথে সাথে এটাও জানতে পারি যে ওমাহা শহর এবং তার পাশ্ববর্তী অঞ্চল থেকে বিপুল সংখ্যক লোক আমেরিকার সৈন্য বিভাগে যোগ দিয়ে কোরিয়া ও ভিয়েতনামে যুদ্ধ করেছে। সেই যুদ্ধে অনেক ওমাহাবাসী সৈনিক প্রাণ হারিয়েছে আবার অনেকেই জীবিত অবস্থায় স্বদেশে ফিরে এসে বিভিন্ন বৃত্তিতে নিয়োজিত হয়ে জীবন যাপন করে এখন বার্দ্ধক্যের দোরগড়ায়।
আমেরিকার যে সকল সৈনিক দেশের হয়ে যুদ্ধ করে কোরিয়া, ভিয়েতনাম কিংবা বিদেশে আরো অন্য কোন দেশে নিহত হয়েছেন তাদেরকে মেমোরিয়েল ডে তে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। আবার যে সকল সৈনিক জীবিত অবস্থায় স্বদেশে ফিরে এসে এখনো জীবন যাপন করছেন তাদেরকেও বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানানো হয়। বিগত ২০১২ ইংরাজির ৩ জুলাই অর্থাৎ আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস পালনের একদিন পূর্বে ওমাহা শহরে অনুষ্ঠিত হয় শীতল যুদ্ধ বিজয়ের অভিবাদন (Cold war victory Salute) অনুষ্ঠান।
এই শীতল যুদ্ধ বিজয়ের অভিবাদন অনুষ্ঠানে ওমাহার জীবিত প্রাক্তন সৈনিক যারা কোরিয়া এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন তারা পরিবার সহ উপস্থিত থাকেন এবং ওমাহা শহরের ডাউনটাউনে সমবেতভাবে পদ যাত্রায় সামিল হন।
শীতলযুদ্ধ বিজয়ের অভিবাদন অনুষ্ঠানে আমেরিকার জাতীয় সামরিক কমাণ্ডার ফ্যাং উং ছিল মার্শাল। ফ্যাং উং জন্মসূত্রে চীনা। ১৯৪৯ সালে মাও সে তুঙের নেতৃত্বে চীনে কম্যুানিষ্ট শাসন প্রবর্তনের এক বৎসর পূর্বে তার জন্ম। চীনে কম্যুনিষ্ট শাসনের শুরুতেই পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সহিত হংকং চলে যায় এবং সেখান থেকে বারো বৎসর বয়সে আমেরিকায় চলে আসে। পরবর্তীতে আমেরিকার সৈনিক হয়ে ভিয়েতনামে যুদ্ধ করে এবং ১৯৮৯ সালে সামরিক বিভাগ থেকে অবসর গ্রহণ করে। এই সমবেত অনুষ্ঠানে তার বক্তব্যে বলেন, বিগত বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে কোরিয়া, ভিয়েতনাম, মধ্যপ্রাচ্য এবং সেন্ট্রাল আমেরিকাতে যে সকল যুদ্ধে আমেরিকা যোগ দিয়েছে সেগুলোই হলো শীতল যুদ্ধ অর্থাৎ কোল্ড ওয়ার।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আনবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পৃথিবীর বুকে যে ধ্বংসলীলা সংশোধিত হয় তার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে এবং বিশ্ব জুড়ে যেন শান্তির বাতাবরণ টিকিয়ে রাখা যায় সে উদ্দেশ্যেই আমেরিকার শীতল যুদ্ধে যোগদান। এসব বলার পর ফ্যাং উং ভিয়েতনামে যুদ্ধরত কিছু কিছু আমেরিকান সৈনিকের স্বদেশ প্রেম ও বীরত্ব পূর্ণ ঘটনা এবং ভিয়েতকং গোরিলাদের হাতে বন্দী অবস্থায় আমেরিকান সৈন্যদের নিষ্ঠুরভাবে নিগৃহীত হওয়ার নির্মম কাহিনি ব্যক্ত করেন। তিনি আরো বলেন যে, পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানীকে পৃথক করে রাখা বার্লিনের প্রাচীর ভাঙ্গা হয়েছে, সোভিয়েত রাশিয়া ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়েছে এবং পৃথিবীর বহু কম্যুনিষ্ট রাষ্ট্রই মুক্ত বাজারে যোগদান করেছে। শেষে এটাও বলেন, দীর্ঘদিনের শীতলযুদ্ধ করে ওরা যে শিক্ষা গ্রহণ করেছে সেটা হলো পারস্পরিক মতবিরোধে ধ্বংসকে আবাহন নয়, শক্তি প্রয়োগেই বিশ্বে শান্তির বাতাবরণ বজায় রাখতে হবে।
ষাটের দশক থেকে সত্তরের দশকের সময়সীমার মধ্যে শীতলযুদ্ধ নামে আখ্যায়িত কোন পরিভাষাই আমাদের জানা ছিল না। আমরা জানতাম ভিয়েতনামে তখন উত্তপ্ত গরমযুদ্ধই চলছে। হো-চি-মিনের নেতৃত্বে দক্ষিণ ভিয়েতনামে কম্যুনিষ্ট শাসন কায়েম করতে ভিয়েতকং গোরিলাদের প্রচেষ্টাকে গুড়িয়ে দিতে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা উড়ে এসে জুড়ে বসে কি ভীষণ সামরিক অভিযানই না চালিয়েছিল। বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে বামপন্থী মতাদর্শের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচার ছিল মুক্তকামী ভিয়েতনামবাসীদের উপর সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার বর্বরোচিত হস্তক্ষেপ। যদিও শেষ পর্যন্ত আমেরিকা লেজে গুবড়ে হয়ে ৩০ এপ্রিল, ১৯৭৫ সালে ভিয়েতনাম থেকে নিজেদেরকে গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
কম্যুনিষ্ট ভিয়েতকংরাই দক্ষিণ ভিয়েতনামে ক্ষমতাসীন হয়। সে সময় আমেরিকা কর্তৃক ভিয়েতনামে সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে আমাদের দেশেও ধিক্কার জানানো হয়। দেশে তখন শিক্ষিত যুব সম্প্রদায়ের কর্ম-সংস্থানের সুযোগ প্রায় বন্ধ। রাজনৈতিক অস্থিরতা চরমে। তখন বিশেষ করে পশ্চিম বাংলার বিশ্ববিদ্যালয়, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং আরো বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে চীনের মাও-সে-তুঙের মতাদর্শে দেশ গঠনের কাজে ঝাপিয়ে পড়ে। শহরে, গঞ্জে, বিপ্লবী ছাত্রযুবরা তাদের মতাদর্শে জনগণকে সচেতন করার উদ্দেশ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী এবং ভিয়েতকংদের সমর্থনে মিটিং মিছিল করতো। আর ঐসব মিটিং মিছিলে ওদের দৃপ্ত শ্লোগান ছিল - দুনিয়ার নিপীড়িত জনগণের শত্রু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, নিপাত যাক নিপাত যাক। আমার নাম তোমার নাম ভিয়েতনাম, ভিয়েতনাম, ভিয়েতনাম। গঙ্গা যদিও মেকং না হয় মেকং তোমায় লালসেলাম, লালসেলাম, লালসেলাম। হো হো হো-চি-মিন, রেড স্যালুট রেড স্যালুট ইত্যাদি।
সত্তরের দশকে ভিয়েতনামে মার্কিন সৈন্যবাহিনীর নির্মম অভিযান, স্বদেশপ্রেমী লড়াকু ভিয়েতকংদের বিজয়ের কাহিনি এবং তৎসম্পর্কিত সে সময়ের ঘটনাবলী দীর্ঘদিন মনের স্মৃতিপটে যেভাবে লালিত হয়ে আসছে, বর্তমানে ওমাহা শহরের শীতলযুদ্ধ বিজয়ের অনুষ্ঠানে চীনা বংশোদ্ভূত আমেরিকার সামরিক কমাণ্ডার ফ্যাং উংয়ের বক্তব্য শুনে এবং ওমাহা শহরে বেশ ভালো সংখ্যায় ভিয়েতনামবাসীদের বসবাস দেখে মনে তোলপাড় হয়। প্রশ্নজাগে, বিগত দিনের উপলব্ধ ধ্যান ধারণা এবং বর্তমান অবস্থানের মধ্যে এতসব কি পরিবর্তন দেখছি! এরকম ভাবনাই যখন মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে, একদিন নিজ এপার্টমেন্টের নির্জন প্রকোষ্ঠে বসে ওমাহা শহর থেকে প্রকাশিত দৈনিক ওমাহা ওয়ার্ল্ড হেরাল্ড পত্রিকায় চোখ বুলাই। সেদিনের সেই পত্রিকায় ভিয়েতনাম বাসী ফুং নগুয়েনের কাহিনি পাঠ করে আরো আশ্চর্য হয়ে যাই।
ফুং নগুয়েন ছিলেন দক্ষিণ ভিয়েতনামে সামরিক বিভাগের কর্ণেল। ৩০ এপ্রিল ১৯৭৫ ইংরাজি সায়গন পতনের পর ভিয়েতকংদের হাতে দক্ষিণ ভিয়েতনামের সামরিক বিভাগের অনেকেই বন্দী হন। এদের মধ্যে অনেককেই গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আবার অনেককেই বন্দী শালায় আটক করা হয়। ফুং নগুয়েনকে প্রথমে বলা হয়েছিল ওকে তিন বছরের জন্য কারাগারে বন্দী থাকতে হবে। কিন্তু সেটা বাড়তে বাড়তে আট বছর হয়ে যায়। এই আট বছরের কারাগার জীবনটা ছিল দুর্বিষহ। জেলের ভিতর নির্মম অত্যাচার, অনাহার এবং অসুস্থ হয়ে অনেক বন্দীই মারা যায়। অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে কেহ প্রতিবাদমুখর হলেই নির্মম ভাবে গুলিতে প্রাণ হারাতে হয়েছে। ভোর হতেই জেলের অভ্যন্তরে পায়খানা পরিষ্কারের মধ্য দিয়েই ফুং নগুয়েনের দিনের কাজ শুরু হতো। তবে রাত্রিটা যেন কিছু শান্তিতে কাটতো। রাতের অন্ধকারে নিস্তব্ধতায় কর্ণেল ফুং নগুয়েন গোপনে প্রার্থনা করত। সে ভগবান বুদ্ধকে উদ্দেশ্য করে বলতো আমাকে সুস্থ শরীরে বাঁচতে দাও, আমাকে শক্তি দাও।
এভাবেই দীর্ঘ আট বছর জেল খাটার পর আন্তর্জাতিক চাপ এবং ভিয়েতনামের ভয়াবহ আর্থিক দুরবস্থার জন্যই ফুং নগুয়েন ছাড়া পায়। ১৯৮৩ ইংরাজিতে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর সে তার নিজের বাড়িতেই ফিরে যাওয়ার কথা। কিন্তু মধ্য ভিয়েতনামের বান মি থাউট (Ban Me Thout) শহরে ফুং নগুয়েনের বাড়িটা সায়গান পতনের পরই উত্তর ভিয়েতনামীরা দখল করে নেয়। তাঁর স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েদেরকে নিয়ে সেখানে গিয়ে থাকার কোন সুযোগ হয়নি।
ভিয়েতকংরা দক্ষিণ ভিয়েতনাম দখল করে শাসন ব্যবস্থা কায়েম করার শুরুতেই দুই ভিয়েতনাম এক হয়ে যায়। সায়গনের নূতন নামকরণ হয় হো চি মিন সিটি। উত্তর ভিয়েতনামের অবিসংবাদী কম্যুনিষ্ট নেতা হো-চি-মিনের পরেই ছিল লে দোয়ানের স্থান। হো-চিনের শারীরিক অসুস্থতার সময় থেকে লে দোয়ানই ছিল ভিয়েতনামের রাষ্ট্রপরিচালনায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব। রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের পরই ১৯৭৬ ইংরাজিতে লে দোয়ান ভিয়েতনামবাসীদেরকে উন্নয়নের আশ্বাস দিয়েছিলো। জোড় দিয়ে বলেছিলেন যে, দশ বছরের মধ্যে অবশ্যই প্রত্যেক ভিয়েতনামবাসীদের ঘরে ঘরে রেডিও, টিভি এবং রেফ্রিজারেটর ইত্যাদি থাকবে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধে বিধ্বস্ত দক্ষিণ ভিয়েতনামের এককোটি গৃহহারা মানুষ, যুদ্ধে পঙ্গু হওয়া সাড়ে তিন লক্ষ মানুষ, দশ লক্ষ বিধবা, আট লক্ষ আশি হাজার অনাথ শিশু, আড়াই লক্ষ মাদকাসক্ত, তিন লক্ষ দেহ ব্যবসায়ী এবং ত্রিশ লক্ষ কর্ম সংস্থান বিহীন ব্যক্তিদের সমস্যা নিরসনে সরকার পুরাপুরি ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে সরকারের নির্মম অনুশাসনে জর্জড়িত গৃহহায়ারা ভিয়েতনাম থেকে পালিয়ে যেতে থাকে। এক সাথে বহু লোক নৌকায় চড়ে প্রশান্ত মধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অন্য দেশের উদ্দেশ্যে চলে যায়। ওরাই (Boat People) বোট পিপুল নামে আখ্যায়িত। বাঁচার তাগিদে নৌকায় সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতিকুল দুর্যোগ আবহাওয়ার অনেককেই প্রাণ হারাতে হয়েছে। ফুং নগুয়েনের বড় ছেলে Boat People হয়েই ভিয়েতনাম থেকে পালিয়েছে এবং ঘটনাচক্রে সে ফুং নগুয়েনের বহু আগেই ওমাহাতে পৌঁছায়।
বাও বিল নগুয়েন নামে ভিয়েতনামের আরেকব্যক্তি, সেও অনেকের সঙ্গী হয়ে নৌকার চেপে দেশ থেকে পালিয়েছিলো। ভিয়েতনাম থেকে হংকং এমনিতে সাধারণত নৌকাযোগে চারদিনে পৌঁছা যায়। কিন্তু বাও বিল নগুয়েনের নৌকা সামুদ্রিক ঝাড়ে আক্রান্ত হয়ে জলে ভাসতে ভাসতে এক মাস পর হংকং পৌঁছে। সেই দুর্যোগপূর্ণ নৌকা যাত্রায় বাও বিল নগুয়েন প্রতিজ্ঞ করেছিল সে যদি প্রশান্ত মহাসাগরের এই নাটকীর যাত্রায় বেঁচে যায় তাহলে বৌদ্ধধর্ম প্রচারের কাজ করবে এবং অন্যান্য ভিয়েতনামীদের সহায়তায় বুদ্ধ মন্দির প্রতিষ্ঠা করবে। এই বিল বাও নগুয়েন হংকং থেকে আমেরিকাতে ১৯৮২ ইংরাজিতে আসে। প্রথমে ডেনভর মীট প্যাকিং কোম্পানীতে কাজ করে পরে নেব্রাস্কা বীফ কোম্পানীতে যোগ দিয়ে বর্তমানে ওমাহাতে স্থায়ী ভাবে বসবাস করছে। ১৯৮৯ ইংরাজিতে মার্কিন সরকার ভিয়েতনামী রিফিউজিদেরকে আমেরিকর পুনর্বাসন দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। যে সকল ব্যক্তি দক্ষিণ ভিয়েতনামে সৈন্য বিভাগে ছিল বা যারা আমেরিকা সরকারের হয়ে কাজ করছিল তাদেরকেই এ সুযোগ গ্রহণে ‘অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বাও বিল নগুয়েন যার সাথে ফুং নগুয়েনের কোন আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই, সে-ই ফুংকে আমেরিকা সরকার কর্তৃক প্রদত্ত এ সুযোগ গ্রহণ করার জন্য প্রথমে আহ্বান করে।
নগুয়েন ফুং ১৯১২ সালে স্ত্রী ও আট সন্তানকে নিরে আমেরিকার ওমাহাতে চলে আসে। ফুং নগুয়েন দীর্ঘ দুদশকেরও অধিক সমরব্যাপী ওমাহাতে বসবাস করছে। এখন ওমাহা শহরেই মার্কিন সরকারের আরো সব আশ্রিত ভিয়েতনামীদের সঙ্গে ফুং নগুয়েনের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমেরিকার নৈকব্য কুলীন নাগরিক হয়ে বসবাসের অধিকারী হবে।
ওমাহাতে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ পেরে ফুং নগুয়েন এবং বাও বিল নগুয়েন তাদের দীর্ঘদিনের মনোবাসনা বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চালার। ওমাহা শহরের উত্তরপূর্বে অবস্থিত ৩৮১২ ফোর্ট স্ট্রীটের পাশে সামান্য উঁচু টিলাতে ওমাহার বসবাসকারী ভিয়েতনামীদের সহায়তায় ওরা (Quoc An Temple) কোরক এন টেম্পল নামে একটি মন্দির তৈরি করেন। এই মন্দির পরিচালন সমিতির সভাপতি হলো ফুং নগুয়েন এবং সাধারণ সম্পাদক বাও বিল নগুয়েন। ওমাহার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা নিয়মিতভাবে সেখানে সমবেত হয় এবং প্রার্থনা করে। কিছুদিন হলো ওমাহার ভিয়েতনামী যাদের অধিকাংশই মিস্ত্রি, নার্স সহায়ক কিংবা নীট প্যাকিংয়ের কাজে নিয়োজিত, তাদের থেকে সংগৃহীত চাঁদা আঠারো হাজার ডলারের বিনিময়ে ভিয়েতনাম থেকে বুদ্ধমূর্তি আনানো হয়েছে এবং সেগুলো মন্দিরের পাশে উন্মুক্ত টিলার স্থাপন করা হয়েছে।
ওমাহাতে প্রবাসকালে যে এলাকাতে রয়েছি সেটা শহরের মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত। এলাকাটা হিলস্বরো নামে পরিচিত। সেই হিলস্বরোর পাশেই ওয়েস্টিন হিলস্ এর মেরেডিথ এভিনিউর ডানপাশের ১৪৪৭৭ নম্বর বাড়িটাই আমাদের বাসস্থান। শহরের বাজার হটি, বাচ্চাদের স্কুল কিংবা বড়দের অফিস বাতারাতের জন্য হিলস্ বরোর পাশ দিয়ে যে দীর্ঘ রাস্তাটি রয়েছে তাহলো 144 স্ট্রীট। 144 স্ট্রীট মহা শহরের শেষ উত্তর প্রান্ত থেকে দক্ষিণের শেব সীমানা অবধি বিস্তৃত। বাড়ির কাছেই উত্তর দক্ষিণে বয়ে চলা এই 144 স্ট্রীটের সমান্তরালে দুদিকে রয়েছে পায়ে হাটার (Side walk) রাস্তা। শহরের রেসিডেনশিয়াল এলাকার বড় রাস্তাগুলোর পাশে সমান্তরালভাবে এধরণের পায়ে হাটার পথ আমেরিকার প্রায় সব শহরেই রয়েছে।
আমার ব্যক্তিগত জীবনে প্রতিদিন প্রত্যুষে এক ঘন্টা পায়ে হাটার অভ্যাস দীর্ঘদিনের। বাইরে কোথাও গেলেও এ অভ্যাসের ব্যতিক্রম হয় না। তবে প্রাকৃতিক অবস্থা যদি বিশেষভাবে বাঁধাস্বরূপ হয়ে দাঁড়ায় তাহলে অন্যকথা। ওমাহাতে শীতকালে ভোরবেলা ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরে পায়ে হেটে চলা ফেরার কথা কল্পনাই করা যায় না। রাস্তাঘাট বরফে আচ্ছাদিত থাকে এবং শীতের প্রকোপ খুব বেশি। তাই শীতের প্রকোপ কম এবং রাস্তায় বরফ জমা না থাকলে দুপুরে কিংবা বিকালের পড়ন্ত বেলায় আমার হাটার অভ্যাসটা চালু রাখতাম। মেরেডিথ এভিনিউর বাড়ি থেকে বেরিয়ে 144th স্ট্রীটের সমান্তরাল বয়ে চলা পায়ে হাটার পথ দিয়ে উত্তর দিকে এগিয়ে চলতাম। ত্রিশ মিনিট সময়ের মধ্যেই হাটতে হাটতে পৌঁছে যেতাম ওমাহা শহরের পূব পশ্চিমে বয়ে চলা ব্যস্ততম রাস্তা ফোর্ট স্ট্রীটের পাশে। আবার সেখান থেকেই এবাউট টার্ন হয়ে হাটতে হাটতে চলে আসতাম নিজ বাড়িতে।
ফুং নগুয়েন এবং বাও বিল নগুয়েনদের বুদ্ধ মন্দিরটা ফোর্ট স্ট্রীটের পাশেই একটা উঁচু টিলাতে রয়েছে বলে যখন প্রথম জানতে পারি তখন খুবই আনন্দিত হই। মনে মনে ভাবি, বাঃ ভিয়েতনামীদের প্রচেষ্টায় তৈরি বুদ্ধ মন্দিরটা যখন ফোর্ট স্ট্রীটের পাশেই একটা উঁচু টিলাতে রয়েছে তাহলে আমি একাই হেটে হেটে সেই মন্দিরটাতে যেতে পারবো।
রুটিন মাফিক পায়ে হেটে চলার সময়ই আমি একা দুতিন দিন ফোর্ট স্ট্রীট অবধি গিয়ে আর চটজলদি এবাউট টার্ন করিনি। সাইড ওয়াকের বায়ে পশ্চিমদিকে কিছুদূর গিয়ে দেখি সেদিকটা ক্রমশ ঢালু হয়ে গেছে, ধারে কাছে কোন উঁচু টিলা নেই। সেখান থেকে ফিরে আবার পুবদিকে এগুই। সেদিকে, গিয়েও ধারে কাছে কোন মন্দিরের সন্ধান না পেয়ে বাড়িতে ফিরে এসে ছেলের স্মরণাপন্ন হই। ল্যাপটপ খুলে নাড়াচাড়া করে ওমাহার রোড ম্যাপ দেখে ছেলে আমাকে বলে যে, আমাদের মেরেডিথ এভিনিউর ১৪৪৭৭ নম্বর বাড়ি থেকে ৩৮১২ ফোর্টস্ট্রীটের কোয়ক এন টেম্পলটির দূরত্ব প্রায় কুড়ি মাইল। অর্থাৎ মেরেডিথ এভিনিউ থেকে 144th স্ট্রীটের সমান্তরাল পায়ে হাটার পথ দিয়ে ফোর্ট স্ট্রীটের যে জায়গায় যাই সেখান থেকে পুবদিকে আরো কুড়ি মাইল দূরে গেলেই পাওয়া যাবে Quoc An temple কিন্তু সেখানে পায়ে হেটে একাকী যাওয়া সম্ভব নয়।
কৈশোরে ছাত্রাবস্থায় দেশের নানা পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত ভিয়েতকং এর দেশ প্রেম ও বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামী ভূমিকার খবর পাঠ করে মন উদ্দীপিত হতো এবং সাথে সাথেই আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদীদের নির্মম সামরিক অভিযানের জন্য ওদের প্রতি ক্ষোভ এবং ঘৃনায় মনটা বিষিয়ে উঠতো। এখন অবশ্যি কোন ঘটনাতেই আগের মত মনে ক্রিয়া বিক্ক্রিয়া কিংবা উদ্দীপনা হয় না। তবে ভিয়েতনামযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ওমাহার বিপুল সংখ্যক প্রাক্তন আমেরিকান সৈনিক এবং ভিয়েতনাম থেকে আগত ভিয়েতনামীদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্পর্কের খবর এবং তাদের নানা ইতিবৃত্ত জানার কৌতুহলকে পুরাপুরি উপেক্ষা করতে পারি না। তাই ৩৮১২ ফোর্ট স্ট্রীটের কোয়ক এন টেম্পলটি স্বচক্ষে দেখার বাসনা ছেলের নিকট উত্থাপন করি। ছেলের সাথে বার্তালাপে ঠিক হয় অনুকুল আবহাওয়ায় যেকোন বন্ধের দিন অবশ্যই গাড়ি করে ভিয়েতনামীদের প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধ মন্দিরটি দেখতে যাবো।
তখন নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ। ওমাহার তাপমাত্রা শূণ্যের নিচে। দিনে রাতে বিরামহীন বরফের কুঁচি পড়ছে। রাস্তা ঘাট, গাছপালা এবং বাড়ি ঘর সবকিছুতেই বরফের আচ্ছাদন। আমাদের দেশে ফিরার টিকিট ডিসেম্বর মাসের ২৭ তারিখ। ওমাহায় আর মাত্র চারটা রোববার কাটাতে পারবো। এই চার রোববারের মধ্যে প্রথম রোববারেই ৩৮১২ ফোর্ট স্ট্রীটে ফুং নগুয়েনদের বুদ্ধ মন্দির দেখতে যাবো বলে ঠিক করা হয়েছিল। আবহাওয়া সেদিন প্রতিকুলে থাকায় সম্ভব হয়নি। ঠাণ্ডার প্রকোপে উঁচু টিলায় উন্মুক্ত স্থানে দাঁড়িয়ে বরফের আচ্ছাদন ছাড়া আর কিছুই দেখা যাবে না। অগত্যা সেদিন বুদ্ধমন্দির দর্শনের জন্য যাওয়ার কর্মসূচী বাতিল করা হয়। পরের সপ্তাহের শুরুতেও দেখা যায় দিনের গতি তেমন সুবিধাজনক নয়। কারণ তাপমাত্রা শূণ্যের নিচেই আছে। তবে বরফ পড়ার পরিমাণ ধীরে ধীরে কমে আসতে থাকে। আবহাওয়ার পূর্ব ঘোষণামতে আগামী রোববারও তাপমাত্রা শূণ্যের নিচে থাকবে। এমতাবস্থায় ৩৮১২ ফোর্ট স্ট্রীটে যাওয়ার পরিকল্পনা যদি কার্যকরী না হয় তাহলে আমাদের ভিয়েতনামীদের বৌদ্ধমন্দির দর্শন অধরাই থেকে যাবে। কারণ দেশে ফিরে যাওয়ার আগে বাক্সপ্যাটরা গোছগাছ এবং আনুষঙ্গিক অনেক ব্যাপার থাকে যার জন্য রওয়ানা দেওয়ার পূর্বে সপ্তাহ দিন ঘরের বাইরে কোন প্রোগ্রাম রাখা ঠিক নয়। এসব ভেবে ভেবে ঠিক করি ১৫ ডিসেম্বর রোববারে আমরা অবশ্যই বুদ্ধ মন্দির দেখতে যাবো।
দেখতে দেখতে ১৫ ডিসেম্বর রবিবার এসে গেল। আবহাওয়ার তেমন বিশেষ কোন পরিবর্তন নেই। তবে এলাকায় ভোর থেকে বরফের কুঁচি পড়া বন্ধ হয়ে গেছে। দুই তিন ইঞ্চি স্তুপীকৃত বরফ গ্যারেজ ঘরের সামনে এখনো জমা আছে। ভোর বেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ডজার এসে মেইন রাস্তার বরফ সরিয়ে দিয়েছে। ঘুম ভাঙার পর বিছানা ছেড়ে চা খাওয়ার পরই আমাদের পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী কিছুক্ষণের মধ্যে বেরিয়ে যাওয়ার পালা। শেষ পর্যন্ত ঠিক হয় আমি, আমার ছেলে অশোকতরু এবং তার পরের প্রজন্মের প্রথম পুরুষ অর্থাৎ আমার নাতিমশাই শ্রী অরুণীম বাবু এক সাথে আজকের অভিযানে যাবো। সকাল দশ ঘটিকার মধ্যেই আমাদের স্বল্পাহার পর্ব চুকে যায়। আমরা তিনজন শীতবস্ত্র যথারীতি পরিধান করে চলে আসি গ্যারেজ ঘরে। গ্যারেজঘরের সামনে স্তুপীকৃত জমাটবাধা বরফগুলো না সরানো অবধি গাড়ি চালাতে অসুবিধা হবে। তাই গ্যারেজ ঘরের দরজা খুলে বাপ, বেটা এবং নাতিমশাই দুটো বেলচা দিয়ে বরফ ঠেলে গাড়ি চলার পথ পরিষ্কার করে নেই।
বরফ পরিষ্কার করে গাড়ি চলার পথ সুগম হলে পর ছেলে ড্রাইভিং সীটে বসে এবং আমি আর নাতি মশাই পিছনের সীটে বসি। মেরেডিথ এভিনিউর ১৪৪৭৭ নম্বর বাড়ির সামনে থেকে অতি অল্প সময়ের মধ্যে গাড়ি এসে উঠে 144th স্ট্রীটে। উত্তরমুখী হয়ে গাড়ি পাঁচ মিনিট ড্রাইভ করার পরই পৌছে যাই ফোর্ট স্ট্রীটে। ফোর্ট স্ট্রীটে পড়ে ডানদিকে মোড় নিয়ে আমাদের গাড়ি চলতে থাকে পূব দিকে। সোজা রাস্তা, তবে সমতল নয়। কিছুদূর এগিয়ে রাস্তাটা বেশ নিচুতে নেমে যায়। আবার কিছুদূর গিয়ে উপরে উঠে। বরফ না পড়ায় আকাশটা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে থাকে। রাস্তার দুপাশেই কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে সুন্দর সুন্দর বাড়িগুলো দেখা যায় যদিও বাড়ির এবং গাছপালা থেকে বরফের কুঁচি তখনো নিঃশেষ হয়ে যায়নি। এমনিতেই রাস্তায় গাড়ি দিয়ে চলাচলের সময় লোকজন বড় একটা নজরে পড়ে না। আজ বন্ধের দিন, তাছাড়া আবহাওয়াও ঠাণ্ডা তাই গাড়ি চলাচলও কম। নির্জন ফাঁকা রাস্তা দিয়ে যেন কেবলমাত্র আমাদের একটা গাড়িই ছুটে চলছে। এভাবেই সোজা রাস্তায় আধ ঘন্টা ড্রাইভ করার পর অশোকতরু রোড ম্যাপ নির্দেশিকা দেখে বুঝতে পারে আমরা ৩৮১২ ফোর্ট স্ট্রীটের সন্নিকটে। সে আমাকে বলে - আমরা মন্দিরের কাছে এসে গেছি। আমি সতর্ক হয়ে গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই। রাস্তার পাশে সামান্য উঁচু টিলাতে দূর থেকে দেখা যায় পত্রবিহীন ডালপালা সহ শুষ্ক গাছগুলোতে বরফের কুঁচি লেগে রয়েছে। গাড়ির গতিবেগ কমিয়ে যেখানে গাড়ি থেমে যায় সেখানেই সামনে দেখি একটি গেইট এবং সে গেইটের উপরে বিশাল সাইনবোর্ডে লিখা রয়েছে Quoc An Buddhist Temple এবং আরো অনেককিছু যা আমাদের বোধগম্য হয়নি। গাড়িটা রাস্তার পাশেই একটা নির্জন জায়গায় রেখে আবার চলে আসি মন্দিরের গেইটের সামনে। গেইটের সামান্য দূরেই বাঁ পাশে রয়েছে টিনের ছাউনি ও লোহার খুটি দিয়ে তৈরি ছোট্ট একটা ঘর। সেটাই হলো বুদ্ধমন্দির, যেখানে ভিয়েতনামের বৌদ্ধরা বসে প্রার্থনা করে। বুদ্ধ মন্দিরের সামনেই রয়েছে গাছ পালা সম্বলিত দু একর ভূমিতে উন্মুক্ত উদ্যান যা নাকি ওদের পরিভাষায় ডিয়ারপার্ক। ইদানীং ফুং নগুয়েনরা ভিয়েতনাম থেকে নানা রঙে সজ্জিত সিমেন্টের সুন্দর মূর্তিগুলো এনে এই উন্মুক্ত উদ্যানে স্থাপন করেছে। উদ্যানের মাঝখানে উঁচু জায়গায় বিশাল এক বুদ্ধমূর্তি এবং তাঁর সামনে হাটু গেড়ে বসা পাঁচ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী যাদেরকে গৌতম বুদ্ধ প্রথম ধর্মোপদেশ দিয়েছিলেন। গৌতম বুদ্ধ ও তাঁর অনুগত পাঁচ শিষ্যের মূর্তি ছাড়া উন্মুক্ত উদ্যানেই আরেক দর্শনীয় স্থানে বুদ্ধের মায়ের মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। এভাবেই ৩৮১২ ফোর্ট স্ট্রীটের বৌদ্ধমন্দির এবং তৎসংলগ্ন উন্মুক্ত উদ্যানের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য ওমাহার ভিয়েতনামীদের হয়ে ফুংনগুয়েন এবং বিল বাও নগুয়েনরা নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
আমরা বাপ, বেটা এবং নাতি প্রায় ঘন্টা খানেক সময় এই বুদ্ধ মন্দিরের আশেপাশে ঘুরাঘুরি করি। মন্দির এলাকার অতিনিকটে আর কোন ঘরবাড়ি নেই। এখানে আসা অবধি অন্যকোন লোকজন ও দেখা যায়নি। ভিয়েতনামীদের কেহই আজ তাদের প্রার্থনা স্থলে আসেনি। আজকের দিনে সকালবেলা যে এই মন্দিরটা বন্ধ থাকবে সেটা আমরা আগাম জানতে পারিনি। অগত্যা এক ঘন্টা সময়ব্যাপী আমরা তিনজনই এদিক সেদিক হাটাহাটি করে ওমাহাবাসী ভিয়েতনামীদের তৈরি বৌদ্ধ মন্দির ও দৃষ্টি নন্দন উন্মুক্ত উদ্যান দেখার পর কয়েকটা ছবি তুলে নেই।
সময় এগিয়ে চলার সাথে সাথে আবহাওয়ার ও কিছুটা পরিবর্তন হতে থাকে। ঠাণ্ডাটা যেন ধীরে ধীরে কমে আসে এবং দিনের আলোও বাড়তে থাকে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে অকুস্থলে আসার সময় রাস্তাঘাট কিংবা বাড়িঘরের সামনে কোন লোকজন দেখিনি। এখন ফেরার পথে লোকজন বেশ নজরে পড়ছে। তবে আমেরিকান মেমসাহেব নয়। বেশির ভাগই কালো আদমী। ওরা হয়তবা পায়ে হাটা দূরত্বে কোন চার্চে যাচ্ছে। আমাদের চলার পথে আরো কিছুদূর এগিয়ে চলতি গাড়ি থেকেই রাস্তায় অরো কয়েকজন অল্পবয়সী বাচ্চাদের দেখতে পাই। ওদের খুব নিকটে এসে ভালো করে তাকিয়ে মনে হলো ওরা যেন আমাদের দেশের মিজো জনজাতি গোষ্ঠীরই কেহ হবে।
ওদেরকে পিছনে ফেলে আমাদের গাড়ি স্বাভাবিক গতিতেই বাড়ির দিকে এগুতে থাকে। বৌদ্ধ মন্দিরে এপথ দিয়ে আসতে যত সময় লেগেছিলো এখন যেন তার চেয়ে অনেক কম সময়েই বাড়িতে পৌঁছে যাচ্ছি। বাড়িতে পৌঁছে ড্রইং রুমের সোফায় বসতেই টেবিলের উপর রাখা ওমাহা ওয়ার্ল্ড হেরাল্ড (Omaha World Herald) পত্রিকা দেখতে পাই। সেটা ওলট পালট করতে গিয়ে যা দেখি তাতে আশ্চর্য হয়ে যাই। কি অদ্ভুত কাকতালীয় ব্যাপার। বৌদ্ধমন্দির থেকে ফিরে আসার পথে যে সব বাচ্চাদের দেখে মিজো জনজাতি গোষ্ঠীর কেহ হবে বলে ভেবেছিলাম ঠিক ঐরকম বাচ্চাদের একটি গ্রুপ ফটো পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। পত্রিকার বয়ান অনুসারে ওরা হলো মায়ানমারের ক্যারেন উপজাতি গোষ্ঠীর ছেলেমেয়ে। দীর্ঘদিন ধরে মায়ানমারে গোষ্ঠীদ্বন্দে ক্যারেনরা বাস্তুচ্যুত হয়ে সীমান্তের ওপারে থাইল্যান্ডে উদ্বাস্ত ক্যাম্পে বসবাস করত। ২০০৫ সাল থেকেই ওরা আমেরিকায় চলে আসছে। প্রথমে মিনেসটা ও নিউইয়র্কে কিছু সংখ্যক ক্যারেন উপজাতি এসে বসবাস আরম্ভ করে। বর্তমানে চার হাজারেরও বেশি থাইল্যাণ্ডের উদ্বাস্ত ক্যাম্প থেকে মায়ানমারের ক্যারেন উপজাতি গোষ্ঠীর মানুষ ওমাহায় এসে বসবাস করছে। এদের মধ্যে অধিকাংশ কর্মক্ষম বয়স্করা মাংস প্যাকিং কোম্পানীতে চাকুরীরত। বাকীরা গ্রোসারী দোকান, হোটেল, রেস্টুরেন্ট এবং গাড়ি মেরামতের কারখানায় কাজ করে।
মায়ানমারের গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত ক্যারেন গোষ্ঠীর অনেকেই প্রাণ হারান এবং তাদের অনাথ শিশুরাও অন্যান্যদের সঙ্গে থাইল্যাণ্ডের উদ্বাস্তু ক্যাম্প থেকে ওমাহায় চলে আসে। নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে চলে আসা অনেক ছেলে মেয়েরাই শৈশবের বিভীষিকাময় দিনগুলোর স্মৃতি বহন করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এদের মধ্যেই একজন হলেন (Sha Ka Paw) শা-খা-পাও। সে ছয় বৎসর বয়সেই তার মা বাবাকে শেষ দেখেছে। মায়ানমারে ক্যারেনদের উপর হিংস্র অত্যাচারের সময় মাসীর হাত ধরে পালিয়ে চলে যায় থাইল্যান্ডের উদ্বাস্ত ক্যাম্পে। ক্যাম্পের আশ্রয়ে থাকার সময় তার নাম রাখা হয়েছে (Sha Ka Paw) শা-খা-পাও অর্থাৎ ক্যারেনদের মাতৃভাষায় উজ্জ্বল নক্ষত্র। বারো বৎসর বয়সে সে তার মাসীর হাত ধরেই চলে আসে ওমাহায়। বেনসন হাইস্কুলে পড়াশুনা শেষ করে অচিরেই সে স্নাতক হয়ে যাবে। শা-খা-পাও তার উচ্চ শিক্ষা লাভ করার উদ্দেশ্যে বিল এন্ড মিলেন্ডা গেইটস ফাউন্ডেশন (Bill & Milenda Gates Foundation) প্রদত্ত স্কলারশিপ পেতে সচেষ্ট। এই স্কলারশিপ প্রাপ্তির যোগ্যতা অর্জনের প্রথম সোপান হলো প্রার্থীকে নিজের লেখা রচনা বিল এন্ড মিলেন্ডা গেইটস্ এর কর্মকর্তাদের নিকট জমা দেয়া। শা-খা-পাও বিল এন্ড মিলেন্ডা গেইটস্ ফাউন্ডেশনে জমাদেয়া তার নিজের লেখা প্রবন্ধে উল্লেখ করেছে কিভাবে তার শৈশবের কঠোর উদ্বাস্ত জীবন তাকে সহনশীলতা হতে এবং অন্যের প্রতি দরদী হওয়ার মনোবৃত্তি গড়ে তুলতে শিক্ষা দিয়েছে। সে আরো লিখেছে “মাতৃভূমিকে হৃদয়ে রেখে আমি বেড়ে উঠছি বেনসন স্কুলে। আমি স্বপ্ন দেখি একজন শিক্ষক এবং মিশনারী হয়ে স্বদেশে ফিরব।”
ক্রীসমাসের তিন সপ্তাহ আগে ডিসেম্বর মাসের শীতলতম রাতে উত্তর ওমাহার মাউব্য ভিউ প্রেসবেটেরিয়ান চার্চের নিচতলায় শা-খা-পাও ও জনাত্রিশেক ক্যারেনগোষ্ঠীর ছেলেমেয়ে জড়ো হয়। সেখান থেকে বৌদ্ধ মন্দিরের অনতিদূরে 49th স্ট্রীটের সুরেনসেন পার্কওয়ের সামান্য উত্তরে চলে যায় ক্যারেন ক্রীশ্চান রিভাইবেল চার্চের অস্থায়ী ভবনে। বড়দিনের উৎসবে নিজেদের মাতৃভাবায় রচিত ধর্ম সঙ্গীত পরিবেশনের রিহার্সেল দিতে। এই অস্থায়ী ভবনের জায়গাতেই ওমাহার ক্যারেন গোষ্ঠীর লোকেরা তাদের নিজস্ব সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি সম্পাদনের জন্য ক্যারেন ক্রীশ্চান রিভাইবেল চার্চ এবং আনুষঙ্গিক পরিকাঠামো গড়ে তুলার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। মায়ানমার দেশটা বার্মা নামেই পরিচিত ছিল। বৃটিশ শাসনাধীনকালে আমাদের দেশের বহু লোক বার্মায় গিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো। বাংলা সাহিত্যের দিকপাল শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখনীতে বার্মার চিত্রপট রয়েছে। ভারতের বীর সন্তান নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং আরো অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামী বার্মার মান্দালয় জেলে বন্দী ছিলেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্মা থেকে আমাদের বেঙ্গলে চাউল আমদানীর সব পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো বলেই বাংলায় পঞ্চাশের মন্বন্তর বিভীষিকাময় রূপ ধারণ করে এবং আরো কত কি! এসবতো আমাদের ছেলেবেলার কাহিনি। কিন্তু বার্মাযে পরবর্তীতে মায়ানমারে রূপান্তরিত হয়ে রাজনৈতিক গোষ্ঠীদ্বন্দে মত্ত এবং সেখানকার ক্যারেনগোষ্ঠীর লোকেরা জন্মভূমি থেকে উৎখাত হয়ে বিদেশে উদ্বাস্ত ক্যাম্পে দুর্বিষহ জীবন যাপন করতে হয়েছে তা আমার অজানা ছিল। ওমাহা প্রবাসের শেষ পর্যায়ে নিজের দেশে ফেরার প্রাক্কালে নাটকীয় ভাবেই স্বদেশের পরশী মায়ানমারের ক্যারেন গোষ্ঠী লোকদের বাস্তুহারা হয়ে ওমাহায় বসবাসের উপরোক্ত কাহিনি সম্পর্কে অবহিত হই। ভিয়েতনাম, মায়ানমার এবং আরো অন্যান্য পূর্ব এশিয়া দেশের লোকেরা স্বদেশ ছেড়ে চলে এসে নিজ নিজ সামাজিক ও ধর্মীয় রীতি নীতি আঁকড়ে ওমাহায় স্থায়ীভাবে বসবাস করার ঘটনাগুলো আমার মনে বিশেষ আলোড়ন সৃষ্টি করে। আমেরিকা পুঁজিবাদী দেশ। পৃথিবীর অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যাপারে আমেরিকার নাকগলানোর পেছনে পুঁজিবাদের স্বার্থরক্ষার দূরভিসন্ধিই কাজ করে। আমেরিকার প্রতি এরকম ধারনাই তথাকথিত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবিরা পোষণ করে থাকেন। এ ধারনাটাকে পুরাপুরি নস্যাৎ করার মত আমার নিজেরও তেমন কোন জ্ঞান বুদ্ধি নেই। তবে আশ্চর্য হই যখন জানতে পারি আমেরিকার নাগরিক বিল গেইটস, ওয়ারেন বাফেটরা পৃথিবীর গরীব ও নিরন্ন মানুষের দুঃখ দুর্দশা নিরসনে নিজস্ব অর্জিত ধনের সিংহভাগই খরচ করেন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এবং সে উদ্দেশ্যেই গঠন করা হয়েছে বিল এন্ড মিলেন্ডা গেইটস ফাউন্ডেশন এবং হাওয়ার্ড জি বাফেট ফাউন্ডেশন ইত্যাদি।
আমেরিকার নাগরিক বিল গেইটস পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের অন্যতম। বিল গেইটস’এর অর্থানুকুল্যে গঠিত হয়েছে বিল এন্ড মিলেন্ডা গেইটস ফাউন্ডেশন। মায়ানমারের ভিটে মাটি থেকে উৎখাত হয়ে ওমাহায় চলে আসা ক্যারেন কিশোর শা-খা-পাও স্বপ্ন দেখে বিল এন্ড মিলেন্ডা ফাউন্ডেশনের বৃত্তি পেয়েই সে পড়াশুনা করে পরিপূর্ণ শিক্ষিত মানুষ হয়ে স্বদেশে একদিন ফিরে যাবে। আবার ওয়ারেন বাফেটও হলো পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি, ২০০৮ সালে ফোর্বসের তথ্যানুসারে। ওমাহা শহরেই ওয়ারেন বাফেটের জন্ম এবং ওমাহাতেই তার বসবাস। নিজ হাতে তৈরি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বার্ক শায়ার হ্যাথাওয়ের চেয়ারম্যান এবং ওমাহা শহরেই তার প্রধান কার্যালয়। ওয়ারেন বাফেটের অর্থানুকুল্যই গঠিত হয়েছে হাওয়ার্ড জি বাফেট ফাউন্ডেশন। হাওয়ার্ড জি, বাফেট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এবং মুখ্য আধিকারিক হলেন ওয়ারেন বাফেটের ছেলে হাওয়ার্ড জি, বাফেট। হাওয়ার্ড জি, বাফেট ব্যক্তিগত জীবনে একজন সফল কৃষক, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, চিত্রশিল্পী এবং জনদরদী সেবাকর্মী। বিশ্বের অনুন্নত দেশগুলির ক্ষুধার্ত নিরন্ন মানুষের খাদ্যাভাব দূরীকরণের উদ্দেশ্যে পরিকল্পনা গ্রহণ করে হাওয়ার্ড জি বাফেট ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে নানা দেশে ঘুরে ঘুরে সেবামূলক কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
পৃথিবীর দুর্দশাগ্রস্ত ও নিরন্ন মানুষের দুঃখকষ্ট ও খাদ্যাভাব দূরীকরণের জন্য পৃথিবীর প্রথম সারির ধনী ব্যক্তি বিল গেইটস এবং ওয়ারেন বাফেটের উপার্জিত অর্থের সিংহ ভাগ ব্যয় করার অঙ্গীকার এবং মাতৃভূমি থেকে উৎখাত হয়ে আসা ভিয়েতনাম ও মায়ানমারের উদ্বাস্তুদের ওমাহায় স্বাধীনভাবে বসবাস এবং জীবিকা নির্বাহের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে এটা কি মনে হয় যে, আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদ দুনিয়ার নিপীড়িত জনগণের শত্রু। এসব ভাবতে গিয়ে দম মেরে বসে থাকতে হয়। তারপর মনে হয়, কোথাও যেন একটা শুভঙ্করের ফাঁকি কাজ করছে।