আববার্ণ হিলসের এডামস্ত্রীক এপার্টমেন্টে আমাদের বসবাসের তিনমাস হয়ে গেছে। শীতের দাপট আর নেই। তখন বসন্তের শেষ। চারদিকের শুকনো ডালপালা নিয়ে গাছের কঙ্কালগুলো নূতন রূপ ধরেছে। মনে হয় কোন এক ঐন্দ্রজালিক শক্তির প্রভাবে পত্রবিহীন গাছের শুকনো কঙ্কালগুলো হঠাৎ সজীব মহীরুহে রূপান্তরিত হয়েছে।
এডামস্ত্রীক এপার্টমেন্টে আবির্ভূত আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের প্রথম পুরুষ শ্রীমান অরুণীম ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে। দেখতে দেখতে ওর বয়স আড়াই মাস হয়ে গেলো। ওকে কারসীটে ভালোভাবে রেখে ভ্রমণ করা যায়। ছুটির দিনে আশেপাশের শহর ডেট্রয়েট, ট্রয়, হ্যামট্রেক, পন্টিয়াক, রোচেষ্টার হিলস্ প্রভৃতি জায়গাগুলো দেখা হয়েছে। তাই পরবর্তীতে শনি রবি দু’দিনের ছুটিতে পেনসেলভেনিয়া ষ্টেটের পিটস্বার্গ শহরে যাওয়ার কর্মসূচী হাতে নেওয়া হয়। শনিবার দিন সকালবেলা আববার্ণ হিলস্ থেকে নিজেদের ক্রাইসলার জীপে চেপে রওয়ানা দেই পিটস্বার্গের উদ্দেশ্যে। ড্রাইভিং সীটে অশোকতরু এবং তার ডানপাশে আমি। পিছনে মধ্যিখানে কারসীটে বেল্ট বেঁধে রাখা হয় অরুণীমকে এবং তার দু’পাশের দুটো আসনে ঠাম্মা রুবি এবং মা সোনা।
আমেরিকার রাস্তা দিয়ে চলন্ত গাড়িতে শিশুদেরকে মা বাবা কিংবা অন্য কেহর কোলে বসিয়ে নেওয়া বারণ। অরুণীমকে গাড়িতে কারসীটে বেল্ট বেঁধে নিয়ে যেতে প্রথমে আমার খুবই ভয় হয়। মনে মনে ভাবি, আড়াই মাসের শিশুটিকে এরকম অবস্থায় কারসীটে বেল্ট বেঁধে ইন্টারস্টেট হাইওয়েতে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে যাওয়া কি ঠিক হবে? কিন্তু না, পরে দেখা যায় ঘন্টায় সত্তর মাইল বেগে চললেও অরুণীমের কোন অসুবিধা হয়নি। তবে রাস্তায় আমাদের গাড়ি এক নাগাড়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য চলেনি। কুড়ি পঁচিশ মাইল অন্তর অন্তর ইন্টারস্টেট হাইওয়ের পাশে রেস্ট হাউস থাকে। প্রয়োজনে দূর পাল্লার যাত্রীরা তাদের গাড়ি পার্ক করে কিছু সময়ের জন্য রেষ্ট হাউসে বসে আরাম আয়েসের পর আবার গাড়িতে উঠে গন্তব্যস্থলের দিকে পাড়ি দেয়। আমাদের নিজেদের সুবিধার জন্য এবং বিশেষ করে অরুণীমের কথা ভেবে ঘন্টা দেড় দুই পর পর বার তিনেক রেষ্ট হাউসে কিছু সময় বিশ্রাম করে সমস্ত পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। সেজন্যেই নির্ধারিত সময়ের কিছু পরে আমরা পিটস্বার্গে পৌঁছাই।
আমাদের যাত্রাশুরুর পূর্বেই শুক্রবার রাতে আববার্ণ হিলসের বাড়ি থেকে ল্যাপটপের মাধ্যমে ওনলাইনে পিটসবার্গে পৌঁছে হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পিটস্বার্গের এয়ারপোর্ট সন্নিকটস্থ বিশাল বহুতল বিশিষ্ট হোটেল মেরিয়টে পাশাপাশি দুটো ডাবল বেড সহ একটা বড় রুম ভাড়া নেওয়া হয়। শনিবার সন্ধ্যার প্রাক্কালে সূর্য পশ্চিম দিগন্তে ডুব দেওয়ার আগেই আমরা হোটেল মেরিয়টের বর্হিপ্রাঙ্গণে পৌঁছাই। সেখানে না হলেও শতাধিক গাড়ি সারিবদ্ধভাবে কয়েকটা লাইনে একের পর এক পার্ক করা হয়েছে। বেশ কিছু ঘুরাঘুরি করেই একটা খালি স্লট খুঁজে বের করে আমাদের গাড়িটা পার্ক করে চলে যাই হোটেল মেরিয়টের রিসেপশন কাউন্টারে। রিসেপশন কাউন্টার থেকে আমাদের রুমের চাবি নিয়ে চলে যাই এলিভেটরের কাছে। সাথে অবশ্য রিসেপশন কাউন্টার থেকে একজন সহায়ক আমাদেরকে দেওয়া হয়। সহায়কের সাহায্যে এলিভেটর চড়ে নবমতালায় পৌঁছে আমাদের নির্ধারিত রুমে ঢুকে পড়ি।
সকাল থেকে এক নাগাড়ে প্রায় আট ঘন্টা সময় অবধি এতটা দূরত্ব পাড়ি দিয়ে আসতে শরীরে বেশ ক্লান্তি অনুভব হয়। হাতমুখ ধুয়ে কাপড় চোপড় পালটিয়ে রাত্রি যাপনের বিছানাটায় সটান হয়ে কিছুটা বিশ্রাম করি। কিন্তু বেশি বিশ্রাম করার অবকাশ নেই। কারণ, আমাদেরকে যেতে হবে পিটস্বার্গ ডাউন টাউনে। দেরী করে রওয়ানা দিলে সবকিছু দেখে ফিরতেও অধিক রাত হয়ে যাবে। তাই সামান্য বিশ্রামের পরই শরীর ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ি।
দিবালোক অন্তর্হিত হওয়ার সাথে সাথেই দিকে দিকে এলাকার রাস্তাঘাটের ল্যাম্প পোষ্ট গুলো জ্বলে উঠেছে। হোটেল থেকে অদূরবর্তীতে উঁচু নিচু পাহাড়ি জায়গাগুলোতে অবস্থিত সারিবদ্ধ ঘর এবং আশে পাশের বাতিগুলো থেকে আলোর ঝলমলানি উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হচ্ছে। আমরা মেরিয়ট হোটেলের নবমতালার রুম থেকে জানালা দিয়ে এরকমটা দেখতে পেয়ে আর দেরী না করে প্রস্তুত হই বেরিয়ে পড়তে।
হালকা শীতবস্ত্র পরিধান করে অরুণীমের কারসীট সহ ট্রলি নিয়ে ধীরে ধীরে এলিভেটর চড়ে হোটেলের বেসমেন্টে চলে আসি। তারপর অশোক তরু একাই আমাদের গাড়িটা পার্কিং স্লট থেকে ড্রাইভ করে নিয়ে এসে হোটেলের সামনেই দাঁড় করায়।
অরুণীমকে গাড়িতে কারসীট সহ বেল্ট বেঁধে আমরা সবাই নিজ নিজ আসনে বসার পর গাড়ি ছুটে চলে ইন্টারষ্টেট হাইওয়ে ধরে। প্রায় ২৫ থেকে ৩০ মিনিট সময় অবধি গাড়ি চলতে চলতে পৌঁছে যায় পিটস্বার্গ ডাউন টাউনের পাশে ডকুইসনি (Doquesne Incline) ইনক্লাইন। ডকুইনি ইনক্লাইন হলো পশ্চিমের পাহাড়ি উঁচু জায়গা মাউন্ট ওয়াশিংটন থেকে পূর্বে ক্রমশ ঢালু হয়ে আসা পিটস্বার্গ ডাউন টাউনের যোগাযোগ রক্ষাকারী আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি নদীর উপর সেতু।
পিটস্বার্গ এলাকার উত্তর পূব থেকে বয়ে আসা এলেঘেনি (Allegheny River) এবং দক্ষিণ পশ্চিম থেকে বয়ে আসা মাননগাহেলা (Manongahela River) নদী দুটো এসে মিশেছে ওহিও (Ohio River) নদীতে। ঐ সঙ্গম স্থলের পূর্ব প্রান্তে ত্রিকোনাকৃতি যে ভুবন, তাতেই গড়ে উঠেছে (Golden Triangle) গোল্ডেন ট্রাইঙ্গল। ডকুইসনি ইনক্লাইনের পশ্চিম প্রান্ত মাউন্ট ওয়াশিংটনের উঁচু জায়গা থেকে নদীর অপর প্রান্ত নিচু এলাকায় অবস্থিত গোল্ডেন ট্রাইঙ্গলের আলোকোজ্জ্বল গগনচুম্বী অট্টালিকাগুলোকে দূর থেকে রাতের অন্ধকারে ভারী সুন্দর দেখায়। আমরা গাড়িতে বসে বসেই নদীর কিনারায় গোল্ডেন ট্রাইঙ্গলের আকাশচুম্বী অট্টালিকাগুলোর আলোকোজ্জ্বল মনোমুগ্ধকর শোভা উপভোগ করেই ডকুইনি ইনক্লাইন পাড়ি দিয়ে পিটস্বার্গের ডাউন টাউনে প্রবেশ করি।
পিটস্বার্গের পশ্চিম এলাকায় এলিঘেনি, মাননগাহেলা এবং ওহিও নদীর বেষ্টনীতে গোল্ডেন ট্রাইঙ্গল ছাড়া পূব দিকে বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে রয়েছে ওকল্যাণ্ড, সাউথ সাইড, হিল সাইড, নর্থ সাইড প্রভৃতি এলাকা। গোল্ডেন ট্রাইঙ্গলে রয়েছে ত্রিশটিরও বেশি আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি বহুতল আকাশচুম্বী অট্টালিকা। এগুলোর মধ্যে নয়টি অট্টালিকার উচ্চতা পাঁচশ ফুটের অধিক এবং সবচেয়ে উঁচু অট্টালিকাটির উচ্চতা হলো ৮৪১ ফুট। এই আকাশচুম্বী উচ্চতম অট্টালিকাটি ‘স্টিল টাওয়ার্স’ নামে খ্যাত। ডাউন টাউনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আকাশচুম্বী অট্টালিকাগুলোকে ঘিরেই রয়েছে পয়ত্রিশটি বড় বড় শপিং মল এবং আমেরিকার বিখ্যাত সব কোম্পানীগুলোর অফিস। ষ্টিল সংক্রান্ত ব্যবসায়ের সহিত জড়িত প্রায় তিনশটির মত প্রতিষ্ঠান রয়েছে পিটস্বার্গে এবং সেজন্যই পিটস্বার্গকে “সিটি অফষ্টিল” বলেও অভিহিত করা হয়।
গোল্ডেন ট্রাইঙ্গলের পূবে ওকল্যাণ্ড, সেডি সাইড প্রভৃতি এলাকা জুড়ে রয়েছে বিখ্যাত ইউনিভার্সিটি অফ পিটস্বার্গ, কারনেগি মেলন ইউনিভার্সিটি সহ আরো যাটেরও অধিক উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠান। ১৭৮৭ ইংরাজিতে প্রতিষ্ঠিত আমেরিকার প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্যতম ইউনিভার্সিটি অফ পিটস্বার্গ বর্তমানে নানা ডালপালা বিস্তৃত করে বিশাল মহীরুহে রূপান্তরিত হয়েছে। এই ইউনিভার্সিটির বিভিন্ন বিভাগে এক লক্ষেরও অধিক কর্মচারী নিয়োজিত। এরমধ্যে ইউনিভার্সিটি অফ পিটস্বার্গের মেডিকেল সেন্টারের কর্মী সংখ্যাই হলো আটচল্লিশ হাজার। ইউনিভার্সিটি অফ পিটস্বার্গের ডঃ জোনাস সল্কই ১৯৬২ ইংরাজিতে পোলিও ভেকসিনের প্রথম উদ্ভাবন করেন।
দেশ বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উচ্চ শিক্ষার জন্য ইউনিভার্সিটি অফ পিটস্বার্গ, কারগেনি মেলন ইউনিভার্সিটি এবং আরো সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্র-ছাত্রীরা এসে ভর্তি হয়। তাছাড়া গুগুল, অ্যাপল, বডিসনি, ইউবার, ইনটেল এবং আইবিএম প্রভৃতি পৃথিবী খ্যাত কোম্পানিগুলো সহ আরো সহস্রাধিক ছোট বড় কোম্পানীর কার্যালয় পিটস্বার্গে রয়েছে। তাছাড়া কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান সাইবার ডিফেন্স, সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং, রবোটিক এনার্জি এবং নিউক্লিয়ার নেভি প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর গবেষণা এবং উন্নয়নের ব্যাপারে জড়িত। সরকারী পরিসংখ্যান মতে পিটস্বার্গের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োজিত কর্মীদের সম্মিলিত বেতনের পরিমাণ কুড়ি বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হয়ে থাকে।
আধুনিক প্রযুক্তি ও জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চায় অগ্রণী আমেরিকার পেনসেলভেনিয়া রাজ্যের এই দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরে পিটস্বার্গে ডকুইনি ইক্লাইন দিয়ে প্রবেশ করে ডাউন টাউনের গোল্ডেন ট্রাইঙ্গল, ওকল্যাণ্ড এবং সেডি সাইড প্রভৃতি এলাকা আমরা গাড়িতে চেপেই ঘুরে ঘুরে দেখি। পূব থেকে পশ্চিম এবং উত্তর থেকে দক্ষিণে নানা পথ ধরে অসংখ্য সেতুর উপর দিয়ে চলতে চলতে অনন্য সুন্দর আলোর ঝলমলানিতে গগনচুম্বী অট্টালিকা, নদীর উপর অনতিদূরে আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি নানা আকারের সেতু এবং নিচে নদীতে ভাসমান জলে চকমক আলোর প্রতিফলন দেখে সত্যিই পিটস্বার্গ শহরকে রূপনগরী ছাড়া অন্য কিছু ভাবাই যায় না।
প্রায় ঘন্টা দেড়েক সময় শহরে ঘুরাঘুরি করার পর চলে যাই একটি ভারতীয় রেস্তরায়। সেখানে গিয়ে রেস্তরার পার্কিং জোনে গাড়ি রাখার উপায় নেই। অনেক আগে থেকেই আরো লোকজন রেস্তরায় এসে গেছে। ওদের গাড়িগুলো পার্কিং জোনের সব শ্লট দখল করে রেখেছে। তাই বাধ্য হয়ে দু’তিন ফার্লং দূরে আরেকটি মটেলে গিয়ে আমাদের গাড়ি রাখতে হয়।
রাত তখন প্রায় দশটা বেজে গেছে। রাত বাড়ার সাথে সাথে শীতও যেন বাড়ছে। আমাদের শীতবস্ত্র বাইরে বয়ে চলা ঠাণ্ডা হাওয়াকে পুরাপুরি প্রতিহত করতে পারছে না। বেশ ঠাণ্ডা অনুভূত হয়। এই শীতের মধ্যেই খোলা আকাশের নিচে সাইড ওয়াক দিয়ে অরুণীমের ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে ফার্লং তিনেক দূরত্ব পাড়ি দিয়ে আবার রেস্তরার সামনে চলে আসি।
রেস্তরায় ভিড় তখনও কমেনি। গেইটের সামনে আমাদেরকে মিনিট পনেরো দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। গেইট খুলার পর ভিতরে প্রবেশ করেই প্রথমে যা নজরে পড়ে তা দেখে অবাক হই। আমাদের দেশের সিনেমা হলগুলোর মতই বিরাট হলঘর। তবে হলঘরের একপাশে রয়েছে অনেকগুলো ডাইনিং টেবিল। ডাইনিং টেবিল ঘিরে লোকজনের ভিড়। অন্য পাশে সারি সারি চেয়ার এবং সামনে টাঙানো বিরাট পর্দা। প্রত্যেকটি চেয়ারেই মানুষ বসে আছে এবং সামনের বিরাট পর্দায় দেখানো হচ্ছে বিগ বি অমিতাভ বচ্চনের একক অভিনয়। লোকজনের চেহারা এবং পোষাক পরিচ্ছদ দেখে সবাইকে ভারতীয় বলেই মনে হয়। একটু ভালো করে নজর দিতেই বুঝা যায় ডাইনিং টেবিল ঘিরে চেয়ারে বসা লোকগুলি নিজ নিজ ভোজনে ব্যস্ত এবং সারি সারি চেয়ারে বসা লোক গুলো বেশ উৎসাহেই মনমাতানো একক অভিনয় উপভোগ করছে।
রাতের আহার পর্ব শেষ করে তাড়াতাড়িই রেস্তরা থেকে আমাদের বেরিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। কারণ, রাত্রি যাপনের জন্য যেতে হবে এয়ারপোর্টের নিকট হোটেল মেরিয়টে। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় যে তাড়াতাড়ি আহার শেষ করে এখান থেকে বের হওয়া যাবে না সেটা বুঝা যাচ্ছে। বিকল্প কোন ব্যবস্থাও নেই, অগত্যা আহারের জন্য অর্ডার বুক করে দাঁড়িয়ে থাকি। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর ওয়েটার এসে আমাদেরকে একটা ডাইনিং টেবিলের সামনে নিয়ে বসার ব্যবস্থা করে দেয়। অল্পক্ষণের মধ্যেই খাবার এসে যায়। আমরাও চটজলদি খেয়েই রেস্তরা থেকে বেরিয়ে পড়ি।
ইতিমধ্যে সময় গড়িয়ে মধ্য রাত্রি পার হয়ে গেছে। বাইরে ঠাণ্ডার মাত্রাটা যেন রাত বাড়ার সাথে সাথে বাড়ছে। রেস্তরা থেকে বেরিয়েই গাড়িতে চাপতে পারলে কোন অসুবিধা ছিল না। কিন্তু আমাদেরকে আবার খোলা আকাশের নিচে সাইড ওয়াক দিয়ে অরুণীমের ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে মোটেলে যেতে হবে তিন ফার্লং দূরত্ব পাড়ি দিয়ে। তাড়াতাড়ি পা ফেলেই অরুণীমের ট্রলি ঠেলে ঠেলে আমরা পৌঁছে যাই মোটেলের দোরগড়ায়।
অশোকতরু মোটেল থেকে গাড়ি বের করে নিয়ে এসে আমাদের সামনে রাস্তার পাশে দাঁড় করায়। প্রথমেই অরুণীমের কারসীটটা বেঁধে নেই। তারপর আমরা সবাই গাড়ির ভেতরে গিয়ে বসি। গাড়ির ভেতরে ঠাণ্ডা হাওয়ার কোন প্রভাব নেই। অনেকক্ষণ খোলা আকাশের নিচে ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাপটায় বেশ কাবু হয়েছিলাম। গাড়ির ভেতর এসি নব ঘুরিয়ে তাপমাত্রা বেশ আরামদায়ক অবস্থানে রেখেই আমাদের গাড়ি স্টার্ট নেয় পিটস্বার্গের এয়ার পোর্ট সংলগ্ন হোটেল মেরিয়টে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে।
প্রশস্ত মসৃণ রাস্তা দিয়ে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলছে। নিস্তব্ধ নিঝুম রাতে আলোর রোশনাইয়ে সজ্জিত দূরের সুউচ্চ অট্টালিকাগুলোর অনুপম সৌন্দর্য, সামান্য দূরত্ব অতিক্রম করার পর বাঁকে বাঁকে নিচে বয়ে চলা নদীর জলে আলোর রকমারি প্রতিফলন প্রভৃতি রাত বাড়ার সাথে সাথে দর্শকের উপর আরো বেশি করে মোহময় প্রভাব বিস্তার করছে। আমরা গাড়িতে বসে পারিপার্শ্বিক সৌন্দর্যের আকর্ষণীয় রূপে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে নির্বাক চেয়ে দেখি। কিন্তু কি আশ্চর্য, প্রায় ঘন্টা খানেক সময় অবধি ভাবাবিষ্ট মনে চলতে চলতে বুঝতে পারি আমরা যেন একই জায়গায় বার বার ঘুরপাক খাচ্ছি। ডাউন টাউন সহ সমগ্র পিটস্বার্গের রাস্তাগুলোতে সামান্য এগিয়েই বাঁক নিয়ে নদীর উপর সেতু। আবার কিছুদূর গিয়ে আবার বাঁক নিয়ে সেতু। তারপর সেতু আর সেতু। সরকারী পরিসংখ্যান অনুসারে সারা পিটস্বার্গে মোট ৪৪৬ টি সেতু রয়েছে। আর এই বিশেষ সংখ্যার সেতু আছে বলেই পিটস্বার্গকে সিটি অফ ব্রীজেস বলা হয়ে থাকে। আমরা চারজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ এবং শিশু অরুণীমকে নিয়ে নিশুতি রাতে পিটস্বার্গ শহরের ডাউন টাউন থেকে সেতুর বেড়াজাল কাটিয়ে সঠিক রাস্তা ধরে গন্তব্যস্থলের দিকে এগুতে পারছি না। রূপনগরী পিটস্বার্গ এখন মায়াবী জাদুকরী পিটস্বার্গ হয়ে আমাদেরকে হাবুডুবু খাওয়াচ্ছে।
অশোকতরু বুঝতে পারছে না কেন সে গাড়ির গতিপথ সঠিকভাবে চিহ্নিত করে এগুতে পারছে না। তবুও সে হাল না ছেড়ে বিশেষ করে নজর রেখেই ষ্টিয়ারিং ধরে সঠিক পথ খুঁজে পেতে ধীরে ধীরে গাড়ি চালাচ্ছে। আমি কিন্তু ভয়ে ভীত হই। কি জানি বাবা, আমাদেরকে কি এভাবেই সারারাত ঘোর পাক খেতে হবে নাকি। ভাবতে ভাবতে বিবশ হয়ে যাই। এখন এমতাবস্থায় কেহর কোন সাহায্য পাওয়াও দুষ্কর। তাই অজানা আশঙ্কায় প্রায় দিশেহারা। তখন অনন্যোপায় হয়ে মনে মনে গুরুদেবকে স্মরণ করি। প্রার্থনা করি, আমাদের গাড়ি যেন সঠিক পথ ধরেই এগিয়ে যায়। তবে কিছুক্ষণ পর নীরবতা ভঙ্গ করে অশোকতরু বলে, - বাবা আমরা এখন ঠিক পথেই এগুচ্ছি। ঐ দেখ ডকুইসিস ইনক্লাইন দেখা যাচ্ছে। আমি সম্বিত ফিরে পাই। সামনে তাকিয়ে দেখি সত্যি ডকুইনি ইনক্লাইন আলোতে ঝলমল করে তার স্বমহিমা বিস্তার করছে। এতসময়ে মনে যে আশঙ্কা বিরাজ করছিল তা হঠাৎ বিলীন হয়ে যায়। মনে আনন্দের ঢেউ বইতে থাকে।
অশোকতরু গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেয়। অচিরেই ডকুইসিস ইনক্লাইন পার হয়ে হাইওয়ে ধরে গাড়ি এগিয়ে চলে এয়ারপোর্টের দিকে। মিনিট ত্রিশেক ড্রাইভ করার পর আমরা পৌঁছে যাই হোটেল মেরিয়টে। রাত তখন দুটো বাজতে দশমিনিট বাকী।
পরদিন সকালবেলা ঘুম ভাঙতে প্রায় আটটা বেজে যায়। আমাদেরকে হোটেল থেকে দশটার ভেতরেই চেক আউট করতে হবে। তাড়াতাড়ি স্নানটান শেষ করে মেরিয়টের কাফেটারিয়াতেই সকালবেলার আহার পর্ব সেরে নেই। তারপর জিনিসপত্র গোছ গাছ করে হোটেলের রিসেপশন কাউন্টার রুমে চাবি জমা দিয়ে চলে যাই পার্কিং জোনে। ফিরা যাত্রায় প্রথমেই পিটস্বার্গের উপকণ্ঠে ভারতীয় প্রবাসীদের দ্বারা তৈরি ও নিয়ন্ত্রিত বালাজী মন্দিরে যাবো। সেখানে কিছু সময় কাটিয়ে মন্দির থেকে পূজার প্রসাদ নিয়ে রওয়ানা হবো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে প্রবাসের আস্তানা আববার্ণ হিলস্ এডামসক্রীকের এপার্টমেন্টে পৌঁছোতে। হোটেল মেরিয়টের প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে এসে হাইওয়ে ধরে পূবমুখে চলতে থাকে আমাদের গাড়ি। চলতে চলতে আবার সেই মাউন্ট ওয়াশিংটন, ডকুইসিস ইনক্লাইন, পিটস্বার্গ ডাউন টাউনের গোল্ডেন ট্রাইঙ্গলে গগনচুম্বী অট্টালিকা অতিক্রম করে আমাদের গাড়ি দ্রুত এগিয়ে চলে পিটস্বার্গের পূব দক্ষিণ অভিমুখে। তবে পিটস্বার্গের স্কাইস্ক্রেপার, ষ্টিল টাওয়ার্স এবং বিশেষ প্রযুক্তিতে তৈরি সেতুগুলো রাতে যে মনোহারিনী রূপ প্রকাশ করেছিল দিনের আলোয় সেটা যেন কিছুটা নিষ্প্রভ।
আমরা এসব অতিক্রম করে পিটস্বার্গের দক্ষিণ ঘেঁষে পূর্বাভিমুখে এগিয়ে চলি। জায়গাটার ভৌগলিক অবস্থান অনেকটা আমাদের মেঘালয় রাজ্যের শৈলশহর শিলং এর মতই দেখতে। তবে উঁচু নিচু পাহাড়িয়া জায়গায় বসবাসের ঘরগুলো আমেরিকার ধাঁচেই তৈরি। প্রায় ত্রিশ চল্লিশ মিনিট ড্রাইভ করার পর আমরা পিটস্বার্গের উপকণ্ঠে একটা নির্জন পাহাড়িয়া অঞ্চলে প্রবেশ করি এবং সেখানেই রয়েছে ভারতীয় প্রবাসীদের বালাজী মন্দির। বালাজী মন্দিরের সামনে পৌঁছে গাড়ি পার্কিং জোনে রেখে আমরা চলে যাই মন্দির এলাকার অভ্যন্তরে। নির্জন পাহাড়িয়া জায়গায় মন্দিরের চতুঃসীমার আবেষ্ঠনীতে তখন জমজমাট অবস্থা। ইতিমধ্যেই লোকজনের ভিড় জমে গেছে। আবাল বৃদ্ধ বনিতার সমাবেশ দেখে মনে হয় বালাজী মন্দিরটা যেন পিটস্বার্গ ও তৎপার্শ্ববর্তী অঞ্চলের প্রবাসী ভারতীয়দের এক মিলন মঞ্চ। বেশির ভাগ জমায়েত প্রবাসীদের চালচলন দেখে মনে হয় ওরা যেন সারাদিনের জন্যই এখানে এসেছে। আমাদের মত মন্দির দেখেই চটজলদি ফিরে যাওয়ার মত নয়।
আমরা তাড়াহুড়া করেই মন্দিরের বহিরাঙ্গণে চারপাশে সামান্য ঘুরাঘুরি করে চলে যাই মন্দিরের ভিতর। কিন্তু উপচে পড়া ভিড়ের মধ্যে ঠেলাঠেলি করে অরুণীমকে নিয়ে চলাফেরা করতে অসুবিধা হয়। তাই ভিড় থেকে দূরত্ব বজায় রেখে একটা ফাঁকা জায়গাতে এসে দাঁড়িয়ে থাকি। ইতিমধ্যে প্রসাদ বিতরণের জন্য কুপন দেওয়া শুরু হয়ে যায়। কুপন সংগ্রহের লাইন শুরু হওয়ার সাথে সাথেই অশোকতরু লাইনের প্রথম ভাগেই দাঁড়িয়ে চারটা কুপন খরিদ করে নিয়ে আসে। তারপর আমরা সবাই চলে যাই প্রসাদ গ্রহণের জন্য মন্দিরের পাশেই নির্ধারিত ঘরে। সেখানে প্রসাদ গ্রহণ করার সুবন্দোবস্ত রয়েছে।
অরুণীমকে আমাদের পাশেই ট্রলিতে রেখে বাকী চারজন চেয়ারে বসে প্রসাদ গ্রহণ করি। দক্ষিণ ভারতীয়দের তৈরি খিচুড়ি প্রসাদ। আমার খেতে খুবই ভালো লাগে। সারাদিনের জন্য পেটভরে খিচুড়ি প্রসাদ তৃপ্তি সহকারে খেয়ে নেই। কারণ প্রায় আট ঘন্টা লাগাতার হাইওয়ে দিয়ে গাড়ি চলতে চলতে আমাদের অকুস্থলে পৌঁছতে রাত্রি হয়ে যাবে। তাই রাস্তায় খাবারের যেন প্রয়োজন না হয় সেরকম ভেবেই উদর পূর্তি করে নেই।
প্রসাদ গ্রহণ করার পরই আমরা ধীরে ধীরে মন্দিরের সামনে পার্কিং জোনে চলে আসি। তখন বেলা প্রায় বারোটা ছুই ছুই। গাড়িতে অরুণীমের কারসীট বেঁধে ট্রলিটা ডিকিতে রেখে দেই। তারপর সবাই গাড়িতে যার যার নিজস্ব আসনে বসি। অশোকতরু গাড়িতে ষ্টার্ট দেয়। ধীরে ধীরে পাহাড়ের ঢালু রাস্তা বয়ে গাড়ি এগিয়ে বাঁক নিয়েই চলে যায় হাইওয়েতে। শেষবারের মত পিছন ফিরে বালাজী মন্দিরের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলি - বিদায় মায়াবী সেতুনগরী পিটস্বার্গ, বিদায়।