গুডুম্, গুডুম্।…….. গুডুম্, গুডুম্।
আজকাল প্রায়ই পাহাড়ের নিস্তব্ধতা ভেদ করে দূর থেকে দূরে গুলির আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হয়ে থাকে। মিজো ন্যাশন্যল ফ্রন্টের স্বঘোষিত স্বাধীন মিজোরামের সামরিক বিভাগের ভলান্টিয়ার্সরা রাইফেল ধরেছে। শত্রুকে নিশানা করে নাজেহাল করে। প্রত্যেকেরই মনোবল দৃঢ় এবং অটুট। ‘আমাদের স্বঘোষিত মিজোরামের স্বাধীনতা এবং অখণ্ডতা বজায় রাখতে দেহে শেষ রক্ত বিন্দু থাকা পর্যন্ত শত্রুর সাথে লড়াই চালিয়ে যাব। শত্রু বাহিনী যতই শক্তিশালী হোক না কেন। আমরা যখন আমাদের দেশকে স্বাধীন বলে ঘোষণা করেছি তখন এই স্বাধীনতার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটাবই’। প্রত্যেক বিদ্রোহী মিজোর একই মনোভাব। এ মনোভাব নিয়েই গুপ্ত বাহিনীর আগাম খবর পেয়ে থু-আয়া তাঁর সহ কর্মীদেরকে নিয়ে সদর রাস্তার পাশে জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড়ের ঝোপে এমবুশ করেছে।
মিজো বিদ্রোহীদেরকে পুরাপুরি পর্যুদস্ত করতে সরকার সেনা বাহিনীকে জোর তলব করেছে। কনভয়ের পর কনভয় কাছাড়ের ভিতর দিয়ে শিলচর হয়ে মিজো পাহাড়ে ঢুকেছে। বিদ্রোহীদেরকে দমন করে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হবে। দুদিন আগেও বেশ কিছু ঢুকেছে, আজ যে কিছু সংখ্যক ঢুকবে তাদের প্রতীক্ষাতেই থু-আয়া সহকর্মীদেরকে নিয়ে এই এমবুশ করেছে। পাহাড়ের গা ঘেষে রাস্তাটা ক্রমাগত এঁকে বেঁকে সর্পিল গতিতে উপর দিকে উঠে গেছে। গভীর জঙ্গল। রাস্তার একদিকে পাহাড়টা ক্রমশ উঁচু হয়ে গেছে। অন্যদিকে গভীর খাত। একটু অসতর্ক হলেই মোটর গাড়ী গভীর খাতে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশী। থু- আয়া ও তাঁর সহকর্মীরা রাস্তার যে দিকে খাত তার বিপরীত পার্শ্বে পাহাড়ের উঁচু জায়গার মধ্যে পজিশন নিয়ে প্রতীক্ষা করছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মিলিটারী ভ্যানের ক্ষীণ আওয়াজ পেয়ে থু-আয়া সতর্ক হয়ে গেল। আওয়াজ শুনে মনে হচ্ছে ভ্যানগুলি অনেক নিচে ঘুরে ঘুরে পাহাড়ের সর্পিল রাস্তা ধরে এগিয়ে আসছে। এখনও আয়ত্তের মধ্যে আসতে প্রায় আধ ঘন্টা সময় লাগবে।
পাহাড়ের নিস্তব্ধতা ভেদ করে ক্ষীণ আওয়াজটা ধীরে ধীরে প্রকট হয়ে আসছে। আওয়াজ বাড়ার সাথে প্রতিটি মূহুর্তে থু-আয়া ও তাঁর সহকর্মীদের মনে নূতন আলোড়ন সৃষ্টি করে চলছে। প্রতিটি মূহুর্ত এক এক করে কাটছে আর প্রতিটি বিদ্রোহী মিজোর দেহে শত্রু হানার উন্মাদনা বেড়ে চলছে। প্রায় ৫০ মিটার কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ মিলিটারী ভ্যানের একটানা আওয়াজ ভেদ করে গর্জে উঠল গুডুম্ গুডুম্ বিকট শব্দ। একটি গুলির আওয়াজই বিভিন্ন উচুঁচু নিচু পাহাড়ের মধ্যে বাধা পেয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। পাহাড়ের মধ্যবর্তী নিচু জায়গাতে কিছু সংখ্যক গুলাগুলি হলেই সেগুলোর আওয়াজ এমনভাবে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে যেন মনে হয় বিরাট একটা বাহিনী চারিদিক থেকে এক নাগাড়ে গুলি করে চলছে। আগে পিছে ছয় সাতটা মিলিটারী বোঝাই ভ্যান চলছিল। আচমকা গুলির আঘাত খেয়ে প্রথম গাড়ীটা থামতেই সবগুলি থমকে দাঁড়াল। চিলের ঝাপটা খেয়ে মরণী ছাত্রা ভ্যানের মিলিটারীগুলোও গুলির আঘাতের চেয়ে শব্দে বেশী ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ভ্যান থেকে লাফিয়ে পড়তে শুরু করল। ক্রমাগত গুলি এবং বোমা ছুড়ে প্রায় আধঘণ্টা পরে জেনারেল থু-আয়া এবং তাঁর সহকর্মীরা থামলেন।
ততক্ষণে সূর্য পশ্চিম আকাশের শেষ সীমানায় দ্রুত মিলিয়ে যাচ্ছে। আঁধার জায়গাটাকে অতি শীঘ্রই ছেয়ে ফেলবে। রাস্তার মধ্যিখানে দু’খানা মিলিটারী ভ্যান বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়ে জ্বলছে। তারও কিছু পিছনে পাহাড়ের গায়ে লেগে একটা ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। মিলিটারীর দেহগুলি বিভিন্ন ভঙ্গিতে মাটিতে এখানে সেখানে পড়ে রয়েছে।
— ওদের সবগুলিই খতম হয়ে গেল নাকি? সাড়া শব্দ ত কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না। ফিস ফিস করে জেনারেল থু-আয়া তাঁর সহকর্মীকে জিজ্ঞাসা করলেন।
— আমার একটা করে গুলিতে না হলেও দু’তিনটা ঘায়েল হয়েছে। একটা স্ট্রেইট গুলির ঘা খেয়ে মরেছে আর দু’একটা নিশ্চয় ভয়ে প্রাণ বাঁচাতে লাফ দিয়ে খাতে পড়ে গেছে। একেবারে খতম না হলেও চার পাঁচশ মিটার নিচে থেতলে মরণ গোঙাণি গোঙাচ্ছে।
একথা বলেই সহকর্মীটি হাসল। জেনারেল থু-আয়াও কথাগুলি শুনে না হেসে পারল না। কারণ ওদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এরকম হয়ে থাকে। আচমকা আক্রমণে ভয় পেয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে বাঁচার জন্য মরীয়া হয়ে মরণ ফাঁদে ঝাপিয়ে পড়ে। এবারও ব্যতিক্রম হয়নি।
অন্ধকারটা একটু গাঢ় হওয়ার পর জেনারেল থু-আয়া ও তাঁর সহকর্মীরা অত্যন্ত সন্তর্পণে ওদের গুপ্ত পথ দিয়ে সদর রাস্তায় নেমে আসল। অন্ধকার গাঢ় হওয়ায় পাহাড়ের নিস্তব্ধতা যেন আরও বেশী মনে হল। নিঝুম অন্ধকারে পাহাড়ের নিস্তব্ধতার মধ্যে সদর রাস্তায় কয়েকটা ছায়া মূর্তির মতই বিদ্রোহী থু-আয়ারা এদিক সেদিক ধীরে ধীরে খুঁজে খুঁজে দেখছে। ওরা দেখল সদর রাস্তায় যতগুলি পড়ে রয়েছে সবগুলিই মৃত। আরো কিছু দূর এগিয়ে দেখল পুড়ে যাওয়া দুটোভ্যানের ভগ্নাবশেষ পড়ে রয়েছে। আরো কিছু পিছে আরেকটি ভ্যান পাহাড়ের গায়ে ঠেস দিয়ে আছে। মৃতদেহের পাশে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত যে সমস্ত রাইফেল ছিল সেগুলি কুড়িয়ে কুড়িয়ে থু-আয়া ও তাঁর সহকর্মীরা ধীরে ধীরে আবার গুপ্ত পথ দিয়ে পাহাড়ে উঠল। সিগন্যাল বাহিনীর নির্দেশ পেলেই সেখান থেকে অন্য অঞ্চলে চলে যাব।
কোন জায়গাতে আক্রমণ করে সেখানে বেশি সময় থাকতে নেই। শত্রু ঘায়েল করার পর অস্ত্রশস্ত্র যা পাওয়া যায় তা নিয়েই সুবিধা মত তাড়াতাড়ি এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হয়। কিন্তু সেটা সিগন্যাল বাহিনীর নির্দেশানুসারেই হয়। তাই জেনারেল থু-আয়া ও তাঁর সহকর্মীদেরকে সিগন্যালের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। যে দিক থেকে সিগন্যাল আসার কথা সেদিকে মুখ করে জঙ্গলের মধ্যে থু-আয়া বসে পড়ল। থু-আয়ার সাথে সাথে তাঁর সহকর্মীরাও বসল। সামান্য অবসরে ক্লান্তিতে ভরপুর দেহটাকে একটু চাঙ্গা করে নিতেহয়। সেটা ভেবেই একটা বাইলো ধরিয়ে বেশ আমেজের সহিত টানতে লাগল। অবশ্য আক্রমণের সাফল্যে ওদের মনে আনন্দের ঢেউ কেমন একটা চনমন করছে।
বাইলোর ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে জেনারেল থু-আয়া বলল, ওরা ভাবতেই পারেনি যে এ জায়গা থেকে ওদেরকে আমরা এমনভাবে আক্রমণ করব। থু-আয়ার কথা শুনেই সহকর্মী জায়চোয়াঙ্গা বলল, — হ্যাঁ, বেটাদের ভ্যানে বসার নমুনা দেখে মনে হচ্ছিল ওরা “Pleasure trip” এ যাচ্ছিল।
— “Pleasure trip” মানে? সহকর্মী বোংথাঙ্গা প্রশ্ন করল।
— “Pleasure trip” মানে ওরা ভাবছিল আইজল গিয়েই ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে রাত্রে মদ খেয়ে বস্তীতে মেয়ে ছেলেদের উপর হামলা করবে।
জায়চোয়াঙ্গা আরো কিছু বলতে চাইছিল কিন্তু তার আগেই রোলখোমা মাঝখান থেকে বলল, ওদের বিদ্রোহ দমন করা মানে ত ওই। পুঞ্জীতে ঢুকে এলোপাতাড়ি মারপিট করে কেবল মেয়েদেরকে ধর্ষণ করা।
সহকর্মী রোলখোমা, বোংথাঙ্গা এবং জায়চোয়াঙ্গার কথাগুলি শুনে জেনারেল থু- আয়ার বেশ ভালোই লাগছিল। আবার সাথে সাথে প্রতিহিংসায় মেজাজটা ও কড়া হয়ে উঠেছিল। সে বলল, - আইজলের পার্শ্ববর্তী এমন একটা পুঞ্জী বাকী নেই যেখানে শত্রুবাহিনীর লম্পটগুলো এলোপাতাড়ি ভাবে পাশবিক অত্যাচার করেনি। চৌদ্দ পনেরো বছরের উর্দ্ধে প্রত্যেকটি মিজো মেয়েকে ওদের পাশবিক কামনার শিকার করেছে। ওরা আমাদের মা বোনদেরকে ধর্ষণ করেছে। ইজ্জত লুঠছে অথচ ওরা ভীষণ কাওয়ার্ড। বিদ্রোহীদেরকে দমন করতে এসে বিদ্রোহীদের আচমকা একগুলিতেই সাধারণ সৈনিক থেকে ক্যাপ্টেন পর্যন্ত গুলিয়ে যায়।
এ সমস্ত আলাপ আলোচনার ফাঁকে বেশ সময় এগিয়ে গেছে। আকাশে মিট মিট করা তারার আলো ছাড়া সমস্ত কিছুই গাঢ় অন্ধকারে ছেয়ে ফেলছে! হঠাৎ দূরে পাহাড়ের গায়ে পর পর দুবার সরু লম্বা আলোর রেখা দেখে থু-আয়া ও তাঁর সহকর্মীরা উঠে পড়ল। এবার এস্থান ছেড়ে গোপন আস্থানায় চলে যেতে হবে। গুপ্তবাহিনী আশপাশের পরিবেশ পর্যালোচনা করে রাত্রিবেলা বিভিন্ন ভাবে আলোর সঙ্কেত দিয়ে এ্যাকশন স্কোয়াডকে গাইড করে থাকে। আলোর সঙ্কেত দিয়ে বিদ্রোহী এ্যাকশন স্কোয়াডকে গাইড করা হয়ে থাকে সেটা জানতে পারলেও সে সংকেত স্কোয়াডকে কোন জায়গা থেকে কোন জায়গায় যাবার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে সেটা নিরাপত্তা বাহিনী সঠিক ভাবে আঁচ করতে পারে না।
জেনারেল থু-আয়া, বোংথাঙ্গা, জায়চোয়াঙ্গা এবং অন্যান্য সহকর্মীরা সবাই আজকে শত্রুপক্ষ থেকে প্রাপ্ত রাইফেল গুলো সাথে বহন করে পাহাড়ের গভীর জঙ্গলের মধ্য দিয়ে নিজেদের গুপ্ত পথে গোপন আস্তানার উদ্দেশ্যে এগিয়ে চলল।
আইজলগামী নিরাপত্তা বাহিনীটির নাপাত্তা হওয়ার খবরটা যখন সামরিক কর্তাব্যক্তিদের কাছে পৌঁছবে ততক্ষণে জেনারেল থু-আয়া সহকর্মীদেরকে নিয়ে তাঁদের আস্তানায় পৌঁছে যাবে। সামরিক কর্তাব্যক্তিরা বিদ্রোহী মিজোদের এবম্বিধ আচরণে ক্ষেপে গিয়ে অধিক সংখ্যক সৈনিককে আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত করে সমূলে বিনাশ করার জন্য যে জায়গাতে বিদ্রোহীরা আচমকা আক্রমণ চালিয়ে ছিল সেটাকে ঘিরে ফেলবে। তখন সে জায়গাতে নিরাপত্তা বাহিনী তৎপর হয়ে যে ফল পায় সেটা প্রকৃতই পর্বতের মুষিক প্রসবের সামিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভীষণ ভাবে তোড়জোড় চালিয়ে শেষে বুঝতে পারে যে ওরা গভীর জঙ্গলে ততক্ষণ শুধু শুধুই হয়রান হয়েছে।