রাংচোয়াঙ্গাদেরকে যখন শিলচর জেল থেকে বের করে নিয়ে রেলগাড়ীর সাহায্যে দূরপাল্লার পাড়ি দেয় তখন ওরা টের পায়নি যে ওদেরকে কোথায় এবং কি উদ্দেশ্যে নেওয়া হচ্ছে। রাংচোয়াঙ্গা এবং অন্যান্যদের মন এক অজানা আশঙ্কায় ভারাক্রান্ত ছিল। কি হবে ভাবনাটাই সর্বক্ষণের জন্য ওদের মনে পীড়াপীড়ি করছিল। কর্তৃপক্ষ রাংচোয়াঙ্গাদের সাথে অন্যান্য বিদ্রোহী মিজোদেরকে আসামের বিভিন্ন জেলে ভাগ বাটোয়ারা করে পাঠিয়ে স্বতন্ত্র ভাবে রাখে। আসামের বিভিন্ন জেল ছাড়া অনেককে আসামের বাইরেও চালান দেয়। বিভিন্ন জেলে বিদ্রোহীদেরকে কালযাপনের অধিকাংশ সময়ই অজানা ভবিষ্যতের অমঙ্গল চিন্তায় কাটে। রাষ্ট্রদ্রোহীতার অপরাধে অভিযুক্ত করে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২১ ধারা মতে গ্রেপ্তার করে দীর্ঘদিন চলে যাওয়ার পরও সত্য এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার জন্য মহামান্য আদালত বিচার শুরু করেনি। বিচারাধীন বন্দী হিসাবে দীর্ঘদিন ধরে তাদেরকে জন্মভুমি থেকে বিচ্ছিন্ন করে সুদুর অঞ্চলে অবস্থিত বিভিন্ন চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ করে রেখে দেয়। ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২১ ধারা ছাড়াও অনেককে বিভিন্ন ধারাতে গ্রেপ্তার করেছে। কিন্তু যখন চার্জশীট দাখিল করতে পারেনি তখন কর্তৃপক্ষ অনেকের ক্ষেত্রে পূর্বের অভিযোগ বাতিল করে মুক্তি দেওয়ার কথা ঘোষণা করে। তখন স্বভাবতই সে সমস্ত বন্দীরা ভাবে যে যাক তাহলে এত দিন পর মুক্তি পেয়ে আবার জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়া যাবে। তখন মনে নূতন প্রাণের স্পন্দন বইতে থাকে। অনেকেই নিজেদেরকে আনন্দের জোয়ারে ভাসিয়ে দেয়, কিন্তু এখানেই শেষ নয়। কর্তৃপক্ষের কারসাজি তাদের সেই আনন্দের জোয়ার বেশীক্ষণ বইতে দেয় না। তাদেরকে পূর্ব্বের অভিযোগ থেকে খালাস করে জেল থেকে বের করে আবার অন্যান্য ধারা প্রয়োগ করে জেলে ঢুকিয়ে দেয়। ন্যায় এবং সত্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য যে বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থা সেটার মহিমা প্রকাশ করতে কর্তৃপক্ষ এমনি ভাবে মিজো বন্দীদেরকে জেল গেইট থেকে বের করে দেয় এবং অন্য ধারা দিয়ে আবার গ্রেপ্তার করে জেলে ঢুকিয়ে দেয়। এগুলি করেই হয়তো কর্তৃপক্ষ বাইরের লোকদের কাছে প্রমাণ করতে চান যে, দেখ আমরা মিজো বন্দীদেরকে এমনিতেই ফেলে রাখিনি। কিন্তু এমনিতর প্রশাসনিক এবং বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থা কার্যকরী হতে গিয়ে বিচারাধীন মিজো বন্দীদেরকে যে কষ্ট সহ্য করতে হয় সেটা বাইরের জনগণ পুরাপুরি টের পায় না। আবার কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ওদেরকে পূর্বের ধারা থেকে মুক্তি দেওয়ার খবর ঢালাও ভাবে প্রচার করলেও সাথে সাথে নূতন ধারায় অভিযুক্ত করে যে আবার জেলে আবদ্ধ করে রাখছে সেটা তেমন ব্যাপকহারে প্রচারিত হয় না। প্রসাশনিক ব্যবস্থার আবর্তে পড়ে রাংচোয়াঙ্গা এ জেল সে জেল থেকে স্থানান্তরিত হতে হতে দীর্ঘদিন পর আবার শিলচর জেলে পৌঁছল। রাংচোয়াঙ্গা দেখল তার ব্যাপারে মূলত কোন পরিবর্তন না হলেও জেলের আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি একটু ভিন্ন ধরণের।

প্রশাসনিক ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে রাংচোয়াঙ্গাদেরকে ছাড়ার ব্যাপারে কিছু ত্বরান্বিত করতে না পারলেও শান্তি এবং নিরাপত্তা রক্ষা করার জন্য নূতন বিদ্রোহী মিজোদেরকে গ্রেপ্তার করা বন্ধ হয়নি। নিত্য নূতন বিদ্রোহী মিজোরা নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক ধৃত হয়ে জেলে আসছে। বেশীর ভাগই বিচারাধীন বন্দী।

একদিন সকালবেলা রাংচোয়াঙ্গা দেখল চারটি মিজো ছেলে কয়েদীর পোষাক পরে জেলের কুয়া থেকে জল তুলছে। কয়েদীর পোষাক পরা দেখে রাংচোয়াঙ্গা একটু আশ্চর্যই হল। সে নিজেই তাদের কাছে গিয়ে ভিড়ল এবং তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলল,-আরে তোমাদের দেখছি আদালতে বিচার হয়ে গেছে।

— হ্যাঁ, আদালত আমাদের বিচার করেছে। আমরা চারজনের সবাই ছমাস সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছি। তাদের মধ্যে একটি ছেলে রাংচোয়াঙ্গার কথা শুনে প্রতে্যুত্তরে বলল।

— মাত্র ছমাস?

— হ্যাঁ, ছমাস।

— বা তাহলেতো বেশ মজা। তোমাদের একটা হিল্লে হয়ে গেছে। ছমাস পরেই আবার নিজ নিজ জায়গায় চলে যেতে পারবে।

রাংচোয়াঙ্গার কাছ থেকে এধরণের আলাপ শুনে ছেলেগুলি নিজেদের মধ্যে একটু চাওয়া চাওয়ি করল। চাওয়া চাওয়িটা একটু অর্থপূর্ণ। প্রত্যেকেই কথাটা শুনে যেন আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। মুচকি হাসি সবারই ঠুটে লেগে আছে। রাংচোয়াঙ্গা তাদের এরকম অর্থপূর্ণ চাওয়া চাওয়ি এবং মুখে মুচকি হাসির রেখা দেখে অপ্রস্তুত হল। সে মনে মনে ভাবল যে ছেলেগুলি ওকে বেওকুফ ভাবছে না কি? যাহোক নিজেকে সামলে নিয়ে ওদেরকে বলল,

— তোমরা আমার কথা শুনে হাসছ কেন?

তখন ছেলেদের মধ্যে একটি আগ বেড়ে রাংচোয়াঙ্গার কাছ ঘেসেই বলল

— আপনার কথা শুনে আমরা না হেসে পারছি না। কারণ আপনি ব্যাপারটাকে যত সহজে নিয়েছেন আসলে কিন্তু তা নয়। ব্যাপারটা অন্য ধরণের।

— ব্যাপারটা কি রকম?

— ব্যাপারটা হচ্ছে আমরা এখন যে ছমাস জেলে খাটছি আসলে এটাই শেষ নয়। একথা বলেই ছেলেটি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর সে বিস্তারিত ভাবে ঘটনাটা বলতে লাগল। সে বলল

— জানেন, আমরা চারজনকে দুবছর আগে বাড়ী থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসে। এনে জেলের মধ্যেই বিচারাধীন বন্দী হিসাবে রেখে দেয়। আমরা ভাবছিলাম যে ওরা যখন আমাদেরকে গ্রেপ্তার করে বিচারাধীন বন্দী হিসাবে জেলে রেখেছে নিশ্চয়ই আদালতে বিচার করে যাহোক একটা কিছু করবে। কিন্তু দিন এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে এটাই ধারণা হল ওরা এমনি ভাবে যতদিন পারে জেলে আটকে রাখবে। আদালতে বিচার শুরু করার কোন নাম গন্ধই নেই। তাই আমরা চারজন চুপি চুপি ঠিক করলাম যে এমনি ভাবে জেলে আটক থাকব কেন? বরং জেল থেকে পালিয়ে যাই। যেমনি ভাবা ঠিক তেমনি কাজ। রাত্রিবেলা ওয়ার্ডের একটা জায়গা ভেঙ্গে জেলের দেওয়াল টপকে পালিয়ে গেলাম। কিন্তু কর্তৃপক্ষের চেলা চামুণ্ডারা আমরা পালিয়ে যাওয়ার পর মুহুর্তেই টের পেয়ে যায়। অল্পক্ষণের মধ্যেই পাকড়াও পাকড়াও রব ওরা চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়। ওরা সবদিকে প্রচার চালিয়ে দেয় যে চারটি মিজো জেল থেকে পালিয়েছে যে ভাবেই হোক ওদেরকে ধর। আমরা বেশীদূর এগোতে পারিনি। শহর থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার প্রতিটি রাস্তায় ওরা পাহাড়া বসিয়ে দেয়। আমরা শেষ পর্যন্ত নিদারুণ অসহায় অবস্থায় ওদের হাতে ধরা পড়ে যাই। ধরা পড়ার পর ওরা আমাদেরকে যে ভাবে পেঁদিয়েছে সেটা আর বলার নয়। তারপরই জেল থেকে পালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত করে মহামান্য আদালতে চালান দেয় বিচারের জন্য। সেই মহামান্য আদালত জেল পালানোর দোষে দোষী সাব্যস্ত করে আমাদেরকে ছমাস সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে এবং কর্তৃপক্ষ ও তাদের নিরাপত্তার জন্য আমাদেরকে এখানে পাঠিয়ে দেয়। আমাদেরকে প্রথমে যে অভিযোগে বন্দী করে আনে সেটার কোন চার্জশীটই দিতে পারেনি। আদৌ দিতে পারবে কি না সন্দেহ।

ছেলেটি এক নাগাড়ে এসমস্ত বলে চলছিল। তারপর মুখে হাসির রেখা টেনে রাংচোয়াঙ্গাকে বলল,

— দেখুন আমাদের এমতাবস্তায় যদি আপনি বলেন যে আমরা ছমাস পরে নিজ নিজ জায়গাতে চলে যেতে পারব তাহলে কি না হেসে পারি?

ছেলেটির প্রশ্ন রাংচোয়াঙ্গাকে যেন খানিকটা বেওকুফ বানিয়ে দিল। সে এটার প্রতে্যুত্তরে কি বলবে চট্ করে ঠিক করতে পারেনি। তাই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে নিজেকে সামলে নিল। সে বলল,

— যাহোক ভাই, এখন দেখছি তোমাদের ব্যাপারটা খুব মজার। আমিও এখন তোমাদের ব্যাপার শুনে না হেসে পারছি না। জেলের ভিতর তোমরা তোমাদের পজিশন নিয়ে গর্ববোধ করতে পার। তোমরা একাধারে বিচারধীন বন্দী আবার কয়েদীও। তাই তোমাদের পজিশন আমাদের চেয়ে অনেক ভালো।

— হ্যাঁ, আমাদের পজিশন ভালই। আমাদেরকে কর্তৃপক্ষ এখানে দ্বৈত ভূমিকায় রেখেছে। আপনিও পারেন ইচ্ছা করলে আমাদের অবস্থায় আসতে।

— না বাবা থাক। দ্বৈতভূমিকায় আমার দরকার নেই। ময়দানে লড়াই করতে সাহসের অভাব হয় না। কিন্তু জেলের ভিতর পেদানির কথা ভাবলেই আমার শরীর শিরশির করে।

রাংচোয়াঙ্গা কথাগুলি বলে নিজে হাসল। হাসতে হাসতে সে ভাবল ওদের সাথে আলাপ করছে ঠিকই কিন্তু ওদের নাম ধাম কিছুই জানা হল না। সে কথার মোড় ঘুরিয়ে বলল,

– আচ্ছা, তোমাদের সাথে আলাপ হচ্ছে ঠিকই কিন্তু তোমাদের নামকি? রাংচোয়াঙ্গার মুখ থেকে প্রশ্ন বের হতেই ছেলেটি যেন প্রায় লুফে নিল। সে বলল,

— হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিকই এতসময় ধরে আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন অথচ আমাদের নাম ধাম জানেন না সেটা কেমন কথা? তাহলে আমি বলছি আপনি শুনুন। আমি হলাম মানলিয়ানা। ও হচ্ছে বেলেনডেনা, ও হচ্ছে লালরেনহুন আর ও হচ্ছে লিনদোয়ানা।

সবাইকে দেখিয়ে মানলিয়ানা এক এক করে পরিচয় করিয়ে দিল। তারপর সে আরও বলে চলল। সে বলল,

— জানেন, আমি আর বেলেনডেনা ইঞ্জিনীয়ারীং কলেজে পড়তাম। সেখান থেকে ছুটিতে বাড়ী আসার কিছুদিন পর একদিন সেপাই বাবুরা বাড়ী থেকে তুলে নিয়ে আসে। লালরেনহুন এবং লিনদোয়ানাকেও আমাদের সাথেই আইজল থেকে চালান দেয়। অবশ্য ওদের বাড়ী আমাদের চেয়ে অনেক দূরে। লালরেনহুন এবং লিনদোয়ানা দুজনেই কলেজে পড়ত।

রাংচোয়াঙ্গা মানলিয়ানার কাছ থেকে ওদের নাম জানতে পারল। সে ভাবল, নাম বলতে মানলিয়ানা তার পড়াশুনার কথাও বলল তাহলে ওকে একটু ক্ষেপানো যাক। সে বলল,

— ঈস্ দেখতো তোমাদের Prospective life টা কেমন নষ্ট করে দিয়েছে।

— Prospective life নষ্ট করে দিয়েছে?

— তা নয়ত কি? ইঞ্জিনীয়ারীং পড়তে, পাশ করে নিশ্চয়ই বড় একটা কেউ কেটা হতে। তা না হয়ে এখন জেলের কয়েদীর পোষাক পড়ে জল টানছ।

— আপনি কি আমাদের সাথে Joke করছেন?

— কেন?

— তা নাহলে আপনি এধরনের কথাবার্তা বলেছেন কেন? আমাদের সামগ্রিক ভাবে যদি বর্তমান অবস্থায় কোন Prospect থাকত তাহলে আজ জাতি হিসাবে আমাদের fellow beings রা ময়দানে সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে কেন? আজ পুরাপুরি স্বাধীন হওয়ার একাগ্র বাসনা নিয়ে মিজোদের সশস্ত্র অভিযানের ফলে যারা আজ শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক ধৃত হয়ে জেলে জীবন কাটাচ্ছে তাদের জীবনটা কি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে? না না, আপনি এভাবে বলবেন না। আমাদের জীবনকে ওরা নষ্ট করতে পারে না বরং উল্টোদিকে প্রকৃত অর্থে আমরা সবাই মিজোদের সামগ্রিক উন্নতির জন্যই আজ জেলজীবন কাটাচ্ছি। জানেন, আমার মনে হয় আমাদের গর্ববোধ করা উচিত। আজকে আমরা জেল খাটছি প্রকৃত স্বাধীন মিজোরামের জন্য। যদিও সশস্ত্রভাবে ময়দানে লড়াই করছি না তবুও আমাদের এই দুঃখ কষ্ট আগামী দিনের সুখ সমৃদ্ধির সহায়ক হবে।

রাংচোয়াঙ্গা নিছক রসিকতার জন্যই মানলিয়ানাকে বলছিল। সে যে এমন ভাবে গুরুত্ব দেবে খেয়াল করেনি। মানলিয়ানার কথাগুলি ওর হৃদয়ে স্পর্শ করল। সে প্রতে্যুত্তরে কথা বেশী না বাড়িয়ে শুধু বলল,

— তুমি যা বলছ সেটার বিরুদ্ধে আমার কিছুই বলার নাই। তবে একটু বলছি যে তুমি যা বলেছ সেটা ঠিকই।

রাংচোয়াঙ্গা এবং মানলিয়ানাদের মধ্যে এধরনের আলাপ আলোচনার অবসরে সময় অতিবাহিত হচ্ছিল। এখন নিজের ওয়ার্ডে চলে যাওয়াই ভাল। একথা ভেবেই রাংচোয়াঙ্গা তাদেরকে বলল,

— যাক ভাই তোমাদের সাথে অনেকক্ষণ আলাপ করলাম। এবার নিজের ওয়ার্ডে চলে যাই। তোমরা তোমাদের কাজ কর। জেলবাবুদের শ্যেনদৃষ্টি পড়লে কি হয় বলা মুসকিল। এবলেই রাংচোয়াঙ্গা তাদেরকে কুয়ার পাশে রেখেই নিজের ওয়ার্ডের দিকে চলল।

সূর্য ডুবে যাওয়ার সথে সাথেই ফাইল শেষ করে সমস্ত বন্দীদেরকে যার যার সেলে এবং ওয়ার্ডে ঢুকিয়ে ওয়ার্ডাররা দরজা বন্ধ করে দিল। রাংচোয়াঙ্গা তার নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে বসল। এবার এখানে এসে রাংচোয়াঙ্গা লক্ষ করল যে, প্রত্যেকদিনই ওয়ার্ডের দরজা বন্ধ করে দেওয়ার পর যখন অন্ধকার ঘনিয়ে আসে তখন মিজো বন্দীরা সমবেত ভাবে প্রার্থনা শুরু করে। বিভিন্ন পুঞ্জী থেকে যে সমস্ত বুড়ো পাস্তরদেরকে ধরে এনেছেন তাদের মধ্যেই এক একজন করে প্রতিদিন প্রার্থনা সভা পরিচলনা করে।

প্রার্থনা সভার গান রাংচোয়াঙ্গার ভাল লাগে না। তাই সে যখন সভা চলতে থাকে তখন নিজে নিজে ভাবে। প্রত্যক্ষভাবে সে প্রার্থনা সভার বিরোধিতা ও করতে পারে না। কারণ দীর্ঘদিন “যীশু সত্য হরির" মহিমা কীর্তন যে ভাবে মিজো পাহাড়ের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে দিয়ে মিজোদেরকে খৃষ্টধর্মের বশে এনেছিলেন সেটা থেকে মুক্ত করতে এমনিতে চট করে পারা যাবে না। আজ থেকে একশ বছরেরও পূর্বে মিজো জেলার সীমান্ত অঞ্চল কাছাড়ে ক্রমাগত মিজোদের ঝটিকা আক্রমণ চলতে থাকলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের আমলা বাহিনী ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। বিভিন্ন ভাবে কাঠখড় পুড়িয়ে, সামরিক বাহিনী নিয়ে মিজো পাহাড়ে ঢুকে সেখানে প্রশাসনিক ব্যবস্থা কায়েম করতে Political Officer নিয়োগ করা হয়। কিন্তু দুর্ধর্ষ মিজো লালরা তাদের অনুগামীদেরকে নিয়ে ক্রমাগত ভাবে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীদের সাথে লড়তে থাকে। ঝটিকা আক্রমণে অনেক সামরিক অফিসারকেই নিহত করে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রশাসন ব্যবস্থা তখন বুঝতে পারে এমনিভাবে শুধু বলপ্রয়োগ করেই দুর্ধর্ষ এবং যুদ্ধপ্রিয় মিজো পাহাড়ের অধিবাসীদেরকে বশে আনা যাবে না। ওদের উপর যতই শক্তি প্রয়োগ করে দমনে আনার চেষ্টা হবে ততই ওরা ক্ষেপে গিয়ে সেটার মোকাবিলা করতে লড়াকু হবে। এসমস্ত ভেবেই তখন সাম্রাজ্যবাদের আমলারা ঠিক করে যে ওদেরকে বশে আনতে গেলে “যীশু সত্য হরির” দলের আশু প্রয়োজন। অর্থাৎ খৃষ্টান মিশনারীদেরকে মিজো পাহাড়ে ঢুকিয়ে যীশুর অপার মহিমা কীর্তন করে ওদের যুদ্ধপ্রিয় দুর্ধর্ষ মনোভাবকে ভোতা করে ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করতে হবে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ মিজো জেলাকে বহিভূর্ত অঞ্চল (excluded area) ঘোষণা করে সেখানে খৃষ্টান মিশনারী ছাড়া অন্য কেহকে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করা নিষেধ করে দেয়। প্রশাসনিক আমলাদের আনুগত্যেই যীশু সত্য হরির দল" অর্থ্যাৎ খৃষ্টান মিশনারী দলে দলে মিজো জেলাতে ঢুকে যায়। মিজোদেরকে খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত করে ওদেরকে পথে আনার অদম্য উৎসাহ এবং উদ্দীপনা নিয়ে কাজে লেগে যায়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ যেখানে গিয়ে শাসন ব্যবস্থা পত্তন করেছে সেখানেই যীশু সত্য হরির দল" দেবদূতের মতই সেখানকার অধিবাসীদের সামনে হাজির হয়েছে। লোকদেরকে খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত করেছে। এমন কোন জায়গা নেই যেখানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ঢুকেছে অথচ তার দোসর খৃষ্টান মিশনারী নেই। এমন জায়গা খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে। আর মিজো জেলাতে প্রশাসনিক আমলাদের চেয়ে খৃষ্টান মিশনারীদেরই প্রয়োজনীয়তা বেশী ভাবে দেখা দেয়। কারণ মিজো পাহাড়ের অধিবাসীরা যুদ্ধ দেখলেই ওদের যুদ্ধং দেহি ভাবটা আরো তেতে উঠে। কাজেই ওদের মধ্য যীশুর মহিমা ছড়িয়ে দিয়ে খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত করাটাই হচ্ছে আসলে ওদেরকে দমিয়ে নিজেদের আওতায় আনার প্রকৃষ্ট পথ। খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত করে বশে আনার মহান দায়িত্ব নিয়েই দূরদেশ পাড়ি দিয়ে মিজো পাহাড়ের গভীর অরণ্য অঞ্চলে খৃষ্টান মিশনারীরা ঢুকে যায়। অত্যন্ত কষ্টসহিষ্ণু হয়ে দিনের পর দিন কাটিয়ে মিজোদের আচার আচরণ এবং ভাষা রপ্ত করে ওদের সাথে একাত্ম হওয়ার চেষ্টা করে। মিজোদের আক্রমণে অনেক মিশনারীরাই নিহত হন। কিন্তু মিজোদের এধরণের আক্রমণে খৃষ্টান মিশনারীরা দমে নাই। তারা বরং নূতন উদ্যমে কি ভাবে এই দুর্ধর্ষ অধিবাসীদের সাথে মিশে ওদেরকে বশে আনা যায় সেটার জন্য বিভিন্ন পন্থা বের করার জন্য মরীয়া হয়ে উঠে। নিজেদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে মৃত্যুভয়কে উপেক্ষা করে মিশনারীরা মিজোদের সাথে মিশে। তাদের খাওয়া, চলাফেরা ইত্যাদি সমস্ত কিছুকেই নিজেরা রপ্ত করে। মিজোদের জীবন যাপনের সমস্ত পদ্ধতিকেই নিজেরা গ্রহণ করে। তারপর ধীরে ধীরে নিজেদের আসল মন্ত্রদ্বারা ওদেরকে ঘিরে ফেলতে থাকে। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই মিশনারীরা মিজো পাহাড়ের প্রায় সমস্ত এলাকায় খৃষ্টান ধর্মের মহিমা ছড়িয়ে দেয়। বেশীর ভাগ অধিবাসীরাই ধীরে ধীরে নিজেদেরকে খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত করে নেয়। মিজোদেরকে বশে আনতে গিয়ে বাঘা সামরিক অফিসাররা যে রকম ভাবে ব্যতিব্যস্ত এবং বিভ্রত হয়েছে সে তুলনায় মিশনারীদের কিছুই হয়নি। প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিরা বশে আনতে গিয়ে ওদেরকে দিয়েছিল ক্ষেপিয়ে। আর খৃষ্টান মিশনারীরা ওদেরকে বশে আনতে গিয়ে ঠিক ঠিকই আপন করে ফেলছিল যদিও প্রথম প্রথম অনেক মিশনারীরাই ওদের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে নিহত হয়েছিল।

মিশনারীরা ব্যাপক হারে একাত্ম হয়ে সেখানে বিদ্যালয় স্থাপন করে, পড়াশুনার প্রচলন করে। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই অধিবাসীরা নিজেদেরকে শিক্ষিত করে তুলে। পূর্বাঞ্চলের সমতল অঞ্চলের অধিবাসীদের শিক্ষিতের হার ডিঙ্গিয়ে অনেক উপরে চলে যায়। শুধু পূর্বাঞ্চলের অধিবাসী কেন- একমাত্র কেরলের কোন অংশ ছাড়া ওদের যে শিক্ষিতের হার সেটা ডিঙ্গিয়ে ভারতবর্ষের অন্য কোন অঞ্চলের অধিবাসীরাই যেতে পারেনি। মিজো পাহাড়ে যখন বিদ্রোহ শুরু হয় তার পূর্বেই সেখানে শিক্ষিতের হার ছিল শতকরা ৪৪ জন।

মিশনারীদের চেষ্টায় শিক্ষার প্রচলন এবং অন্যান্য পরিবর্তন ঘটলে ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শাসনব্যবস্থার ফলে স্বাভাবিক ভাবেই মিজো জেলাতেও “প্রিভিলেজড্ ক্লাসের” সৃষ্টি হয়। তাদের মধ্য থেকে বাছাই করে সরকারী চাকুরীতে নিয়োগ করা হয়। এমন কি ব্রিটিশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পরও অনেক মিজো আই, এ, এস অফিসার আছেন। তারা সরকারের দক্ষ অফিসার হিসাবেই কাজ করে যাচ্ছেন। তুলনামুলক ভাবে বিচার করলে সমতল অধিবাসীদের চেয়ে মিজো আই,এ,এস অফিসাররাই বেশী। শিক্ষার প্রচলন করে মিজোদেরকে শিক্ষিত করে প্রিভিলেজড্ ক্লাসের লোকদেরকে বিভিন্ন সরকারী চাকুরীতে নিয়োগ করা ছাড়াও ব্যাপক হারে মিজোদের চরিত্রে যে যুদ্ধপ্রিয় মনোভাব সুপ্ত আছে সেটার প্রতি খেয়াল রেখেই ধীরে ধীরে ব্রিটিশ সরকার মিজোদের বিরাট অংশকে সেনাবাহিনীতে ঢুকিয়ে দেয়। ক্রমে ক্রমে যুদ্ধপ্রিয় মিজোরা পুরাপুরি ভাবেই যথাযোগ্য সৈনিক সেজে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সেবা করে।

খৃষ্টান মিশনারীরা মিজোদেরকে এমন ভাবে মগজ ধোলাই করে যে, পরবর্তী সময়ে মিজোরা খৃষ্টধর্ম ছাড়া আর কিছুই সহ্য করতে পারেনি। অত্যন্ত নগণ্য সংখ্যক রিয়াং, চাকমা এবং পাওয়াই উপজাতির লোক ছাড়া সবাই খৃষ্টধর্মকে পুরাপুরি ভাবে গ্রহণ করে ফেলেছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, খৃষ্টধর্ম ছাড়া অন্য কোন ধর্মাবলম্বী লোক সেখানে ধর্ম প্রচার করতে গেলেই মিজোদের দ্বারা আক্রান্ত হত। ১৯৬৬ সালের কিছু পূর্বে রামকৃষ্ণ মিশনের তরফ থেকে একবার মিজো পাহাড়ে প্রচেষ্টা চালায় সেখানে রামকৃষ্ণ পরমহংসের তত্ত্ব প্রচার এবং প্রসারের জন্য। কিন্তু খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী মিজো খৃষ্টানরা সেটা সহ্য করতে পারেনি। তারা সুযোগ দেয়নি যাতে রামকৃষ্ণ মিশনের প্রবক্তারা মিজো পাহাড়ে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের তত্ত্বকথা প্রচার এবং প্রসার করেতে পারে। তাছাড়া মিজো জেলাতে যেসমস্ত মিশনারীরা নিজেদের জীবনকে তুচ্ছ করে মিজোদেরকে বশে আনতে গিয়ে আক্রান্ত এবং নিহত হয়েছিল তাদের স্মৃতিস্তম্ভের পাশে এখন বড়দিনে মিজোরা দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করে তাদের পূর্বপুরুষদের ক্ষমার জন্য। মিজো পাহাড়ের বিভিন্ন অঞ্চলে বা তার আশে পাশে আক্রান্ত এবং নিহত মিশনারীদের স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে। বড়দিনে সেখানে জমায়তে হয়ে সুর ধরে মিজোরা প্রার্থনা করে। ওরা বলে যে, হে মহানুভব আমাদের পূর্বপুরুষেরা জানত না যে তোমরা কত মহৎ এবং সং ছিলে। তোমরা আমাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে এগিয়ে নেওয়ার জন্যই এসেছিলে। আমাদের পূর্বপুরুষেরা অজ্ঞ ছিল বলেই তোমাদেরকে হত্যা করেছে। আমরা তাদের অপরাধের জন্য তোমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। অবশ্যই তোমরা ক্ষমা করবে।

রাংচোয়াঙ্গা তার বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে এ সমস্তই ভাবছিল। ইতিমধ্যে জেলে বিচারাধীন মিজো বন্দীদের প্রার্থনা শেষ হয়ে গেছে। সময়ের সাথে তাল রেখে রেখে জেলের ঘণ্টিটাও কয়েকবার বেজেছে। এখন ধীরে ধীরে রাতের গভীরতা যতই বাড়ছে জেলটাও নিস্তব্ধ হয়ে আসছে। কেবল মাঝে মাঝে বিভিন্ন ওয়ার্ডের ভিতরে প্রহরারত কয়েদীর চীৎকার ভেসে আসছে। রাংচোয়াঙ্গার ঘুম তখন আসেনি। সে ভাবছে যে, খৃষ্টধর্মের প্রভাব যা মিজো জেলার ব্যাপক জনগণের মধ্যে বংশানুক্রমিক ভাবে পড়ছে এবং যে সংস্কার গড়ে উঠেছে সেটা থেকে মিজোদের চট করে সরিয়ে আনা কখনই সম্ভব হবে না। আজকে যারা জেলে আবদ্ধ আছে তারা এমনিভাবে যীশু প্রভুকে উদ্দেশ্য করে প্রার্থনা চালিয়ে যাবে। সেটাতে বাধা দিতে গেলেই উল্টো ফল হবে। তবে আজকে যারা সশস্ত্রভাবে ময়দানে লড়াই করছে তাদের কথা অন্যরকম। খৃষ্ট ধর্মের সংস্কার ওদের মজ্জায় থাকলেও আজ লড়াইয়ের অবসরে কতটুকু বা সময় পায় যীশুকে স্মরণ করতে। লড়াইয়ের চিন্তাই ওদের মনে এমন ভাবে আঁকড়ে থাকে যে যীশুর চিন্তা আর চাড়া দিয়ে উঠতে পারে না। রাংচোয়াঙ্গা এমনি ভাবে চিন্তা করতে করতে কখন ঘুমিয়ে পড়ল সে টেরই পায়নি।