সকাল বেলার খাবার খেয়ে রাংচোয়াঙ্গা একটা বিড়ি ধরিয়ে নিজের ওয়ার্ড থেকে অন্য ওয়ার্ডে যাওয়ার সময় অনেকদিন আগে এ জেলেই দেখা পরিচিত একজনকে দেখে দাঁড়ালো। কয়েক বৎসরে চেহারার পরিবর্তন হলেও চিনতে অসুবিধা হয়নি। তাকে লক্ষ্য করে বলল,

— আরে থাংলুরা না?

— হ্যাঁ, আমি থাংলুরাই।

— তোমার ত বেশ পরিবর্তন হয়েছে। — একটু মোটা হয়ে গেছি। তাই তোমার চিনতে অসুবিধা হচ্ছে।

— অসুবিধা হচ্ছে না। অসুবিধা হলে ত তোমাকে থাংলুরা বলে ডাকতে পারতাম না। তোমাকে দেখে অন্য কেহ ভেবে পাশ কেটে চলে যেতাম। সে যাহোক। তোমাকে যে আজকাল জেলের ভিতরে ঘুর ঘুর করতে দেখি না। কি ব্যাপার?

— আমাকে দেখবে কি করে। আমি কি এতদিন এখানে ছিলাম যে দেখবে?

— তাহলে এতদিন তুমি কোথায় ছিলে?

— তুমি, জায়রেমা এবং অন্যান্যদেরকে এখান থেকে পাচার করার কিছুদিন পর আমাকেও অন্যান্যদের সাথে এখান থেকে পাচার করে। প্রথমে এখান থেকে নওগা। নওগা থেকে তেজপুর এবং তেজপুর থেকে এখানে এনেছে। গতরাতে এসে পৌঁছেছি। তা তুমি কেমন আছ?

— আছি এক রকম। অনেক জেলের জল খাইয়ে আমাকেও দশবারো দিন হল এখানে এনেছে।

— আমাদেরকে নিয়ে যে বেটারা কি করবে সেটা কিছুই টের পাচ্ছি না।

— হ্যাঁ, আমাদেরকেত আটকে রেখেছেই, তাছাড়া নিত্য নূতন বিদ্রোহী মিজোদেরকেও বন্দী করে জেলে ঢুকিয়ে দিচ্ছে।

নিত্য নূতন মিজোদেরকে বন্দী করে জেলে ঢুকিয়ে দিচ্ছে কথাটা রাংচোয়াঙ্গার মুখ থেকে শুনার পর থাংলুরা মনে মনে ভাবতে লাগল। সে ভাবল এখন জেলে যে সমস্ত মিজো বন্দীদেরকে সে চিনতে পারছে না তারা তাহলে নূতন বন্দী। আগে এখান থেকে পাচার হওয়ার সময় যে সমস্ত মিজো বন্দীদেরকে দেখেছিল তাদের অনেকেই এখন এখানে নেই। এগুলি ভাবতে ভাবতেই থাংলুরা রাংচোয়াঙ্গাকে বলল,

— এখানে যাদেরকে চিনতে পারছি না তারা সবাই কি নূতন মিজো বন্দী?

— সবগুলি নূতন বন্দী না হলেও বেশীর ভাগই নূতন। পুরাতনদেরকে অন্যত্র চালান দেওয়া হয়েছিল। অবশ্য পুরাতনদের মধ্যে কেহ কেহকে এখানে আবার আনানো হয়েছে। তাদেরকে তুমি চিন।

— তা মোটামোটি চিনি। কিন্তু আমি বলছি ওরা কি কেবল মিজোদেরকে সমানে বন্দী করে আনছে? পুরাতন বন্দীদেরকে কি ছাড়ছে না?

— নূতন ভাবে বন্দী করে যে আনছে সেটাতো দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু পুরাতন বন্দী কাউকে ছেড়েছে বলে আমি জানি না। তবে কয়েকজনকে জেল কর্তৃপক্ষ চারিদেওয়ালের ভিতর আটকে রাখতে পারে নি। তারা চলে গেছে।

পুরাতন বন্দীদের মধ্যে কেহকে ছেড়েছে বলে রাংচোয়াঙ্গা জানেনি বলল। আবার বলছে যে কয়েকজন চলে গেছে। একথাগুলি ঠিক কি অর্থ প্রকাশ করছে থাংলুরা বুঝতে পারেনি। তার যেমন কি রকম একটা খটকা লাগল। সে রাংচোয়াঙ্গাকে বলল,

— আরে তুমি একবার বলছ যে পুরাতন কেহকে ছাড়েনি। আবার বলছ যে কয়েকজন চলে গেছে, সেটা কেমন কথা?

— চলে গেছে মানে ওদের শরীরিক অস্থিত্ব আর জেলের মধ্যে নেই। দীর্ঘদিন ধরে জেলের মধ্যে তিলেতিলে যে অত্যাচার চলে আসছিল সেটা ওরা মোকাবিলা করতে পারেনি। নিপীড়ন এবং অত্যাচার ওদেরকে ধীরে ধীরে মৃতে্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছিল। এক এক করে কয়েকজন মিজো বন্দীই জেলের অভ্যন্তরে মারা গেছে। জীবিত অবস্থায় ওদেরকে না ছাড়লেও মৃত্যুর পরোয়ানা জেল কর্তৃপক্ষ থেকে ওদেরকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। তাই বলছি পুরাতন বন্দীদের মধ্যে কেহকে না ছাড়লেও কয়েকজনকে কর্তৃপক্ষ চার দেওয়ালের ভিতর আটকে রাখতে পারেনি।

রাংচোয়াঙ্গার নিকট থেকে এসমস্ত শুনে থাংলুরা কি বলবে সে ঠিক করতে পারল না। সে অন্যমনস্ক হয়ে গেল। তার চোখের সামনে তখন ধীরে ধীরে কয়েকটি প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠতে লাগল। দীর্ঘ চার বৎসর পূর্বে থাংলুরা এখানে যে কয়েকজন বৃদ্ধ মিজোকে দেখছিল তাদের চেহারাই এক এক করে চোখের সামনে ভেসে উঠল। বংকন, জেমবক, চেতলাং এবং পাংগজুয়াল প্রভৃতি এলাকা থেকে যে সব বৃদ্ধ মিজোদেরকে তাদের ছোট ছোট ছেলে মেয়ে এবং অত্মীয় পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন করে বন্দী করে জেলে এনে রেখেছিল, সে সমস্ত বৃদ্ধ মিজোরা বেশী কথা না বললেও মুখ দিয়ে তাদের যে অভিব্যক্তি প্রকাশ পেত সেটা থেকে মনে হত ওরা যেন প্রতিমূহর্তেই ভাবত, কেন ওদেরকে এমন করে অন্যায় ভাবে ছেলে মেয়ে এবং আত্মীয় পরিজনদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে জেলে আটকে রেখেছে? ওরা মনে মনে ভাবত কেন এমনিভাবে ওদের উপর জুলুম চালানো হচ্ছে, ওরাতো কোন দোষ করেনি। স্মরণকালের ঘটনাগুলিকে তলিয়ে ভালভাবে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে, বিচার করে, কিন্তু না কোথাও এমন কোন নজির খুঁজে পায়নি যে কারণে ওদেরকে এমনি ভাবে জেলে অত্যাচার সইতে হবে। নিজেরা কোন অন্যায় করেনি অথচ জেলের মধ্যে অত্যাচার সহ্য করতে হচ্ছে সেটা ভেবে ভেবে যখন কুল কিনারা পেত না তখন মাঝে মাঝে অজান্তেই ওদের দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসত। কোন কোন সময় ওদের অসহায় করুন চাউনি দেখে মনে হত ওরা বোধ হয় ওদের ফেলে আসা ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের কথা ভাবছে। ওদের অমঙ্গল আশঙ্কায় ভুগছে। নিজেকে নিজেই চিন্তা ভাবনার মধ্যে ঘুরপাক খাইয়ে আত্মীয় পরিজনদের অমঙ্গল আশঙ্কায় কষ্ট পেত। অথচ ওদের কিছুই করার নেই। এসমস্ত ভাবনার ফলেই হয়তবা সব সময়ই একটা মনমরা অসহায় ভাব ওদের চোখে মুখে ফুটে উঠত।

এখন অবশ্য বংকন পাংগজুয়াল প্রভৃতি অঞ্চল থেকে বন্দী হিসাবে ধরে আনা বৃদ্ধ মিজোদের আর সেই করুন চাউনি নেই। তাদের উপর যে দমন পীড়ন চালানো হয়েছিল সেটা সহ্য করতে না পেরে মানসিক এবং শারীরিক ভারসাম্য হারিয়েই ওরা দিনে দিনে মৃত্যুর করাল গ্রাসে নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলছে। কিন্তু তাদের ছেলেমেয়ে আত্মীয় পরিজনদের অবস্থা? তারা কি করছে? তারা কি ভাবছে? কোন স্ত্রী হয়ত প্রথম প্রথম ভাবছিল যে তার স্বামীকে ধরে জেলে আটকে রেখেছে ঠিকই তবে ক’দিন পর নিশ্চয়ই মুক্ত করে দেবে। তার স্বামী মুক্ত হবেই। এ ধারণা নিয়ে শিশুপুত্রকে অবলম্বন করে দিন যাপন করছিল। সে স্বামীর জন্য প্রতীক্ষা করছিল। কিন্তু দিন গেল মাস গেল, শেষ অবধি অনেক বছর কেটে গেল, তবুও স্বামী মুক্ত হয়ে ফিরল না। প্রতিনিয়তই তার মনে একটা প্রশ্ন জেগেছিল তার স্বামী এমন কি অপরাধ করেছিল যার জন্য ওকে এমনি ভাবে আপনজনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে জেলে আটকে রেখেছে? এসমস্ত ভেবেও সে হয়ত তার ক্ষীণ আশা টুকু ত্যাগ করতে পারেনি যে তার স্বামী একদিন অবশ্যই ফিরবে। কিন্তু তার ক্ষীণ আশাটুকু চুর্ণ হয়ে যায় যখন খবর পৌঁছে যে তার স্বামী জেলের মধ্যেই মারা গেছে। তখন সে মুহুর্তে এখবরটা নিশ্চয়ই ওর কাছে মর্মান্তিক ও নিষ্ঠুর হয়েছিল। সে আঘাত পেয়েছিল। সাময়িক ভাবে বেসামাল হলেও বাস্তব জীবনের স্বাভাবিক নিয়মানুসারেই পরে কি ওর মনে প্রতিনিয়তই এ প্রশ্ন জাগেনি যে, কেন তার স্বামী সেখানেই মারা যায়? তার স্বামীর অপরাধ কি ছিল? তার স্বামীতো অপরাধ করেনি।

এ সমস্ত ভেবে ভেবেই হয়ত বা কোন বৃদ্ধা স্ত্রী আজকে PPV এর কোন নির্জন প্রকোষ্ঠে বসে কেবল দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে জীবনটা কাটিয়ে দেবে। তার বেশী সে কিছুই করতে পারবে না। কিন্তু তার ছেলে মেয়ে কি করবে? ওরা ও কি বৃদ্ধার মত PPV এর কোন নির্জন প্রকোষ্ঠে বসে বসে তাদের পিতার দুঃখে দুঃখিত হয়ে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলবে? নিশ্চয়ই না। শিশু অবস্থায় যখন তাদের পিতাকে জোর করে মা এবং তাদের কাছ থেকে বিছিন্ন করে জেলে পুড়ে দিয়েছে তখন হয়তবা তারা কিছুই বুঝতে পারেনি। কিন্তু তাদের বয়স এবং বুদ্ধি বিবেচনা বাড়ার সাথে সাথে কি এ প্রশ্ন মনে জাগবে না যে, তাদের পিতাকে তাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে কোথায় নিয়ে রেখেছিল? কেন তাদের পিতা জেলের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে দমন পীড়নের বলি হয়ে শেষে মৃত্যু মুখে পতিত হয়েছে? এ সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিযেই হয়তবা তারা বুঝবে তাদের পিতার একমাত্র অপরাধ ছিল সে মিজো। মিজোরা তাবেদার হয়ে না থেকে পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য জীবন পণ করে লড়াইয়ে নেমেছিল। তাদের এলড়াই অর্থাৎ মুক্তি সংগ্রামকে শাসকগোষ্ঠী অপরাধ বলে ধরে নিয়েছিল। সে অপরাধেই অপরাধী করে তাদের পিতাকে জেলে আটকে রেখে নির্মমভাবে তিলে তিলে মৃতে্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল। এসমস্ত ভেবে কি ওরা ওদের দুর্ধর্ষ ও যুদ্ধপ্রিয় পূর্ব পুরুষের জাতীয় বৈশিষ্ট বহন করে আগামীদিনে এগিয়ে যাবে না? নিশ্চয়ই ওরা এগিয়ে যাবে। ওরা বাস্তবানুগ হবে। জেলের অভ্যন্তরে মৃত মিজো বিচারাধীন বন্দীদের কথা কেন্দ্র করেই থাংলুরা এসমস্ত মনে মনে ভাবছিল।

রাংচোয়াঙ্গা দেখল থাংলুরাকে বিচারাধীন বন্দীদের মরে যাওয়ার খবরটা দেওয়ার পর সে চুপ করে কেবল ভাবতে থাকে। তাই সে থাংলুরাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

— কিহে তুমি যে একেবারে চুপ হয়ে গেলে?

— না, ভাবছি। থাংলুরা তার ভাবনাতে ছেদ টেনে বলল।

— কি ভাবছ?

— ভাবছি যে, মিজো বিচারাধীন বন্দীদের এধরণের মৃতে্যুতে তাদের আত্মীয় পরিজনদের কি রকম অবস্থা হয়েছে। তাদের উত্তরসুরীরা এঘটনাগুলিকে কেন্দ্র করে কি করবে ইত্যাদি।

– তুমি আমি যে দৃষ্টিকোণ থেকে জিনিষটা বিচার করে ভাবব ওরা ও তেমনই ভাববে। সে রকম ভেবেই ওরা কিছু করবে। এখানে জেলের মধ্যে আবদ্ধ থেকে আমাদের মত ভাবনাতেই নিজেদেরকে আটকে রাখবে না। ওরা ভাবনাটাকে বাস্তবে প্রয়োগ করবে। যে উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে গিয়ে ওদের পূর্ব সুরীরা কায়েমী স্বার্থের ধারক বাহকদের অত্যাচারে জর্জরিত হয়েছে, জীবন উৎসর্গ করেছে সে উদ্দেশ্যকেই প্রকৃত অর্থে বাস্তবে রূপ দিতে এগিয়ে যাবে। এবলেই রাংচোয়াঙ্গা থামল।

রাংচোয়াঙ্গা এবং থাংলুরা আলাপ করছে দেখে আরো কয়েকজন অল্পবয়সী মিজো বন্দী ওদের পাশে এসে দাঁড়াল। তারা দুজন কি নিয়ে আলাপ চালিয়েছে সেটা ওরা বুঝতে পারেনি। তাই তাদের মধ্যে একজন থাংলুরা এবং রাংচোয়াঙ্গাকে লক্ষ্য করে বলল

— দুজন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বেশ মজা করে কি গল্প করছেন?

— না, মজা করে গল্প করছি না। ওকে জেলের ভিতর মিজোবন্দীদের মারা যাওয়ার কথা বলছিলাম। সেটা ভিত্তি করেই আলাপ চলছে। রাংচোয়াঙ্গা প্রতে্যুত্তরে বলল।

ছেলেটি রাংচোয়াঙ্গার উত্তর শুনে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। সে ভাবছিল ওরা বুঝি জেলের কোন মজাদার কাহিনী নিয়ে আলাপ করছিল। কিন্তু না। ওরা নিজেদের ব্যাপার নিয়েই গুরুত্ব দিয়ে আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল। এমনি ভাবে হঠাৎ ওদের আলাপের মধ্যে এভাবে বলা ঠিক হয়নি। সে যাহোক, বলে যখন ফেলছে তখন আর কি করা যায়? সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

— আপনি কি কেবল জেলে মরে যাওয়া মিজো বন্দীদের কথাই বলছেন, আর কিছু বলেন নি?

— আর কি বলব?

— কেন মিজো ছেলে যে জন্মলাভ করেছে সে কথা?

— না, সেটা বলিনি। রাংচোয়াঙ্গা বলল।

মিজো ছেলে জেলে জন্মলাভ করেছে? সেটা কেমন করে হল? জেলে মিজো ছেলে জন্মলাভ করেছে কথাটা শুনে থাংলুরা আশ্চর্য হল। ব্যাপারটা খোলাখুলি ভাবে জানার কৌতূহল সে চেপে রাখতে পারল না। তাই তাড়াতাড়ি ছেলেটিকে লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করল

— জেলে মিজো ছেলে জন্মলাভ করেছে?

— হ্যাঁ এজেলেই মিসেস রোজামা একটি পুত্র সন্তান লাভ করেছে।

— সেটা কি রকম ভাবে সম্ভব হল?

— কি রকম ভাবে সম্ভব হল মানে? সম্ভব হয়েছে। শাসকগোষ্ঠীর দৌলতে বুড়াবুড়ি, ছেলে মেয়ে, গর্ভবতী কেহই রেহাই পায়নি। আমাদেরকে গ্রেপ্তার করে আনার কিছুদিন পর মিসেস রোজামাকেও গ্রেপ্তার করে এ জেলে আটকে রাখে। তখন সে গর্ভবতী ছিল। গর্ভবতী অবস্থাতেই সে জেলে দিন কাটিয়ে যেতে থাকে। তারপর একদিন স্বাভাবিক নিয়ম অনুসারেই মিসেস রোজামা একটি পুত্র সন্তান প্রসব করে। পুত্র সন্তানটি জেলের চারিদেওয়ালের ভিতর আবদ্ধ আবহাওয়াতেই ক্রমে ক্রমে বড় হতে থাকে। ঘটনাটা অনেকটা অঘটনের মতই। মিসেস রোজামা বিচারাধীন মিজো বন্দী হিসাবে জেলের অভ্যন্তরেই একটি পুত্রসন্তান লাভ করেছে। প্রিয়দর্শিণী ইন্দিরা গান্ধীর পূর্বসুবীদের আমল থেকে এখন পর্যন্ত পবিত্র (!) সরকারের দৃষ্টিভঙ্গীতে বিভিন্ন আন্দোলনে অংশ গ্রহণকারী রাষ্ট্রদ্রোহী বা সামাজদ্রোহী বলে যে সমস্ত লোকেরা জেলে আবদ্ধ থেকে নানা ধরণের অত্যাচার বা নিপীড়ন সহ্য করছে তাদের তুলনায় মিসেস রোজামার ব্যাপারটা একটু অন্য ধরনের। প্রথম প্রথম মিসেস রোজামা জেলের পারিপার্শিক অবস্থা দেখে তার আসন্ন নবজাতকের কথা ভেবে এক অজানা আশঙ্কায় ভুগছিল। কি জানি কি হয়। মনে মনে ভাবনা বা দুর্ভাবনা নিয়েই জেলের অভ্যন্তরে তার সময অতিবাহিত করছিলেন। অবশেষে একদিন তার সমস্ত ভাবনাকে উপেক্ষা করে নবজাতক ভূমিষ্ঠ হয়। জেলের চারিদেওয়াল ভেদ করে যে ক্ষীণ আলো বাতাস ছিল সেটুকুই নবজাতক ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর গ্রহণ করে।

নবজাতককে পেয়ে রোজামার ভালই হল। জেলের দৈনন্দিন জীবনের বিড়ম্বনাকে ভুলে সে তার পুত্র সন্তানকে অবলম্বন করে দিন কাটাতে থাকে। কিন্তু সেটাও শেষ পর্যন্ত একঘেয়ে মনে হল। দিন এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে নূতন নূতন সমস্যা এসে সামনে দাঁড়ায়। নূতন চিন্তা এসে মাথাতে জট পাকাতে থাকে। দীর্ঘদিন অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর মিসেস রোজামা ভাবতে থাকে যে তাকে না হয় আজীবন জেলেই কাটাতে হবে কিন্তু এই শিশু সন্তানটির কি হবে? তাকেও কি সারাজীবন জেলে থাকতে হবে? আজ এ ছেলেই জেলের বাইরে থাকলে তার দেশের পরিবেশে ধীরে ধীরে বড় হতো। এখানে প্রতিনিয়ত যেভাবে কর্তৃপক্ষের শাসন বিধি প্রয়োগ হচ্ছে সে অবস্থায় কি তার স্বাভাবিক বিকাশ ঘটবে? এসমস্ত ভাবতে ভাবতে সে আরও ভাবে তার ছেলের কি দোষ? সে ত মিজো দেশই দেখেনি। মিজো সংস্কৃতি বা মিজো প্রথার কিছুই জানে না। জন্মই হলো মিজো জেলার অনেক দূরে অবস্থিত একটি জেলের প্রকোষ্ঠে। তাহলে তাকে কেন জেলের ভিতর আটকে রাখবে? না কি সে জেলের অভ্যন্তরে জন্মলাভ করেছে বলে সে জেল কর্তৃপক্ষেরই সম্পত্তি? এ সমস্ত ভাবনা একবার শুরু হলেই সেগুলো মিসেস রোজামার মাথায় কিল বিল করতে থাকে। ওকে বেসামাল করে তুলে। চিন্তার জট পাকিয়ে জটিল থেকে জটিলাকার হয়। তার ছেলের চিন্তাটাই এখন নিজের চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিমুহুর্তেই সে ভাবে যে, সে না হয় সারা জীবন জেলে আবদ্ধ থাকবে, কিন্তু তার ছেলের অবস্থা? সন্তানের প্রতি মায়ের যে স্নেহ মমতা সেটা মিসেস রোজামা উপেক্ষা করতে পারেনি। সেই স্নেহ মমতা বোধই তাকে তার ছেলের জন্য ভাবিয়ে তুলে। মিসেস রোজামা জেলের অভ্যন্তরে বসে বসে তার ছেলের জন্য হয়ত চিন্তাই করুক বা তার ছেলের অবস্থা নানা ঘাত প্রতিঘাতে যত দুঃসহনীয়ই হোক না কেন এটা সত্যি, এ সমস্ত ঘটনা মিজো জাতীয় জীবনে একটা বিশেষ ঘটনা বলেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ভবিষ্যতে মিজো নাগরিক তাদেরকে ভুলতে পারবে না। মিসেস রোজামার ছোট্ট ছেলেটিও হয়তবা এখন এ-অবস্থায় এই পরিবেশে কেন আছে সেটা পুরাপুরি উপলদ্ধি করতে না পারলে ও আগামী দিনে সে নিশ্চয়ই আজকের দিনকে ভুলতে পারবে না। বয়স বাড়ার সাথে সাথে, বিচার বুদ্ধি যখন বাড়বে তখন সেও উপলদ্ধি করতে পারবে কেন তার মাকে এমন নিদারুণ ভাবে স্বদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে জেলে আটকে রেখেছিল? কেন সে তার শৈশব স্বাভাবিক ভাবে অন্যান্য মিজো শিশুদের মতই মিজো জেলার পাহাড়ীয়া প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে কাটাতে পারেনি। এসমস্ত প্রশ্নের মোকাবিলা করতে গিয়ে সে বাস্তব সত্য বুঝতে পারবে। সে বুঝতে পারবে কি ভাবে এগিয়ে মিজো জাতির ভবিষ্যত রচনার সোপান তৈরি করতে হবে। থাংলুরা মন দিয়ে রাংচোয়াঙ্গা এবং ছেলেটির কথা শুনছিল। দীর্ঘদিন বিভিন্ন জেলে থাকায় এ জেলে যে সকল ঘটনা ঘটেছিল তার কোন খবরই সে পায়নি। এখন এসমস্ত শুনে সে ভাবল জেলের ভিতর বেশ কিছু পরিবর্তন হয়ে গেল। কিছু লোক মারা গেল। আবার নূতন লোক জমায়েত হল। অবশ্য পরিবর্তন স্বাভাবিক। The only unchangeable thing is change itself. দিন এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে আরও কত পরিবর্তন হবে।

থাংলুরা এগুলি মনে মনে ভেবে রাংচোয়াঙ্গাকে বলল,

— চল এবার তোমাদের ওয়ার্ডের দিকে যাই। বেশী সময় একজায়গায় এমনভাবে দাঁড়িয়ে আলাপ করতে ভাল লাগে না।

রাংচোয়াঙ্গা থাংলুরার কথা মতই সারা দিল। সে পা বাড়িয়ে নিজেদের ওয়ার্ডের দিকে চলল। বাকী ছেলেগুলি কি করবে ঠিক করতে পারল না। ওরা দাঁড়িয়েই রইল। থাংলুরা এবং রাংচোয়াঙ্গা পাশাপাশি চলল। থাংলুরা রাংচোয়াঙ্গাকে বলল,

— আমরা বিভিন্ন জেলে থাকার অবসরে এজেলের কি রকম পরিবর্তন হয়ে গেল। রাংচোয়াঙ্গা থাংলুরার একথা শুনে একটু হাসল এবং বলল

— পরিবর্তন হবে না কেন? পরিবর্তন হবে।

— আমাদের জেলেই যে কেবল পরিবর্তন হবে তা নয়। দিন এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে ব্যক্তির পরিবর্তন হবে, সমাজ জীবনে পরিবর্তন হবে, রাষ্ট্রীয় জীবনে পরিবর্তন হবে এবং সেগুলি আর্ন্তদেশীয় পরিবর্তন আনবে। আর এই পরিবর্তনের ঢেউয়ে আমরা এবং আমাদের ভবিষ্যৎ নাগরিকেরা তালে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাব।

একথাগুলি বলতে বলতে রাংচোয়াঙ্গা এবং থাংলুরা রাংচোয়াঙ্গাদের ওয়ার্ডে ঢুকে গেল।

গতানুগতিক ভাবে দীর্ঘদিন ধরে জেল কর্তৃপক্ষের দুর্নীতির শিকার হয়ে নিপীড়ন অত্যাচার সহ্য করতে করতে শেষ পর্যন্ত এমন এক পর্যায়ে এসে পৌঁছল যে, তারা আর সব কিছু মেনে নিতে পারেননি। তাই রাংচোয়াঙ্গা এবং অন্যান্য মিজোবন্দীরা ভাবল এমনি ভাবে দীর্ঘদিন জেলে চুপচাপ বসে থাকলে কিছুই হবে না। এ ভাবনা নিয়েই রাংচোয়াঙ্গা, থাংলুরা এবং অন্যান্যরা মিলে একটা যৌথ সিদ্ধান্তে উপনীত হল। জেলের ভিতর বন্দীদের প্রতি দুর্ব্যবহার এবং তাদের বিচার আদালতে যথাশীঘ্র আরম্ভ করার দাবীতেই অনির্দিষ্ট কালের জন্য অনশন করার সিদ্ধান্ত নেয়। মিজো বন্দীরা এক জোট হয়ে কর্তৃপক্ষের নিকট স্মারকলিপি পেশ করে অনশন আরম্ভ করে দেয়।

বিচারাধীন বন্দীদের একজোট হয়ে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে এমনিভাবে আন্দোলন করার ইতিহাস পূর্ব ভারতে প্রথম। বিচারাধীন মিজো বন্দীদের এ আন্দোলনের খবর পূর্বাঞ্চলের কোন কোন শ্রেণীর নিকট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে হলেও তথাকথিত সাংবাদিকরা সেটাকে অস্পৃশ্য বলেই মনে করছে বোধ হয়। তাদের পত্রিকাতে বিনোবার লাঠি ভর দিয়ে পদ যাত্রা, বিমলা প্রসাদ চালিহার সর্দিজ্বর বা পত্রিকার মালিকের দ্বারা ক্লাবের দ্বারোদঘাটন প্রভৃতির খবর প্রাধান্য পায় বলেই বোধ হয় বিচারাধীন মিজো বন্দীদের আন্দোলনের খবর প্রাধান্য পায়নি। সে যাহোক, পত্রিকা ওয়ালারা সেটা উপেক্ষা করলেও এ ঘটনাটা পুরাপুরি চাপা পড়ে যায়নি। মিজোদের প্রতি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। আসামের বিধানসভার বিভিন্ন দল থেকে প্রতিনিধি নিয়ে একটি প্রতিনিধি দল পাঠান মিজো পাহাড়ের অবস্থা পর্যালোচনা করতে।

বিধান সভার সদস্যদেরকে নিয়ে গঠিত প্রতিনিধি দল মিজো পাহাড়ে গিয়ে সেখানকার বাস্তব অবস্থা কোন দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে কি ভাবে দেখছে সেটা বলা মুসকিল। তবে ওরা আসার পর যে খবর বেরিয়েছে তাতে ওরা বলছে যে মিজো পাহাড়ে মিলিটারী বাহিনীর প্রভাব প্রতিপত্তি কমাতে হবে। বিধানসভার সদস্যদেরকে নিয়ে মিজো জেলা পরিদর্শনকারী প্রতিনিধি দলের মন্তব্য এবং জেলের ভিতর বিচারাধীন মিজো বন্দীদের একযোগে অনির্দিষ্ট কালের জন্য অনশন প্রভৃতি ঘটনা সরকারী মহলে কিছু নাড়া দেয়। আসাম মন্ত্রীসভার পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয় জেলে আটক বিচারাধীন বন্দীদের বিচার অতি শীঘ্রই আরম্ভ হবে।

বিচারাধীন মিজো বন্দীদের বিচার অতি শীঘ্রই আরম্ভ হবে। জেলে অনশনরত মিজোবন্দী রাংচোয়াঙ্গা, থাংলুরা প্রভৃতি সবাই সরকারের এ সিদ্ধান্ত জেল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জানতে পারল। অবশ্য যেদিন থেকে জেলে ঢুকেছে সেদিন থেকেই রাংচোয়াঙ্গা শুনে আসছে যে আদালতে বিচার শীঘ্রই আরম্ভ হয়ে যাবে। কাজেই এ খবর রাংচোয়াঙ্গাদের মনে কোন চিত্তচাঞ্চল্য ঘটায়নি। তবুও, যেহেতু তারা দাবী আদায়ের জন্য স্মারকলিপি পেশ করে অনশন আরম্ভ করেছিল সেটার পরিপ্রেক্ষিতেই সরকার জেল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জানিয়েছিল যে বিচার শীঘ্রই আরম্ভ হবে তাই তারা সেটাকে জেলের ভিতর কার আন্দোলনের একটা জয় হিসাবেই গ্রহণ করে। বিচারাধীন সব মিজো বন্দীরা অনশন ভঙ্গ করল এবং বাইরের ভাবটা প্রকাশ করল যে, যাহোক এতদিনে তাদের একটা সুবিচার হবে।তবে অনেক বিচারাধীন মিজো বন্দীদের মনে স্বাভাবিক ভাবেই সংশয় থেকে গেল যে সরকারের ঘোষণা কি কার্যকরী হবে?

কিন্তু না, সরকারের এবারের ঘোষণাটা দেখা গেল একটু অন্য ধরণের। কিছুদিন পরই দলে দলে মিজো বিচারাধীন বন্দীদেরকে শিলচর থেকে আইজলে চালান দেয়। সেখানে এক এক করে জেল থেকে বন্দীদেরকে ছেড়ে দিতে আরম্ভ করে। ক্রমে ক্রমে থাংলুরা এবং রাংচোয়াঙ্গাও জেলের বাইরে চলে আসে।