রাংচোয়াঙ্গা এবং অন্যান্যরা জেল থেকে বেরিয়ে আসার পর মিজো পাহাড়ে অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে থাকে। নিরাপত্তা বাহিনীর সহিত আইজলের পাশে ঝুমপাই অঞ্চলে এবং অন্যান্য পার্বত্য এলাকায় বৈরী মিজোদের সশস্ত্র সংঘর্ষ এবং উভয় পক্ষে হতাহত ঘটতে থাকলেও সেসমস্ত খবর গুলিকে যথাযথো গুরুত্ব না দিয়ে মিজো পাহাড়ের শহর ভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলির কার্যকলাপ প্রাধান্য পেতে থাকে। দিল্লীতে প্রধানমন্ত্রী সহ ভারত সরকারের অন্যান্য নেতৃবর্গের সঙ্গে মিজো জেলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ আলোচনা হয় এবং মিজো জেলাকে পূর্ণ রাজ্যে রূপান্তরিত করার দাবী পেশ করা হয়। ইত্যাবসারে খবরের কাগজের শিরোনামায় আসতে থাকে যে কিছু সংখ্যক মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্টের কর্মী সরকারের সহিত বোঝাপড়ায় আসতে থাকে।

অন্যদিকে সর্ভভারতীয় ক্ষেত্রেও চলতে থাকে বিরাট পরিবর্তন। সোভিয়েত রাশিয়ার সহিত ভারতের চুক্তি সম্পন্ন হয়। তারপর প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পূর্ব পাকিস্তানে জনগণের উপর ইয়াইয়া খাঁর অমানুষিক অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে মানবিক তাড়নায় (!) ভারতীয় সৈন্য সামন্ত দিয়ে সেখানে ইয়াইয়া খাঁনের সৈন্যবাহিনীর পরাজয় ঘটিয়ে শেষপর্যন্ত মুজিবুর সরকারের পত্তন করার সহায়ক হন। তখন ইন্দিরা সরকারের জয় জয়কার, অবস্থা একেবারে তুঙ্গে। ইন্দিরা গান্ধীকে সাক্ষৎ দেবীই আখ্যা দেওয়া হয়। তারই কিছুদিন পর ১৯৭২ ইং ২১ শে জানুয়ারীতে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী এক ঐতিহাসিক ঘোষণা করেন। মেঘালয়, ত্রিপুরা, মণিপুরকে পূর্ণাঙ্গ রাজ্য হিসাবে ঘোষণা করার সাথে সাথে অরুণাচল এবং মিজোপাহাড় সম্পর্কেও ঘোষণা করে। ১৮ই এপ্রিল প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠানের বন্দোবস্ত করেন। নির্দ্ধারিত দিনে মিজোরামের নির্বাচন নির্বিঘ্নেই অনুষ্ঠিত হয়। বিধানসভার ত্রিশটি এবং লোকসভার একটি আসনের জন্য মোট প্রার্থী দাড়াল ১৬০ জন। তার মধ্যে সরকারের বোঝাপড়ায় যে সমস্ত মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্টের কর্মীরা এসেছিল তাদের থেকে পনেরোজন প্রার্থী দেওয়া হয় - একজন লোকসভা আসনে এবং বাকী ১৪ জন বিধানসভার আসনে। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা হওয়ার পর দেখা গেল বিদ্রোহী মিজোরা (যাদের পূর্ব পরিচয়) একটি আসনও লাভ করতে সমর্থ হয়নি। মিজো ইউনিয়নই সংখ্যাগরিষ্ট আসন লাভ করে। বিধান সভায় মিজো ইউনিয়ন পায় একুশটি, মিজো কংগ্রেস পায় ছয়টি এবং নির্দলীয় প্রার্থীরা পায় তিনটি। লোকসভার আসনটি দখল করে মিজো ইউনিয়নের মিঃ সংলিয়াঙ্গা। মিজো ইউনিয়নের নেতা মিঃ সি ছোঙ্গার নেতৃত্বে সরকার ঘঠিত হয়।

মিজোপাহাড়ে প্রকাশ্য রাজনৈতিক দলগুলির তৎপরতা এবং সরকারের অনুসৃত নীতির ফলে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয় সেটা জেনারেল থু-আয়া, য়‍্যাঙ্গায়া প্রভৃতিদেরকে ভাবিয়ে তুলে। অবশ্য জেনারেল থু-আয়া জানে যে বিপ্লবী সংগ্রামে কোন কোন সময়ে অনুকূল অবস্থার বিপরীতে বাধা বিপত্তিই বেশী জোরদার হয়ে উঠে। সে সময়ে বাধা বিপত্তি হচ্ছে দ্বন্দ্বের প্রধান দিক। অনুকুল অবস্থা হচ্ছে গৌণ দিক। কিন্তু বিপ্লবীদের প্রয়াসের মাধ্যমে বাধাবিপত্তিকে ধাপে ধাপে অতিক্রম করা সম্ভব। কাজেই আজকে বিদ্রোহী মিজোদেরকে সঠিক ভাবে বাস্তব অবস্থার বিশ্লেষণ করতে হবে। শাসকগোষ্ঠী মিজো পাহাড় সম্পর্কে যে নীতি গ্রহণ করেছে সেটা কি মিজোজনগণের স্বার্থে করেছে? না মিজো জাতীয় সংগ্রামের উত্তাল তরঙ্গ ওদের কর্তৃত্বের সমস্ত কিছুই যেন খড়কুটোর মত ভাসিয়ে না নিতে পারে সে জন্য অত্যন্ত সুচতুর উপায়ে সেটাকে আটকে দেওয়ার জন্য এ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে? দিন এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে অবশ্যই এটার উদ্দেশ্য এবং ফলাফল জনগণের নিকট পরিস্কার হয়ে যাবে। মিজো পাহাড়ের জনগণ – শুধু মিজো পাহাড়ের জনগণ নয়, সমস্ত পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য অধিবাসীদের প্রতি কায়েমী স্বার্থরক্ষার ধারক বাহকদের যে মনোভাব সেটা কি রকম? সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে কায়েমী স্বার্থের বৃহত্তর স্বার্থরক্ষার দিক লক্ষ্য রেখেই পূর্বাঞ্চলীয় পার্বত্যদের ক্ষেত্রে বিধি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে সেটাই হচ্ছে ওদের আসল উদ্দেশ্য। ১৯৫০ ইং ৭ই নভেম্বর তারিখে সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য অধিবাসী এবং তাদের প্রতি চীনের কি ভূমিকা হতে পারে সে সমস্ত উল্লেখ করে পণ্ডিত জহরলাল নেহেরুর নিকট পত্র দেন। প্যাটেল নেহেরুকে যে পত্র লিখেন তা হচ্ছে -

We consider ourselves friends of China, yet they do not reciprocate this sentiment. Their communist ideology dictates that anyone not explicitly aligned with them is an adversary, a critical point we must acknowledge.

Let us now examine the political vulnerabilities along this potentially problematic border. Our northern and northeastern flanks encompass Nepal, Bhutan, Sikkim, Darjeeling, and the tribal regions of Assam. From a communications standpoint, these are weak areas. Continuous defensive lines are absent, offering almost limitless opportunities for infiltration. Police presence is minimal, confined to a small number of passes, and even there, our outposts appear understaffed.

These regions lack close and intimate ties with us. Their inhabitants do not demonstrate established loyalty or devotion to India. Even Darjeeling and Kalimpong are not immune to pro-Mongoloid biases. Over the past three years, our efforts to engage the Nagas and other hill tribes in Assam have yielded little progress. I am confident that China, and their inspiration, Soviet Russia, will exploit these vulnerabilities to further their ambitions.

প্রত্যক্ষভাবে ব্রিটিশ ভারত ছেড়ে চলে যাওয়ার সময়ই মিজো জনগণের মধ্যে স্বতন্ত্র এবং স্বাধীন সত্ত্বা নিয়ে চলার মনোভাব বিদ্ধমান ছিল। তখন অবশ্য কোন কোন মহল থেকে স্বাধীনভাবে থাকার কথাই ঘোষণা করা হয়। কেহ কেহ মিজো পাহাড়াকে বার্মার সাথে যোগ দেওয়ার ওকালতি করেন। আবার ব্রিটিশ সরাসরি ভাবে চলে যাওয়ার প্রাক্কালে ১৯৪৭ ইংরেজীতে ব্রিটিশ কনষ্টিটিউসনেল বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক কোপল্যাণ্ড বার্মা আসামও চট্টগ্রামের পার্ব্বত্য এলাকা নিয়ে (যার অধিবাসী প্রায় সবাই খৃষ্টান এবং পার্বতীয়া) “ ক্রাউন কলোনী অফ ইষ্টার্ণ এজেন্সী" নাম দিয়ে একটি পৃথক স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করার পরিপ্রেক্ষিতে মত দিয়েছিলেন যার মধ্যে অবশ্যই নাগা পাহাড়, মিজো পাহাড় প্রভৃতি অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু সে সময় সেসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত না হয়ে মিজো পাহাড়, নাগাপাহাড় প্রভৃতি অঞ্চল ভারতবর্ষেই অন্তর্ভূক্ত হয়। কিন্তু সেখানকার সকল জনসাধারণের নিকট সে ব্যবস্থা পুরাপুরি মনঃপুত হয়নি বলেই সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর নিকট ব্রিটিশ চলে যাওয়ার তিন বৎসরের মধ্যেই লিখতে হয় যে,

during the last three years we have not been able to make any appreciable approaches to the Nagas and the hill tribes in Assam.

বর্তমানে মিজো পাহাড়ের সমস্যা সমাধানের জন্য সরকার মিজোপাহাড়ের প্রকাশ্য রাজনৈতিক দলগুলির সাথে সমঝোতা করে যে ব্যবস্থা গ্রহণ করছে তা সম্পূর্ণভাবে মিজো পাহাড়ের জনগণকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। কিছু সংখ্যক মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্টের কর্মীরা জেল থেকে বেরিয়ে এসে বা এমনিতে সরাসরি ভাবে সরকারের নিকট আত্মসমর্পণ করে নির্বাচনে যোগদান করে এবং কেন্দ্রীয় শাসনে মিজোরামের ব্যাপক উন্নতি হওয়ার মহিমা কীর্তন করে সাময়িক ভাবে ব্যাপক জনগণের বিপ্লবী সংগ্রামে ভাটা টানলেও শেষ রক্ষা করতে পারবে না। জনগণ আবার এগিয়ে যাবে। সঠিকভাবে রাজনীতিতে সুসজ্জিত সশস্ত্র সংগ্রামীদের প্রয়াসের মাধ্যমে বাধা বিপত্তিকে ধাপে ধাপে অতিক্রম করে নূতন অনুকূল অবস্থার সৃষ্টি করবে। আজকের প্রতিকূল অবস্থা অনুকূল অবস্থার জন্য স্থান ছেড়ে দিবে। মিজো পাহাড়ের সশস্ত্র বিদ্রোহী মিজোদের একটি গোপন ঘাটিতে বসে জেনারেল থু- আয়া এবং য়‍্যাঙ্গায়া আলাপ করছিল। নানা প্রতিঘাত ওদেরকে নিজেদের কর্তব্য থেকে একটুও হেলাতে পারেনি। শরীরের শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত বিজয় অবধি অতন্দ্র সৈনিকের মত সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার অগ্নিমন্ত্র সর্বক্ষণই ওদের শিরায় শিরায় বয়ে চলছে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় শাসিত পৃথক মিজো রাজ্য হওয়ায় বা মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্টের কিছু সংখ্যক কর্মী সশস্ত্র পথ পরিত্যাগ করলেও ওদেরকে নিরাশ করতে পারেনি। ওরা সেটাকে বিশেষভাবে বিশ্লেষণ করে বরং অভিজ্ঞতাই সঞ্চয় করছে। বিজয় অবধি সংগ্রাম চালিয়ে যেতে বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করতে হবে, বর্তমানের ঘটনা সেই একধাপ অতিক্রম করারই একটা নির্দশন মাত্র। আজকে মিজো পাহাড়ে যা হয়েছে সেটা বিদ্রোহী মিজোদের সশস্ত্র আন্দোলনকে উপেক্ষা করে হয়নি। আসল লক্ষ্যে পৌঁছতে অর্থাৎ প্রকৃত অর্থে স্বাধীন হতে যে কঠোর সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে সেটার ভয়ে ভীত হয়েই হয়তবা আজকে অনেকে কেন্দ্রীয় শাসিত পৃথক মিজো রাজ্যের প্রস্তাব মেনে নিয়েছে। কিন্তু এই যে প্রস্তাব সেটা সশস্ত্র মিজো সংগ্রাম চলছে বলেই এসেছে। নইলে কেন্দ্রীয় শাসিত পৃথক মিজো রাজ্য গঠন করার প্রশ্নই এসময় এভাবে আসত না। আজকে মিজোরাম ইউনিয়ন টেরিটরি হওয়াতে কারা সবচেয়ে বেশী খুশী হয়েছে? মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্টের কোন সব কর্মীরা নির্বাচনে যোগ দিয়েছে?

যারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ চলাকালীন অবস্থায় পুঞ্জীর লাল ছিল অর্থাৎ মিজো চীফস্ ছিল, যারা অবস্থাসম্পন্ন ছিল তারাই আজকে মিজো পাহাড়কে মিজো রাম ইউনিয়ন টেরিটরি ঘোষণা করায় সবচেয়ে বেশী খুশী হয়েছে। ওদের নেতৃত্বই আজ সেখানে কায়েম হচ্ছে। যারা উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে তীব্র সংগ্রাম করেও প্রচণ্ড ভাবে শোষিত হচ্ছিল তাদেরতো সে রকম উৎসাহ উদ্দীপনা নেই। সে সব শ্রেণীভুক্তের সশস্ত্র বিদ্রোহী মিজোরা সমঝোতায় আসেনি। তারা নির্বাচন প্রার্থী হিসাবে দাঁড়ায়নি। তাহলে এসমস্ত ঘটনা থেকে কি প্রমানিত হয়? এগুলি বিচার বিশ্লেষণ করে থু-আয়া এবং য়‍্যাঙ্গায়াদের মনে এটাই বিশেষ ভাবে নাড়া দেয় যে, চূড়ান্ত বিশ্লেষণে জাতীয় সংগ্রাম হচ্ছে শ্রেণীসংগ্রামেরই সমস্যা। এদৃষ্টিভঙ্গী নিয়েই আগামী দিনের সংগ্রামকে জোরদার করতে হবে।

হ্যাঁ, জাতীয় সংগ্রাম হচ্ছে শ্রেণীসংগ্রামেরই সমস্যা। আর আজকে সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে কেবলমাত্র মিজো পাহাড়ের ছোট্ট গণ্ডীকে কেন্দ্র করে চললেই হবে না। আর্ন্তজাতিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করেই সংগ্রামের কর্মসূচী গ্রহণ করতে হবে। পূর্বপাকিস্তানে নানা ফন্দি ফিকির করে প্রতিষ্ঠিত মুজিব সরকারের চট্টগ্রামে পার্বত্য অঞ্চলে মাওপন্থী কম্যুনিষ্ট ও সশস্ত্র বিদ্রোহী মিজোদের সংগ্রামের উত্তাল তরঙ্গ যেভাবে সেখানকার ভিত্তি কাপিয়ে তুলে সেটাকে নির্মূল করার মনোবাসনা ভারত সরকারও পরিত্যাগ করতে পারেনি। ১৯৬৬ ইংরেজীতে যে সরকার স্বাধীনতা কামী মিজোদের মুক্তিযুদ্ধকে রাষ্ট্রদ্রোহী কার্যকলাপ বলে বর্ণিত করে সৈন্য মোতায়েন করে দমন পীড়ন চালায়, সে সরকারই ১৯৭১ ইংরেজীতে মানবতার দোহাই দিয়ে পূর্ববাংলার আওয়ামী লীগের সশস্ত্র মুক্তি যুদ্ধকে সহায়তা করার নাম করে শেষ পর্যন্ত সরাসরি যুদ্ধে যোগদান করে ইয়া ইয়া খার সৈন্যদের পরাজয় ঘটায়। পূর্ববাংলায় ইয়া ইয়া খার সৈন্য যেভাবে জনগণের উপর অত্যাচার চালায় সেটা ভীষণ অমানুষিক, সেটা পাশবিক। খান সেনাদের অমানুষিক এবং পাশবিক অত্যাচারে পূর্ববাংলায় জনগণের যে অভূতপূর্ব এবং অশেষ দুঃখ কষ্ট হয় সেটা ইন্দিরা গান্ধীর হৃদয়কে নিদারুণ ভাবে ব্যথিত করে তুলে। কিন্তু মিজো পাহাড়ের মুক্তি যোদ্ধা এবং মিজো জনসাধারণের উপর যখন সৈন্য বাহিনী কর্তৃক অত্যাচার চলে তখন কি মানবিকতার প্রশ্ন ছিল না? মিজোদের সংগ্রাম হচ্ছে ভারতবর্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ব্যাপার। ওরা ভারতবর্ষ থেকে পৃথক হয়ে স্বাধীন হওয়ার কথা বলছে। আর পূর্ববাংলার জনগণ চাইছিল পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন হতে। কাজেই ইন্দিরা গান্ধীর ক্ষেত্রে পূর্ববাংলার জনগণের ব্যাপারে যে মানবতার প্রশ্ন জড়িত সেটা বিদ্রোহী মিজোদের বেলায় আসতে পারে না। তাইতো আজ মিজো পাহাড়ে চলছে বিদ্রোহী মিজোদের পূর্ণ স্বাধীনতার সংগ্রামকে দমিয়ে দেওয়ার নানা কৌশল এবং অত্যাচার।

মিজো পাহাড়ে, চট্টগ্রামের পার্ব্বত্য অঞ্চলে ভারত সরকার ও মুজিব সরকারের সৈন্যবাহিনী সশস্ত্র বিদ্রোহী মিজোদেরকে দমন করার বিধি ব্যবস্থা গ্রহণ করা ছাড়াও বার্মাতে চীন, আরাকান পাহাড় অঞ্চলে বিদ্রোহী মিজোদেরকে দমন করার জন্য চলছে নে- উইন সরকারের তৎপরতা। বার্মাতে জমি লিবারেশন ফ্রন্ট (Zomi Liberation Front) বার্মার কম্যুনিষ্ট পার্টি, ইষ্টার্ণ নাগা রিভলিউশনারী কাউন্সিল এবং উনু’র ন্যাশনাল ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্টের সশস্ত্র আন্দোলনের সাথে আছে মিজোদের সশস্ত্র আন্দোলন। সেখানে বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর সশস্ত্র আন্দোলনে নে উইন সরকারের অবস্থা বেসামাল। কোন কোন ক্ষেত্রে বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠী যৌথভাবে কর্মসূচী গ্রহণ করে নে-উইন সরকারকে উৎখাত করার জন্য এগিয়ে যাচ্ছে। উনুর নেতৃত্বে পরিচালিত ন্যাশনাল ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্টের প্রস্তাবিত ফেডারেল ইউনিয়ন অফ বার্মার অন্তর্ভূক্ত আরাকান পাহাড়, চীন পাহাড় পার্বত্য চট্টগ্রামে মিজো জাতি বসতি অঞ্চল মিজোদের হবে। এই ভিত্তিতে ওদের সাথে যৌথ কর্মসূচী গ্রহণ করে নে উইন সরকারের পতন ঘটানোর জন্য মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্টের প্রধান মিঃ লালডেঙ্গার নিকট প্রস্তাব পেশ করা হয়। লালডেঙ্গার নেতৃত্বে বিদ্রোহী মিজোরা কি সে প্রস্তাব কার্যকরী করতে সচেষ্ট হবে না? নিশ্চয়ই হবে। সেখানকার বিভিন্ন গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক দলগুলির সশস্ত্র সংগ্রাম এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে মিজোদের সংগ্রামও পরিপুরক ভাবে এগিয়ে যাবে। ওদের সংগ্রামের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মিজোদের সংগ্রামের ও অগ্রগতি হবে। ক্রমে ক্রমে চীনের য়ুনান প্রদেশের সীমান্ত অঞ্চল থেকে আরম্ভ করে পাকিস্তানের পার্বত্য চট্টগ্রাম হয়ে ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বিকাশ ঘটার সাথে সাথে মিজোদের জাতি সত্বার বিকাশ ঘটবে। সেদিন কি বার্মার চীন পাহাড় ও আরাকান পাহাড়, চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চল এবং ভারতবর্ষের মিজোপাহাড়ের সমস্ত অধিবাসীদেরকে নিয়ে বৃহৎ মিজোরাম হবে না? এসমস্ত ভাবনাই য়‍্যাঙ্গায়া এবং জেনারেল থু-আয়ার মনে চাড়া দিয়ে উঠেছিল। বার্মা, বাংলাদেশ এবং ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন গোষ্ঠীর সশস্ত্র আন্দোলনে যে যোগসূত্র গড়ে উঠেছে বা আগামী দিনে সে সব সংগ্রাম কিরূপ নেবে সেগুলি ভাবনার সাথে সাথে জেনারেল থু-আয়া এবং য়‍্যাঙ্গায়ার মনে সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেলের চিঠির কিছু বক্তব্য ও বার বার মনে সাড়া দেয়। বল্লভ ভাই প্যাটেল নেহেরুকে লিখেছিলেন তিনি নিশ্চিত যে, চীন এবং তার অনুপ্রেরণার উৎসস্থল সোভিয়েত রাশিয়া আংশিক ভাবে আদর্শের সমর্থনে এবং আংশিকভাবে উচ্ছাকাঙ্খা চরিতার্থ করতে এ সমস্ত দুর্বল অপরিসর স্থানগুলিকে নিজেদের কাজে লাগাতে কোন সুযোগেরই অপব্যবহার করবে না।

আজকে সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেলর চিঠির বক্তব্য এবং তাৎপর্য জনগণ তাদের নিজ-অনুসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করবেন। কিন্তু সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেলের বক্তব্য অনুসারে সোভিয়েত রাশিয়া আজকে আর চীনের অনুপ্রেরণার উৎসস্থল নয়। বরং চীনের নিকট সোভিয়েত রাশিয়া একটি উদাহরণের বস্তু। লেনিন স্টালিনের সোভিয়েত রাশিয়াকে ক্রুশ্চেভ সংশোধনবাদীরা সামাজিক সাম্রাজ্যবাদে পরিণত করেছে। চীন পৃথিবীর বিপ্লবী জনগণের নিকট একথা জোর দিয়ে প্রচার করছে। তাছাড়া বার্মার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সশস্ত্র আন্দোলনে, ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলের নাগাও মিজো প্রভৃতিদের সশস্ত্র আন্দোলনে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে যেভাবে চীনের ভূমিকাকে জড়ানো হচ্ছে ঠিক সেভাবে রাশিয়াকে জড়ানো হচ্ছে না। সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেলের চীনের অনুপ্রেরণার উৎসস্থল সোভিয়েত রাশিয়ার ভূমিকা বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সশস্ত্র আন্দোলনে চীনের ভূমিকার মত হচ্ছে না। মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্টের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বলা হচ্ছে যে বার্মার জামি লিবারেশন ফ্রন্ট, বার্মার কম্যুনিষ্ট পার্টি, ইষ্টান নাগা রেভলিউশনারী কাউন্সিল এবং আরাকান ইন্ডিপেন্ডেন্ট আর্মি প্রভৃতির নেতৃবৃন্দদের তরফ থেকে মত পোষণ করা হয় যে, মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্টের প্রধান লালডেঙ্গা চীনে গিয়ে সেখানকার নেতৃবৃন্দের সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যেমে দৃঢ় রাজনৈতিক মতাদর্শে দীক্ষিত হন। এটাও বলা হয় যে, মুজিব সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী মিজো ও মাওপন্থী কম্যুনিষ্টদের চট্টগ্রামে অভ্যুত্থানের পর তাদেরকে জবরদস্ত শিক্ষা দেওয়ার জন্য ভারত সরকার ও মুজিব সরকারের সৈন্য বাহিনীদের যে যৌথ আক্রমণ হয় সেটার পরই লালডেঙ্গা বার্মার দূর উত্তরপূর্ব সীমান্ত অঞ্চলে চলে যায় এবং সেখান থেকে আবার চীনের য়ুনান প্রদেশে চলে যান।

বার্মার উত্তরপূর্ব সীমান্তে চীন পাহাড়ে জঙ্গলাকীর্ণ ৭৯৮১ ফুট উঁচু গিরিপথ দিয়ে এগিয়ে গিয়ে উৎড়াই ভেঙ্গেই চীনের য়ুনান প্রদেশের সীমানা। বিভিন্ন বিদ্রোহী জাতিগোষ্ঠীর সশস্ত্র মুক্তি যুদ্ধারা এপথ ধরেই চীনে যাওয়া আসা করে। বিদ্রোহ নাগারা চীন থেকে ফিরে আসতে এবং চীন যেতে এ পথই ব্যবহার করে থাকে। লালডেঙ্গাও এ পথেই তার স্ত্রী রিয়াকডিকি লালডেঙ্গা, চার ছেলেমেয়ে এবং তার উপদেষ্টা মিঃ জোরামথাঙ্গাকে নিয়ে চীনের য়ুনান প্রদেশে চলে যান। কিন্তু কেন লালডেঙ্গা চীনে গেলেন? কেন বার্মার বিভিন্ন উপজাতি গোষ্ঠীর সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধারা চীনে যায়? কেন মৃত্যু ভয় তুচ্ছ করে, প্রতিনিয়ত সংগ্রাম চালিয়ে, পাহাড়ের জঙ্গলাকীর্ণ দুর্গম অঞ্চল ভেদ করে সেখানে যায়? কোন আশায় বা তারনায় ওদেরকে সেখানে টেনে নেয়? এসব প্রশ্নের মোকাবিলা করতে গিয়ে বিভিন্ন জন বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে বিভিন্ন মত পোষণ করতেন। অনেকে বলছে চীন তার নিজস্ব স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে বিভিন্ন উপজাতিকে উস্কানি দিচ্ছে। ওদেরকে মদত জুগিয়ে যাচ্ছে। জেনারেল থু-আয়া এবং য়‍্যাঙ্গায়াও ভাবছে। ওরা বলছে হ্যাঁ, চীন নিজস্ব স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়েই বিদ্রোহী জাতিগোষ্ঠীদেরকে সাহায্য করছে। তবে চীনের নিজস্ব স্বার্থ বিভিন্ন সশস্ত্র আন্দোলনকারী উপজাতিদের স্বার্থ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। মিজো পাহাড়ের সশস্ত্র মিজো যুদ্ধাদের স্বার্থ চীনের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। নাগা পাহাড়ের সশস্ত্র নাগাদের স্বার্থ চীনের স্বার্থ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। কারণ চীনের নেতৃবৃন্দরা এটা স্বীকার করছে যে এশিয়া, আফ্রিকা, লেটিনআমেরিকার বিভিন্ন দেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত। আমেরিকার দ্ধারা আক্রান্ত, নিয়ন্ত্রিত, হস্তক্ষেপাধীন ও লাঞ্ছিত সমস্ত দেশের ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আক্রমণ নীতি ও যুদ্ধনীতির বিরোধিতা করার এবং বিশ্বশান্তি রক্ষা করার উদ্দেশ্যে ব্যাপকতম যুক্ত ফ্রন্ট গড়ে তোলা উচিত। এ লক্ষ্য নিয়েই আজকে সাম্রাজ্যবাদের ধারক বাহক প্রতিক্রিয়াশীল বার্মা সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সশস্ত্র জাতিগোষ্ঠী যৌথভাবে কর্মসূচী গ্রহণ করছে।

ভারতবর্ষের বিদ্রোহী মিজো নাগারা সে দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নিজ নিজ জাতীয় সত্বার বিকাশ ঘটানোর জন্য প্রতিবন্ধকতা দূর করে এগিয়ে যেতে সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। চীনের নেতৃবৃন্দ এ সমস্ত জাতিগোষ্ঠীর আন্দোলনকে বর্তমান যুগের মাকর্সবাদ লেলিনবাদের নীতি আকড়ে দৃঢ়ভাবে সমর্থন জানাচ্ছে। তাই বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সশস্ত্র সংগ্রামীরা চীনের সাথে যোগাযোগ রাখছে। তার অর্থ এই নয় যে, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী চীনের উপর পুরাপুরি নির্ভরশীল হয়ে গেছে। বরং চীনের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে আজ ওরা শিখছে যে, নিজেদেরকে আত্মনির্ভরশীল হতে হবে। বৈদেশিক সাহায্যের আশা করা যায় কিন্তু তার উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকা ঠিক নয়। নিজেদের প্রচেষ্টায় এবং নিজ নিজ জনগণের সৃজণী শক্তির উপর নির্ভর করে শত্রুর মোকাবিলা করতে এগিয়ে যেতে হবে। জেনারেল থু-আয়া এবং য়‍্যাঙ্গায়া তাদের গোপন ঘাটিতে বসে এভাবেই বিশ্লেষণ করছিল।

রাংচোয়াঙ্গা জেল থেকে বেরিয়ে এসে প্রথম প্রথম কয়েকদিন সংগ্রামরত বিদ্রোহী জোদের সাথে যোগাযোগ করতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু জেল থেকে বেরিয়ে আসার পর সরকার বাহাদূরের বিভিন্ন বাহিনীর তৎপরতায় ওদের গতিবিধিকে যে ভাবে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে তাতে ওর পক্ষে সম্ভব হয়নি যোগাযোগ করতে। রাংচোয়াঙ্গা পারেনি জেনারেল থু-আয়া বা য়‍্যাঙ্গায়ার সাথে দেখা করতে। অন্যদিকে রেমা, রোসাঙ্গী ও জায়চোয়াঙ্গা প্রভৃতিদের সাথেও য়‍্যাঙ্গায়া এবং জেনারেল থু-আয়ার দেখা হয়নি। প্রতিপক্ষ থেকে যে আঘাত ওদের উপর আসছে তাতে সম্ভব হয়নি দীর্ঘদিনের মধ্যে যোগাযোগ করতে। তবে এটা সত্য যে, যতই প্রতিপক্ষ থেকে আঘাত আসছে ততই য়াঙ্গায়া, জেনারেল থু-আয়া, রেমা, রোসাঙ্গী প্রভৃতিদের প্রতিরোধ করার ক্ষমতা গুণগত দিক দিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

রাজনীতিকে গভীরে নিয়ে যাচ্ছে আগামী দিনে সংগ্রামের পরিপূর্ণতা লাভ ক্রার জন্য। ওরা সব বাধা বিপত্তিকে সাহসের সহিত মোকাবিলা করে এগিয়ে চলছে মিজো জাতি সত্বার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাতে। ওরা আজ বুঝতে পারছে যে, চুড়ান্ত বিশ্লেষণে জাতীয় সংগ্রাম হচ্ছে শ্রেণী সংগ্রামেরই একটি সমস্যা। ওরা বুঝতে পারছে আজকে তাদের সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে কেবলমাত্র ছোট্ট মিজো পাহাড়ের বাস্তব অবস্থাকেই বিশ্লেষণ করলে চলবে না। ওরা আজ এজন্য বুঝতে পারছে দেশীয় পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মধ্যে যোগসুত্র রক্ষা করে এগিয়ে চলতে হবে। তাইতো য়্যাঙ্গায়া, থু-আয়া, রেমা, রোসাঙ্গী ও রাংচোয়াঙ্গা প্রভৃতিরা মৃতে্যু ভয় তুচ্ছ করে সশস্ত্র সংগ্রামের আদর্শকে বহন করে এগিয়ে চলছে। ওদের মনে প্রাণে এসেছে দৃঢ়তার নির্দেশ। এদৃঢ়তার নির্দেশই ওদেরকে এগিয়ে নিচ্ছে।