থিংডলের পাশে রাস্তা থেকে সামান্য দূরে দুর্গম জঙ্গলে ওৎপেতে রয়েছে রাংচোয়াঙ্গা তাঁর সহকর্মীদেরকে নিয়ে। মিলিটারী ভ্যাণ রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছে দেখেই রাংচোয়াঙ্গা নিজেকে সামলে রাখতে পারেনি। ভ্যানকে নিশানা করে ওর বন্দুক থেকে গুলি গুডুম্, গুডুম্ করে বেরিয়ে আসল। সাথে সাথে সহকর্মীরাও লক্ষ্য করে ছুড়ল। কয়েকটা গুলি ছুড়ার পর অপর পক্ষ থেকে সমানে ট্যাক ট্যাক করে গুলি ক্রমাগত বেরিয়ে আসতে লাগল।

— ওরে বাবা এযে দেখছি ভিমরুলের চাকে ঘা দিয়েছি।

— হু, ওরাতো সস্তাগুলি পেয়েছে তাই না থেমে সমানে ঝাড়ছে।

মনে হচ্ছে সমস্ত পাহাড়টাই ওরা ঝাঝড়া করে দেবে। বিস্তীর্ণ পাহাড় বিদীর্ণ করে সমান তালে ট্যাক ট্যাক আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ার মাঝে মাঝে দু’একটা গুডুম্, গুডুম্ শব্দ করে রাংচোয়াঙ্গাদের বন্দুক থেকে গুলি বেরিয়ে আসে। গুডুম্, গুডুম্ আওয়াজ শুনে শত্রু পক্ষ আরও ক্ষেপে যায়। তখন শত্রুবাহিনী তিন ভাগ হয়ে ওদের আস্তানাকে ঘিরে তিন জায়গা থেকে গুলি চালাতে থাকে। এমনি ভাবে অনেকক্ষণ গুলি চালিয়ে কিছু দম নেয়। তখন প্রতিপক্ষ থেকে ভেসে আসা আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। শুনা যায় March ahead. তিন দিক থেকে ওদেরকে ঘিরে ফেল। শত্রুপক্ষের সেনাবাহিনী যার যার অস্ত্র হাতে নিয়ে চার্জ করার ভঙ্গীতে এক পা এক পা করে এগিয়ে চলে জঙ্গলে ঘেরা রাংচোয়াঙ্গাদের পাহাড়ের দিকে।

— এই রে! বেটারা এবার আমাদেরকে ঘিরে ফেলতে এগিয়ে আসছে। একজন সহকর্মী বলল। সাথে সাথেই রাংচোয়াঙ্গা বলল, — ওদেরকে লক্ষ্য করে গুলি চালাও।

চারিপাশের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে আবার বন্ধুকের নল গর্জে উঠল গুডুম্, গুডুম্ করে। বন্দুকের গুলির আওয়াজ শোনার সাথে সাথেই শত্রু বাহিনীর সৈন্যগুলি থমকে দাঁড়াল। চার্জ করার ভঙ্গীতে এগিয়ে আসতে পারল না। ঝপ করেই মাটিতে উপুর হয়ে শুয়ে দিক বিদিক জ্ঞান হারিয়ে এক নাগাড়ে নিজ নিজ অস্ত্র থেকে ট্যাক ট্যাক করে গুলি চালিয়ে যেতে লাগল।

এমনিভাবে অনেকক্ষণ অতিক্রান্ত হওয়ার পর রাংচোয়াঙ্গা তাঁর সহকর্মীদেরকে নির্দেশ দিল পিছন দিকে গড়িয়ে চলতে। ক্রমাগত শত্রুবাহিনীর গুলির আওয়াজ সমস্ত পাহাড় অঞ্চল কাঁপিয়ে তুলল। অন্যদিকে ধীরে ধীরে রাংচোয়াঙ্গা ও তাঁর সহকর্মীরা পিছনে দুর্গম অঞ্চলে পিছিয়ে যেতে লাগল। রাংচোয়াঙ্গা এবং তাঁর সহকর্মীরা অনেকদূর চলে যাওয়ার পর তাঁদের পরিত্যক্ত অঞ্চলটির উপর চিরুণী অভিযান চলানোর জন্য শত্রু বাহিনী বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলল। সামরিক অফিসারের কড়া নির্দেশ। ওদেরকে ধরতেই হবে। একটি বাহিনী অফিসারের নির্দেশ পেয়ে বেহুস হয়ে যেতে যেতে একসময় খেয়াল হল যে ওরা পাহাড়ের গভীর জঙ্গলে ঢুকে পড়েছে। যূথভ্রষ্ট হয়ে নির্জন অরণ্যে ওরা খেই হারিয়ে ফেলেছে। চিরুণী অভিযান চালিয়ে বিদ্রোহী মিজোদের ধরা দূরের কথা এখন নিজেদেরকে বাঁচিয়ে জঙ্গল থেকে বের হয়ে আশাই মুশকিল। এধরনের অসহায় পরিস্থিতিতে জোয়ানদের মধ্যে দেখা দেয় ভীষণ হতাশার ভাব। আশঙ্কা এবং উৎকণ্ঠা মনে মনে বাড়তেই থাকে। এই বুঝি মিজোরা ঝাপিয়ে পড়ল। তার চেয়েও বড় ভয় জন্তু জানোয়ারের। ক্রমে ক্রমে রাত্রির করাল অন্ধকার জায়গাটাকে গ্রাস করতে থাকে।

জওয়ানগুলোও অজানা উৎকণ্ঠা নিয়ে অন্ধকারে একত্রে বসে পড়ে। সবাই ভীতসন্ত্রস্ত। অন্ধকারে আর কোথাও এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। সমস্ত রাত ভর এখানেই থাকতে হবে। তারপরও কি হবে সেটা অজানা। প্রভাত হওয়ার পূর্বে, রাত্রির অন্ধকার তখনও মিলিয়ে যায়নি, জোয়ানরা ঠিক করল এমনিভাবে বসে থেকে লাভ-নেই। এখনই উঠে রওয়ানা দেওয়া যাক। যদি কোন ভাবে রাস্তার হদিস পাওয়া যায়। এসব ভেবেই জোয়ানরা উঠে রওয়ানা দিল। জঙ্গলের মধ্য দিয়েই চুপি চুপি পথ করে অত্যন্ত সতর্ক ভাবে এগিয়ে চলল। কিছুদুর যাওয়ার পরই দেখল জঙ্গলের মধ্যে একটু ফাঁকা জায়গায় ছয় সাতজন শুয়ে বেদম ঘুমুচ্ছে।

জোয়ানরা ভাবল, এখন এই ছ’সাতজনকে যে ভাবেই হোক ধরে নিতে হবে। পথ হারা, দিশেহারা জোয়ানরা এসুযোগের সৎ ব্যবহার যদি করতে পারে তাহলে তাদের এ বিজয় অর্জনের গৌরব ছড়িয়ে পড়বে। পরমবীর চক্র না পেলেও বাহিনী নিশ্চয় কোন না কোন বকশিস থেকে বঞ্চিত হবে না। অজানা আশঙ্কা যখন মৃত্যুর কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল তখন এহেন সুযোগ পেয়ে কেন বিজয় অর্জনের গৌরব থেকে বঞ্চিত হবে? ধীরে ধীরে সমস্ত জোয়ানরা অত্যন্ত সতর্ক হয়ে নিজেদেরকে বৃত্তাকার করে হঠাৎ ঘুমের মধ্যেই সাতজনকে ধরে ফেলল। হুড়মুড় শব্দে ঘুম ভেঙ্গে চেতনা ফিরে সাতজন মিজো বিদ্রোহী দেখল ওরা শত্রুদের হাতে পুরাপুরি বন্দী হয়েছে।

রাংচোয়াঙ্গা তাঁর সহকর্মীদেরকে নিয়ে দীর্ঘ ৪/৫ ঘণ্টা যাবত লড়াই চালিয়ে শত্রুবাহিনীদের গতিপথ প্রতিহত করে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে পিছু হটে এসে এ জায়গাতেই নিশ্চিন্তে বসে পড়েছিল। সারা দিনের ক্লান্তি সমস্ত দেহকে অবসন্ন করে দিয়েছিল। আর এগোতে পারছিল না। রাত্রিতে এখানে বসে ভাবছিল পরদিন প্রভাতের প্রথম আলোর স্পর্শেই ওরা এ অঞ্চল ছেড়ে অন্যত্র চলে যাবে। কিন্তু ক্লান্তিতে ভরপুর সমস্ত দেহকে ভর করে এমন ঘুম এসেছিল যে রাংচোয়াঙ্গা ও তাঁর সহকর্মীরা কিছুই টের পায়নি। দল ছুট হয়ে পথভুলে যারা প্রতিটি মুহূর্তে মৃত্যুভয়ে ভীত ছিল তাঁদের হাতেই শেষ পর্যন্ত রাংচোয়াঙ্গা ও তাঁরসহকর্মীদেরকে বন্দী হতে হল। এ এক নিদারুণ অঘটন। আস্তে আস্তে পূর্বদিগন্তে লাল আলোর ছটা ছড়িয়ে সূর্য উকি দিল। সমস্ত অরণ্য অঞ্চল থেকে আবছায়া অন্ধকার বিলীন হয়ে গেল। জোয়ানরা অপ্রত্যাশিত ভাবে সাতজন বিদ্রোহী মিজোকে বন্দী করে নিয়ে হাটতে লাগল। তখনও ওরা জানে না সঠিক রাস্তা কোনটা। কোন দিকে গেলে ভালো হয়। সময় এগিয়ে চলে। পূর্বদিগন্তে তখন আর লাল আলোর ছটা নেই। সূর্যের কিরণ ধীরে ধীরে প্রখর হয়ে উঠছে। সময়ের সাথে সাথে তালে তাল মিলিয়ে জোয়ান্নাও চলছিল। হঠাৎ দূর থেকে ভেসে আসে গাড়ীর আওয়াজ। আওয়াজ খেয়াল রেখেই জোয়ানরা এদিক সেদিক এগিয়ে চলল। অবশেষে একটি টিলার উপর থেকে দেখা গেল সামান্য দূরেই নিচে বড় রাস্তা চলে গেছে। রাংচোয়াঙ্গা ও তাঁর সহকর্মীদেরকে মাঝখানে রেখে লাইন দিয়ে এক এক করে টিলা থেকে নেমে জোয়ানরা সদর রাস্তায় চলে এল। কিছুক্ষণ পরেই রাস্তা দিয়ে কয়েকটা মিলিটারী ভ্যান আসায় সেগুলিতে উঠে জোয়ানরা বন্দী মিজো বিদ্রোহীদেরকে নিয়ে সগৌরবে ক্যাম্পে চলে গেল।

সেমা তাঁর সহকর্মীদেরকে নিয়ে বাইরেংটির নিকট গিয়ে রাংচোয়াঙ্গাদের মতই শত্রুবাহিনীকে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালায়। কিন্তু শত্রুবাহিনীর বিপুল বেপরোয়া পাল্টা আক্রমণে নিজেদেরকে সামলাতে না পেরে বাধ্য হয়েই পশ্চাদাবসরণ করে। বাইরেংটির পাশ থেকেই জঙ্গলের ভিতর দিয়ে রাস্তা ধরে উত্তর-পূর্ব দিকে এগিয়ে চলে। বারে বারে বিদ্রোহীদের আচমকা আক্রমণে নিজেদের প্রচুর ক্ষয় ক্ষতি হওয়ার ফলেই নিরাপত্তা বাহিনী নিজেদেরকে আরও সুসংহত করেছিল। ব্যাপক ভাবে শক্তি নিয়োগ করেছিল বিদ্রোহীদের পুরোপুরি ভাবে জব্দ করতে। শত্রুবাহিনীর বিপুল সৈন্যবাহিনী এবং প্রচুর যুদ্ধ সামগ্রীর সামনে কয়েকটি বিদ্রোহী মিজো যুবক সামনা সামনি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অর্থই হচ্ছে নিজেদেরকে তোপের মুখে ঠেলে দেওয়া। সেটা বিবেচনা করেই সেমা তাঁর সহকর্মীদেরকে নিয়ে রণভঙ্গ দিয়ে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে উত্তর পূর্ব দিকে ক্রমাগত সরতে থাকে। এমনিভাবে দীর্ঘপথ অতিক্রান্ত করে দুদিন পর যখন একটি টিলার উপর এসেছিল তখন সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসছিল। ক্ষুধার জ্বালায় পেটের সমস্ত নাড়ীভুড়ি এক হয়ে যাচ্ছিল।

টিলাটার পাশ দিয়েই রুকণী নদী বয়ে চলেছে। নদীরস্রোত বেশী না হলেও ঝির ঝির শব্দ করে জল গড়িয়ে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছিল। সেমা এবং অন্যান্য সহকর্মীরা সেই নদীতে নেমে এসেই কিছু জলপান করে নিজেদেরকে চাঙ্গা করল। তারপর একত্রে সবাই মিলে সেই টিলার উপরই গিয়ে বসে পড়ল। জল গড়িয়ে বয়ে যাওয়ার কুলকুল ধ্বনি এবং পাহাড়ে বিভিন্ন পাখীর কাকলী মিলে একটা নূতন শব্দ তরঙ্গের সৃষ্টি করেছিল যা নাকি সেই প্রাকৃতিক পরিবেশে অত্যন্ত মনোরম লাগছিল। সেই মনোরম পরিবেশে বসে বসেই সেমা এবং তার সহকর্মীরা ভাবতে লাগল কি করা যায়। ওদের সাথে লড়তে না পেরে তো অনেকদুর ছিটকে এসেছি। এখন সকাল সকাল মূল বাহিনীর সাথেও যোগাযোগ করতে মুশকিল হবে।

— হ্যাঁ, যেভাবে এখানে মিলিটারী এনে ছাড়া হয়েছে। তাতে মনে হচ্ছে সারা দেশের সব মিলিটারী আমাদেরকে খতম করার জন্য আনানো হয়েছে।

— বেটারা একটু পরে পরেই ক্যাম্প বসিয়েছে। খুব সতর্ক হয়ে চলাফেরা না করলে ওরা আমাদেরকে ধরে ফেলতে পারে।

— যাতে ধরতে না পারে সেজন্য আর বড় রাস্তার দু’মাইলের ধারে কাছে দিয়ে যাওয়া নয়। কষ্ট হলেও ঘুরে গভীর জঙ্গলে দিয়ে যেতে হবে। সময় তাতে বেশী লাগলে ও ক্ষতি নেই।

— কিন্তু ঘুরে যেতে গেলে রসদের কি হবে? এখনই ত পেটের সমস্ত নাড়িভুড়ি ক্ষুধার জ্বালায় এক হয়ে গেছে।

রসদের কি হবে? এ প্রশ্নটাই হল সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। Place of operation থেকে অনেকদূর সরে আসার ফলে সাময়িক ভাবে যোগাযোগ রক্ষাকারী বাহিনী থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ফলে রসদ যোগানোর সমস্যাটাই হচ্ছে সবচেয়ে প্রধান। যোগাযোগ রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সংযোগ না হলে রসদ পাওয়া যাবে না। অথচ এখন শীঘ্র সংযোগ স্থাপন করাটাও সম্ভব নয়। যে ভাবেই হোক এখন নিজেদেরকে রসদ সংগ্রহ করতে হবে। সূর্য মধ্যি আকাশে উঠার তখনও বেশ বাকি। ধীরে ধীরে পাখীর কাকলী মিলিয়ে গেছে। কিন্তু রুকণীর জল বয়ে যাওয়ার কুলকুল ধ্বনি ঠিকই ভেসে আসছে। অনেকক্ষণ আলাপ আলোচনার পর সেমা এবং অন্যান্যরা সেই নদীর পার ঘেসে ধীরে ধীরে হেটে নিচে নেমে আসে। কিছুক্ষণ চলার পরই দেখা গেল নদীটা যে দিকে বয়ে সমতলে চলে গেছে তার অপর পাশেই কয়েকটা ছোট ছোট ঘর নিয়ে একটি গ্রাম। আশে পাশেই ক্ষেত এবং গরু ছাগল চরে ঘাস খাচ্ছে। গ্রামটি হল তুলারতল। মিজো পাহাড় থেকে রুকণী নদী বয়ে এসে এ গ্রামটির পাশ দিয়েই চলে গেছে। ফরেষ্ট রিজার্ভের অর্ন্তভূক্ত এই গ্রামটিই কাছাড় জেলার সর্বশেষ সীমান্তে অবস্থিত। সে জায়গায় নদীটিই কাছাড় ও মিজো পাহাড়ের সীমারেখা নির্দেশ করেছে। ফরেষ্ট রিজার্ভ অর্ন্তভূক্ত শেষ গ্রাম তুলারতলের শেষ বাড়ীটির সীমানা যেখানে শেষ হয়েছে সেখানেই রুকণীনদী পার হয়ে যে জায়গাতে প্রথম পদস্পর্শ করতে হয় সেটা মিজো পাহাড়েই অবস্থিত। যদিও গ্রামটি কাছাড় জেলার শেষ সীমান্তে অবস্থিত তবুও বর্তমান যুগের যানবাহন ব্যবস্থা সেখানে অচল। অন্ততপক্ষে সাতমাইল দূর থেকেই যন্ত্রচালিত চক্রযানকে সেলাম ঠুকতে হয়। এখানকার অধিবাসীদেরকে পায়ে হাটার আদিম এবং অকৃত্রিম পদ্ধতিই অবলম্বন করে ফরেষ্টের মধ্য দিয়ে চলাচল করতে হয়। রুকনী নদীর পারে মিজো সীমানাতেই দাঁড়িয়ে সেমা ও তাঁর সহকর্মীরা নদীর অপর পারের ছোট্ট গ্রাম খানি দেখছিল। এই গ্রামে গিয়ে যদি জনগণকে বলা হয় কিছু রদস দিতে তাহলে কি রকম হয়। মনে মনে ভাবছিল। আসি।

— চল না ওপারে গিয়ে গ্রামের অধিবাসীদের কাছ থেকে কিছু রসদ চেয়ে নিয়ে

— ওরা আমাদেরকে দেবে কি?

— না দিলে ফিরে চলে আসব।

— কিন্তু ওরা যদি আমাদেরকে শত্রু মনে করে আটকে রাখার চেষ্টা করে, তাহলে?

— না সে রকম কিছু হলে আমাদের আগ্নেয়াস্ত্র আছে। আমরা আমাদের আগ্নেয়াস্ত্রই স্মরণ করব। এ বলেই সেমা তাঁর বাহিনীকে নিয়ে নদী পার হয়ে তুলারতল গ্রামে অবতরণ করল। সাতজন বন্দুকধারী মিজো এক এক করে লাইন ধরে গ্রামের মধ্যে এসেছে দেখেই গ্রামবাসীদের মধ্যে সাড়া পরে গেল। সরকারের প্রচারযন্ত্রের সৌজন্যে বিদ্রোহী মিজোদের কাহিনী সম্বন্ধে এলাকার সকলেরই নানান ধরণের অনেককিছু জানার সৌভাগ্য হয়েছিল। মিজো এসেছে, মিজো এসেছে। বাঁচতে হলে এখানে আর থাকা যাবে না। পালাও পালাও রব গ্রামের চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পিছন ফিরে না তাকিয়ে বুড়া বুড়ি, বাচ্চা জোয়ান সবাই ছুটছে উত্তরের দিকে। এখান থেকে পালিয়ে না গেলে আর উপায় নাই। যেতে যেতে পাশের গ্রাম গুলিতেও একই বার্তা রটনা করে চলল। নিমিষের মধ্যেই তুলারতল গ্রামখানি ফাঁকা হয়ে গেল। তারপর বাগেওয়ালা বস্তী। প্রাণের ভয়ে সবাই সে অঞ্চলের মঙ্গলময় অধিকর্তা হাওয়াইতাং বিট অফিসের সাহেবের কাছে চলল। গ্রামে ঢুকতেই এধরণের এক অভাবনীয় পরিস্থিতির উদ্ভব হবে সেটা সেমারা ভাবেনি। যা হোক লোকগুলো প্রাণের ভয়ে পালিয়েছে। আপাততঃ তাদের কাছ থেকে কোন বাধা পাওয়ার প্রশ্নই উঠে না। সেমা ভাবল এখন ওরা নিশ্চয়ই কোন তৃতীয় শক্তির কাছে নিজেদেরকে সমর্পণ করবে। তাদের দৌলতেই প্রশাসনিক ব্যবস্থা বহাল রাখার পয়লা নম্বর হাতিয়ার পুলিশ মিলিটারি আসবে এ অঞ্চলে মিজো প্রতিরোধ করতে। অবশ্য ততক্ষণে কিছু রসদ যদি পাওয়া যায় তা নিয়েই কেটে পরা যাবে।

সেমা তাঁর সহকর্মীদেরকে বলল ঘটনা যখন এভাবে এগিয়ে চলছে তাহলে আমরা আর খালি হাতে ফিরে যাব কেন? চলো দেখি ওদের বাড়ীতে কিছু পাওয়া যায় কিনা?

— সেই ভালো যা কিছু পাওয়া যায় তা নিয়ে চলো। সাতজন বিদ্রোহী মিজো গ্রামে বাঁশ দিয়ে ঘেরা ছনের ছাউনি দেওয়া ছোট ছোট ঘর গুলির ভিতর গিয়ে এক এক করে খুঁজতে লাগল। কিন্তু হা হতোস্মি। নেওয়ার মতো কিছুই নাই।

খুঁজতে খুঁজতে হয়রান একজন সহকর্মী বলল-দুর এদের অবস্থা দেখেছি আমাদের চেয়েও খারাপ।

— হ্যাঁ ঘরের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে লোকগুলি বোধ হয় হাওয়া খেয়েই বেঁচে থাকে।

সমস্ত তুলারতলে ঘরগুলি খুজে যা দেখল তাতে মনে হলো ওরা এতক্ষণ শুধু শুধুই হয়রান হয়েছে। তাই কিছু দূর এগিয়ে ওরা বাগেওয়ালা বস্তীতে গেল। সেখানেও সেই একই অবস্থা। তাই তারা ভাবল এভাবে এগিয়ে আর লাভ নেই, বরং নিরাপত্তার দিকে ক্ষতি হতে পারে। সেজন্যই সাতজন বিদ্রোহী মিজো এবাউট টার্ণ করে যেদিক দিয়ে এসেছিল সেদিকে মুখ ফিরিয়ে এগিয়ে চলতে লাগল। যাওয়ার সময় তুলারতল গ্রামে দেখল কয়েকটা গরু বাছুর মাঠে চরছে। ওরা সাধারণ প্রাণী বলেই হয়ত সরকারী প্রচার যন্ত্রের সাহায্যে প্রচারিত বিদ্রোহী মিজোদের কার্য কাহিনী শুনতে পারেনি। তাই ওরা নির্ভয়ে মাঠে চরে বেড়াচ্ছিল। গরু বাছুর গুলিকে দেখে সেমা ভাবল ওদেরকে দিয়েই মিজো বিদ্রোহী বাহিনীর কিছু রসদ জোগাতে হবে। গ্রাম ছেড়ে মিজো জেলাতে প্রবেশ করার প্রাক্কালে দু’তিনটে গরু বাছুড় ধরে ফেলল এবং সেগুলিকে টেনে হেছড়ে সেমা তার সহকর্মীদেরকে নিয়ে গভীর জঙ্গলের দিকে এগিয়ে চলল।

হাওয়াইতাং বিট অফিসে বাবু আরাম করছিল এমন সময় দেখা গেল কাতারে কাতারে বুড়াবুড়ি জোয়ান বাচ্চা সবাই মিছিল করে আসছে। আসতে দেখেই বাবু সাহেব মনে মনে ভাবল ওরা আবার এক সাথে আসছে কেন? বেগার খাটার দিন কমিয়ে দেওয়ার জন্য না অন্য কোন দাবী নিয়ে আসছে! না ওদেরকে দেখে তা মনে হচ্ছে না। সবার মুখে একটা ভীতির ভাব রয়েছে। সবাই ভীত সন্ত্রস্ত। বাবু আরাম কেদারা ছেড়ে দিয়ে বাবুর মত এসেই ওদেরকে জিজ্ঞেস করল।

— কি হয়েছে? তোমারা এভাবে মিছিল করে আসছ কেন? দলের মধ্যে থেকে দু’একজন মাতব্বর আগ বেড়ে বাবুকে বলল

— বাবু, মিজোরা এসে আমাদের গ্রামে হামলা করছে।

— মিজোরা?

— হ্যাঁ বাবু, বিদ্রোহী মিজোরা এসে আমাদের গ্রাম লুঠ করতে আরম্ভ করেছে।

— তা কতজন মিজো এসেছে?

— তা হবে বাবু অনেক। সবাই বন্দুক উচিয়ে আওয়াজ দিতে দিতে আসছে।

— কোন দিকে এল?

— ঐত বাবু জঙ্গল থেকে রুকণী নদী পার হয়ে এসেছে। হয়ত এত সময়ে আমাদের ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে ছারকার করে দিয়েছে।

সর্বনাশের কথা। বিদ্রোহী মিজোরা যদি তুলারতল বাগেওয়ালা বস্তীতে হামলা চালিয়ে থাকে তাহলে ত অতি শীঘ্র এখানে এসে যাবে। তাহলে উপায়? বাবুসাহেবকে খবরটা অত্যন্ত বেসামাল করে দিল। তাড়াতাড়ি যে ভাবে হোক একটা ব্যবস্থা করতে হয়। সদর অফিস শিলচরে খবর পৌঁছে দিতে হয়। বাবু সাহেব ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে চললেন ব্যবস্থা করার জন্য অর্থাৎ খবর পৌঁছে দিতে।

— হ্যালো, স্যার?

— হ্যালো, কি হয়েছে?

— স্যার, মিজোরা এসে আক্রমণ করছে, স্যার।

— মিজোরা?

— হ্যা স্যার, মিজোরা।

— মিজোরা কোথায় আক্রমণ করছে?

— স্যার, বিদ্রোহী মিজোরা আমাদের তুলারতল বাগেওয়ালা বস্তীতে এসে আক্রমণ করছে। — তুলারতল বাগেওয়ালা বস্তী কোথায়?

— আমাদের হাওয়াইতাং ফরেষ্ট বীটের আণ্ডারে স্যার তুলারতল বাগেওয়ালা বস্তী।

— তা মিজোরা কিরকম আক্রমণ চালিয়েছে?

— স্যার, বস্তীতে ঢুকে বেদড়ক গুলি চালাচ্ছে আর সমস্ত ঘর বাড়ী পুড়িয়ে দিচ্ছে স্যার।

— লোকজনকে হত্যা করছে নাকি?

— তা হবে বোধ হয়, স্যার। তবে কতজন বলা যাবে না, স্যার। তুলারতল বাগেওয়ালা বস্তীর সমস্ত লোক এসে হাওয়াইতাং এসে জড়ো হয়েছে, স্যার। বোধহয় মিজোরা আমাদের এদিকে আর ও এগিয়ে আসছে।

— আচ্ছা তাহলে আমি এখন করব কি?

— তা আপনাকে খবরটা জানালাম, স্যার। একটা ব্যবস্থা করুন স্যার। আমাদের এখানে ভীষণ অবস্থা স্যার।

— আচ্ছা, আমি কর্তৃপক্ষকে জানাচ্ছি। আচ্ছা স্যার, আচ্ছা। ফোনটা রেখে দিয়ে বিট অফিসার মনে মনে ভাবল, যাক বাবা খবরটা সদর অফিসের বড়বাবুর কাছে পৌঁছে দিয়েছি। এখন একটা নিশ্চয়ই ব্যবস্থা হবে। অবশ্য খবরটা দিয়ে ও স্বস্তি পাচ্ছে না। প্রতিটি মুহুর্ত্তই উৎকণ্ঠা নিয়ে কাটাচ্ছে।

যাহোক আমলা তন্ত্রের কার্যপদ্ধতি এবং নীতি পুরোপুরি ভাবে অনুসরণ করে শেষ পর্যন্ত খবরটা নিরাপত্তা বিভাগে গিয়ে পৌঁছল, তখন অবশ্য অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে জনগণের মনোবল অটুট এবং বিদ্রোহী মিজোদের মোকাবিলা করার জন্যই বাহিনী চলে এল ময়দানে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা বহারম্ভে লঘুক্রিয়ার মতোই হল। বাগেওয়ালা বস্তীতে অগ্নি সংযোগ লুঠতরাজ প্রভৃতি ঘটনার কোন নিদর্শনই পাওয়া যায় নি। অবশ্য পরে তুলারতল বস্তীতে গরুর পরিসংখ্যান যখন নেওয়া হয় তখন দেখা গেল পুর্বের চেয়ে কয়েকটা কমে গেছে।

এ ঘটনার পর “সাবধানের মোর নেই” এই কথা মনে করেই বোধ হয় নিরাপত্তা বাহিনী বাগেওয়ালা বস্তীতে একটা স্থায়ী মিলিটারী ক্যাম্প বসিয়েছে। ক্যাম্পের চারিদিকে পরিখা খনন করে রেখেছে এবং একটি প্রায় পঞ্চাশ ফুট উচু মাচানের মধ্যে ঘর তৈরি করে সেটাতে সব সময়ই একজন অতন্দ্র প্রহরী বসিয়ে রাখে। এটা স্থাপন করার পর কোন অতন্দ্র প্রহরী হাওয়া খাওয়া এবং দূরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ক্রমপরিবর্তন রূপ দেখা ছাড়া কোন বিদ্রোহী মিজোর টিকি দেখেছে বলে মনে হয় না।