পশ্চিম দিগন্তে সূর্য ক্রমশঃ ঢলে পড়ছে। য়‍্যাঙ্গায়া, জিটিঙ্গা এবং আরেকজন সহকর্মী পাহাড়ের দুর্ভেদ্য জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে তৈরি আঁকা বাঁকা সর্পিল রাস্তা দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে। দূরে পাহাড়ের চুড়ায় সূর্যরশ্মি বিভিন্ন ভাবে ছড়িয়ে রয়েছে। মূহুর্তের মধ্যে সেগুলির রং পরিবর্তন করে ক্রমাগত ফিকে হয়ে আসছে। রাত্রির অন্ধকার গ্রাস করার আগেই তাঁদেরকে সাইলো পুঞ্জিতে গিয়ে পৌঁছতে হবে। জিটিঙ্গা প্রথমে ভেবেছিল দীর্ঘদিন বিদেশে বাস করার ফলে হয়তবা য়‍্যাঙ্গায়ার এই দুর্গম পথে চলতে অসুবিধা হবে। কিন্তু বস্তুতপক্ষে য়‍্যাঙ্গায়া ওদের সাথে ঠিক ভাবেই পাল্লা দিয়ে এগিয়ে চলছে। ওর চোখে মুখে বাড়তি কোন ক্লান্তিকর ছাপ ফুটে উঠেনি। তালে তালে পা ফেলে এগিয়ে চলছে সাইলো পুঞ্জির আস্তানায়।

জেনারেল থু-আয়া, জায়চোয়াঙ্গা, রেমা এবং প্রত্যেক অঞ্চল থেকেই অন্যান্য সহকর্মীরা আগে থেকেই এসে জড় হয়েছে। এই জমায়েত অনেকটা পার্টিতে এটেন্ড করার মতই। এটা বিদ্রোহী মিজোদের নূতন ধরণের পার্টি। প্রতিপক্ষ শত্রু বাহিনীর সাথে ক্রমাগত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে যারা দৈনন্দিন সংগ্রামে জড়িত আছে তাদেরকে নিয়ে যে সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে তার মধ্যেই মাঝে মাঝে কর্মের ফাঁকে যে আনন্দ উৎসবের প্রয়োজন দেখা দেয় সেটার তাগিদেই তাদের এধরণের পার্টির আয়োজন। সামরিক কেউকেটা বা অন্যান্য যারা পার্টিতে যোগ দিয়ে থাকে তাদের থেকে স্বাভাবিক ভাবেই বিদ্রোহী মিজোদের পার্টিতে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্য ভিন্ন স্বাদের এবং ভিন্ন নমুনার। সংগ্রামী অভিযান চালিয়ে বিগত দিনে যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছে সেগুলির বিনিময় এবং আগামী দিনে যে কর্মসূচীকে রূপ দেওয়া হবে সে গুলিই আলোচিত হয়ে থাকে এই নূতন ধরণের পার্টিতে।

আস্তানায় এসে যাঁরা জমায়েত হয়েছে তাঁরা সবাই সবাইকে চিনে। একমাত্র ব্যতিক্রম য়‍্যাঙ্গায়া। যারা পূর্বে খবর পেয়েছিল যে য়‍্যাঙ্গায়া এসেছে অথচ কোনদিন দেখেনি তারা নূতন মানুষটিকে দেখেই বুঝে ফেলল যে সে য়‍্যাঙ্গায়া। সবাই য়‍্যাঙ্গায়াকে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানাল এবং তাঁর উপস্থিতিতে আনন্দ অনুভব করল। কিন্তু সবার আনন্দকে উপেক্ষা করে রেমা তাঁর কৈশোর এবং যৌবনের প্রারম্ভ পর্যন্ত একপ্রাণ একমনে গাথা বন্ধুকে পেয়ে জড়িয়ে ধরল। আলিঙ্গন করে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকল। সে আনন্দে দিশেহারা হয়ে কিছুই বলতে পারল না। কেবল চোখ দিয়ে টপ টপ করে কয়েক ফোটা আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ল। য়‍্যাঙ্গায়া সহজে ভাবাবেগে উদ্বেলিত হয় না, কিন্তু এই মূহুর্তে পুরানো বন্ধুর অকৃত্রিম ভালোবাসা ওকে কিছুটা কাবু করে ফেলল। তবুও সে নিজেকে সংযত করে বন্ধুকে টেনে নিয়ে ঘরের মধ্যে মাচানের উপর পাশাপাশি বসল। ঘরের মধ্যিখানে উপর থেকে দড়ি ঝুলিয়ে একটা লণ্ঠন টাঙানো হয়েছিল। সেটার টিম টিম আলোই সেই পরিবেশে যথেষ্ট আলো ছড়াচ্ছে। জেনারেল থু-আয়া, জায়চোয়াঙ্গা, জিটিঙ্গা এবং আরও কয়েকজন সহকর্মী রেমা এবং য়‍্যাঙ্গায়ার পর ঘরের ভিতরে মাচানের উপর আসন গ্রহণ করল। কেবলমাত্র চারজন সহকর্মী বাইরে থাকল। তাদের মধ্যে দুজন পাশের ছোট্ট একটা খুপরীতে রাত্রির আহারের ব্যবস্থা করবে এবং অন্য দুজন টহল দিবে। যদিও নিরাপত্তা বাহিনীর কেহই আঁচ করতে পারবে না যে এখানে বিদ্রোহী মিজোদের আড্ডা বসেছে তবুও কৌশল হিসাবে নিরাপত্তার দিক লক্ষ্য রেখেই এ ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে। রেমা পকেট থেকে বাইলো বের করে য়‍্যাঙ্গায়াকে দিল। অনেকদিন পর বাইলো পেয়ে য়‍্যাঙ্গায়া বেশ খুশিই হলো। বিদেশে থাকাকালীন অবস্থায় সিগারেটই খেয়েছে। প্রথম প্রথম বাইলোর জন্য ভীষণ তেষ্টা পেত। পরে অবশ্য আর ততটুকু অসুবিধা হয়নি। বাইলো ধরিয়ে ধুয়া ছাড়তে ছাড়তে য়‍্যাঙ্গায়ার মনে পুরানো কথা ভেসে উঠল। শিলং এ থাকাকলীন অবস্থায় কলেজের পাশেই একটি চায়ের দোকানে বসে বসে যখন য়‍্যাঙ্গায়া বাইলো খাচ্ছিল তখন একটি সহপাঠী বাঙ্গালী ছাত্র য়‍্যাঙ্গায়াকে বলেছিল,

— Hello Mr., what brand of cigarette are you smoking? তখন য়‍্যাঙ্গায়া ঐ ছেলেটিকে বলেছিল

— This is our native brand. We call it Bailoo, this is made of a special kind of tobacco which grows plenty in our Mizo Hills.

— What a nice smell is coming out of it! Will you please offer me one?

— Why not! you take more than one, এই বলেই সহপাঠীকে দু’ তিনটা বাইলো এগিয়ে দিয়েছিল। ছেলেটি অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে বাইলোগুলি খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছিল। কিভাবে দলিয়ে গুড়িয়ে মিক্সারের মতই পত্রিকার কাগজে মুড়ে তৈরি করা হয়েছিল। কলেজের ঐ সহপাঠীর মত অনেককেই অনেকবার এই বাইলো সম্পর্কে য়‍্যাঙ্গায়াকে বলতে হয়েছে।

রেমা শুধু য়‍্যাঙ্গায়াকে বাইলো দিয়েছে এবং নিজে ধরিয়ে সুখটান দিচ্ছে সেটা দেখে জিটিঙ্গা সহ্য করতে পারলো না। সে এমনিতে বেশী খায় না কিন্তু সামনে অন্যকে খেতে দেখলে ওর সহ্য হয় না। প্রচণ্ডভাবে যেন ওকে নেশায় চেপে ধরে। তাই সে রেমাকে বলল - কিহে, তুমি আর তোমার বন্ধু খেলেই হল! আমাদের নেশা নেই? দাও দাও। আমাদেরকে দাও। এই বলে সে প্রায় কেড়েই রেমার বাইলো গুলো টেনে নিল এবং এক এক করে জায়চোয়াঙ্গা এবং সবাইকে দিল। ঘটনাটা এমনিভাবে করল যে সবাই খুব মজা পেল এবং রেমাকে বেওকুফ বানিয়ে দিল। সবাই মজা পেয়েছে এবং হাসছে দেখে রেমাও হাসল। কিন্তু তার হাসিটা বোকার মতই দেখাচ্ছিল।

এভাবে বেশ কিছু সময় কেটে যাওয়ার পর জেনারেল থু-আয়া আনুষ্ঠানিক ভাবে আড্ডার কাজ শুরু করে দিলেন। প্রথমেই সে য়‍্যাঙ্গায়া সম্বন্ধে বলতে আরম্ভ করল। যদিও অনেকেই য়‍্যাঙ্গায়ার অতীত এবং বর্তমানে এখানে আসার উদ্দেশ্য কি সেটা মোটামোটি জানে তবুও থু-আয়া রীতি অনুয়ায়ী প্রকাশ্য এই আড্ডাতে সবাইকে বলল যে যদিও য়‍্যাঙ্গায়া প্রত্যক্ষভাবে আমাদের সশস্ত্র সংগ্রামে যোগ দেন নি তবুও তিনি আমাদের একজন এবং এখন থেকে সে আমাদের সশস্ত্র সংগ্রামের একজন প্রকৃত সংগ্রামী। আমাদের সংগ্রামের সে অংশ বিশেষ। আমাদের পথ এবং তাঁর পথ এক এবং অভিন্ন।

এগুলি বলে থু-আয়া য়‍্যাঙ্গায়ার দিকে ফিরে চাইল এবং তার সম্মতি সূচক মুখের ভাব দেখে হাসল। সে আবার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে সবাইকে বলল, আমি য়‍্যাঙ্গায়া সম্বন্ধে এইটুকুই বললাম। তিনি পরে তার নিজস্ব বক্তব্য বলবেন। এখন আমরা আমাদের অতীত দিনের ঘটনাগুলির উপর আলোচনা এবং মতামত ব্যক্ত করব।

জেনারেল থু-আয়ার পর জায়চোয়াঙ্গা তাদের ডিভিশনের বিভিন্ন প্লেটুন এমবুশ করে যে সমস্ত আক্রমণ চালিয়েছিল সে গুলির জয়ের কাহিনী এক এক করে ব্যক্ত করতে লাগল। সে বলল, — আমরা যতদিন এমবুশ করে আক্রমণ চালিয়েছি সেগুলির মধ্যে জেনারেল থু-আয়ার নেতৃত্বে এমবুশ করে যে আক্রমণ চালিয়েছিলাম সেটাই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। পাঁচটা মিলিটারী বোঝাই ভ্যাণের মধ্যে সবটাই আক্রমণের শিকার হয়েছিল। এবং সেগুলো থেকে কিছু অস্ত্রশস্ত্র ও আমরা কুড়িয়ে নেই। এছাড়া বাকী সবগুলি তেমন জোরদার হয়নি।

জায়চোয়াঙ্গা একথাগুলো বলেই সে তার বক্তব্য শেষ করল। তারপর জিটিঙ্গা তাঁর বক্তব্য পেশ করতে শুরু করল। সে বলল, আমাদের সশস্ত্র বাহিনী যেভাবে লড়ে যাচ্ছে তাতে ক্ষয় ক্ষতির চেয়ে আমাদের জয়ই হচ্ছে বেশী। তার ফলস্বরূপ নিরাপত্তা বাহিনীর কর্তাব্যক্তিরা ক্ষেপে গিয়ে দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে। তাই শহরের আশে পাশে বসতকারীদেরকে ধর পাকড় করছে। এখন যারা এমনি সাধারণভাবে জীবন যাপন করছে তাদের অবস্থা দুঃসহ হয়ে উঠছে। কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ এসে সমস্ত পুঞ্জী ঘেরাও করে M.N.F এর ভলান্টিয়ার্স বলে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে। বৃদ্ধ, বার তের বছরের ছেলে, গর্ভবতী মেয়েছেলে পর্যন্ত রেহাই পাচ্ছে না। ওদের ধারণা সব মিজোই কোন না কোন ভাবে সরকারকে উপেক্ষা করে বিদ্রোহীদের মদত দিচ্ছে। তাছাড়া নিরাপত্তা বাহিনীর কর্তা ব্যক্তি থেকে আরম্ভ করে সাধারণ সৈনিকরা পর্যন্ত মিজো মেয়েদের উপর অকথ্য বর্বর পাশবিক অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে।

জিটিঙ্গার কথাগুলো শুনতে শুনতে সবারই মনে প্রচণ্ড প্রতিহিংসার কঠোর মনোভাব জেগে উঠেছিল। ওদের চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল সেই নিরাপত্তা বাহিনীর সৈনিকদের অকথ্য অত্যাচার। ওরা দেখতে পাচ্ছিল বর্বর পশুদের খপ্পরে পড়ে অসহায় ষোড়শী মিজো মেয়ের করুণ আর্তনাদ। অশীতিপর বৃদ্ধ, যুবার উপর সামরিক কর্তাব্যক্তিদের অমানুষিক অত্যাচার। এগুলো যতই ওদের মনে ভেসে উঠছিল ততই শরীরের প্রতিটি শিরা উপশিরা অনুরণিত হচ্ছিল এবং মনে এক তীব্র জীঘাংসার ভাব চাড়া দিয়ে উঠছিল। ওরা ভাবছিল

— না, এর প্রতিশোধ আমরা নেবই নেব। যত বাধা বিপত্তিই আসুক না কেন।

রেমাও ভাবছিল। সে নিজেকে ভাবনা থেকে ছিন্ন করে সমস্ত ঘরের নীরবতা ভঙ্গ করে বলল, — আমরা আমাদের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি। আর ওরা? ওরা দেশের সার্বভৌমত্ব এবং অখণ্ডতা বজায় রাখতে আইন শৃঙ্খলার যথারীতি প্রয়োগ করছে।

— আইন শৃঙ্খলার যথারীতি প্রয়োগের নমুনা আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। জিটিঙ্গা বলল। – হ্যাঁ আইন শৃঙ্খলার মর্যাদা রাখতে গিয়েইত পবিত্র সরকারের বাহিনী মিজো মেয়েদেরকে দৈহিক অত্যাচার করে। বুড়ো মিজোর হাত পায়ের হাড় দলিয়ে গুড়িয়ে দেয়। বিভিন্ন পুঞ্জীকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়।

এতসময় জেনারেল থু-আয়া মনোযোগ দিয়ে কথাবার্তা শুনছিল। এবার সে মুখ খুলল। বলল, — ওরা আমাদের মা, ভাই, বোনদের উপর যে অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে সেটাই স্বাভাবিক। যতদিন যাবে ততই ওরা আরও বেশী ক্ষেপে যাবে। একটা জাতি যখন জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়ে তখন স্বাভাবিক ভাবেই শাসকগোষ্ঠী সেটাকে দমন করতে যেকোন ব্যবস্থা অবলম্বন করে। সেই ব্যবস্থা যত বীভৎসই হোক না কেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ইতিহাসে তাই দেখা গেছে। আমাদের সংগ্রামকে আমরা যত এগিয়ে নেব ওরাও আমাদেরকে দাবিয়ে দিতে ততবেশী মরীয়া হয়ে তৎপর হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওরা পারবে না। কারণ, একটা দেশ সেটা আয়তনে ছোট যতই হোক না কেন সেটাকে বৃহৎ শত্রু দাবিয়ে রাখতে পারে না যদি দেশের সমগ্র জনসাধারণ সেই শত্রুর বিরুদ্ধে ব্যাপক ভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যায়। কাজেই আজকে আমাদের সংগ্রামকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে কর্মসূচী গ্রহণ করতে হবে। এক নাগাড়ে অনেকক্ষণ বলে থু-আয়া থামল এবং সহকর্মী এক জনের কাছ থেকে একটা বাইলো নিয়ে ধরাল।

য়‍্যাঙ্গায়া প্রত্যেকের কথাই প্রথম থেকে শুনে আসছে। আলোচনাতে অংশ গ্রহণকারী জায়চোয়াঙ্গা, জিটিঙ্গা, রেমা এবং থু-আয়া প্রত্যেকের আলোচনাই ওর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। অবশ্য জেনারেল থু-আয়ার বক্তব্যটাই ওর মনে বেশী রেখাপাত করেছে। কারণ তার মতে থু-আয়ার বক্তব্যের মধ্যে সংগ্রামী চেতনা কিভাবে এগিয়ে নিতে হবে সেটার দিক দর্শন আছে। থু-আয়ার বক্তব্য সংগ্রামী চেতনাকে দিকদর্শন দিলেও এবং অন্যান্যদের আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হলেও য়‍্যাঙ্গায়া ভাবল সবাই যেন একটা বিশেষ বিষয়বস্তুকে আলোচনা থেকে বাদ দিয়েছে। আজকে মিজো জেলাতে বিদ্রোহী মিজোরা তাদের স্বঘোষিত স্বাধীন মিজোরামের মর্যাদা রক্ষাকল্পে যে ভাবে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিযে যাচ্ছে সেটা মিজো জেলার বাইরে কি রকম প্রভাব বিস্তার করছে? অন্যান্যরা সেটাকে কিভাবে দেখছে? এপ্রশ্নগুলিই আলোচনা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাই য়‍্যাঙ্গায়া এপ্রশ্নগুলি নিয়ে আলোচনা করতে চাইল। সে সহকর্মী সবাইকে লক্ষ্য করে বলল, মিজো জেলার বাইরে আমাদের সংগ্রামের প্রচার কি রকম হচ্ছে? বাইরের লোক আমাদের সংগ্রাম সম্পর্কে কি ভাবছে?

য়‍্যাঙ্গায়ার প্রশ্ন জেনারেল থু-আয়াকেই বেশী আকর্ষণ করল। সে বাইলো টানছিল। য়‍্যাঙ্গায়ার প্রশ্ন শুনে বাইলোর ধূয়া ছেড়ে হাসতে হাসতে বলল- বাইরে নিশ্চয়ই আমাদের সংগ্রামের বার্তা প্রচারিত হচ্ছে। বিভিন্ন লোক আমাদের সংগ্রাম সম্পর্কে ভাবছে। তাতে বিভিন্ন জন বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গীতে প্রচার করছে, বিভিন্ন ভাবে ভাবছে। অনেকে ভাবছে একটা জাতি তার আপন সত্ত্বা নিয়ে বিকাশ লাভ করুক সে পুরাপুরি ভাবে পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হউক। প্রকৃত স্বাধীন হোক। তাঁরা নিশ্চয়ই আমাদের সংগ্রামের প্রতি সহানুভূতি দেখাচ্ছে। যারা চায় না আমরা স্বাধীন হই তারা আমাদের বিরুদ্ধে প্রচার করছে। ওরা বলছে আমরা মিশনারীদের হাতের পুতুল। আমাদেরকে উস্কিয়ে দেওয়া হচ্ছে এ লড়াই করতে। আমাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট বলতে কিছু নাই। আমাদেরকে কলুর বলদের মত তৃতীয় পক্ষ পিছন থেকে ব্যবহার করছে সরকারের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা ক্ষুন্ন করতে, সরকারকে ব্যতিব্যস্ত করতে। তাছাড়া সমতলের সাধারণ আধিবাসীদের মধ্যে আমাদের প্রতি যাতে বিরূপ মনোভাব গড়ে উঠে সে প্রচার করছে। ওরা প্রচার করছে যে আমরা হচ্ছি পাহাড়ী জংলী, আমরা আবার স্বাধীন হব কি? আমরা স্বাধীনতার কি বুঝি? ইত্যাদি ইত্যাদি।

— বিভিন্ন মতাবলম্বী লোক আমাদের স্বপক্ষে বা বিপক্ষে যাই বলুক না কেন আমাদের তরফ থেকে কি কিছু বাইরে প্রচার করা যায় না? থু-আয়া থামার পরই য়‍্যাঙ্গায়া আবার প্রশ্ন করল।

— তা করা যায়। আমাদের লোক বাইরে গিয়ে আমাদের বক্তব্য প্রচার করতে পারে। কিন্তু সে প্রচারের কোন মূল্য থাকবে না যদি আমরা আমাদের মিজোরামে যে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি সেটাকে জোরদার করতে পারি। ভিয়েতনামের সংগ্রামী জনগণের লড়াইয়ের কাহিনী আজকে পৃথিবীর সমস্ত দেশেই পৌছছে। আজকে আমেরিকাতেই ভিয়েৎনামী সংগ্রামী জনগণের পক্ষে জনমত গঠন হচ্ছে এবং সেটা সম্ভব হয়েছে ভিয়েৎনামী সংগ্রামী জনগণ আপোষহীন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে বলেই। আমার মনে হয় আমরা আমাদের যতবেশী জনগণকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে সংগ্রাম চালিয়ে শত্রু বাহিনীকে কোনঠাসা করতে পারব স্বাভাবিক ভাবে ততই আমাদের সংগ্রামী চরিত্র বাইরে প্রচার হবে। সংগ্রাম না চালিয়ে শুধুমাত্র বাইরে গিয়ে দুঃখের কাহিনী প্রচার করে অন্যের কৃপা প্রার্থনা কোন স্বাধীনতা সংগ্রামী জনগণ করতে পারে না। কাজেই এখন আমাদের প্রথম এবং প্রধানতম কাজ হচ্ছে আমাদের সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আমাদের জনগণকে ব্যাপক ভাবে আমাদের নায্য লড়ায়ে টেনে আনা।

য়‍্যাঙ্গায়ার প্রশ্নের উত্তরে জেনারেল থু-আয়া যা বলল সেটা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত মনে হল। প্রত্যেকের মনেই থু-আয়ার বক্তব্য ক্রিয়া করতে লাগল এবং ভাবল, সংগ্রামের বিজয় অভিযানেই আমাদেরকে বিশ্ববাসীর কাছে প্রচার করবে। আমরা লড়ব আমাদের কায়দায়। আমরা লড়ব আমাদের শক্তিতে। তা দিয়েই আমরা প্রমাণ করব আমরা স্বাধীনতার কি বুঝি। আমরা অন্যের হাতের ক্রীড়নক না স্বয়ং নির্ভরশীল।

এভাবে আলাপ আলোচনা এবং ভাবনার ফাঁক দিয়ে অনেক সময় চলে গেল। রাত্রি দশটা বাজতে চলছে। যে সহকর্মীদের উপর রাত্রির খাবার তৈরী করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তাঁরা এসে বলল যে খাবার তৈরি হয়ে গেছে। খাবার তৈরি হয়ে গেছে শুনা মাত্রই রেমা বলল- তাহলে গরম গরম খেয়ে নেয়া যাক নইলে যা শীত পড়েছে সব ঠাণ্ডায় জমে যাবে।

— হ্যাঁ, হ্যাঁ আমাদেরকে গরম হতে হবে। তাই গরম গরম খাওয়া ভালো। রেমার কথাকে কার্যকরী করতে হেসে জিটিঙ্গা বলল এবং হাড়ি বর্তন নিয়ে আসতে সহকর্মীদেরকে ঈঙ্গিত করল।

আহারের সামগ্রী মধ্যিখানে রেখে সবাই সমবেত ভাবে গোল হয়ে বসল। প্রত্যেকেই হাড়ি বর্তন থেকে নিজ নিজ হাতে ভাত এবং শূকরের মাংস নিয়ে তাড়িয়ে তাড়িয়ে খেতে লাগল। খেতে খেতে রেমা য়্যাঙ্গায়াকে লক্ষ্য করে বলল, — কিহে, কেমন লাগছে?

— ভালই লাগছে। য়‍্যাঙ্গায়া বলল। সে একটু একটু করে খাচ্ছিল। খাওয়ার ফাঁকে সে রেমাকে বলল, — আমাদেরকে খুব সহনশীল হতে হবে এবং প্রত্যেককেই থু-আয়ার মত দূরদর্শী হতে হবে। রেমা খেতে খেতে বলল, — হুঁ। রেমা এবং য়‍্যাঙ্গায়ার পাশেই জিটিঙ্গা বসেছিল। সে রেমাকে বাড়তে না দিয়ে য়‍্যাঙ্গায়ার প্রশ্নটাকেই টেনে নিয়ে বলল, — তুমি যা বলেছ তা ঠিকই। আমাদেরকে সহনশীল হতে হবে। আমরা নিজেকে সংগ্রামের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে নিলে সংগ্রামের অভিজ্ঞতাই বাস্তব অবস্থার সঠিক বিশ্লেষণ করতে আমাদের সহায়ক হবে। আমাদের চিন্তাধারাকে সঠিক করে তুলবে। তবে না খেলে আমাদের দ্বারা কিছুই হবে না। তাই এখন খাবার সময় খেয়ে নাও।

জিটিঙ্গার শেষ কথাগুলি শুনে সবাই হাসল। জিটিঙ্গার ধরণটাই এই। সব সময়ই সে সবাইকে হাসাতে চেষ্টা করে। সীরিয়াস আলাপ গুলোকেও সে ঠেলে ঠেলে কায়দা করে এমন ভাবে এনে সবার সামনে ছেড়ে দেয় যে সবাই শুনে না হেসে পারে না।

এমনি ভাবে তাড়িয়ে তাড়িয়ে খেতে খেতে এবং রসিয়ে রসিয়ে আলাপ করতে রাত্রি এগিয়ে চলল। খাওয়া শেষ হওয়ার পর আরও কিছু সময় আড্ডা চলবে। যদি কোন প্রশ্ন মাথায় চাড়া দিয়ে উঠে সহকর্মীরা খুটিয়ে খুটিয়ে আলোচনা করে সেটার সমাধান করার চেষ্টা করবে। এবং সবাই আগামী দিনের সংগ্রাম চালিয়ে নেওয়ার নিজ নিজ দায়িত্ব সমঝে নিবে। পূব দিগন্তে ঊষার আলো উঁকি দেওয়ার পূর্বেই সবাই সাইলো পুঞ্জীর এই গোপন আড্ডাখানা ছেড়ে নিজ নিজ নিদ্ধারিত জায়গায় পৌঁছে যাবে।