চড়াই উৎড়াই ভেঙ্গে সরু পথ ধরে রোসাঙ্গী এবং লালচুঙ্গী জুমক্ষেত থেকে নিজেদের পুঞ্জীতে এগিয়ে চলছে। দু’জনই পাশাপাশি হাটছে। দুজনেরই পিঠে দুটো ঝুড়ি। ঝুড়িগুলো সমতল অঞ্চলে তৈরি ঝুড়ির মত নয়। দেখতে বেশ বড় আকারের এবং শক্ত ও মজবুত। উপরে বেত বা কাপড় দিয়ে বেল্ট লাগানো থাকে। পিঠের উপর সমস্ত ঝুড়িটা রেখে বেল্টা কপালে আটকে রাখা হয়। এধরণের ঝুড়ি গুলি নিয়ে চলা ফেরা করতে দুহাতের প্রয়োজন হয় না। আসামের পার্ব্বত্য অঞ্চলের প্রায় সব পাহাড়ীয়া অধিবাসীরা এ ধরণের ঝুড়ি ব্যবহার করে থাকে। দুহাত উন্মুক্ত রেখে ঝুড়ি গুলি বোঝাই করে সহজ ভাবেই চড়াই উৎড়াই পাড়ি দেওয়া যায়। রোসাঙ্গী এবং লালচুঙ্গী তাঁদের পিঠের উপর সমস্ত ঝুড়িটা রেখে বেল্টল্টা কপালে আটকে হাতগুলি উন্মুক্ত রেখেই এগিয়ে চলেছে।
চড়াই উৎড়াই ভেঙ্গে সরু পথটা সামান্য দূর গিয়েই বড় রাস্তায় মিলেছে। বড় রাস্তার পাশেই উঁচু টিলাটায় সামরিক অফিসারদের ক্যাম্প। ক্যাম্পটার পাশেই নিচ দিয়ে যে সরু পথটা গিয়েছে সেটা ধরেই এগিয়ে যেতে হবে। রোসাঙ্গী এবং লালচুঙ্গী চলতে চলতে ক্যাম্পের পাশে নিচ দিয়ে যে রাস্তাটা গেছে সেখানে এসে দাঁড়াল। অনেকক্ষণ এক নাগাড়ে চড়াই উৎড়াই ভেঙ্গে চলার পর শরীর কিছুটা ক্লান্ত বোধ করছিল। রোসাঙ্গী ভাবল এখানে একটু জলপান করে বিশ্রাম করলে ভাল হয়। উঁচু থেকে টিলা গড়িয়ে ঝরণা নেমে এখানে বড় রাস্তার পাশে মিলিয়ে গেছে। সারা বছরই ঝির ঝির করে জল বইতে থাকে। তবে বর্ষার সময় গতিটা একটু প্রখর। রোসাঙ্গী বলল- চল, জল খেয়ে এখানে কিছুটা বিশ্রাম করি।
এই বলেই ঝুড়িটা নামিয়ে রাস্তার উপর রেখে ধীরে ধীরে ছড়াতে নেমে হাত পা ধুয়ে কুশ করে জল খেতে লাগল। লালচুঙ্গী ও ঝুড়িটা নামিয়ে রাস্তার উপর রেখে নিচে নামতে লাগল। সে তখন দেখল টিলার উপর সামরিক ক্যাম্প থেকে একটি লোক বেরিয়ে আসছে। লালচুঙ্গী নামতে নামতে রোসাঙ্গীকে বলল, — উপর থেকে একটা সিপাই আমাদেরকে লক্ষ্য করছে।
— ওর দিকে তাকাসনে তাড়াতাড়ি জল খেয়ে নে, এখান থেকে কেটে পরব। রোসাঙ্গী জল খেতে খেতে বলল। লালচুঙ্গীও উপর দিকে না তাকিয়ে নিচে নেমে হাত পা ধুয়ে হাত দিয়ে কুশ করে জল খেতে লাগল। এই নির্জন পরিবেশে ওরা দুজন ছাড়া অন্য কোন তৃতীয় ব্যক্তি থাকতে পারে এ ধরণের ভাবনাই যেন ওদের মধ্যে নেই। অবশ্য রোসাঙ্গী আস্তে আস্তে লালচুঙ্গীকে বলল — বদমাসগুলির কখন কি মর্জি হয় তা বলা মুসকিল। আমাদেরকে দেখলেই ওরা বেসামাল হয়ে যায়।
— আমি একবার আড়চোখে দেখব না কি ও বেটা কি করে?
— না না দেখার দরকার নেই। চল এবার রওয়ানা দেই। এ বলেই রোসাঙ্গী ছড়া থেকে রাস্তার উপরে উঠে আসল। লালচুঙ্গীও রোসাঙ্গীর সাথে সাথে আসল।
ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে এসে লোকটি টিলার উপর দাঁড়িয়ে ততক্ষণ রোসাঙ্গীও লালচুঙ্গীকে দেখছিল। ঝির ঝির করে একতানে বয়ে যাওয়া ছড়ার পাশে দাঁড়িয়ে দুটো মিজো মেয়ের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিভিন্ন ভঙ্গীতে নড়া চড়ার ফলে যে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল সেটা সেপাই বাবুর নিকট খুব মনোরম বলে মনে হচ্ছিল। টিলার উপর দাঁড়িয়ে সে আনন্দ উপভোগ করছিল। কিন্তু রোসাঙ্গী ও লালচুঙ্গী সেখান থেকে উঠে চলে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে দেখে ওর সহ্য হল না। সে ভাবল ওদেরকে কিছু সময় আটকে রেখে একটু রগড় করা যাক। তাই জোরে হাঁক দিয়ে ওদেরকে লক্ষ্য করে বলল
— হেই ওধার কিয়া করতা হ্যায়?
— এই রে, যা ভেবেছিলাম তাই হয়েছে। শালার বেটা দেখে ফেলছে। এখন না হলেও কিছু সময় আটকে রাখবে। রোসাঙ্গী লোকটার হাঁক শুনে লালচুঙ্গীকে বলল। তারপর সে ফিরে টিলার উপর লোকটির দিকে চেয়ে বলল — বাবু সাব পানী পীনেকে লিয়ে হাম ইধর আয়ী থী। এই বলেই রোসাঙ্গী লালচুঙ্গীকে ঈশারা দিয়ে বলল — চল আমরা চলে যাই। এই বলেই তারা রওয়ানা দিতেই সিপাইটি আরও জোর গলায় চিৎকার দিয়ে বলল — হেই ইধর শোন যাও।
— এত সহজে আমাদেরকে ছেড়ে দেবে না। লালচুঙ্গী বলল।
— হুঁ, মনে হচ্ছে তাই। অথচ তুমি না শুনে চলেও যেতে পারবে না।
দুজনেই সেপাই সাহেবের আদেশ মান্য করতে টিলার দিকে এগিয়ে চলল। যেতে যেতে রোসাঙ্গী ফিস ফিস করে বলল — ওর সাথে যখন আলাপ করবে তখন একটু মাখো মাখো ভাব নিয়ে আলাপ করো, দেখবে গলে যাবে। ভাব দেখিয়ে ওর কাছ থেকে সুযোগ বুঝে কাটতে হবে।
রোসাঙ্গীর কথা শুনে লালচুঙ্গী না হেসে পারল না। সে অবশ্য কিছু বলেনি। তবে মুখে একটা মুচকি হাসির ভাব ফুটিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল।
লোকটির পাশে যেতেই সে তাঁদেরকে লক্ষ্য করে গুরু গম্ভীর আওয়াজ দিয়ে বলল
— তোমলোগ ওধারকা পানী কিউ ঝুটা করতা হ্যায়?
— নেই বাবু সাব পানী ঝুটা করনেকে লিয়ে নেই, হম পানী পীনেকে লিয়ে ওধার গয়ী থী। রোসাঙ্গী মোলায়েম সুরে বলল।
— হুঁ, তুমহারা ঘর কাহা হ্যায়?
— ইধারসে থোরা দূর হোগা। হাম তো হর রোজ ইধারমে আ যা করতা হ্যায় বাবু সাব। ইস্ টাইমমে জুম ক্ষেতমে বহুত কাম হ্যায়।
মাখো মাখো ভাব দেখানোর কথাটা লালচুঙ্গী ভুলেনি। দুজনের আলাপ শুনার ফাঁকে ফাঁকে সেপাইটার দিকে তাকাচ্ছিল। এবং দেখাচ্ছিল যে সেপাই বাবুকে ওর ভালই লেগেছে, পছন্দ হয়েছে। লালচুঙ্গীর ভাবটাও লক্ষ্য করে সেপাইটি ওকে প্রশ্ন করল
— তুম্হারা ঘর কাহা হ্যায়?
— হামারা দুনোকা ঘর একহি পুঞ্জীমে বাবুসাব।
— তুম ভি রোজ আ যা করতা হ্যাঁয়?
— জী হাঁ।
— আচ্ছা পানী পীনেকে জরুরত হ্যায় তো হামারা ক্যাম্পমে আও। ওধার ছড়ামে মত যাও। সমঝা? সেপাইটি লালচুঙ্গী এবং রোসাঙ্গী দুজনকেই লক্ষ্য করে বলল।
— ঠিক হ্যায় বাবু সাব। রোসাঙ্গী এবং লালচুঙ্গী দুজনেই বলল এবং কৃতজ্ঞতার ভাব প্রকাশ করল। রওয়ানা দেওয়ার পূর্বে রোসাঙ্গী ফিরে মুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে বলল
— বাবু সাব, হামারা ঘরমে এক রোজ আইয়ে। হাম বহুত খুস হোগি।
— আচ্ছা আচ্ছা, তুমারা পুঞ্জীমে জরুর যায়েগা।
রোসাঙ্গী এবং লালচুঙ্গী ক্ষিপ্রগতিতে পা ফেলে সরু পথ ধরে পুঞ্জীর দিকে এগিয়ে চলল। যেতে যেতে রোসাঙ্গী বলল — যাক বেটা অল্পের মধ্যেই ছেড়ে দিয়েছে।
— ও ভেবে নিয়েছে যে বরাবরের জন্য একটা লাইন পাওয়া গেছে কাজেই আজকে বেশি এগোলে সব মাটি হয়ে যাবে। তাই তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিয়েছে। কি বলিস? এই বলেই রোসাঙ্গী লালচুঙ্গীর মতামত চাইল।
— ভাববে না কেন? তুই যে ভাবে ওর দিকে বারে বারে চাউনি দিয়েছিস সেটা দেখে আমিত ভাবছি তুই ঠিকই ওর প্রেমে পড়ে গেছিস। তাহলে আমি মাখো মাখো ভাবটা ঠিকই বুঝাতে পেরেছি।
— হ্যাঁ প্রয়োজনের চেয়ে বেশীই বুঝাতে পেরেছিস। তাহলেও আমি তোর মত পারিনি। তুই যদি না থাকতিস তাহলে আওয়াজ শুনেই দৌড় দিতুম। আর তখন ও আমাদের পিছে পিছে ছুটে জঙ্গলে গিয়ে ধরত। তোর বুদ্ধি আছে মাইরি! তবে রেমারা যদি টের পায় যে তুমি সেপাইদের সাথে ভাব করতে যাচ্ছ তাহলে তোমাকে ঠেঙ্গিয়ে দেবে।
— তুই দেখ না ওকে রোজ রোজ ভাব দেখিয়ে কোথায় ঠেলে নেই। রেমাদেরকে বলেই এবেটাদের এমন ফাঁদে ফেলব যে ওদের পুলক কোন দিকে বেরোয় টের পাবে।
— যাই করিস বাপু দেখিস শুধু বিপদ টেনে আনিস না।
— বিপদ টেনে আনব কিরে? বিপদ আমাদের সব সময় লেগেই আছে। পুঞ্জী থেকে বেরুলেই সব সময় মাথায় আতঙ্ক চাড়া দিয়ে উঠে। বদমাসগুলো কখন কি করে বসে। তাছাড়া পুঞ্জী চড়াও করেও হামলা করে। এমতাবস্থায় আমরা বিপদ টেনে আনব কি? এখন বিপদ কেটে উঠতে আমাদের নানা ঝুকি নিতে হবে।
রোসাঙ্গী এবং লালচুঙ্গী দুজনেই আলাপ করতে করতে ওদের পুঞ্জীতে এসে পৌছে যায়। প্রথমেই পুঞ্জীতে ঢুকে বাঁদিকে বেকে ছোট রাস্তা ধরে লালচুঙ্গীর বড়িতে যেতে হবে। সে বাঁকে দাঁড়িয়ে রোসাঙ্গীকে উদ্দেশ্য করে বলল- মাংঠালে। রোসাঙ্গীও প্রত্যুত্তরে বলল মাংঠালে। তারপর দুজন দুদিকে রওয়ানা দিল। রোসাঙ্গী ধীরে ধীরে একটু একটু ঝুকে এক পা এক পা করে চড়াই ভেঙ্গে তার ঘরের দিকে এগিয়ে চলল, অতি অল্প সময়ের মধ্যে ঘরে পৌঁছে যাবে। সারাদিনের ক্লান্তি বয়ে আনা অবসন্ন দেহটাকে কিছুক্ষণের জন্য নিশ্চিন্তে বিশ্রাম দেওয়া যাবে।
সেদিন রাত রেমার বাড়ী ফিরতে অনেক দেরী হয়ে গেল। সন্ধ্যার সাথে সাথে অন্ধকার নেমে আসার পর প্রতি মূহুর্তেই রোসাঙ্গী একটা উৎকণ্ঠা নিয়ে কাটাচ্ছিল। কারণ সাধারণতঃ রেমা যখন ফিরবে বলে যায় তার ব্যতিক্রম হয় না। সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় ফিরে আসবে বলেও তার ফিরতে দেরী হওয়ায় রোসাঙ্গীর তর সইছিল না। দূরে পাস্তরের বাড়ীর সামনে ছোট গীর্জা থেকে ঢং ঢং করে আটটা বাজার আওয়াজ ভেসে আসছিল। তারপর ন’টা। না, তবুও রেমা ফেরেনি। প্রিয়জনের অনুপস্থিতিতে ওর মনে কেমন অমঙ্গল আশঙ্কা চাড়া দিয়ে উঠছিল। যাহোক, অবশেষে রেমা ফিরল। রোসাঙ্গী কান পেতে রেখেছিল। লোক চলাচলের শব্দ পেয়েই সে সতর্ক হয়ে গেল। রেমা দরজাতে ঠুকা দেওয়ার সাথে সাথে রোসাঙ্গী দরজা খুলে দিল। দরজা খুলে রেমাকে দেখে ও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। ওর দম বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রাণটা যেন ফিরে এল।
— এত দেরী দেখে চিন্তায় আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। রোসাঙ্গী রেমাকে বলল।
— একটা কাজে গেলাম তাই এত দেরী হল। রেমা পায়ের জুতা জোড়া খুলে মাচানের উপর বিছানাতে শরীরটা এলিয়ে দিতে দিতে বলল। কিছুক্ষণ চুপ চাপ থেকে সে আবার বলল,
— আমরা আর এ পুঞ্জীতে বেশী দিন থাকতে পারব না রোসাঙ্গী।
— কেন?
— সরকার সমস্ত পুঞ্জী গুলোকে ভেঙ্গে দেবে।
— ভেঙ্গে দেবে?
— হ্যাঁ এমনিতেই যাকে সন্দেহ করছে তাকেই জেলে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। এখন বাদ বাকী যারা আছে তাদেরকে বড় রাস্তার পাশে ঘর তৈরি করে মিলিটারীর পাহাড়ায় আটকে রাখবে। আমাদেরটা বোধহয় অচিরেই ভেঙ্গে দেবে।
— তাহলে আমাদেরকে মিলিটারীর পাহাড়ায় বড় রাস্তার মধ্যে গিয়ে বসবাস করতে হবে?
— এখানে থাকলে ওরা আমাদেরকে তা করতে বাধ্য করবে। তাই আমাদেরকে ইতিমধ্যে এখান থেকে কেটে পড়তে হবে।
— ওরা যা করবে তাই আমাদেরকে সহ্য করতে হবে। আমরা প্রতিরোধ করব না? রোসাঙ্গী রেমার কথাগুলো শুনে প্রশ্ন করল।
— হ্যাঁ ওদেরকে সমুচিত জবাব দেব বলে আমরা এখান থেকে কেটে পড়ব। শত্রু যখন প্রবল হয়ে আমাদের উপর আক্রমণ চালাবে তখন আমাদেরকে পলায়নটা কৌশল হিসাবে নিতে হবে। আজকের পলায়নের উদ্দেশ্য হচ্ছে আগামী দিনে প্রতিরোধ করার শক্তি সংহত করা।
রোসাঙ্গী রেমার কথা শুনে মনে মনে ভাবছিল। দীর্ঘদিন ধরে এ পুঞ্জীতে বসবাস করে এখানকার আকাশ বাতাস, এখানকার জলবায়ু, গভীর জঙ্গলের প্রতিটি গাছপালার সাথে যে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল সেটাকে ছিন্ন করে এখান থেকে আরও গভীরে চলে যেতে হবে। কিন্তু কেন? প্রতিপক্ষ শক্তিশালী বলেই কি আজ আমাদের উপর প্রচণ্ড ভাবে অত্যাচার চালিয়ে যাবে। দৈনন্দিন জীবনের সাথে নিবিড় সম্পর্কের পুঞ্জী থেকে আমাদেরকে জোর করে উচ্ছেদ করে তাদের খোঁয়াড়ে নিয়ে পশুর মত ব্যবহার করবে? প্রচণ্ড ভাবে অত্যাচার চালিয়ে আমাদেরকে কি দাবিয়ে রাখতে পারবে? নিশ্চয়ই না। আমাদের উপর যতই অত্যাচার চালাক না কেন আমরা সেটার মোকাবিলা করব। যে ভাবে পারি শত্রুকে আঘাত হানার দুর্বার বাসনা নিয়ে এগিয়ে চলব। এ সমস্ত ভাবতে ভাবতেই রোসাঙ্গীর মনে ক্যাম্পের সেই অফিসার সেপাইটির চেহারা ভেসে উঠল। সাথে সাথেই তাঁর মনে একটা জিঘাংসার ভাব দেখা দিল। সে ভাবল, ওদেরকে সমুচিত শিক্ষা দিতে হবে। আজকে যে পীরিতের মেকি বন্ধন গড়ে এসেছি সেটার সূত্র ধরেই ওদেরকে সায়েস্তা করতে হবে।
রেমা বিছানার উপর শুয়ে এ পুঞ্জী ছেড়ে চলে যাওয়ার কথাই ভাবছিল। রোসাঙ্গী ওকে ডেকে বলল — আমরা আজ বড় রাস্তার ধারে সেপাই অফিসারদের ক্যাম্পে গিয়েছিলাম।
— কেন?
— আমাদেরকে ডেকে নিয়েছিল। আমি আর লালচুঙ্গী জুমক্ষেত থেকে ফেরার পথে ওদের ক্যাম্পের পাশে ছড়াটাতে নেমে জল খাচ্ছিলাম। তখন একটা সেপাই আমাদেরকে ডেকে নিয়েছিল।
— সেখানে নিয়ে কি করল?
— কি আর করবে? আসল লক্ষ্য ছিল আমাদেরকে নিয়ে রগড় করা।
— তারপর ছাড়ল কখন?
— তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিয়েছে। আমি আর লালচুঙ্গী দু’জনেই বেটাকে খুব পীরিতির ভাব দেখালাম। এবং ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলাম যে ক্যাম্পে সুবিধা হবে না। আমাদের পুঞ্জীতে আসলে বাসনা আর অতৃপ্ত থাকবে না।
— তা ও আসবে কি?
— মনে হয় আসবে। টোপটা আরেকটু ভাল ভাবে ফেললে সুর সুর করে আসবে। তুমি কেবল সহকর্মীদেরকে নিয়ে গোপনে ওৎপেতে থাকবে, ওরা আসলে যাতে আর ফিরে না যেতে পারে।
— তাহলে দু’তিন দিনের মধ্যে আনার ব্যবস্থা কর।
তারপর রোসাঙ্গী এবং লালচুঙ্গী আরও দুদিন জুম ক্ষেত থেকে ফেরার পথে আফিসারদের ক্যাম্পে নিজেরা জল চেয়ে খেয়েছে। প্রথম দিনের লোকটির সাথে আলাপ করার সাথে সাথে আরও দুতিন জনকে আকৃষ্ট করে রোসাঙ্গী এবং লালচুঙ্গী এমন ভাব দেখিয়েছে যে তোমরা জওয়ানরা আমাদেরকে না চাইলেও আমরা আমাদের বাড়ন্ত দেহ নিয়ে নিজেরা টাল সামলাতে পারছি না।
তোমাদেরকে আমাদের এখানে আসতে হবে। আমাদের যৌবন জ্বালার যে চাহিদা সেটা মেটাতে তোমাদের আশু প্রয়োজন।
রোসাঙ্গী এবং লালচুঙ্গীর টোপে শেষ পর্যন্ত সেপাইরা আকৃষ্ট হয়েছে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হচ্ছে। রোসাঙ্গী এবং লালচুঙ্গীর নেতৃত্বে সরু আঁকা বাঁকা পথ দিয়ে এগিয়ে চলছে তাঁদের পুঞ্জীতে। দুজন মিজো মেয়েকে ঘিরে চারজন যে পরিবেশের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলছিল সেটা খুবই চিত্তাকর্ষক। প্রতিটি মূহূর্তে জওয়ানদের প্রতিটি অস্ত্রে মধুর রোমান্সের ঢেউ বইয়ে দিচ্ছিল। শান্ত পরিবেশ, পাহাড়ী মেয়ের দৈহিক গঠন এবং নিজেদের কামনা চরিতার্থ করার উদগ্র বাসনা ওদেরকে বেসামাল করে তুলছিল এবং ভাবছিল কত শীঘ্র ওদের পুঞ্জীতে গিয়ে পৌঁছবে।
রোসাঙ্গী ক্যাম্প থেকে এগিয়ে আনতে যাওয়ার পূর্বেই মেহমানদিগকে যাতে আপ্যায়ন করা যায় সেটার ব্যবস্থা করে গিয়েছিল। ব্যবস্থাটা তেমন বেশী জম জমাট করেনি। কিছু শূকরের মাংস এবং তাঁদের পুঞ্জীতেই তৈরি কিছু মদ। সন্ধ্যায় অন্ধকার নেমে আসার আগ পর্যন্ত যাতে ওদেরকে নেশায় বুদ করে রাখতে পারা যায় সে অনুপাতেই মালের ব্যবস্থা।
রোসাঙ্গী পুঞ্জীতে ঢুকেই সে একটু আগ বেড়ে তাদেরকে অনুসরণ করতে বলল। তার পিছনে লালচুঙ্গী চলল এবং লালচুঙ্গীর পিছন বাকী চারজন সেপাই একরকম প্রায় কিউ দিয়ে চলল। রোসাঙ্গী তাঁর ঘরের সামনে এসে দরজাটা খুলে ওদেরকে ভেতরে যাওয়ার অভ্যর্থনা জানাল। কিন্তু সিপাইরা প্রথম বাইরে দাঁড়িয়েই চতুপার্শ্বস্থ মনোরম দৃশ্যাবলী দেখতে লাগল। তারপর এক এক করে সবাই রোসাঙ্গীর ঘরে ঢুকে মাচানের উপর বসল।
— বাবু সাব আপলোগ পয়দলসে বহুৎ দুর আয়া হ্যায়। থোরা আরাম কিজিয়ে। এই বলেই রোসাঙ্গী মদের বোতল এবং মাংস ওদের সামনে এগিয়ে দিল।
— আরে খানা পিনেকা কিয়া জরুরৎ হ্যায়?
— মেহের বানি করকে ঘর মে আয়া তব থোরা খানা খাইয়ে সাব।
— ঠিক হ্যায় হামলোগ খায়েগা। তুমলোগ পহেলে খাও। লালচুঙ্গী তখন মাংস নিয়ে মুখে পুড়ল এবং বোতল থেকে মদ নিয়ে কয়েক ঢোক খেল।
রোসাঙ্গী এবং লালচুঙ্গী খাওয়ার পর ওরাও মাংস মদ দুইই একটু একটু করে খেতে লাগল। খেতে খেতে ভাবছে তোমাদের এই মদ এবং মাংস আপ্যায়নেই তুষ্ট থাকবো না। তোমাদেরকেও চাই। অবশ্য মদ এবং মাংস খেয়ে শরীরটাতে একটু মদির নেশা না আনতে পারলে তোমাদেরকে নিয়ে জমবে না। তাই একটু নেশায় মত্ত হয়েই তোমাদেরকে নিয়ে মত্ত হব।
রোসাঙ্গীও ফাঁক বুঝে একজন একজন করে মদের পাত্র এগিয়ে দিচ্ছে। নিজেকে কিছুটা বেসামাল হওয়ার ভাব দেখিয়ে একবার একজনের গায়ে ঢলে পড়ছে এবং আরেকবার অন্যজনের গায়ে ঢলে পড়ছে। লালচুঙ্গী ও সামনতালে রোসাঙ্গীর সহযোগী হয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এভাবে সময় এগিয়ে যাচ্ছে এবং সময় যাওয়ার তালে তালে সেপাই বাবুরাও নেশায় মশগুল হচ্ছে। ওরা যখন নেশায় পুরাপুরি ভাবে উন্মত্ত হয়ে গেছে তখন রোসাঙ্গী হঠাৎ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ততক্ষণে সন্ধ্যার অন্ধকার চারিদিক ঘিরে ফেলছে। চারটি পুরুষ জানোয়ার নেশায় মদমত্ত হয়ে লালচুঙ্গীকে ঘরে পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে গিলে ফেলতে উদ্যত হচ্ছে। এমন সময় অন্ধকার ঘরের বারান্দায় এসে কয়েকটা ছায়া মূর্তি যেন দাঁড়াল। না ছায়া মূর্তি নয়। রেমার সহকর্মীরা এসেছে। প্রথমেই লালচুঙ্গীকে ঘর থেকে বের করে আনল। তারপর সামনা সামনি দাঁড়িয়েই সবাই মিলে রঙ্গীন নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা শত্রু বাহিনীর চারটি জানোয়ার পুরুষকে নৃশংস ভাবে খতম করল।
এ ঘটনার পর এই পুঞ্জীর চারঘর নিয়ে বারোজন অধিবাসী এবং রেমার অন্যান্য সহকর্মী সবাই পুঞ্জী ছেড়ে পাহাড়ের দুর্গম পথ অতিক্রম করে রাত্রির অন্ধকারে এগিয়ে চলল। এমনিতেই ধারে কাছের সমস্ত পুঞ্জী ওরা ভেঙ্গে বড় রাস্তার পাশে পাহাড়া দিয়ে মিজোদেরকে আটকে রাখছে। এ ঘটনার পর শত্রু পক্ষ থেকে যে আঘাত আসবে সেটা এখান থেকে মোকাবিলা করা ধ্বংসের মুখে নিজেদেরকে ঠেলে দেওয়ারই সামিল হবে।