আইজলের সামরিক সেনা নিবাসের একটি প্রহরারত সেলের মধ্যে রাংচোয়াঙ্গা এবং তার সহকর্মীদেরকে আবদ্ধ করে রাখা হয়। অন্যান্য যে সমস্তদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের চেয়ে রাংচোয়াঙ্গাদের গ্রেপ্তার অন্য ধরনের। খোদ Place of operation থেকে ঘেরাও দিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর জওয়ানরা ওদেরকে পাকড়াও করে এনেছে। যুদ্ধরত অন্যান্য বিদ্রোহী মিজোদের সাথে ওদের যোগাযোগ বিদ্ধমান। কাজেই যেভাবে হোক ওদের নিকট থেকে তথ্য বের করে আনতে হবে।
রাংচোয়াঙ্গা এবং তাঁর সহকর্মীরা ধরা পড়ার পর বন্দী অবস্থায় যখন জওয়ানরা তাঁদেরকে নিয়ে চলে তখনই ভেবেছিল যে এই ধরা পড়ার ঘটনা ওদেরকে অনেকদূর নিয়ে যাবে। ধরা পড়ার আসল ধাক্কা সামনে অপেক্ষা করছে। নানান ভাবে কৌশল করে, ছলে বলে ওদের কাছ থেকে তথ্য বের করে নেওয়ার জন্য চেষ্টা করবে। নানা রকম অত্যাচার করবে। সে অত্যাচার হবে বড় ভয়াবহ। মানসিক, শারীরিক দুভাবেই নির্যাতন চালিয়ে ওদেরকে বেসামাল করবে। অবশ্য যারা মৃত্যু মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছে তাঁদের আবার ভয় কিসের? মাভৈঃ মন্ত্রে এগিয়ে যেতে হবে। মাভৈঃ বলে সব পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে।
সামরিক বিভাগের তিনজন কর্মচারী একটা ছোট্ট ঘরের মধ্যে বসে আছে। রাংচোয়াঙ্গাকে বন্দুকধারী সিপাইরা পাহাড়া দিয়ে তাঁর সেল থেকে নিয়ে এসে সামরিক কর্মচারীদের সামনে হাজির করল। এক এক করে সবাই ওকে প্রশ্ন করতে লাগল। একজনের প্রশ্ন শেষ হতে না হতেই আরেক জন প্রশ্ন করা শুরু করে। তিনজনেরই উদ্দেশ্য যে ভাবেই হোক রাংচোয়াঙ্গার কাছ থেকে গোপন তথ্য বের করে আনতে হবে। কোথায় কোথায় বিদ্রোহী মিজোদের গোপন আড্ডা আছে, কোথা থেকে ওরা অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করে এবং কোথায়ই বা বিদ্রোহীদের আসল পাণ্ডাগুলি আছে ইত্যাদি সব খবরই ওর কাছ থেকে বের করতে হবে।
কিন্তু সামরিক আফিসারদের কোন প্রচেষ্টা রাংচোয়াঙ্গাকে বেসামাল করতে পারেনি। কারণ সে জানে স্বদেশকে পুরাপুরি ভাবে স্বাধীন করতে গিয়ে যে পথ নিয়েছে সেটাকে বানচাল করা তথা দমিয়ে রাখার উদ্দেশ্যেই এই সমস্ত লোকগুলিকে নিয়োগ করা হয়েছে। তাঁর পথ এবং ওদের পথ ভিন্ন। তাদের প্রত্যেকটি প্রশ্ন করার উদ্দেশ্য হচ্ছে বিদ্রোহীদের সম্পর্কে জানা এবং সেটার উপর ভিত্তি করেই তাদের দমন পীড়ন নীতি আরও জোরদার করে তাদের প্রভুদের প্রকৃত সেবা করা। কাজেই রাংচোয়াঙ্গা যেখানে মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে দেশকে স্বাধীন করার অদম্য বাসনা নিয়ে শত্রুর সাথে মুখামুখি লড়াইয়ে নেমেছে সেখানে তার শরীরের শেষ রক্ত বিন্দু থাকা পর্যন্ত পারেনা শত্রুদের কাছে কোন গোপন কথা বলতে।
প্রথম পর্যায়ে বিভিন্ন রকম প্রশ্ন করে সামরিক অফিসাররা রাংচোয়াঙ্গার নিকট থেকে কোন কথাই বের করতে পারল না। তারপর শুরু করল ইন্টারগেশনের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ। থেমে থেমে শরীরের সমস্ত হাড়ের জোরাতে রোলার দিয়ে প্রচণ্ড আঘাত থেকে শুরু করে হাতের প্রত্যেকটি নখের অগ্রভাগে সূঁচ বিধে দেওয়া। এমনিভাবে ওকে অত্যাচার চালিয়ে বেশ করে কিছু সময় ছেড়ে দেওয়া হয়। তারপর আবার যখন হুসে আসে তখনই চালায় পূর্ববত অত্যাচার। জলের পিপাসায় যখন বুক ফেটে যায় তখন জলের গ্লাসটা ওর সামনে রেখে দেয়। খেতে গেলেই আবার সেটাকে সরিয়ে নিয়ে আসে। কিন্তু এত করা সত্বেও রাংচোয়াঙ্গার কাছ থেকে কোন কথাই বের করতে পারল না যা নাকি তাদের কাজে আসতে পারে। শেষ পর্যন্ত সামরিক অফিসাররাই মানসিক ধৈর্য হারিয়ে ফেলে।
রাংচোয়াঙ্গার কাছ থেকে খবর আদায় করার সবরকম চেষ্টাই যখন ব্যর্থ হয়ে যায় তখন সামরিক অফিসাররা বাধ্য হয়েই তাকে অন্যান্যদের সাথে আইজল থেকে কঠোর পাহাড়ায় শিলচর জেলে পাঠিয়ে দেয়। শিলচর জেলের ভিতর ঢুকে সেখানকার বেশীর ভাগ বন্দীদেরকে দেখে প্রথমে রাংচোয়াঙ্গার মনে হলো মিজো জেলার কোন শহরই যেন ওরা তুলে নিয়ে এসেছে। রাংচোয়াঙ্গা জেলে আসার পর লক্ষ্য করল দুতিন দিন পর পরই নূতন নূতন করে বিদ্রোহী মিজোদেরকে বন্দী করে এনে জেলে ঢোকাচ্ছে। সরকার বাহাদূরের জেল ম্যানুয়েলসের নিয়ম অনুসারে যে ওয়ার্ডে মাত্র পনেরোজন বন্দীকে আবদ্ধ করে রাখার নির্দেশ সেখানে কমপক্ষে একশো পঞ্চাশ জন বন্দীকে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। সন্ধ্যার সাথে সাথেই যখন জেল ওয়ার্ডাররা এসে চারিদিক বন্ধ করে দিয়ে যায় তখন ওয়ার্ডের ভিতরটা এক অকল্পনীয় রূপ ধারণ করে। বিভিন্ন জড় বস্তুকে ছোট বাস্ক বা বেগের মধ্যে ঢুকাতে গিয়ে যেভাবে উল্টেপাল্টে গুজে দেওয়া হয় এখানে ব্যবস্থাটা ঠিক সেরকম। আগের দিন সূর্য ডুবে যাওয়ার সাথে সাথে পরের দিন সূর্য উঠার আগ মূহুর্ত পর্যন্ত এই পনেরোজন বন্দীর ঘরে একশপঞ্চাশ জন কিভাবে রাত কাটায় কল্পনা করা মুসকিল।
সাধারণতঃ মানুষ দিনের বেলায় পরিশ্রম করে ক্লান্তিতে ভরা অবসন্ন দেহটাকে রাত্রিবেলা শুয়ে সতেজ করে কিন্তু এখানে ঠিক উল্টো ব্যাপার। সারারাত্র অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে কাটিয়ে সকাল বেলা কিছুটা মুক্ত হাওয়া নিতে পারে। প্রভাত হওয়ার সাথে সাথে মুরগির বাচ্চাদের যেমন মালিক খাচা থেকে খুলে দেয় প্রায় সে রকম ভাবেই ওয়ার্ডাররা ওয়ার্ডের দরজা খুলে দিয়ে যখন সমস্ত বন্দীদেরকে ফাইলে বসিয়ে দেয় তখন সবাই একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে। সারারাত্রির অস্বস্তিকর পরিবেশ থেকে মুক্ত হয়ে একটু নড়াচড়া করে। একদিন রাংচোয়াঙ্গা ফাইল থেকে ফিরে এসে ওয়ার্ডে বসে লক্ষ্য করল তার পাশেই একটি বালক বসে আছে। তাকেও বিদ্রোহ মিজো হিসাবে বন্দী করা হয়েছে। ভারতের স্বাধীন সরকার Penal code এর ১২১ ধারায় সেই বালকটিকে গ্রেপ্তার করে এনেছে। অভিযোগ গণতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিষ্ঠিত সরকারকে হিংসাত্মক উপায়ে উচ্ছেদ করার জন্য যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। রাংচোয়াঙ্গা সেই বালকটিকে জিজ্ঞাসা করল
— তোমার নাম কি?
— জায়রেমা
— মিজো পাহাড়ের কোন জায়গায় তোমার বাড়ী?
— নাহথিয়েলের পাশেই একটি পুঞ্জীতে।
— সেখান থেকেই কি তোমাকে গ্রেপ্তার করেছে?
— হ্যাঁ, একদিন ভোর বেলা আমাদের সারা পুঞ্জীটা সেপাইরা এসে ঘেরাও করে আমাদেরকে ধরে নিয়ে আসে। আমাকে বেশী মারেনি তবে অন্যান্যদেরকে খুব বেশী মেরেছে।
— হ্যাঁ, আমাদেরকে ধরে ফেলতে পারলে ওদের প্রতাপ খুব বেশী বেড়ে যায়, তখন খুব অত্যাচার করবে। কিন্তু জঙ্গলে ফাঁকা আওয়াজ শুনলেই অনেক সময় ভয়ে ওদের কাপড় খারাপ হয়ে যায়।
রাংচোয়াঙ্গার কাছ থেকে সেপাই বাহিনীদের প্রতি বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য শুনে জায়রেমা খুব মজা পেল। সে নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। ফিকফিক করে হাসল, ওর মুখে হাসি মিলিয়ে না যেতেই রাংচোয়াঙ্গা আবার বলল তুমি পড়াশুনা করতে কি?
— হ্যাঁ
— কোন ক্লাসে?
— সেভেন ক্লাসে।
— তোমার বাড়ীতে কে কে আছে?
— আমার মা এবং দুজন ছোট ভাই।
বাড়ীর প্রশ্ন আসতেই জায়রেমা একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেল, ভেসে আসে চোখের সামনে তার মায়ের চেহারা। তার ছোট দুই ভাইয়ের অসহায় চাউনি। পুঞ্জীতে ঢুকে সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে যখন তার বাড়ী থেকে ধরে আনতে যায় তখন স্বভাবতই ছেলের মমতায় তার মাকে আকুল করে তুলে। সে জায়রেমাকে আগলে রেখে বলে না তোমরা আমার ছেলেকে ধরে নিয়ে যেতে পারবে না। ও আমার অবলম্বন, ও কোন দোষ করেনি। কিন্তু সেপাইরা তার মায়ের কথা গ্রাহ্যই করেনি। মাকে একটি সেপাই হেচকা টান মেরে সরিয়ে জায়রেমাকে টেনে হেছড়ে নিয়ে চলে। অসহায় বুড়ী চিৎকার দিয়ে কাঁদতে থাকে। ছোট দুটি ভাই কিছু না বুঝে মায়ের এবং দাদার উপর এধরণের ব্যবহার দেখে ভয়ে মায়ের সাথে গলা মিলিয়ে চীৎকার করতে থাকে। জায়রেমা সেপাইদের কাছে পুরোপুরি ভাবে পর্যদুস্ত। তার করবার কিছুই নাই। কেবলমাত্র মা এবং ছোট ভাইদের অসহায় অবস্থা দেখে তার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছিল।
এসমস্ত ভাবতে ভাবতে জায়রেমা রাংচোয়াঙ্গাকে বলল — জানেন বাড়ীর কথা মনে হলেই আমার কান্না এসে যায়, মায়ের কথা মনে হয়, ছোট ভাইদের কথা মনে হয়। প্রথম প্রথম কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারতাম না। এখানে যারা আছে সবাইর দেখছি আমার মত দুঃখ আছে। বাড়ীর কথা আসতে কেহ কেহ বাবা মা আবার কেহ কেহ বৌ ছেলে মেয়ের জন্য দুঃখ পায়। এখন অবশ্য এই দুঃখ আগের মত সাড়া দেয় না।
রাংচোয়াঙ্গা কথাগুলি মন দিয়ে শুনছিল। জায়রেমা বলার পর সে বলল — হ্যা দুঃখ পাওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু এখন আমাদের যে পরিস্থিতি তাতে দুঃখটাকে ধীরে ধীরে জয় করতে হবে। কারণ আমরা আজ যে উদ্দেশ্য সিদ্ধি করার জন্য শপথ গ্রহণ করেছি সেটাকে বানচাল করার জন্য ওরা আমাদেরকে নানা বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে চেষ্টা করবে। তাই আমরা যদি সেখানে দুঃখ কষ্ট পাচ্ছি বলে নিজেদের মধ্যে হা হুতাশ করে মরি তাহলে চলবে না। কারণ কোন মহৎ উদ্দেশ্যই সহজ ভাবে চরিতার্থ করা যায় না। কাজেই আমাদের উদ্দেশ্য সফল করতে গিয়ে দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা বরণ করতে হবে। সেগুলি সাহসের সহিত মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে হবে।
জায়রেমা রাংচোয়াঙ্গার কথাগুলি শুনে আনন্দ পাচ্ছিল। শুধু তাই নয়, কথা শুনে তার মনে মনে বীর হওয়ার বাসনা চাঙ্গা দিয়ে উঠল। সে ভাবতে লাগল এবং ভাবতে ভাবতে সে হঠাৎ রাংচোয়াঙ্গাকে হাত ধরে টানতে টানতে বলল — চল দাদা তোমাকে একটি জায়গা দেখিয়ে নিয়ে আসি। এসময়টাতে ওয়ার্ডারদের প্রতাপ একটু কম থাকে। এসুযোগ টুকু গ্রহণ করে তাদের ওয়ার্ডের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত একটি সেলের কাছে নিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে জায়রেমা রাংচোয়াঙ্গাকে বলল- এই সেলে আমাদের পু লালডেঙ্গা থাকতেন।
— তাই না কি?
— হ্যাঁ।
— তুমি কি করে জানলে?
— আমাকে একটি ওয়ার্ডারে বলেছে যে, লালডেঙ্গাকে গ্রেপ্তার করে শিলচর জেলে এ সেলেই এনে রেখেছিল। জানেন তিনি যখন এ সেলে থাকতেন তখন খুব পড়াশুনা করতেন। সবসময় একটা না একটা বই নিয়ে উনি পড়তে থাকতেন।
— এটাও বুঝি ওয়ার্ডারে বলেছে?
— হ্যাঁ।
— তুমি পু লালডেঙ্গাকে কোন দিন দেখেছ?
— না, আমি দেখেনি তবে ওনার সমন্ধে অনেক শুনেছি। উনিই তো মিজো ন্যাশনেল ফ্রন্টের লিডার ছিলেন, তাই না?
— হ্যাঁ।
— আচ্ছা তিনি এখন কোথায়?
— যেখানে থাকুন তিনি আমাদেরই আছেন।
— জানেন, ওয়ার্ডারটা বলেছিল যে অনেকদিন এখানে থকার পর হঠাৎ খবর এল পু লালডেঙ্গাকে শিলং এ পাঠিয়ে দিতে। তারপর পু লালডেঙ্গাকে শিলং এ নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মন্ত্রীদের সাথে তার আলাপ আলোচনা হয়। তারপর সেখান থেকে ছেড়ে দেওয়ার পর পুলালডেঙ্গার আর কোন খবর পাওয়া যায়নি।
রাংচোয়াঙ্গা ছেলেটার পাশে দাঁড়িয়েই জয়রেমার সাথে আলাপ করছিল। ইতিমধ্যে ওয়ার্ডারদের চাউনি ওদের উপর দুতিন বার পড়েছে। সেটা লক্ষ্য করে রাংচোয়াঙ্গা ভাবল যে এখানে দাঁড়িয়ে থেকে বেটাদেরকে ক্ষেপানোর দরকার নেই, ও বেটারা এমনিতেই আমাদের উপর ক্ষ্যাপা। যে কোন অজুহাতেই এসে কয়েক ঘা লাগিয়ে দিতে পারে। সে জায়রেমাকে বলল, — এখানে আর দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই। আমাদের ওয়ার্ডে চলে যাই নইলে ওয়ার্ডাররা এসে গালাগাল দিবে। এই বলে রাংচোয়াঙ্গা জায়রেমাকে পাশাপশি নিয়ে হেটে ওদের ওয়ার্ডে চলে গেল।
জেলের ভিতর গতানুগতিক ভাবেই দিনগুলি কেটে যাচ্ছিল। প্রায়ই ওয়ার্ডারদের হম্বিতম্বি এবং চোখ রাঙ্গানি রাংচোয়াঙ্গার মেজাজটাকে কিছু সময়ের জন্য বিগড়ে দিত। এসবের মধ্যেই ফাঁকে ফাঁকে রোজ মিজো জেলা থেকে আগত বন্দীদের সাথে সে আলাপ করে নিত। একদিন বংকনের পাশেই রাংচোয়াঙ্গাদের নিকটবর্তী পুঞ্জীর অধিবাসী থাংলুরার সাথে রাংচোয়াঙ্গার দেখা হয়। জেলে নিত্য নতুন আমদানীদের মধ্যে থাংলুরা ছিল একজন। থাংলুরা বংকনএর পাশেই একটি স্কুলে শিক্ষকতা করত। ক্যান্সার রোগে শয্যাশায়ী বৃদ্ধ পিতা, স্ত্রী এবং ছোট একটি শিশু সন্তান নিয়ে তার পরিবারকে দুঃখ কষ্টের মধ্য দিয়ে মোটামোটি ভাবে চালিয়ে নিচ্ছিল। কিন্তু মিজো জেলার বিশেষ পরিস্থিতির জন্যই অন্যান্যদের মত তাকেও একদিন সকাল হওয়ার আগেই ঘর থেকে টেনে নিয়ে আসে মিজো ন্যাশনেল ফ্রান্টিয়ারের ভলান্টিয়ার্স ভেবে। তাকে যখন সেপাইরা বেঁধে নিয়ে আসে তখন মৃত্যু পথযাত্রী তার বৃদ্ধ পিতা কিছুই বলতে পারেনি। কেবল তার দিকে সজল চোখে তাকিয়ে ছিল। শিশুটিও কিছুই বলতে পারেনি। অশ্রুভারাক্রান্ত মন নিয়ে তার মা তাকে কোলে করে দাঁড়িয়েছিল। মায়ের কোল থেকে ও থাংলুরাকে দেখছিল। ও বুঝতে পারেনি লোকগুলো তার বাবাকে কোথায় বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে। ঘর থেকে বেঁধে এনে তাকে ইন্টারোগেশন, অত্যাচার কিছু থেকেই বাদ দেওয়া হয়নি, এই সবকিছু করার পরই তাঁকে এই জেলে পাঠিয়ে দেয়।
দু’তিন দিন জেলে বন্দী জীবনের অভিজ্ঞতা উপলদ্ধি করার পর থাংলুরা এসে রাংচোয়াঙ্গাকে বলল
— কিহে, কি রকম দেখছ?
— দেখব আর কি? সব হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।
— আচ্ছা আমরা পাহাড়ে থাকি বলে ওরা আমাদেরকে জঙ্গলের জানোয়ার ভাবছে নাকি?
— কি ভাবছে, সেটা বলা মুস্কিল। তবে আমাদেরকে যেভাবে এখানে রাখছে সেটা জানোয়ারদের মতই।
— এভাবে আমাদের কতদিন রাখবে?
— তা আমাদের পক্ষে বলা মুস্কিল, আমাদেরকে ধরে যখন ওদের আওতায় এনেছে তখন ওদের ইচ্ছানুয়ায়ীই আমাদেরকে নিংড়াবে।
— তা অবশ্য ঠিক, ওরা তাদের ইচ্ছানুযায়ীই আমাদেরকে ঘাড়ে কোপ দিতে পারে। কিন্তু তাই বলে বিদ্রোহী মিজোদেরকে দমন করতে পারবে না। এ হয় না, কোন জাতিকেই দমিয়ে দিতে পারবেনা যদি সে জাতি স্বাধীনতা লাভের জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়। স্বাধীনতাকামী জাতির দুর্বার সংগ্রামের কাছে শত্রুকে শেষ পর্যন্ত পরাজয় স্বীকার করতে হয়। এ কথাগুলি ভাবতে ভাবতে রাংচোয়াঙ্গা আবার থাংলুরাকে বলল- জেলের ভিতর আমাদেরকে যত অত্যাচারই করুক না কেন দেখবে ওরা বিদ্রোহী মিজোদেরকে দমন করতে পারবে না।
— বিদ্রোহী মিজোদের মধ্যে ব্যর্থতা আসতে পারে?
— হ্যাঁ, সাময়িকভাবে ব্যর্থতা আসতে পারে। কিন্তু তাই বলে ওরা থামবে না। ওরা সংগ্রাম করবে ব্যর্থ হবে আবার সংগ্রাম করবে বিজয় অবধি, এভাবেই এগিয়ে চলবে। আজকে আমাদের উপর যেভাবে অত্যাচার চালাচ্ছে আমাদের উত্তর পুরুষরা সেটার বিচার করবে। যদি আমাদের কোন ভুল ত্রুটি থাকে তবে ওরা সেটা শুধরে নেবে। জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নূতনের দল এগিয়ে আসবে। জাতীয় বৈশিষ্টকে ওরা তুলে ধরবে, এগিয়ে নিবে।
রাংচোয়াঙ্গা এবং থাংলুরা আলাপ আলোচনা করছে দেখে আরো কয়েকজন বন্দী মিজো তাদের চার পাশ ঘিরে বসলো। এদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা রাজনীতি ভালভাবে বোঝে না। তবে এরা সবাই বুঝে যে মিজোরাম স্বাধীন হওয়ার জন্য যে দাবী এবং সেটা বাস্তবে রূপান্তরিত হতে গিয়ে যে সমস্যা সবাই সে সমস্যাবলীর অংশীদার, তারা এটাও বুঝতে পারে যে তারা সরকারের চোখে অপরাধী। তবে প্রকৃত অপরাধের যাতে বিচার হয় সেইজন্য প্রতিদিন সন্ধ্যার পর প্রর্থনা করে ভগবান যীশুকে বলেন যে, হে প্রভু ওরা আমাদেরকে আমাদের নাড়ীর সাথে সম্পর্ক পুঞ্জী থেকে ছিনিয়ে এনে জেলে পুরে দিয়েছে, আমাদের আপনজন, প্রিয়জনের কাছ থেকে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে। অত্যাচার চালাচ্ছে। আমরা মিজো বলেই আজকে আমরা আমাদের প্রিয়জনের কাছ থেকে অনেক দূর থেকে যে অত্যাচার সহ্য করছি, যে দুঃখ কষ্ট ভোগ করছি তার বিনিময়ে যেন আমাদের ছেলে, মেয়ে, মা, বাবা এবং ভাই বোনদের মঙ্গল হয়। এদের এব্যাপারটা অবশ্য রাংচোয়াঙ্গার ভালো লাগে না। যেভাবে বাস্তব ক্ষেত্রে অত্যাচারিতদের মধ্যে লড়াই চলছে সে ব্যাপারে অদৃশ্য যীশুকে নিয়ে টানাটানি কেন? একপক্ষ চাইছে দাবিয়ে রাখতে এবং অপর’ পক্ষ চাইছে সেটার উচ্ছেদ সাধন করতে অর্থাৎ পদানত হয়ে থাকতে চাইছে না, এই পরস্পর বিরোধী দুপক্ষের সম্মুখ লড়াইয়ে অদৃশ্য প্রভু যীশু কি করতে পারে? অবশ্য জেলের ভিতর ওদের কিছু করার নেই তাই যীশু এসে মাথা জুড়ে বসে থাকে, খোলাখুলি ময়দানে জনগণ শত্রুর সাথে ক্রমাগত সংগ্রামে লেগে থাকলে এমনটি হতে পারে না, সশস্ত্র সংগ্রামের পদ্ধতিই ওদেরকে এমনি ভাবে তৈরি করে নেয় যে ওরা আর অদৃশ্য যীশুকে নিয়ে টানাটানি করার ফুরসৎ পায় না।
যাহোক প্রর্থনা সভায় যারা তাদের আপনজনদের মঙ্গলের জন্য প্রভু যীশুর উপর দায়িত্ব দিয়ে থাকে ওদের মধ্যেও অনেক এসে থাংলুরা এবং রাংচোয়াঙ্গার পাশে বসে তাদের আলাপ শুনছে দেখে রাংচোয়াঙ্গার ভালোই লাগে।
এমনিভাবে ভাবনা এবং আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ জেলের পাগলা ঘণ্টি বেজে উঠল। ওয়ার্ডাররা তাদের বাঁশী বাজিয়ে দৌড়াচ্ছে। এবং অন্যদিকে পাগলা ঘণ্টি বাজাচ্ছে। জেলের ভিতর একটা থমথমে ভাব ক্ষণিকের মধ্যে জেগে উঠল। সবাই হুড়মুড় করে ওয়ার্ডের জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে দেখতে লাগে।
— দেখ দেখ এসিস্টেন্ট জেইলারটা প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে। আর তার পিছু পিছু একটা লোক দা নিয়ে ছুটছে।
— পিছনের লোকটা কি ওকে ধরতে যাচ্ছে নাকি?
— হ্যাঁ দৌড়ানোর নমুনা দেখে তাই মনে হয়।
— আরে বাবা, শেষ পর্যন্ত জেলের ভিতরই খুনোখুনি হবে নাকি?
— পিছনের লোকটা কি পাগল নাকি?
— না না পাগল নয়। ছয় নম্বর ওয়ার্ডের বন্দী। ও ছোকড়া বড় জালিম বেটা। ওয়ার্ডারদেরকে মোটেই পাত্তা দেয় না।
দুতিন মিনিট পর্যন্ত এসিষ্টেন্ট জেইলারটাকে দৌড়ানোর পর দেখা গেল আরো ওয়ার্ডার এসে কোন ক্রমে পিছন থেকে দৌড়িয়ে এসে ছোকরাটাকে ধরে ফেলল। তারপর তাকে বেঁধে নিয়ে একটা সেলে ঢুকিয়ে দরজায় তালা দিয়ে দিল। পেট মোটা জেইলারবাবু তখন হাফ ছেড়ে বাঁচল। অবশ্য প্রাণপণে দৌড়ানোর ফলে হাপানোর ঠেলাটা সামলে উঠতে পারেনি। তখনও ওয়ার্ডারদের মধ্যিখানে ঘেরাও হয়ে হাপাচ্ছিল।
কিছুক্ষণ পর যখন জেলের আবহাওয়া ঠাণ্ডা হয়ে আসে তখন আসল ব্যাপারটা সবার কাছে পৌঁছে যায়। সরকারী জেইলার সাহেব রোজ রোজই বন্দীদের রেশন দিতে গিয়ে মারাত্মক ভাবে কারচুপি করেন। অর্থাৎ চোর, জোচ্চোর সমাজ বিরোধী থেকে আরম্ভ করে যত করম বন্দীই জেলের মধ্যে আসুক না কেন তাদের বরাদ্দ রেশন থেকে কারচুপি করা ওর অভ্যাস। কারাগার তত্বাবধানের জন্য যে সমস্ত আমলারা নিয়োজিত তারা সবাই ঠিকাদারের সাথে সমজোতা করে যত রকম দুর্নীতি আছে সব গুলিকেই প্রয়োগ করে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য। টেণ্ডার বিলির প্রথম পর্যায় থেকে আরম্ভ করে গোদামে আসা পর্যন্ত প্রত্যেক ঘাটে ঘাটেই সরকার বাহাদুরের চোর, জোচ্চোর সমাজবিরোধী এবং অন্যান্য বন্দীদের জন্য বরাদ্ধকৃত রেশন কমে আসতে আসতে গোদামে যেটুকু পৌঁছে তা থেকেও সহকারী জেইলার বাবুর হাতাতে হয়। তাছাড়া আছে সবের প্রতি অত্যন্ত দুর্ব্যবহার। জালিম ছোকরা নিশ্চয়ই সব ব্যাপার না জানলেও সরকারী জেইলার বাবুর চোরের রেশন চুরি করাটা সহ্য হয়নি। ও ভেবেছে যে, ওরা বাইরে রিস্ক নিয়ে চুরি করে, ধরা পড়লে মার খেতে খেতে শরীরের হাড় বেজাগায় চলে যায়। আর ও বেটা জেইলার হয়ে নিরাপদে এখানে চালিয়ে যাচ্ছে। ও বেটা রাস্তার চোরের চেয়ে ঢের হারামি। চুরি করতে হয় তবে বেরিয়ে চোরের মত চুরি কর। তা নয়, বাবু চার দেওয়ালের ভেতর চোরের খাবার চুরি করছে। এসমস্ত ভেবে ভেবেই হয়ত জালিম ছোকরা ভেবেছিল ওকে একদিন আচ্ছা করে জব্দ করতে হবে। তাই আজকে সুযোগ পেয়ে বাবুকে দৌড়াচ্ছিল।
ঘটনাটা জেলের ভেতরকার সমস্ত বন্দীদেরকে আনন্দ দিলেও কারাগারের তত্বাবধানকারী আমলাদের কাছে সাংঘাতিক বলেই গণ্য হল। জেলের ভিতর বন্দী অবস্থায় এতবড় সাহস যে প্রকাশ্য দিবালোকে দা নিয়ে সহকারী জেইলারকে তেড়ে মারতে গেছে। এহেন গুরুতর অপরাধের যথাযোগ্য শাস্তি অবশ্যই দিতে হবে। জেলসুপার, জেইলার এবং অন্যান্য সহকারী জেইলাররা মিলে জালিম ছোকরাকে তার সেলে ঢুকিয়ে হাত পা বেঁধে বেত দিয়ে বেদম প্রহার করল এবং ওকে সেলের ভিতরেই চব্বিশ ঘণ্টা আটকে রাখার নির্দেশ দেওয়া হল।
চোরের বরাদ্দকৃত রেশন চুরি করছে বলে তুমি চোর জেইলারকে মারতে যাবে এ অধিকার তোমাকে কে দিল? আমরা জেইলার। আমরা জেল সুপার। আমাদের উপর দায়িত্ব ন্যস্ত হয়েছে তোমাদের উপর তদারকি করার জন্য। সেখানে আমরা যদি ঠিকাদারের সাথে মিলেমিশে আমাদের বন্দোবস্ত করতে পারি, এদিক সেদিক করে ভাবীকালের জন্য আখের গুছিয়ে নিতে পারি তাহলে তুমি চোর কেন আমাদেরকে মারতে আসবে? রাংচোয়াঙ্গা ভাবল, এটাই বোধ হয় জেলের আমলা বাহিনীর মনোভাব।
সত্যিইত জেলের আমলারা যা ইচ্ছা তাই করুক। তা বলে জেলের বন্দীরা সেটার বিরুদ্ধে কিছু করতে যাবে কেন? আইনের চোখে তাদের সেই মৌলিক অধিকারই নেই। তবে জেলের ভেতর থেকে আমলাদের কীর্তি কাহিনী সম্বন্ধে রাংচোয়াঙ্গা যতটুকু ওয়াকিবহাল হয়েছে তা থেকে ওর মনে হয়েছে, আমলারা জেলের বন্দীদের তুলনায় অনেক বেশী দোষী। আমলাগুলিকে তাদের কীর্তিকলাপের জন্য চোরের সেলে ঢুকিয়ে ওদের নাদুস নুদুস দেহে বেত্রাঘাত করলেও যথাযোগ্য শাস্তির তুলনায় কম।
সে যাহোক, জেলের ভিতর বন্দী জীবন যতই গত হচ্ছিল ততই রাংচোয়াঙ্গা নূতন নূতন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছিল। ক্রমে ক্রমে তাঁর কারাজীবনের দিনগুলি বেড়ে চলছিল। হঠাৎ একদিন বিকালে জেল কর্তৃপক্ষ রাংচোয়াঙ্গা ও তাঁর কয়েকজন সহবন্দীকে ডেকে নিয়ে খবর দিল যে, ওদেরকে শেষ রাত্রে তৈরি থাকতে হবে। উপর মহল থেকে নির্দেশ এসেছে যে ওরা কুড়িজনকে আর এখানে রাখা হবে না। কোথায় কোথায়, কেন এবং কি ভাবেই বা নিয়ে যাবে রাংচোয়াঙ্গা এবং অন্যান্যরা আগাম জানতে পারেনি, রাংচোয়াঙ্গা এবং অন্যান্য সহবন্দীরা কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পেয়ে নানা কিছুই ভাবতে থাকে। সেদিন রাতে আর ঘুম আসেনি। সবাই একটা উৎকণ্ঠা নিয়ে রাত কাটাল।
ভোর হওয়ার পূর্বেই সান্ত্রীরা এসে জেলের ভিতর তাঁদেরকে যে পথ দিয়ে নেওয়া হবে সেটা কর্ডন দিয়ে দিল। এক এক করে সবাইকে বেঁধে লাইন দিয়ে সারি বেঁধে একটা ভ্যানে তুলে নিল। সিপাই সান্ত্রীদের নিস্তব্ধতা যেভাবে পালন করা হচ্ছে তাতে মনে হয় গভীর এক ষড়যন্ত্র করে তাদেরকে বধ্য ভূমিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
সামনে পিছনে এসকর্ট বাহিনীর গাড়ী রাখা হয়েছে। আর মধ্যিখানে বন্দীদেরকে রাখা হয়েছে প্রিজন ভ্যানে যার মধ্যে রয়েছে রাংচোয়াঙ্গা ও তাঁর সহবন্দীরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ী ষ্টটি দিল। গাড়ী আওয়াজ দিয়ে ছুটে চলল। দশ পনেরো মিনিট ভ্যান চলার পর এসে একটা জায়গায় থামল। তারপরই আবার কিছু সংখ্যক সিপাই সান্ত্রীরা কর্ডন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল এবং তার মধ্য দিয়েই ওদেরকে নিয়ে এগিয়ে চলল। এক এক করে ঠেলে দিল রেল লাইনে দাঁড়ানো একটা কম্পার্টমেন্টের মধ্যে। সেখানকার ব্যবস্থাটাও নিরাপত্তার দিক দিয়ে ভালভাবে খেয়াল রেখেই করেছে।
বন্দীদের মধ্যে জায়রেমাকেও ওরা এনেছিল। সে মিজো পাহাড় থেকে বেরিয়ে কাছাড় জেলার বাইরে কোথাও যায়নি। রেলগাড়ী কোনদিন সে দেখেওনি। বন্দী করে আনায় আজ সে গাড়ীতে চেপেছে। গাড়ীর প্রতি একটা আনন্দ ও কৌতূহল থাকলেও অজানা আশঙ্কা ওকে ভীষণভাবে মনমরা করে ফেলছে। সে ধীরে ধীরে রাংচোয়াঙ্গার পাশে এসে বসল এবং বলল- দাদা আমাদেরকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? — তোমার মত আমিও কিছুই জানি না। তবে বোধ হয় অনেক দূরেই নিবে। নইলে রেলগাড়ীতে চাপাবে কেন?
— জানেন, আমার যেন কেন ভয় হচ্ছে।
— ভয় পেয়ে কিছু লাভ হবে না। শুধু শুধু কষ্ট পাবে। কাজেই ভয় পেয়ো না। সাহস সঞ্চয় কর। জায়রেমা কিছুই বলল না। সে চুপ করে বসে রইল।
সময় বাড়ার সাথে সাথে গাড়ী এগিয়ে চলছে। ক্রমাগত একটার পর একটা ষ্টেশন পিছিয়ে ফেলে পাহাড় লাইনের গাড়ী ছুটে চলছে। ষ্টেশনে দুতিন মিনিট থামার অবসরেই লোক গন্তব্য স্থলে পৌঁছে বা গন্তব্য স্থলে পৌঁছতে উঠানামা করছে। প্লেটফরমের চলমান লোকগুলি মাঝে মাঝে রাংচোয়াঙ্গাদের কম্পার্টমেন্টের মধ্যে উকি দিয়ে দেখছে। অনেকে হয়তো তাদেরকে দেখে ভাবছে, আরে বাবা লোকগুলিকে এভাবে বেঁধে মিলিটারীর পাহাড়ায় কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? লোকগুলি কে? ওরা কি চোর ডাকাত না অন্য কিছু? অনেকে হয়ত তাদের চেহারা দেখে ভাবছে যে ওরা বোধহয় বিদ্রোহী মিজো।
মাইলংডিসা, হারাঙ্গাজাও, জাটিঙ্গা প্রভৃতি উত্তর কাছাড়ের পাহাড়ী ষ্টেশনগুলিকে গাড়ী পিছনে ফেলে এগিয়ে চলার সাথে সাথে রাংচোয়াঙ্গা ও জানালার পাশ দিয়ে বাইরে তাকিয়ে মনে মনে অনেক কিছুই ভাবছে। সে ভাবছে সমস্ত পাহাড়ী ষ্টেশন ঘিরে চতুপার্শ্বস্থ যে গভীর অরণ্য বিরাজ করছে সেখানকার সমস্ত অধিবাসীরাই হচ্ছে পার্বত্য উপজাতীয়। বর্তমানে আমরা যে ভাবে অত্যাচারিত নিপীড়িত, ওরা ও নিশ্চয়ই তেমনি ভাবে অত্যাচারিত ও নিপীড়িত। আমরা অত্যাচার এবং নিপীড়নের নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে, প্রকৃত স্বাধীন হতে গিয়ে বাধা বিপত্তিকে উপেক্ষা করে সশস্ত্র সংগ্রামে নেমেছি। ওরা হয়ত একদিন অত্যাচার এবং নিপীড়নের নাগপাশকে ছিন্ন করে বেরিয়ে আসবে। ওদের মুক্ত এবং স্বাধীন হওয়ার পথে যদি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি রুখে দাঁড়ায় তাহলে ওরা সশস্ত্রভাবে মোকাবিলা করবে। তখন ওদের হয়ত এমনি ভাবে যেতে হবে।
রাংচোয়াঙ্গা ভাবছে আর ওর ভাবনার সাথে সাথে গাড়ীও তার আপন ঝিকঝিক আওয়াজ তুলে সর্পিল গতিতে এগিয়ে চলছে। মাঝে মাঝে গাড়ীর হুইসেল পাহাড়ের নিস্তব্ধতা আরও বেশী করে ভেদ করছে। আওয়াজ পাহাড় থেকে পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। গড়ীর হুইসেল শুনে রাংচোয়াঙ্গার মনে হচ্ছে সেটা যেন চিৎকার দিয়ে পাহাড়ের অধিবাসীদেরকে বলছে, হে পাহাড়ের অধিবাসী তোমরা দেখে যাও আমি রাংচোয়াঙ্গা এবং তার সহবন্দীদেরকে বইয়ে নিয়ে চলছি কিন্তু ওদের মধ্যে অনেকেই জানে না কোথায় তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।