জেনারেল থু-আয়া এবং য়‍্যাঙ্গায়া একটি গোপন আড্ডায় বসে আলাপ করছে। মিজো পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকাতে যে সমস্ত ঘটনা ঘটেছে সবগুলির খুটিনাটি খবর জিটিঙ্গাই পারে সবচেয়ে বেশী বলতে। য়‍্যাঙ্গায়া এবং থু-আয়া জিটিঙ্গার জন্যই অপেক্ষা করছে। বিগত দিনের ঘটনাগুলির একটা মোটামোটি চিত্র পাওয়ার আশায় য়‍্যাঙ্গায়া এবং থু-আয়ার আলাপ চলাকালীন অবস্থায় জিটিঙ্গা নিদ্ধারিত সময়ের সামান্য দেরীতে এসে হাজির হল। পৌঁছার সাথে সাথেই জিটিঙ্গাকে থু-আয়া বলল

— কিহে তোমার যেন আজকে কিছু দেরী হয়ে গেল।

— হ্যাঁ, দেরী হয়ে গেল। তবে বোধহয় দেরী তেমন বেশী হয়নি।

— না, তেমন বেশী দেরী হয়নি। আচ্ছা যাহোক, বল খবর সবর কি আছে?

— খবর বলার জন্যইত এসেছি। খবর সবই বলব একটু অপেক্ষা কর। কিছুটা সময় আরাম করে নেই।

— আচ্ছা বস। আরাম কর। বাইলো খাবে নাকি?

— দাও একটা।

থু-আয়া বাইলো পকেট থেকে বের করে জিটিঙ্গাকে একখানা দিল। সে নিজে এবং য়‍্যাঙ্গায়াও একটা একটা করে ধরিয়ে নিল। বাইলো টানার আমেজ নিয়েই জিটিঙ্গা বলল

— খবর বিশেষ সুবিধার নয়।

— কেন কি হয়েছে?

— রাংচোয়াঙ্গা এবং তার সহকর্মী ধরা পড়ে গেছে।

— ধরা পড়ে গেছে?

— হ্যাঁ, ধরা পড়েছে, সবাইকে অক্ষত অবস্থায় ধরে মিলিটারী ক্যাম্পে নিয়ে গেছল। সেখানে খুব অত্যাচার চালিয়ে যখন ওদের কাছ থেকে অন্য কোন খবরই বের করতে পারেনি তখন মিজো জেলার বাইরে বন্দী অবস্থায় চালান দিয়েছে।

— রাংচোয়াঙ্গা তার সহকর্মীদেরকে নিয়ে কি থিংডলের পাশেই ছিল?

— হ্যাঁ।

রাংচোয়াঙ্গা ধরা পড়ার খবরটা অস্বাভাবিক না হলেও অপ্রত্যাশিত। সবাই একসাথে অক্ষত অবস্থায় ধরা পড়াটা একটা বিরাট ভুল না হলে হতনা। নিশ্চয়ই একটা বিরাট ভুল ওরা কোথাও করেছে নইলে এমনিভাবে ধরা পড়ত না। যাহোক ভুল যখন করেছে তখন তার খেসারত কিছুটা দিতেই হবে। তবে আমাদের বাহিনীকে এঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। এসব ভেবেই থু-আয়া আবার বলল- রাংচোয়াঙ্গার বিপর্যয়ের কাহিনীতো বললে আর অন্যান্য খবর কি রকম বল?

— অন্যান্য খবরও বিশেষ সুবিধার নয়।

— সুবিধার নয় মানে?

— সুবিধার নয় মানে মিজো জেলার শেষ সীমান্ত পেড়িয়ে কাছাড়ের ভাগাবাজার কাবুগঞ্জ থেকে আরম্ভ করে সমস্ত স্কুলের ছেলেরাই স্ট্রাইক করেছে, ওদের অভিযোগ মিজোরা কাছাড়ে ঢুকে সাধারণ লোকদের গুলি করে মারছে।

— মিজোরা কাছাড়ে ঢুকে সাধারণ লোকদের গুলি করে মারছে?

— ওদের অভিযোগ তাই।

— যতটুকু খবর পেয়েছি তা হচ্ছে যে, সেমা বাইরেংটির কাছেই শত্রু বাহিনীর সাথে লড়তে থাকে। কিন্তু ওদের বিপুল সংখ্যক বাহিনীর সাথে বেশীক্ষণ লড়া সুবিধা হবে না বলে পিছন ফিরতে থাকে। শেষে এমন হয় যে সংযোগ রক্ষাকারী বাহিনী ওদের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারেনি। তখন সেমাদের রেশনের অভাব দেখা দেয়। তাই ওরা নতছড়ার পাশ দিয়ে রুকনি নদীর ওপারে তুলারতল এবং বাগেওয়ালা বস্তীতে যায়। সেখানকার অদিবাসীদের কাছ থেকে কিছু খাবার আনতে পারে কি সেটা ভেবেই। কিন্তু সেখানকার সমতলের অধিবাসীরা ভয়ে সেমাদেরকে দেখেই গ্রাম ছেড়ে পালাতে থাকে। সেমারা অবশ্য সে গ্রাম থেকে অন্য কিছু না পেয়ে খোলা মাঠ থেকে কয়েকটা গরু ধরে নিয়ে আসে।

জিটিঙ্গার এই প্রতিবেদন শুনে য়‍্যাঙ্গায়া তখন বলল — তুমি যা বললে সেটা থেকে বুঝা যাচ্ছে যে মিজোরা সমতলে ঢুকে গুলি করে সাধারণ লোকদেরকে মারছে ঠিক নয়।

— না সমতলে ঢুকে সাধারণ লোকদেরকে গুলি করে মারছে সেটা ঠিক নয়। তবে ওরা অভিযোগ করছে যে, নতছড়ার আরও পূবে ধলাখাল নামক স্থানে নাকি মিজোরা একটি কলেজের ছাত্রকে ধরে নিয়ে গাছে বেঁধে গুলি করে মেরেছে। তাই ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে সেখানকার স্কুল কলেজের ছাত্ররা ধর্মঘট করছে।

— তাহলে নিশ্চয়ই সেখানকার সাধারণ মানুষ আমাদের উপর বিরূপ মনোভাব পোষণ করছে?

— হ্যাঁ, বিরূপ মনোভাব পোষণ করাই স্বাভাবিক।

— এমনিতেই যত রকম প্রচার যন্ত্র আছে সেগুলির মাধ্যমে আমাদের বিরুদ্ধে প্রচার করা হয়। আর এখন এঘটনায় ওরা ভাবাবেগে আমাদের বিরুদ্ধে আরো বেশীই ক্ষেপাবে।

জেনারেল থু-আয়া ভাবল যে, রাংচোয়াঙ্গাদের ধরা পড়ার চেয়ে সেমাদের তুলারতল এবং বাগেওয়ালা বস্তীতে প্রবেশ করার প্রতিক্রিয়াটাই বেশী ক্ষতিকারক। কারণ এমনিতেই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি সবসময়ই চাইছে কি ভাবে মিজোদেরকে নির্মমভাবে দমন করা যায়। সে সময় যদি এমন কোন ঘটনা ঘটে যেটাকে ওরা হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে জনগণকে ক্ষেপিয়ে দিতে পারে তাহলে সেটাকে ওরা পুরাপুরি ভাবেই ব্যবহার করবে। তুলারতল এবং বাগেওয়ালা বস্তীর ব্যাপারটাকে নিশ্চয়ই প্রতিক্রিয়াশীলরা ভালভাবে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করবে। ওরা হয়ত এ ঘটনাকেই দেখিয়ে বলবে যে, দেখ বেটা জঙ্গলীদের সাহস! মিজো জেলা ছাড়িয়ে এখন সমতলে এসে আক্রমণ চালাচ্ছে। এসমস্ত ভাবনাই জেনারেল থু-আয়ার মনে একটির পর একটি জেগে উঠতে থাকে। আজকে সমতলবাসীদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে যে বিদ্রোহী মিজোদের এই সশস্ত্র আন্দোলন হচ্ছে জাতীয় সত্বা বিকাশের আন্দোলন, এ আন্দোলন মুক্তির আন্দোলন। আন্দোলনে সফলতা শুধু মিজোদের সফলতাই আনবে না, এ আন্দোলন সমতলবাসীদের কাছে প্রতিক্রিয়াশীল শাসনযন্ত্রের আসল রূপ তুলে ধরবে। এ ক্ষেত্রে বিদ্রোহী মিজোদের আন্দোলন পরিচালনা করতে গিয়ে সমতলবাসীদের সমর্থন আনতে হবে। কাজেই এমন কোনকিছু করা উচিত নয় যাতে সমতলবাসী বিদ্রোহী মিজোদের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করতে পারে। সেমা যে উদ্দেশ্যেই তাঁর সহকর্মীদেরকে নিয়ে তুলারতল এবং বাগেওয়ালা বস্তীতে যাক না কেন সেটার সুত্র ধরে সাময়িক ভাবে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী সাধারণ সমতলবাসীদেরকে মিজোদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলবে। মিজো পাহাড়ের সমস্ত অঞ্চলটাই নিরাপত্তা বাহিনীর নিকট অর্পণ করা হয়েছে বিদ্রোহী মিজোদেরকে দমন করার জন্য। কিন্তু নিত্য নূতন শক্তি সংহত করে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী মিজোদেরকে কোন ভাবেই দমিয়ে রাখা যাচ্ছে না। ঢেউয়ের মত একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত ছড়িয়ে পড়ছে। যারা আজ লড়তে গিয়ে বেকায়দায় পড়ে শত্রুর হাতে ধরা পড়ছে তাদের শূন্যস্থান পূর্ণ করার জন্য নূতন দল এগিয়ে আসছে। বিদ্রোহী মিজোদের ক্রমবর্ধমান শক্তিতে ভীত হয়ে সরকার সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা অনুসৃত নীতিই গ্রহণ করছে বিদ্রোহীদেরকে দমন করতে। যারা সশস্ত্র ভাবে হাতিয়ার নিয়ে দৈনন্দিন লড়াই চালাচ্ছে তাদেরকে অন্যান্যদের নিকট থেকে পুরাপুরি ভাবে বিচ্ছিন্ন করার জন্য মিজো পাহাড়ের সমস্ত অধিবাসীদিগকেই জোর করে সরকার কর্তৃক তৈরি Protected and progressive village এ এনে ঢুকিয়ে দিচ্ছে।

হিটলারের ইহুদি নিধনযজ্ঞ আজ কারো অজানা নয়। আবালবৃদ্ধবনিতা লক্ষ লক্ষ ইহুদিদেরকে Concentration Camp এ ঢুকিয়ে নির্মম হত্যার কাহিনী যে কোন সুস্থ মানুষের মনে শিহরণ জাগায়। হিটলারের অমানুষিক ইহুদি নিধন যজ্ঞের কলঙ্কময় ইতিহাসকে সাম্রাজ্যবাদীরাও নিন্দা করছে। কিন্তু তাই বলে কি আজও হিটলারের নির্মম অত্যাচারের মত ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে না? হিটলার নেই, তার Concentration Camp ও নেই। কিন্তু নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করতে, অন্যকে দাবিয়ে রাখতে যে অত্যাচার এবং নিপীড়নের নির্মম পদ্ধতি সেটা ঠিকই আছে। বরং সাম্রাজ্যবাদী এবং তার সেবাদাসরা হিটলারের ব্যাপক গণহত্যা পদ্ধতির চেয়েও বেশী নির্মম পদ্ধতিতে মুক্তিকামী দেশের জনগণকে অত্যাচার করে যাচ্ছে।

মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদীরা স্বাধীনতাকামী দেশে অন্যায় ভাবে হস্তক্ষেপ করে সেখানকার জনগণকে ব্যাপকভাবে হত্যা করছে। লোকগুলি ধরে ধরে এনে খাচায় পুড়ে দিচ্ছে। Strategic Hamlet তৈরি করে সেটার মধ্যে জনগণকে আটকে রেখে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে দিচ্ছে। নাৎসী বাহিনীর Concentration Camp এবং সাম্রাজ্যবাদীদের সৃষ্ট Strategic Hamlet এর মধ্যে মূলগত তফাতটা কোথায়? নাৎসীবাহিনী তাঁদের উদ্দেশ্য ক্ষণিকের মধ্যেই চরিতার্থ করে ফেলত। ইহুদিদেরকে ধরে নিয়ে নিমেষের মধ্যে ওদের জীবনদীপ শেষ করে দিত। আর আজ আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদ কি করছে? ভবিষ্যত বংশধরেরা যখন ইতিহাসের হিসাব নিকাশ করবে ওরা তখন দেখবে আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদী বাহিনীর নির্মম অত্যাচার কোন অংশেই নাৎসী বাহিনীর নির্মম অত্যাচারের তুলনায় কম নয়। আজকে মিজো জেলাতে P.P.V. গুলিও আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদীদের Strategic Hamlet এর ধাচেই তৈরি করা হয়েছে। Strategic Hamlet গুলিতে ভিয়েতনামের সংগ্রামী জনগণকে আটকে রেখে দমিয়ে রাখার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। ভিয়েতকংদেরকে বিচ্ছিন্ন করে সমূলে বিনাশ করাই উদ্দেশ্য। কিন্তু হায়! বিপুল ইয়াঙ্কি বাহিনীর সেনাগুলিই ভিয়েতকংদেরকে বার্তা পৌঁছাচ্ছে। স্বদেশকে মুক্ত করার দৃঢ় আত্মপ্রত্যায় নিয়ে ছোট একটা দেশের জনগণ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্যবাদী দেশ আমেরিকাকে নাস্তানাবুদ করছে। ওরা সশস্ত্র যুদ্ধ চালিয়ে প্রমাণ করে দিচ্ছে যে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যত বিপুলাকারই হোক না কেন আজ মুক্তি কামী ছোট্ট দেশ গুলির কাছে সাম্রাজ্যবাদ পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে।

শিলচর থেকে আইজলে যোগাযোগের বড় রাস্তার পাশে এবং আইজল থেকে লুংলের রাস্তার পাশে PPV তৈরি করা হয়েছে। হাজার হাজার মিজো, যারা পূর্ব পুরুষদের আমল থেকে বিভিন্ন পুঞ্জীতে বসবাস করে আসছে সে সব পুঞ্জী থেকে উচ্ছেদ করে পুরুষ, স্ত্রী এবং শিশু নির্বিচারে জোর করে PPV তে এনে জড় করছে। প্রথম বার আঠারোটা PPV তৈরি করে মোট ষাট হাজার মিজো নরনারীকে বলপ্রয়োগ করে বাধ্য করেছে সেখানে বসবাস করতে। পূর্বপুরুষদের ভিটে মাটি থেকে উচ্ছেদ করে PPV তে এনে জড় করার কথা উল্লেখ করে সংবাদিক লিখেছে যে

— The relocation of Mizo villagers from their ancestral lands to new settlements has been met with considerable sorrow, as no population transfer can ever be entirely without contention. Despite official assurances that the Mizo people have been successfully relocated and are now content in their new homes, the reality is that they long for their former abodes, which hold the memories of their ancestors.

প্রত্যেকটি PPV সামরিক বাহিনীর লোকেরা পাহাড়া দিয়ে থাকে। সেখানকার বসবাসকারী প্রত্যেকটি ব্যক্তিকেই সামরিক কর্তাব্যক্তিদের অনুমতি নিয়ে নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে যেতে হয় এবং সে এলাকা থেকে নির্দিষ্ট সময়ে ফিরে আসতে হয়। সেটার ব্যতিক্রম হলেই মুসকিল। আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদ যে ভাবে Kill all, burn all, and destroy all নীতি অবলম্বন করেও ভিয়েতনামের জনগণকে দমিয়ে রাখতে পারছে না এখানেও সরকারের শাসনযন্ত্র মিজোদেরকে PPV তে আটক করে দমন করতে পারছে না। যুদ্ধরত বিদ্রোহী মিজোদেরকে পারেনি ব্যাপক মিজো জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে। বড় বড় সংবাদপত্র গুলিই সমানে স্বীকার করে যাচ্ছে যে মিজো পাহাড়ের আইজল সহর অর্থাৎ যেখানে বিদ্রোহী মিজোদেরকে দমন করার জন্য সরকার প্রসাশনিক ব্যবস্থার মূল কেন্দ্র স্থাপন করেছে সেখানকার জনসাধারণের কাছ থেকে যুদ্ধরত বিদ্রোহী মিজোরা নিয়মিত ভাবে টাকা এবং অন্যান্য সাহায্য পেয়ে যাচ্ছে। টাকা পয়সা এবং অন্যান্য সাহায্য কেবলমাত্র পাহাড়ের সুদূর অভ্যন্তরে অবস্থিত অঞ্চল থেকেই পেয়ে থাকে সেটা নয়। ওরা PPV তে আটক হাজার হাজার মিজোদের কাছ থেকেও বিভিন্ন ভাবে সাহায্য পেয়ে থাকে। এভাবে PPV করে জনগণকে আটক করেও বিদ্রোহী মিজোদের বিচ্ছিন্ন করতে না পেরে প্রশাসক গোষ্ঠী আরও ক্ষেপে যাচ্ছে।

সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক কুমারমঙ্গলম একবার PPV গুলি পরিদর্শন করতে আসেন। PPV তৈরি করে প্রসাশন ব্যবস্থা কায়েম হয়েছে, সেটাকে তিনি প্রসংশা করেন। PPV গুলিতে মিজোদের রেখে সরকার রেশন দিত। সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক PPV গুলি পরিদর্শন করে চলে যাওয়ার কিছুদিন পরই ষাট হাজার মিজোদের রেশন বন্ধ করে দেয়। একথাটা বলতে গিয়েই একটি সাময়িক পত্রিকাতে লিখে

Upon a visit from Kumarmangalam, the Indian Army’s Chief of Staff, who commended the PPVs’ efficient operation, the reactionary Indian rulers swiftly implemented an inhumane measure: they completely halted food rations for the 60,000 inmates of the PPVs.

কিন্তু এতসত্বেও সাহসী বিদ্রোহী মিজোদের সশস্ত্র অভিযান বন্ধ করতে পারেনি। ওৎপেতে থেকে ওদের আক্রমণ অভ্যাহত গতিতেই চালিয়ে যাচ্ছে। সামরিক বাহিনীর Out post উড়িয়ে দিচ্ছে। আচমকা আক্রমণ চালিয়ে ঘায়েল করে রাইফেল ছিনিয়ে নিচ্ছে। বারবার প্রশাসকদের ব্যবস্থা বানচাল করে দিচ্ছে। এতে প্রশাসক গোষ্ঠীও ক্ষেপে ভাবে যে, যুদ্ধরত বিদ্রোহী মিজোদেরকে ব্যাপক জনগণের নিকট থেকে পুরাপুরি ভাবে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। সমস্ত রকমের যোগাযোগ বন্ধ করে দিতে হবে। যাতে ওরা খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিষ কোন রকম ভাবে পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করতে না পারে। এমনিভাবে ওদেরকে বিচ্ছিন্ন করে অনাহারে মারতে হবে। এসবকিছু কার্যকরী করতে গিয়েই প্রশাসক গোষ্ঠী কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করে। কর্ম পদ্ধতিটা কি হবে সেটা লিখতে গিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর পত্রিকায় উল্লেখ করেছে

— Shillong reports indicate that an additional 40,000 Mizo villagers are to be relocated to progressive villages as part of a new regrouping operation. This initiative, expected to conclude within two months, aims to provide Mizos with enhanced security, protection, and access to modern farming facilities. Currently, 237,000 Mizo villagers have already been settled in these regrouped progressive villages, benefiting from improved security and development. The district’s total population is 350,000. The decision to restart population transfers was made at a high-level meeting in Shillong, where Lt. Gen. Arora briefed attendees on the current situation in the Mizo hills and stressed the necessity of further village regrouping due to recent incursions by armed Mizo rebels.

জিটিঙ্গার প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে জেনারেল থু-আয়ার ভাবনা অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছিল। থু-আয়া একা থাকলে সে ভাবনা হয়ত জট পাকিয়ে পাকিয়ে আরও এগিয়ে চলত কিন্তু জিটিঙ্গা এবং য়‍্যাঙ্গায়া তার পাশে থাকায় সেটা সম্ভব হয়নি। য়‍্যাঙ্গায়া প্রশ্ন করে তার ভাবনার মধ্যে ছেদ টানল। সে বলল — আমার মনে হয় শাসক গোষ্ঠী divide and rule নীতিই আমাদের উপর প্রয়োগ করছে।

— কি রকম ভাবে?

— ওরা বিদ্রোহী এবং সরকারের অনুগত ভক্ত মিজো এই দু’ভাগে ভাগ করে নিয়েছে। যাদেরকে PPV তে এনে আটক রেখেছে ওদেরকে বলবে যে, দেখ বিদ্রোহী মিজোদের জন্যই তোমাদের এ অবস্থা হয়েছে। ওদের অত্যাচার এবং নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই দেওয়ার জন্যই তোমাদেরকে PPV তে এনে জড়ো করা হয়েছে। বিদ্রোহীরা এধরণের সশস্ত্র যুদ্ধ না চালালে তোমাদের এ ধরণের দুঃখ কষ্টের উদ্ভব হত না। আজকে তোমাদের যে দুঃখ কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছে সবটাই বিদ্রোহীদের জন্য হচ্ছে।

— মুক্তি যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সশস্ত্র মিজোদের প্রতি বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি করার জন্য ওরা প্রতিনিয়ত PPV তেএধরণের প্রচার চালাতে পারে। আবার এও হতে পারে যে ওরা মিজো জেলার বাইরে বিভিন্ন প্রচার যন্ত্রের মাধ্যমে প্রচার চালাবে যে, বিদ্রোহী মিজোদের অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে অনুগত মিজোরা তাদের আদি পুঞ্জী ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে। তাই সরকার ওদের নিরাপত্তার দিক লক্ষ্য রেখে ওদের নূতন বসতি সৃষ্টি করছে। PPV গুলি অনুগত মিজোদের নিরাপদ বসতির নূতন নামান্তর।

— ওরা বাইরে ভিতরে যাই প্রচার করুক না কেন, দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাই আমাদের লোকেদেরকে ঠিক পথে এগিয়ে নিবে।

— তা ত বটেই। আমাদের অভিজ্ঞতাই আমাদেরকে সাহায্য করবে ঠিক পথে এগিয়ে যেতে।

তবে ওদের ইচ্ছানুযায়ী প্রচার বাইরের লোকদেরকে আমাদের সংগ্রাম সম্পর্কে সাময়িক ভাবে বিভ্রান্ত করবে। অবশ্য আমাদের সংগ্রাম উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছলে সে সংগ্রামই সঠিকবার্তা বাইরের লোকেদের কাছে পৌঁছে দিবে।

থু-আয়া এবং য়‍্যাঙ্গায়া এক নাগাড়ে আলাপ করে চলছিল। জিটিঙ্গা তাদের দুজনের আলাপের মধ্যে অংশগ্রহণ করেনি। সে মন দিয়ে শুনছিল। য়‍্যাঙ্গায়া এবং থু-আয়া আলাপ করে থামার পর জিটিঙ্গা প্রায় বক্তৃতার মতই বলে চলল। সে বলল যে, বস্তুত পক্ষে ১৯৪৭ ইংরেজীর পর বৃহৎ ভারতবর্ষ আজ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীদের Prison House এ পরিণত হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ, সামন্ততন্ত্র এবং মুৎসুদ্দি পুঁজিপতিদের ক্রমবর্দ্ধমান শোষণ এবং নিপীড়ন বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী এবং পার্ব্বত্য উপজাতিদের জীবনকে অসহনীয় দুঃখ কষ্টের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। ক্রমবর্দ্ধমান চাপে তাদের সংগতি এবং উপজীবিকা দ্রুত হারাচ্ছে। আজকে মিজোরাও অত্যন্ত নির্মম ভাবে শোষিত হচ্ছে। আসাম সরকারের Socio-economic পর্যালোচনাতে দেখা যায় যে মিজোরা অত্যন্ত চড়া সুদে ধার করা টাকার চাপে জর্জরিত। গড়ে প্রতিটি মিজো পরিবার বছরে একশ বত্রিশ টাকা ঋণী। ১৯৪৭ ইংরেজীর পূর্বে মিজোদের সাধারণ ব্যবসা পাশ্ববর্তী অঞ্চলে চালিয়ে যেত। কিন্তু দেশ বিভাগের ফলে সেসমস্ত অঞ্চল এখন পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত। ফলস্বরূপ পূর্বের সে সমস্ত অঞ্চলের সাথে ব্যবসার সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আজ অবধি পাল্টা কোন বাজার পাওয়া যায়নি যেখানে সেখানকার মত ব্যবসা চালানো যায়। এতে মিজোদের অর্থনৈতিক অবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। আজকে সরকার সেদিকে কতটুকু নজর দিচ্ছে? আজকে নির্যাতন থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য যে সশস্ত্র অভিযান চালানো হয়েছে সেটার বিরুদ্ধে সরকারের প্রচারযন্ত্র যতটুকু সোচ্চার তার তুলনায় মিজোদের দূরাবস্থার কথা কতটুকু প্রচার করছে? যা প্রচার করছে এবং যা ব্যবস্থা গ্রহণ করছে সেটা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে তারা তাই করছে যা নাকি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ মালয়ের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের সংগ্রামীদের বিরুদ্ধে করেছিল। তারা তাই করছে যা নাকি আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদ ভিয়েৎকংদের বিরুদ্ধে করছে। বর্তমানে তাই করছে যা নাকি নেহেরু সরকার প্রথম তেলেঙ্গানাতে ১৯৪৮ ইংরেজীতে কৃষকের সশস্ত্র সংগ্রামের বিরুদ্ধে এবং পরে নাগাদের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের বিরুদ্ধে করেছিল।

বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও অন্যান্য অঞ্চলের অধিবাসী যদি নির্যাতন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এবং শোষণ ও নির্যাতনের হাতিয়ারকে উচ্ছেদ করার জন্য বিদ্রোহ ঘোষণা করে তাহলে তাদেরকে মোকাবিলা করার জন্য শাসকগোষ্ঠী অনেক আগে থেকেই তাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছিল। ১৯৬২ ইংরেজীর পর সৈনিকদের মধ্যে বাছাই করে Anti guerrilla war fare পরিচালনা করার জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় যাতে ওরা বিভিন্ন জাতীগোষ্ঠীর মুক্তি আন্দোলনে অনুসৃত গেরিলা যুদ্ধ দমন করতে পারে। কিন্তু এতসব করা সত্বেও বিক্ষুদ্ধ মিজো মুক্তি সংগ্রামীরা Anti guerrilla war fare প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত সৈনিকদেরকে Banana leaf সৈনিকদের মতই ব্যবহার করছে। মিজো কুকি বিদ্রোহীরা ডিমাপুর ইম্ফল হাইওয়েতে অবস্থিত সেতু উড়িয়ে দিয়েছে। কালাসপুর জঙ্গলের পাশেই অবস্থিত একটি অঞ্চল থেকে প্রতিক্রীয়াশীলদের পাঁচজন চরকে ধরে নিয়ে শাস্তি দিয়েছে। বিশজন বিদ্রোহী মিজো এমবুশ করে মিজো জেলার নাহলান অঞ্চলে অত্যন্ত সফলতার সহিত সৈনিকদেরকে ঘায়েল করেছে। আচমকা আক্রমণে শত্রুপক্ষের একজন মেজর নিহত হন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রচার করেনি। ওরা তাদের প্রচার যন্ত্রের মাধ্যমে বিদ্রোহী মিজোদের বিজয় কাহিনী প্রচার করতে ভয় পায়। কি জানি সেই বিজয় কাহিনী হয়ত অন্যান্যদের মনে উৎসাহ সঞ্চার করে এবং ওরাও উদ্বুদ্ধ হয়ে বিদ্রোহী মিজোদের পথ অনুসরণ করে। তাই বিদ্রোহী মিজোদের বিজয় অভিযানের কাহিনী, ওদের মুক্তি আন্দোলনের উদ্দেশ্য এবং বক্তব্য যতই পারা যায় প্রচার না করে চাপা দিয়ে রাখা ভাল।

কিন্তু সশস্ত্র সংগ্রামের ধারা এমনই যে সেটা সমস্ত কিছু ভেদ করে আপনগুণে আসল সত্য নিয়ে বের হয়ে আসে। নানা ভাবে চাপা দিয়ে আসল সত্যকে গোপন করা যায় না। তা যদি না হয় ভিয়েতনামের ভিয়েতকংদের বিজয় অভিযানের কাহিনী আমেরিকার জনসাধারণের মনে কিভাবে সাড়া জাগায়? আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদীকে ভিয়েতনামে তাদের হস্তক্ষেপ করার বিরুদ্ধে কেন আমেরিকার জনগণ জনমত গঠন করে? আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদ কি জোর গলায় প্রচার করে যে তারা অন্যায়ভাবে ভিয়েতকংদের উপর জুলুম চালাচ্ছে? নিশ্চয়ই না। ভিয়েতকংদের সশস্ত্র সংগ্রামের উচ্চপর্যায়ই তাদের খবর চারিদিকে পৌঁছে দেয়। সশস্ত্র সংগ্রামের ঠেলা সামলাতে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদীরা বাধ্য হয় কিছু আসল সত্য প্রকাশ করতে।

মিজোদের ব্যাপারও অনেকটা সে রকম। ওরা বলে না যে মিজোদের উপর অন্যায় জুলুম চালানো হচ্ছে, মিজোরা তাদের সর্বাঙ্গীন স্বাধীনতার জন্য ঠিকই উপযুক্ত। বরং উল্টো প্রচার চালায় যে, বিদ্রোহী মিজোরা যা করেছে সেটা অন্যায়। তাদের সেই অন্যায় দাবীকে কোন মতেই স্বীকার করা যায় না। তারা যদি তাদের পথ পরিত্যাগ না করে তাহলে সেটাকে নিশ্চয়ই দমন করা হবে। দমন করার ব্যবস্থা বা পদ্ধতি যতই নির্মম হোক না কেন। কিন্তু এত সব করা সত্বেও বিদ্রোহী মিজোদের আসল খবর বেরিয়ে আসছে।