আজকে আমরা আমাদেরকে যে মিজো বলছি সেটা হচ্ছে আমাদের নূতন নামাকরণ। আমাদের ভাষায় মিজো মানে হচ্ছে যারা উঁচুতে বাস করে অর্থাৎ those who live in the high land. আমরা লুসাই, কুকি, মহার, পাইতো, রিয়াং, পাওয়াই, চাকমা, লাখের প্রভৃতি বিভিন্ন গোষ্ঠীর সম্মিলিত নাম দিয়েছি মিজো।
এখন পর্যন্ত এমন কোন তথ্য সমৃদ্ধ আমাদের কোন পুরাতন গ্রন্থ নেই যা থেকে আমরা আমাদের প্রাচীন ইতিহাস জানতে পারি। তবে বংশ পরম্পরাগত ভাবে মুখে মুখে যে কাহিনী চলে এসেছে তা থেকে আমরা জানতে পারি এ অঞ্চলের সবচেয়ে পুরানো বাসিন্দা ছিল লুসাই, চীন এবং কাচিন এই তিনটি গোষ্ঠী। তারা সম্ভবত সুদুর চীন সীমান্ত থেকে ক্রমে ক্রমে গভীর জঙ্গলের মধ্যপথ ধরে এগিয়ে বার্মা হয়ে এখানে এসে বসবাস করতে আরম্ভ করে। তাদের বংশধররাই ক্রমে ডাল পালা মেলে বিভিন্ন গোষ্ঠীতে এ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যেক গোষ্ঠীরই সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি সেই গোষ্ঠীকে পরিচালনা করতেন। তাকে বলা হত লাল।জনসংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে যখন সমস্যা বাড়তে থাকে তখন লালরা তাদের নিকটবর্তী অঞ্চলের লালের সাথে ক্রমাগত যুদ্ধে মেতে থাকত। তখন যুদ্ধটা হত লালদের দ্বৈতযুদ্ধ। দুই পুঞ্জীর সীমান্ত অঞ্চলে দাঁড়িয়ে দুই গোষ্ঠীর প্রধান দুই লাল সাধারণ ভাবে নিজেদের প্রচলিত অস্ত্রদ্বারা যুদ্ধ করত। সে যুদ্ধ চলতে থাকত যতক্ষণ পর্যন্ত না একজন মারা যেত। তারপর বিজিত লালের অনুগামীরা বাধ্য হয়ে বিজয়ী লালের অনুগামী হত। বিজয়ী লাল বিজিত লালের মাথার খুলি নিয়ে নিজের গৌরব বৃদ্ধির জন্য বাড়িতে রেখে দিত। যে লাল যতবেশী খুলি নিয়ে রাখতে পারত সেই ছিল সে সময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী। এমনিভাবে বিভিন্ন লালদের পরিচালনাধীন বিভিন্ন গোষ্ঠীগুলির জীবনযাত্রায় কালের প্রবাহে বিবর্তন ঘটে এগিয়ে চলছিল। লালরা তাদের ক্রমে ক্রমে বর্দ্ধিত জনসংখ্যা নিয়ে কেবলমাত্র পাহাড়ের সীমাবদ্ধ গভীর অরণ্যে থাকতে পারেনি। জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপে ওরা বাধ্য হয়ে নিজেদের বসবাসের অঞ্চলের পরিধি বৃদ্ধি করছিল। অরণ্যের দুর্গম অঞ্চল থেকে ক্রমশঃ সমতলের নিকটবর্তী পাহাড়ী টিলায় ছড়িয়ে পড়েছিল। মনিপুর, কাছাড় এবং ত্রিপুরা প্রভৃতি সীমান্ত অঞ্চলের পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে ওদের পুঞ্জীর বিস্তৃতি লাভ করেছিল।
বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ যখন মধ্যাহ্নের সূর্যকিরণের মত ভারতে প্রভাব বিস্তার করে দেশের শাসন ব্যবস্থা চালিয়ে যাচ্ছিল তখন এ সমস্ত পাহাড়ী অঞ্চলের জাতিগোষ্ঠীর আচরণ তাদেরকে বিচলিত করে তুলছিল। তাদের উপর বৃটিশ সরকারের কর্তৃত্ব স্থাপন করতে গিয়ে যে ব্যবস্থা অবলম্বন করেছিল সে গুলির ইতিহাস থেকে মিজোদের বীরত্বের কাহিনী প্রচুর জানা যায়।
আজ থেকে দেড়শ বছরেরও অনেক আগে ১৮৪৪ ইংরেজীর জুনমাসে মনিপুর রাজ্যের অন্তর্গত থাডই এবং কাইয়ুং বস্তীর ৩০ জন কুকি তাদের প্রধানের নেতৃত্বে বার্মার দুর্গম বিভীষিকাময় পাহাড়ের গভীর অরণ্যের মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে পথ করে কাছাড় জিলার বনরাজ পরগণার দক্ষিণে অবস্থিত আরেকটি কুকি পুঞ্জীতে এসে বেপরোয়া আক্রমণ চালায় এবং আক্রমণকারী কুকিরা সেই পুঞ্জীতে ব্যাপক হত্যা চালিয়ে আটজন কুকির মাথা নিয়ে আবার চলে যায়। মণিপুরের সীমান্ত অঞ্চল থেকে কাছাড়ে এসে এই আক্রমণ তৎকালীন সরকার বাহাদুরের আমলাদেরকে চিন্তিত করে তুলে এবং সেটার জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা যাতে কার্যকরী হয় সেদিকে নজর দেয়। তখনকার সুপারিন্টেনডেন্ট ই আর লায়নস উপরোক্ত ঘটনা ঢাকাতে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ 15th div এর কমিশনারকে জানান। তাদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন আক্রমণকারী কুকিরা হচ্ছে নাগাদেরই একটি উপজাতি। গণহত্যাকে ওরা অপরাধ না মনে করে পরম আনন্দদায়ক ঘটনা বলে গণ্য করে। তাদের প্রথা অনুয়ায়ী কোন গোষ্ঠী প্রধানকেই মৃত্যুর পর কবরে তার মৃতদেহের সাথে মানুষের মাথার খুলি স্থাপন না করে কবর দেওয়া হয় না এবং একজন মানুষের গুরুত্ব হিসাব করা হয় তাঁর বাড়ীতে সজ্জিত মানুষের মাথার খুলি দেখে।
“These so-called ‘Kookies’ are a Naga hill tribe from this region. For them, murder is not a crime but a source of great delight. According to their customs, a chief cannot be buried without a certain number of human skulls placed in the grave, and a man’s importance is measured by the number of skulls decorating his house.”
থাড়ুই এবং কাইয়ুং পুঞ্জীর ৩০ জন কুকি তাদের প্রধানের নেতৃত্বে হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার পর লায়নস সাহেবের তৎপরতায় সে দলের মাত্র একজন কুকিকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিচার বিভাগীয় দণ্ডাদেশ তার উপর যাতে বর্তায় সেটার জন্য অভিযোগ ও তথ্য সম্বলিত নুথিপত্র লায়নস সাহেব 15th div এর কমিশনারের নিকট পাঠান। তার কথা লিখতে গিয়ে লিখেন।
One member of the party has been apprehended who confesses that he accompanied the others at the behest of their rajah for the express purpose of collecting heads. Although he denies involvement in the actual murders, he is clearly an accessory before and after the fact. When the village was attacked, all but one of the men were absent, and it appears unlikely that further evidence will be obtained.
I therefore have the honor to forward, in a separate packet, the “Nuthe.” This case is, fortunately, a very unusual one for your perusal and orders before committing the prisoner for trial at the session.
ইহা ছাড়াও মনিপুরের পলিটিকেল এজেন্টকে লায়নস সাহেব অনুরোধ করে বলেছেন যে, তিনি যেন নিজ উদ্যোগ নিয়ে সেখানকার রাজাকে প্ররোচিত করেন যাতে এধরণের আকষ্মিক আক্রমণ না ঘটে।
ব্রিটিশ সরকার নিজস্ব সুবিধার্থে মনিপুর রাজ্য, কাছাড় জেলা প্রভৃতি অঞ্চলে ভৌগলিক সীমারেখা টেনে ভাগ বাটোয়ারা করে প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু করলেও সে সমস্ত অঞ্চলের পাহাড়ে অবস্থিত লুসাই কুকি প্রভৃতি উপজাতিরা তাদের তরফ থেকে নিজেদেরকে সরকারের প্রশাসনিক আওতা থেকে মুক্ত রেখেছিল। বিভিন্ন অঞ্চলের সীমারেখা তাদের আটকে রাখতে পারেনি। তারা নিজেদের অনুশাসনই মেনে চলত এবং স্বভাবসিদ্ধ ভাবে এক অঞ্চলের পুঞ্জী থেকে অন্য অঞ্চলের পুঞ্জীতে গিয়ে তাদের আক্রমণ অব্যাহত রাখছিল। ব্রিটিশ সরকার তাদের অনুশাসন উপজাতিদের উপর প্রয়োগ করার চেষ্টা চালিয়ে গেলেও উপজাতিরা বারংবার সেটা উপেক্ষা করেছে।
১৮৪৯ ইংরেজীর নভেম্বর মাসের ছয় তারিখ কাছাড় থেকে দক্ষিণে আট দশদিনের পথ দূরে অবস্থিত জায়গা থেকে লালিংবং রাজা অর্থাৎ লাল লালিং বুং তার দুইশত অনুচরদেরকে একনলা বন্দুক, বর্শা, দা প্রভৃতি অস্ত্র শস্ত্রে সজ্জিত করে নিয়ে এসে কাছাড় জেলায় সোনাপুর পরগনার সৈদপুর গ্রামের দক্ষিণ পশ্চিমে এবং মাকা ছুবরী বিলের নিকট অবস্থিত শিয়াহ পাও পুঞ্জীতে আক্রমণ চালায়। লালিং বুং তার অনুচরদের নিয়ে বীরদর্পে শিয়াহপাও পুঞ্জীর অধিবাসীদেরকে হত্যা করতে থাকে। সর্বমোট চৌদ্দজন স্ত্রীলোক এবং পনেরজন পুরুষকে হত্যা করে বাকী বিয়াল্লিশ জনকে বন্দী করে। বেপরোয়া হত্যাকাণ্ড চালিয়ে নিজের গৌরব বৃদ্ধির স্বাক্ষর রাখার উদ্দেশ্যেই লালিং বুং তার সম্প্রদায়কে নিয়ে ঊনত্রিশটি মৃতদেহ থেকে কেবলমাত্র একটি ছাড়া বাকী সবগুলি থেকেই মুণ্ডু কেটে নিয়ে যায়। যাওয়ার পূর্বে শিয়াহপাও পুঞ্জীতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে যায়।
তার পরদিন ৭ই নভেম্বর তারিখ ফেরার পথে লালিং বুং শিয়াহ পাও থেকে সামান্য দূরে সাবাজপুর গ্রামের পশ্চিমে আবস্থিত লালুং কুকীর পুঞ্জী এবং অগমাস পুঞ্জীতে আক্রমণ করে। কিন্তু নিকটবর্তী শিয়াহপাও পুঞ্জীর আক্রমণের খবর ছড়িয়ে পড়ায় লালুং কুকীর পুঞ্জী এবং অগমাস পুঞ্জীর সমস্ত অধিবাসীরাই পুঞ্জী ছেড়ে পালিয়ে যায় এবং অনেকে সমতলে নেমে আসে। লালিংবং তার সহচরদেরকে নিয়ে খালি পুঞ্জীতে আগুন ধরিয়ে চলে যায়। তার বিজয় অভিযান অপ্রতিহত থাকে।
তখন কাছাড় জেলার সুপারেনটেনডেন্ট ছিলেন জি ভারনার সাহেব। শিয়াহ পাও পুঞ্জীতে ঘটনা ঘটবার দিনই সন্ধাবেলা একটি বালক এসে ভারনার সাহেবের কাছে বেপরোয়া গণহত্যার এবং আগুন লাগানোর খবর পেশ করে। লুচাই-কুকীর আক্রমণের খবর শুনেই সাথে সাথে ভারনার সাহেব কাছে দারোগাকে না পেয়ে পুলিশ জমাদারকে পাঠান বিষয়টি অনুসন্ধান করতে। ভারনার সাহেব পুলিশ জামাদারকে পাঠিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন কি খবর নিয়ে আসে সেটা জানার জন্য। সেদিন রাত্রে এবং পরের দিন দিনের বেলায়ও কোন খবর আসেনি। রাত্রে বরকন্দাজ ফিরে এসে খবর দেয় যে, সে আজ দুপুর বেলা দূর থেকে দেখেছে দুটো গ্রাম আগুনে জ্বলছে এবং আগ্নেয়াস্ত্রের আওয়াজ ভেসে আসছে। কিন্তু কে কোথায় কি ভাবে গুলি চালাচ্ছে সেটার কিছুই আঁচ করতে পারেনি।
ভারনার সাহেব নিজেই ঘটনা সরোজমিনে তদন্ত করার জন্য এগিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছিল।
কিন্তু কেবলমাত্র একটি বালকের কাছ থেকে খবর পেয়েই হুট করে চলে যাওয়াটা কি ঠিক হবে? সেটা ভেবেই ভারনার সাহেব নিজে যান নি। যাহোকে, বরকন্দাজ এসে খবর দেওয়ার পর ভারনার সাহেব পরদিন আবার আটজনের এক সশস্ত্র বরকন্দাজ বাহিনী ঘটনাস্থলে পাঠান, ঘটনার সত্যতা নিরুপণ করতে। সেদিনই লালুং কুকি এবং অগমাস পুঞ্জীর প্রায় তিনশ থেকে চারশ নর নারী যাদের অধিকাংশই বৃদ্ধ ও শিশু এবং শিয়াহপাও পুঞ্জীর মাত্র তিনজন মিছিল করে ভারনার সাহেবের নিকট জড় হন। তাদের সাথে অবশ্য সমতলেরও অনেক লোক আসেন এবং উপরোক্ত লুচাই কুকি আক্রমণের ঘটনা ব্যক্ত করেন।
ভারনার সাহেব ওদের মধ্যে আস্থা ফিরে আনবার জন্য তাদের পুঞ্জীতে সিপাই পাহাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু উহাতে সবাই আপত্তি করেন। ওরা বলে যে, লুচাই কুকিদের রীতিই হচ্ছে হত্যা করে মাথা কেটে নিয়ে যাওয়া। ওরা কোন সময়েই আক্রমণ করে একদিনের বেশী এক জায়গায় থাকে না। ভারনার সাহেব একথাই তার উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে লিখেন
— I offered to send out sepoy guards to the different villages, but to that they objected, as they said the Luchayee had left that they never remained more than a day, that their custom was to take the heads of those they killed with them and walk off.
লালুং কুকি ও অগমাস প্রভৃতি পুঞ্জীর অধিবাসীদের আপত্তি থাকা সত্বেও ভারনার সাহেব হাবিলদার সহ বারজন সিপাই এর একটি দল পাহাড়া দেওয়ার জন্য সাবাজপুরে পাঠান।
কিন্তু পুঞ্জীর আধিবাসীরা আবার তাদের জায়গায় স্বাভাবিক ভাবে বসবাস আরম্ভ করলে পাহাড়াদার সিপাইদেরকে উঠিয়ে আনা হয়। জেলার সীমান্তে অবস্থিত পুঞ্জী গুলিতে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসলেও সেটা ছিল সাময়িক।
কিছুদিন পরই আবার শুনা যায় লুচাইরা তাদের আক্রমণ চালাবে। খবরটা ভারনার সাহেবকে স্বাভাবিক ভাবেই চিন্তিত করে তুলে। সাহেব ভেবেছিলেন যাতে লুচাই কুকিরা এসে কাছাড় জেলার সীমান্তরেখায় অবস্থিত পুঞ্জীতে ব্যাপকভাবে আক্রমণ চালাতে না পারে সেটার ব্যবস্থা করতে হবে। তাই সে তার উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ সিলেটের তৎকালীন সেসন জজ এইচ ষ্ট্যামফোর্থকে লিখেন যে, সিলেটের Light Infantry Battalion থেকে কিছু সৈন্যদল পাঠানো যুক্তিযুক্ত হয় যাতে ওদেরকে সীমান্ত অঞ্চলে নিয়োগ করে লুচাই কুকিদের আকস্মিক আক্রমণ থেকে সেখানকার লোকদের রক্ষা করা যায়। তিনি ষ্ট্যামফোর্থকে লিখেন
…. that there was a rumour that the Luchayee Kookies intended returning again to this district for the purpose of securing Jhum of the villages they had attacked and burnt or some other purpose; I have thought is advisable to send guards from the Sylhet Light Infantry Battalion down to the southward of 1 Habildar and 12 sepoys each, the one to Soonabarooie ghat pergunnah Soonapur the other to Nudeergram Pergunnah Bundraj in order to protect the people of the plain from the incursion.
ভারনার সাহেবের পত্র পেয়ে জজ সাহেব ষ্ট্যামফোর্থ ওকে নির্দেশ দেন এই যুদ্ধপ্রিয় উপজাতীদের সম্পর্কে ভালভাবে খোঁজ খবর নিতে। যেখানে সমস্ত ভারতবর্ষই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পদানত সেখানে পাহাড়ের জঙ্গলে বসবাসকারী উপজাতি ব্রিটিশ প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে উপেক্ষা করে তাদের খেয়াল খুশী অনুয়ায়ী ক্রমাগত ভাবে আক্রমণ চালিয়ে যাবে সেটা কি বরদাস্ত করা যায়? তাদেরকে যেভাবেই হোক ব্রটিশ শাসনের কবলে আসতে হবে। তারা যত যুদ্ধপ্রিয়ই হোক না কেন তাদেরকে ব্রিটিশ শাসনে দমতে হবে।
সেসন জজ ষ্ট্যামফোর্থের নির্দেশ পেয়ে ভারনার সাহেব তৎপর হয়ে উঠেন। দুঃসাহসিক কর্ম করার বাসনা তার মনে চাড়া দিয়ে উঠে। সে নিজেই লুচাই কুকিদের তথ্য ও তাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে সচেষ্ট হন। শিলচর সদর সহর থেকে অনেকদূরে দক্ষিণ দিকে সীমান্ত অঞ্চলে অবস্থিত পূর্বে আক্রান্ত শিয়াহপাও পুঞ্জির অভিমুখে রওয়ানা দেন। সেখানে গিয়ে পৌঁছে তার যে অভিজ্ঞতা হয় সেটা বলতে গিয়ে ষ্ট্যামফোর্থ সাহেবকে লিখেন —
On the 22nd instant I went out myself to the place where Seyahpow’s people were murdered. It is far in the jungles, I found it deserted…. I found great difficulties in getting there, for after crossing the Boaljoor river the road became so bad that we were obliged to go the greater part of the way along a single stick raised from two or three feet from the ground on account of the marshes. It was very fatiguing and I must say I never passed over so wretched a path in my life.
ভারনার সাহেব নিজে শিয়াহপাও পুঞ্জীতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন সেটা তাকে লুচাইদের তথ্য সংগ্রহ করার উদ্যমকে বিরত করেনি, পরন্তু তার অনুসন্ধানী মনকে প্রেরণা দেয় বিভিন্ন উপায়ে লুচাই কুকিদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে। সে প্রকৃতভাবেই অনুসন্ধান চালিয়ে যায় লুচাই কুকিদের সম্পর্কে জানতে। তার উদ্যম এবং প্রচেষ্টায় সে যতটুকু লুচাই কুকিদের জানতে পেরেছিল সেগুলি পরবর্তী সময়ের ব্রিটিশ আমলাদের সোপান তৈরি করেছিল লুচাই কুকি প্রভৃতি উপজাতিদেরকে তাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার আওতায় আনতে। ভারনার সাহেব যা জানতে পেরেছিলেন সবকিছুই জজসাহেব ষ্ট্যামফোর্থকে লিখে ব্যক্ত করেন।
তিনি লিখেন-
I have been able to ascertain that the Luchayee Kookies are a very large and war-like tribe who reside some eight or ten days’ journey south of Cachar. They are well known by the Kookies who reside in this district, for many of them were on friendly terms with them formerly, and they live near to one another and it is supposed that the cause for enmity now shown is owing to their having left them and taken up the abode here. They say the Luchayees live nearer to Chittagong within four or five days journey and that they go there for the purpose of making their bazars, as they do also sometimes to Comilla, but that they are quite independent of the Tipperah Rajah and live far away from Aggurtalla; The place described by them as the Luchayee country tallies exactly with Pemberton’s map for on it I find the Longshie or Lusai tribe down as inhabiting a tract of country between the 92 and 93 degrees of East longitude and some miles to the North and South of the 23 degree of north latitude and immediately to the Tipperah hill district: The Poitoo Kookies are those who reside near Aggurtulla. All Kookies appear to be gradually migrating westward and are continually at war amongst themselves.
এ সমস্ত খোঁজ খবর নেওয়ার পর ভারনার সাহেবের নিকট এটাই প্রতীয়মান হয় যে, লুচাই কুকিদেরকে ক্রমাগত আকস্মিক আক্রমণ ও ব্যাপক গণহত্যা থেকে বিরত রাখা খুবই কঠিন ব্যাপার হবে। কারণ, ঘটনা ঘটবার পূর্বে পুলিশ বরকন্দাজ ওদের গতিবিধি ও আকস্মিক আক্রমণের কোন কিছুই আগাম জানতে পারে না। তাছাড়া সেনাবাহিনীকে পাঠিয়ে ব্যবস্থা অবলম্বন করা কতটুকু কার্যকরী হবে সেটাও সন্দেহজনক। বাস্তবক্ষেত্রে সৈন্যবাহিনী উদেশ্য সিদ্ধ করতে ঠিক জায়গায় পৌঁছতে পারবে কিনা সেটাও প্রশ্ন। তাই ভারনার সাহেব ষ্ট্যামফোর্থকে জানান -
With reference to the practicality of sending troops against the Luchayee from this I am of the opinion that it would be attended with great difficulty. There is no road, and the path they would require to follow runs through nothing but jungle, over swamps and uninhabited hills.
এমনি ভাবে দিন এগিয়ে চলার সাথে সাথে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হয়। উর্দ্ধতন ও নিম্নতন সরকারী আমলাদের মধ্যে চলতে থাকে খবর বিনিময় এবং বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় দমন করার জন্য। উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ থেকে নির্দেশ আসে সেনাবাহিনীকে কাজে লাগাতে। সে অনুয়ায়ী সামরিক বাহিনীর লেফটানেন্ট কর্ণেল লিষ্টার ১৮৫০ ইংরেজীর জানুয়ারী মাসে তার কিছু সেনাবাহিনীকে নিয়ে যায় সীমান্ত অঞ্চলের পার্শ্ববর্তী এলাকায়। এক পক্ষ কালের কিছু বেশী সময় নিয়ে সেখানে অত্যন্ত দাপটের সঙ্গে একটা বা দুটো বস্তীতে আক্রমণ চালায় এবং ধ্বংস করে দেয়। এটুকু করে লিষ্টার সাহেব নিজেই দমে যান। তিনি বাধ্য হয়ে তার সঙ্গীদেরকে নিয়ে ফিরে আসেন। লিষ্টার সাহেবের এই বিজয় অভিযানের রিপোর্ট বলতে গিয়ে ভারনার সাহেব ষ্ট্যামফোর্থকে লিখেন
I have the honour to report that Lt. Col Lister with the detachment of his corps with which he proceeded from this against the Luchayee Kookies on the 4th instant returned this morning (23rd January). He attacked and destroyed one or two of their villages, I believe he found his force too small to proceed with against the others, the Luchayee being a much more powerful tribe than he had any idea of and the difficulties of getting at them increasing every step as he advanced, and as his retreat might have been not off without difficulty….
লেফটানেন্ট কর্ণেল লিষ্টার বিপুল উৎসাহে অভিযান চালিয়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন সেটা থেকে তিনি অনুমান করেন যে তার অভিযানে যে সাফল্য অর্জন হয়েছে সেটা লুচাই উপজাতিকে তো দমন করা যায়নি, পরন্তু সেই আক্রমণ তাদেরকে উৎসাহিত করবে প্রতিহিংসা পরায়ণ হতে। তাই লিষ্টার সাহেব পশ্চাদবরণ করে যা বলেন সেটা উপলক্ষ করেই ভারনার সাহেব ষ্ট্যামফোর্থকে লিখেন-
As this attack has emboldened the Luchayee than otherwise any as they are of a most vindictive nature Col. Lister has determined on leaving 4 companies of his corps in Cachar for the present in order to protect the people as much as possible from any future incursions.
গভীর অরণ্যে লুচাই কুকিদের পুঞ্জীর প্রকৃত অবস্থান এবং চলাচলের পথ নিশানা করতে না পারায় লেফটানেন্ট কর্ণেল সৈন্য বাহিনীকে কাছাড় জেলার সীমান্ত অঞ্চলেই মোতায়েন করেন যাতে অন্ততপক্ষে লুচাই কুকিরা জেলাতে ঢুকে তাদের আক্রমণ চালানোর রীতি অব্যাহত না রাখতে পারে।অন্যদিকে মরীয়া হয়ে সরকার বাহাদুরের আমলারা তৎপর হন কিভাবে দুর্গম অরণ্য পথ ভেদ করে যুদ্ধপ্রিয় লুচাই কুকি উপজাতিদিগকে নিজেদের বসে আনা যায়।
কাছাড় মিজো জেলার সীমান্ত অঞ্চলে সৈনিকদের পাহাড়া বসিয়ে বৃটিশ সরকারের আমলাবাহিনী কেবল ভাবতে থাকে কিভাবে লুচাইদেরকে দমন করা যায় - কি ভাবে লুচাই পাহাড় বৃটিশ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করা যায়।অন্যদিকে লুচাইরা তাদের আক্রমণ অব্যাহত গতিতেই চালিয়ে যায়। ১৮৭১ ইংরেজীর জানুয়ারী মাসে সাইলো গোষ্ঠীর পরাক্রমশালী অল্পবয়স্ক লাল শ্রী বেনখুনিয়া কাছাড় জেলার সীমান্ত অঞ্চলে অবস্থিত বিভিন্ন চা বাগান গুলিতে পর্যায়ক্রমে আক্রমণ চালায়। বর্তমান হাইলাকান্দি মহকুমার কাটলীছড়াতে আলেকজাণ্ডারপুর চা বাগানের তৎকালীন সাহেব ডাক্তার জেমস উইনচেষ্টারকে হত্যা করে তার শিশু কন্যা মেরী উইনচেষ্টারকে সাথে করে নিয়ে যায়। সে সময় চা বাগানে বসবাসকারী কিছু স্থানীয় লোকেদেরকে বন্দী করে নেয়। ১৮৭১ ইংরাজীর জানুয়ারী মাস থেকে ফেব্রুয়ারী মাস পর্যন্ত কাছাড় সীমান্তে ক্রমাগত ভাবে লুচাই আক্রমণ চলে। সেটা কেবল সাইলো লাল বেনখুনিয়ার নেতৃত্বেই হয়েছে তা নয়। বিভিন্ন মিজো গোষ্ঠীর লালদের নেতৃত্বে আক্রমণ সংগঠিত হয়েছিল। লুচাই কুকিদের ক্রমাগত আক্রমণের ঠেলায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ নাস্তানাবুদ হয়ে পড়ে। ওদেরকে অতিশীঘ্রই কব্জার ভিতর নিয়ে আসার জন্য ক্ষেপে মরীয়া হয়ে তোড়জোড় চালায়। কিন্তু হায়- দুর্গম অরণ্য পথ ভেদ করে ওদের আসল আস্তানায় পৌছানোই যে মুশকিল! যাহোক, শেষপর্যন্ত কাছাড় জেলা থেকে জেনারেল Boucher এর নেতৃত্বে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী দুর্গম অরণ্য পথ ভেদ করে মিজো পাহাড়ের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে কিছু সংখ্যক সাইলো গোষ্ঠীর লালদেরকে নিজেদের বসে আনে। সুকৌশলে ওদেরকে বন্ধু করে নেয়। তখন লাল বোথাং পুইয়া ব্রিটিশদের নির্দেশেই বেনখুনিয়া লালের পুঞ্জীতে যায় এবং ওকে প্ররোচিত করে সমর্থ হয় ডাঃ জেমস উইনচেষ্টারের শিশু কন্যা মেরী উইনচেষ্টারকে ও দেশীয় বন্দীদেরকে ফিরিয়ে আনতে। জেনারেল Boucher এর নেতৃত্বে এই যে অভিযান হয় সেটাতে ব্রিটিশ আর্মির পরবর্তী কালের Commander-in-chief এবং তৎকালীন Lt Collord Roberts ছিলেন। কাছাড় জেলা থেকে জেনারেল Boucher এর নেতৃত্বে অভিযান চালানোর সাথে সাথেই চট্টগ্রাম থেকেও ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একটি দল General Brounlow এর নেতৃত্বে মিজো পাহাড়ের দিকে রওয়ানা হয়েছিল।
জেনারেল Boucher এর অভিযানে পাহাড়ে ঢুকে অনেক লালদেরকে বশে এনে মেরী উইনচেষ্টার প্রভৃতিদেরকে ফিরিয়ে আনলেও মিজো পাহাড়ে ব্রিটিশ কর্তৃত্ব স্থাপন করতে পারে নি। পরবর্তী সময়ে গোর্খা রেজিমেন্টের Lt John Stewart চীন গোষ্ঠীর লাল হওসাটা কর্তৃক আচমকা আক্রমণে নিহত হয়। Stewart নিহত হওয়ায় ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী ক্ষেপে গিয়ে Capt Shakespeare এর নেতৃত্বে আরেকটি অভিযান চালানো হয়। Capt Shakespeare কলোদিন নদীর দক্ষিণ দিকে আরও অরণ্য ভেদ করে মিজো পাহাড়ের বিস্তৃত অঞ্চল ব্রিটিশ কর্তৃত্বে আনে। কিন্তু তাতেও মিজোদের আচমকা আক্রমণ লেগেই ছিল। তাই সেখানে সামরিক কর্তা ব্যক্তিদের Political officer হিসাবে নিয়োগ করে সেখানকার অবস্থা শান্ত করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু সেখানকার অবস্থা শান্ত হয় না। দীর্ঘদিন এরকম ভাবে চলতে থাকে।
ইংলণ্ডের লর্ড বংশজাত ইউলিক ব্রাউনির ছেলে হারবার্ট আর ব্রাউনি সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আসে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ আমলা সেজে। লর্ড ক্লাইভ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীকে কেন্দ্র করে সমস্ত ভারতবর্ষে ইংরাজ প্রভাব বিস্তার করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মহিমা ছড়িয়ে দেন। আর সে দেশেরই ছেলে হারবার্ট আর ব্রাউনি। সে ভেবেছিল লর্ডক্লাইভ যদি এ হেন কীর্তি স্থাপন করে যেতে পারে তাহলে সে কেন সামান্য সীমানা নিয়ে অবস্থিত লুচাই পাহাড়ের উপজাতিদিগকে পদানত করে স্বীয় মহিমা অক্ষয় রাখতে পারবে না? পাহাড়ী লুচাই কুকিরা যতই পরাক্রমশালী হোক না কেন তাদেরকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কাছে মাথা নত করতেই হবে। তাদেরকে যে ভাবেই হোক বশীভূত করতে হবে। এই দৃঢ় আত্মপ্রত্যয় নিয়ে Bengal Staff Corps এর Captain হারর্বাট আর ব্রাউনি এসেছিলেন লুচাই পাহাড়ের পলিটিকেল অফিসারের দায়িত্ব নিয়ে। খুব তৎপর হয়ে উঠেন লুচাইদেরকে পদানত করতে। কিন্তু হায়! হারর্বাট ব্রাউনি ভারতবর্ষের বিভিন্ন শহর থেকে লুচাই পাহাড়ের অধিবাসীদের সম্বদ্ধে যা ভেবেছিল সেটা বাস্তবক্ষেত্রে গিয়ে মিলেনি। অনেক ফারাক। যা ভেবেছিল সেটা প্রয়োগ করতে গিয়ে অনেক বাধা, অনেক বিপত্তি। কিন্তু না, অনেক বাধা বিপত্তি থাকলেও সেগুলিকে মেনে যেভাবে হোক লুচাইদেরকে দমিয়ে দিতে হবে। ওদেরকে বুঝিয়ে দিতে হবে যে ওরা যতই খুনো খুনী করুক না কেন ওরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সাথে পেরে উঠবে না। সমস্ত পৃথিবী বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের মহিমা জানে- জানে তার ক্ষমতা। আর লুচাইরা কোন ছার। এই মনোবল নিয়েই চলছিল যুবা হারর্বাট আর ব্রাউনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে পারেনি। নিজের শক্তি এবং মনোবল সম্পর্কে যতই দম্ভ পোষণ করেছিল সবকিছু তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে যায়-ধুলিস্যাৎ হয়ে পড়ে। ১৮৯০ ইংরেজীর সেপ্টেম্বর মাসে হারর্বাট আর ব্রাউনি যখন তার সঙ্গীদেরকে নিয়ে লুচাই পাহাড়ের চেংসিলের দিকে এগিয়ে চলেন তখন লুচাইদের ঝটিকা আক্রমণে আক্রান্ত হন। লুচাইদের আচমকা আক্রমণ হারর্বাট সাহেব প্রতিহত করতে পারেনি। তার দম্ভ, শক্তি প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব সব কিছুই মূহুর্তের মধ্যে চূর্ণ হয়ে যায়। লুচাইদের আক্রামণে মারাত্বক ভাবে আহত হন। সেদিনই সেখানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
চেংসিলের পথে মারাত্মক ভাবে আহত হয়ে মৃতে্যু হওয়ার পর Bengal Staff Corps এর Captain এবং লুচাই পাহাড়ের পলিটিকেল অফিসার হারর্বাট আর ব্রাউনির মৃতদেহ বহন করে সদর শহর শিলচরে আনানো হয়। তাঁর মৃতদেহ অবশ্য বিশেষ সমারোহে সামরিক মর্যাদা দিয়েই আনানো হয়। তদানীন্তন কালে কাছাড় জেলায় বসবাসকারী সাহেব সুবাদের মৃত্যুর পর বর্তমানে শিলচর মিশন রোডের পার্শ্বে অবস্থিত যে graveyard এ সমাধি দেওয়া হত সেখানেই ব্রাউনি সাহেবকে মর্যাদা সহকারে সমাধি দেওয়া হয়। তাঁর সমাধির উপর প্রস্তর ফলকে লিখে রাখে
In loving memory of Capt. Herbert R. Browne, Bengal Staff Corps, Political Officer, Lushai Hills. Son of Lord Ulick Browne. Mortally wounded by Lushais on September 9, 1890, during his journey to Chengsil, where he passed away the same day at the age of 31 years.
লর্ড ইউলিক ব্রাউনির পুত্র Captain হারর্বাট আর ব্রাউনির কবরের পাশেই আরো দুজন সাহেবের কবর আছে। একজন পূর্বে বর্ণিত বেনখুনিয়া কর্তৃক নিহত ডঃ জেমস উইংচেষ্টার এবং আরেকজন পিটার ব্লিথ। জেমস উইংচেষ্টার সাহেবের কবরের প্রস্তর ফলকে খোদাই করে যা লিখা হয় সেটা হচ্ছে।
This stone is erected by the European inhabitants of Cachar in memory of James Winchester, who was killed in a Lushai attack on Alexandrapore Garden on January 23, 1871.
এবং পিটার ব্লিথ সাহেবের কবরের উপর প্রস্তর ফলকে যা লিখা হয় সেটা হচ্ছে
Erected by public subscription, this monument commemorates Peter Blyth, who died on January 27, 1880, during a raid by Amgaini Nagas on Baladon Tea Garden.
যখন তাদেরকে কবর দিয়ে সেটার উপর প্রস্তর ফলকে তাদের কাহিনী লিখা হয় তখন নিশ্চই উদ্যোক্তরা ভেবেছিল এই স্মৃতি ফলক তাদের কাহিনী বহন করে নিয়ে যাবে যুগ যুগান্তর ধরে। তাদের উত্তর পুরুষেরা এখানে এসে দেখবে এবং পূর্ব পুরুষদের কথা স্মরণ করবে।
তখন মদমত্তে মাতোয়ারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীর বশংবদেরা আশা করছিল যেভাবে তারা দিকে দিকে বিজয় গৌরবে এগিয়ে চলছে তেমনি ভাবে এগিয়ে যাবে। তাদের শৈর্য্য বীর্যের কাহিনী অমর অক্ষয় থাকবে। কিন্তু ইতিহাস বড় নির্মম। তাদের আশা পূর্ণ হয়নি। তাদের বিজয় অভিযানে ভাটা নেমে আসে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে পিছু হটতে হয়। তারা সরাসরি শাসন ব্যবস্থা ছেড়ে দিতে বাধ্যে হয়। সরাসরি শাসন ব্যবস্থা ছেড়ে দিয়ে ভারতবর্ষে থেকে চলে যাওয়ার পর তাদের শৌর্য্য বীর্যের অনেক নিদর্শনই দিনে দিনে কালের অতল গহ্বরে তলিয়ে যেতে থাকে। এখানেও শিলচর শহরে অবস্থিত গোরস্থানে জেমস উইংচেষ্টার, পিটারব্লিথ এবং লুচাই পাহাড়ের পলিটিকেল অফিসার হারর্বাট আর ব্রাউনির কবরের উপর স্মৃতি ফলকে লিখিত কাহিনী তাদের উত্তর পুরুষের কাছে পৌছে দেওয়ার জন্য যে দায়িত্ব বহন করে আসছিল সেটার মহিমা ক্রমে ক্রমে ম্লান হয়ে আসে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বশংবদরা চলে যাওয়ার পর এখানে আর তাদের উত্তর পুরুষরা আসে না পূর্বপুরুষদের স্মৃতি স্মরণ করতে।
পলিটিকেল অফিসার হারর্বাট আর ব্রাউনি নিহত হওয়ার পর ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী ভীষণ ভাবে ক্ষেপে যায়। ওরা ১৮৯১ ইং তৃতীয়বার জোর অভিযান চালায়। কিন্তু সে সময়ও পাওয়াই গোষ্ঠীর লাল জাখাপা কর্তৃক আক্রান্ত হয়ে পলিটিকেল অফিসার Mr Murrey লুংলেতে নিহত হয়। পাওয়াই লাল জাপাখা কর্তৃক পলিটিকেল অফিসার নিহত হলেও এই অভিযানেই ব্রিটিশ রাজ লুচাই পাহাড়ে সামগ্রিক ভাবে তাদের কর্তৃত্ব স্থাপন করে।