দিন এগিয়ে চলছে। মিজো জেলার কলোডিন, সাইরেং প্রভৃতি নদী বয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে। জলপ্রবাহ বন্ধ হয়নি। থু-আয়া জিটিঙ্গা য়‍্যাঙ্গায়া, রেমাও অন্যান্যদের সশস্ত্র অভিযান কলোডিন নদীর মতই বয়ে চলছে। কখনও বর্ষার খরস্রোতের মত। আবার শীতের চর পড়া নদীর ক্ষীণস্রোতের মত। দীর্ঘ চার বৎসরের মধ্যে বিদ্রোহী মিজোদের সশস্ত্র লড়াই চলাকালীন অবস্থায় রেমা কোনদিন সমতলে নেমে আসেনি। অনেকদিন পর রেমা তার দুজন সাথীর সঙ্গে শিলচর শহরে আসে। মিজোপাহাড়ে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হওয়ার প্রথম দিকে যে সমস্ত মিজোরা নেমে সমতলে আসত তারা স্বভাবতই ভয়ে ভয়ে চলাফেরা করত। তখন অনেক সময় শহরের সমতলবাসী কোন কোন শ্রেণীর লোকদের দ্বারা তারা প্রকাশ্য রাস্তাতেই নিগৃহীত হত। কিন্তু আজ আর তেমনটি নয়। রেমা সহরে ঢুকেই বড় রাস্তা ধরে শিলচর শহরের কেন্দ্রাভিমুখে এগিয়ে যেতে যেতে যা দেখল সেটা তার কাছে নূতন ঠেকল। জোরাম হোটেলের পাশ থেকে আরম্ভ করে বড় রাস্তার পাশে দেওয়ালে লাল কালির বড় বড় হরফে লিখা রয়েছে

“We support the Mizo War of Liberation” “We support the armed struggle of the Mizo people.” দেওয়ালের লিখন দেখে একটু আশ্চর্য হলেও মনে মনে কিছুটা আনন্দিত হল। মনে হল সেদিন আর নেই যে জনগণ বা ছাত্র সমাজ ধর্মঘট করে সরকারকে জানাবে যে বিদ্রোহী মিজোদেরকে অচিরেই দমন করতে হবে। কিন্তু " মিজো মুক্তি যুদ্ধ আমরা সমর্থন করি" বা “আমরা মিজোদের সশস্ত্র সংগ্রামকে সমর্থন জানাই” এসমস্ত লেখার উদ্দেশ্য কি? ওরা কি বুঝতে পেরেছে যে মিজোদের সশস্ত্র আন্দোলনের পথ সঠিক? ওরা কি বুঝতে পেরেছে যে অত্যাচার এবং নিপীড়নের হাত থেকে মুক্ত হয়ে প্রকৃত স্বাধীন হতে হলে মিজোদেরকে এভাবেই এগিয়ে যেতে হবে? মিজোরা যা করেছে সেটা ঠিক করছে। এসমস্ত ভেবেই বোধ হয় ওরা মিজোদেরকে সমর্থন জানাচ্ছে। নইলে সমতলের জনগণ কেন মিজোদেরকে সমর্থন করতে যাবে? অবশ্য সমতলের ব্যপক জনগণ ক্রমাগতই দৈনন্দিন সঙ্কটের স্বীকার হচ্ছে। শাসকগোষ্ঠীর অনুসৃত নীতিতে যদি জনগণের সঙ্কট দূরীভূত না হয়- জনগণ যদি স্বাবলম্বী হতে না পারে এবং উল্টোদিকে শাসকগোষ্ঠীর শাসনযন্ত্র নির্মমভাবে দমন পীড়ন চালিয়ে ওদের সমস্ত কিছুই নিংড়ে নেয় তাহলে ওরা সেই শাসকগোষ্ঠীকে আপন বলে গ্রহণ করবে কেমন করে? ওরা হয়ত দিনে দিনে বুঝে নিয়েছে যে শাসনযন্ত্র ওদের উপর রয়েছে সেটা মূলতঃ ব্যাপক জনগণকে শোষণ করারই যন্ত্র। সাম্রাজ্যবাদ এবং সামন্ততন্ত্রের ক্রীড়নক হয়েই শাসনযন্ত্র পরিচালিত হচ্ছে। কাজেই এ শাসন ব্যবস্থা পারে না জনগণের প্রকৃত মুক্তি আনতে। এ শাসনব্যবস্থা বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে উপেক্ষা করবেই। এ সমস্ত ভাবনাই হয়ত আগামীদিনে সমতল বাসীদেরকে এগিয়ে নিবে তাদের ভবিষ্যৎ মুক্তি সংগ্রামের পথে। আগামী দিনের কথা ভেবেই হয়ত ওরা আজ আমাদের সশস্ত্র সংগ্রামকে সমর্থন জানাচ্ছে। এই নৈতিক সমর্থনে আজ আমাদের কতটুকু বৈষয়িক লাভ হবে সেটা বলা মুসকিল। কিন্তু সান্ত্বনা এই যে ওরা আমাদেরকে সমর্থন করছে। রেমা এগুলি ভাবতে ভাবতেই-এগিয়ে চলছিল।

সেদিনই সন্ধ্যার পর রেমা তার দুজন সাথীকে নিয়ে শহরের উপরেই একটি জীর্ণ কুঠিতে বসে বিশ্রাম করছিল। ঘরটির মালিক রোলসন সরকারী চাকুরীয়া। তারা অবশ্য সরকারী ভাষ্য অনুযায়ী অনুগত মিজো। রোলসন অফিস থেকে সন্ধ্যার পর ঘরে আসে। যারা প্রত্যক্ষভাবে সশস্ত্র সংগ্রামের সহিত জড়িত তারা এপরিবেশে এমন ভাবে দেখা করতে আসলে বা হঠাৎ অন্য কোনও কারণে আসলে সাধারণত গৃহস্বামীর ভয় হওয়া স্বাভাবিক কিন্তু তাঁদের প্রতিঅকৃত্রিম ভালোবাসা এবং যে শ্রদ্ধা আছে সেটা কোন সময়েই গৃহস্বামীকে আতঙ্ক গ্রস্থ হতে দেয় না। তাই রোলসন অত্যন্ত শ্রদ্ধাপরাবশ হয়েই তাদের আগমনে অভিনন্দন জানাল। সে খুশীই হল। সেও একটা চেয়ার টেনে তাদের পাশে বসল। রোলসন চেয়ারে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে বলল

— কখন আসলে?

— এইত হবে প্রায় ঘণ্টা খানেক।

— কিছু খেয়েছ কি?

— হ্যাঁ, মিসেস রোলসন প্রচুর খাইয়ে আপ্যায়ন করেছে।

— প্রচুর খাওয়াবে কোথেকে? বড়জোর চা আর বিস্কুট। এর বেশী আছে কি?

— না, না বেশীই খাইয়েছে। সেজন্য তোমাকে ভাবতে হবে না। তোমার গিন্নি দেখলাম অতিথি সেবা ভালই করতে পারে। আচ্ছা যাক্। এখন বল তোমাদের খবর কি?

— খবর ভালই।

— ভাল হলেই ভাল।

— তোমাদের এখানকার খবর কি রকম?

— ব্যক্তিগত খবর গতানুগতিক। কোন রকম দিন কাটিয়ে যাচ্ছি। মাঝে মাঝে অবশ্য তোমাদের কথা খুবই মনে পড়ে।

— মনে পড়াটাইতো স্বাভাবিক।

— তোমাদের কথা মনে পড়াটাই সার। এর বেশীত আর এগোনো যায় না। রোলসন একথা বলেই একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেল, মুখে যেন একটা বিষাদের ছাপ পড়ল। হ্যারিকেনের টিম টিম আলো ঘরের অন্ধকার দূর করলেও একটা আবছা ভাব ছিল। সেই আলো আবছায়াতে রোলসনের বিষাদগ্রস্ত মুখখানা রেমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। সে রোলসনকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যই বলল না, তোমার দ্বারা অবশ্য এর বেশী কিছু করাও সম্ভব নয়। এজন্য তোমার দুঃখ করে লাভ নেই। তুমি বরং এখন বলো এখানকার লোকেরা আমাদের প্রতি কি রকম ধারণা পোষণ করে।

রেমার প্রশ্ন শুনে রোলসন যেন হারিয়ে যাওয়া একটা খবর খুঁজে পেল। সে বলল

— আরে কিছুদিন আগে পত্রিকাতে একটা সংবাদ দেখলাম।

— কোন পত্রিকাতে?

— হিন্দুস্থান ষ্ট্যন্ডার্ড।

— কি সংবাদ দেখলে?

— সংবাদটা হচ্ছে যে এখানে কাছাড় জেলায় গোপনে প্রচারিত একটি ইস্তেহারে নাকি নিপীড়িত জনগণকে সংগ্রামের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। সংবাদদাতা সেটাকে ভিত্তি করেই লিখছে যে এখানকার “Extremist” রা যদি তাদের কার্যকলাপ চালিয়ে যায় তাহলে অদূর ভবিষ্যতে পার্শ্ববর্তী মিজো জেলায় বিদ্রোহীদের সাথে তাদের যোগাযোগ হতে পারে। অচিরেই যথোচিত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পরে নিরাপত্তা ও শান্তি বিঘ্নিত হবে।

পত্রিকার সংবাদ রেমার মনে রেখাপাত করল। গোপনে প্রচারিত ইস্তাহারে নিপীড়িত জনগণকে সংগ্রামের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে আর Extremist রা যদি তাদের কার্যকলাপ চালিয়ে যায় তাহলে অদূর ভবিষ্যতে পার্শ্ববর্তী মিজো জেলার বিদ্রোহীদের সাথে তাদের যোগাযোগ হতে পারে। নিপীড়িত জনগণকে আহ্বান জানালেই কি জনগণ হুড়মুড় করে সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ে? জনগণের সংগ্রামকে নিয়ন্ত্রিত করার জন্য কি কোন পরিচালিকা শক্তির প্রয়োজন নেই? অনিবার্য কারণ বশতই যারা শোষিত, যারা নিপীড়িত তারা সংগ্রাম করবে তাদের মুক্তির জন্য। কিন্তু তাই বলে শুধু গোপন ইস্তাহার বিলি করে হবে না। শোষিত নিপীড়িত জনগণকে সংগঠিত করে সংঘবদ্ধভাবে নিপীড়ন এবং শোষণের মূলে কুঠারাঘাত করার জন্য মুক্তির মূলতত্বে সজ্জিত সেই অগ্রণী দল কোথায়? যা নাকি ব্যাপক জনগণকে আকৃষ্ট করবে শোষণহীন সুস্থ সমাজ গঠন করতে। যা নাকি স্বভাবতই প্রকৃত শক্তি সংগ্রহ করে সাম্রাজ্যবাদকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিবে। পত্রিকার সংবাদদাতা যাদেরকে Extremist বলে উল্লেখ করেছে তারাই কি সে অগ্রণী দলের অভাব পূরণ করবে? না Extremist বলতে সংবাদদাতা কেবল কিছু সংখ্যক উশৃঙ্খল এবং বিচ্ছিন্নতাকামী কোন শক্তির কথা বলতে চাইছে? সংবাদদাতার ভাষ্য যাই হোক তবে এটা সত্য যে ব্যাপক জনগণ অর্থাৎ সমাজের উৎপাদিকা শক্তি যখন বুঝতে পারবে যে সাম্রাজ্যবাদ সামন্ততন্ত্রের ধারক বাহক মুষ্ঠিমেয় লোক তাদের কায়েমী স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে ব্যাপকভাবে সমাজের প্রগতিকে ব্যাহত করছে তখন স্বভাবতই জনগণ সমাজের প্রগতির অন্তরায় স্বার্থান্বেষীদের সৃষ্ট হাতিয়ার শাসনযন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। শুধু তাই নয় সেটার আমুল পরিবর্তন করার জন্য এগিয়ে চলবে। তখন নিশ্চয়ই মুক্তি ও প্রগতির মূল তত্ত্বে সজ্জিত অগ্রণী দল ব্যাপকভাবে জনগণকে তাদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার পথে এগিয়ে নিবে। সাংবাদিকরা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের উদ্দেশ্যকে প্রতিভাত করার জন্য পত্রিকার মাধ্যমে সংবাদ পরিবেশন করে থাকে। আজকে পত্রিকায় ওরা ছাপছে যে যদি সমতলের নিপীড়িত জনগণ সংগ্রামের আহ্বানে সারা দেয় তাহলে আগামী দিনে বিদ্রোহী মিজোদের সাথে তাদের যোগাযোগ হতে পারে, শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে নিপীড়িত জনগণ সংগ্রামে যাচ্ছে কেন? বা মিজোরাই কেন সশস্ত্রভাবে মরণ পণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে? এ সম্বন্ধে কি ওরা সঠিক কথা তাদের সংবাদ পত্রের মাধ্যমে প্রচার করছে? ওরা লিখছে শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। ওরা বলছে আজকে বিদ্রোহী মিজোদের সশস্ত্র লড়াইয়ে শান্তিও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে মিজো জাতি গোষ্ঠীর শান্তি ও নিরাপত্তা যে ভাবে বিঘ্নিত হয়ে আসছে সেটার প্রতিকার কল্পে বিদ্রোহী মিজোরা লড়ছে এবং স্বাভাবিক ভাবে যারা এতদিন শান্তিতে এবং নিরাপদে ওদের শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করেছিল আজকে তাদের শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। সমতলের অধিবাসীদের ব্যাপারটাও অনেকটাই তাই। কৃষক, শ্রমিক, সাধারণ মধ্যবিত্তদের জনজীবনে আজ কতটুকু নিরাপত্তা আছে? সবাই কি এক দারুণ অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে না? আজকাল গ্রামাঞ্চলে সামন্ততান্ত্রিক শোষণ ব্যবস্থা কি এমন পর্যায় সৃষ্টি করেনি যেখানে কৃষক তার পরিবার নিয়ে সারা বৎসরই নিদারুণ দুঃখ কষ্টের মধ্য দিয়ে মৃত্যুর মুখে এগিয়ে চলছে? আজকে কৃষক এবং তার বৌ ছেলেমেয়ের জীবনের নিরাপত্তা কোথায়? শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক এবং শহরের সাধারণ মধ্যবিত্তদের নিরাপত্তা কোথায়? কোন কোন সময় যদি শ্রমিক কৃষক এবং সাধারণ মধ্যবিত্ত নিজেদের বাঁচার তাগিদে মাথা তুলে নিজস্ব দাবী নিয়ে এগিয়ে চলে তাহলে কায়েমী স্বার্থের ধারক বাহক শোষণযন্ত্রের রোলার কি ওদের উপর নির্মম ভাবে চালিয়ে দেওয়া হয় না? তাহলে ব্যাপক শ্রমজীবি জনগণের নিরাপত্তা কোথায়? কাদের নিরাপত্তার জন্য এধরণের শাসনযন্ত্র ব্যবহৃত হয়ে থাকে? এই ব্যাপক জনগণ যদি বুঝে নেয় যে মুষ্টিমেয় কায়েমী স্বার্থের দল তাদের শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য শাসনের জাতাকল চাপা দিয়ে তাদের শান্তি ও নিরাপত্তা ক্রমাগত ভাবে বিঘ্নিত করছে তখন স্বাভাবিক ভাবেই সেটার প্রতিকার কল্পে শ্রমজীবি জনগণ লড়াকু হয়ে শাসন শোষণের যন্ত্র উপড়ে ফেলবে। তখন ঠিক ঠিকই মুষ্টিমেয় কায়েমী স্বার্থের ধারক বাহকদের শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। সংবাদপত্রের সংবাদদাতা হয়ত একথাটা বুঝতে পেরেই ইঙ্গিত দিয়ে চলছে যে ওদের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর হওয়া উচিৎ নইলে পরে অসুবিধা হবে। সংবাদ পরিবেশনের জন্য পত্রিকার মালিক তাকে নিয়োগ করেছে, ভরণ পোষণের দায়িত্ব নিয়েছে, এমতাবস্থায় সেই গোমস্তা সাংবাদিক যদি মালিকগোষ্ঠির রক্ষকদেরকে সময়মত সতর্ক করে না দিতে পারে তাহলে কেমন করে চলবে? এটা না করলে যে পুরাপুরি নেমকহারামি হয়ে যায়!

প্রথম প্রথম পত্রিকা ওয়ালারা জোর গলায় পত্রিকার মধ্য দিয়ে প্রচার করছে যে, বিদ্রোহী মিজোরা খৃষ্টান মিশনারীদের ক্রীড়নক হয়ে রাষ্ট্রদ্রোহী কাজ করছে। ওরা প্রচার করত নাগা, মিজো এবং অন্যান্য উপজাতি গোষ্ঠীর যে বিক্ষোভ দিনে দিনে ফেটে পড়ছে সেটার পিছনে আছে খৃষ্টান মিশনারীদের উস্কানি। সেটাকে ভিত্তি করে খৃষ্টান মিশনারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য বিভিন্ন ভাবে মতামত পোষণ করা হয়। ফলস্বরূপ সরকার বাহাদূর কিছু খৃষ্টান মিশনারী যাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক ভাল চিকিৎসকও আছে তাদেরকে এদেশে থাকার অনুমতি প্রত্যাহার করে নেয়। তাদের মধ্যে অবশ্য কেহ কেহ স্বদেশে ফিরে কিছু দিন থেকে আবার এখানে এসে বহাল তবিয়তে আছে। কিন্তু দিন এগিয়ে চলার সাথে সাথে পত্রিকা ওয়ালাদেরও সুর পাল্টাতে থাকে। এখন অবশ্য বিভিন্ন উপজাতি গোষ্ঠীর সশস্ত্র আন্দোলনে খৃষ্টান মিশনারীদেরকে নিয়ে বেশী টানাটানি করছে না। মিজো প্রভৃতি অন্যান্য বিদ্রোহীদের সশস্ত্র আন্দোলনে চীন মদত জুগিয়ে যাচ্ছে বলে ফলাও করে খবর ছাপাচ্ছে। কয়েকদিন পর পরই খবর প্রকাশিত হয় যে নিরাপত্তা বাহিনী মিজোদের গোপন আড্ডাতে হানা দিয়ে প্রচুর গোলাবারুদ ও আধুনিক সমরাস্ত্র দখল করছে। সেগুলির মধ্যে চীনা ছাপ রয়েছে। আবার খবর প্রকাশিত হয় যে, অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সুত্রে খবর পাওয়া গেছে যে মিজো ন্যাশনেল ফ্রন্টের ভলান্টিয়ারর্সরা চীনে গেরিলা যুদ্ধের কৌশল শিখছে। আবার কোন কোন সময় লিখছে পাকিস্তানের চট্টগ্রামে একটি ঘাটিতে থেকে চীনের তত্ত্বাবধানে তদানীন্তন পাকিস্তান সরকারের সহায়তায় মিজোরা আধুনিক সমরাস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করার কৌশল শিখছে। এসমস্ত খবর পরিবেশন করতে গিয়ে সীমান্তের নিরাপত্তা বাহিনী বা প্রতিরক্ষা বাহিনীর অপদার্থতার নজির না টেনে চীন বা পাকিস্তানকে বেশি দোষারূপ করা হয়ে থাকে। কিন্তু কেন? আজকে প্রতিরক্ষা ও অন্যান্য বাহিনী যারা মিজোদেরকে পুরাপুরি ভাবে দমন করার জন্য নিয়োজিত তাদের সমস্ত প্রচেষ্টাকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে বিদ্রোহী মিজোরা যদি সীমান্ত পার হয়ে অন্যত্র গিয়ে তাদের শক্তি সংহত করতে পারে তাহলে দোষটা কার? আভ্যন্তরীণ প্রশাসন ব্যবস্থায় নিত্য নূতন বেড়াজাল সৃষ্টি করেও বিদ্রোহী মিজোদেরকে আয়ত্বে আনতে না পারার ঘটনাকে গুরুত্ব না দিয়ে কেবল চীনের প্রতি বিষোদগার প্রকাশ করাটা কি উদ্দেশ্য প্রণোদিত নয়? ওরা কি শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতই আসল সত্যকে চাপা রাখার অপচেষ্টা করছে না? ওরা কি জানেন না যে আজ পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে অচল করে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে প্রকৃত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম করতে বিভিন্ন দেশের জনগণ বদ্ধপরিকর। সেটার ঢেউ সামলাতে গিয়ে হিম সিম খেয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের সেবাদাসরা তাদের স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ব্যাপক ভাবে সংগ্রামী ঢেউ যেন চারিদিকে ছড়িয়ে না পড়ে সেটার প্রতি লক্ষ্য রেখেই বিভ্রান্তিকর সংবাদ পরিবেশন করছে।

বিভিন্ন ভাবে সংবাদ পরিবেশন করে ব্যাপক জনগণকে বিভ্রান্ত করার যত অপকৌশলই গ্রহণ করা হউক না কেন আজ বিভিন্ন দেশের সংগ্রামী জনগণ অবশ্যই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে দিনে দিনে পঙ্গু করে সমাজতন্ত্রের পথকে সুগম করবে। অবশ্য সেটা করতে গিয়ে নানা প্রতিবন্ধতাকে মোকাবিলা করতেই হবে। বিভিন্ন দেশের জনগণ সাম্রাজ্যবাদী শোষণের হাত থেকে মুক্ত হয়ে প্রকৃত স্বাধীন হওয়ার বাসনা চরিতার্থ করতে গেলে নিশ্চয়ই নানা দুঃখ কষ্টের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। দুঃখ কষ্ট বা বিপর্যয়ের মুখোমুখি না হয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থে পরিচালিত শাসন ব্যবস্থাকে বিকল করে নূতন শাসন ব্যবস্থা কায়েম করা সম্ভব হবে না। দুঃখ কষ্ট ও বিপর্যয়ের মোকাবিলা করেই জনগণ এগিয়ে যাবে নূতন শাসন ব্যবস্থা কায়েম করতে।

হিন্দুস্থান ষ্ট্যান্ডার্ডে প্রচারিত যে খবরের কথা মিঃ রোলসন উল্লেখ করেছে সেটাকে কেন্দ্র করেই রেমার মন এগিয়ে চলছিল। একের পর এক উপরোক্ত সমস্ত ভাবনাই তার মনে ভেসে উঠছিল। রেমা এমনিভাবে কোন ঘটনা বা বিষয়কে কেন্দ্র করে ভাবতে ভাবতে কত বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছে সেটার হিসেব নেই। আজকেও হয়ত তেমনি ভাবে রেমার ভাবনা আরো এগিয়ে যেত। কিন্তু মিসেস রোলসন সেটাতে ছেদ টানল। সেও এসে তাদের পাশেই একটা আসন জুড়ে বসেছিল। মিঃ রোলসন এবং রেমার মধ্যে সামান্য কথোপকথন হওয়ার পর রেমা ভাবনার রাজ্যে নিজেকে ডুবিয়ে দিলে ঘরের মধ্যে সবাই চুপচাপ বসে থাকে। ঘরের মধ্যে এমনিভাবে নিশ্চুপ বসে থাকাটা মিসেস রোলসনের ভাল লাগেনি। সে তার নীরবতা ভঙ্গ করে রেমাকে বলল-আচ্ছা রোসাঙ্গীর খবর কি? মিসেস রোলসনের আওয়াজ শুনে রেমা যেন সম্বিৎ ফিরে পেল। সে বুঝতে পারেনি মিসেস রোলসন ওকে কার কথা জিজ্ঞেস করেছে। সে নিজের মনকে পুরাপুরি ভাবনার রাজ্য থেকে ছিন্ন করে এনে মিসেস রোলসনের দিকে চেয়ে বলল

— কার খবর জিজ্ঞেস করলেন?

— আমি রোসাঙ্গীর কথা বলছি।

— হ্যাঁ, রোসাঙ্গী ভালই আছে।

— সে এখন করে কি?

— সে মেডিকেল কোর’ এর হয়ে কাজ করছে। প্রথম প্রথম অবশ্য ওর কিছু অসুবিধা হত। এখন সব ঠিক হয়ে গেছে। ওর কাজ কর্ম দেখে মনে হয় পাশ করা ডাক্তারের চেয়েও ভাল চিকিৎসা করতে পারে।

— তাই নাকি?

— হ্যাঁ।

— সত্যিই রোসাঙ্গী মহত। সে নিজেকে যেভাবে নিয়োজিত করছে সেটা আমরা পারব না। জানেন, আমাদের অফিসে একটা বাঙ্গালী ছোকরা আছে সে প্রায়ই আমাকে বলে যে আমি মিজো হয়ে কেন সরকারী চাকুরী করছি? আমি কেন মিজোদের সশস্ত্র সংগ্রামে যোগ দেই না?

— তখন সেটার প্রতে্যুত্তরে কি বলেন?

— কি আর বলব। বলি যারা সংগ্রাম করছে করুক আমার কি? আমার সংগ্রামের প্রয়োজন নেই। আমার চাকুরীর প্রয়োজন তাই চাকুরী করছি। তবে সত্য ব্যাপারটা কি জানেন? মুখে এভাবে বললেও আসলে কিন্তু ছোকরার প্রশ্ন আমাকে সাংঘাতিক পীড়া দেয়। ভাবি ছোকরাত ঠিকই বলছে। মিজো ছেলেমেয়েরা মরণপণ করে লড়ছে। শাসন শোষণের বিরুদ্ধে-লড়ছে স্বাধীনভাবে থাকতে আর আমি কেবলমাত্র গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য এখানে গোলামী করে যাচ্ছি।

এ সমস্ত বলতে বলতে মিসেস রোলসন যেন একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেল। রেমাও তার কথা শুনেই গেল। কিছু বলল না। সময়ের প্রতি খেয়াল করেই ওরা ভাবল আর বেশী রাত করে লাভ নেই। এখন নৈশ আহার শেষ করে ধীরে ধীরে শুয়ে পড়া যাক। এটা ভেবেই উঠে পড়ল।

পরদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠেই রেমা তার দুজন সহকর্মীকে নিয়ে মিঃ এবং মিসেস রোলসনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। কোথায় যাবে এবং কোনদিকে যাবে সেসমস্ত কোন আভাসই রোলসনদেরকে দেয়নি। ওরাও সে সম্বন্ধে প্রশ্ন করেনি। রোলসনের ঘর থেকে বেরিয়ে তিন জন মিজো সদর রাস্তা ধরে এগিয়ে চলল। যেতে যেতে একজন সহকর্মী রেমাকে বলল,

— মিঃ এবং মিসেস রোলসন আমাদের প্রতি যে ব্যবহার করেছে সেটা কিন্তু মন্দ নয়। বেশ ভালই বলতে হয়

— হ্যাঁ, খবর নেই বার্তা নেই, দীর্ঘদিন পর আচমকা ওদের ওখানে উঠছি। কিন্তু তাই বলে ওরা অপ্রস্তুত বা ভীত হয়নি।

— আমার কিন্তু ওদের ওখানে উঠার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত মনে মনে সন্দেহ ছিল। কি জানি ভদ্রলোক আমাদেরকে থাকার জায়গা দিবেন কিনা।

— থাকার জায়গা দিবে না কেন? সরাসরি আমাদের সাথে যোগদান করতে না পারলেও আমাদেরকে উপেক্ষা করতে পারবে না। এখানকার খবরা খবর জিজ্ঞেস করতে কেমন ভাবে বলল শুনোনি?

— তা শুনেছি। এ সমস্ত শুনে এবং ব্যবহার দেখেইত বলছি যে সে মন্দ নয়, ভালোই।

— হ্যাঁ, ভালোই।

এমনি ভাবে আলাপ আলোচনা চালিয়ে পাশাপাশি হেটে পথ পাড়ি দিতে দিতে মোটরষ্ট্যান্ডে এসে পৌঁছল। মোটরে চেপে কয়েক মাইল গিয়ে আবার পায়ে হেটে নির্দিষ্ট পুঞ্জীতে যেতে হবে। তাই রেমা তার সহকর্মীদেরকে নিয়ে বাসে গিয়ে উঠল। বাসটা তখনও ফাঁকা ছিল। কিন্তু রেমা উঠার সাথে সাথেই ভীড় জমে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে বাসটা যাত্রীতে পুরাপুরি ভর্তি হয়ে গেল। যাত্রীদের ভীড়ের চাপে বাসের মধ্যে একটা অস্বস্তিকর ভ্যাপসা আবহাওয়ার সৃষ্টি হল। সবাই ভাবছে বাসটা ছেড়ে দিলে ভালো হয়। রেমা জানালার পাশে বসেছিল। সে বাইরে তাকিয়ে দেখছিল। সে দেখল দেওয়ালে পাশা পাশি পোষ্টার পড়েছে। সব লেখা ভালোভাবে বুঝতে না পারলে ও বড় বড় হরফগুলি সে বুঝতে পারল। পোষ্টারের লিখা রয়েছে “বিপ্লবী জনগণকে দমন করতে প্রতিক্রিয়াশীল ইন্দিরা নে-উইন চক্রান্ত ব্যর্থ হউক” “বার্মার সংগ্রামী জনগণ জিন্দাবাদ” " শহীদ থাকিন থান টুন জিন্দাবাদ”। ইত্যাদি। বিগত দিনে দেওয়ালের লিখন দেখে রেমা যতটুকু আশ্চর্য হয়েছিল আজ এই পোষ্টারগুলি দেখে আরও বেশী আশ্চর্যান্বিত হল। বিপ্লবীদেরকে দমন করতে ইন্দিরা নে-উইন চক্রান্ত ব্যর্থ হউক। বার্মার সংগ্রামী জনগণ জিন্দাবাদ ইত্যাদি কথাগুলি তার মনে তোলপাড় করতে লাগল। সে ভাবল, বিপ্লবীদেরকে দমন করতে ইন্দিরা নে-উইন চক্রান্তটা কি? বার্মাতে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী তাদের মুক্তির জন্য সশস্ত্রভাবে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতবর্ষের পূর্ব সীমান্তেও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী লড়ছে। কাজেই সেই বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে দমন করার চেষ্টা উভয় সরকারকেই চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এমতাবস্থায় ইন্দিরা নে-উইন সরকার কি যৌথভাবে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বদ্ধপরিকর হয়েছে? যদি দুই দেশের মধ্যে সেরকম একটা বোঝাপড়া হয়ে থাকে তাহলে কি সেটাকেই “বিপ্লবীদের দমন করতে ইন্দিরা নে-উইন চাক্রান্ত” বলে অভিহিত করতে চাইছে?

সে যাহোক, আজ বার্মার সংগ্রামী জনগণ এবং নে-উইন সরকারের সেনাবাহিনীর সাথে Encounter এ নিহত মাও পন্থী কমুনিষ্ট পার্টির নেতা থাকিন থান্ টুন্ প্রভৃতির প্রতি যে সহানুভুতি সূচক পোষ্টার এখানে পড়ছে সেটা স্বাভাবিক ভাবেই সাম্রাজ্যবাদের সেবাদাসদেরকে সন্ত্রস্ত করে তুলবে। আজকে বার্মার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সশস্ত্র সংগ্রাম, মিজো পাহাড়ের মিজো সংগ্রাম এবং নাগাদের সংগ্রাম প্রভৃতি আগামী দিনে কি রূপ নিবে এবং তাতে চীনের ভূমিকা কি হতে পারে সেটার প্রতি লক্ষ্য রেখেই সাম্রাজ্যবাদীরা তৎপর হচ্ছে। চীনের য়ুনানের সীমান্ত অঞ্চল থেকে আরম্ভ করে ভারতবর্ষের পূর্ব সীমান্ত পর্যন্ত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী এবং জনগণের যে সশস্ত্র অভিযান চলে আসছে সেটাতে চীনের যোগাযোগ এবং মদত কি হারে হচ্ছে তা প্রত্যক্ষভাবে না বললেও পরোক্ষ ভাবে ইঙ্গিত দিয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় সাম্রাজ্যবাদীর সেবাদাসরা লিখে যাচ্ছে। তারা লিখেছে যে —

Among the primary insurgent groups in Burma, collaborating closely with China, are the Eastern Naga Revolutionary Council, the Kachin Independence Army, and organized elements of Shan, Kayah, and Chin rebels, including the pro-Phizo wing of the “Naga Federal Government.” The Mizo National Front also cooperates with these groups.

তারা আরও যা লিখেছে সেটা থেকে বুঝা যায় যে, বার্মা সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপটেন Mr Naw seng ১৯৪৮ ইংরাজীতে বিনা অনুমতিতে কাজ ছেড়ে আত্মগোপন করেন। বার্মার উত্তর পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য অধিবাসী কাচিনদেরকে উৎসাহিত করে সশস্ত্র ভাবে লড়াই চালিয়ে নিজেরা স্বাধীন হতে। তারপর ঘটনাচক্রে চীনে চলে যান। সেখান থেকে চীনে শিক্ষণ প্রাপ্ত গেরিলাযোদ্ধা নিয়ে দেশে ফিরে “North East Command of Free Kachins” এর জন্য সশস্ত্র লড়াই জোরদার করেন। দিনে দিনে সক্রিয় সমর্থন সংগ্রহ করে Mr Naw Seng “North East Command of Free kachins” গড়ার জন্য এগিয়ে চলছেন।

অন্যদিকে Eastern Naga Revolutionery Council তাদের শক্তি সংহত করে উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য এগিয়ে চলছে। তারা বার্মার Nagahills জেলাতে তাদের ক্রিয়াকলাপ জোরদার করলেও ভারতবর্ষের নাগাপাহাড়ের আত্মগোপনকারীদের সাথে যোগাযোগ রয়েছে। E.N.R.C এর ব্রিগেডিয়ার Bau Naung এর পরিচালনায় প্রায়ই ভারতবর্ষের নাগাল্যাণ্ড ষ্টেটের ভিতর ঢুকে বিদ্রোহী নাগার যোগসাজসে আক্রমণ সংগঠিত করে থাকে। বার্মার উত্তরাঞ্চল এবং উত্তর পশ্চিমাঞ্চল থেকে যে সমস্ত সংবাদ আসাম এবং নাগাল্যাণ্ডে এসে পৌঁছায় সেটা থেকে বুঝা যায় যে চীনা উপদেষ্টারা সেসব নাগাদের আক্রমণে সরাসরি যোগদান করে থাকে। সে সমস্ত অঞ্চলে চীনারা সাধারণ ব্যবসায়ী বা কারুশিল্পীর ভান করে থাকে এবং সময়মত বিদ্রোহীদেরকে পরিচালনা করে। শুধু তাই নয়, চীনের য়ুনান প্রদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক সমজাতীয় পার্ব্বত্যবাসী এসে বিদ্রোহীদের সাথে বসবাস করে। তাদেরকে সেখানকার বার্মার অধিবাসীদের থেকে পৃথক করে চিনতে পারা খুবই মুশকিল।

তাছাড়া বার্মার আপার চিন্দইন জেলা থেকে প্রায় পাঁচ শতেরও বেশি কুকি, চীন এবং মিজোদেরকে সংগ্রহ করে ১৯৬৯ ইংরাজীর শেষভাগে পূর্ব পাকিস্থানে গোপনে নেওয়া হয়। সেখানে বার্মার একজন কুকি নেতা মিঃ Thangvill তাদেরকে গেরিলা যুদ্ধে শিক্ষিত করার ট্রেইনিং দেন। বার্মার চীন পাহাড়ে যা নাকি ভারতের সীমান্তে অবস্থিত, সেখানে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী বা ছোট ছোট দল ব্যাপক ভাবে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। পত্রিকা গুলো অবশ্য উল্লেখ করেছে সেখানে যতগুলি দলই ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে তারা সরাসরি ভাবে কমুনিষ্ট চীনের সাহায্য এবং নির্দেশ পেয়েই করছে। সেখানে অবস্থিত “Stillwell Road” অর্থাৎ “আসাম বার্মা-চীনা রোড” যা নাকি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তৈরি করা হয়েছিল চীনের সাথে সরবরাহ ব্যবস্থা চালু রাখার জন্য। সেটার উপর চীনা পন্থীরা নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখতেই এসমস্ত অঞ্চলে চীনের নির্দেশ অনুয়ায়ী তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে যাতে এখন বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর আন্দোলনে চীন থেকে সব সময় সেটা দিয়ে প্রয়োজনীয় সবকিছুর জন্য সরবরাহ ব্যবস্থা বজায় রাখতে পারে। সে দিকে খেয়াল রেখে শুধু বার্মাতে বসবাসকারী কুকি, চীন এবং মিজোদেরকেই সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে যেতে উস্কানি দিচ্ছে না, ভারতবর্ষের মিজো পাাহড়ের বিদ্রোহী মিজোদেরকেও সীমান্ত পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী বার্মার চীন পাহাড়ে আক্রমণ চালানোর জন্য নির্দেশ ও সাহায্য দিচ্ছে। তাই ভারতের বিদ্রোহী মিজোরা সীমান্ত পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী বার্মার চীন পাহাড়ে গিয়ে আচমকা আক্রমণ চালায়। ১৯৬৮ ইং চীন পাহাড়ের টিডিম এবং ফালামে বার্মা সরকারের সরকারী অফিস এবং ট্রেসারী লুট করে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ভারতের বিদ্রোহী মিজোদেরকে নিয়ে মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্টের লোকেরা বার্মার চীন পাহাড়ে এধরণের আচমকা আক্রমণ চালাবে কেন? এসমস্ত ঘটনাগুলি উল্লেখ করে সংবাদদাতারা বিভিন্ন ভাবে তাদের খবর প্রচার করে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে আরও লিখেছে যে,

Greater cooperation and closer coordination between India and Burma in political, economic, and security spheres appear to be the imperative need of the hour. The coming months will undoubtedly pose greater difficulties for both nations, and their future largely depends on how these new challenges are faced.

হ্যাঁ, আগামীদিনে সন্দেহাতীত ভাবেই দুদেশের মধ্যে জাতিগোষ্ঠীর সশস্ত্র লড়াইয়ের ফলে অবস্থার জটিলতা সৃষ্টি হবে। সেটাকে কি ভাবে দুদেশের সরকার মোকাবিলা করবে? যখন দুদেশের জাতিগোষ্ঠীই প্রতিষ্ঠিত সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে তখন সেটাকে মোকাবিলা করতেও দুদেশের সরকারেরই প্রয়োজন ভালোভাবে নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা এবং সমন্বয় গড়ে তুলতে। দুদেশের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীও লড়াকু জনগণের দ্বারা পরিচালিত সশস্ত্র লড়াইয়ে যে জটিল অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে সেটা উপলদ্ধি করেই হয়তবা সংবাদ পত্রের বিভিন্ন সংবাদিক উপরোক্ত মন্তব্য করে প্রভুদের সতর্ক করার চেষ্টা করছে।

দেওয়ালে পোষ্টার দেখার পর বাসে ভিড়ের চাপে বসে থাকা অবস্থায় এসমস্তই রেমার মনে ভেসে আসছিল। ততক্ষণে বাস তার নিজস্ব আপন গতিতে এগিয়ে চলছে। মাঝে মাঝে রাস্তায় থেমেছে। অনেক যাত্রী উঠানামাও করেছে। কিন্তু রেমা সে দিকে ভালভাবে নজর দেয়নি। উপরোক্ত সংবাদ গুলিকেই কেন্দ্র করে মন এগিয়ে চলছিল। এক সময় বাস তাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছল। সহকর্মী একজন রেমার সম্বিত ফিরিয়ে বলল যে এখানে নামতে হবে।